একুশে আগস্টের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় :: বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার প্রশ্নে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবার সেই দিন

Posted: অগাষ্ট 21, 2014 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

লিখেছেন: বাধন অধিকারী

21-august-2007-procession২০০৭ এর আগস্টে সেনাকর্পোরেট জরুরিক্ষমতার সরকারের কালে সংঘটিত ছাত্র বিক্ষোভের পর এইবার দিয়ে চতুর্থবারের মতো ২০২১২২ তারিখ উদযাপিত হচ্ছে। কিন্তু যে প্রশ্নকে সামনে রেখে আমরা কিছু শিক্ষকশিক্ষার্থী সেনাকর্পোরেট কর্তৃত্বের মহাজরুরি ক্ষমতার সেই সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলাম; বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার সেই প্রশ্নটিকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাসদস্য কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনাকে আমরা নিছক একটি নির্যাতনের ঘটনা হিসেবে দেখিনি। একে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় জরুরি ক্ষমতার অন্যায্য হস্তক্ষেপ বিবেচনা করেছি। সুমহান জনযুদ্ধের ৭১’এর প্রেরণায় স্বাধীন বাংলাদেশে যে জনমত ছিল;সেই জনমত বঙ্গবন্ধুর সরকারের কাছে থেকে আদায় করে নেয় ৭৩’এর অধ্যাদেশ; বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের দলিল। সেই অধ্যাদেশের প্রেরণাটুকুকে উপজীব্য করে আমরা ক’জন মাত্র শিক্ষকশিক্ষার্থী (পরে আরও ক’জন যুক্ত হয়েছিল। সবমিলে মোটামোটি ৮০ জন ছিলাম) মৌন মিছিলে দাঁড়িয়েছিলাম।

খুব দ্রুততম সময়ে বাঁশপাতা কাগজে মার্কার দিয়ে চারুকলার বন্ধু রাজন লিখেছিল ব্যানার, সেটা আলপিন দিয়ে সেঁটে দেয়া হয়েছিল একটা সবুজ কাপড়ে। ওই ব্যানারে আমরা ছোট করে লিখেছিলাম; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর হামলা রুখে দাড়াও। আর অনেক বড় করে লিখেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না। ব্যানারের টেক্সটটা প্রস্তাব করেছিলেন শিক্ষকবন্ধু সেলিম রেজা নিউটন। আর তার চেম্বারে উপস্থিত আমিপার্থ (আরও ২/১ জন ছিল কিনা আমার ঠিক মনে নেই আর কেউ তখনও আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে কিনা)তাতে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলাম। মিছিল সংঘটিত হবার ঘটনাটি খুব আকষ্মিক ছিল না চরিত্রের দিক থেকে। সেনা কর্পোরেট কর্তৃত্বের ঐ মহাজরুরি ক্ষমতার কালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর কোন অস্তিত্ব, কোন চিহ্ন ছিল না;প্রতিবাদ তো দূরের কথা! ঐ সময়ে আমরা ভরসা করতে পেরেছিলাম একমাত্র সেলিম রেজা নিউটনকে।

জরুরি ক্ষমতার ঐ সরকার নিয়ে একরকম দিশেহারা অবস্থায় অভীপ্সা পত্রিকার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। আসলে জানতে গিয়েছিলাম তার কাছে, পুরো পরিস্থিতিটাকে উনি কিভাবে দেখছেন এবং কী করার কথা ভাবছেন। সেই সাক্ষাতকারে এই অন্যায্য ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিজের সুস্পষ্ট অবস্থান জানান দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন; এই অন্যায্যতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি আছেন। তাই তাঁর দিক থেকে নেমে পড়বার সিদ্ধান্ত আর আমাদের দিক থেকে (পার্থপ্রীতুমামুনরাজীবসায়েম ভাইতাইসিনরাজনআমি) নেমে পড়বার সিদ্ধান্তের ঐক্যে তার প্রেরণায় আরও ৩ জন শিক্ষক এবং আমাদের তরফে আরও ক’জন শিক্ষার্থী যুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষার দাবি নিয়ে আমরা আসলে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম জরুরি ক্ষমতার সরকারকে যে তাদেরকে আমরা মানি না। আমরা তাদের অস্বীকার করি!

আমাদের তরফে আমরা বলতে চেয়েছিলাম, রাষ্ট্র জরুরি আইন জারি করে সব মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা আমরা মানব না। আমরা স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রীয় আইন মানতে বাধ্য নই। এই জরুরি আইন আমরা অন্যায্য মনে করি। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেক এই আইন মানতে বাধ্য নয়!অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বিক্ষোভজনিত আন্দোলনের স্বাতন্ত্র্য ছিল এখানেই। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনা সদস্য কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতনের উছিলায় আমরা শিক্ষকশিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সাথে সঙ্গতি রেখে, ৭৩এর অধ্যাদেশের মর্মবাণীকে মাথায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেক নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে ছাত্র শিক্ষক মুক্তির আন্দোলনে সেই আমরাই; মানে আমিটিটোতুষারতূর্যপার্থপ্রীতুমামুনবর্ণাজেরিনজহিরমুকুটবাবুসুমনদীপ্তির সাথে ম্যানেজমেন্টমার্কেটিংপাবলিক এ্যাডের বন্ধুদের ঐক্যে আমরা কর্তৃত্ববিরেধী শিক্ষার্থীবৃন্দ নামে প্লাটফর্ম গড়ে তুলেছিলাম। প্রতিদিন ছাত্রশিক্ষকমুক্তির নাম করে আসলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তির প্রশ্নটিকেই বারবার সামনে এনেছি। তীতুমীরের বাশের কেল্লা, প্রীতিলতার আত্মাহুতির আগুন, ভাষা শহীদের রক্ত,জনযুদ্ধের বীর নারীর গর্ভসহ ইতিহাসের যাবতীয় মুক্তিপরায়ন ইতিহাসের প্রতি অঙ্গীকারের শপথ নিয়ে শুরু হয়েছিল কর্তৃত্ব বিরোধী মঞ্চ নামের একটা ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্রবিহীন প্লাটফর্মের যাত্রা। ‘বিবেকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না’ ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টনমেন্ট নয়, মুক্ত চিন্তার জমিন’ ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ কর’ এইসব শ্লোগানে মুখরিত হতো গোটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

একুশে আগস্ট উদযাপন করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্বাধীনতার প্রশ্ন আজ আলোচিত হয় না, আমরা যারা এই আন্দোলন করেছি, যারা সংগঠিত করেছি সেই তারা কেউ উদযাপনের সাথে নেই!যে যে যার যার যাপনবাস্তবতায় আছি!প্রগতিশীল মাস্টারদের আর প্রগতিশীল ছাত্রদের সংগঠনগুলা আজ একুশে আগস্ট উদযাপন করে; নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস, কালো দিবস আরও কি কি সব নাম দিয়ে। আমরা যারা একুশে আগস্ট রচনা করেছিলাম,আমরা যারা কর্তৃত্ববিরেধী প্লাটফর্ম গড়ে তুলে ছাত্র শিক্ষকদের মুক্ত করেছিলাম; সেই তারা পারিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে! এ আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতায় আমার ব্যক্তিগত দায়দায়িত্বটুকু আমি এড়াতে পারি না।

বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করতে গেলে যে যাবতীয় বাইরের কর্তৃত্বের বাইরে আসতে হবে সম্পূর্ণভাবে; এটাই ছিল আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের মূল প্রেরণা। দর্শনগত জায়গা। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব আর বাজারের হস্তক্ষেপমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছিলাম আমরা, সংগ্রাম করেছিলাম তার জন্য। কিন্তু ৭৩এর অধ্যাদেশ শিক্ষকশিক্ষার্থীদের স্বাধীনতার যতটুকু নিশ্চয়তা বিধান করেছিল, তা দিয়ে আগস্টের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঠেকানো যায়নি। অধ্যাদেশের সংস্কার করে তাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা আদায় করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকশিক্ষার্থীদেরই। তিনজনের প্যানেল থেকে ভিসি নিয়োগ দেওয়ার যে সুযোগ রাষ্ট্রপতির হাতে। সেই ভিসি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভগবানসম ক্ষমতার অধিকারী। ৭৩’এর অধ্যাদেশের মূল প্রেরণাকে উপেক্ষা করে আমরা বিশ্বিদ্যালয়ের লোকজনেরাই উপাচার্য পদটিকে ভগবানসুলভ করেছি।

৭৩এর অধ্যাদেশে রাষ্ট্রের হাত থেকে স্বশাসিত হবার অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষকদের এবং আমাদের মানে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন থাকবার কথা ছিল। কিন্তু কোথায় স্বাধীনতা? অভ্যন্তরীণ ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্র তো চাইনি আমরা। ভিসির স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার যাতাকলে পিষ্ট হতে চাইনি। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিচালনকাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাববার আছে বৈকি! রাষ্ট্রের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে এখানে আমরা একটা মিনি রাষ্ট্র বানিয়েছি; যে রাষ্ট্রে ভাইস চ্যান্সেলর হলো স্বৈরতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট। একক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ। এটা কি করে সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষা করবে? আবার এই মিনি রাষ্ট্রে থাকে বড় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ! রাষ্ট্রের নিয়োগকৃত ভিসি যখন ভগবানের মতো বিশ্ববিদ্যালয় চালায় তখন এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ঢুকে পড়ে। তাই অভ্যন্তীণ কাঠামোকে ৭৩’এর অধ্যাদেশের মূল চেতনার সাথে একীভূত করতে অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে গণতান্ত্রিক করবার ব্যাপারে আমাদের আজ থেকেই ভাবা দরকার। এই জায়গায় পরিবর্তন দরকার। দরকার অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ববাদী পরিচালন ব্যবস্থার অবসান। লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি নয়, আবার ছাত্ররাজনীতি বন্ধের নামে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন তৎপরতা বন্ধের পাঁয়তারাও নয়, দরকার শিক্ষকশিক্ষার্থীদের স্বাধীন সংগঠন। দরকার বাজার মোকাবিলা। বাজার কখনও নেসক্যাফে হয়ে, কখনও সুন্দরী প্রতিযোগিতা হয়ে, কখনও নাইট কোর্স হয়ে, কখনও নতুন সাবজেক্ট হয়ে কখনও বিশ্ব ব্যাংকের হিকাপ নামের প্রজেক্ট হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমাগত দখল কায়েম করছে। মধ্য আয়ের সন্তানরাও হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও পরিণত হচ্ছে বড়লোকের শিক্ষাক্রয়ের প্রতিষ্ঠানে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষা মানে রাষ্ট্র এবং বাজারের হাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করা।

এটা ঠিক যে গোটা সমাজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিচ্ছিন্ন করে মঙ্গলকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা মুশকিল। কিন্তু সাথে সাথে এটাও ঠিক, শুরু করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই এবং ব্যর্থতাগুলোকে অতিক্রম করেই!

২১ আগস্ট ২০১১

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s