সাম্রাজ্যবাদী গণহত্যা ও বর্বরতার ধারাবাহিকতায় গাজায় আবার শুরু হয়েছে মার্কিন মদতে ইজরায়েলি আগ্রাসন

Posted: অগাষ্ট 17, 2014 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: গুরুপ্রসাদ কর

gaza-35গাজায় আবার ইজরায়েলের বর্বর বিমান হানা শুরু হয়েছে। মৃত্যু মিছিল অব্যাহত। গত ৫ দিনে প্রায় ১৪০ জন মানুষ মারা গেছেন, হাজারেরও বেশি মানুষ আহত। আতঙ্ক সৃষ্টি করতে বেছে বেছে স্বাস্থকেন্দ্র ও মসজিদে বিমান হানা চলছে। আহত মানুষেরা যাতে চিকিৎসা না পেতে পারে তার জন্য ৭০%-এর বেশি অ্যাম্বুলেন্স ধ্বংস করা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্থলপথে ও জলপথে আক্রমণের জোর প্রস্তুতি চলছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে ২৭শে ডিসেম্বর থেকে মার্কিন সরকারের সরবরাহ করা বিমান, ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে ইজরায়েলি হানাদারেরা গাজায় যে ভয়ঙ্কর আক্রমণ শুরু করেছিল, তাতেও দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যাদের মধ্যে আবার মহিলা ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। ঐ বছর ২৭ ডিসেম্বর মাঝ বেলায় হঠাৎ গাজার আকাশে মার্কিনের সরবরাহ করা এক ঝাঁক যুদ্ধ বিমান আকাশে উড়তে দেখা গেলো। মার্কিনের সরবরাহ করা এফ১৬ যুদ্ধ বিমান ও অ্যাপাচে হেলিকপ্টার থেকে যে ভয়ঙ্কর আক্রমণ শুরু হয়, তা মার্কিন মদতেই ঘটে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। ২৪ ঘন্টার মধ্যেই গাজায় ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছিল।

অধিকৃত অঞ্চলের একটি সুপরিচিত সংগঠন (B’Tselem) জানাচ্ছে যে, ২০০০ সাল থেকে আজ অবধি ইজরায়েলি সেনার হাতে ৬৭৫০ জন প্যালেস্টাইন নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩৮০ জনই শিশু! একই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ১৯৬৭ সাল থেকে আজ আবধি ২৯ হাজার সাধার মানুষের বাড়ি তারা ধ্বংস করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার প্রথমবার নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন, “কেউ যদি আমার বাড়িতে রাতে রকেট নিক্ষেপ করে যেখানে আামার দুই মেয়ে ঘুমাচ্ছে, তা হলে সেটা থামাতে আমার সাধ্যের মধ্যে যা আছে আমি সব করবো।” আসলে বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবার জন্য নিজেকে উপযুক্ত করে তুলেছেন। আর তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছেন তার কার তিনি আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলো মানুষসহ বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন না, প্রতিনিধিত্ব করেন মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির আর তাই এই পুঁজির স্বার্থে যে আগ্রাসী মার্কিন নীতি বলব রয়েছে, তাকেই তিনি এগিয়ে নিয়ে যাবেন এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

১৯৬৭ সাল থেকে ইজরায়েল গাজাকে চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ করে সেখানকার জনগণকে যে করু অবস্থার মধ্যে থাকতে বাধ্য করছে তা ইহুদিদের উপর নৎসীদের জঘন্য অত্যাচারের কথা মনে করিয়ে দেয়। গাজার ৮০% অধিবাসী দারিদ্র সীমার নীচে বাস করে। সেখানকার ৯৭% কারখানা ও ফ্যাক্টরী অচল থাকে । ৫০% মানুষ বেকার। ২০০৬ সালে ইজরায়েলি আগ্রসনকরীরা গাজার একটিমাত্র বিদ্যু কেন্দ্রটিকেও গুঁড়িয়ে দিয়েছে। পানীয় জলের সঙ্কট ভয়াবহ। আর ইজরায়েলি বাহিনীর অবরোধে সেখানে জীবনদায়ী ঔষধ মেলা ভার। গাজার এই অবস্থাটিকে অনেকেই নৎসীদের গ্যাস চেম্বারের সাথে তুলনা করেছেন, যে গ্যাস চেম্বারে হিটলারের বাহিনী ইহুদিদের বন্দি করে রেখেছিল।

যদিও প্যালেষ্টাইনের জনগণের উপর এবারের এই আক্রমণ বিরাট ভয়াবহ, কিন্তু এই ধরনের আক্রমণ সেই ৪৬ সাল থেকেই চলে আসছে। আর প্রতিবার আক্রমণ চালিয়ে ইজরায়েল এত মানুষকে হত্যা ও বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছে, ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। কিন্তু এই আক্রমণের কার ও প্যালেস্টাইনের মানুষের স্বাধীনতার লড়া বুঝতে হলে সংক্ষেপে আমাদের ইজরায়েল রাষ্ট্র গড়ে উঠার ইতিহাসটা দেখে নিতে হবে যে ইতিহাসকে খালি মার্কিন ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই নয়, আমাদের সরকার ও বড় গণমাধ্যমগুলিও চেপে রাখার চেষ্ট করে।

আসুন, প্রকৃত সত্যকে জানি

gaza-57মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশ তাদের প্রচারযন্ত্রকে ব্যবহার করে অন্যান্য বিষয়ের মতোই প্যালেস্টাইন অঞ্চলে ইজরায়েল রাষ্ট্রের উদ্ভব সম্পর্কে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে আসছে। তাই আসুন, আমরা এই মিথ্যার জালকে ছিন্ন করি। ইজরায়েল রাষ্ট্রের মদতকারীরা বরাবর এই প্রচার চালিয়ে আসছে যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের মুল সমস্যা হলো প্যালেস্টাইনিয় জনগ ইজরায়েল রাষ্টটিকে সহ্য করতে পারে না। বাস্তবে তথ্যকে বিকৃত করে দেখানোর চেষ্ট করা হয় যে, স্বাধীন ভুমির জন্য ঐ অঞ্চলের অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই ইহুদি জনগ ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।

আসলে বিংশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাস করতেন। অনেক দেশেই তারা ছিলেন পুঁজিবাদী শাসকদের অত্যাচার ও বৈষম্যের শিকার। একই সাথে এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ বিপ্লবী ও অন্যান্য প্রগতিশীল আন্দোলেনের সাথে যুক্ত ছিলেন। আর এই ধারার বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের প্রত্যক্ষ মদতে এই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে এক সঙ্কীর্ণ উগ্র ইহুদিবাদের জন্ম হয়েছিল। এই ধারার প্রবক্তারা প্যালেস্টাইন অঞ্চলে ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনের স্বপ্ন দেখাতো যেখানে ঐ অঞ্চলে বসবাসকরী ইহুদিদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। এই ধারার এক প্রথম সারীর প্রবক্তা, থিওডর হার্জল বলেছিলেন, “এশীয়বাসীদের বিরুদ্ধে ইউরোপের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্যালেস্টাইন অঞ্চলে আমরা এমন একটি কেন্দ্র গড়ে তুলবো, যা বর্বরতার হাত থেকে সভ্য জগতকে রক্ষা করবার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।”

গত দু’হাজার বছরের ইতিহাসে প্যালেস্টাইন অঞ্চলে ইহুদি সম্প্রদায় কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। সুদূর অতীতে (প্রথম শতাব্দির ৭০ দশক নাগাদ) রোম সাম্রাজ্যের কাছে প্যালেস্টাইনের শেষ ইহুদি রাজত্বের পতনের পর এই অঞ্চলের ইহুদিরা ইউরোপ সহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯১৮ সালেও যদি প্রকৃত হিসাব নেওয়া হয় তা হলে দেখা যায় যে, প্যালেস্টাইন অঞ্চলে প্যালেস্টাইনি অধিবাসীর সংখ্যা ৬ লক্ষ ৮০ হাজার, যেখানে ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা ৫৬ হাজার। প্যালেস্টাইনিয় মানুষ ঐ অঞ্চলের ৯৭ শতাংশ জুড়ে বাস করতেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অন্য পরিকল্পনা ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আটোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস হলে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্যালেস্টাইন সহ এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত অঞ্চলগুলির পর আধিপত্য তৈরী করবার চেষ্ট করে। আর এই অঞ্চলগুলি তাদের কাছে লোভনীয় ছিল, কারণ ততদিনে খনিজ তেল অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের বিশেষ সম্পদ। ব্রিটেন তখন হিসেব করেছিল যে দক্ষিন আফ্রিকার মতো প্যালেস্টাইন অঞ্চলেও যদি ইহুদি জঙ্গীবাদীদের একটি রাষ্ট্র তৈরী করা যায়, তা হলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভুত্ব বজায় রাখার কাজটি সহজসাধ্য হবে। ব্রিটেনের আরও একটি লক্ষ্য ছিল, যাতে সদ্য গঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ইহুদি সম্প্রদায়ের সমর্থন না পায় সেটা সুনিশ্চিত করা। আর এই লক্ষ্যে সেই ১৯২২ সাল থেকেই ব্রিটিশ এই অঞ্চলে বসবাসের জন্য বাইরের ইহুদিদের মদত করে চলে

gaza-58ব্রিটিশ মদতে প্যালেস্টাইন অঞ্চলে এইভাবে ইহুদি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনের মানুষও সংগ্রাম গড়ে তোলে। ১৯৩৬ সালে এখানে বৃটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়া শুরু হয়, যা বৃটিশ ১৯৩৯ সালে নির্মমভাবে দমন করে। সেই সময় জঙ্গি ইহুদিবাদী এক নেতা লিখেছিলেন, “আমরা যেন নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে এই সত্যকে ভুলে না যায় যে, রাজনৈতিকভাবে আমরা হচ্ছি আগ্রাসক আর তারা (প্যালেস্টাইনিয় জনগ) নিজেদের অধিকারের পক্ষে লড়ায় করছে। ……দেশটা হচ্ছে তাদের, কার তারাই এখানকার বাসিন্দা যেখানে আমরা এখানে বাইরে থেকে এসে বসতি স্থাপন করতে চাই, আর তার ফলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, আমরা তাদের দেশ কেড়ে নিতে চাইছি।” ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বৃটেন ও তার সহযোগী মার্কিন সরকার তাদের নিজেদের দেশে ইহুদিদের খুব বেশি ঢোকার সুযোগ দেয় নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি আক্রমণে ইউরোপে যখন ইহুদিরা বিপর্যস্ত হয়ে আশ্রয়ের খোঁজ করছে, তখন কৌশলে তাদের প্যালেস্টাইন অঞ্চলে বসতি স্থাপনের জন্য মদত করা হয়।

দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়, আর তাই স্বাভাবিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যও সে বৃটিশকে টপকে তার নিজের অধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে রাষ্ট্রসংঘ প্যালেস্টাইন অঞ্চলকে দু টুকরো করে ইজরায়েল রাষ্ট্র ও একটি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবার এ প্রস্তাব পাশ করা হয়। তখন পর্যন্তও এই অঞ্চলে প্যালেস্টাইনিয় জনগনের সংখ্যা ইহুদিদের তুলনায় ছিল দ্বিগুন এবং তারাই ঐ অঞ্চলের ৯২% জায়গা জুড়ে বসবাস করতো। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবে ইজরায়েলকে ৫৪% অঞ্চল দিয়ে দেয়া হয়।

আরব দেশগুলি রাষ্ট্রসংঘের এই প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকার করলে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে, ইহুদি জঙ্গীবাদীরা ইজরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম ঘোষণা করে প্যালেস্টাইনি মানুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। দার ইয়াসিন গ্রামে ইজরায়েলি হানাদারেরা ২৫০ জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে যার মধ্যে ১০০ জন ছিল নারী ও শিশু। ইজরায়েলি বাহিনী প্যালেস্টাইনিয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায়, আর তার ফলে প্রচুর মানুষ ঘরবাড়ী ছেড়ে পালায়। ১৯৪৯ সালে যুদ্ধ শেষ হলে দেখা যায় যে, প্যালেস্টাইনিয় জনগণেদুইতৃতীয়াংশ, তথা ৮ লক্ষ মানুষ নিজভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে লেবানন, র্ডা, সিরিয়া, গাজা এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ইজরায়েল ঐ অঞ্চলের প্রায় ৭৭% জমি দখল করে নিয়েছে।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইজরায়েল পরিকল্পিতভাবে প্যালেস্টাইনিয় সমাজ তথা তাদের গ্রাম, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সামাজিক পরিকাঠামো ধ্বংস করার পরিকল্পনা গ্রহ করে। ১৯৮৮ সাল নাগাদ দেখা যায় যে, ১৯৪৮ সালের সীমানা অনুযায়ী যে অঞ্চল প্যালেস্টাইনিয়দের হাতে ছিল সেই অঞ্চলের মোট ৪৭৫টি গ্রামের মধ্যে ৩৮৫টি ইজরায়েল ধ্বংস করে ফেলেছে। ইজরায়েলি নেতা মোসে দায়ান স্বীকার করে বলেছিল, “এমন একটি ইহুদি গ্রাম নেই, যা প্যালেস্টাইনিয় গ্রামকে ধ্বংস করে তৈরি করা হয় নি।”

gaza-59১৯৬৭ সালে মার্কিনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইজরায়েল আরও অঞ্চল দখল করতে ও নিজেকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ৬ দি ধরে আরব দুনিয়ার বিরুদ্ধে এক বিভৎস আক্রমণ চালায়। এই আগ্রাসী যুদ্ধে ইজরায়েল ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইনের বাকী ২৩% অঞ্চল অর্থাৎ ওয়েস্ট ব্যাংক, গাজা, পুর্ব জেরুজালেমের সাথে সিরিয়ার গোলান হাইট ও মিশরের সিনাই পেনিনসুলা দখল করে নেয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর রাষ্ট্রসংঘে ২৪২ নং যে প্রস্তাব গৃহিত হয়, তাতে ইজরায়েলকে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখলীকৃত অঞ্চল ফিরিয়ে দেবার কথা বলা হয় এবং তার পরিবর্তে আরব রাষ্ট্রগুলিকে ইজরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবার কথা বলা হয়। ইজরায়েল দখলীকৃত অঞ্চলগুলি থেকে সরে আসার বদলে সেখানে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সামরিক ঘাঁটি ও ইহুদি বসতি স্থাপনের কাজ চালিয়ে যায়। সেই থেকে গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে প্যালেস্টাইনিয় মানুষ তাদের সমস্ত স্বাধীনতা হারিয়ে ইজরায়েলি সামরিক ঘোরটোপের মধ্যে বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। ১৯৮৮ সাল নাগাত দেখা যায় যে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের ৫২% ও গাজার ৩০% অঞ্চল ইজরায়েলি নাগরিক ও সৈন্যবাহিনীর দখলে চলে গেছে আর প্যালেস্টাইনিয় জনগণের হাজার হাজার ঘরবাড়ী ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ১৯৮২ সালে ইজরায়েল আবার লেবানন আক্রমণ করে এবং নির্বিচারে গণহত্যা চালায় যার ফলে প্রায় ২০ হাজার লেবানিস ও প্যালেস্টাইনিয় শরনার্থীর মৃত্যু হয়।

মার্কিন স্বার্থেই ইজরায়েলের সৃষ্টি

ইতিহাস থেকে আমরা দেখেছি যে, পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদে রুপান্তরিত হওয়ার পর থেকে সে যেমন দুনিয়া জুড়ে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা কায়েম করেছে তার পাশাপাশি এই ব্যবস্থা বজায় রাখতে সমস্ত প্রগতিশীল শক্তিকে ধ্বংস করবার চেষ্টা করেছে এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে যথাসম্ভব মদত করেছে। পুঁজিবাদের এই পরিনতি আসলে তার অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকাশের মধ্যেই নিহিত। একচেটিয়া ব্যবস্থা দেখা দেবার পর সে মুক্ত প্রতিযোগিতা ও গণতন্ত্রের বিকাশের পক্ষে থাকে না, যে কোনভাবে উদ্বৃত্ত মুল্য লুণ্ঠ করা হয়ে ওঠে তার মূল কর্মসুচী। অন্য সমস্ত কর্মসুচী হয়ে ওঠে একচেটিয়া পুঁজির উদ্বৃত্ত লুণ্ঠনের কর্মসুচীর অধীন। তাই রাজনৈতিক আধিপত্য হচ্ছে একচেটিয়া ব্যবস্থার এক আবশ্যিক অঙ্গ। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পর যখন সরাসরি উপনিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে শুরু করে, তখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যে হীন কৌশলগুলি গ্রহ করেছিল, মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কর্মসুচী হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম। আর এর জন্য সে বেছে নিয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীল উগ্র ইহুদিবাদী মতাদর্শকে মদত করার অপকৌশল। এই প্রক্রিয়া প্রথম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শুরু করলেও পরবর্তীতে শক্তিশালী হয়ে ওঠা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রকের ভুমিকায় চলে আসে। আসলে ইজরায়েল রাষ্ট্রটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তার এক বিশেষ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। এটি এমন একটি গুরুত্বপুর্ণ অঞ্চল যেখান থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার উপর নজরদারী বজায় রাখা যায় এবং সর্বোপরি আরবের তৈল সম্মৃদ্ধ অঞ্চলের পর খবরদারী করা যায়। এই কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বছরে ইজরায়েলকে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন ডলার সাহায্য করে আসছে। আর এই সাহায্যের ফলে ইজরায়েল আধুনিক মারণাস্ত্রে মারাত্মকভাবে সজ্জিত হয়ে নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ক্রমাগত প্যালেস্টাইনিয় জনগণকে নিশ্চিহ্ন করবার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইজরায়েল রাষ্ট্রটির জন্মের ইতিহাস দেখায় যে, ঐ অঞ্চলে প্যালেস্টাইনি জনগণের পাশাপাশি কিছু ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস থাকলেও তা কখনো ঐতিহাসিকভাবে আরব জনগোষ্টির বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্ত আন্দোলন হিসাবে দেখা যায় নি এবং দেখা যাবার কোন কারণও ঘটেনি, কার বেশিরভাগ ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষ ক্রমে ক্রমে এখান থেকে ইউরোপে চলে গেছেন এবং বাকিরা এই অঞ্চলের অন্যান্য মানুষের সাথে মিশে যাবার প্রক্রিয়াতে ছিলেন। যেহেতু কেবলমাত্র আরব অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখার জন্যই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই রাষ্ট্রটির জন্ম দিয়েছে, তাই এই রাষ্ট্রটির বিলোপ সাধন না ঘটিয়ে এই অঞ্চলের প্যালেস্টাইনিয় মানুষের স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে না। একমাত্র এই জঙ্গি ইহুদি রাষ্ট্রটির বিলোপ ঘটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ‌ও গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাই একদিকে যেমন প্যালেস্টাইনিয় জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তেমনি তা ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষেরও শান্তি সুনিশ্চিত করতে পারে।।

১৩ জুলাই ২০১৪

সাহায্যকারী লেখা:

1) ’Israel: A state of occupation, Revolutionary workers’, Nov.20, 2000.

2) ’Israel unleashes a massacre in Gaza, Larry Everest, Revolutionary workers’, Dec.28, 2008.

3) ‘The fateful triangle’, Noam Chomsky (Boston: South End Press, 1993)

4) ‘India’s Reckless Road to Washington Through Tel Aviv’, Vijay Prasad, Z-Magazine, dec.27, 2008.

5) ‘An eye for an eyelash: The Gaza massacre’, David Edwards & David Cromwell, Z-Magazine, 16th January, 2009.

অনুলিখন: আব্দুল্লাহ আলশামস বিল্লাহ

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s