নোম চমস্কি :: আমেরিকানরা খেলাধুলা সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজখবর রাখলেও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী সম্পর্কে বেশী খোঁজখবর রাখে না কেন?

Posted: সেপ্টেম্বর 30, 2014 in সাক্ষাৎকার
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , ,

Noam Chomsky In Conversation At British Library(এই অনুবাদকর্মটি নোম চমস্কির The Chomsky Reader বইটির অংশবিশেষ। এই অংশটি নেওয়া হয়েছে alternet.org-এ প্রকাশিত Noam Chomsky: Why Americans Know Much About Sports But So Little About World Affairs লেখাটি থেকে। এই অনুবাদকর্মটির কোনো কপিরাইট নাই। প্রয়োজনে যে কেউ এটাকে যেকোনো স্থানে ছাপাতে পারেন। অনুবাদক)

অনুবাদ: ইস্ক্রা এবং পার্থ প্রতীম দাশ

প্রশ্ন: আপনি লিখেছেন পেশাদার বুদ্ধিজীবি এবং আমলারা কেমন করে বাস্তবতাকে ধোঁয়াশাপূর্ণ করে ফেলে। এবং কোথাও কোথাও আপনি মানুষের কাণ্ডজ্ঞানকে “কার্তেসীয় কাণ্ডজ্ঞান” নামেও অভিহিত করেছেন। বিশেষত, সমসাময়িক সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তির অবস্থান নির্ণয় করতে গিয়ে মূলত, আপনি কাণ্ডজ্ঞানের উপরেই অধিক আলোকপাত করেছেন। কাণ্ডজ্ঞান বলতে আপনি কি বোঝাতে চান? আমাদের সমাজের প্রেক্ষিতে এর অর্থই বা কী? উদাহরণস্বরূপ, সাংঘাতিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং বিচ্ছিন্ন সমাজে থেকে মানুষের পক্ষে তার সত্যিকার আগ্রহ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কেউ যদি রাজনৈতিক কার্যকলাপে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণই না করতে পারে, নেহাত সাক্ষী গোপাল সেজেই থাকতে হয়, তাহলে তার পক্ষে কি অর্জন করা সম্ভব? এক্ষেত্রে কাণ্ডজ্ঞানই বা কিভাবে গড়ে উঠতে পারে?

চমস্কি: আচ্ছা, একটা উদাহরণ দেই। গাড়ি চালানোর সময় আমি কখনো সখনো রেডিও শুনি এবং প্রায়শই দেখতে পাই যে, সেখানে আলোচনার বিষয় হলো খেলাধুলা। এর বেশীরভাগই হলো ফোনালাপ। মানুষ ফোন করে এবং দীর্ঘসময় ধরে খটমটে আলোচনা করে। আর এটা যে একটা উচ্চমার্গের বিশ্লেষণী আলাপ তা স্পষ্টই বোঝা যায়। এ ব্যাপারে মানুষের অঢেল জ্ঞান। তারা জটিল খুঁটিনাটি অনেক বিষয় সম্পর্কে দখল রাখে আর গ্যালো দিনের খেলায় কোচের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো কিনা বা এইরকম অনেক বিষয় নিয়ে বহু গভীর আলোচনা চালায়। এরা কোনো পেশাদার বিশেষজ্ঞ নয়, নিতান্তই সাদামাটা লোক যারা তাদের মেধা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতাকে এক্ষেত্রে কাজে লাগাচ্ছেন এবং আমার মনে হয় সেইসাথে কিছু না কিছু অর্জনও করছেন। অপরিদকে ধরি, বহিঃবিশ্বের হালচাল অথবা নিজ দেশের সমস্যার কথা। এসব ব্যাপারে তাদের চিন্তাচেতনা অত্যন্ত অগভীর, যা কল্পনারও বাইরে।

আমার ব্যক্তিগত আগ্রহের জায়গা থেকেই হয়তো এই মতামতটি এসেছে, কিন্তু, আমার একে আসলে সঠিকই মনে হয়। খেলাধুলার মতো বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হলেও একটা নির্দিষ্ট মাত্রার বুঝ হয়। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ না করলে বাস্তব দুনিয়াকে দেওয়ার মতো কোনো সামর্থ দৃশ্যত কোনো মানুষের নাই। তারা বড়জোড় একটা কাল্পনিক জগতে বিচরণ করতে পারে, আসলে তারা তাই করছে। মানুষ তাদের কাণ্ডজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তাকে যে ব্যবহার করছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু এমন একটা জায়গায় ব্যবহার করছে যার কোনো অর্থ নাই এবং অর্থ নাই বলেই এর এতো বৃদ্ধি। জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান করার কোনো ক্ষমতা নাই বলেই তারা অর্থহীনতায় মগ্ন। কারণ, ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছে অন্যকোথাও।

এখন আমার মনে হয় এই একই ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা, বোঝাপড়ার সামর্থ, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং সমস্যা বুঝে কাজ করার ক্ষমতাগুলো এমন ধরণের শাসনব্যবস্থাসমূহের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেত বা যেতে পারে যেগুলো গুরুতর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং মানবজীবনে প্রভাব রাখে।

জটিল অনেক জায়গায়ও আছে। বিশেষায়িত জ্ঞানেরও প্রয়োজন আছে। আমি বুদ্ধিজীবিতা বিরোধী কোনোকিছু বলছি না। কিন্তু আমার কথা হলো অনেক ক্ষেত্রেই কোনো বিশেষায়িত জ্ঞান ছাড়াই বহুকিছু বুঝে ফেলা সম্ভব। এবং, এসব ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করাও সম্ভব যদি যথেষ্ট আগ্রহ থাকে।

তথাকথিত প্রাচীন সমাজেও এমনটা ছিল। সেখানেও দেখা যেত যে, ধোঁয়াশাপূর্ণভাবে একধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হত, যেখানে বিশেষজ্ঞরাই সবকিছু জানতো এবং অন্যরা খুব বেশীকিছু জানতে পারত না। যেমন: উত্তরাধিকারের নিয়মনীতি খুব জটিল করে ব্যাখ্যা করা হত। অনেক নৃবিজ্ঞানীরাই দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে এসবের একটি সামাজিক উপযোগিতা আছে। এর একটি অংশ হতে পারে বুদ্ধিবৃত্তিক। এটা অনেকটা গণিতের মত। গণিতে যেমন কোনোকিছুর বৈশিষ্ট্য বোঝানোর জন্য খটমটে জটিল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রেও ঠিক তেমন ঘটনাই ঘটে। ঐসময়ে গণিত বা প্রযুক্তির মতো এতো জটিল বিষয়াদি না থাকলেও অন্যধরণের জটিলতাপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিলো। আমি এই উপমাগুলোর উপরে আর বেশী জোর দিতে চাচ্ছি না কিন্তু সম্ভবত এধরণের ঘটনা এই সময়েও ঘটছে।

গ্যাস স্টেশনে কাজ করা একজন মানুষ আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করতে চাইবেন না, কারণ, সেটার কোনো মানে নাই। এতে অপ্রীতিকর অনেক বিষয় তার নজরে আসতে পারে, এমনকি সে ঝামেলায়ও পড়ে যেতে পারে। তারচেয়ে বরং, সে এমন বিষয় নিয়ে মেতে থাকতে চাইবে যা আনন্দদায়ক এবং নিরুপদ্রব, যেমন: ফুটবল বা বাস্কেটবল ইত্যাদি। কিন্তু, এক্ষেত্রেও দক্ষতা, বোঝাপড়া এবং মেধার ব্যবহার করতে হয়। খেলাধুলার মতো বিষয়গুলো সমাজে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেয়, যাতে ক্ষমতায় বসে থাকা মানুষেরা সেইসব কাজ নির্বিঘ্নে করে ফেলতে পারে।

.

প্রশ্ন: কিছুক্ষণ আগে আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বিশেষজ্ঞতার বাতাবরণে মানুষ বাধাপ্রাপ্ত হয় কিনা। এটাকে কি এভাবেও বলা যায় না যে বুদ্ধিজীবি ও বিশেষজ্ঞরা আসলে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন সাধারণ মানুষকে ভয় পায়, যারা খেলাধুলার মতো আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী, সামাজিক বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো নিয়েও চর্চা করতে পারে?

চমস্কি: এরকম সন্দেহ আমারও হয়। ওইসব অনুসন্ধানী ব্যাপারগুলো অতোটা গভীর বা দুর্বোধ্য নয় যে একজন আনাড়ী সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝতে অসুবিধা হবে। মূলধারার সাহিত্যে জনসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কিত লেখাগুলো খুবই অগভীর এবং পোশাকী। এগুলো নিয়ে যারা কথা বলে তাদের প্রত্যেকেই জানে প্রতিষ্ঠিত মতবাদগুলোর যত কাছাকাছি থাকা যায় ততোই মঙ্গল। আমি নিশ্চিত সকলেই এই সুবিধাকে কাজে লাগান। আমিও লাগাই। উদাহরণস্বরূপ, আমি যখন নাৎসিদের কুকর্ম অথবা সোভিয়েত বর্বরতার কথা বলি, আমি জানি আমাকে এই কথাগুলো তুলে নেওয়ার জন্য বলা হবে না। কিন্তু, যখনই আমি আমেরিকা, ইজরায়েলের মতো “নিষ্পাপ দেশগুলোর” কার্যকলাপ নিয়ে সমালোচনা করতে যাব তখনই পাণ্ডিত্যপূর্ণ মালমশলা প্রয়োগের প্রয়োজন পড়বে। কারণ, নাৎসিদের কুকর্ম বা সোভিয়েত বর্বরতা অথবা ১৯৬৭ সালে আমেরিকা বা ইজরায়েলের বিজয় এসবকে বুদ্ধিজীবিরাই প্রতিষ্ঠিত করেছে। এভাবে প্রামাণ্য তথ্য, এমনকি যৌক্তিক বিচারবুদ্ধির স্বাধীন ব্যবহার অত্যন্ত সুবিধাজনক। জনমত নিয়ে কাজ করা পত্রিকা বা পাণ্ডিত্যপূর্ণ সাহিত্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যে কোনো মানুষ এটা সহজেই বুঝতে পারে। এটা জীবনকে সহজ করে আর একগুচ্ছ আবোলতাবোল, নির্বোধ যুক্তিকেও দ্বীধাহীনভাবে প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। কখনো কখনো নির্ভেজাল কুৎসার মাধ্যমেও। আসলে প্রমাণাদিও অপ্রয়োজনীয়, যুক্তিও অর্থহীন। আমেরিকান ভিন্নমতাবলম্বী, এমনকি উদারপন্থীদের কথা বলতে গেলেই তাদের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ হলো, তারা দাবী করে আমেরিকা হলো সব শয়তানদের নাটের গুরু। ব্যাপারটা হলো গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসালেই এইরকম অভিযোগ পুরোপুরি বৈধতা পায়। আর এই অভিযোগগুলো তোলার জন্য কোনো ছলচাতুরীর প্রয়োজনও হয় না। সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপরীতে দাঁড়ালেই তা ন্যাক্কারজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু পার্টির নিয়ম মোতাবেক চললে সেটাই আবার নিয়মসিদ্ধও হয়ে যায়। খুব বেশি জনসচেতনতা সততার মানদণ্ড নির্ধারণের দাবী তুলতে পারে, ফলে, স্বাভাবিকভাবেই বহু বন উজাড় হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারে এবং বহু ভাবমূর্তি টলিয়েও যেতে পারে। ক্ষমতার চামচামির সময় মিথ্যা বলার অধিকারকে পর্যাপ্ত বল ও নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষা করা হয়। যখন কেউ রাষ্ট্রীয় শত্রুর পক্ষেও ওকালতি করার হিম্মত দেখায় তখন এই ব্যাপারটা এক্কেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হলো এরা রাষ্ট্রীয় শত্রুদের পক্ষে ওকালতি করছে। কম্বোডিয়ার ঘটনাটি এর যুতসই উদাহরণ। অল্পকিছু মাওবাদী (Maoist) ছাড়া খেমার রোচের (Khmer Rouge) বর্বরতা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ ছিলো না। এটাও সত্য ও প্রামাণ্য যে, পশ্চিমা প্রোপাগান্ডাও একে সোৎসাহে গ্রহণ করেছিল। এইসব বর্বরতাকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের নৃশংসতাকেও হালাল করেছিল। এবং, যতদিন সৎচিন্তার স্ফুরণ ঘটার সুযোগ হয়নি ততদিন তারা যেভাবে কপট মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছিলো সেটাও দেখার মতো। সত্য ঘটনা প্রকাশ করার ফলে এগুলো ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পড়ে। এইসমস্ত প্রতিবাদ এবং আরও কিছু মিথ্যাচারকে আমি এবং এডওয়ার্ড হারমান (Edward Herman) লিপিবদ্ধ করি।

মোদ্দাকথাটা হলো, রাষ্ট্রকার্যের স্বার্থে মিথ্যাচারের অধিকারকে এখানে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিলো। কিন্তু, এধরণের কাজ করা গুরুতর অপরাধ। একইভাবে, কেউ যদি কিউবা, নিকারাগুয়া, ভিয়েতনাম বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় শত্রুদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে মিথ্যা বা সন্দেহজনক বলে মনে করে তাহলে তার গায়েও একই ধরণের দেশদ্রোহীতার তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। যৌক্তিক বিবেচনাবোধ যেন রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়ে ক্ষমতার প্রতি বিশ্বস্ততায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য এটি একটি মোক্ষম দাওয়াই। গণমাধ্যমে সমালোচকের প্রবেশাধিকার সামান্যই। এবং, এসব সমালোচনার ব্যক্তিগত পরিণাম এতোটাই বিব্রতকর যে কেউ এ পথ মাড়াতেই চায় না। বিশেষত, দ্য নিউ রিপাবলিকের মতো কিছু পত্রিকা সমালোচকদের প্রতিদিন নিগৃহীত করতে করতে আর তাদের প্রকাশিত কুৎসার প্রতিবাদ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে করতে অসততা এবং ভণ্ডামীর চূড়ান্ত পর্যায়ে নেমে গেছে। তাই মিথ্যা বলার পবিত্র অধিকার কোনো রকমের বিপত্তি ছাড়াই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু, যদি অবিশ্বস্ত সূত্রগুলোকেও আলোচনা ও বিতর্কের ঘরে স্থান দেওয়া হতো তবে কিছুটা ভিন্ন চিত্র হয়তো দেখা যেত।

তথাকথিত এইসব চর্চার বাতাবরণেই একটা দীক্ষায়ন ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটে যা নির্বিকার নিষ্ঠায় ক্ষমতাবানদের পক্ষে কাজ করে যায়। একই সাথে সততা আর বস্তুনিষ্ঠটার ভাবমূর্তিও ধরে রাখে। উদাহরণস্বরূপ, মিডিয়ার কথা বলা যেতে পারে। ক্ষমতাবান উপরওয়ালাদের যেমনটা চাই, তেমন আঙ্গিকে কোন কিছু হাজির করার জন্য প্রয়োজনে মিডিয়া কখনো কখনো বিশেষজ্ঞ শিক্ষাবিদও হয়ে উঠতে পারে। আর, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো উপরওয়ালাদের প্রতি যথেষ্ট বাধ্যই থাকে। যোগ্য ওস্তাদদেরও হাতের কাছেই পাওয়া যায়, যারা পাণ্ডিত্যের মর্যাদা দেখিয়ে কোন সংকীর্ণ মতামতকে বিশদভাবে হাজির করে।

আর যখন এই পদ্ধতি কাজ করে না, যেমনটা ল্যাটিন আমেরিকার ক্ষেত্রে হচ্ছে, অথবা, বর্তমানে সন্ত্রাসের যে নয়া সংজ্ঞা সৃষ্টি হচ্ছে তখন নতুন একজাতের “ওস্তাদদের” আমদানি করা হয়। নির্বিকার কপটতা এড়িয়ে মিডিয়া যেসব মতবাদকে সরাসরি হালাল করতে পারে না, তখন এই ওস্তাদরা সেইসব মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। আমি এবং আমার মতো অনেকেই এরকম বহু উদাহরণ দেখিয়েছে।

জনসংশ্লিষ্ট যূথবদ্ধ পেশাগুলোও দীক্ষায়ন ব্যবস্থার বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে। আসলে, এইসব মতাদর্শকে বহুভাবে সুরক্ষিত রাখা হয়। আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে। যেমনটা আগেও বলেছি, আমার কোনো বিষয়েই কোনো প্রকৃত পেশাদার যোগ্যতা নাই, তবুও আমার কাজগুলো যথেষ্ট প্রসার পেয়েছে। যেমন, কিছুকাল আগে আমি ম্যাথমেটিক্যাল লিংগুইস্টিকস এবং অটোমাটা থিওরি (mathematical linguistics and automata theory) নিয়ে কাজ করেছিলাম। সেই সুবাদে মাঝে মাঝে গণিত ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক সেমিনারে লেকচারও দিয়েছি। কেউ এসব বিষয়ে আমার কথা বলার যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করার কথা ঘুনাক্ষরেও চিন্তা করেনি। আসলে, তারা জানতো এ ব্যাপারে আমার জ্ঞান আসলে হাস্যকরকম শুন্য। আমি কি নিয়ে কথা বলছি সেটাই অংশগ্রহণকারীদের প্রধান বিবেচ্য ছিল। সেই বিষয়ে কথা বলার অধিকার আমার আছে কিনা সেটা নিয়ে তারা চিন্তিত ছিল না। কিন্তু, আমি যখন আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে কথা বলি, তখন অন্য কোথাও না হলেও অন্তত যুক্তরাষ্ট্রে, আমাকে বারবার চ্যালেঞ্জ করা হয়, এসব ব্যাপারে কথা বলার যোগ্যতার সার্টিফিকেট দেখাতে। মোটাদাগে আমার মনে হয়, যুথবদ্ধতার কারণেই যে মতাদর্শের যতবেশী বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ থাকে সেই মতাদর্শকে ততই কম পরীক্ষানিরীক্ষা মোকাবেলা করতে হয়। আপনার প্রশ্নের আলোকে এই পরিণামগুলো বেশ অবশ্যম্ভাবী।

.

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন বেশীরভাগ বুদ্ধিজীবিই বাস্তবতা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন। তাঁরা কি এটা জেনেবুঝেই করেন? সত্যিকারের বাস্তবতা সম্পর্কে কি তাদের ধারণা থাকে? তাঁরা কি জেনেবুঝেই সামাজিক গতিকে ঘিরে রহস্য সৃষ্টি করেন?

চমস্কি: বেশীরভাগ মানুষই মিথ্যুক নয়। জ্ঞান নিয়ে পাপাচারকে তারা বেশীক্ষণ সহ্য করতে পারে না। অস্বীকার করার উপায় নাই যে ডাহা মিথ্যাবাদী লোকজনও আছে। তারা নির্লজ্জ প্রোপাগান্ডা প্রচারক। সাংবাদিক, এমনকি শিক্ষকতা পেশার মধ্যেও আপনি এমনটা পাবেন। কিন্তু এমনটাই চল এটা আমি মনে করি না। চলটা হোলো আনুগত্য, সমালোচনা না করার প্রবণতা ও আত্মপ্রবঞ্চনার সহজ রাস্তা বেছে নেওয়া। শিক্ষকতা বা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এরকমই কিছু নির্দিষ্ট চল আছে। অর্থ্যাৎ, মোটাদাগে, যারা মুক্তমনের অধিকারী, উপরওয়ালারা যাদের অনুগত বলে বিশ্বাস করতে পারে না তারা বেশিদিন টিকতে পারেন না। তাদেরকে প্রায়শই ছেঁকে বের করে দেওয়া হয়।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s