গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত ইরাক

Posted: সেপ্টেম্বর 1, 2014 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

islamic-state-11ইরাক প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যবাহী দেশ। মানবজাতির উন্মেষের অন্যতম ধাত্রীভূমি। যেখানে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর তীরে মেসোপটেমিয়ায় প্রথম নগর রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছিল ছয়সাত হাজার বছর আগে। কিন্তু এখন সেখানেই নগরেপ্রান্তরে অশুভ শক্তি ধ্বংসলীলায় মেতেছে। ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘোরানোর চেষ্টা করছে।

আবার জ্বলছে ইরাক। বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ ও মার্কিন বিমান হামলা চলছে। কালো ধোঁয়ায় ঢাকছে আকাশ। আর ছড়াচ্ছে আতঙ্ক। শিয়াসুন্নির ফারাক জানে না যে শিশুরা, যাদের তা বোঝার মতো বয়েস হয়নি, তারাও খেলার মাঝে থমকে যাচ্ছে। কেউবা ভয়ে জড়োসড়ো। অনিশ্চয়তা তাড়া করে বেড়াচ্ছে দেশের মানুষকে।

সংঘর্ষবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলিতে সবকিছুর তছনছ অবস্থা। রাস্তা প্রায় খাঁখাঁ। কোথাও বা জ্বলছে গাড়ি। তার মধ্য দিয়েই পালাচ্ছেন প্রাণ বাঁচাতে ভিটেমাটি ছেড়ে যাচ্ছেন মানুষজন। যাদের মধ্যে কারুর কারুর হয়তো বা ঠাঁই মিলছে মরুপ্রান্তরের কোন শরণার্থী শিবিরে।

গত জুনে পশ্চিম ইরাক ও পূর্ব সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দখল নিয়ে ইসলামিক স্টেট নামে একটি রাষ্ট্র গঠনের দাবি করেছে সুন্নি উপজাতি গোষ্ঠী ভিত্তিক মৌলবাদী বাহিনী ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস)। মার্কিনীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইরাকি সেনাবাহিনীকে কার্যত ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে সেদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর মোসুলও দখল করেছে এই সন্ত্রাসীরা। আর বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক গণহত্যা সংগঠিত করছে। এদিকে আইএসআইএসর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে শিয়াপন্থী সশস্ত্র মিলিশিয়াগুলি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ইরাককে শিয়া, সুন্নি ও কুর্দ জনগোষ্ঠীর নামে তিন খণ্ডে ভাগ করা। আর সেদেশের তেল ভাণ্ডারের উপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। ইরাকে আট বছরের দখলদারির সময়ে শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদের বীজ বপন করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। যাদের গড়া নূরমালিকির পুতুল সরকারের জাতিবিদ্বেষী নীতিতেও জনমনে ক্ষোভ বাড়ে। আর তার সুযোগ নিয়েই প্রভাব বিস্তার করেছে আইএসআইএস। তাছাড়া সিরিয়ায় রাষ্ট্রপতি বাসার আলআসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তার দোসর সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক এবং ইজরায়েলের মতো রাষ্ট্রগুলি মদত জুগিয়েছিল আইএসআইএস বাহিনীকে; যারা সন্ত্রাসবাদী আল কায়দা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত ছিল।

আরও লক্ষণীয়, ইরাকে সন্ত্রাসবাদী আইএসআইএস বাহিনীর অগ্রগতি রুখতে নূরমালিকির সরকার আগে অনেকবার মার্কিন সাহায্যের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু ওবামা প্রশাসন তখন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, ইরান ও সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাগদাদের উপর চাপ সৃষ্টির জন্যই আইএসআইএস’র সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু পরিস্থিতি যে ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, বুঝতে পেরে এখন তারা ইরাকে আরও সেনা পাঠাচ্ছে। আগ্রাসণ চালাতে ইরাকি কুর্দিস্তানকে ঘাঁটি হিসাবেও ব্যবহার করছে। আর কুর্দিশ বিচ্ছিন্নতাবাদী পেশমার্গ বাহিনীকে মদত জোগাচ্ছে।

সন্ত্রাসীদের দমন ও ইয়াজিদি সংখ্যালঘুদের উদ্ধারে “মানবিক সহায়তার” দোহাই দিয়ে ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই উত্তর ইরাকে বিমান হামলা শুরু করেছে। যে তথাকথিত ‘‘নিয়ন্ত্রিত আক্রমণেরপ্রকৃত উদ্দেশ্য সেদেশে ফের আধিপত্য বৃদ্ধি করা বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। ২০১১ সালে সেনা প্রত্যাহার আরম্ভ করার পর ফের ইরাকে বড় আক্রমণে জড়ালো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্। এদিকে চলমান মার্কিন বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে সম্প্রতি মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফোলিকে হত্যা করেছে একজন মুখোশধারী আইএসাইএস সন্ত্রাসী, যে ব্রিটিশ উচ্চারণে ইংরেজিতে কথা বলে। যার প্রেক্ষিতে ইরাক ও সিরিয়ায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্রিটেন।

এদিকে, এবছরের প্রথমার্ধে ইরাকে হিংসা ও সন্ত্রাসী হামলায় সাড়ে পাঁচ হাজার অসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।[] আর সেদেশে ঘরছাড়া হয়েছেন এবছরে প্রায় ১২ লাখ মানুষ।[] গত জুলাইতে ১৭৩৭ জন নিহত ও ১৯৭৮ জন আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ।।

.

তথ্যসূত্র

[] “Over 1,700 people killed in Iraq’s violence in July: UN”, 1 August 2014

[] Julian Borger, “Iraq humanitarian crisis has reached highest level, UN aid officials warn’’, 14 August 2014

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s