২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪

hok-kolorob-653423প্রথমেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত সকল আন্দোলনকারী সহযোদ্ধাদের জানাই লাল সালাম!

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে আমরা একই সাথে উজ্জীবিত এবং মর্মাহত। পুলিশি ও সন্ত্রাসী হামলায় আহতদের কষ্টে আমরা মর্মাহত। আবার স্বৈরতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদী, নিপীড়ক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনে আমরা উজ্জীবিত।

২৮ আগস্ট, ক্যাম্পাসের ভেতরেই একজন ছাত্রী সন্ত্রাসীদের দ্বারা যৌন নিগ্রহের শিকার হন। অভিযোগ করা হলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা সালিশী ঢঙে মিটমাট করার উদ্যোগ নেয়। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রশাসনের তদন্ত কমিটি হতে তখন নির্যাতিত ছাত্রীর “চরিত্র” নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীরা এর তীব্র নিন্দা জানায়।

আন্দোলন ফুঁসে ওঠছে লক্ষ্য করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অভিজিৎ চক্রবর্তী, তা দমনে সচেষ্ট হন। আন্দোলনকারীদের দাবী না মেনে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ উল্টো একটি আচরণবিধি প্রকাশ করে এবং ক্যাম্পাসের ভেতরে নজরদারীর জন্য একটি নতুন দল গঠনের ঘোষণা দেয়। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গোয়েন্দা বাহিনী ও সাদা পোশাকের পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন পদক্ষেপে ছাত্রছাত্রীদের আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিষদের মিটিংয়ে ঘেরাও করে। রাজ্য সরকার বা তৃণমূলের পকেটস্থ উপাচার্য এবং শিক্ষকেরা নির্বাহী পরিষদের কিছু সদস্যের বিরোধিতা সত্ত্বেও আন্দোলন দমনে পুলিশি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪, উপাচার্যের নির্দেশে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচীকে ছত্রভঙ্গ করতে, কিছু সাদা পোশাকের পুলিশ ও নিয়মিত পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের লাঠিপেটা করে। এতে ত্রিশ জনের অধিক ছাত্রছাত্রী আহত হয়। বেশ কয়েকজন জন আন্দোলনকারীকে এসময় গ্রেফতার করা হয়। তবে এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। তা এই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা মাত্র। ২০০৫ সালে ক্ষমতাসীন ছিল সিপিএম। সেই বুদ্ধদেবের আমলে অনশন ধর্মঘটে চালানো হয়েছিল পুলিশি হামলা। এখন ক্ষমতা হারিয়ে সিপিএম তৃণমূলের সমালোচনা করলেও আদতে শাসকশ্রেণীর এই দুই অংশের মাঝে কোন পার্থক্য যে নাই, তা বলাই বাহুল্য।

যাই হোক, ১৭ স্বপ্টেম্বর হামলার পর শিক্ষার্থীরা দমে যাননি। বরং দেশে বিদেশে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তারা সমর্থন পেয়েছেন। পুলিশ কমিশনার সুরজিৎ করের “বহিরাগত তত্ত্ব” শতভাগ সফল! হ্যাঁ, এতে বহিরাগতরা অংশ নিয়েছে, নিচ্ছে ও নিবে। কারণ, এটি কেবলমাত্র কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এই সমাজে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক চেতনার বিরুদ্ধে, শাসকশ্রেণীর ফ্যাসিস্ট চেতনার বিরুদ্ধে, এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তাতে গণতন্ত্রমনা জনগণের যেকোন অংশই সামিল হতে পারে খুব স্বাভাবিকভাবেই। আর এটিই আমরা লক্ষ্য করেছি মহামিছিলে।

একটি সমাজের প্রগতি প্রধানত নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। অর্থাৎ সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে তার শিক্ষাব্যবস্থা উৎপ্রোতভাবে জড়িত। তা সমাজের মরুদণ্ড স্বরূপ। উৎপাদন ব্যবস্থা যদি গণমুখী হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থাও হবে গণমুখী। অপরদিকে, যদি এই উৎপাদনব্যবস্থা গণমুখী না হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থাও হবে তার অনুরূপ। কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ পীড়িত বাঙলাদেশভারতের মতো দেশসমূহে উৎপাদনব্যবস্থা নয়াঔপনিবেশিক হওয়ায়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাও ক্রমেই কর্পোরেট পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতি স্বীকার করেছে ও করছে। যার মূল উদ্দেশ্য কেবলই মুনাফা অর্জন, বা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ। এই ব্যবস্থা ক্রমেই মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে, যা শাসকশ্রেণী এবং কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। এর সঙ্গে মিশেছে কর্পোরেট সংস্কৃতি, ইতিহাস বিকৃতি আর সযতনে লালিত পুরুষতন্ত্র।

এমন শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় পাশ করতেই শেখাচ্ছে, নৈতিক গুণাবলী বৃদ্ধিতে যা তেমন কোনো ভূমিকাই রাখছে না। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে দিনদিন আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যাদের মামাটিমানুষ নিয়ে ভাবনার চেতনাটুকুও অবশিষ্ট নাই। ভোগবাদীতায় আচ্ছন্ন হয়ে তারা নারীদের যৌনবস্তু, ভোগ্যপণ্য বলে মনে করতেই শিখছে। ফলে এক ভোগবাদী চেতনার ধারক প্রজন্ম গড়ে ওঠছে প্রতিনিয়ত।

সাম্প্রতিক সময়ে বাঙলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের দ্বারা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সামান্য প্রতিবাদেই যেন তার সমাপ্তি। প্রকৃতার্থে যাদবপুরের আন্দোলন দিশা দেখাতে পারে এমন হাজারো প্রতিবাদকে আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে।

এক সময় ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষকদের একটা বড় অংশ যুক্ত হতে দেখা যেত। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর থেকে কথিত বিশ্বায়নের নামে কর্পোরেটদের অবাধ আগমণ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে এখন শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও অনেকাংশেই নির্ভর করে, সেই শিক্ষক কোন চিন্তাধারার ধারক, তার ওপর। সেই সাথে এই শিক্ষকরাও কিন্তু এই নয়াউপনিবেশবাদী ব্যবস্থাতেই বেড়ে ওঠেছেন, অনেকে প্রগতিশীলতা ঝেরে ফেলে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছেন। আর তাদের চিন্তাকাঠামোটিও কিন্তু সেভাবেই গড়ে ওঠেছে। যে কারণে এখানকার সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনগুলোতে নগণ্য সংখ্যক শিক্ষককেই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে। যাদবপুরের আন্দোলন এ ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাতে সমর্থন রয়েছে অনেক শিক্ষকদের, গায়ক, অভিনেতা, সংবাদকর্মী, পেশাজীবী এবং নিপীড়িত জনগণের।

hok-kolorob-76425সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনগুলো মূলতঃ বেতন, ফি বাড়ানো বা নাইটকোর্সের প্রতিবাদেই গড়ে ওঠে। সেখানে শিক্ষার্থীদের পড়ার বিষয়বস্তু, কারিক্যুলাম যা এনজিও আর কর্পোরেটদের স্বার্থে নির্ধারিত, এর বিরুদ্ধে তেমন কোন প্রতিরোধই গড়ে তোলা যায়নি। বিশ্বভারতী থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, অথবা কলকাতা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সবখানেই রয়েছে যৌন নিপীড়ন। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়েছে, কিন্তু তাতে গড়ে তোলা যায়নি আন্দোলন। এ ক্ষেত্রেও যাদবপুরের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ভাববার অবকাশ নাই। ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে থাকা পুরুষতন্ত্রকেই তা নির্দেশ করে মাত্র।

এমতাবস্থায় গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের দাবীটাই হওয়া উচিৎ মূল দাবী। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মাণের মাধ্যমেই কেবল স্বৈরতন্ত্র পুরুষতন্ত্র ধ্বংসের দিকে ধাবিত হওয়া সম্ভব। আর এ কারণেই গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবীটি বিপ্লবী রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত। এক্ষেত্রে আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় অংশ এই বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর তাই আন্দোলনগুলোও দীর্ঘসময় টিকে থাকেনি। অর্জিত হয়নি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।

বাঙলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা দরকার। রাজনৈতিক ব্যানার ব্যবহার না করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে ব্যানার ব্যবহার করাটা ছিল এখানকার বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর আরেকটি বড় ব্যর্থতা। অনেকেই সাফাই দিচ্ছেন যে, রাজনৈতিক সংগঠনের নামে ব্যানার ব্যবহার করা হলে শিক্ষার্থীরা আসবেন না, কিন্তু তা কখনোই সঠিক চিন্তা নয়। পৃথিবীর সবকিছুতেই যেখানে রয়েছে রাজনৈতিকতা, সেখানে এই আন্দোলন অরাজনৈতিক থাকে কিভাবে। আর তাকে অরাজনৈতিক বলার মানে হলো বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিকে সমর্থন করা। আর আন্দোলনের এই ব্যর্থতায়, এই আন্দোলন অর্থনীতিবাদী আন্দোলনে আবদ্ধ হয়েই থেকেছে। যে কারণে এই আন্দোলনগুলো একটা ধাপ পেরিয়েই থমকে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ছাত্র রাজনীতি যদি শ্রমিককৃষকমেহনতি জনগণের আন্দোলন সংগ্রামের সাথে যুক্ত হতে পারে, তবেই তা বিপ্লবী রাজনীতির পক্ষে পরিচালিত হওয়া সম্ভব। অপরদিকে, যখন তা কেবল শিক্ষার্থীদের বেতনভাতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনেই আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন সে আন্দোলন যে অল্প সময়েই নেতিয়ে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে শুধু শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নয়, বেতনফি কমানোর আন্দোলন নয়, কেবল পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়; বরং শাসকশ্রেণীর প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত, এক গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে পারলেই কর্পোরেট, এনজিওবাদীদের অপশক্তিকে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।।

.

সংগ্রামী শুভেচ্ছাসহ,

শাহেরীন আরাফাত

(মঙ্গলধ্বনির পক্ষে)

———————-

# হোক কলরব

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s