যেখানে শিক্ষার্থীর মাথায় দাসত্ব এবং গোলামীর শৃঙ্খল পরানোর আয়োজন, সেখানে শিক্ষার মান কিসে হয়?

Posted: অক্টোবর 18, 2014 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , ,

লিখেছেন: ফারুক আহমেদ

Education-38সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাশের হার ৪% থেকে সর্বোচ্চ ২১%। এই পাশের হার পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হারের সাথে তুলনীয় নয়। এখানে পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের জন্যই পাবলিক পরীক্ষায় একটি ন্যূনতম রেজাল্ট থাকতে হয়। সেদিক থেকে এ পরীক্ষায় যারা অংশ গ্রহন করে তাদের প্রায় সবাই পাবলিক পরীক্ষা থেকে সর্বোচ্চ রেজাল্ট জিপিএ৫ অর্জনকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। এ পরীক্ষার আয়োজনই করা হয় বহু সংখ্যক শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্প সংখ্যক আসনের জন্য শিক্ষার্থী নির্বাচন করার করে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে ‍‌‌‌বৈধ উপায়ে বাদ দেওয়ার জন্য। তার পরও এখানে পাশ নম্বর বলে একটি নম্বর নির্ধারণ করা হয়।

দেখা যাচ্ছে যে, পাবলিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে মাত্র ৪% থেকে সর্বোচ্চ ২১% এই পাশ নম্বর উঠাতে পারছে। উপেক্ষা করা যায় এমন ব্যতিক্রম ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পরীক্ষার প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের পড়ে আসা পাঠ্যসূচী অনুযায়ী হয়ে থাকে। তাই স্বাবাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে শিক্ষার মান নিয়ে। এখন শিক্ষার মানের প্রশ্ন নিয়ে চারদিকে তোলপাড় হচ্ছে। সুযোগ সন্ধানী স্বার্থপর অলস বুদ্ধিজীবী থেকে দায়িত্বহীন মতলববাজ শিক্ষক সবাই এখন কে কার উপর দিয়ে বলে ফায়দা নিতে পারে সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আ...স আরেফিন সিদ্দিক শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যখ্যান করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ্ব বলে দাবি করেছেন। এখন বরাবরের মতই বাংলাদেশে জনগণের মাথার ওপর পরগাছা রূপে বসে থাকা পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী, সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষক দুই দলে বিভক্ত হয়ে একই উদ্দেশ্য সাধনে পারষ্পরিক ঝগড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের সাধারণ লক্ষ্যটি হলো সরকারের শিক্ষা উন্নয়নের নামে শিক্ষাবিরোধী নীতিকে রক্ষা করা। সেখানে যাতে কোন রকমের আঁচড় না লাগে সে ব্যবস্থা করা। শিক্ষার আসল সমস্যাকে সচেতনভাবে আড়ালে রেখে উটকো সমস্যাকে সামনে এনে কারো কারো মতলববাজী সফল করা।

একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ দিন থেকেই বিশেষ করে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর থেকে সদা সর্বদাই সরকারের এবং ক্ষমতাসীন দলের গোলামীর আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নামে স্বায়ত্বশাসিত হলেও এসব বিশ্ববিদ্যালয় গুলোই সরকারের গণবিরোধী সমস্ত নীতির একনিষ্ঠ সমর্থক। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে অপ্রয়োজনীয় হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের পাশের নিম্ন হার ফলাও করে প্রচার করে তখন তা আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় যেন তা সরকারের বিরূদ্ধে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের শতভাগ অনুগত বিশ্ববিদ্যালয় কি এমন কিছু করতে পারে যা সরকারের বিরূদ্ধে যায়? এ প্রশ্নের সহজ এবং একমাত্র উত্তর হলো না।

যত শিক্ষার্থী এসব ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে তার মাত্রা ২% থেকে ৩% শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তির সুযোগ পায়। কাজেই পাশের নিম্ন হার প্রচারের কোন রকমের প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ে না। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় ফলাও করে পাশের নিম্নহার প্রচার করছে। সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের সেবাই যার কর্তব্য এবং ব্রত সে প্রতিষ্ঠান কি করে সরকারের বিরূদ্ধে যায় এমন কাজ করতে পারে? এর প্রধান কারণ হলো পরিষ্কার বুঝ।

নীতিহীন দলবাজ, স্বার্থপর এবং ভোগে বেহুঁশ পন্ডিতবুদ্ধিজীবী ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে বাংলাদেশের শিক্ষার হালচিত্র গোপন নেই। প্রাথমিক স্তর থেকে সকল পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়মিত হয়ে গেছে। লুন্ঠনজীবী শাসক শ্রেণির লুন্ঠন সর্বস্তরে বিস্তার লাভ করে শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ভর্তি বাণিজ্য কারো কাছে গোপন নেই। সন্ত্রাসনৈরাজ্য সৃষ্টি, জালিয়াতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস সহ বহু উপায়ে ভর্তি বাণিজ্য চলছে। পরীক্ষার খাতা শিথিল করে দেখার জন্য পরীক্ষকদের প্রতি বোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ, প্রভাবশালী বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরীক্ষা কেন্দ্র ক্রয়, পরীক্ষার খাতা বিলিবন্টনের কারসাজি, বিশেষ সাজেশন প্রদান সাধারণ মানুষের কাছে গোপন থাকছে না। কাজেই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল দেখিয়ে সরকার শিক্ষার মান বৃদ্ধির যে গল্প শুনিয়ে ঢেঁড়ি পেটাচ্ছেন তার দ্বারা মানুষ আশাবাদি হতে পারছেন না। কিন্তু সমাজের মধ্যে এর বিরূদ্ধে কোন সংগঠিত প্রতিবাদ নেই। ফলে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দুই ধরণের বাণিজ্যই হচ্ছে। যে কোন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময় থাকে রাজনৈতিক বাণিজ্য। এর পর এই ফলাফল যখন ভর্তি প্রক্রিয়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে তখন তা রূপান্তরিত হতে থাকে অর্থনৈতিক বাণিজ্যে। শিক্ষা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা এখন বাংলাশে বলা চলে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। প্রাইভেট স্কুলকলেজবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবসা এখন সবচেয়ে রমরমা ব্যবসা।

একথা ঠিক যে, পৃথিবীর কোন দেশেই এমন কি কোন সমাজ ব্যবস্থাতেই বিশেষ বিশেষ ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সে দেশের সকল শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা এবং শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একথাও ঠিক যে, সঠিক ভাবে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকলে সঠিক মূল্যায়নের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আসার সময় শিক্ষার্থীরাই নির্ধারণ করে নেয় সে কোথায় পরবর্তীতে শিক্ষা গ্রহন করবে এবং করতে পারবে। ফলে বিশেষ প্রতিষ্ঠানে সবাই একযোগে গিয়ে পড়ে না, এখন বাংলাদেশে যেমনটি হচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সরকারের রাজনীতি এবং শিক্ষা বাণিজ্যের পৃষ্ঠপোষকতার নীতি দ্বারা তাড়িত হয়ে সরকার শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নকে উচ্ছ্বেদ করেছে। একটা সময় ছিল সেটাও খুব বেশিদিন আগের কথা নয় যখন স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানেই পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র হতো এবং ঐসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণই পরীক্ষা কেন্দ্রে গার্ড দিতেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সেদিক দিয়ে বিশেষ কোন সুযোগের আশা করতে পরত না। কিন্তু এখন তা এক অকল্পনীয় ব্যাপার। এখন প্রতিষ্ঠানই ফলাফল ক্রয় করার নানা উদ্যোগ আয়োজন গ্রহন করে থাকে। ফলে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী শিক্ষালাভ করলো সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর প্রতি নেই। অপরদিকে সরকারের ফলাফল রাজনীতির কারণে গণহারে সর্বোচ্চ ফলাফল থেকে অপ্রত্যাশিত সব ফলাফলের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীর নিজেরও কোন মূল্যায়ন করার ক্ষমতা তৈরী হয় না। স্বাভাবিকভাবেই একই ফলাফল লাভকারী সবাই বিশেষ এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে পড়ার যোগ্য এবং সেটা তার অধিকার হিসেবেই সে দেখতে থাকে। এ‌ই অবস্থায় বিশেষ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারলে শিক্ষার্থীর মনে গাছে তুলে মই টান দেওয়ার মত ক্ষোব তৈরী হয়। কারণ মাত্র কিছুদিন আগেই তাকে নানাভাবে নানা আয়োজনে রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক কারণে সংবর্ধনা ইত্যাদি দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র প্রতিযোগিতায় পারল না ঐটুকুতে তার ক্ষোভ মিটিয়ে দেওয়া সহজ নয়। সামাজিক এবং পারিবারিক ভাবে সামালোচনার মধ্যদিয়ে একদিকে তার মুখ বন্ধ করার প্রয়োজন পড়ে অপরদিকে তার মধ্যে অন্য এক ধরণের ক্ষোভের সৃষ্টি করা যাতে সে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাড়িত হতে পারে। এই বুঝ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পাশের নিম্নহার ফলাও করে প্রচার করছে। এর মধ্যদিয়ে যেমন শিক্ষার্থীর ক্ষোভকে সামাজিকভাবে ভাষাহীন করে দেওয়া সম্ভব তেমনই তাকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দিকে তাড়িত করাও সম্ভব। শিক্ষার নিম্ন মানের কারণে মাথা ব্যাথায় বিশ্ববিদ্যালয় পাশের নিম্নহার ফলাও করে প্রচার করছে একথা ভাবার বিশেষ কোন কারণ নেই।

শিক্ষার নিম্ন মান বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাথা ব্যথার কারণ হলে তাঁরা অন্য পদক্ষেপ নিতেন। শিক্ষা এমন বিষয় যে, তার মান হঠাৎ যেমন আকাশ ছুঁয়ে যায় না তেমনই হঠাৎ করেই গহীনেও নেমে যায় না। শিক্ষার মান বাড়ারও একটা প্রক্রিয়া থাকে আবার নেমে যাওয়ারও একটা প্রক্রিয়া থাকে। বলা হয়ে থাকে শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। সেদিক দিয়ে শিক্ষকের দায় থাকে। এর মধ্যে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের দায় সবচেয়ে বেশি থাকার কথা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের দায় শুধু তাঁর সামনে বসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা চলে না। তিনি যদি শিক্ষিত হয়ে থাকেন এবং শিক্ষক হয়ে থাকেন তবে সামগ্রিকভাবে সমাজের শিক্ষার দায়ও তাঁর ওপর অবশ্যই বর্তায়। এই অর্থে যে, তিনি মতামত নির্ণয় করতে পারেন এবং ভালমন্দ বিচার করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তাঁর আঙ্গিনার বাইরে সমাজের মধ্যে শিক্ষার হালচালের কোন খবর রাখবেন না তা হয় না। বিশেষ করে কোন সরকার যখন শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে ঢাকঢোলঢেঁরি পেটাতে থাকেন এবং শিক্ষার আমূল পরিবর্তনের নামে নতুন নতুন পদক্ষেপ, পাঠ্যসূচীর আমূল পরিবর্তন করতে থাকেন তখন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের অবশ্যই দায় থাকে তার খোঁজখবরহদিশ করার।

শিক্ষার উন্নয়নের গল্পের আড়ালে সরকার শিক্ষা নিয়ে কি কি করছে শিক্ষার মান নিয়ে যারা সস্তা কথা বলছেন তাঁরা কি কখনোই তার কোন খোঁজ রাখেন? প্রথমেই আসা যাক প্রাথমিক স্তরে নতুন করে দুই দুটি পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন প্রসঙ্গে। দেশের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক সহ যাঁরা এখন শিক্ষার মান নিয়ে সস্তা কথা বলে বাজার গরম করছেন তাঁরা কি কখনোই বিশ্লেষণ করেছেন এই পরীক্ষা দুটি কেন? এর মাধ্যমে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে নাকি কমে যাবে? শিক্ষা ধ্বংসের জন্য একটি দেশ নানা মাত্রিক পরিকল্পনা গ্রহন করতে পারে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে শিক্ষা দানের বিষয় কোন দেশের বিচ্ছিন্ন বা একক কোন পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যাপার হতে পারে না। এ পদ্ধতি মানব সমাজ তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে অর্জন করেছে। সেদিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে প্রাথমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষার মত কোন পরীক্ষার আয়োজন অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাহলে বাংলাদেশ যখনই এই ব্যাতিক্রম হতে যাচ্ছে তখন এ দায় থেকে শিক্ষিতসুধী জনেরা কি মুক্ত হতে পারেন? যে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয় সে দেশ সভ্য দেশের মধ্যে পড়ে না। এই বাধ্যবাধকতা কার? সরকারের পক্ষ থেকে এমনভাবে বলা হয় যেন এই বাধ্যবাধকতা সেই শিশুর বা শিশুর পরিবারের! শিশু বা শিশুর পরিবারের দিক থেকে বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন এই জন্য ওঠে না যে, সকল শিশু এবং শিশুর পরিবারই শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে পেতে চায়। আবার অনেক শিশু আছে যাদের কোন পরিবারই নেই। কোন শিশুই স্কুলে যাওয়ার চেয়ে কঠোর কঠিন কাজ এবং সেখানে নানা নির্যাতন ভোগকে স্বেচ্ছ্বায় বেছে নেয় না। সে স্কুলে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় এবং নির্যাতন মূলক পরিস্থিতির মধ্যে যেতে বাধ্য হয়। সেই সব পরিবারের শিশুরাই প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় যেসব পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা দারিদ্র্য সীমার নীচে। তাই প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার অর্থ হলো রাষ্ট্রের সেই দায় যাতে কোন মানুষের জীবন দারিদ্র্য সীমার নীচে না থাকে। এই বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের।

অসংখ্য মানুষের জীবন দারিদ্র্য সীমার নীচে রেখে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ঘোষনা দিয়ে প্রচার করা হলো শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের প্রথম প্রতারণা। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক অর্থ হলো শিশুর জন্য একটি ন্যূনতম শিক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বাধ্য। এখানে শিক্ষাই নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষাহীন সার্টিফিকেট নয়। শিক্ষা নিশ্চিত করার অর্থ হলো একটি ন্যূনতম সময়কাল ধরে শিশুকে শিক্ষা প্রদান এবং তার সার্বক্ষনিক মূল্যায়ন। শিক্ষা প্রদান এবং সার্বক্ষনিক মূল্যায়ন ছাড়া শিশুর ন্যূনতম শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই মূল্যায়ন কোন পাশ ফেলের গন্ডির মধ্যে ফেলা যায় না। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যখন সেই দায়িত্ব পাশ কাটিয়ে যেতে চায় তখন তাকে পাশ ফেলের গন্ডির মধ্যে বাঁধতে চেষ্টা করে। রাষ্ট্রের দায় শিশুর ওপর চাপাতে চায়। কেবলমাত্র তখনই প্রথামিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন করা যেতে পারে। রাষ্ট্র যখন তা করে তখন সেটা হয় শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় প্রতারণা। প্রাথমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষার আয়োজনের মধ্যে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসাবাণিজ্যের যোগ আছে, সেটা ভিন্ন আলোচনা। এখানে সে আলোচনার সুযোগ নেই। এখানে শুধু রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের কথাটাই বলা হলো। প্রাথমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন কিভাবে শিক্ষার ন্যূনতম মানকেও উচ্ছ্বেদ করে সে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কিন্ত যাঁরা শিক্ষার মান নিয়ে সস্তা কথা বলে চলেছেন তাঁরা কখনোই সে আলোচনায় এগিয়ে আসেননি।

সৃজনশীল প্রশ্ন! অদ্ভুৎ এক নাম!! সরকারের লক্ষ্যউদ্দেশ্য সে যাই হোক শিক্ষা সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখেন না এমন একজন আকাঠ মূর্খ শিক্ষামন্ত্রী এই নিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দানের বহু বাগাড়ম্বর করেছেন। কৌতুহল উদ্দীপক বিষয় হলো পাঠদানের পদ্ধতি বা পাঠ দানের বিষয় নিয়ে নয়, শিক্ষককে প্রশিক্ষণ নিতে হবে প্রশ্ন প্রণয়নের ওপর! কেউ কি প্রশ্ন তুলেছেন পৃথিবীর কোথায় এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়? সৃজনশীল প্রশ্ন উচ্চারণের সাথে সাথে কোন বোধের উদয় হয়? মনে কি প্রশ্ন জাগে না যে, প্রশ্ন তাহলে অসৃজনশীলও আছে? একথা সত্য যে শাসক শ্রেণি শিক্ষা পদ্ধতিতে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে তার মধ্য দিয়ে তারা পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন করার যোগ্যতাও হারিয়েছে। একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আবর্তিত হওয়ার ফলে এবং শিক্ষা পদ্ধতি বলে কিছু না থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের বরাবরই নোট বই গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করে সেগুলো মুখস্ত করতে হয়। পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে পাঠ্যক্রম যাই থাকুক তা থেকে ন্যূনতম জ্ঞান লাভ থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়। এটাকেই অবলম্বন করে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নের যৌক্তিকতা দাবি করা হয়। এর মধ্যদিয়ে আসল সমস্যা ডালপালা বিস্তার করে এখন এমন আধিপত্যের জাগায় দাঁড়িয়েছে যে শিক্ষা পদ্ধতি যতটুকু ছিল এখন তাও সম্পূর্ণরূপে উচ্ছ্বেদ হয়ে গেল। সৃজনশীল প্রশ্নের এক ভুতুড়ে কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে শিক্ষকদের পাঠদানের দায় বলে আর কিছু রাখা হলো না। শেখাজানা বা শেখানো জানানো এখন আর কোন বিষয় নয়। তথাকথিত সৃজনশীল প্রশ্ন এবং শিক্ষার্থীর তথাকথিত সৃজনশীল উত্তরই সব। এই উত্তর দেখলে দেখা যাবে শিক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিচার বোধ উচ্ছ্বেদ করে সম্পূর্ণ নির্বোধ মানুষে পরিণত করেছে। প্রশ্নের ক্ষেত্রে সৃজনশীর শব্দটাই একটি নির্বোধ উচ্চারণ। একটি নির্বোধ উচ্চারণ বার বার করার মধ্যদিয়ে বোধবুদ্ধি বিলুপ্ত হওয়াটা স্বাভাবিক এবং এখন সেটাই হচ্ছে।

পাঠ্যক্রম পরিবর্তনপরিবর্ধন, সংযোজনবিয়োজন এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু উচ্ছেদ করা কোন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। পাঠ্যক্রম থেকে ইতিহাস উচ্ছেদ করা হয়েছে। ইতিহাসের নামে যা পাঠ করানো হয় তা কোন দলের প্রচার পত্র হওয়ারও অযোগ্য। পাঠ্যক্রম এবং পাঠ্য পুস্তকের আমূল পরিবর্তনের নামে যা করা হয়েছে যে কোন বিচার বোধ সম্পন্ন মানুষ এ দেখে বলার কথা এর মধ্যে প্রতারণা, শয়তানি, মতলববাজি, মূর্খতা, শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য সবই আছে নেই শুধুমাত্র শিক্ষা। এখন যাঁরা শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলছেন তাঁরা কি দেখেছেন পাঠ্যবইয়ের কি দশা করা হয়েছে। বানান ভুল এখন আর পাঠ্যবইয়ের কোন ভুলই নয়। ভুল পদ্ধতি, ভুল আলোচনা, আলোচনায় অসংলগ্নতা, বিচ্ছিন্নতা, পারষ্পরিক সম্পর্কবিবর্জিত এমনই শত প্রশ্ন তোলা যায় পাঠ্যবই এবং পাঠ্যক্রম থেকে।

এই সবের মধ্যদিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় আরো বেশি হারে পাশ করলেই কি মানসম্পন্ন শিক্ষার ছাড়পত্র পাওয়া যাবে? ভিতরের প্রশ্ন না তুলে পরীক্ষায় পাশের হারের সাথে মানের প্রশ্ন জুড়ে দেওয়া কি ভিতরকে আড়াল করা নয়? এই পাঠ্যক্রম এবং পদ্ধতির মধ্যথেকে শিক্ষা গ্রহন করে যারা বহুনির্বাচনী পরীক্ষায় টিক মার্ক দিয়ে পাশ করেছে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে তাদেরই বা মান কি? মানের হিসাব করতে গেলে পাঠ্যক্রম দেখতে হবে, পাঠের পদ্ধতি দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ, বুদ্ধিজীবীগণ কি এসব দেখবেন? দেখা তাঁদের দায়িত্ব। কিন্ত আমরা সাধারণ মানুষ এও জানি তা তাঁরা দেখতে পারেন না। কারণ যাঁরা এবং যে প্রতিষ্ঠান এখন শিক্ষার্থীদের হাত পায়ের দাসত্বের শৃঙ্খল রেখেই বা বাড়জোর খুলে মাথায় দাসত্বের শৃঙ্খল পরানোর কাজ করেন তার দ্বারা মান নির্ধারণ এবং শিক্ষার প্রকৃত মান কোন এক বিষয় হতে পারে না।।

১৭/১০/১৪

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s