শোষক মালিক এবং তাদের পাহারাদার রাষ্ট্রের কাছে শ্রমিকের অভিমান!

Posted: অগাষ্ট 1, 2014 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , ,

লিখেছেন: ফারুক আহমেদ

toba-group-workersতোবা ফ্যাশনে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিককে তিন মাস ধরে বেতন দেওয়া হচ্ছে না। এমন নয় যে, এই তিন মাস ফ্যাক্টরি বন্ধ ছিল। পুরোদমে ফ্যাক্টরি চালু ছিল। বিশ্বকাপের জার্সি নির্মাণ সহ সকল ধরণের কাজই সেখানে হয়েছে। অথচ শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয় নাই। এই তোবা ফ্যাশনের মালিকই তাজরিণ গার্মেন্টের মালিক। যেখানে এই মালিকের অবহেলার কারণে আগুনে পুড়ে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। সেই মামলার দায়ে মালিক দেলোয়ার হোসেন জেলে। শ্রমিকদের বেতন না দেওয়ার পিছনে মালিকের জেলে থাকাকে অজুহাত হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

শ্রমিকরা বেতন না পেয়ে ঈদের আগের দিন সন্ধ্যা থেকে বাড্ডার হোসেন মার্কেটে তোবা ফ্যাশনের ৭ তলায় আমরণ অনশন শুরু করেছেন। আজকে সরকারের লোকজন এবং মালিক পক্ষের লোকেরা ঈদের তৃতীয় দিন পালন করছে। অথচ চারদিন হয়ে গেল শ্রমিকরা পাওনা বেতনের দাবিতে অনশন করে আছেন কেউ কোন খবর নেয়নি। মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র লোকেরা ফিরে দেখেনি, পাছে তাদের ঈদের আনন্দে ব্যাঘাত ঘটে! তাদের কথা হলো মালিক দেলোয়ার মুক্তি পেলে ব্যবস্থা করা হবে! অদ্ভুৎ দেশ বাংলাদেশ! এক অপরাধের থেকে মুক্তির সুপারিশ হয় আরেক অপরাধের দায়ে! শ্রমিকদের তিনমাস বেতন দেওয়া হয়নি এটা কি অপরাধ নয়? এই অপরাধের পুরষ্কার হিসেবে অন্য অপরাধের থেকে দায়মুক্তির সুপারিশ!

মালিক যখন শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা দেয় না তখন শ্রমিকরা কোথায় যাবে? সহজ জবাব হলো রাষ্ট্রের কাছে। তিনমাস ধরে যখন শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছেন না, রাষ্ট্র নীরব। ঈদের আগের দিন পযন্ত শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছেন না, রাষ্ট্র নীরব। শ্রমিকরা আমরণ অনশন করেছেন, রাষ্ট্র নীরব। শ্রমিকরা অসুস্থ্য হয়ে পড়ছেন, রাষ্ট্র নীরব। আমরণ অনশন? কে করেছে? শ্রমিক? শ্রমিক মরলে কার কি এসে যায়? স্পেক্ট্রাম গার্মেন্টস ধ্বসে শ্রমিক মরেছে কার কি এসে গেছে? তাজরিণ ফ্যাশনে আগুনে পুড়ে শ্রমিক মরেছে কার কি এসে গেছে? রানা প্লাজা ধ্বসে এগারোশ’র বেশি শ্রমিক মারা গেছেন, অনেক শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছেন, কয়েকহাজার শ্রমিক পঙ্গু হয়ে গেছেন কার কি এসে গেছে? মালিক পক্ষের? সরকারের? মালিক পক্ষের বিজিএমইএর? শ্রমিকের মৃত্যু তাঁদের কাছে কি বেদনার? শ্রমিকের জীবন রক্ষা কি তাদের দায়ীত্ব? এদের আচরণ থেকে এর জবাব মেলে, “না”। তাহলে শ্রমিকের অনশন ভাঙাতে তারা আসবে কেন? উল্টো শ্রমিকের অনশনে মৃত্যু হলে তাদের পক্ষে উস্কানির মামলা দেওয়া কি অসম্ভব?

toba-group-workers-2এই অভিমানি আন্দোলন কারা করতে পারে? বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে চরিত্র সেদিক দিয়ে দেখলে এই আন্দোলন করতে পারে তারাই যাদের অঢেল খাবার আছে। বাংলাদেশের মানুষতো দেখেছে এদের ৬ ঘন্টার অনশন, ৮ ঘন্টার অনশন! বাংলাদেশের মানুষ দেখেছেন ৬ ঘন্টার অনশনে রাষ্ট্রের কর্তাব্যাক্তিরা কিভাবে ছুটাছুটি করে। তাদের জন্য কত শরবত তৈরী হয়! অ্যাম্বুলেন্স রেডি থাকে! পাছে ৬ ঘন্টার খাদ্য বিরতিতে প্রাণপাখি হতাশ হয়ে উড়ে যায়! আবদার এদেরই সাজে। শ্রমিকদের এ আবদার কেন? আরে এরাতো সব সময়ই অনশনে থাকে। তিন মাস ধরে যে শ্রমিক বেতন পায় না সে কি পরিবার পরিজন নিয়ে অনশনে ছিল না?

তাহলে শ্রমিকদের এই আবদারের আন্দোলনের অর্থ কি? তাঁদের অভিমান কে দেখবে? রাষ্ট্র যে মালিকের পক্ষে সেই মালিকের কাছে আবদার করে শ্রমিক মরে গেলে মালিকের কি ক্ষতি হবে? শ্রমিকরা কি তাদের ন্যায্য মজুরির জন্য আবদার করবে? নিজের পাওনার দাবিতে কি শ্রমিকের আন্দোলন করারও অধিকার নেই?

সংবাদ মাধ্যম থেকে এবং সেখানে গিয়ে দেখা গেল কয়েকটি বাম সংগঠন শ্রমিকদের এই আন্দোলনের নের্তৃত্ব দিচ্ছৈন! ন্যায্য বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা আমরণ অনশনের মত আবদারী এক আন্দোলন করছে বাম সংগঠনের নের্তৃত্বে! কার কাছে আবদার? মালিকের কাছে। যে মালিক তিনমাস ধরে বেতন না দিয়ে শুধু শ্রমিককেই নয় তাঁর পরিবারের লোকদেরকেও না খাইয়ে রেখেছে! সেই মালিকের কাছে না খেয়ে মরে যাওয়ার হুমকি!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদের দিন দুস্থদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকেন। এই শ্রমিকদের চেয়ে দুস্থ আর আছে কে? পথের ভিখারিরও একটা আয় ইনকাম আছে। অথচ এই শ্রমিকরা কাজ করেও তিন মাস বেতন পান না। এই দুস্থ শ্রমিকরা যদি সপরিবারে সদস্যদের নিয়ে খয়রাতের জন্য নয়, তাদের ন্যায্য বেতনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে যেতেন তবে কি প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন? বাম নেতারা এই ধরণের আবদারী আন্দোলনের চেয়ে শ্রমিকদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করাতে নিয়ে যেতে পারতেন! পারতেন না। কারণ তাঁরা জানতেন এমনটি হবার নয়। সেখানে শিরনির জন্য ছাড়া অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যাওয়া চলে না! এই নেতারা শুধু এটুকু জানেন না যে, মালিকের কাছে শ্রমিকের অভিমানি আন্দোলনের কোন মূল্য নেই! শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রতিবাদ ছাড়া, বল প্রয়োগ ছাড়া কখনো হয়েছে কি? শ্রমিক ভিক্ষুক নন। শ্রমিক চায় তার অধিকার। শক্তি খরচ করেই সে প্রতিদিন বাঁচে, মালিকও বাঁচে শ্রমিকের শক্তি চুষে। তার খাদ্য বন্ধ করলে সে নিজের মৃত্যুর হুমকি দেবে কেন? শক্তি প্রয়োগে মালিকের খাদ্য বন্ধ করে অধিকার ছিনিয়ে আনাই তার কর্তব্য নয় কি? ন্যায্য বেতনের জন্য দেনদরবার করতে হবে কেন?

পুনশ্চ: মালিক পক্ষ, বিজিএমইএ বা সরকার যদি শ্রমিকের বেতন দিয়ে দেয়, শ্রমিকের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তবে কি এ আন্দোলনকে সফল বলা যাবে? কাজ করেও তাঁদের অনাহারী তিন মাসের কি হবে?

৩১//১৪

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s