লিখেছেন: সৌম্য মণ্ডল

kisssssssচা এর দোকান থেকে সংবাদ মাধ্যম, বঙ্গরাজনীতি উত্তাল, হৈ হৈ এবং ছি ছিক্কারে, কারণ গত ৫ নভেম্বর রাস্তা অবরোধ করে প্রায় ৩০০ ছাত্র ছাত্রী চুমু খেয়েছে! তাও আবার যাদবপুর থানার সামনে দাড়িয়ে! ওয়াকি টকি হাতে পুলিশ ঘেঁটে লাট, “স্যার”কে কি ভাষায় রিপোর্টিং করবে বুঝতে পারছেনা! অন্য সময় হলে না হয় “হাতে নাতে” ধরা পরা “অপরাধী” মেয়েটির বুকে খানিক হাত বুলিয়ে নেওয়া যেত অথবা যুগলের কাছ থেকে ২০০ টাকা ফাইন, অন্তত পক্ষে ধমকির ফরম্যাটে একটু জ্ঞান তো দেওয়া যেত! মানে ওই পার্কে, বা অন্ধকার গলিতে আইনের রক্ষকরা যে বঙ্গ সংস্কৃতিটা অনুশীলন করেন আর কি!

তাই ‘সংবাদ প্রতিদিন’ যখন পরেরদিনের প্রথম পাতার বেঢপ সাইজের শিরোনাম দেয় “প্রকাশ্যে চুম্বন! বঙ্গ সংস্কৃতি চুরমার করলো যাদবপুরের ছাত্র ছাত্রীরা” তখন আন্দোলনকারীরা ধরে নিতেই পারেন যে তারা যা করতে চেয়েছিল ঠিক তাই করতে পেরেছে। এমনকি যখন শিক্ষা মন্ত্রীও দাবি করেছেন যে তাঁর মাথা হেঁট হয়ে গেছে!

নিন্দায় সরব বঙ্গের হতভম্ব বুদ্ধিজীবী কুল। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন “এটা কোনো প্রতিবাদ এর ভাষা হতে পারে না। কুরুচির পরিচয় ছাড়া আর কিছু নয়। কেরালায় চুম্বন করে প্রতিবাদ হয়েছে বলে এখানেও করতে হবে তার মানে নেই…” শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর সুরেই যারা প্রশ্ন তুলেছে যে চুমুটা প্রতিবাদের কোনো মাধ্যম হতে পারে কিনা? আমার মনে হয় যে, বাস্তবে আন্দোলনকারীদের প্রত্যেকের কাছেই চুমুটাকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নেওয়াটা লজ্জারই বিষয়। এই প্রতিবাদ এটাই স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয় যে, আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে চুমু খাওয়াটাও প্রতিবাদ হয়ে উঠতে পারে, কতৃত্বকে নাড়িয়ে দিতে পারে!
অসীম চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, “আন্দোলনের স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেললে এরকমই হয়। ক্লাসও করব আবার আন্দোলনও করব, এই যদি চিন্তা হয় তবে আন্দোলনের ভাষা তো চুমু খাওয়া হবেই।” অসীম চট্টোপাধ্যায় এর মত অনেকেই ভিসির পদত্যাগের দাবিতে “হোক কলরব”এর সাথে গত ৫ তারিখ এর কর্মসূচিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। ঘটনার সূত্রপাত হলসূত্রপাত হলোমাফ করবেন পাঠক ঘটনার কোনো নির্দিষ্ট সূত্রপাত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা,, কংগ্রেস, বিজেপি, সিপিএম, তৃণমূল, কোনো জামানার মধ্যে এর সূত্রপাত খুঁজে পাচ্ছিনাখুঁজতে খুঁজতে সেই সমাজে যেখানে ব্যক্তি সম্পত্তির উৎপত্তি, মেয়েদের সম্পত্তিতে রূপান্তর করে হারেম বা বিয়ের নামে যৌন দাসীতে পরিণত হওয়া, পুরুষতন্ত্র নির্মাণের যুগে ফিরে যেতে হবে। এরপর পরিবর্তনশীল সমাজের সাথে সাথে পুরুষতন্ত্র হাজির হয়েছে নতুন নতুন কেতায়। আরো অনেক বেশী লজ্জার বিষয় যে, আমদের সমাজের পুরুষতন্ত্র ইউরোপীয় উন্নত পুঁজিবাদী সমাজের পুরুষতন্ত্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকা, স্থুল চরিত্রের রয়ে গেছে, যাকে পন্ডিত ব্যক্তিরা বলে থাকেন “ভারতীয় সংস্কৃতি”।

তবুও সূত্রপাত যদি বলতেই হয় তাহলে বলা যেতে পারে যে, কিছু দিন আগে স্টিং অপারেশনের নামে কেরালার সংবাদ মাধ্যমে ভয়ানক ঘটনা হিসেবে গাড়ি রাখার জায়গায় ২ জন তরুণ তরুনীর চুম্বন দৃশ্য সম্প্রচার করা হয়, এরপর ভারতীয় সংস্কৃতির স্বঘোষিত একমাত্র ঠিকাদার দক্ষিনপন্থী আরএসএস বাহিনী অনৈতিক কাজের আখড়া হিসেবে চিহ্নিত করে একটি ক্যাফেতে হামলা চালায়। এর প্রতিবাদে ২ নভেম্বর কেরালার কচি শহরে ছাত্রছাত্রীরা মেরিন ড্রাইভকিস অফ লাভ (kiss of love)” শিরোনামে প্রকাশ্যে চুমু খেয়ে প্রতিবাদের ডাক দেয়। আর অন্যদিকে, চুমু খাওয়া ঠেকাতে মেরিন ড্রাইভএ হাজির হয়েছিল বিভিন্ন জুজুধান ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন গুলো। এটা তো মানতেই হবে যে চুমুই ধর্মীয় জুজুধানদের ঐক্যবধ্য করেছে অন্তত ঘন্টা খানেকের জন্যকচির ওই প্রতিবাদী জমায়েতে পুলিশ হামলা করে এবং প্রায় ৫০ জন প্রতিবাদীকে গ্রেপ্তার করে। কচির “কিস অফ লাভ”এর সমর্থনে সারা দেশের বিভিন্ন শহরে মূলত ছাত্রছাত্রীরা চুমু খেয়ে প্রতিবাদের কর্মসূচি নেয়। যাদবপুর থানার সামনে কর্মসূচি দেশ জোড়া সেই প্রতিবাদেরই অঙ্গস।

কিন্তু কেন চুমু? আমার প্রশ্ন চুমু হলেই বা ক্ষতি কি? প্রকাশ্যে চুমু দেখে যাদের অতিরিক্ত চিত্ত চাঞ্চল্য ঘটে, তারা গুপ্ত রোগ লুকোবেন না, ডাক্তারের কাছে যান, এতে লজ্জার কিছু নেই। নতুবা একটু ধৈর্য ধরুন অভ্যেস হয়ে যাবে। কোনসময় মেয়েদের সালোয়ার পরাটা বা নারীপুরুষের হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোটা অশ্লীল ছিল, বলা ভালো দেশের বড় অংশ জুড়ে এসব এখনো অশ্লীল। চুমু শুধু চুমু হলেও ক্ষতি ছিলনা, কিন্তু অরাজনৈতিকরা দুঃখ পেলেও এটাই বাস্তব যে, চুমু শুধুই চুমু নয়, চুমুর সীমানা ছাড়িয়ে আজ তা অনেক কিছু। প্রশ্নটা গণতন্ত্রের, অন্যকে শোষণ বা নিপীড়ন করছে না এরকম যেকোনো স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকারের। বিশেষত হিন্দু ফ্যাসিস্টরা সরকারি ক্ষমতায় আসার পর প্রকাশ্যে, সংগঠিতভাবে, সরকারীভাবে গণতন্ত্রবিরোধী পিছিয়ে থাকা চেতনায় সুরসুরি দেওয়া অনেক বেড়ে গিয়েছে, গত ২৩ অক্টোবর মহারাষ্ট্রে উচ্চবর্ণের মেয়ের সাথে প্রেম করার অপরাধে দলিত ছেলের হত্যা বা মুসলিম ছেলেদের হিন্দু মেয়ের সাথে প্রেম করার বিরোধিতা করে “লাভ জিহাদ”এর তত্ত্ব হাজির করা, অথবা বিজেপির ছাত্র শাখা এবিভিপির দেশ জুড়ে লাইভ ইন সম্পর্কের বিরুধ্যে প্রচার আন্দোলন, দেশজুড়ে মুসলিম বিরোধী প্রচার, লিঙ্গ বৈষম্য বিরোধী পোস্ট ফেসবুকে প্রচার করার জন্য আসামের ছাত্রীর বাড়িতে গেরুয়া শিবিরের হুমকি বা ধর্মীয় জিগির কোনটাই বিচ্ছিন্ন নয়। পুরোটাই ফ্যাসিস্ট প্রজেক্টের অংশ। আর এর সাথেই জুড়ে যাচ্ছে অন্যের জীবন, গণতন্ত্র, স্বাধীনতায় নাক গলানো, নৈতিকঅনৈতিক বিচার করনেওয়ালা নীতি পুলিশের বার বাড়ন্ত। জনগণকে ফ্যাসিস্ট শাসনের নিগড়ে বাঁধতে হলে তাকে আগে বাধ্য পোষ্য বানানোটা জরুরি। নীতি পুলিশগিরি এমন একটা ব্যাপার, যার মাধ্যমে শাসক জনগণের দ্বারা জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করায়। ৫ তারিখের কর্মসূচি না হলে জানতেই পারতাম না যে, চারপাশে ঘুরে বেড়ানো প্রগতিশীল দের মধ্যে কতজনের মাথার ভিতর আরএসএস বসে আছে!

আর সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে এলিটিস্ট আন্দোলন বলে যে সমস্ত কমরেডরা মিছিলে এলেন না, তারা আদতে এলিটিস্ট আন্দোলনের তকমার সাহায্যে নিজের মনের ভিতরের রক্ষনশীলতাকে ঢাকার চেষ্টা করছেন নাকি? অথবা এই প্রতিবাদের অন্তর্নিহিত গৈরিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক চরিত্রের অন্তর্বস্তুকে দেখতে পারছেন না? প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন জনৈক অধ্যাপক এই প্রতিবাদকে সভ্যতাবিরোধী বর্বর বলেছেন। যুক্তি সেই ভারতীয় সংস্কৃতি। যদিও উনাকে ধুতি পাঞ্জাবি পরতে কোনদিন দেখিনি বা বিজ্ঞাপনের হার্ডিংএ নারীদেহ পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে উনার কোনো প্রতিবাদও আমার চোখে পরেনি। যদিও তিনি সরকার বিরোধী প্রতিবাদী কন্ঠ হিসেবে থেকেছেন। মাননীয় শিক্ষক নিশ্চয়ই জানেন যে, মানুষ ছাড়া অন্যান্য কোনো পশুপাখি এত গভীরভাবে চুমু খায় না, বরং মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে চুমু খাওয়ার ধরনে বৈচিত্র এসেছে। সুতরাং চুমুর সাথে সভ্যতার কোনো বিরোধিতা নেই। বরং চুমু খাওয়া আটকানোর সাথে বিরোধিতা আছে বলা যেতে পারে। নীতি পুলিশরাই বরং সভ্যতা বিরোধী।

প্রেসিডেন্সি কলেজের আরও একজন শিক্ষক ছিলেন, যার নেতৃত্বে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে ছাত্ররা মদ, গাজা, গরুর মাংস খেয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি, রক্ষণশীলতাকে আঘাত করেছিলেন, শিক্ষকের নাম ডিরোজিও এবং ছাত্র গোষ্ঠীটির নাম ইয়ংবেঙ্গল। সেই সময় অপসংস্কৃতি অশ্লীলতার দায়ে ডিরোজিওকে ১৮৩১ সালে হিন্দু সমাজপতি রাধাকান্ত দেবের প্রধান উদ্যোগে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। আজ যারা ছি ছি করছেন তাদের মধ্যে অনেকেই গদগদ চিত্তে ডিরোজিওর মূর্তিতে মালা দিয়ে আসেন। কিন্তু ভূমিকা নেন রাধাকান্ত দেবের মত। আর যারা বলছেন বাচ্চারা কি শিখবে? তাদের বলব যে, ধান্দাবাজি, স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতার বদলে বড়দের কাছ থেকে বাচ্চারা যদি চুমু খাওয়া শেখে তাহলে ক্ষতি কি??

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s