‘আচ্ছে দিন’-এর একশো দিন :: কাদের মুখে হাসি, কাদের চোখে কান্না

Posted: অক্টোবর 28, 2014 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , ,

লিখেছেন: সব্যাসাচী গোস্বামী

modi-100-daysকথা ছিল, ক্ষমতায় এসেই প্রথমে মোদিজী দেশের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সমস্যা মেটাবেন। কথা ছিল, দুর্নীতি সমাধানে একটা জবরদস্ত সমাধান করা হবে। কিন্তু অভিযোগ ছিল, স্রেফ যে মোদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরতেই খরচ করা হয়েছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা, সে কি করে একটা দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন উপহার দেবে দেশবাসীকে! প্রচারের বহর দেখে এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহরও অবকাশ থাকে না।

বিজ্ঞাপন জনসংযোগে রাজনৈতিক মোট খরচ হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বিজেপি একাই খরচ করেছে ৫ হাজার কোটি টাকা। দেশ জুড়ে অন্তত তাক লাগিয়ে দেওয়া মোদির ছবি সহ হোর্ডিং ছিল তিনমাস ধরে ১৫ হাজার। সস্তার এলাকায় হোর্ডিং পিছু ২৩ লাখ টাকা খরচ করেছে বিজেপি আর মুম্বাইয়ের নরিম্যান পয়েন্টের মতো জায়গায় এই খরচ ২০ লক্ষ টাকা, ফলতঃ হিসেব বলছে বিজেপির স্রেফ হোর্ডিং লাগাতে খরচ হয়েছে ২,৫০০ কোটি টাকা। বিভিন্ন ভাষায় সংবাদ, বিনোদন, খেলাধূলার ফাঁকে বিজ্ঞাপনের জন্য ২০০০ স্পট কিনেছিল বিজেপি প্রাইম চ্যানেলে তিরিশ সেকেন্ডের জন্য যার খরচ ৮০ হাজার টাকা এক্ষেত্রেও সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ৮০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা। টি টোয়েন্টিতে বিজ্ঞাপন বাবদ খরচ ১৫০ কোটি টাকা। অনলাইন রেডিওতে ৩৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি বিজেপির প্রিন্ট মিডিয়া সেল সূত্রের খবর অনুযায়ী ৫০০ কোটি টাকা খরচ করে ৫০টি জাতীয় ও আঞ্চলিক স্তরের সেরা বাছাই করা সংবাদপত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গায় ৪০ দিন ধরে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। জতীয় স্তরের একটি অন্যতম বৃহত্তম সংবাদ পত্রের সাথে চুক্তি করে প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করে বিজেপি ঐ সংবাদ পত্রের সমস্ত প্রকাশনায় সব সংস্করণে দিয়ে গেছে পূর্ণ পৃষ্ঠার ৪২ টি বিজ্ঞাপন।

এত টাকা এলো কোথা থেকে? সহজ উত্তর। সৌজন্যে কর্পোরেট পুঁজি। কেন ঢালবে না? একবার ভাবুন তো, এই মোদিই তো গুজরাটে টাটার ন্যানো কারখানার জন্য জমি দিয়েছে জলের দরে, ফলতঃ জমি থেকেই টাটারা লাভবান হয়েছে সরাসরি ২২হাজার কোটি টাকাযে টাটার ন্যানো কারখানাকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সংগ্রাম করে কৃষিজমি দখল করতে দেয়নি, অন্তত প্রাথমিকভাবে পিছু হঠিয়ে দিয়েছিল, মোদি তাকেই ডেকে নিয়ে গিয়ে জলের দরে জমি দিয়ে দিলেন নিজের ‘শিল্পবান্ধব’ ভাবমূর্তি নির্মাণের স্বার্থেকিন্তু সেদিনই এই শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তির পাশাপাশি জনবিরোধী ভাবমূর্তিটাও যে প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছিল, তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু টাটাই নয়, মুন্ত্রার সেজ প্রকল্পের জন্য আদানি গোষ্টিকে গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রীত্বে থাকালীন মোদি জমি দিয়েছেন বর্গ মিঃ পিছু ১টাকা দরে। এল এন্ড টি কেও ৮০ হেক্টর জমি দেওয়া হয়েছে বঃমিঃ পিছু ১ টাকা দরে। এসার স্টিল প্রজেক্টকে পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করেই শিল্পের জন্য বনভূমি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রচুর পরিমানে। লার্সেন এন্ড টুবরো, মারুতি কম্পানিকেও প্রভুত পরিমান জমি সে সময় মোদি সরকার তুলে দিয়েছিল, বলা যেতে পারে জলের দরেইফলতঃ মোদিই তখন কর্পোরেট পুঁজির কাছে উন্নয়নের ‘পোষ্টার বয়’তাঁরা হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করল মোদিকে প্রধানমন্ত্রির গদিতে বসানোর জন্য। বাঘা বাঘা সাংবাদিকরা ঝাঁপিয়ে পড়লেনমিডিয়ার অধিকাংশ সময়জুড়ে তখন ‘মোদি কথা’ প্রচারিত হলো! গুজরাট গণহত্যার নায়ক মোদি ভাই হয়ে উঠল আম্বানীদের চোখে ‘দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতা’। ‘মানুষদের প্রভু’‘নেতাদের নেতা’‘রাজাদের মধ্যে রাজাধিরাজ’টাটার চোখে গুজরাট তখন ‘শিল্পপতিদের সবচেয়ে ভরসার ঠিকানা’

বাজারি মিডিয়া প্রচার করল বিরাট অগ্রগতি হয়েছে মোদির গুজরাটে। ফলতঃ গুজরাটের উন্নয়ন নিয়ে গল্পের ফানুস আকাশে উড়ল। চাপা পড়ে গেল, গুজরাট গণহত্যার সময়কার নিহতদের পরিজনদের আর্ত চিৎকার। চাপা পড়ে গেল, নারীর পেট চিরে গর্ভের ভ্রূণ তলোয়ারের ডগায় খুঁচিয়ে তুলে আনার সেই নৃশংস দৃশ্য। চাপা পরে গেল, বেষ্ট বেকারির নিহতদের দলাপাকানো লাশগুলি। এমনকি এতো হইচইয়ের পরও চাপা পড়ে গেল ইশরাত জাহানের কথাও শুধু তাই নয় উন্নয়নের ঢক্কা নিনাদের ভারতের অধিকাংশ লোক জানলই না যে ‘উন্নত’ গুজরাটে নরেন্দ্র মোদির জমানায় ৯,৮২৯ জন শ্রমিক; ,৪৪৭জন কৃষক ও ৯১৮ জন ফার্ম মজুর দারিদ্রের জ্বালায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন!

বস্তুতঃ উন্নয়নের প্রকৃত চিত্রটি গুজরাটে ছিল বড়ই করুণ। দারিদ্র, ক্ষুধা, অপুষ্টি, বঞ্চনা আর হাহাকারের এক হার হিম করা চিত্র। কর্পোরেট মিডিয়ার প্রচারের সঙ্গে বাস্তবতঃ যার কোন মিলই নেই! যদি উন্নয়নকে আর্থিক প্রবৃদ্ধির নিরিখে বিচার করি তবে একটা কথা শুরুতেই মাথায় রাখতে হবে বন্দর শহর হওয়ার কারনে বানিজ্যিক বিকাশের দিক থেকে গুজরাটের শহরগুলি বরাবরই একটু ব্যবসা বানিজ্যে সমৃদ্ধ। বস্তুত নরেন্দ্র মোদির সময়ের চেয়ে পূর্বতন কংগ্রেস জমানায় এই বিকাশের হার বেশি তো ছিলই, এমনকি তা একটু আধটু বেশি নয় মোদি জমানার প্রবৃদ্ধির দ্বিগুণ ছিল! যদি ধরে নেওয়া হয় উৎপাদনের (GSDP) বিচারে, তাহলেও দেখব মোদির গুজরাটকে ফেলে এগিয়ে ছিল বিহার, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু! এমনকি মোদি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগেও গুজরাটের উৎপাদন ছিল পরবর্তী মোদি জমানার দ্বিগুন।

রাজন কমিটির সুপারিশকে যদি ধরি, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রয়ক্ষমতা, নারী এবং তপশিলি জাতি উপজাতিদের অবস্থা, উন্নয়নে সমাজের সকল অংশের প্রতিনিধিত্বের মতো দশটি মানদন্ডকে ধরা হয়েছিল। তার ভিত্তিতে রাজন কমিটি যে উন্নয়নভিত্তিক রাজ্যের তালিকা প্রস্তুত করল তাতে মোদির গুজরাটের স্থান হলো ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৭ তম। মানবোন্নয়ন সূচকের ভিত্তিতে ধরলে

গুজরাটের স্থান দেশের মধ্যে একাদশতম। রঘুনাথম কমিটি পশ্চাদপদতার নিরিখে দেশের রাজ্যগুলির যে তালিকা বানালো তাতে ২৮ টা রাজ্যেকে তিনভাগে ভাগ করা হলো। ৭ টি উন্নত রাজ্য। ১১টি কম উন্নত রাজ্য এবং আরো স্বল্পোন্নত ১০টি রাজ্য। মোদিজীর গুজরাট সেখানে স্থান পেল কম উন্নত রাজ্যের তালিকায়। সম্প্রতি বিশ্বায়নের অর্থনীতির পক্ষের উকিল পন্ডিতদের দব্‌দবার যুগে, বিনিয়োগের নিরিখে উন্নয়নকে পরিমাপের বিষয়টা বেশ চর্চ্চিত হচ্ছে। তার নিরিখেও মোদিকে ‘ফার্ষ্ট বয়’ বলা যাচ্ছে না। কেননা স্যোসিয়ো ইকনমিক রিভিউ২০১২এর তথ্য বলছে ২০১১ সালে গুজরাটে ২০ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছিল, কিন্তু বাস্তবে লগ্নি হয়েছিল ২৯ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা, অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে ০.২৫ শতাংশ। ৮৩০০ টি মউ স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়িত হয়েছিল ২৫০টি। ঘটনা হলো প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগেও গুজরাটের স্থান প্রথমে নয় পঞ্চমে। প্রথমে রয়েছে মহারাষ্ট্র।

তবে কয়েকটা ব্যাপারে মোদির গুজরাট ছিল দেশের মধ্যে প্রথমে। যেমন দারিদ্র বৃদ্ধির প্রশ্নে। ২০০১ সালে যেখানে দারিদ্র ছিল ৩২ শতাংশ মোদি জমানায় দশ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯.৫ শতাংশআদিবাসী উচ্ছেদের প্রশ্নে। অনেকেই হয়ত খবর রাখেন না, নরেন্দ্র মোদির গুজরাটে ৪৭.৯০ শতাংশ আদিবাসী স্থায়ীভাবে বাস্তুভিটেহীন হয়ে গেছে। দারিদ্রতা এতোটাই তীব্র ছিল যে গুজরাটের ৪৭% শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী, অনুর্দ্ধ ৫ বছরের ৫০% শিশু অপুষ্টির শিকার। ৭৫% শিশু রক্তাল্পতার শিকার। ৪৬% এর ওজন গড় ওজনের চেয়ে কম। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২৮.% পুরুষদের ও ৩২.% মহিলাদের ওজন গড় স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে কম। ইন্টারন্যাশানাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মোদির গুজরাটে ৮০ শতাংশ মহিলাই রক্তাল্পতা শিকার। শিক্ষা ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যেও গুজরাট দেশে প্রথম যেখানে গুজরাটে লিঙ্গ বৈষম্য ১৩.% সেখানে তা মহারাষ্ট্রে ০.০৬%, তামিলনাডুতে ১.২৪% শিক্ষার গুণগত মান এতোটাই খারাপ যে ইউনিসেফের প্রথম সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে যে গুজরাটে পাঠ্যবই পড়তে পারে, ঘড়ি দেখে সময় বলতে পারে, পয়সা গুণতে পারে এবং প্রাথমিক স্তরের যোগ বিয়োগ অংক কষতে পারে এমন ছাত্রের সংখ্যা বিহারের চেয়েও কম!

গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মোদি একদিকে যেমন কর্পোরেট মালিকদের দান খয়রাতিতে ছিলেন মুক্ত হস্ত, কৃষক এবং মেহনতি মানুষদের বেলায় ছিলেন ততটাই কৃপণ। কর্পোরেট মালিকরা সস্তায় জমি পেয়েছে। বিদ্যুৎ পেয়েছে। জল পেয়েছে। অথচ কৃষকরা ভরতুকি সবচেয়ে কম পেয়েছে মোদি শাসিত গুজরাটে। সারের উপর ভ্যাটের পরিমান ছিল মোদি শাসিত গুজরাটে ৫ শতাংশ, দেশের মধ্যে কোথাও এত সারের উপর ভ্যাট নেয়া হয় না। মোদি জমানায় গুজরাটে ৩.৯৮ লক্ষ কৃষক বিদ্যুৎ সংযোগ পায়নিপ্ল্যানিং কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গুজরাটে স্বাস্থ্যে ব্যয় ১৯৯০৯৫ সালে যেখানে ছিল ৪.২৫ শতাংশ মোদিজীর জমানায় (২০০৫২০১০ সালে) তা কমে হয়েছে ০.৭৭ শতাংশ। পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিনেও গুজরাটে ভ্যট দিতে হয় দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। পরিবহন সংক্রান্ত গ্যাস সিএনজি’র উপর ভ্যাটও দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল মোদির গুজরাটে।

লগ্নি বান্ধব ভাবমূর্তি বানাতে গিয়ে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুজরাটে মারাত্মক পরিমানে। নিরমা কোম্পানিকে মোদি সরকার দিয়ে দিয়েছে বিরাট পরিমান জলাভূমি, যার ফলে অন্তুত ৯ টি খরাপ্রবণ গ্রাম স্থায়ি সর্বনাশের দিকে এগোচ্ছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্য নষ্ট হয়েছে গুজরাটের ৩৫ শতাংশ। শুধু তাই নয় গুজরাটের শহরগুলি আজ জঘণ্য ধরণের পরিবেশ দূষনের শিকার।

এই যে এতো করুণ দশা, তা সত্ত্বেও কেন এত ঢক্কা নিনাদ? কারণ কর্পোরেট পুঁজির কাছে উন্নয়ন মানে হলো মুনাফা করার অবাধ স্বাধীনতা। লুট করার বৈধতা। ফলতঃ লাভবান তারা হয়েছে তো বটেই। তাঁরা কতটা স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছে হয়েছে তা বোঝা যায় আদানি গোষ্টির শ্রীবৃদ্ধি দেখলেই২০০২ সালে আদানিদের ব্যবসার পরিমান ছিল যেখানে ২৮১৬ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়াল ৩৫৮৮১ কোটি টাকা! মোদিজী দিল্লীতে সরকার গড়বে বুথ ফেরত এই এক্সিট পোল রিপোর্ট শুনেই আদানি গোষ্টির শেয়ার সূচক এত বেড়ে গেল যে গত ১৬ মে শেয়ার বাজারের দৌলতেই তারা ঘরে তুলল ৬০ কোটি ডলার, টাকার অঙ্কে ৩৫০০ কোটি টাকা। আর একই দিনে মুকেশ আম্বানি লাভ করে প্রায় ৫৮০০ কোটি টাকা এহেন মোদি সরকার ক্ষমতায় এলে দেশটা যে একটা গুজরাট মডেলেরই একটা বিস্তৃতরূপ হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত সেদিকেই দেশ এগোচ্ছে। ‘আচ্ছে দিন’ আসছে। ধীরে ধীরে। তবে তা কতজনের জন্য ‘আচ্ছে’ তা বুঝতে বেশি মাথা খাটাতে হবে না।

রেলভাড়া ভাড়া বেড়ে গেল ১৪.২ শতাংশ হারে। সঙ্গে বাড়ল পণ্য মাশুলও ৬.৫ শতাংশএর ফলে যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে তা তো স্বাভাবিকতাহলে কোথায় গেল মূল্যবৃদ্ধি রোখার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি? এ যে সরাসরি প্রতারণা! সারের দাম, খাদ্য সুরক্ষা, একশোদিনের কর্মসূচিতেও ভর্তুকি কমানোর কথা ঘোষনা করা হলো ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই। জ্বালানি তেলে ২২,০৫৪ কোটি টাকা ভর্তুকি কমানো হবে। ডিজেলের দাম প্রতি মাসে লিটারে ৫০ পয়সা করে এখন থেকে বাড়বে। লক্ষ্য ডিজেলে ভর্তুকি শুণ্যতে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে পেট্রোলের মতো ডিজেলের দামও নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা যায় আর দাম চলে যায় বেসরকারি মালিকদের নিয়ন্ত্রণে। গ্রাম উন্নয়নে গত বছর যেখানে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৫৬,৪০৮ কোটি টাকা, এবার বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৩,০৮২ কোটি টাকা। সামাজিক খাতে গতবার যেখানে বরাদ্দ ছিল ১,৯৩,০৪৩ কোটি টাকা সেখানে এবার বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৭৯,৪১১ কোটি টাকা। তফশিলি জাতি উপজাতিদের জন্য যোজনা বরাদ্দ কমানো হয়েছে যথাক্রমে ৪৭ হাজার কোটি টাকা এবং ১৪ হাজার কোটি টাকা। গতবছর সামাজিক কল্যাণ বাবদ বরাদ্দ হয়েছিল ৬,৮০,১২৩ কোটি টাকা এবার তা কমে হয়েছে ৪,৮৪,৫৩২ কোটি টাকা। এদিকে সাধারণ বাজেটে বীমা ও প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের ঊর্দ্ধসীমা ২৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করা হয়েছে। শিল্পে বিলগ্নীকরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৫৮,৪২৫ কোটি টাকা। বিলগ্নীকরণের খাড়া ঝুলছে বালকো, ওএনজিসি, সেল, কোল ইন্ডিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলির মাথার উপর। দেশীবিদেশী পুঁজিকে যখন ২২,২০০ কোটি টাকা প্রত্যক্ষ করে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, তখন জনগণের উপর চাপানো হয়েছে ৭,৫২৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত কর।

গণআন্দোলনের চাপে সংস্কারিত জমি অধিগ্রহণ আইনটিকে মোদি সরকার পুনরায় সংস্কার করতে চলেছে। শতকরা পঞ্চাশ শতাংশ জমিদাতার সম্মতিতেই এখন কোন প্রস্তাবিত জমি অধিগ্রহন করা যাবে, পূর্বতন কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কারিত আইনে যেখানে দরকার ছিল অন্তত আশি শতাংশের সম্মতি! এছাড়া ক্ষতিপূরণের পরিমানও কমানো হবে। মোদি সরকার এ বছরের বাজেটে অন্তত ৫.৩২ লক্ষটাকা ব্যক্তিগত আয়কর ছাড় বাবদ দান করেছে, এদিকে যখন দৈনিক ২০ টাকার কম রোজগার করেন অধিকাংশ মানুষ তখন তাঁর সরকার খাদ্য সুরক্ষা বিলটিকে ফাইল চাপা দিয়ে দিয়েছে। ১০০ দিনের কাজে জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে ব্যপক হারে।

ভারতে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ওপর নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার ব্যাপারে মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি চাপ সৃষ্টি করছিল অনেক দিনই ধরেই। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রি হিসেবে মার্কিন মুলুকে পা রাখার আগেই সে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি প্রশাসনের কাছে আর্জি জানিয়েছিল যে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলি যেন নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনায় তোলা হয়। প্রধানমন্ত্রী আমেরিকা সফরে যাওয়ার আগে নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। কেন্দ্রে ইউপিএ জমানায় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠান এনপিপিএর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল সরকার। তৎকালীন কেন্দ্রীয় রসায়ন মন্ত্রী শ্রীকান্ত জেনার দাবি, এমন কিছু ওষুধের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল যেগুলি ‘ন্যাশনাল লিস্ট অব এসেনশিয়াল মেডিসিন’ তথা অত্যাবশক ওষুধের তালিকাভুক্ত না হলেও জীবনদায়ী ওষুধ হিসেবে পরিচিত। এতে ক্যান্সার, মধুমেহ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত সমস্যার প্রতিকারে ব্যবহৃত ওষুধের দাম এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গিয়েছিল। উদাহরণ দিয়ে জেনা বলেন, “গ্লেভেক নামে ক্যানসারের যে ওষুধের দাম ছিল ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা। তা কমিয়ে সাড়ে ৮ হাজার টাকা করা হয়। বহু অ্যান্টিবায়োটিকের দামও কমিয়ে প্রায় অর্ধেক করা হয়।” কিন্তু গত২৬ শে ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় রসায়ন মন্ত্রকের নির্দেশে এনপিপিএ জানিয়ে দিয়েছে, তারা ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিচ্ছে। একমাত্র দেশে আপৎকালীন পরিস্থিতি বা মহামারীর মতো সমস্যা দেখা দিলে তবেই মূল্য নির্ধারণের উপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ হবে। যদিও সরকারের একটি শীর্ষ সূত্র বলছে, জুলাই মাসের ১০ তারিখ এনপিপিএ অ্যান্টিডায়াবেটিক এবং হৃদরোগ সংক্রান্ত আরও ১০৮টি ওষুধের ওপরেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। সেগুলি অত্যাবশক ওষুধের তালিকায় নেই। এনপিপিএর এই সিদ্ধান্তে কিছু বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা আপত্তি জানাচ্ছিল। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে এনপিপিএর জুলাই মাসের নির্দেশিকা তথা সেই মোতাবেক নিয়ন্ত্রণও খারিজ হয়ে গেল। বলা বাহুল্য ঔষধ প্রস্তুকারক বহুজাতিক সংস্থাগুলো যখন আরো বেশি বেশি করে এই নীতির কারণে মুনাফা করবে তখন ভারতে ৪.১ কোটি মধুমেহ রোগে আক্রান্ত, হৃদরোগীর সংখ্যা প্রায় ৪.৭ কোটি, ১১ লক্ষ মানুষ ক্যানসারে ও প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ এইডসে ভুগছেন। সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে এই রোগীরা ও তাঁদের পরিবার দুর্দশায় পড়বেন।

গত ৩১ শে জুলাই থেকে মোদি সরকার কারখানা আইন১৯৪৮, ট্রেড ইউনিয়ন আইন১৯২৬, শিল্প বিবাদ সম্পর্কিত আইন১৯৪৮, ঠিকা শ্রমিক আইন১৯৭১, এপ্রেন্টিস আইন ১৯৬১ থেকে শুরু করে সমস্ত আইনকে সংস্কার করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই আইন সংস্কারের মধ্যে দিয়ে কার্যত শ্রমিকদের যততটুকু আইনী অধিকার ছিল তাও কেড়ে নেওয়ার বন্দোবস্ত পাকা করা হলো। এর ফলে ওভার টাইম সময়সীমা ৫০ ঘন্টার পরিবর্তে ১০০ ঘন্টা করা হবে, যা বহু কারখানার শ্রমিকদের রক্তঘামকে একেবারে নিঙরে নেবে সন্দেহ নেই। এইসব সংস্কারের ফলে এখন ৩০০ জনের কম এমন কারখানাকে মালিকপক্ষ কোর্ট বা সরকারের অনুমতি ছাড়াই বন্ধ করে দিতে পারবে। আগে কোন কারখানায় যেখানে ১০ শতাংশ শ্রমিক মিলেই একটা ইউনিয়ন নথিভুক্ত করাতে পারত এখন সেখানে লাগবে কমপক্ষে তিরিশ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন। এগুলি সবই শ্রমিকের অধিকার হরণের দিকে আরো কয়েক কদম। মহিলাদের রাতের ডিউটির ক্ষেত্রেও আগে যে কিছু নিষেধাজ্ঞা ছিল তা শিথিল করা হয়েছে।

এই লেখা যখন লিখছি, তার কিছুদিন আগেই মোদি সরকার ১০০ দিনে পা দিয়েছেপ্রবণতাটা পরিস্কার। আমিরদের মুখের হাসি চওড়া হচ্ছে, আর গরিবদের জন্য শুধু কান্না, হাহাকার ।।

১০//২০১৪

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s