প্রমিজল্যান্ড :: স্থায়ী তেল দখলের পাঁয়তারা!

Posted: জুলাই 20, 2014 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , ,

লিখেছেন: জাহেদ সরওয়ার

gaza-35আরব বিশ্ব বহুদিন ধরে পশ্চিমাবিশ্বের জ্বালানির স্থায়ী জোগানদার। তেলের খনির ওপর ভাসমান আরববিশ্ব তাই পশ্চিমাদের জন্য অপরিহার্য। মাঝখানে লাতিন আমেরিকার ভেনেজুয়েলাসহ আরো কিছু দেশের তেলের জোগান তারা হাত করতে পেরেছিল। কিন্তু লাতিন আমেরিকায় ফিদেল কাস্ত্রো ও হুগো চাভেজের নেতৃত্বে দখলদার বিরোধী চেতনা জোরদার হলে পশ্চিমাবিশ্ব সেখান থেকে একপ্রকার পাত্তাড়ি গোটায়। যদিও হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর আবার ভেনেজুয়েলা দখলের পাঁয়তারা শুরু করেছে। অস্থির করে তুলেছে চাভেজপরবর্তী মাদুরো সরকারকে। বলা হয়ে থাকে, ভেনেজুয়েলায় সৌদি আরবের চেয়ে বহুগুণ তেলের মজুদ আছে। তবে আরববিশ্বকে তারা হাতে রেখেছে বিভিন্ন কৌশলে। আরববিশ্ব একসময় ব্রিটেন, ফ্রান্সের যৌথ উপনিবেশ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে আরবে পশ্চিমা উপনিবেশের অবসান হয়ে নতুন নতুন রাষ্ট্র স্বাধীনতা অর্জন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জোরেশোরে শুরু হয় বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদে মার্কিন নেতৃত্ব।

ট্রাডিশনাল তথা সামন্তীয় উপনিবেশের শেষ হয়ে আসছিল সারা বিশ্বে। ফ্রান্স, ব্রিটেনও বুঝতে পেরেছিল। তাহলে তেলসমৃদ্ধ আরববিশ্বকে ধরে রাখার উপায় কী? এরই পরিকল্পনার ভিত্তিতে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে কাজ করেছিল। প্রশ্ন আসতে পারে, আরববিশ্বকে ধরে রাখতে বা দখলে রাখতে ফিলিস্তিন কেন? এখানে পশ্চিমাবিশ্ব কাজে লাগিয়েছে ধর্মীয় বিরোধকে। জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা নিয়ে একটা পুরনো বিরোধ ছিল। এই ঐতিহ্যবাহী উপাসনালয়টি একই সঙ্গে সেই সময়ে জেরুজালেমবাসী ইহুদি, খ্রিস্টান ও নব্য মুসলমান সবার উপসনাকেন্দ্র ছিল। ইহুদিরাই ছিল তখন উপাসনালয়টির নেতৃত্বে। নব্য মুসলমানদের আকসায় উপাসনা করতে ইহুদিরা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তখন আরব জাহানে দিকে দিকে মুসলমানদের জয়জয়কার। ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত নিয়ে তৎপর তখন মুসলিম সম্প্রদায়। তারা অনেক শক্তিশালীও তখন। হজরত ওমরের নেতৃত্বে জেরুজালেমের এই উপাসনালয়টি মুসলমানদের হস্তগত হয়। আর ইহুদিরা যেহেতু হজরত মুহম্মদ (সা.)-কে কখনোই মেনে নিতে পারেনি, তাদের সঙ্গে মুসলমানদের বিরোধ প্রায় স্থায়িত্ব পায়। কোরআনেও ইহুদি প্রশ্নে অনেক আয়াত আছে।

ইহুদিরা সারা বিশে ছড়িয়েছিটিয়ে ছিল। পৃথিবীর ধনিক শ্রেণির অধিকাংশই তারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিংহভাগ ধনকুবেরই ইহুদি। ঠিক এই পুরনো বিরোধের আবেগকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তখনো ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল এসব এলাকা। ফিলিস্তিনে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পেছনে নেতৃত্ব দেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। এরপরের ইতিহাসের পট খুব দ্রুতই পরিবর্তিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই আরবইসরায়েল বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর ফলে উত্থান ঘটে আরব জাতীয়তাবাদের। ইঙ্গমার্কিন জোট দুভাবে আরবকে দখলে রাখে। ইসরায়েলকে দিয়ে পুরো আরবকেই অশান্ত করে রাখে আবার আরবের প্রায়ই দেশের সঙ্গে তাদের তেল ব্যবসায়ও জারি রাখে। ইঙ্গমার্কিন জোট ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনে পুনঃস্থাপিত করার কারণে আরব জাতীয়তাবাদের অপ্রিয়ভাজনে পরিণত হলে তাদেরই উৎসাহে আরব জাতীয়তাবদীদের জোট আরব লীগ গঠন করা হয়।

সিরিয়া জর্দান ইরাক লেবানন ও মিসর একটা চুক্তি করে প্রাথমিকভাবে আরব লীগ গঠন করে। পরে ইয়েমেন ও সৌদি আরবও এই লীগে যোগ দেয়। কিন্তু লীগ আরব রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতাকে বাস্তবে রূপায়ণ করার জন্য কোনো সংগঠন সৃষ্টি করতে পারেনি। ফিলিস্তিনকে আরব লীগের কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে সুদান তিউনিসিয়া লিবিয়া ও মরক্কো আরব লীগে যোগ দেয়। আরব লীগের প্রতিনিধিদের নির্বুদ্ধিতা ও ইঙ্গমার্কিন জোটের কূটনৈতিক তৎপরতায় ইসরায়েলকে নির্মূল করার উদ্দেশ্য আরব লীগের প্রচেষ্টা বাস্তবে পরিণত হতে পারেনি। বরং নেতাদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করা হয়েছে। শুধু নেতাদের মধ্যে নয়, প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রেই খুব সচেতনভাবে বিভক্তি তৈরি করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যেজুড়ে আজকের যেই অশান্তি লিবিয়া ইরাক সিরিয়া ফিলিস্তিন তা এই বিভক্তির দান। এটা সাম্রাজ্যবাদের পুরনো নীতি। ভাগ করো তারপর শাসন করো। কারণ একটা রাষ্ট্রের দুটা গ্রুপ যদি যুদ্ধ করে তাদের শক্তি ক্ষয় করে ফেলে তাহলে বাকিটা সহজেই পরাজিত করা যায়। তখন ধ্বস্তবিধ্বস্ত দেশটির খনিজ সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদ হস্তগত করা তেমন সমস্যা নয়। এটাই সাম্রাজ্যবাদের পলিসি। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার কিছু বছর পরই ১৯৫৬ সালে মিসর আক্রমণ করে। ১৯৬৭ সালে মিসর সিরিয়া ও জর্দানে বিমান হামলা চালায়।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সিনাই মরুভূমির পাশাপাশি সিরিয়ার গোলান মালভূমি, জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং জেরুজালেমের পূর্ব অংশসহ অবশিষ্ট সব ফিলিস্তিনি ভূখইসরায়েল দখল করে নেয়। এ সম্পর্কে ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বিন গোরিওন ১৯৪৮ সালে বলেছিল, মনে রাখতে হবে যে, ‘যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এ রাষ্ট্র কখনো তার বর্তমান আয়তন ও সীমানা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে না। নীল নদ থেকে ফোরাত উপকূল পর্যন্ত ইসরায়েলের সীমানা বিস্তৃত হবে।১৯৭৩ সালে আবারও ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়। ইসরায়েল রাষ্ট্রটিকে আধুনিক সব মারণাস্ত্র এমনকি পারমাণবিক বোমা দিয়ে শক্তিশালী করা হয়েছে। ইসরায়েলকে সহজে থামানো যাবে না। কারণ ইসরায়েলের ছদ্মবেশে আসলে সাম্রাজ্যবাদই আরবের তেলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। ইসরায়েল এখন আরবের স্থায়ী যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল প্রতিনিয়তই তার সীমানা বাড়ানোয় তৎপর। প্রতি দশ বছর পর পর ইসরায়েলের অস্তিত্ব বিপন্ন বলে শোরগোল তুলে আরবের ভূমি দখল করে নিচ্ছে ইসরায়েল। ১৯৬৭ সালে সিরিয়ার ভূমি ইসরায়েল দখল করে নিচ্ছে এমন অভিযোগে যুদ্ধ শুরু হলে ইঙ্গমার্কিন জোট শান্তি বিঘেœর অজুহাতে ইসরায়েলের সমর্থনে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন নৌবহর প্রেরণ করে। এর জবাবে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নও ভূমধ্যসাগরে নৌবহর প্রেরণ করে এবং স্পষ্ট ঘোষণা করে যে তারা আরবদের সমর্থন করে ও কোনো প্রকার আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ সোভিয়েত রাশিয়া বরদাস্ত করবে না। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আরো বেশি একপেশে হয়ে যায়।

পাশ্চাত্যশক্তি ইসারায়েলের সঙ্গে যেই প্রমিজল্যান্ডের পরিকল্পনা করেছে তাতে জর্দান সিরিয়া ও লেবানন, কুয়েত এই চারটি দেশ নিজেদের পরিচয় মুছে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে। গ্রিস মিসর ইরাক ও সৌদিয়া আরবের অর্ধেক ইসরায়েলের ভেতরে ঢুকবে। এই বিশাল এলাকাকে প্রমিজল্যান্ড পরিকল্পনা করে এগোচ্ছে এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ফিলিস্তিনের নিশ্চিহ্ন করা এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। পুরা ফিলিস্তিন গ্রাস করে তারা হাত দেবে অন্য পরিকল্পনায়। গাজার শিশুনারী ও নিরীহ মানুষ হত্যা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ইরাকের গৃহযুদ্ধ মিসরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইত্যাদি একই সূত্রে গাঁথা। যেসব দেশ তেল সম্মৃদ্ধ এই প্রমিজল্যান্ড প্রজেক্টে সবই চলে আসে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় ইসরায়েলকে দিয়ে তাহলে আরবের তেলের একমাত্র দখলদার হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী। ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ এখনো যারা অবশিষ্ট আছে তাদের হত্যা করে তাদের ভূমি দখলে আরবের অন্যান্য রাষ্ট্র যেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে তার জন্য আরবের প্রতিটি রাষ্ট্রেই বলতে গেলে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছে ইঙ্গমার্কিন জোট। এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই যে এই দানবীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আরবদের মধ্যে কোনো ঐক্য নেই বললেও চলে তার ওপর তারা নিজেদের গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। আরবের সাধারণ মানুষ যদি নিজেদের মধ্যে তুচ্ছ বিবেদ ভুলে নিজেরাই সংগঠিত হতে না পারে তাহলে তাদের আসলে কেউ বাঁচাতে পারবে না। মুসলমানরা জন্মনিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করে না। তার জন্মকে খোদাপ্রদত্ত বলে মনে করে। ফলে দ্রুত বর্ধিত আরব জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতেই আসলে ইসরায়েলিরা শিশুদের হত্যা করছে অবিরত। শিশু আর নারী গণহারে হত্যা করতে পারলে এদের জন্মনিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ধরনের একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তারা এগোচ্ছে।

সম্প্রতি গাজা আক্রমণে শত শত শিশু হত্যা যেই বিশ্ববিবেক সামাজিক গণমাধ্যমে স্বোচ্চার হয়ে উঠেছে তাদের প্রতিবাদ আসলে অতটুকুই। এদের জন্য আর কিছুই করা প্রায় অসম্ভব। ইসরায়েলিরা বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বানে সাড়া দেয় যখন তাদের দখল হত্যা ইত্যাদি টার্গেট পূর্ণ হয় তখন। আর বিশ্বের প্রভাবশালী সব মিডিয়াই যেহেতু তাদের নিয়ন্ত্রিত তারা এটার প্রচার দেয় ভিন্নভাবে। যেমন বিশ্ব মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করছে ‘ইসরায়েল মানছে যুদ্ধবিরতি কিন্তু হামাস মানছে না’। আমাদের দেশের প্রথম আলো পর্যন্ত এই শিরোনামে খবর ছেপেছে। কিন্তু হামাস তো জানে এটা কেবলই ইসরায়েলের খেলা। তাদের একটা টার্গেট পূর্ণ করেই তারা যুদ্ধবিরতির ডাক দিচ্ছে। খালি চোখেও এটা দেখা যায় যে শত শত নারী শিশু হত্যা করে শত শত বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে তারা বলছে তারা যুদ্ধবিরতি চায় এটা হাস্যকর।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s