লিখেছেন: মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

matin-bairagi-book-6দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন কবি মতিন বৈরাগী, কি লিখছেন, কেন লিখছেন, এসব প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। সরল উত্তর হলো তিনি কবিতা লিখছেন সচেতন মানুষ হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। আজকের প্রজন্মে যখন কবিতা নিয়ে অনেক ভাংচুর চলছে, বর্ণনাত্বক ছন্দবদ্ধোতার অধ্যায় পেরিয়ে, আধুনিকতার খোলস ভেঙে কবিতা যখন তার ডানা মেলে দিয়েছে ঠিকানাহীন আকাশের দিকে, সিম্বলিজম, সুরিয়ালিজম, দাদাইজম এমনকি হাংরি মুভমেন্টঅলাদের পেছনে ফেলে কবিতা যখন এগিয়ে চলছে অনাগত আগামীর পথে তখনো তিনি তাঁর মতো করে লিখে চলছেন। উত্তাল তরঙ্গ পেরিয়ে কবিতার স্টিমারে আসীন হয়ে ছুটছেন কাক্সিক্ষত গন্তব্য সন্ধানে। বস্তুত কবিতার বিষয়ে কিছু লিখতে হলে বা বলতে হলে, কবিতা বলতে আমার কি বুঝি সে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, কবিতা কিছু বলে না, বেজে ওঠে’। ফরাসি কবি লুই আরাগাঁ বলেছেন, কবিতার ইতিহাস তার টেকনিকের ইতিহাস’। আবার দান্তে বলেছেন, সুরে বসানো কথাই হলো কবিতা’। কোলরিজ মনে করেন, শ্রেষ্ঠতম বিন্যাস, শ্রেষ্ঠতম শব্দসমূহের প্রকাশই কবিতা’। কথাগুলো পুরনো এবং বহুল ব্যবহৃত তবে এখনো শ্বাশত, এখনো সবের সারবত্তা উপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, এখনো উড়িয়ে দেয়া যায় না এসব কথা।

কবির প্রথম কবিতার বই, বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৭ সালে। এর পর একে একে প্রকাশিত হয়েছে কাছের মানুষ পাশের বাড়ি (১৯৮০)। খরায় পীড়িত স্বদেশ (১৯৮৬)। আশা অনন্ত হে (১৯৯২)। বেদনার বনভূমি (১৯৯৪)। অন্তিমের আনন্দ ধ্বনি (১৯৯৮)। অন্ধকারে চন্দ্রালোকে (২০০০)। দূর অরণ্যের ডাক শুনেছি (২০০৫)। স্বপ্ন এবং স্বাধীনতার গল্প (২০০৭)। অন্যরকম অনেক কিছু (২০০৮)। খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি (২০১২)। নির্বাচিত (২০০১)। সিলেক্টেড পোয়েম’স (২০০৫)। কবিতা সমগ্র (২০০৮) এবং দুঃখ জোয়ারের জলস্রোত (২০১৪)

কবি মতিন বৈরাগী তাঁর কখনো আসনি তুমি কবিতায় প্রত্যাশিত জীবনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করতে গিয়ে আকুল হয়ে লিখেছেন হয়তো আশা ছিল ধীরে ধীরে নামিবে রোদ্দুর/ নাওয়ের বাদামের হাওয়ায় ভাটিয়ালী সুর..। বৃক্ষমানুষ কবিতায় সময়ের অবক্ষয়কে চিহ্নিত করতে গিয়ে লিখেনতারপর একদিন মাত্র সেইদিন তাকে কেটে ফেলা হলো/ যেনো কতশতো কফিনে পড়ে আছে সড়কে..। আত্ম পরিচিতির সঙ্কটে নিমজ্জিত সত্তাকে শনাক্তকরনের তাগিদ থেকে তিনি ভবনাগুলো উড়িয়ে দিলাম কবিতার পঙক্তিতে সন্নিবেশ করেন তার চেয়ে চলো চুপচাপ কোথাও বসি / দেখি নিজেদের..। কত সরলভাবে তিনি কত গভীর কথা বলতে পারেন কবিতার চরণ দুটি যেন সে কথারই সাক্ষ্য বহন করছে। শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে আবর্তিত তাঁর ভাবনা জগৎ। তাই তো হাতুড়ির আওয়াজ বা লাঙল টানার শব্দ তাঁর কাছে হয়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের জীবনের প্রতীক। এ প্রসঙ্গে তিনি শব্দটা আছে কবিতায় লিখেন হয় তো হাতুড়ির নয় তো চাকার কিংবা শুকনো মাটির / পরিশ্রমী হাত টানছে লাঙল। একই কবিতায় তিনি সেই শ্রমজীবী মানুষের অসম্পূর্ণ অধ্যায়, অপ্রাপ্তির অধ্যায় বা বঞ্চনার অধ্যায় সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে লেখেনঅদ্ভূত রোদ চারিদিকে ফ্যাকাশে / একটা ফুল ফুটে ফুটে ঝরে যাচ্ছে কোন আবেগ নেই..। সমাজ যতই ক্ষয়িষ্ণু হোক, জীবন যতই সঙ্কুল হোক, পথ যতই বন্ধুর হোক, পথিককে পথের ঠিকানা বাতলে দেয়ার জন্য কবিকে আলোকিত লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অন্ধকার সড়কের ধারে। সেই অনুভূতি, সেই দায় থেকেই তিনি নতুন কিছু গড়ে উঠবার সময় কবিতায় বলছেন : স্বপ্নগুলো ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে গেলে পর / পথ খুঁজে পাবে পথের পথিক, তখন দিবেসের শেষের হেমালোচ্ছটা ছড়িয়ে থাকবে / আশপাশে সকল সবুজে। স্বভাবগতভাবে মানুষেরা হয়ে থাকে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। তাদের ডানা বেধে রাখা যায় না। একটি পাখির মাধ্যমে কবি সে কথাই ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। এ প্রত্যয়ে একটা পাখির মুক্তি সংগ্রাম কবিতায় তিনি লিখেছেনআমার মনে হলো সে চিৎকার করে বলছে / মুক্তিমুক্তিইনকিলাব জিন্দাবাদ’।

যাপিত জীবনের হতাশা মাঝে মাঝে গ্রাস করে ব্যক্তি সমাজ এবং ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্রকে, এর প্রভাবে মনো জগতে দেখা দেয় বৈকল্য, চিন্তার জট স্থবির করে দেয় ভাবনালোকের স্বাভাবিকতা। মস্তিষ্ক হয়ে পড়ে অকার্যকর। এ কথাই বিধৃত হয়েছে কবির মাথার গল্প কবিতায়। এই কবিতায় তিনি লিখেছেন: আমার তন্দ্রা টুটে গেলো কিন্তু মনে হলো আমার মাথাটা আর কাঁধে নেই কবি কবিতা লিখবেন আর সেখানে প্রেম থাকবে না, তাতো হবার নয়। কফিনে শুয়েও প্রেমের পঙ্ক্তিতে কবি বেঁচে থাকেন। অবিনশ্বর প্রেমের জন্য তাই কবিকে গ্রহণ করতে হয় কাব্যময়তার সহায়তা। অপ্রাপ্তির অভিযোগ উত্থাপন করতে হয় শব্দের গাঁথুনিতে। এমনি একটি কবিতা, তুমি হয়ে ওঠো না বলে, এই কবিতায় তিনি লিখেন আমি তোমার মধ্যে সারাক্ষণ জেগে থাকি / কেবল তুমি, তুমি হয়ে ওঠো না আর। আহা! কি অবাক করা হাহাকার, এই অপ্রাপ্তির চেতনা থেকেই হয়তো একজন সাধারণ মানুষ এক সময় কবি হয়ে ওঠেন। সমাজ পরিবর্তনের প্রত্যয়ে প্রতিজ্ঞ কবি তাঁর বিদ্রোহ হোক কবিতায় লিখেন: বিদ্রোহ চাই সমাজে জীবনে অঙ্গে / বিদ্রোহ হোক তোমার নিয়ম ভঙ্গে। একই চেতনায় আবিষ্ট হয়ে তিনি জেগে উঠুক স্বপ্ন আবার কবিতায় লিখেন: হে অজ্ঞাত পুরুষ মানুষের প্রিয় স্মৃতি আজ এই রাত্রির অন্তিমে / একটি দাবি উচ্চারিত হোক জেগে উঠুক স্বপ্ন আবার’। জীবনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আশা নিরাশার দোলাচলে প্রতিনিয়ত কবি দোলায়িত হয়েছেন। কখনো প্রত্যাশিত সূর্যের আলোক রেখা দেখে হয়েছেন উজ্জীবিত, কখনো আবার সে আলোক রেখাকে দেখেচেন মেঘের আড়ালে হারিয়ে যেতে। তবুও তিনি নৈরাশ্যেও গহ্বরে নিপতিত হননি। প্রত্যাশার প্রহরের অপেক্ষায় থেকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। কবি বিশ্বাস করেন, মানুষ এক সময় জেগে উঠবেই। সকল প্রতিবন্ধকতা ছিন্ন করে হবে রোদের মতো উদ্ভাসিত। মানুষকে কখনো অবদমিত করে রাখা যায় না। সে নিরিখেই তিনি কী ভয় দেখাবে তাদেরে কবিতায় লিখেছেন: যখন মানুষ জেগে ওঠে পিছু ফেলে ক্লান্তির অবসান / যখন উঠে দাঁড়ায় যুগযুগান্তরের জগদ্দল ভেঙে পূর্ণ করে জীবনের দায় / ———গান হয় পাখির কণ্ঠ হিরন্ময় রোদের সমান

আমাদের নাগরিক জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায় সচল হয়ে ওঠে রাত্রের আঁধারে। আনন্দ বেদনার অনেক অনুষঙ্গ রাতের শহরকে করে কলুষিত। মানবতার এক বিপর্যস্ত আখ্যান যেন ওতোপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে রাতের আঁধারের সাথে। এ বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে কবি মধ্যরাতে এই শহর কবিতায় লিখেছেন: মধ্যরাতে, এই শহরের গাছগুলো হেঁটে হেঁটে চলে যায় বহুদূর / ফুটপাতগুলো খুব প্রগলভ কথা বলে ফিসফাস। একই কবিতার অন্যত্র তিনি লিখেছেন: মধ্যরাতে এই শহর ঘন হয়ে হয়ে / আরেক শহর হয়ে ওঠে। একই আঙ্গিকে রাতের স্বরূপ চিত্রিত করতে তিনি নানা দৃশ্য কবিতায় লিখেন: তারপর / নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে সময়সংবাদ / পড়ে থাকে আয়োজন বেড়ে চলে রাত। কবি মতিন বৈরাগী একটি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেছে সমগ্র জীবন। অপেক্ষায় অপেক্ষায় তাঁর চুলে পাক ধরেছে। শৃঙ্খলিত জীবন ভাঙার, ডাঙায় মুখরিত জীবনের, সাদা কথায় শোষণহীন সমাজ প্রবর্তনের সেই প্রতীকী ট্রেনটি হিরন্ময় হুইসেল বাজিয়ে কখনো আসেনি বৈরাগীর অপেক্ষার স্টেশনে। তাঁর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। এই অপ্রাপ্তির হাহাকার ধ্বনিই যেন প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর সেই ট্রেন কবিতায়, এই কবিতায় তিনি লিখেছেন: আমরা যেই ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম / সেই ট্রেন আর আসেনি। এভাইে আবর্তিত হয়েছে কবি মতি বৈরাগীর কাব্য ধারা। আর্তুর র‌্যাঁবো যেমনটি বলেছেন, কবিতা আসলে গাণিতিক বা জ্যামিতিক সূত্রের মত কোনো বিষয় নয়। কবিতা হলো হৃদয়, মন মস্তিষ্কের এলোমেলো এক অবিন্যন্ত রসায়ন প্রক্রিয়া মাত্র। কবিতা ইন্দ্রিয় সত্তা হতে বিমুক্ত এক নান্দনিক সৃষ্টি। ’ কবিদের সম্পর্কে র‌্যাঁবো বলেন, কোনো ধর্ম গ্রন্থের ঈশ্বর নয়, কবিকে নিজেকেই হতে হবে নিজের ঈশ্বর। ’র‌্যাঁবোর নির্দেশিত পথেই হেঁটেছেন কবি মতিন বৈরাগী। সৃষ্টিশীলতার জন্য নিজেই হয়েছেন নিজের নির্মাতা। অকুণ্ঠ চিত্তে প্রকাশ করেছেন নিজের ভাবনাগুলো। কবিতার মাধ্যমে হয়েছেন জনগণমনের মুখপাত্র। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন বলেছেন: প্রায় ছয় হাজার বছর ধরে পৃধিবীতে কবিতার চর্চা হয়ে আসছে, তদুপরি কবিতার কোন সংজ্ঞায়ন নেই। আদতেই তাই, কারো কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করবার কোন অবকাশ নেই। এ কারণেই কবি মতিন বৈরাগীর কবিতাকেও স্বতন্ত্রভাবে শ্রেণিবদ্ধ বা সংজ্ঞায়িত করার ফুরসৎ নেই। তিনি স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। তাঁর কবিতায় নেই ভারি ভারি কথার স্রোত। তদুপরি কবিতার প্রতি ছত্রে ছড়িয়ে আছে ওজনদার কথা। একটি সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা যদি কবির দায় হয়ে থাকে, তাহলে বলবো: তিনি সেই দায় সঠিক ভাবেই প্রতিপালনে সক্ষম হয়েছেন। তাছাড়া ব্যক্তি জীবনে তিনি যেমন প্রতিশ্রুত পথ থেকে বিচ্যুত হননি। কবিতা বিনির্মাণের ক্ষেত্রেও তেমনি হননি কক্ষচ্যুত। দৃঢ়তার প্রশ্নে থেকেছেন প্রশ্নহীন। ঊনসত্তুর বছরে পদার্পন শুভ হোক, এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সমাপ্তি টানছি।

তথ্যঋণ কৃতজ্ঞতা

(০১) উজ্জ্বলকুমার মজুমদার। সাহিত্য সমালোচনার রূপরীতি। কলকাতা। দে’জ পাবলিশিং। ২০০৯

(০২) আব্দুল মান্নান সৈয়দ। ছন্দ। ঢাকা। অবসর। ২০০১

(০৩) খসরু পারভেজ। কবিতার ছন্দ। ঢাকা। বিদ্যা প্রকাশ। ২০০৫।

(০৪) বিনয় বর্মন। আধুনিক বিশ্ব কবিতা আন্দোলন। ঢাকা। মাসিক উত্তরাধিকার। ৫৬তম সংখ্যা। অক্টোবর, ২০১৪।

মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক কবিও লেখক।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s