hok-kolorob-321

মাননীয় সম্পাদক

এই সময়

.

গত ১৯ এবং ২০ তারিখ যথাক্রমে ‘এই সময়’ ও Times of India পত্রিকায় দেখলাম যে আমার এবং আরো কয়েকজন বন্ধুর ছবি যাদবপুর কান্ডে ‘সশস্ত্র বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ‘চক্রান্তকারী মাওবাদী’ হিসেবে প্রত্যাশা মতোই সন্দেহ করা হয়েছে, যা যেকোনো গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে করা হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট করে বলা না হলেও বলা হয়েছে যে, আমাদের মধ্যে নাকি অনেকে প্রেসিডেন্সি কলেজে বেকার ল্যাব ভাঙচুরে অভিযুক্ত।

টাইমস গ্রুপ সুপ্রতিষ্ঠিত সংবাদ প্রতিষ্ঠান, সুতরাং এইটুকু আশা করাই যায় যে, সাংবাদিক বন্ধু পুলিশ কমিশনারের (সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ) কথায় না নেচে যদি কষ্ট করে একটু তথ্যানুসন্ধান করতেন, তাহলে জানতে পারতেন যে, বেকার ল্যাব আক্রমন এর অনেক আগেই প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার পড়া শেষ হয়ে যায় এবং ওই সময় আমি উপস্থিতও ছিলাম না, এবং বাকিদেরও কারোর বিরুদ্ধে বেকার ল্যাব ভাঙচুরের অভিযোগ নেই, বরং ওইদিন তারা বহিরাগত গুন্ডাদের হামলায় আক্রান্ত হয়েছিল, আহত হয়েছিল, আক্রমন করেছিল তৃণমূলের গুন্ডারা। পুলিশ কমিশনার সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বহিরাগত তত্ত্ব হাজির করলেন এবং আমাদের কয়েকজনের ছবি গোল মার্ক করে সংবাদমাধ্যমগুলোতে পাঠালেন। তারপর থেকে সংবাদ মাধ্যম এবং “অতি তৃনমূলি” অংশ ওই ছবিগুলো নিয়ে প্রচারে নামে। যেন কি না কি পাওয়া গেছে! এই ছবিগুলোতে আমাদের মূল চক্রান্তকারী সশস্ত্র বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। যদিও আমি সহ দুই বন্ধু যারা যাদবপুরে পড়িনা, গ্রেপ্তার হয়েছিলাম, লালবাজারেও ছিলাম, কিন্তু পুলিশ আমাদের কাছে থেকে একে৪৭ বা নেইল কাটার কোনোকিছুই উদ্ধার করতে পারেননি। এটা স্পষ্ট যে, সিপি (পুলিশ কমিশনার) শুধুই সিপি নয়, তিনি টিএমসিপি (তৃণমূল ছাত্র পরিষদ)-ও বটে। কমিশনারকে তৃণমূল ভবনের দারোয়ানও বলা যেতে পারে। গোটা রাজ্যের মানুষ জানেন তৃণমূল কংগ্রেসের কিছু ভুঁইফোর, ভাগ্যাণ্বেষী ছাত্রনেতা (নেতা হওয়ার আগে যাদের সাথে ছাত্র আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক ছিল না) কিভাবে বিভিন্ন কলেজ, ইউনিভার্সিটি ঘুরে ঘুরে ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপকঅধ্যাপিকাদের পিটিয়ে সন্ত্রাস ছড়িয়ে বেড়ান, সেখানে স্থানীয় তৃণমূল নেতা ও গুন্ডা উপস্থিত থাকেন। কমিশনার কি কোনবার ওইসব শাসক দলের নেতাদের বহিরাগত দুষ্কৃতী বলে গোল মার্ক করা ছবি সংবাদ মাধ্যমগুলোতে পাঠিয়েছেন? বা অন্তত একবার সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন?

এমন কি যাদবপুরের ঘটনায় ওইরাতে শাসক দল ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে যে বহিরাগত গুন্ডাবাহিনী মজুত করেছিল তাদের চিহ্নিত করেছেন? উত্তর হলো – ‘না’। কিন্তু কেন করেননি? কারণ, সরকার ভালোভাবেই জানে তা – ‘বহিরাগত’টা কোনো বিষয়ই নয়। হ্যাঁ, আমরা ছিলাম ন্যায় ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনের সমর্থনে। বহিরাগত গুন্ডা ও পুলিশের দ্বারা বন্ধু/কমরেডরা আক্রান্ত হতে পারে, এই আশঙ্কায় আমরা কয়েকজন ‘বহিরাগত’ রাত্রিবেলা রয়ে যাই। কযেকজন বাইরের ছাত্র থাকাটা কি পুলিশ ও গুন্ডাদের ওই বর্বর আক্রমনকে ন্যায্যতা দিতে পারে? পুলিশ কমিশনার ‘বহিরাগত তত্ত্ব’ এনে নিজের, উপাচার্য ও সরকারের পিঠ বাঁচাবার বৃথা চেষ্টা করছেন নাকি?

বহিরাগত তত্ত্বের জবাব আশা করি, গত কয়েক দিনের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী জমায়েত দিতে পেরেছে। বিশেষত ৬০এর দশকের পরে এই প্রথম ২০ তারিখের এতো বড় স্বতস্ফূর্ত জমায়েত। দাবি পূরণ হোক বা না হোক একটা আন্দোলন যা দেয় তা হলো চেতনা। শত্রু, মিত্র চিনতে শেখায়। যাদবপুর সহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসরকারপুলিশের অনর্গল মিথ্যাচার এটা শেখাচ্ছে যে, সমাজ ব্যবস্থা এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্বের কোনো বৈধতা নেই, কর্তৃত্ব লাঠি, গুলি ও মিথ্যে কথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ব্যক্তি নেতাকেন্দ্রিক চামচা নির্ভর মধ্যযুগীয় রাজনীতি যারা করেন, তারা কালেকটিভ লিডারশিপ, ছাত্রছাত্রীদের কালেকটিভ কনশাসনেস ব্যাপারটা সম্ভবত বোঝেন না। তাই তারা ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে চেতনাকে গুরুত্ব না দিয়ে চক্রান্তের গন্ধ খুঁজছেন, এটা মানতে পারছেন না যে জনগণই ইতিহাস তৈরি করে।

যাদবপুরের নির্যাতিতা মেয়েটিকে উপাচার্য ১৫ দিন পর ক্যাম্পাসে আসতে বলেন ও ব্যাপারটা মিটমাট করে নিতে বলেন, এরপর ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই কমিটি ছাত্রীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এবং উপাচার্য শ্লীলতাহানির ঘটনাকে কর্তৃপক্ষের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করে ক্যাম্পাসের আপাত মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশের উপর আঘাত হানতে সিসিটিভি, পরিচয়পত্র, হোস্টেলে বন্ধুদের আনা যাবে না, ১০ টার মধ্যে হোস্টেলে ঢুকতে হবে, ইত্যাদি নিয়ম চালু করতে উদ্যোগী হন। যাতে ছাত্রছাত্রীদের উপর নজরদারি রাখা যায়। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকে দমন করা যায়, বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর মতো কর্তৃপক্ষের স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ও শিক্ষার বেসরকারিকরণ, ফি বৃদ্ধি ইত্যাদি ছাত্রছাত্রী স্বার্থ বিরোধী নীতির পথ প্রশস্ত হয়। যেমনভাবে ক্যাম্পাসের বাইরেও কেন্দ্র অথবা রাজ্য সরকার সমস্যাকে মূল থেকে সমাধান করার উদ্যোগ না নিয়ে, দোষীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিয়ে কিছু ব্যক্তি বা সমস্যাকে অজুহাত করে কালাকানুন লাগু করে সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের চলাফেরার, কথা বলার, সংগঠিত হওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়। তাই সমস্যাটা সারা দেশের ছাত্রছাত্রী সমাজের সমস্যা। এখানে বহিরাগত সমীকরনটা অন্যরকম, ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষসরকারপুলিশ বনাম ছাত্রছাত্রী সমাজ, শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। স্বৈরতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র। ২০ তারিখের মিছিল আশা করি সেটা বোঝাতে পেরেছে। শেষে একটাই কথা বলার শাসক সাবধান। times they are a-changing…

.

নিবেদক,

সৌম্য মণ্ডল

# হোক কলরব

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s