কবি মতিন বৈরাগীর ৬৮ তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও তাঁর কবিতা ভ্রমণের কথকতা

Posted: নভেম্বর 15, 2014 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: ফরিদুজ্জামান

matin-bairagi-2নব্বই দশকের শুরুর দিকে ঊন্মেষ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের সভায় আমার প্রথম পরিচয় সেই থেকে তাঁর সংগে আমার সম্পর্ক প্রায় ব্যক্তিক পর্যায়ের। তাঁর কবিতা আমাদের মুগ্ধ করত। তাঁর আলোচনা বিশেষ করে কাব্য প্রসংগে আলোচনা মনোযোগ দিয়ে শুনেছি, শুনি। কারণ কবিতা লেখা, কবিতার সৌন্দর্য, শিল্প সত্তা, কবিতার কাঠামো, কবিতার বসতি, আধার আধেয় নিয়ে সময় সুযোগ পেলে কথা তোলেন এবং বলতে চেষ্টা করেন।

সে সম্ভবত ১৯৯৪ সালের কথা উন্মেষ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের এক আসরে প্রায়ত কবি সমুদ্র গুপ্ত পরিচয় করিয়ে ছিলেন কবি মতিন বৈরাগীর সাথে। সে আসরের সভাপতি ছিলেন কথাশিল্পী মহসিন শস্ত্রপাণি। সেই সভায় আরও উপস্থিত ছিলেনকবি কাজী মনজুর, কবি মুনীর সিরাজ আর আমার বন্ধু ভজন সরকার। সেই থেকে আজ অবধি মতিন ভাইয়ের সাথে আমার সাপ্তাহিক যোগাযোগ অনিবার্য। তাঁর অনেক কবিতারই প্রথম শ্রোতা হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। তাঁর অনেক কবিতার আলোচনা শুনে উজ্জিবিত হয়েছি।

কবি মতিন বৈরাগীর কবিতা প্রসংগে . আহমদ শরীফ তাঁর এক কাব্যের মলাট মন্তব্যে লিখেছিলেন কবি মতিন বৈরাগী নিজের গুণের দানের জন্যেই বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনে সুখ্যাত সুপ্রতিষ্ঠিত। এঁর কবিতা মানুষের দাসত্বে শোষন বঞ্চনাজাত বেদনার কথা বলে, বলে পৃথিবীর হালচাল বদলানোর কথার বাতলায় মুক্তির পন্থা, দিশা দেয়আশা আশ্বাস দেয় মুক্তির আনন্দের সুন্দরের’ . বোরহানউদ্দিন খানজাহাঙ্গীর তাঁর মতিন বৈরাগীর কবিতা নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন মতিন বৈরাগী সুকবির শক্তি নিয়ে কবিতা ক্ষেত্রে বিচরণ করছেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি র‌্যাডিক্যাল‌ কিন্তু তিনি কবিতার প্রান্তিকতার অবস্থানে বিশ্বাসী নন, তিনি কবিতা লেখার বা কবিতা হওয়ার যে অপ্রতিরোধ্য ঐতিহ্য আছে তার মধ্যে অবস্থান করছেন। তিনি সমাজ ব্যবস্থার অনাচারে ক্ষুব্ধ সে জন্য তিনি সমাজ ক্ষেত্রে ন্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন্’ . বিনয় বর্মন তার প্রবন্ধ কিছু ভালো লাগা পঙক্তি’ তে উল্লেখ করে বলেছেন: মতিন বৈরাগী আত্মমগ্ন হয়ে গণমানুষের জন্য কবিতা লিখেছেন। গণমানুষের কবিতা লেখার একটি বড় ঝুঁকি আছে। বক্তব্যের ভারহেতু কবিতার শিল্পসুষমা ক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মতিন বৈরাগী আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন বক্তব্য শিল্পের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে। তার স্পষ্ট উচ্চারণ শিল্পসৌকর্র্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সচেতন প্রয়াসের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার কবিতা স্থূলতা থেকে রক্ষা পেয়েছে। তার শব্দের তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি, পৌঁছেছে বুলস আই পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। এ এক বড় কাব্যস্বার্থকতা, কবিজীবনের এক বড় প্রাপ্তি। কাব্যপ্রবণতায় মতিন বৈরাগী নজরুল, সুভাষ, সমর, সুকান্ত দিলওয়ারের উত্তরসূরি। হয়তো সমাজবাদী কাব্যের শেষ বরপুত্র।’ উল্লেখ করেছেন আরো এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আলোচক, কবিতাপ্রেমীরা পত্রপত্রিকায়, সাময়িকিতে এবং স্মরণিকায় লিখেছেন। কবি লেখক ভজন সরকার লিখেছেন প্রবাস থেকেবাংলাদেশে খুব কম কবি আছেন যিনি এবং তারপর’ শব্দ দু’টি দিয়ে একটি কবিতা শুরু করতে পারেন। কিন্তু একজন কবি পারেন। কবি হিসেবে তিনি খুব শক্তিমান; যেমন শব্দচয়নে, কাব্যভাবনায, তেমনি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায। কিন্ত এই কবি একান্ত নিভৃতচারী, গুটিয়ে থাকেন প্রচারপ্রসার দূরে। তার প্রতিফলন আমরা পাই, একটি স্বাধীনতা কতবার পেলে তবে স্বাধীনতা হয়’ চরণটিতে। চার দশক আগে পাওযা স্বাধীনতার সুফল থেকে যোজন ক্রোশ দূরে আমাদের যে নিরন্তর ঘূর্ণাবর্ত, কবি মতিন বৈরাগী মাত্র একটি সরল সহজ বাক্যেই সবার কথাগুলো যেন বলে দেন। এ রকম করে মতিন বৈরাগীর কবিতায় থাকে অন্ধকারের বর্ণনা। হতাশার পাঁকে পড়া মানুষের নিরন্তর দুর্দশার কথাচিত্র। কিন্তু ইংগিত থাকে আলোর কাছে ফিরে যাবার। তাই এক একটি কবিতা যেন সোনা রোদের একটুকরো ঝলক। গভীর অন্ধকার শেষে সোনালী সকালের হাতছানি। মতিন বৈরাগীর কবিতার পথ বেশ দীর্ঘ। সে দীর্ঘ পথের সবটুকু বর্ণনা দেযা আমার লেখার উদ্দেশ্য নয। একেবারে সদ্য লেখা কয়েকটি কবিতা নিয়ে সামান্য আলোচনা। কোন আগামীতে’ কবিতাটি শুরু হয়েছে এভাবে এবং তারপর চারিদিকে ভাঙচুর পতনধ্বনি, মনে হলো/এক পাহাড ধ্বসের মুখে কিংকর্তব্যবিমুঢ আমি’। পডলে মনে হবে আগে থেকেই পড়ছি কবিতাটি। কবি বলে যাচ্ছেন কিভাবে পাহাড ধ্বসের সামনে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন পতনউন্মুখ সমযয়ে। একটু পরেই সব বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিক যেন মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে থাকা কারো পাংশুল মুখের বর্ণনা এটা। পেছনের দিনগুলো, যার সমষ্টিক নাম ইতিহাস, ব্যক্তিক নাম স্মৃতি, সে সবকিছু আস্তে আস্তে মনে করার চেষ্টা হচ্ছে পতনের সামনে দাঁড়িয়ে। অথচ কিছুই মনে পডছে না যেনো। এক নিঃসরণের ক্লীবতায় আচ্ছন্ন সব কিছু।

অথচ কবি এক প্রচ্ছন্ন আশায় বুক বেঁধে আছেন কেউ কিংবা কারা হয়তো আসবে এই মৃত্যুন্মুখ সময়ের সামনে থেকে আমাদের উদ্ধার করতে। এই আশার সলতেটুকু জ্বলতে না দেখলে আমাদের জীবনে বেঁচে থাকা কি সম্ভব হয? কোনো এক আগামীতে আমরা সবাই যাবো আলোর পথে; আজকের অন্ধকার দূর তো হবেই, হতেই হবে; এই সামান্য আশাটুকু না থাকলে মানুষ কি বেঁচে থাকে?

এই বেঁচে থাকা কী শুধুই ব্যক্তি মানুষের বেঁচে থাকা? বাঁচা তো সমগ্র বাংলাদেশের বেঁচে থাকা। সে কথাগুলোই আছে আরেকটি কবিতায়; দুঃস্বপ্ন থেকে’। কবিতাটিতে সরাসরি আছে ৭১এর কথা। এক ঝলমলে স্বপ্ন শুরুর দিনগুলোর কথা। অথচ অনেকটাই ফিকে রংয়ে ধূসর হয়ে গেছে সে স্বপ্ন। তাই বাস্তবতার জমিনে দাঁড়িয়ে ৭১এর স্বপ্নের ফেরিওয়লা মানুষগুলোর মুখ দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয় আজকাল। ঘুম ভেঙ্গে গেলে এক হতাশা ভর করে। কবি মতিন বৈরাগী তাই বলেন, ওপাশে ঝলমলে এক সূর্য সবুজের জমিনে উড়ছে/আহা, কীযে অদ্ভুত বেঁচে থাকা বাংলাদেশের মানুষ ৭১ চেয়েছিল এক সবুজ জমিন, যেখানে প্রতিদিন উঠবে ঝলমলে সূর্য; অথচ সে স্বপ্নটুকু আজ দুঃস্বপ্নের মধ্যেই শুধু বেঁচে আছে। যেমন আরেকটি কবিতা; নাম, শব্দটা আছে’। একেবারে নিখুঁত কবিতা; ব্যাকরণে গাঁথা কবিতা। অনুপ্রাস আর মাত্রাবৃত্তস্বরবৃত্তের মিশেলে গড়ে ওঠা একটি চিত্রকল্পময় কবিতা। চোখ দু’টো বন্ধ করলেই যেমন শোনা যায় শব্দ, অনুভব করা যায় কেউ না কেউ তো ছিলই এই শব্দের পেছনের কারিগর। এখানে শব্দটা শুধু ধ্বনি নয়। শব্দটা আসলে সভ্যতার অন্য নাম। সভ্যতার পেছনে তো থাকে শ্রমিক, কৃষক কিংবা খেটে খাওয়া মানুষদের নিরব উপস্থিতি। অথচ আমরা টের পাই না; শুনি না তাদের শব্দময় উপস্থিতি। কিন্তু কবি মতিন বৈরাগী শুনেছেন। শুধু শুনেছেন বললে ভুল বলা হবে, কবি বিশ্বাসও করেন শব্দরা আছে, শব্দরা থাকবে। মানব সভ্যতার প্রয়োজনে অনুকুল বাতাসে শব্দদের আবার আসতে হবেই। এই শব্দের জন্য কান পেতে থাকা মানেই সভ্যতার জন্য অপেক্ষায় থাকা, ঝি ঝি পোকার জন্য অপেক্ষায় থাকা, নিস্তব্ধ নদী কিংবা রাত্রির সীমান্তের জন্য অপেক্ষায় থাকা, একটি ফুলের ফোঁটা থেকে ঝরে যাওয়ার কাল অব্দি উজ্জ্বল উপস্থিতির মাধ্যমে অপেক্ষায় থাকা।

মতিন বৈরাগীর পরের গুচ্ছ কবিতা” কবিতাগুলোতে পাঠককে ক্রমশ অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু প্রেক্ষাপটে বিছান সেই সুদূর অতীত থেকে বর্তমান বাস্তবতা। এর মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা, ৭১ বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ, স্বাধীন বাংলাদেশের সীমান্ত হত্যাসহ আরো অনেক ক্ষয়িষ্ণু সময়ের উজ্জ্বল বর্ণনা! কিন্তু এসব কিছুর পরেও কবি স্বপ্ন দেখেন অনেকগুলো মুখের। যাঁরা আসবেন, বদলে দেবে, ভেঙেচুরে আবার গড়বেন। ঠিক আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নের মতো করে আবার গড়বেন দেশ।

কবি মতিন বৈরাগীর কবিতার প্রতিটি শব্দে যেনো জমে আছে আমাদের প্রতিদিনের অবক্ষয়ের চিত্র। কিন্তু গুলো অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয় না, দেয় না হতাশায় হাতপা গুটিয়ে থাকার ক্লিবতা; দেয় অন্ধকার থেকে আলোর পথের ইশারা। কবির কবিতা পাঠ শেষে পাঠক খুঁজে পায় সে পথের নিশানা, যা তাকে একদিন পৌঁছে দেবেই আলোর গন্তব্যে। কবি মতিন বৈরাগী সামাজিক দায়বদ্ধতাটুকু চার দশকের অধিক কাল থেকেই করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনে।”

ফরিদুজ্জামান, কবি লেখক

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s