লিখেছেন: ওমর শামস

protest-poetry-1মানুষের ন্যায়সততা যতো পুরোনো, অন্যায়ও ততো পুরোনো। এবং ইতিহাসে তা ঘুরেঘুরে চলেছে। স্বাভাবিকভাবে, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার অনুভূতিকে মানুষ প্রকাশ করে এসেছে আগেও, এখনো। ব্যাক্তিগত অন্যায় এক জিনিশ, আর দলগত, সমাজগত, রাষ্ট্রগত অনৈতিকতা আরেক মাত্রার ব্যাপার যাতে আমরা সমষ্টি হিশেবে আক্রান্ত হই। কবিতা যেহেতু অনুভূতি প্রকাশের ক্রিয়াশীল মাধ্যম, অন্যায়ের প্রতিবাদে, রাজনৈতিকসাংগঠনিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ধর্মাচ্ছদনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবি ও কবিতার প্রতিবাদ তো হবেই। ইতিহাস ও অর্থনীতির বিশ্লেষণে মার্ক্সবাদের ভিত্তিভূমি তৈরী হওয়ায়, পৃথিবীর রাজনীতি বিশ শতকে এসে কাপিটালনীতিতে তাড়িত হওয়ায়, কম্যুনিজমে পার্টি স্বৈরতন্ত্র হওয়ায়, গণতন্ত্রর বিফলতায়, উন্নত ও অনুন্নত দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক বিভাজন থাকায়, দেশজনতা ভেদে ক্ষমতার স্তরীকরণ থাকায় প্রায় অরাজনৈতিক কবির পক্ষেও অন্যায়বিরোধী উচ্চারণ একেবারে এড়িয়ে যাওয়া মুশকিল। নিরঙ্কুশ বিশুদ্ধতাবাদী রসিকরা সব কালেই ছিলেন, আছেন যাঁরা কবিতার প্রদেশ থেকে সামাজিক উচ্চারণকে নির্বাসন দিলেই স্বস্তি বোধ করেন।

ইংরেজি, তুর্কি, আরবি, ভিয়েতনামী ও স্পানীশ ভাষার কয়েক জন কবির প্রতিবাদী কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হলো। কবিরা হলেন: ল্যাংস্টোন হিউস, ডিলান টমাস, তাহা মুহম্মদ আলী, জুয়ান কুন, মাহমুদ দরবেশ, সেজার ভায়্যেহো, পাবলো নেরুদা, রাফায়েল আলবের্তি, মিগেল হেরনান্দেস। এদুয়ার্দো গালিয়েনোর ঠিক কবি পরিচিতি নেই, কিন্তু তাঁর Mirrors গ্রন্থে কিছু লেখা আছে যেগুলো কবিতাই। তারই একটি আমি অনুবাদ করেছি এখানে।

সব শেষে একটি বাংলা কবিতা, ‘নিরঙ্কুশ’। না, এটি নজরুল, সুকান্ত, বিষ্ণু কিংবা সুভাষের নয়, কবিতাটি এককালের ‘নির্জনতম’ ‘প্রকৃতির কবি’ জীবনানন্দ দাশের। ঔপনিবেশিকতা নিয়ে এমন কবিতা সব ভাষাতেই বিরল।

[] ল্যাংস্টোন হিউস, [James Mercer Langston Hughes (1902 – 1967)], আমেরিকার নিগ্রো কবি। তাঁর কবিতাটিতে নদীর সঙ্গে কালো মানুষের জীবন, শ্রমের সম্পর্ক ও ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে বেদনা ও আশা উভয়ই ফুটে উঠেছে।

[] নাজিম হিকমত, [Nâzım Hikmet Ran (1902 – 1963)], তুরস্কের বিখ্যাত বামপন্থী বিপ্লবী কবি সকলের পরিচিত। তাঁর কবিতাটি ব্যাক্তিগত সংগ্রামী, জেলজীবন অধ্যুষিত একটি আখ্যানের কথ্য ভাষায় বিবরণ একটি দিনের কাহিনী: তাঁর স্ত্রী, আগত সন্তান, সন্তানের ভবিষ্যৎ, সমাজ, মানুষ এমন কি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধের শঙ্কাআশাভরসার কথা।

[] এদুয়ার্দো গালিয়েনো, [Eduardo Hughes Galeano (1940 -)], উরুগুয়ের সাংবাদিক, লেখক, ঔপন্যাসিক। উদ্ধৃত লেখাটি তাঁর ‘আয়না’ গ্রন্থের থেকে নেয়া মেক্সিকোর জাপাতোর মৃত্যুর কিংবদন্তী নিয়ে লেখা।

[] তাহা মুহম্মদ আলী, [Taha Muhammad Ali (1931 – 2011)], প্যালেস্টাইনী কবি। শিক্ষা চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত কিন্তু জীবন ও আত্মশিক্ষার অভিজ্ঞতায় প্যালেস্টাইনী দুর্দশার অরুন্তুদ কবিতা লিখেছেন। উদ্ধৃত কবিতাটি মহাপরাশক্তির সঙ্গে ক্ষুদ্র কওমএর সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের কবিতা।

[] সেজার ভায়্যেহো, [César Abraham Vallejo Mendoza (1892 – 1938)], পেরুর বিখাত কবি। সারা জীবন গরীবিয়ানায় কাটিয়েছেন; ১৯২৩ থেকে প্যরিসে। দুটো কবিতার অনুবাদ করা হয়েছে। প্রথম কবিতাটি সব অভাগা মানুষের দুর্ভাগ্যকে যেন নিজের কাঁধে নিয়েছেন এবং বলতে পারেন যে, “মনে কয় যদি সব দরোজায় টোকা দিতে পারতাম, সবাইকে ডাকতে পারতাম আর গুচ্ছগুচ্ছ রুটি বানাতে পারতাম এইখানে, আমার বুকের চুলোয়!” দ্বিতীয় কবিতা, ‘জনতা’, পৃথিবীর সব প্রতিবাদী কবিতার মধ্যে শ্রেষ্ঠ একটি।

[] পাবলো নেরুদা, [Pablo Neruda (1904 – 1973)], চিলির কবি; গারসিয়া মার্কেজএর মতে ২০ শতকের সব ভাষার শ্রেষ্ঠতম কবি। অনূদিত কবিতাটি Alturas de Maccu Piccuর ১২টি কবিতার ১০ম।

[] রাফায়েল আলবের্তি, [Rafael Alberti Merello (1902 – 1999)], স্পেনের ১৯২৭ গোত্রের বিখ্যাত কবি। স্পানীশ সুররিয়ালিস্টদের অন্যতম পুরোধা যদিও অন্য স্টাইলের কবিতা তিনি বিস্তর লিখেছেন। ১৯৩৯ সনে আর্জেন্টিনা চলে যান। ১৯৬৫ থেকে আমৃত্যু ইতালিতে স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন। উদ্ধৃত কবিতাটি স্পেনের ৪০০০৩০০০ বছরের পুরোনো মানব বসতি, ‘মিয়ারেস’এর ধ্বংসাবশেষ নিয়ে, অনেকটা নেরুদার মাচ্চুপিচুর কবিতার মতো।

[] মিগেল হেরনান্দেস, [Miguel Hernández Gilabert (1910 – 1942)], স্পেনের ১৯২৭ গোত্রের মধ্যে তরুণতর কবি। ‘ পিঁয়াজের লালাবাই’ কবিতাটি তাঁর শিশুপুত্রের উদ্দেশে লেখা। যখন তিনি ফ্রাঙ্কোর জেলে, তাঁর স্ত্রী জোসেফিনার এক চিঠি পান যাতে সে লিখেছিলো যে শিশু সন্তানটি শুধু একটি পিঁয়াজ খেয়েছে। তাই প’ড়ে দুঃখে সঙ্গেসঙ্গে সাহসে এই কবিতাটি লিখেছিলেন।

[] জুয়ান কুন, [Xuân Quỳnh (1942 – 1988)], ভিয়েতনামএর সবচেয়ে বিখ্যাত নারীকবি। ধানকাটার মধ্যে দিয়ে বিমানবোমাবর্ষী মার্কিন আগ্রাসনের অপরূপ এবং শক্তিশালী প্রতিবাদ করেছেন। চমৎকার কবিতা। একটি সন্দেহজনক গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে তাঁর স্বামীসহ ১৯৮৮ সনে মারা যান।

[১০] মাহমুদ দরবেশ, [Mahmoud Darwish (1941 – 2008)], প্যালেস্টাইনী কবি যাঁর কবিতা তাঁর জনগণের স্বর্গস্খলনের প্রতীক। তিনি ও তাঁর স্বজনরা যে সততই মৃত্যুর মুখোমুখি, সেই সত্যকে এক অপূর্ব ম্যাজিক রিয়ালিজমের কবিতায় প্রকাশ করেছেন।

[১১] ডিলান টমাস, [Dylan Marlais Thomas (1914 – 1953)], ব্রিটিশ কবি। ‘হাত’ কবিতাটিতে সম্রাট কিংবা রাষ্ট্রশক্তির কলমের দস্তখতেই যে যুদ্ধ, সংহার, মারি, খুন ঘটে তার নির্মম প্রতিকৃতি তুলে ধরেছেন।

[১২] জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯ ১৯৫৫), বাংলা কবিতার আধুনিকতার ‘শুদ্ধতম’ কবি। ঔপনিবেশিকতাকে চিত্রায়িত ক’রে, ‘নিরুঙ্কুশ’ কবিতাটি তাঁর অসাধারণ রচনা।

—————————————

।।১।।

নিগ্রোর নদীর গল্প

ল্যাংস্টোন হিউস

.

জেনেছি নদী আমি,

আমি নদী জেনেছি পৃথিবীর মতো পুরাতন।

মানুষের ধমনীর রক্তের স্রোতের চেয়েও প্রাচীন।

.

যখন প্রভাত ছিল শিশু

আমি ইউফ্রেটিসে স্নান করেছি

আমি কঙ্গোর পাশে কুঁড়েঘর বেঁধেছি

যা আমাকে দুলিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে।

আমি নীল নদের দিকে তাকিয়ে দেখেছি এবং

তার ওপারে পিরামিড গড়েছি।

আমি মিসিসিপির গান শুনেছি যখন আব্রাহাম লিংকন

নিউঅরলিয়েন্স এলেন এবং

তার কর্দমাক্ত বুক

আমি সূর্যাস্তে সোনা হয়ে যেতে দেখেছি।

.

আমি নদী জেনেছি সনাতন, সান্ধ্য নদী।

.

আমার হৃদয় নদীর মতো গভীর হয়ে গেছে।

———————————-

।। ২।।

রাত্তিরের ধান

জুয়ান কুন

.

কোনাচে মাথালের শাদা চাকা বেরিয়ে এসেছে

আমাদের শিশুকালের শান্ত আকাশের মতো।

বকের বিস্তৃত ডানার মতো রাত্তিরে,

সফেদ বৃত্তগুলো ডেকে এনেছে বিরাট আকাশ।

.

ধানের সোনা আর ক্লাস্টার বোম মিশে উঠেছে,

নাফাটা বোমাও এখন আর ভয় ধরায় না;

আমাদের বুক বহুবহু বছর যুদ্ধকে জেনে গেছে।

আয়, আয় বোনেরা আমরা ধান তুলি।

.

আমাদের প্রত্যেকে পরেছে তার ছোট্ট চাঁদ,

সোনার ধান বিছানো মাদুরের উপর

আমরা আমাদের গ্রামের ধান কাটুরে।

উজ্জ্বল শাদা বারোটি মাথাল এই লম্বা রাত্তিরে।

.

আকাশের বোমা কিম্বা বুলেটে আমরা ভীত নই

সন্ত্রস্ত শুধু আমাদের নেবুগন্ধ চুলে শিশির ভিজলে।

——————————————–

।।৩।।

জেল থেকে বেরোবার পর

নাজিম হিকমত

.

. গাত্রোত্থান:

জাগলে?

তুমি কোথায়?

বাড়িতে!

নিজের বাসায়

জাগতে অভ্যস্ত নও।

তেরো বছরের হাজত

তোমাকে এই ধরণের ধান্দায় ফেলে দ্যায়।

তোমারঅপাশে কে ঘুমোচ্ছে?

নির্জনতা নয় সে তোমার বউ।

ফেরেশ্‌তার মতো শান্তিতে ঘুমোচ্ছে।

অন্তঃসত্ত্বায় সে রমণী।

কটা বাজে?

আটটা।

রাতের আগ পর্যন্ত তুমি নিশ্চিন্ত।

কারণ সেইটেই নিয়ম:

জ্বলন্ত দিবারোদে পুলিশ হানা দ্যায় না।

.

.

. সান্ধ্যভ্রমণ:

জেল থেকে বেরোতে না বেরোতেই

তুমি বৌকে পোয়াতি বানিয়েছো:

সে তোমার বাহুতে

আর তোমরা হাঁটছো

সন্ধ্যায় মহল্লার চারদিকে।

মহিলার পেট প্রায় নাক ছুঁয়েছে।

আলতোভাবে বয়ে বেড়াচ্ছে,

তুমি শ্রদ্ধাশীল ও গর্বিত।

বাতাস ঠাণ্ডা, শিশুর হাতের মতো।

মনে হয় হাতের তালু ঘ’ষে উষ্ণ করো।

পাড়ার বিড়ালগুলো কসাইয়ের দরোজায়,

আর উপরতলায় তার কোঁকড়াচুলঅলা বৌ

জানালার তাকে স্তন দিয়ে সন্ধ্যার আকাশ দেখছে।

আধোআলো, ঝক্‌ঝকে আকাশ:

ঠিক মধ্যেখানে শুকতারা

এক গ্লাশ পানির মতো চক্‌চক করছে।

বছর গ্রীষ্মকাল অনেক লম্বা গ্যালো

মলবেরি গাছগুলো হলুদ

কিন্তু ডুমুর এখনো সবুজ।

টাইপিস্ট রফিক আর জেবুন্নিসার মেজো মেয়ে

সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরিয়েছে,

ওদের করতল সংলগ্ন।

মুদির দোকানী কেরামতের ঘরে আলো জ্ব’লে আছে।

আর্মানি নাগরিকরা কি কুর্দিশ পাহাড়ে

ওদের পিতৃহত্যাকে ভুলবে?

.

ধোপানী মরিয়মের বেকার ছেলেটা

কফি হাউস ছেড়ে বেরোলো মন ভারি।

রহিমতুল্লার রেডিও খবর দিচ্ছে:

চাঁদমুখো হলুদ লোকেরা

এক ধবল ড্রাগনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।

তোমাদের মধ্যে থেকে

৪৫০০ মোহাম্মদকে পাঠানো হয়েছে

তাদের ভাইদের খুন করার জন্য।

তুমি রাগেলজ্জায় জ্ব’লো

এই অপ্রতিকার্য বেদনা তোমারই,

যেন পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তোমার স্ত্রীকে

ওরা ফেলে দিয়েছে এবং সন্তানকে হত্যা করেছে।

.

সহসা রাত্রি হলো, সন্ধ্যাভ্রমণ শেষ।

একটা পুলিশ জিপ তোমাদের গলিতে ঢুকলো,

তোমার বৌ ফিস্‌ফিসিয়ে বললো:

আমাদের বাড়ি?”

.

.

. রাত ১টা:

বইগুলো বান্ধব, সৎ এবং সাহসী

নীলছোপ টেবিলের উপর স্তূপীকৃত।

বন্দীত্ব থেকে আমি মুক্ত হয়েছি,

শত্রুদুর্গ আমার দেশের ভিতরেই।

এখন ১টা,

আমরা বাতি নিবোই নি।

আমার বউ পাশে শুয়ে: পাঁচ মাসের পোয়াতি,

যখন আমার শরীর অকে ছোঁয়,

যখন সে আমার হাত তার পেটে বুলোয়,

শিশু ন’ড়ে ওঠে।

ডালের ওপরে পাতা,

জলের মধ্যে মাছ,

পেটের মধ্যে শিশু

আমার সন্তান।

আমার সন্তানের মা বুনছে

একটি গোলাপি শিশুজামা

এক হাত চওড়া আমার হাতে এইটুকু হাতা।

যদি মেয়ে হয়, আমি চাই

যে সে পা থেকে মাথা পর্যন্ত তার মার মতো হোক।

যদি ছেলে হয়, আমার মতো লম্বা।

যদি ছেলে হোক বাদামি রঙের চোখের,

যদি মেয়ে হোক নীল রঙের চোখের।

ছেলে বা মেয়ে, আমি চাই না

সত্য, ন্যায় আর শান্তির প্রতি উদ্যত হবার জন্য

সে জেলে যাক।

কিন্তু আমি জানি,

নদীর ওপরে আলো জাগাতে যদি ভোরের দেরি হয়,

তবে সে লড়বে —— এবং

স্পষ্টতই বাবা হওয়া এখন কতো কঠিন!

.

এখন ১টা,

আমরা এখনো বাতি নিবোই নি।

হয়তো ঘণ্টা খানেকেই, ভোরের দিকে

হানা পড়বে বাড়িতে;

আমাকে ধ’রে নিয়ে যাবে বই সমেত।

পুলিশের হাতকড়ায়, আমি পিছনে তাকিয়ে দেখবো

দরোজার চৌকাঠে আমার বউ

ভোরের হাওয়ায় দোদুল্যমান ওড়না,

ফুল্ল, ভারী পেটে নড়ন্ত আমার সন্তান।

—————————————

।।৪।।

জাপাতোর পুনরুত্থান

এদুয়ার্দো গালেয়ানো

.

লোকে বলে, সে জন্মেছিলো বুকের উপর ছোট্ট একটি হাতের উল্কি নিয়ে,

ম’রেছিলো দেহে সাতটি বুলেটের ক্ষত নিয়ে।

পঞ্চাশ হাজার পেসো পেয়েছিলো খুনী, আর ব্রিগেডিয়ার জেনেরালের পদ।

মৃত পেয়েছিলো অগুনতি কৃষক, অবনত টুপী হাতে,

যারা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলো।

আদি পূর্বপুরুষের থেকে ওরা নিঃশব্দতা উত্তরাধিকার পেয়েছিলো।

ওরা কিছুই বললো না, অথবা বললো:

আহা! বেচারা!’

আর কিছুই না।

কিন্তু তারপর, শহরের চৌমাথায় ধীরেধীরে ঠোঁট নড়তে লাগলো।

সে নয়। ”

অন্য কেউ ছিলো।”

মনে হলো, খুব মোটা লাগছিলো।”

চোখের ওপরের তিল তো ছিলো না।”

আকাপুল্‌কো থেকে জাহাজে চ’ড়েছিলো।”

আরবে চলে গিয়েছে।”

রাত্রে একটা শাদা ঘোড়ার উপর বেরিয়ে প’ড়েছিলো।”

সে এখন আরব দেশে।”

আরব আশলে ওহাকার থেকে অনেক দূরে।”

শিগগীরই ফিরে আসবে।”

————————————————

।।৫।।

মহাশক্তির সঙ্গে আব্‌দেল হাদীর লড়াই

তাহা মুহম্মদ আলী

.

সারা জীবনে

সে না লিখেছে, না পড়েছে।

সারা জীবনে

সে একটিও গাছ কাটে নি,

একটি বাছুরেরও গলা কাটে নি।

নিউইয়র্ক টাইমস্‌এর পশ্চাদ্দেশে,

সারা জীবনে,

সে একটা টু বলে নি।

কোন বান্দার বিরুদ্ধে

চড়া গলায় সে চ্যাঁচায় নি,

শুধু এইটুকু বলা ছাড়া:

আসুন, বসুন

আল্লার নামে ফেলতে পারবেন না।”

.

তথাপি

তার উদ্ধারের আশাভরসা নেই!

তার অবস্থা সঙ্গীন।

আল্লার প্রেরিত তার জন্য সমস্ত অধিকার

এখন সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত এক চিলতে লবণ।

বিচারক ভদ্র ও ভদ্রাগণ,

ফরিয়াদী তার শত্রু সম্বন্ধে এক কণাও সে জানে না।

আমি হলফ্‌ ক’রে বলতে পারি,

যদি বিমাননৌবাহক এন্টারপ্রাইজের

সকল সেনার সঙ্গে তার দ্যাখা হতো,

তবে সে সকল সৈন্যদের জন্য

সেবন করত বাখরখানি ও ডিম ভাজা

তাজা তার ঝোলার থেকে।

——————————————

।।৬।।

দস্তখতের হাত

ডিলান টমাস

.

দস্তখত ক’রে হাত ধ্বসালো শহর

স্বয়ম্ভূ পাঁচাঙুল শ্বাস করলো আঁট,

দ্বিগুণ করলো মৃত, খণ্ডালো দেশ

রাজা পাঁচজন এরা মারলো সম্রাট।

.

চুক্তি সই ক’রে হাত তাতালো রে জ্বর

জাগালো দুর্ভিক্ষ আর এলো পঙ্গপাল।

প্রবল সে হাত যেই দমালো মানুষ

এঁকে দিয়ে শুধু মাত্র নামাঙ্ক জাল।

.

স্কন্ধে পড়েছে ঢ’লে প্রবল সে হাত

চকধুলো সমাকীর্ণ আঙুলের গিরো,

পালক কলম ইতি করেছে যে খুন

সমাপ্ত ক’রে দিয়ে আলোচনাটিরও।

.

মুর্দা শুমার করে রাজা পাঁচ জন,

ছোঁয় না দগ্ধ ঘা কিম্বা ভুরুকেই

মমতাকে বাধ্য করে স্বর্গ যেমন,

কেননা হাতের মাঝে অশ্রু মোটে নেই।

———————————————

।।৭।।

আমাদের রুটি

সেজার ভায়্যেহো

.

প্রাতঃরাশ গিলিত …… …… কবরখানার

ভেজামাটি প্রিয়জনের রক্তের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে।

শীতের শহর …… এক ঠ্যালাগাড়ী,

যে টেনে চলেছে বুভুক্ষার জর্জরতা,

সে তার পোড়ানি জ্বেহাদ থেকে ছাড় পায় না।

মনে কয়, আমি সব দরোজায় টোকা দিতে পারতাম,

জিগাইতাম কারুর জন্য; আর তারপর দেখতাম,

গরীব যখন সে কাঁদতাছে সবাইকে

টাটকা রুটির টুকরা দিয়ে দিতাম।

লুট করতাম বড়োলোকদের দ্রাক্ষাকুঞ্জ

ঐ দু’হাতে …… যারা আলোর থাবড়ায়

পেরেক ছিঁড়ে ক্রুশকাঠ থেকে উড়ে এসেছে।

প্রাতঃকালের চোখের পাতা,

তুমি তো উঠতেই পাচ্ছো না।

আমাদের দিনকার ভাত দাও, প্রভু!

.

আমার দেহের প্রত্যেকটি হাড়ই অন্যের,

হয়তো চুরি ক’রে এনেছিলাম;

হয়তো যা অন্য মানুষের জন্য ছিলো,

আমি তাই নিয়ে নিয়েছিলাম।

ভাবি, আমি যদি না জন্মাতাম তা’হলে

অন্য আরেকজন এই কফি পান করতো।

নিজেকে অপরাধী চোরের মতো মনে হয়

আমার শেষ কোথায়?

আর তাই এই শীতবেলায় যখন পৃথিবী

মাটির মধ্যে মানুষের ধুলো নিয়ে বিষণ্ন

মনে কয় যদি সব দরোজায় টোকা দিতে পারতাম,

সবাইকে ডাকতে পারতাম

আর গুচ্ছগুচ্ছ রুটি বানাতে পারতাম

এইখানে, আমার বুকের চুলোয়!

—————————————————

।।৮।।

পিঁয়াজের লালাবাই

মিগেল এরনান্দেস

.

পিঁয়াজটি বরফ

বন্ধ এবং গরীব।

তুষার দিন তোমার

এবং আমার রাত্রি।

পিঁয়াজআরক্ষুধা

কালো তুষার বরফ

বড়ো এবং গোল।

.

ক্ষুধার দোলনা

আমার শিশুটি চুষলো

পিঁয়াজের খুন।

কিন্তু তোমার রক্ত

পিঁয়াজ, চিনি ও

ক্ষুধা দিয়ে বর্‌ফিযে।

.

শ্যামল এক রমণী

গলিত চাঁদের কিরণী

ভরালো সুতায় সুতায়

দোলনার পরে।

বাছা, হাসো যদি পারো

চাঁদের কিরণ পিয়ো।

.

আমার বাড়ির বুলবুলি,

খুব হাসো

চোখের মধ্যে হাসি

এই দুনিয়ার আলো।

হাসো দুর্দান্ত

যাতে তাই শুনেশুনে

আমার আত্মা ওড়ে

আকাশে।

আগল ভেঙেছ হাসির

দিয়েছে পাখা ও

হতাশা তাড়িয়ে;

উড্ডীন মুখ

তোমার ঠোঁটের উপরে

উজল জান।

.

তোমার হাসিই

বিজয়ের তরবারি

বিজয়িনী পুষ্পের

বুলবুলিদের।

প্রতিদ্বন্দ্বী সূর্যের

আমার হাড়ের

আমার প্রেমের,

ভবিষ্যৎ।

.

মাংশ লাফায়

সহসা চোখের পাতা

জীবন না কোন

দিনেরই নয়

নব্য রঙিন;

কত প্রজাপতি ওড়ে

তোমার দেহের থেকে।

.

শৈশব থেকে উঠেছি

তুমি জেগো নাক

মুখ প’রে থাকি

বিষাদে হাসি।

দোলনায় থাকো

সদা

পালকে পালকে।

.

তুমি এক ওড়া,

এতো উঁচু বিস্তৃত,

যে শরীরই আকাশ

জন্মানো এক্ষুণি।

যদি পৌঁছতে পারতাম

তোমার উড়াল বৃত্তে।

.

আট মাসে তুমি হাসো

পাঁচটি কমলা বিকাশে

ছোট্ট পাঁচটি ভয়ানক,

পাঁচটিই দাঁত

পাঁচটি চাঁপার কুঁড়ি।

.

সমুখেই হবে

চুমুর আগামী কাল,

যখন দাঁতের মধ্যে

বুঝবে অস্ত্র।

আগুন ছাড়িয়ে

দাঁতের মধ্যে

যখন বুঝবে কেন্দ্র।

.

বাছা! ওড়ো

জোড়া চাঁদ বুকে,

পিঁয়াজে ব্যাথিত;

তুমি তো তৃপ্ত,

ছাড়বে না মোটে।

জানবে না মোটে

যা কিছু ঘটছে।

—————————————————–

।।৯।।

মিয়ারেস, ১৯৬৫

রাফায়েল আলবের্তি

.

রোম অথবা প্যারিসে,

নিউইয়র্ক, বুয়েনস আইরেস, মাদ্রিদ, কোলকাতা, কায়রো

এই সব সমস্ত জায়গায়

ছেঁড়া ছালা আছে

জুতোর ভগ্নাংশ হাড়ছোঁয়া

আবর্জনা ভস্মীভূত,

গভীর গর্ত বিশুষ্ক;

পৃথিবীর পরিত্যক্ত জংধরা,

জমাট রক্তের মানুষী ছাল

মৃত লাভার মতো ক্ষওয়া,

কোঁচকানো বেদনার্ত চামড়া ঘোষণাপত্র যা দোষায়,

চীৎকার করে যদিও তাদের কোন মুখ নেই,

বোবা আর্তনাদ নিঃশব্দতার মতোই বেদনাদায়ক।

কোত্থেকে এই সব ধস,

এই সব নির্বাহু পঙ্গু অবশেষ,

গহ্বর যা মুহূর্তে ছিঁড়ে আরো বর্ধিষ্ণু,

মোচড়ানো সিল্কের ছিন্ন সুতোর চট,

বিভ্রান্ত কাদার দলা, লাল গালা

চকগুঁড়ো কোত্থেকে?

কি বেরোবে, কি উথ্‌লোবে এখান থেকে?

কি বিস্ফোরিত হবে এইসব সহিংস ভীতির থেকে,

কি ধ’সবে অন্ধ, তামস বিচ্ছিন্ন ছাল থেকে,

কখন ছিঁড়বে দড়ি, সেলাই খুলে কামড়াবে হটাৎ,

লৌহখনিজ, খড়িমাটি উজ্জ্বলচ্ছটাময়

কি পারে নতুন সৌন্দর্য জাগাতে?

.

কিন্তু, আহ্‌! ইতিমধ্যে একটা

ছুঁয়ো না, মৃত্যুর শঙ্কা” সব জোড়াতালিমারা

ছিন্নকোণ বাস্তবতার তলে থমকে থাকে!

হটাও, হটাও হাত,

একটি আঙুলও বার ক’রো না, তুমি তোমার

পালিশঅলা নখ শুদ্দো ছুঁচো,

সব নালায় তুমি ঢুকতে চেষ্টা ক’রো না।

হটো, হটো তুমি কারবার ক’রে ফ্যাকাশে,

শূন্যতা থেকে ধূসর এদিকে এক পাও না,

এক কদমের ঝুঁকি নয়, নয় চোখের ইশারা !

আলোড়ন এক বৈদ্যুতিক কম্পন, এখানে

হানতে পারে এবং কিরণ, অন্তঃস্থিত আলো

এইসব পিণ্ডাকার মানুষীকরুণ ধ্বংসস্তূপ।

———————————————————

।।১০।।

মাচ্চুপিচুর চূড়া

পাবলো নেরুদা

.

পাথরের মধ্যে পাথর আর মানুষ, সে কোথায় ছিলো?

বাতাসের মধ্যে বাতাস আর মানুষ, সে কোথায় ছিলো?

সময়ের মধ্যে সময় আর মানুষ, সে কোথায় ছিলো?

.

তুমিও কি তখন অনিশ্চিত মানবতার ভাঙ্গা কুচো,

শূন্য ঈগল যে আজ অব্দি রাস্তায়, পদপাতে,

হেমন্তের মৃত পাতাঝরায়, হৃদয় দীর্ণ করে সমাধি অবধি?

গরীব হাত পা গরীব জীবন …

যেন বৃষ্টি, উৎসবের চাঁদোয়ায় পাপড়ির পরে পাপড়ি,

বিচূর্ণ আলোর দিন তোমাকে কি দিয়েছিলো

তামস আহার তোমার শূন্য মুখে?

বুভুক্ষা, মানুষের ব্যাধি,

ক্ষুধা কাঠুরিয়ার মূল, বিসুপ্ত লতাক্ষুধা,

তোমার ক্ষয়িষ্ণু ধার কি উঠেছিলো এইখানে

ধ্বংসীভূত মিনারের উচ্চতায়?

.

তোমাকে প্রশ্ন করি পথের লবণ, আমাকে দ্যাখাও ছেনি:

স্থাপত্য: পাথর ঘ’ষতে দাও নুড়ি দিয়ে,

চড়ি প্রতি ধাপ বাতাসের শূন্যতায়, আঁচড়াই জরায়ুরে

যতোক্ষণ না ছুঁই একটি মানুষ।

.

মাচ্চুপিচু, তুমি কি পাথরের উপর পাথর রেখেছো চটের ভিতে?

কয়লার উপরে কয়লা, আর সব নিচে অশ্রু?

সোনার ভিতরে আগুন, আর তার ভিতরে

রক্তের চ্ছটা কম্পমান?

.

আমাকে ফিরিয়ে দাও সমাধিস্থ দাস!

ভূস্তর থেকে খশিয়ে দাও অভাগার রুটি,

আমাকে দ্যাখাও গোলামের জামা, তার জানালা।

বলো, সে কি ক’রে ঘুমোতো, কোথায় থাকতো;

বলো, সে কি নাক ডাকতো ঘুমিয়ে,

দেয়ালের কোনো কালো ক্লান্তিখচা গর্তের মতো।

দেয়াল! দেয়াল! তার স্বপ্নের উপর চেপে ছিলো প্রত্যেক

পাথরের থাক; আর যদি সে প’ড়ে থাকে,

যেমন চাঁদের নিচে, স্বপ্নসহ।

.

সনাতন আমেরিকা, নিমজ্জিত নারী,

আঙ্গুলও তোমার, অরণ্য ছেড়ে দেবতার শূন্যবেদীতে

রোশনাই বিবাহের জলুসে, শ্রদ্ধায়

বর্শাদামামাসহ গর্জনে মিশে তোমার, তোমারও আঙুল

যা বিমূর্ত গোলাপ বা তুষারের কূল

নবান্নশস্যর রক্তাক্ত দেহ উঠিয়েছিলো নির্মম গুহায়,

বিকীরক বস্তুর মায়াজালে

তুমিও, তুমিও আমেরিকা, নিমজ্জিত তুমিও কি তোমার

গভীরতম তিতো অন্ত্রে ঈগলের মতো

লুকিয়ে রেখেছিলে ক্ষুধা?

——————————————————

।।১১।।

জনতা

সেজার ভায়্যেহো

.

যখন যুদ্ধ হলো শেষ এবং সৈনিক হল মৃত,

একজন মানুষ তার কাছে এলো, আর বললো:

ম’রো না, তোমাকে এতো ভালোবাসি।”

কিন্তু মৃতদেহ, হায়!, ম’রেই চললো।

.

দু’জন তার কাছে এলো, আবার বললো:

আমাদের ছেড়ে যেও না! সাহস! ফিরে এসো জীবনে !”

কিন্তু মৃতদেহ, হায়!, ম’রেই চললো।

.

কুড়িজন কাছে এলো, একশো, এক হাজার, সহস্র,

চীৎকার ক’রে: “এতো ভালোবাসা মৃত্যুর মুখে এতো অসহায়!”

কিন্তু মৃতদেহ, হায়!, ম’রেই চললো।

.

কোটিকোটি লোক তাকে ঘিরে ধরলো

একই অনুরোধ: “থাকো, ভাই।”

কিন্তু মৃতদেহ, হায়!, ম’রেই চললো।

.

তারপর সারা পৃথিবীর লোক তাকে ঘিরে ধরলো,

মৃতদেহ তাদের দিকে তাকালো আর্ত, করুণ;

ধীরেধীরে উঠে বসলো; প্রথম মানুষটিকে

জড়িয়ে হাঁটা শুরু করলো

———————————————————

।।১২।।

আমাকে মরা দেখতে ভালোবাসে

মাহমুদ দরবেশ

.

আমাকে মরা দেখলে ওরা খুশী হবে, বলতে যে: ‘ও আমাদের, ও এখন আমাদের।’

কুড়ি বছর ধ’রে আমি ওদের পদধ্বনি শুনেছি রাত্রির দেয়ালে।

কোনো দরোজা খোলে না, অথচ ওরা এখন এখানে। আমি ওদের তিনজনকে দেখি।

এক কবি, এক খুনী, আর এক কেতাব পড়ুয়া।

পান করবে?’, আমি জিজ্ঞেস করলাম।

হ্যাঁ, ওরা বললো।

তোমরা আমাকে কখন গুলি করবে?’, আমি জিজ্ঞেস করলাম।

আরে, থিতু হও’, ওরা বললো।

গ্লাসগুলো সাজিয়ে সবার জন্য গান পাওয়া শুরু করলো।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা কখন আমাকে খুন করবে?’

সে খতম’, ওরা বললো…

তুমি তোমার রুহুর আগেই জুতো পাঠিয়েছিলে কেন?’

যেন পৃথিবীর মুখের উপর তা ঘুরে বেড়াতে পারে’, আমি বললাম।

পৃথিবী তো ভয়ঙ্কর কালো, তোমার কবিতা শাদা কেন?’

কেননা আমার হৃদয় তিরিশ সমুদ্র দিয়ে মথিত’, আমি বললাম।

জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি ফরাসী সুরা পছন্দ করো কেন?’

কেননা আমার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ের ভালোবাসা পাওয়া উচিত’,

আমি জবাব দিলাম।

নীল জানালা দিয়ে প্রবাহিত তারার মতো, – আরো সুরা নেবে?’

হ্যাঁ, আমরা গিলবো’, ওরা বললো।

অনুগ্রহ ক’রে সময় নাও। যদি তোমরা ধীরে মারতে চাও,

তাহলে আমি আমার রুহুর বিবির জন্য

অন্তিম কবিতা লিখতে পারি।’

ওরা হাসলো, আর আমার বৌর জন্য একান্ত উৎসর্গীকৃত

শব্দগুলো ছিনিয়ে নিলো।

——————————————————-

।।১৩।।

নিরঙ্কুশ

জীবনানন্দ দাশ

.

মালয় সমুদ্র পারে সে এক বন্দর আছে শেতাঙ্গিনীদের।

যদিও সমুদ্র আমি পৃথিবীতে দেখে গেছি ঢের:

নীলাভ জলের রোদে কুয়ালালাম্পুর, জাভা, সুমাত্রা ও ইন্দোচীন, বালি

অনেক ঘুরেছি আমি, তারপর এখানে বাদামি মলয়ালি

সমুদ্রের নীল মরুভূমি দেখে কাঁদে সারাদিন।

.

শাদাশাদা ছোটো ঘর নারিকেল খেতের ভিতরে

দিনের বেলায় আরো গাঢ় শাদা জোনাকির মতো ঝরঝরে।

শ্বেতাঙ্গ দম্পতি সব সেইখানে সামুদ্রিক কাঁকড়ার মতো

সময় পোহায়ে যায়, মলয়ালি ভয় পায় ভ্রান্তিবশতঃ,

সমুদ্রের নীল মরুভূমি দেখে কাঁদে সারাদিন।

.

বাণিজ্য বায়ুর গল্পে একদিন শতাব্দীর শেষে

অভ্যুত্থান শুরু হলো এইখানে নীল সমুদ্রের কটিদেশে;

বাণিজ্য বায়ুর হর্ষে কোনো একদিন,

চারিদিকে পামগাছ খোলা মদ বেশ্যালয় সেঁকো কেরোসিন

সমুদ্রের নীল মরুভূমি দেখে কাঁদে সারাদিন।

সারাদিন দূর থেকে ধোঁয়া রৌদ্রে রিরংসায় সে উনপঞ্চাশ

বাতাস তবুও বয় উদীচীর বিকীর্ণ বাতাস;

নারকেল কুঞ্জবনে শাদাশাদা ঘরগুলো ঠাণ্ডা ক’রে রাখে;

লাল কাঁকরের পথ রক্তিম গির্জার মুণ্ড দেখা যায় সবুজের ফাঁকে:

সমুদ্রের নীল মরুভূমি দেখে কাঁদে সারাদিন।।

———————————————

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s