লিখেছেন: আব্দুল্লাহ আল শামছ বিল্লাহ

tea-garden6512চা, অত্যন্ত জনপ্রিয় পানীয়। বাংলাদেশের এমন কোন প্রান্ত পাওয়া যাবে না যেখানে এই পানীয়টির চল নেই। নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এটি। ক্লাসের ফাঁকে, অতিথি আপ্যায়নে, অফিসে, আড্ডায় বা বিকালের নাস্তায় এটি লাগবেই।

১৮৪০ সালে, চট্টগ্রাম থেকে এখানে চা চাষের ইতিহাস শুরু হয়। বর্তমানে ১৬৪টিi বাগানে চা এবং আরও কিছু বাগানে অর্গানিক চা চাষ হচ্ছে। এখন বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম চা উৎপাদিত হয়, যা বিশ্বে চা উৎপাদনে ১১তম। উৎপাদিত চা দেশীয় চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে, যাতে প্রায় ০.৮১ ভাগ জিডিপি অর্জিত হয় এই চা শিল্প থেকে। প্রায় ৫ লাখ লোক চা শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। যার মধ্যে প্রায় ১,৫০,০০০ শ্রমিকই আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। মূলত যেসব স্থানে চা বাগান রয়েছে, সেসব অঞ্চলে কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র হলো এই চা বাগান। এছাড়াও চাবাগানের অপূর্ব মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি পর্যটন শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে।

কিন্তু এখানে এই ১৭৪ বছরেও আমরা চাশ্রমিকদের দিকে নজর দিতে পারি নি। চা শ্রমিকেরা যেই নির্যাতন সয়েছে বৃটিশ আমলে, সেই নির্যাতন সয়ছে এখন “স্বাধীন” বাংলাদেশে। যার তীব্রতর সর্বশেষ রূপ দেখতে পাচ্ছি কালগুল চা বাগানে।

একজন চা শ্রমিকের দিন শুরু হয় সকাল ৮ টায় এবং শেষ হয় বিকাল ৫ টায়। এই দীর্ঘ সময়ের বেশিরভাগ সময়ই তাদের দাঁড়িয়ে কাটাতে হয়। প্রতিদিন তীব্র দাবদাহ অথবা ঘনবর্ষণ মাথায় নিয়ে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ তোলাই তাদের কাজ। এক কেজি পাতা তোলার জন্য তাদের আয় দুই টাকা। সেই হিসেবে একজন শ্রমিক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করলে গড়ে ৩০ কেজির বেশি পাতা তুলতে পারেন না। আবার বর্ষাকালে অতি বৃষ্টির কারণে তাও সম্ভব হয় না। অপরদিকে অন্য সময়ে গাছে পাতা বেশি থাকে না। ফলে তখন গড়ে ২০ কেজির বেশি পাতা তোলা সম্ভব হয় না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে যে একজন শ্রমিক যদি গড়ে ২৫ কেজি পাতা তুলতে পারে, তাহলে তার প্রতিদিনের আয় হচ্ছে ৫০ টাকা (২০০৫ পর্যন্ত)। ২০০৬ সালে বেতন বৃদ্ধির দাবীতে আন্দোলন শুরু হলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ টাকায়, যেখানে শ্রমিকদের দাবী ছিল ৩০০ টাকা।() বর্তমান বাজারে এই ৬৯ টাকায় সংসার চলে না। একবার খেলে আরেক বার উপোস থাকতে হয়। এর সামাধানের জন্য বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুসারে প্রতি দুই বছর অন্তর চা শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে আলোচনায় বসার কথা থাকলেও তা মালিক পক্ষ বাস্তবায়নে কখনোই সেভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেনি এবং এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িতও হয়নি। ২০০৬ সালে শ্রম আইন হবার পরে সেখানে সুনির্দিষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি।()

মালিক পক্ষ বেতন বাড়াতে অনাগ্রহের পক্ষে যে যুক্তিটি দাড় করায়, তা হলো তাদের নিয়মিত রেশন দেয়া। কিন্তু কতটুকু রেশন দেয়া হয় তাদের? প্রতিজন শ্রমিক ১ টাকা ৩০ পয়সা কেজি হিসাবে প্রতি সপ্তাহে পান ৩ কেজি ২৭০ গ্রাম চাল বা আটা। সেটাও আবার সব সময় পাওয়া যায় না। এখন এই অনুন্নত সমাজে আদর্শ পরিবার ধরেও যদি হিসাব করা হয়, তা হলে মাথাপিছু পড়ে সর্বোচ্চ ২৫০ গ্রাম চাল। (আদর্শ পরিবারে ৪ জন সদস্য ধরা হয়। দুই জন কাজ করলে পান ৩.২৭০+.২৭০=.৫৪০ কেজি চাল। তাহলে দিন প্রতি প্রতিজনের ভাগে পড়ে ২৭৭ গ্রাম চাল।) এখন বর্তমান বাজারে এই ৬৯ টাকায় সংসার নির্বাহ করা কিভাবে সম্ভব, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

চা শ্রমিকের অর্ধেকেরও বেশী নারী। এই নারীদের অবস্থা আরও খারাপ। আগে শ্রমিকরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পেত না। কাজ না করলে খাবার জুটবে না, তাই বাধ্য হয়ে শ্রমিকরা এই সময়টাতেও কাজ করেছে। এমনও হয়েছে যে কাজ করতে করতে চাবাগানের মাঝেখানেই চটের বস্তা বা পলিথিনের উপর বাচ্চার জন্ম হয়েছে। বর্তমানে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তা যথেষ্ট নয়। এখনও প্রসুতিকালে তারা মাতৃত্বকালীন ছুটি ঠিকভাবে পায় না। দেড় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি এই কঠোর পরিশ্রমের কাজে কোনো মতেই গ্রহনযোগ্য নয়। আবার পূর্ণ ছুটি ভোগের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হতে দেখা যায় না। ডাঃ নিবাস চন্দ্র পাল তার ‘চা শ্রমিকদের কথা’ বইতে উল্লেখ করেন যে, “চা বাগানের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ নারীই রক্তশূন্যতার মাঝে গর্ভধারণ করেন। অপুষ্টি ও বাল্যবিবাহ এর অন্যতম কারণ। প্রতিটি চা বাগানেই রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীর তীব্র অভাব। অধিকাংশ শিশুরই জন্ম হয় মাটির মেঝে, চটের ছালায় বা পলিথিনের ওপর। নারী চা শ্রমিকরা ম্যালেরিয়া, কৃমি, যক্ষা, কুষ্ঠ, গনোরিয়া, সিফিলিস, স্ক্যাবিস, চর্মরোগ প্রভৃতি রোগে ভোগেন।”

২০০৬ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতিটি চা বাগানে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও অনেক চা বাগানে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার কোনো সুবিধা নেই।() কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কোন ধরনের পরিবহনের ব্যবস্থা নেই; একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় পা এবং মাচা। যেসব বাগানে ডিসপেনসারি রয়েছে, সেখানে নামমাত্র ওষুধ ছাড়া জীবনরক্ষাকারী কোনো ওষুধই মেলে না। বেশির ভাগ বাগানেই কোন ডাক্তার, ওষুধ ও নুন্যতম চিকিৎসা সেবা নেই। এ ছাড়াও THE BANGLADESH CHA SRAMIK KALLYAN FUND ORDINANCE, 1986 (ORDINANCE NO. LXII OF 1986)তে বলা হয়েছে প্রয়োজন হলে ফান্ড থেকে অসুস্থ শ্রমিককে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এই ফান্ডের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।()

এখন প্রশ্ন ওঠে এতো সব অসুবিধা থাকতে শ্রমিকেরা এখানে কাজ করছে কেন? মূলত এই সব চা বাগানের শ্রমিকেরা অধিকাংশই বাইরে থাকা আনা। তাদের সাথে সহজে স্থানীয় জনগণের সহাবস্থান পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। সাথে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের হীন মানসিকতা চা শ্রমিকদের ছোটলোক হিসেবে দেখার মানসিকতা। তাই তারা এই কম পারিশ্রমিকে নিরুপায় হয়ে চা বাগানে কাজ করতে বাধ্য হয়। আবার তাদের নিজেদের কোন ভূমি নেই। যার উপর দাঁড়িয়ে তাদের পরিশ্রমটা করতে পারে। চা বাগানের ভেতরে বাগানের জায়গাতেই তাদেরকে থাকতে হয়। কিন্তু বাগানে কাজ না করলে তাদের সেখানে থাকতে দেয়া হবে না, বের করে দেয়া হবে। তাই এই আশ্রয়ের জন্যও তারা বাগান আঁকড়ে পড়ে থাকে। অথচ ২০০৬ সালের শ্রম আইনে এই সমস্যা সমাধানের জন্য বলা হয়েছে।()

এছাড়াও শিশু শিক্ষা, বাসস্থানের পরিবেশ, পানীয় জলের সুবিধা, অবকাশকালীন সুবিধা, বিনোদনের বিন্দুমাত্র ব্যবস্থা সেখানে নেই। অথচ সবকটিই চা শ্রমিক সম্পর্কিত আইনগুলোতে বলা আছে।()

tea-workers-movement-12321চা শ্রমিকদের পূর্ব পুরুষদের কৃষ্টিকালচার হতে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে আজ তারা সকলের কাছে শুধু কুলি নামেই পরিচিত। এই কুলিদের পরিশ্রমেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের চা শিল্প, বিশাল বিশাল চা বাগান এবং চা বাগানের বিলাসবহুল বাংলোগুলো। কিন্তু সেই মানুষগুলোর মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ হয় না। ইংরেজরা যখন তাদের এখানে নিয়ে এসেছিল, তখন তাদের কাছে ওয়াদা করেছিল যে চার বছর পরে তাদেরকে নিজ নিজ বাসভূমে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিবে। কিন্তু সে ওয়াদাই স্রেফ কথার কথাই রয়ে গেছে, বাস্তবতার মুখ দেখেনি কখনও। ১৯৪৭ সালে ইংরেজদের ভারত ত্যাগ কিংবা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ফলে চা বাগানগুলির মালিকানারও বহুবার হাত বদল হয়েছে,(অথচ এই দুই ভয়ংকর যুদ্ধে গোষ্ঠিগতভাবে চাশ্রমিকদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে) কিন্তু চা বাগানের শ্রমিকদের ভাগ্যের এতে খুব একটা হেরফের হয়নি কখনও।

আর এমন এক সময়ে কালগুল চা বাগানের আন্দোলনরত চাশ্রমিকদের সকল দাবীর প্রতি একাত্ম হওয়াটা এখন সময়ের দাবি। সরকার ও বাগান মালিকদের কাছে এই দাবিগুলো নতুন কিছু নয়। তারা এমনি এমনি এই দাবি মেনে নেবে না কখনোই। তাই এই দাবীসমূহ এবং সকল সুবিধা মেনে নিতে শাসকশ্রেণীকে বাধ্য করার জন্য জোর আন্দোলনই একমাত্র পথ। আর ঠিক সেই কারণেই এই আন্দোলনের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রইলো এবং সকল প্রগতিশীল ও মুক্তিকামী মানুষদের প্রতি, যে যেভাবে পারেন, তাতে সামিল হওয়ার উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।।

তথ্যসূত্র

১। http://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%9A%E0%A6%BE#.E0.A6.AC.E0.A6.BE.E0.A6.82.E0.A6.B2.E0.A6.BE.E0.A6.A6.E0.A7.87.E0.A6.B6_.E0.A6.AA.E0.A7.8D.E0.A6.B0.E0.A7.87.E0.A6.95.E0.A7.8D.E0.A6.B7.E0.A6.BE.E0.A6.AA.E0.A6.9F,last accessed 09-09-2014.

২। মজুরী বোর্ড,একাদশ অধ্যায়, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬,( ২০০৬ সনের ৪২ নং আইন )

৩। সেকশন ৮৯, ibid

৪। Section 11, THE BANGLADESH CHA SRAMIK KALLYAN FUND ORDINANCE, 1986,(ORDINANCE NO. LXII OF 1986).

৫। সেকশন ৯৬, Supra note.

৬। আমাদের দেশে চাবাগান সম্পর্কিত আইন আছে ৪টি। এর মাঝে ৩ টিই মালিক পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে। আর বাকি ১টি আংশিক চাশ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করে। এই আইনটাতে যারা আর চাবাগানে পরিশ্রম করতে পারে না, তাদের ভালোমন্দ দেখার কিছু কথা বলা আছে। তবে সেটুকু আইনও এখানে বাস্তবায়ন হয় না। লেখক।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s