সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ এর মধ্যে পার্থক্য কী?

Posted: সেপ্টেম্বর 18, 2014 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: স্ট্যাফেনী ম্যাকমিলান

অনুবাদ: মোঃ সুলতান মাহমুদ

hammer and sickleএকটি সমাজের সংগঠনে (উৎপাদন প্রক্রিয়ায়) পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটতে পারে কেবলমাত্র তখনই যখন শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ পুঁজিবাদীদের অপসারণ করে সমাজের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেবেরাজনৈতিক ক্ষমতা এবং উৎপাদনের উপায় (ফ্যাক্টরি, সম্পদ ইত্যাদির) এ দুয়ের দখলদারিত্বই এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সমাজ কিভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন খাদ্য, কাপড়, বাসস্থান, জ্বালানী, পরিবহণ ইত্যাদি উৎপাদন ও বণ্টন করে এবং কারা এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, এর দ্বারা উৎপাদন প্রক্রিয়াসমূহ ও তাদের মধ্যকার পার্থক্যকে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

পুঁজিবাদে, সবকিছুই উৎপাদন করা হয় কেবলমাত্র একটি উদ্দেশ্যে আর তা হলোঃ পুঁজির অব্যাহত কুক্ষিগতকরণ। পুঁজির মৌলিক উৎস হলো উদ্বৃত্ত মূল্য যা এক ধরণের মুনাফা এবং যেটি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক শোষণের মাধ্যমে সৃষ্ট। সমাজের সবকিছুই পুঁজিবাদী নামক ক্ষুদ্র একটি শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার্থে সাজানো আছে। বর্তমানে এই শ্রেণীটি সমাজের উৎপাদন প্রক্রিয়ার মালিক ও নিয়ন্ত্রক। তাদের হাতেই কুক্ষিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং জনগণকে তাদের আধিপত্য মেনে নিতে , তারাই তথ্য ও ধারণা বা চিন্তার প্রচার নিয়ন্ত্রণ করে।

সমাজতন্ত্রে, সবকিছুই সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে উৎপাদিত হয় এবং তা হলো সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের প্রয়োজনে। এবং সমাজতন্ত্রে গণমানুষ (যারা পুঁজিবাদ ফিরে আনতে চায় তারা ছাড়া বাকি সবাই) সকলের মঙ্গলের জন্য গণতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে একত্রে সমাজ পরিচালনা করে।

একটি পুঁজিবাদী সমাজের সমাজতান্ত্রিক প্রবণতা ও কর্মসূচি (instances) থাকতে পারে যেমন বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসা, শ্রমিক কল্যাণ সমিতি, এবং শিল্পকারখানা, যেখানে অধিক সংখ্যক অত্যন্ত সমন্বিত লোক দরকার। কিন্তু পুরো সমাজের উপর শ্রমিক শ্রেণীর কর্তৃত্ব না থাকলে , সকলের কল্যাণার্থে পরিচালিত অর্থনীতিকে সমাজতন্ত্র বলা হয় না। পুঁজিবাদে, এমনকি এই লক্ষণগুলো অর্থাৎ কর্মসূচিগুলোকে (instances) বাস্তবরূপ দান করা হয় এবং এগুলো পুঁজি কুক্ষিগতকরণে ভূমিকা রাখতে বিদ্যমান থাকে। পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র সামাজিক সংগঠনকে সার্বিকভাবেই নিয়ন্ত্রণ করে (নিজ নিজ ধারায়, ভিন্ন আঙ্গিকে); সামাজিক সংগঠন হলো সামাজিক সম্পর্কগুলোর ধরণ (অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আদর্শিক) যা কিনা সমগ্র সমাজের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। একটি সমাজ কাঠামোয় দুই ভিন্ন আঙ্গিকের সামাজিক সম্পর্ক সহাবস্থান করতে পারে না। একটি সর্বদা অন্যটির উপর প্রভাব বিস্তার করবে এবং তাকে চূর্ণ করবে।

সমাজতন্ত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অপসারিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উপাদানগুলো রয়ে যায়। এবং এই ব্যবস্থায় অবশ্যই ,পুঁজি কুক্ষিগতকরণের পরিবর্তে, পুরো সমাজের সেবা করণের উপযোগি রূপান্তর/পরিবর্তন আনতে হবে। এই রূপান্তর/পরিবর্তন হলো উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন, জনগণকে যেভাবে চিন্তা করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তার পরিবর্তন, এবং যে প্রক্রিয়ায় সামাজিক প্রচেষ্টাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, পরিচালনা করা হয় ও বাস্তবায়ন করা হয় তার পরিবর্তন। এই সকল উপাদানসমূহ যেগুলো পুঁজিবাদ দ্বারা বিকাশ এবং বাস্তবরূপ লাভ করেছে তাৎক্ষণিকভাবে অতীতকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে না। কিন্তু সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে, তাদের দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা প্রয়োজন। সুতরাং প্রাথমিক পর্যায়ে, পুঁজিবাদের কিছু অবশিষ্টাংশ আবশ্যকভাবে থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাক্তির কাজের অনুপাতে বেতন দেওয়া, এবং ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, লোভ, প্রতিযোগিতা, নিষ্ক্রিয়তা ও দাসমনোভাবের বদ্ধমূল অভ্যাস।

পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তন রোধে, শ্রেণী বিভাজন ও মানুষকে বিভক্তকারী পুরনো ধারার চিন্তাকে ভেঙ্গে ফেলার অব্যাহত প্রচেষ্টা দরকার। সমাজের জন্য যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণে, অধিকসংখ্যক লোকের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন, আবার যাতে ক্ষমতা মুষ্টিমেয় লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয় এই জন্যে।

সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদী উভয়েরই বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে, পুঁজিবাদের হাত থেকে রক্ষা করে, সমাজের ক্ষমতায়ন করা এবং ফলশ্রুতিতে ব্যাক্তিগত সম্পদের কুক্ষিগতকরণ ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটানো। এটা শুরু হবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠাকরণের মাধ্যমে। এর সাথে আরো দরকার সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার যেটি পুরো সমাজের কল্যাণার্থে সমাজের যৌথ উৎপাদন পরিচালনা করবে। কিছু সমাজতন্ত্রী বিশ্বাস করে যে এটা করা যাবে পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্য থেকে ভিন্ন প্রকৃতির সরকার গঠনের মাধ্যমে। কিন্তু পুঁজিবাদী শ্রেণী সহজে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না এবং এ জন্য তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে বিপ্লবের প্রয়োজন হবে। মালিকানা বা সরকারের পালাবদল (এমনকি সহিংসভাবে হলেও) যথেষ্ট নয়। অবশ্যই সামাজিক সম্পর্কের সমগ্র জালের আমূল/বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

সাম্যবাদীরা বিশ্বাস করে যে, শ্রেণী বিভাজনের/বৈষম্যের প্রত্যাবর্তন রোধ এবং তাকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে, সমাজতন্ত্রের চাইতেও আরও বেশী পথ পাড়ি দিতে হবে। সাম্যবাদ হলো একটি যৌথ ও শ্রেণীহীন সমাজ। সাম্যবাদীরা সমাজতন্ত্রকে পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের মধ্যকার ক্রান্তিকাল হিসেবে গণ্য করে, যে সময়ে শ্রমিক শ্রেণি ক্ষমতায় থাকে (সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র)। এই স্তরটি দীর্ঘ সময় বিদ্যমান থাকতে পারে এবং শ্রেণী বিভাজন/বৈষম্য সম্পুর্ণরূপে নির্মূল করার লক্ষ্যে, অব্যাহত সংগ্রাম ও অগ্রগতি দ্বারা এই স্তরটিকে চিহ্নিত করা হয়। নতুন শ্রেণীর (আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া) সৃষ্টি এবং পুঁজিবাদের পুনর্জন্ম রোধে, বিশেষভাবে রাষ্ট্র অবশ্যই অব্যাহতভাবে ভেঙ্গে পড়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকবে। সাম্যবাদ তখনই অর্জন করা যাবে যখন মানুষের মাঝে কোনো শ্রেণী বৈষম্য/বিভাজন থাকবে না। শ্রেণী শাসনের হাতিয়ার হিসেবে, রাষ্ট্র (পুঁজিবাদের হাতেই থাকুক অথবা শ্রমিক শ্রেণীর হাতেই থাকুক) শ্রেণী বরাবর ভেঙ্গে যাবে। সাম্যবাদে প্রতিটি ব্যাক্তি তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী, স্বাধীনভাবে এবং স্বেচ্ছায় যৌথ উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের যা কিছু প্রয়োজন তা তারা গ্রহণ করে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s