লিখেছেন: আনোয়ার হোসাইন ফার্মার

tachai-12নেকড়ের ডেরা” চীনের একটি গিরিখাতের নাম। বন্যার সময় যার দেড় কিলোমিটার অঞ্চল দিয়ে পাগলা ঘোড়ার বেগে পাহাড়ি ঢল বয়ে যেতো। চীনের লোকসঙ্গীতে আছে এরকম – “নেকড়ের ডেরা গিরিখাতে আছে তিন তিন শয়তান : ঢল, পর্বত আর নেকড়ের ক্ষুধা, শুকনো মৌসুমে গজায়না একটাও ঘাস বর্ষায় নামে শুধু মহা সর্বনাশ।” সংক্ষেপে এ হচ্ছে গিরিখাতের যথার্থ বর্ণনা।

গিরিখাতটিকে পোষ মানানোর প্রথম যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৫৫ সালের শীতকালে। তার আগে তাচাইয়ের মানুষের আরো ছয়টি গিরিখাতকে পাল্টানোর অভিজ্ঞতা থাকলেও “নেকড়ের ডেরা” ছিলো ভিন্ন। কিন্তু তাচাইয়ের মানুষ আগের পদ্ধতিই খাটালো নেকড়ের ডেরার ক্ষেত্রে। তাতে ফল হলো ১৯৫৬ সালের বন্যায় গিরিখাতে নবনির্মিত ত্রিশটিরও বেশি পাথুরে বাঁধ ধুয়ে মুছে গেলো। এই ব্যর্থতায় কিছু গ্রামবাসীর হৃদয় ভেঙ্গে গেলেও চীনা কমিউনিষ্ট পার্টি থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে বেশির ভাগেরই আতঙ্ক দূর হলো, যদিও বিষন্নভাব কাটেনি তখনো। কিন্তু পরাজয়ের অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের পরই যে কেবলমাত্র জয়লাভ করা সম্ভব তা তারা ভালোমতোই জানতেন। ফলত পার্টি শাখা গরীব ও নিন্মমধ্য কৃষকদের নিয়ে বসলো নেকড়ের ডেরায় ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য।

বিশ্লেষণ করে দেখা গেলো, প্রধানতঃ তারা নতুন পরিস্থিতির ক্ষেত্রে পুরাতন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। বিশেষত খেয়াল করা হয়নি যে, নেকড়ের ডেরায় পাহাড়ি ঢল নামে ভয়ঙ্করভাবে! ফলে আরো বড় বড় পাথর দিয়ে আরো মজবুত ভিত্তিতে আরো গভীর করে, বাঁধ তৈরির ব্যাপারে গ্রামবাসী খেয়াল করেনি। উক্ত বিশ্লেষণের পর গ্রামবাসী আবার শক্তি ফিরে পেলো, এবং সেই শীতকালেই তারা দ্বিতীয় যুদ্ধ শুরু করে দিলো। যৌথ পরিকল্পনা অনুযায়ী পানিপ্রবাহের গতি কমাতে গিরিখাতের উপরের দিকে একটা ছোট জলাধার বানালো। এবং কংক্রিট দিয়ে এমন বাঁধ দেওয়া হলো, যা ১৯৫৬ সালের প্রবাহিত ধরণের বন্যা প্রতিরোধে যথেষ্ট। কিন্তু আচমকা ১৯৫৭ সালে প্রবল ঘূর্নীঝড় সহ ভারী বৃষ্টিতে উল্লেখিত নেকড়ের ডেরার গিরিখাতের কৃত্রিম জলাধার সহ নতুন আরো পঁচিশটি বাঁধ ধুয়েমুছে গেলো। এসময় তাচাইয়ের সমবায়গুলোর বিরোধীরা এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সমালোচকরা সাধারণ গ্রামবাসীর বিপক্ষে তিরস্কার ছুড়ে দিতে লাগলো। বলে বেড়ালো, পুরো শীতের পরিশ্রম এক রাতেই ভাসিয়ে নিলো প্রকৃতি। এবং এ বলে তত্ত্ব ঝাড়তে লাগলো যে, “মানুষ প্রকৃতির সাথে পারবেনা, গিরিখাতকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি সমবায়ের হবেনাইত্যাদি”! শ্রেণীশত্রুরা বলতে লাগলো, “মানুষ কখনো পানির সাথে লড়াইয়ে জিতবেনা, যেমন মোরগ পারেনা কুকুরের সাথে!” এবং এ বলে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো যে, “যতোই শক্তিধর হোক, পানির দেবতা ড্রাগনের সাথে মানুষ কি লড়াই করে জিততে পারবে?”

এ দিনগুলোতে তাচাইয়ের সমবায়ের সংগঠক এবং সমাজতন্ত্র গড়ার কর্মী চেন য়ুং কুই, খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। প্রায়শ তিনি গিরিখাতটির পাশে বসে বসে ভাবতেন, “সত্যিই কি নেকড়ের ডেরা গিরিখাতটি অপরাজেয়?”, “এবার কি আমরা সত্যিই ব্যার্থ হচ্ছি?” তার চোখের সামনে ভেসে উঠতো শ্রেণীশত্রুদের দেঁতো হাসি।

নেকড়ের ডেরায় গিরিখাতের অপ্রত্যাশিত বিপত্তির পর জমিদার ও ধনী কৃষকরা যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলো! তারা খুশিতে ডগমগ করতে করতে পরস্পরে বলতে শুরু করলো, “সমাজতন্ত্রের ওসব চমৎকারিত্বের বাগাড়ম্বর আর যৌথশক্তির বিরাটত্বের হলো কি? আমরা দেখছি তাদের ওসব সমবায়িক হৈচৈ তাদের ভিখিরি বানিয়ে কতদূর নিয়ে যায়?”

china-2অন্যদিকে, চেন য়ুন কুই ভাবলেন নিজের সংগ্রামী শ্রেণীভাইদের কথা, যারা সমাজতন্ত্র গড়ার লড়াইয়ে প্রাণপণে লড়াই শুরু করেছে। অতীতে বৃষ্টিপাত শুরু হলে লোকজন ক্ষেত ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে উঠতো, কিন্তু গিরিখাতকে রূপান্তরের লড়াই শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরিভাবে পাল্টে গেলো। বাড়ি ফেরার পরিবর্তে কমিউনিষ্ট, গরিব ও নিন্মমধ্য কৃষকরা ছুটতো বাঁধের দিকে, যেখানে বন্যার পানি ধেয়ে আসতো। চেন য়ুংএর মনে পড়লো চাও তা হোর কথা, যে তার বিকট ফোলা পা নিয়ে একটা বাঁধের ফাটল রুখবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো কোমর সমান কর্দমাক্ত পানিতে! এসময় চাও তা হোর জীবন বিপন্ন হতে পারে ভেবে লোকজন যখন তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিজেরা বাঁধ রক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করছিলো, চাও তা হো তখনো কারো কথায় কর্ণপাত করেনি। নেকড়ের ডেরায় পরাজয় মেনে নেওয়ার প্রশ্নে চেন য়ুং কুই ভাবলেন, শ্রেণীভ্রাতারা এতে কষ্ট পাবেন সিঃসন্দেহে এবং শ্রেণীশত্রুরা বগল বাজিয়ে যাবে অনবরত।

এ সময় চেন নিজে নিজে বিড়বিড় করে বললেন, “যতই কষ্টসাধ্য হোকনা কেন, আমরা নেকড়ের ডেরা গিরিখাত জিতে নিবো! এটা কেবলমাত্র উৎপাদনের ব্যাপার নয়, বরং দুশ্রেণীর দুমতাদর্শের মধ্যকার সংগ্রাম। আমরা সমাজতন্ত্র বিরোধী বদমাশদের খুশি হতে দিতে পারিনা। এবং পারিনা নিজেরা হতাশ হতে ও পিছু হটতে!” চেন স্বরণ করলেন, সভাপতি মাও সেতুঙএর সেই কথাগুলি, “অসুবিধার সময় আমাদের সাফল্যকে ছোট করে দেখলে চলবে না, আমাদের তাকানো উচিত উজ্জল ভবিষ্যতের দিকে, এবং আমাদের উচিত সাহস সঞ্চয় করা।” সভাপতি মাওএর শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে চেন নিজেকে নিজে দৃঢ়ভাবে বললেন, “অসুবিধার মুখে কমিউনিষ্টরা কুঁকড়ে যায়না, এ সংকটজনক মুহূর্তে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, জনসাধারণকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। পশ্চাদপসরণের কোন প্রশ্নই আসেনা।” পরে চেন য়ুং কুই প্রথমে তার মতামত পার্টি শাখা কমিটির বৈঠকে বললেন, পরে আবার শাখার সমস্ত সদস্যদের কাছে সবিস্তারে অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা বর্ণনা করলেন। এরপর কয়েকজন পার্টি কমরেড ও ক্যাডার বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রামবাসীকে উজ্জীবিত করলেন, সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীও নেকড়ের ডেরা গিরিখাত জয় করা প্রসঙ্গে আলোচনা ও পারস্পারিক মত বিনিময় শুরু করলেন।

ইতোমধ্যে হতাশা কেটে গেছে। দুবছরের ব্যর্থতার পরিপেক্ষিতে চেন য়ুং কুই ও সমবায়ের সদস্যরা প্রকৃতির রূপান্তরের নিয়মকানুনগুলো নিয়ে আলোচনা করতে একত্রিত হলেন। গত কয়েকদিন চেন ভালোভাবে ঘুমাতে পারেননি। একদিন সন্ধায় ভাবতে ভাবতে তার চোখে পড়লো, তারই গুহা ঘরের ছাদের দিকে। যেটা আসলে আস্ত একটি পাহাড়, এবং বহুকাল আগে পাহাড়ের তলায় গুহাটি বানানো হলেও প্রচন্ড ভারে পাহাড়টি কখনোই ধ্বসে পড়েনি! চেন কাছাকাছি আরেকটি পাথুরে ধনুকাকৃতির সাঁকোর কথাও ভাবলেন, যেটার অবস্থা এখনো বেশ ভালো, অথচ তিন চার পুরুষ ধরে গ্রামবাসী সেটি ব্যবহার করছে, এবং ভারী জিনিসপত্র পার করছে। চেনের মাথায় প্রশ্ন এলো, গুহার ছাদের মতো ধনুকাকৃতির সাঁকোটিও কিভাবে অত ভার ধরে রাখে? হ্যাঁ, দুটোইতে ধনুকাকৃতির খিলান, ফলে যতই চাপ পড়ে ততই পাথর সন্নিবিষ্ট হয়। পরক্ষণে চেনের মনে হলো, নেকড়ের ডেরা গিরিখাতেও এই ধনুকাকৃতি খিলানের কৌশল খাটানো যায়! যাতে পাহাড়ি বন্যার পানি বাঁধের উপর যত বেশি চাপ তৈরি করবে, বাঁধের পাথর সন্নিবিষ্ট হয়ে ততই প্রতিরোধ তৈরি করবে।

পরের দিন খোশ মেজাজে চেন গ্রামবাসী গরিব ও নিন্মমধ্য কৃষকদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে নেমে পড়লো। সবাই চেনের বুদ্ধির প্রসংসা করে নতুন পরিকল্পনায় সমর্থন দিলো, এবং নানান কিছিমের পরামর্শ যোগ করলো। এবং সর্বশেষ আলোচনায় উঠে এলো, শুধু ধনুকাকৃতির পাথুরে বাঁধ করলেই হবেনা, তার নীচে একটা করে খাদও করতে হবে। এ খাদগুলো উপর থেকে গড়িয়ে পড়া পানি ধরে রাখবে, এবং কিছুক্ষন পর খাদগুলো ভরে গেলেই শুধু নীচের দিকে পানি প্রবাহিত হবে আবার। ফলে স্রোতের বেগ কমে যাবে।

১৯৫৭ সালের শীতকালে নেকড়ের ডেরার বিরুদ্ধে তৃতীয় যুদ্ধ শুরু হলো। কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্যরা এই কাজে নেতৃত্বের ভূমিকা নিলো এবং গরীব ও মধ্য কৃষকরা থাকলো অগ্রভাগে। গ্রামবাসী এই বলে অঙ্গীকার করলো যে, “আমরা নেকড়ের কাছ থেকে সমস্ত নখদন্ত খুলে নেবো!” যদিও এসময় তাচাইয়ে পার্টির মাত্র ষাট জন সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলো, কিন্তু নেকড়ের ডেরা জয়ের সংগ্রামে যোগ দিলো দেড়শো মানুষ। এদের মধ্যে সতেরোটি দম্পতি ছাড়াও সাতটি পরিবারের সব সদস্যরাই যোগ দিলো। অতীতে গ্রীষ্মকালে ক্ষেতে খাবার পাঠানোর রেওয়াজ ছিলো, কিন্তু এখন ভয়ানক শীতেও মানুষ কাজের জায়গায় বসেই খেলো।

পাথরে খাঁজ কাটা সবচেয়ে কষ্টসাধ্য কাজ! তা সত্বেও তাচাইয়ের সবচেয়ে বয়স্ক কমিউনিষ্ট চিয়া চিনসাই, খাঁজ কাটার কাজে লেগে গেলেন। যিনি বিশ্রাম না নিয়ে হাসিমুখে একটানা অন্তত একশো বার ১৯ কেজি ওজনের ভারী হাতুড়ি দিয়ে পাথরের গায়ে আঘাত করতে লাগলেন। তীব্র শীতের প্রকোপে তার হাতের চামড়া ক্ষতবিক্ষত। হাতুড়ি চালানোর সময় মাঝে মাঝে তার বুড়ো আঙ্গুলের পর্দা ছিঁড়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তবুও তিনি কাজ ছাড়লেন না, একটানা খেটে গেছেন, সবমিলিয়ে তার বিপ্লবী উদ্দীপনা বেশ উঁচু পর্যায়ের প্রতীয়মান হলো। এক রাতে খুব বরফ পড়লো! পরেরদিন যথারীতি খুব ভোরে ঝাঁড়ু ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে তিনি কাজে যোগ দিতে গেলেন। সূর্য্য উঠলে জনৈক সদস্য চিয়া চিন সাইয়ের জন্য খাবার নিয়ে এলেন। খাবারগুলো ঠান্ডায় জমে গেছে ততক্ষণে। কিন্তু সাই কোন অভিযোগ না করে দ্রুতই সেগুলো খেতে লাগলেন! পাশ থেকে জনৈক সদস্য বললেন, “একটু আগুন জ্বেলে খাবারটুকু কেন গরম করে নিচ্ছোনা হে বাপু?” চিন সাই জবাব দিলেন, “আমার জন্মকর্ম কষ্টের মধ্যে, এখন সমাজতন্ত্র গড়ার লড়াইয়ে এসে আমার অতশত সুখের প্রয়োজন নেই।” সাইয়ের জবাবে জনৈক কর্মী অভিভূত হয়ে বললেন, “বুড়ো সাই, তুমি মরে গেলে আমরা তোমার নামে স্মারকস্তম্ভ গড়ে তুলবো!” এবার চিয়া ভেংচি কেটে বললেন, “আমরা কমিউনিষ্টরা ব্যক্তি স্বার্থ কিংবা যশ এর জন্য লড়ছি না, নেকড়ের ডেরা গিরিখাতের সমস্ত বাঁধ এবং অভাবঅনটনমুক্ত সমাজই হবে আমাদের স্মারকস্তম্ভ! তবে আরেকটার কেন দরকার!” সাই পুনরায় কাজে যোগ দিলেন।

শীতকালে গ্রামবাসীর কঠিন পরিশ্রমের ফলে অবশেষে নেকড়ের ডেরা গিরিখাতকে বাগে আনা গেলো। ইস্পাতের দেয়ালের মতো ত্রিশটি বাঁধ দেওয়া হলো। ১৯৬৩ সালে অভূতপূর্ব এবং ভয়ঙ্কর বন্যায় গ্রামের অন্যান্য বাঁধগুলো পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেলেও গ্রামবাসীর যৌথ শ্রমের স্মারক হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো নেকড়ের ডেরা গিরিখাতের বাঁধগুলো। বন্যায় ভেসে আসা পাহাড়ি পলিমাটি গিরিখাতে জমে সর্বনাশা গিরিখাত রূপান্তরিত হলো উর্বর শষ্যক্ষেতে। এতে শুধুমাত্র চমৎকার ফসল হলো তা নয়, বরঞ্চ এ সাফল্য তাচাইয়ের মানুষকে ক্রমাগত সমাজতন্ত্র গড়ার লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলো। নেকড়ের ডেরাকে রূপান্তরিত করার তিনটি যুদ্ধ তাচাইয়ের মানুষকে এ শিক্ষা দিলো যে, “সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সঙ্গতি রেখে অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামও শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হয়, এবং তাতে বিজয়ও সুনিশ্চিত হয়।”

১৯৬২ সালে তাচাইয়ের মানুষ জমি নির্মাণ ও উন্নয়নের দশসালা কর্মসূচি সফলভাবে পূর্ণ করেন। “এই এক দশক সময়ে তারা একশো আশিটি পাথুরে বাঁধ নির্মাণ করে, একলক্ষ ত্রিশ হাজার কিউবিক মিটার পাথুরে খাদ কেটেছে। যাতে প্রতি বছর গড়ে একজন শ্রমিক সতেরশো ষাট ঝুড়ি পাথর বহন করেছে। মূল ফসলি জমি তৈরিতে দুলক্ষ দশ হাজার শ্রমদিবস ব্যয়িত হয়েছে। যাতে গড়ে একজন শ্রমিকের মাথাপিছু লেগেছে একশো বিশ শ্রম দিবস। বিগ্রেডের সমস্ত জমিরই উন্নয়ন হয়েছে, ভাঙ্গাচোরা চার হাজার সাতশো ভূখন্ডকে (যেগুলো তিনবার ভেসে যাওয়া জমি বলে পরিচিত ছিলো) দুই হাজার নয়শোটি সমান বিন্যস্ত জমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে যেগুলোকে আরো বিন্যস্ত করে মাত্র সতেরশোটি জমিতে রূপান্তরিত করা হয়। যাতে বন্যা বা খরা হলেও ভালো ফসল পাওয়া যায়। সবমিলিয়ে তাচাইয়ে মুখশ্রীর যুগান্তকারী পরিবর্তন হয়ে যায় মাত্র এক দশকে।

তাচাইয়ের পরিসংখ্যান ১৯৫৩ সালে সমবায় প্রতিষ্ঠার পরের বছর তাচাইয়ের ৭৪টি পরিবারের ২৯৫ জন জনসংখ্যার বিপরীতে মোট ফসল উৎপাদন হয় ১ লক্ষ ১ হাজার কেজি। যা স্থানীয় হিসেবে প্রতি ‘মু’ তে ১২৫ কেজি (এক ‘মু’ সমান ১/১৫ হেক্টর বা ১/৬ একর পরিমাণ)। এবং সরকারের কাছে ফসল বিক্রি বাবধ সমবায়ের আয় ১৭ হাজার ইউয়ান।

দশ বছর পর ১৯৬৩ সালে ভয়ঙ্কর বন্যার বছর ৮৩টি পরিবারের ৩৬৭ জন জনসংখ্যার বিপরীতে মোট ফসল উৎপাদন ২ লাখ ১০ হাজার কেজি। স্থানীয় হিসেবে প্রতি মুতে ৩৭২ কেজি। সরকারের কাছে ফসল বিক্রি বাবধ সমবায়ের আয় ৬৫ হাজার ইউয়ান।

আরো দশ বছর পর ১৯৭৩ সালে খরার বছর ৮৩টি পরিবারের ৪৪৮ জন জনসংখ্যার বিপরীতে মোট ফসল উৎপাদন প্রায় ৪ লাখ কেজি। প্রতি মুতে উৎপাদন ৫১৩ কেজি। সরকারের কাছে ফসল বিক্রি বাবধ সমবায়ের আয় ১লাখ ৮২ হাজার ইউয়ান।

mao-poster-1রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় ছোট জমিগুলোকে যেমন বড় ও সমভূমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে, তেমনি তাচাইয়ের সাতটি গিরিখাতের চারটিকে রূপান্তরিত করা হয়েছে আবাদি জমিতে। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৪ সালেই মূলত গিরিখাতগুলোর অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হয়। এসময় তাচাইয়ে দ্রুত গতিতে চলা বৈদ্যুতিক পরিবহন কেবলহপার (তারে চলা পরিবহণ বিশেষ) স্থাপন করা হয়। যা দুই পাহাড়ের মাঝে যোগাযোগ ও পরিবহণ সহজ থেকে সহজতর করে তুলে। ১৯৬৭সাল থেকে ১৯৭১ সালে এ ধরণের পাঁচটি কেবল পথ তৈরি করা হয়, ফলে বছরে দশ হাজার শ্রমদিবস সাশ্রয় হয় গ্রামবাসীর। এর মধ্যে বন তৈরির কাজও এগিয়েছে সমানতালে। পাহাড়ের চূড়ায় চারশো মুর জায়গা জুড়ে তখন ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিলো তরুণ পাইন গাছ। মাঝপথে পাহাড়টি ফলের বাগানে সজ্জিত রঙধনুর আকারে। যার মধ্যে রয়েছে আপেল, নাশপাতি, পীচ, খেজুর, আখরোট, বুনো পিপুল ও আঙুরের ৩৭ হাজার গাছগাছালি। যা থেকে ১৯৭৩ সালে ২৫ হাজার কেজির মতো ফল আহরণ করে সমবায়। অথ্যাৎ পরিবার প্রতি তিনশো কেজি! এছাড়া সমবায় পশু পালনেও অর্জন করেছিলো বিরাট সাফল্য।

সবমিলিয়ে তাচাইয়ের সমস্ত কিছু পরিবর্তন হয়ে যায় মাত্র দুতিন দশকে। তাচাইয়ে শেষের সময়টিতে ‘কেবল কার’এ চড়ে স্কুল ফেরত বালক বালিকারা সমস্বরে গাইতো, “দাঁড়িয়ে পাহাড়ে বাঘ, মাথার মুখোমুখি হই উদিত সুর্য্যের, গুণগান গাই সভাপতি মাওএর, যিনি আমাদের রক্ষাকারী তারকা গুণগান গাই, মহান কমিউনিষ্ট পার্টির” পূর্বে যা ছিলো – “নেকড়ের ডেরা গিরিখাতে আছে তিন তিন শয়তান : ঢল, পর্বত আর নেকড়ের ক্ষুধা, শুকনো মৌসুমে গজায়না একটাও ঘাস বর্ষায় নামে শুধু মহা সর্বনাশ।”

———————————

[বি.দ্র: মূল গল্পের (তাচাই একটি লাল নিশান) একাংশ তুলে দেওয়া হলো। এক্ষেত্রে মূল ঘটনা ঠিক রেখে শব্দগত ও বাক্যে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে মাত্র। আশা করি, এতে কোন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবেনা। এবং কেউ এটাকে মূল গল্পের সারাংশ মনে করবেনা। মূলত তাচাইয়ের ইতিহাস আরো ব্যাপক, সাফল্য আরো বিস্তৃত, মূল লড়াই আরো উদ্দীপনাময়। তাচাই সম্পর্কে মাও সেতুঙ বলেছিলেন, “কৃষির ক্ষেত্রে তাচাই থেকে শেখো।” তাই পুনরায় আশা করছি, মাওএর বক্তব্যের যথার্থতা অনুধাবন করে উপরিউক্ত খন্ডাংশ পাঠের মাধ্যমে পাঠক তাচাইয়ের ইতিহাসের প্রতি মনোযোগী হবেন। এবং মূল গল্প ও সমাজতন্ত্র নির্মাণের লড়াইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠবেন। আনোয়ার হোসাইন ফার্মার]

————————————

মূল গল্প: তাচাই একটি লাল নিশান

লেখক: ওয়েন ইন / লিয়াং হুয়া। প্রকাশক: উৎস পাবলিশার্স, ২০০৫।

প্রকাশকের কথা: চীনে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার পর চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে সারা দেশব্যাপী শুরু হয় সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের কাজ। এর অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ছিলো কৃষির সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর। “তাচাই একটি লাল নিশান” হচ্ছে গণচীনের তাচাই নামক গণকমিউনে কৃষির সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের ঐতিহাসিক এক জীবন্ত চিত্র। তাচাই গণকমিউনিটি ছিলো চীনের শানসি প্রদেশের সিয়াং কাউন্টির তাইহাং পর্বতমালায়। কমিউনের নামানুসারে উৎপাদন ব্রিগেডের নাম হয়েছিলো তাচাই উৎপাদন ব্রিগেড। (সংক্ষেপিত)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s