লিখেছেন: আব্দুল্লাহ আল শামছ বিল্লাহ

justice-3বিচারব্যবস্থার প্রথমদিকে উকিল বলে কিছু ছিল না। নিজেদের বক্তব্য নিজেদেরই বিচারককে জানাতে হতো। কিন্তু আইন যখন জটিলরূপ নিতে শুরু করল, সাধারণের পক্ষে তা ভালোভাবে বোঝা এবং বলা আর সম্ভবপর হলো না তখন প্রয়োজন হলো এই উকিলদের। তথাকথিত এই ওকাতি পেশার উদ্ভব সম্ভবত প্রথম হয় গ্রীস ও রোমে আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই সময়ে এদের সম্মানের চোখে দেখা হতো না। রোম সাম্রাজ্যের শেষের দিকে এরা নিজেদের গুণে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বর্তমানে আবার এই পেশাটি আগের রূপে ফিরে গেছে।

আমাদের যাদের কোর্টের বারান্দায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, তারা জানেন সেখানে কি চলছে। সেই বিষয় নিয়ে হয়তো পরবর্তীতে বলার চেষ্টা করব, তবে এই পর্বের বিষয়বস্তু ভিন্নএখানে আমার অভিযোগ বলতে পারেন নির্দিষ্টভাবে উকিলদের প্রতি। প্রথমেই আমরা দুটি উদাহরন টানি >>

১ম উদাহরণ >> রহিম মিয়ারা ৪ ভাই। তার বাবা মারা যাওয়াতে তারা কোর্টে বাটোয়ারার মামলা করলো। উকিল সাহেব এখানে ইচ্ছা করেই রহিম মিয়ার নাম বাদ দিয়ে দিলেন। পরে রহিম মিয়া তার কাছে বিষয়টা বললে উকিল সাহেব বললেন যে ৫০০০ টাকা তার নাম অর্ন্তভুক্ত করতে খরচ হবে।। উল্লেখ্য উনি মামলা করার জন্য ১০০০০ টাকা নিয়েছেন।

এই মামলার দিকে যদি তাকায় তাহলে আমরা দেখি যে, এখানে আসলে নাম সংযোজন করার জন্য উকিল সাহেবের সর্বোচ্চ খরচ হয় একটি কার্টিস বাবদ ১০ টাকা, টাইপ বিল বাবদ ২০ টাকা, আর কোর্ট ফি ১০ টাকা।

২য় উদাহরণ >> একজন মক্কেল উকিল সাহেবের কাছে এসে বললেন, “আমার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, এই কারনে কি আমাকে পুলিশ গ্রেফতার করবে?” উকিল সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “অপনার কাছে কি টাকা আছে?” মক্কেলটি উত্তর দিল যে, তার অনেক টাকা আছে। মক্কেল তার সম্পত্তি বিক্রি করতে থাকল আর উকিল সাহেব সেই সম্পত্তি কিনতে থাকলেন। এইভাবে বেশ কিছুদিন পর হটাত একদিন মক্কেলকে পুলিশ গ্রেফতার করলো। তখন মক্কেল উকিল সাহেবকে জিজ্ঞাসা করল যে তাকে কেন পুলিশ গ্রেফতার করেছে? উত্তরে উকিল সাহেব জানালেন যে তার এখন আর কোন টাকা নাই, তাই।

এই হলো আমাদের দেশের উকিল সাহেবদের বতর্মান অবস্থা। যদিও সরকার সুনির্দিষ্টভাবে উকিল সাহবেদের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন পাশ করেছেন।() এখন মোটা দাগে ১৪ টি আলাদা আলাদা মক্কেলের প্রতি উকিল সাহেবদের দায়িত্ব দেয়া আছে।() যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো

আইনগত পরামর্শদাতা হিসেবে একজন উকিল অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে কার্যকর ও মানসম্মত প্রতিনিধিত্ব করবেন।

অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে যৌথভাবে মামলা পরিচালনার সময় একজন উকিল সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলবেন।

যুক্তিসংগত দ্রুততা ও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে মামলা পরিচালনা করবেন।

মক্কেলের সাথে সম্পাদিত সকল প্রকার যোগাযোগের গোপনীয়তা বজায় রাখবেন।

মামলার প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ সম্পর্কে যত দ্রুত সম্ভব তথ্যানুসন্ধান পূর্বক প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ তা মামলা পরিচালনায় ব্যবহার করবেন।

তিনি নামে বা বেনামে মক্কেলের কোন ধরনের সম্পত্তি কিনতে পারবেন না।

যথাযত ফি নিবেন। বিশেষ ক্ষেত্রে (সুনির্দিষ্টভাবে বিধবা ও এতিম) কোন ফি নিবেন না।

এই সুনির্দিষ্ট দায়দায়িত্ব ছাড়াও আরও ৩টি বিভাগে আরও ৩ ধরনের মক্কেলের সাথে উকিলদের সম্পর্ক এখানে বলা আছে।() এখন চিন্তা করেন কোন উকিল কি এই নিয়ম কানুন মেনে চলে?

এখানে উল্লেখ্য যে, কোন উকিলের বিরুদ্ধে অসদাচরনের অভিযোগ আনলে তার শাস্তি হিসেবে সনদ স্থগিত বা বাতিল হতে পারে।() যদিও আমাদের দেশে এর প্রয়োগ আছে বলে জানা যায় না।

ব্যাক্তিগতভাবে আমি যখন উকিলদের সাথে কথা বলেছি, তখন তারা বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টাকার অভাব। তাদের পরিবার পরিজনের ব্যয়ভার চালাতে এই অবৈধ পথে এটা লাগে। সাথে সাথে টাকার প্রতি মোহও তাদের অন্ধ করে ফেলে।

এরপর রয়েছে দালালদের প্রাদুর্ভাব আছে। আপনি দালারদের টাকা না দিলে মক্কেল পাবেন না। কারন আমাদের দেশে মক্কেল আপনার নাম জেনে কোর্টে আসে না। কোর্টে এসে আপনার নাম শুনে। যদিও বা দুয়েকজন পুর্বপরিচিত মক্কেল আপনার খোঁজ করে, দালালরা তাদেরও বিপথে নিয়ে যায়।

আবার অনেকসময় মক্কেলরা না জেনেবুঝে ওকালতনামায় সই করেন। তারপর উকিল সাহেব বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছ থেকে টাকা নিতে থাকেন। এই ক্ষেত্রে অন্য কোন উকিল ঐ মামলা নেয় না। কারন অবৈধ একটি নিয়ম চালু আছে এই পেশায়, কোন উকিলের মামলা স্বেচ্ছায় হস্তান্তর না করলে অন্য উকিল ঐ মামলা পরিচালনা করতে পারেন না।

আবার এরকম দেখেছি যে, কোন উকিল শুধু হলফনামা করার জন্য ১০০ টাকা চাইলে মক্কেলরা তার কাছে যায় না। কারন এত অল্প টাকায় কোন ভালো উকিল কাজ করেন, সেটা তারা বিশ্বাস করতে পারেন না।

আইন পাশ করার পর যখন আমি কোর্টের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছি, তখন আমি এগুলো দেখেছি। এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুধু আইন পেশায় নির্ভর করে আমি সততার সাথে চলতে পারবো না। বলা চলে চলতে দেয়া হবে না। কারন এই প্রতিযোগিতার যুগে আপনি কোন মক্কেল পাবেন না। আপনাকে পরিবারসহ না খেয়ে দিন কাটাতে হবে।

পরিশেষে একটা ল্প দিয়ে শেষ করছি >>

শোনা যায়, স্যার ইলাইজা ইম্পে() যখন জাহাজ থেকে চাদপাল ঘাটে নামলেন, তখন আগত দর্শনার্থীদের দেখে তার সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “দেখো, ব্রাদার! এদেশের মানুষের গায়ে কাপড় নেই। পায়ে মোজা পযর্ন্ত জোটে না। আমরা ৬ মাসের মধ্যে প্রত্যেককে জুতো আর মোজা পরিয়ে ছাড়বো।() এর পর কত ৬ মাস কেটে গেল, কিন্তু এদেশের মানুষের জুতোকাপড় তো দূরে কথা, খাওয়ার অধিকার পেল না। ইম্পে সাহেব এই সব ভুলে বন্ধুবর হেস্টিংস এর সাথে তখন পুল বাঁধতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পরে ইতিহাসে অক্ষয় হলেন হেস্টিংসের সাথে যুক্তি করে, মাহারাজা নন্দকুমারকে () ফাঁসিতে ঝুলিয়ে।

এই হলো উপমহাদেশের আইনজীবীদের ইথিকসএর পথচলার ইতিহাস। যার গোড়ায়ই গলদ তার আর ভাল ইতিহাস কোথায় পাওয়া যাবে?? যার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে, চলেই যাচ্ছে

(চলবে…)

আব্দুল্লাহ আল শামছ বিল্লাহ :: সংগঠক, মঙ্গলধ্বনি এলএলএম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্যসূত্র

১। BANGLADESH BAR COUNCIL CANONS OF PROFESSIONAL CONDUCT AND ETIQUETTE, 1969.

২। Chapter 2, Ibid.

৩। Chapter 1, 3 & 4 ibid.

৪। Section 32, THE BANGLADESH LEGAL PRACTITIONER’S AND BAR COUNCIL ORDER, 1972 (PRESIDENT’S ORDER NO. 46 OF 1972).

৫। কোম্পানি তথা ব্রিটিশ শাসনের আগে বাঙলার বিচার ভার ছিল নবাবদের হাতে। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি দেওয়ানি মামলার ভার নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। তারপর রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগে কোম্পানি ফৌজদারী মামলার ভারও নিজেরদের হাতে নিয়ে নেয়। দেওয়ানি মামলার বিচারের জন্য প্রতি জেলায় কালেক্টরের অধীনে দেওয়ানি আদালত এবং ফৌজদারী মামলার বিচারের জন্য কাজীর অধীনে ফৌজদারি আদালত স্থাপিত হয়। ১৭৭৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা হলে ইলাইজা ইম্পে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন। নিম্ন আদালত থেকে আসা বিচারগুলো ইম্পের কাছে এসেই শেষ হত। ভারতীয় উপমহাদেশের বৃটিশ বিরোধী ব্যক্তি বা বিপ্লবীদের, বিশেষ করে নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা আছে, এই রকম আসামীদের, কেমন করে যাবজ্জীবন ও ফাঁসি দেওয়া যায়, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ বিচারক। অনেক ফাঁসির রায়প্রাপ্ত আসামীকে ষড়যন্ত্রমুলক যাবজ্জীবনের কারাদণ্ড দিতেন। যাতে কারাগারে তাদের মৃত্যু ঘটানো যায় আর রটিয়ে দেয়া হতো হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে বলে। ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা নন্দকুমারকে জালিয়াতির অভিযোগে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছিলেন, মিঃ ইম্পে। অথচ সত্যিকথা এটাই যে অভিযোগে তাঁর ফাঁসি হয়েছিল সেই অভিযোগটি ছিল মিথ্যা। মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসির পর বহু ভারতীয়দের ইংরেজ প্রীতিতে ভাটা সৃষ্টি হয়। বিলেতে এই অবিচারের খবর এলে ইম্পেকে ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে নেয়া হয় ও বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। অথচ সেই সময় আমাদের ভারতের রাজা, মাহারাজা, জমিদার, এমনকি অনেক আশ্রমের সাধুজীরা ইংলন্ডে গাদাগাদা চিঠি লিখেছিলেন যাতে ন্যায়াধিরাজ মহান বিচারপতি ইম্পের শাস্তি না হয়। লেখক।

৬। শংকর, কত অজানারে, পৃষ্ঠা ২১, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯ তম সংস্কর, অক্টোবর ২০০৭।

৭। http://digital.library.cornell.edu/cgi/t/text/text-idx?c=cdl;cc=cdl;view=toc;subview=short;idno=cdl417

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s