লিখেছেন: সব্যসাচী গোস্বামী

jail_cell_-653.

দিনগত পাপক্ষয়ে বেঁচে আছি।

মাঝে মাঝে চোঁয়া ঢেকুর জানান দেয়

বদহজম।

সুশান্ত বলে, ‘স্যার বড্ড মাছি,

কিছু একটা করুন’!

অফিসারের চোখে নিরুচ্চার হাসি,

কিছুক্ষন থেমে থেকে বলেন

ধুনোর ব্যবস্থা করা যাবে,

কিন্তু স্প্রে দিতে পারব না। জানেনই তো,

আমারও ক্ষমতা বড় কম।

আর তাছাড়াআমার উপর খুবই চাপ…’

সব শুনে মনের ভিতর মাছি ভন্‌ভন্‌ করে

বাইরে কিন্তু থাকি নিরুত্তাপ।

আরশোলা চেটে যায় গাল,

মশারা বিষাক্ত করে খুন,

অত তাড়াতাড়ি আর রাগিনা আজকাল।

সহ্য করতে করতে ধৈর্য বাড়ে।

চর্বি জমে সময়ের শরীরে।

আঁটোসাটো চেপে বসে জামা, গেঞ্জি, পাৎলুন।

——————————————-

.

কোর্টে যাই। কেস পার্টনাররা আসে।

তারা বলাবলি করে –

এ লোকটা শ্লোগান দেয় না কেন?

কেন শব্দের ভাষায় জানায় না বিদ্রোহ’?

আমি কিন্তু থেকে যাই নিরুত্তর, নির্মোহ।

তাদের বিতর্কে অংশ নিই না।

আজ বুঝি, শব্দগুলো সংরক্ষিত রাখলে

তা একদিন অনির্বাণ অস্ত্র হতে পারে।

আজ বুঝি, অস্ত্রগুলো ভোঁতা হয়ে যায়

অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে।

তাই শব্দগুলো পুষে রাখে মন।

একদিন বানাবই এমন শ্লোগান,

আগুন জ্বালাতে যা হবে ইন্ধন।

—————————————-

.

প্রিজনভ্যানের খাঁচা থেকে উঁকি দিয়ে

ভিড়ের মধ্যে খুঁজি ব্যস্ততম মানুষের মুখ।

শহরকে গিলে খায় ডিজেলের ধোঁয়া, আর

যানজটের পুরোনো অসুখ।

দেয়ালে সাঁটানো থাকে সিনেমার পোষ্টার

খোকাবাবু চলেছেন চাঁদের পাহাড়।

পোষ্টারের চারিদিকে লেগে থাকে

পান, গুটখার পিক।

ময়দানে গামছা পেতে শীতের দুপুরে,

ভাতঘুমে কুপোকাত বাউন্ডুলে অচেনা পথিক।

ত্রিনয়নী আলো মেখে কলকাতা স্বপ্ন দেখে

কল্লোলিনী তিলোত্তমা নয়, হবে লন্ডন।

মনের ভিতর শুনি মাছি ভন্‌ভন্‌

—————————————–

.

মা চলে গেছে বহুদিন।

স্বপ্নে তবু মাঝে মাঝে আসে।

বাবা আর দিভাইয়ের সাথে কথা হয়।

প্রায় দিনই। দুপুরে। দূরভাষে।

দূর জেল থেকে প্রেমিকার খবর আসে। জানতে চায়

আমাদের কখনো কি দেখা হবে আর …’

উত্তরে জানাই, ‘হবে, নিশ্চয়ই হবে। ধৈর্য ধর।

ধৈর্য ধরা এ সময় ভীষন দরকার’।

বলি ঠিকই, ছট্‌ফট্‌ও করি।

বাইরে পাহারা দেয় অতন্দ্র প্রহরী।

ধৈর্য ধরি। ধৈর্য রাখি। ধৈর্য মেখে খাই।

ধৈর্যের চাদর পেতে বিছানায় গড়াই।

মনে মনে ভাবি আর কতদিন, কাঁহাতক!

মায়ের শ্মশান যাত্রায় থাকতে পারিনি আমি,

আত্মীয় বন্ধুরা ছিল আর ছিল রাষ্ট্রের ঘাতক।

——————————————-

.

ল্যাজকাটা এ তল্লাটের মার্জার মাস্তান।

যতক্ষন না খেতে দিই মিঁউ মিঁউ চিৎকারে

ঝালাপালা করে দেবে কান।

সামান্য উচ্ছিষ্ট টুকু ছুঁড়ে দিই যেই

চেটেপুটে সব সাফ। পাশ ফিরতেই দেখি

ল্যাজকাটা নেই!

——————————————-

.

নাসিরভাই বল করে

বিপরীতে ব্যাট হাতে ছেলে –

এমন দৃশ্য শুধু দেখা যাবে

প্রেসিডেন্সি জেলে।

নাসিরভাইয়ের মাথায়

ঝুলে থাকে মৃত্যুর ফরমান।

ক’জন জেহাদিকে ফাঁসিতে ঝোলালে,

শান্তির স্বর্গ হবে পবিত্র হিন্দুস্তান

জানিনা, রাষ্ট্রনেতাদের কাছে আছে কিনা পরিসংখ্যান!

জেহাদের অভিযোগে তবু মৃত্যুদন্ড শুনিয়ে দিল নিম্ন আদালত।

দন্ডদাতা কাঁদেন না দন্ডিতের সাথে সমান আঘাতে

শুধু ভেঙে ফেলেন কলমের নিব, আর

রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলেন হাতের।

আমরা স্বপ্নে দেখি নাসির ভাইয়ের ব্যাটিং,

বল ঢুকে পড়েছে সুপ্রীম কোর্টে,

আর তা কুড়িয়ে নিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসছে

নাসির ভাইয়ের অপাপবিদ্ধ সন্তান।

একটা ফুট্‌ফুটে ফুল মাথা তুলে উঁকি দিচ্ছে তার

জামার পকেটে।

————————————————

.

কে কাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়

সূর্য পৃথিবীকে, না সূর্যকে পৃথিবী?

এমন উদ্ভট প্রশ্ন মনে আসতেই চোখে ভাসে

কে সি পালের বই আর নরেন্দ্র মোদির ছবি।

.

সমকামকে অবৈধ জানিয়ে

উচ্চতম ন্যায়ালয় হাত মুছে ফেলে।

পুরুষের আধিপত্য লেগে থাকে

লিফ্‌টের দরজায়, ট্রেনবাসের ভিড়ে, ডায়নিং টেবিলে।

.

চিটফান্ড কলঙ্ককে ঢেকে দিয়ে

ছেয়ে যায় সততার প্রতীকের কাট আউট

প্রতিবাদী গ্রামে, মাঝরাতে শব্দ তোলে পুলিশের বুট।

বিদ্বজনেরা আজ সব দেখেও অন্ধ, সব শুনেও বোবা

চেতনায় সংগ্রামের বার্তা দেয় কামদুনি, খারজুনা, লোবা।

———————————————

.

শব্দরা এলোমেলো ওড়াউড়ি করে

টেনে নিই বেওয়ারিশ খাতা

লিখি আর কাটি, কাটি আর লিখি

দু’একটা শব্দকে ধরবার চেষ্টায় থাকি

ধরতে পারলেই ভাবনার মাটিতে পুঁতি শব্দের বীজ

বীজ থেকে গাছ। গাছ থেকে ফুল, ফল।

কখনো তা দিনলিপি, কখনো কবিতা।

—————————————

(*** নাসির ভাইয়ের পুরো নাম জমিলুদ্দিন নাসির। কলকাতায় আমেরিকান সেন্টারের হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিম্ন আদালত তাকে এবং আফতাব আনসারিকে ফাঁসির সাজা শোনায়। হাইকোর্টে রায় বহাল হওয়ার পর, বর্তমানে সুপ্রীম কোর্ট তাকে তিরিশ বছর সশ্রম কারাদন্ড দেয়। এই কবিতা লেখার সময়ও সুপ্রীম কোর্টের এই রায় ঘোষিত হয়নি।)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s