খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি :: কংক্রিট লাবণ্যে মুহ্যমান কবি মতিন বৈরাগী

Posted: নভেম্বর 15, 2014 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: সুরাজ চৌধুরী

matin-bairagi-book-2কবি মতিন বৈরাগী চার দশকের বেশী সময় ধরে কাব্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন এবং বর্তমানের খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি’ কবিতা গ্রন্থের মোট ছত্রিশটি কবিতায় কবির অন্তক্ষরণের বেদনা অনুভব করা যায় এখানে তাঁর আশা. স্বপ্ন, ক্ষোভ, প্রেম, বিরহ বেদনা এবং নৈরাশ্য প্রতি পঙক্তিতে উন্মোচিত হয়ে পাঠককে তাপিত করে ওয়াল্টার ডেলা মেয়ার এর অমোঘ পঙক্তি ক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য হোয়াট লাভলী থিংস/দাই হ্যান্ড হ্যাথ মেড’ স্ক্রাইব কবিতা‘।

মতিন বৈরাগী তার সৃজনকর্মে স্বদেশ, স্বসমাজ তথা বিশ্বজনীন কল্যাণ কামনায় তাঁর স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গের স্বরূপকে ক্রিয়া পদের ঘটমান ন্ঞর্থক শব্দ প্রয়োগে বাক্সময় করেছেন। কবির মাত্রাবৃত্ত উচ্চারণ ‘‘আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়াখণ্ডগুলো/তুলে নেবে কেউ কোনো বিশ্বাসী হাত/তুমুল করতালির নতুন অভিষেকে/মানুষ অমৃতপুত্র. কখনো মানেনি পরাভব’। কবি চাঁদ, সূর্য, তারকা জোছনার মতো রোমান্টিক অনুসঙ্গ তাঁর কাব্যে একেবারে বাদ দিয়ে এগোননি ফুল, পাখি, অরণ্য.নদী, সমুদ্র কংক্রিট এর মধ্যেও কবির লাবন্যদর্শন যা একজন কবির ভাবনায় বৈদগ্ধতারই প্রকাশ এসব অনুসংগের অন্তরালে তার স্বপ্ন, আশা নৈরাশ্য মোহভঙ্গ চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে এর পরও মেহনতী জনতার কিষাণ হাতের কাস্তে’ আনুষঙ্গটি যথানিয়মে কবির ভাবনায় উঠে এসেছে অরণ্যে ছিলো আলোকানন্দ নাচ/ভিতরে ভাঙছে অ্স্থিরতার কাচ’ কিংবা কখনো সুখের অমেয় আলোকে তুলেছো লেনিন হাত/কখনো চেখের জলের ধারায় হয়েছো নিশীথ রাত’ বিপ্লবের প্রতি গভীর মমত্বের প্রকাশ, কবি প্রধান্য দিয়েছেন মানুষের স্বাধীনতা কে। কবি কালিদাসের কাছে যেমন সবার উপরে মানুষ সত্য /তাহার উপরে নাই’ রঙ্গলালও সমাজ বাস্তবতার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন স্বাধীনতা হীনতায় / কে বাঁচিতে চায় হে/কে বঁচিতে চায়’, মতিন বৈরাগী দেশ এবং বিশ্বে মানুষ স্বাধীন ভাবে বাঁচবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মানুষ হাঁটবে আবার এই পথে /যাবে সে স্বাধীনতার স্নিগ্ধ সড়কে বাঁজিয়ে ভৈরবী’

খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি’ কাব্যে কবির স্বপ্ন স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনার স্বরূপ তার বোধ, বোধের আকাশ কেমন করে খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে কবিকে বেদনার্ত করে তুলছে এবং তা’থেকে বেরিয়ে এসে আবারও সেই দুঃস্বপ্নের মতো কালো মেঘ মুক্ত অখউজ্জ্বল বোধের নীলাকাশের নীচে একটা সুন্দর সুষম আলোয় দীপ্ত স্বদেশে স্বাধীনতার বকুল ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে কবির সেই ইচ্ছে এই গ্রন্থের পরতে পরতে বাঙময় হয়ে উঠেছে যে স্বপ্ন নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিলো কবি মনে করেন এখন আর তার অবশিষ্টাংশও নেই যেনো কবির কাছে ইতিহাসের ফুলস্টপ। কবি বলেন স্বপ্নগুলো পরিত্যক্ত নগরীর মতো নি:সঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে.. সব দিকে বামন বামন দিন কবির নি:সঙ্গ স্বপ্নের মতো পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় তাঁর ভালোবাসাও যেনো অপার নি:সঙ্গতায় হাহাকার করছে চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’ (বনলতা সেন) পঙক্তিতে কবি জীবনানন্দ তাঁর প্রিয়ার চুলের সাথে সুপ্রাচীন বিদিশা নগরীর অন্ধর্কা রাত্রির তুলনা করে সৌন্দর্যকে আরো বহুতর বাড়িয়ে দিয়েছেন মতিন বৈরাগী সে পথে না গিয়ে তাঁর প্রেয়সীর চুলকে ভিন্ন ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছেন এই পড়ন্ত গোধুলিতে আজ টুকরো টুকরো মেঘরূপী নানা বিচিত্র ঘাতপ্রতিঘাতের সাথে যুযুধান কবির কাঙ্খা যখন সন্ধ্যার অরণ্যে হারিয়ে যাচ্ছে কবি তা মেনে নিতে চান না বলেই নিজের বোধের আকাশে শুশ্রƒষার আলো স্বপ্নরূপ ভালোবাসার খোঁজ পেতে চান স্বপ্ন দেখতে চান আর দেখাতে চান কিন্তু তা’ না পাবার আক্ষেপ এবং জাগতিক অসহায় বোধের মধ্যে কবি তাঁর প্রিয়ার প্রতি অভিন্ন কবি কালিদাসের অমর কাব্য মেঘদূতএর নায়ক যক্ষের মতো রণিত হয় তুমিও কি বৈশাখী মেঘের আশায়/চেয়ে আছো স্থির খাপবদ্ধতার সকল অন্তরাল ছিড়ে মানুষকে জেগে উঠবার আহ্বান শোনান কবি কাচের টুকরোর মতো সব কিছু ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, নানা কৃতিবিকৃতির মাঝে দুলছে রাজ্যরাজত্ব। পুরানোনতুন মিলেই আবার ইতিহাসে গতি সঞ্চার হবে এমন বিশ্বাস মানুষ কখনো যন্ত্র মানুষ নয়‘কবি আশায় বুক বাঁধেন তবুও আমি উদিত উষার মুখে/চেয়ে চেয়ে দেখছি তোমার ওই মুখ। জোছনার আর্তনাদ আর পাখির আহাজারী এক পরাবাস্তব দ্যোতনার সৃষ্টি করে। কবির কথায় অদ্ভুত অতিথি এক এসেছে এই ঘরে/বাহিরে কেবল জোছনার আর্তনাদ/উদোম আকাশে পাখিদের আহাজারি/কোথাও কেউ ডাকছেনা আর’ কবির ভাবনা, বোধ, স্বপ্নএবং আশানিরাশা অঙ্গিকারের দোলাচল রোদজোছনার জলে অবিরাম সিক্ত হচ্ছে কবি আবহমান বাংলা কবিতার অঙ্গসৌষ্ঠব যে ছন্দবদ্ধ বাজন নির্ভরতা’ ভুলে যাননি স্বর, মাত্রা, অক্ষর.মিশ্র সহ গদ্য রীতির সকল ছন্দে হাঁটবার চেষ্টা করেছেন গদ্য আঙ্গিকের আনেকগুলো কবিতায় আপাতত গদ্য মনে হলেও তার ভেতরে যে মিশ্র ছন্দের অনায়াশ যাতায়াত আছে তা লক্ষণীয় বাংলা আধুনিক কবিতায় এক্ষেত্রে কবি অমিয় চক্রবর্তী কবি আবুল হোসেন প্রমুখের নাম মনে করিয়ে দেয় অবশ্য ছন্দের ক্ষেত্রে কবি যে শত ভাগ সফল হতে পেরেছেন তা’ বলা হবেনা মতিন বৈরাগী কী গদ্য.কী স্বর. মাত্রা কী মিশ্র সব পথেই হাঁটবার চেষ্টা করেছেন। তবে গদ্য কবিতায় যতি বা পঙক্তি ভাঙার ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্ক থাকলে পাঠক স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন।

কবি মতিন বৈরাগী এক উজ্জ্বল ঊষার দিকে তাকিয়ে আছেন, – তোমার কষ্টগুলো আমাকে বলছে /প্রকৃত স্বাধীনতা ছাড়া আর এক নতুন রাষ্ট্র ছাড়া/মানুষের কষ্টের কোনো উপশম নেইবাস্তববাদী কবির হাতে প্রতীকবাদ এবং পরাবাস্তববাদ মিশেলে যে একটি নান্দনিক অনবদ্য কবিতাও নির্মিত হতে পারে তার প্রমাণ সেই ট্রেন’ কবিতাটি। এ কবিতায় কবির মনোজগতের পরিচয় পাওয়া যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথএর কালজয়ী কবিতা সোনার তরী’ যেমন মানব জীবনের এক পরিণাম সন্ধিক্ষণের বেদনাবোধ , জাগতিক নশ্বরতা কর্মমুখর পৃথিবীর আর্থাৎ জাগতিক অমরতা, সেই ট্রেন’ কবিতাটির মধ্যেও একটা অনির্বচনীয়তা, হাহাকার বাস্তবঅবাস্তবের টানপোড়েন লক্ষনীয়। যে ষ্টেশনে কবি সহ ক’জনমানুষ ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন সে ষ্টেশনটি কিন্তু আজানা, দিনের শেষে ওই ষ্টেশনে রাত্রি নেমে আসে , কোলাহল থেমে যায়, নিঝুম নীরবতায় বেদনা কষ্টের আর্তনাদ, এমনি অবস্থায় সকল স্মৃতি বিলীয়মান, রাত্রির কালো ডানার নীচে সমস্ত পরিপার্শ্ব তলিয়ে গেছে , ডুবে গেছে নির্জণতায় , পোকার কর্কশ শব্দ, ইঁদুরগুলো দৌঁড়াচ্ছে এদিকওদিক আর দূরের গ্রামগুলো নীরব নিঝুম রাত্রিতে অস্পষ্ট রেখার মতো জেগে উঠছে

এমন ভুতুড়ে পরিবেশে হঠাৎ মনে হলো কেউ একজন বলছে যেই ট্রেনের জন্য এতো অপক্ষা/সেই ট্রেন এখন আর নেই’ ভেঙেচূড়ে গেছে, তৈরী হলে কোনদিন আসলেও আসতে পারে উপস্থিত সকলে তাকাচ্ছিলেন পরষ্পরের মুখের দিকে আর অমনি রাত্রির লেপ এসে ঢেকে দিলো তাদের মুখ। তারা এখন আর কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না, কোন কিছুকেই আর না সোনার তরী’ কাব্যে কবিগুরু যেমন মানবজীবনের নিগুঢ় সত্যদর্শন প্রতিকী ব্যঞ্জণায় ফুটিয়ে তুলেছেন, মতিন বৈরাগীর সেই ট্রেন’ ভিন্ন মাত্রায় ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। জন্মান্তর, রূপান্তর বাদেরও ছোঁয়া আছে কবিতাটিতে বহুমাত্রিকতা যেমন স্পষ্ট তেমনি একটি একবচনাত্বক দিনের শেষে বহুবচনাত্বক রাত্রিরা’ নেমে আসায় অপশক্তির ব্যাপকতা অনুভব করা যায়। কবিতাটি সার্থক সহজবোধ্য কিন্তু অন্তরে রয়েছে হাহাকার আমরা যেই ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম/সেই ট্রেন আর আসেনি/.. দিনের শেষে রাত্রিরা নামলো/নিঝুম ষ্টেশনে আমরা ক’জন/আমাদের হৃদয়ে বেদনার আর্তনাদ..আমরা ছিলাম অজানা ষ্টেশনে দাঁড়িয়ে..ঠিক তখন পাশ থেকে কেউ একজন বললো /ওই ট্রেন এখন আর নেই/..অমরা চাইছিলাম পরস্পরের দিকে/রা্ত্রির লেপ ঢেকে দিলো আমাদের মুখ’সেই ট্রেন’ মতিন বৈরাগীর দীর্ঘ কবিতা জেগে উঠুক স্বপ্ন আবার’ কবিতায় কবি এবং চেতনার দ্বৈত অবয়াবিক সংলাপে গল্পের আঙ্গিকে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে শহীদ মিনার কে অনুসঙ্গ করে আমাদের চেতনায় স্বদেশ লাখো শহীদেও স্মৃতি, স্মৃতির মিনার, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয়, স্বাধীনতা, যোগ্য নেতৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অনুভুতি ব্যক্ত করে এইটুক বোঝাতে চেয়েছেন যেন’ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ তিরিশ লক্ষ প্রাণের আত্মাহুতি দিয়ে যে মহান স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে আজ তা ধ্বংস হতে চলেছে শহীদ মিনার শুধু আজ আনুষ্ঠানিক স্মৃতি তর্পনের বেদী ছাড়া আর কিছু নয় তারপরও কবি আশাবাদী হয়ে ওঠেন এভাবে একটি দাবী শুধু উচ্চকিত হোক উচ্চনাদে/জেগে উঠুক স্বপ্ন আবার। বস্তুত কবিতা শুধুই কবিতা নয় আরো বেশী কিছু আর তার রসাস্বদনই পাঠকের প্রথম প্রধান দাবী। কবির অনুভুতি যখন কবিতায় শৈল্পিক মুক্তি পায় তখনই কবি এবং কবিতার সার্থকতা কবিগুরুর শেষের কবিতায় লাবন্যের প্রতি অমিত যেমন বলে জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে/মুহুর্তে চিনিবি আপনারে. ছিন্ন হবে ডোর-/তোরে মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর’

জন্মদিনে কবিকে শুভেচ্ছা

সুরাজ চৌধুরী কবি সংগঠক।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s