লিখেছেন: স্বপন মাঝি

artworks-034সমতাকে (সাম্যবাদী আন্দোলনের সংগঠক সত্যেন্দ্রনাথ রায়ের মেয়ে) পড়াতাম। ওর কাছেই খবর পাই উন্মেষের। সমতা বলছিল, ওখানে গিয়ে, আমি আমার লেখা পাঠ করতে পারব। লেখার চেষ্টা সক্রিয় ছিল, প্রকাশ ছিল না। লেখা হচ্ছে কিনা, যাচাই করিনি, ভয়ে। সমতার কথায় একদিন তার বাবাকে বললাম, উন্মেষে নিয়ে যাবার জন্য। তিনি নিয়ে গেলেন। একে একে পরিচয় হল, মহসিন শস্ত্রপাণি, (সমতার মুখে শুনে শুনে একটা ভয় আগে থেকেই তৈরী হয়ে ছিল।) মতিন বৈরাগী, মুনীর সিরাজ, সমুদ্র গুপ্ত, সৈয়দ তারিক, মঞ্জুর সামস, কাজী মনজুর, কফিল আহমেদ, আমিন (হায়, পুরো নাম মনে নেই, উনি মারা গেছেন; সেকারণে হয়তবা।) আশরার মাসুদ, সুনীল শীলের সাথে।

ঘাম ঝরানো ভয়ে ভয়ে পাঠ করেছিলাম, একখানা কবিতা। কেউ কিছু না বলায়, বেঁচে গিয়ে, বুঝেছিলাম, কিছুই হয়নি। তাই সবাই নীরব।

প্রথম প্রথম উন্মেষের আশ্রয়ে, কিছুটা প্রশ্রয় পেলেও, পরে আর তা টিকল না। মহসিন ভাই খুব নির্দয়ভাবেই সমালোচনা করতেন, মনে হত, ছুরি চালাচ্ছেন। ভয় পেয়ে পালিয়ে আসিনি। কারণ ছুরি শুধু আমার উপর নয়, সবার উপর চলত। নমস্যদের আক্তান্ত দেখে, আশ্বস্ত হতাম।

মতিন বৈরাগীর কবিতা দীর্ঘ হত, প্রায়ই। এই দীর্ঘ কবিতা লেখার অন্যায়ে, সমুদ্রদা খুঁজে পেয়েছিলেন, পণ্যের বাজার। গল্প ফেঁদেছিলেন, এক কৃষক বাঁশ বিক্রি করবে। বেশি পয়সা উপার্জনের আশায়, বাঁশটাকে ছোট ছোট টুকরা করে না কেটে, অখণ্ডিত বাঁশ নিয়ে যখন বাজারে উপস্থিত, হাট ভেঙ্গে গেছে। লম্বা বাঁশটাকে বহন করতে গিয়ে পথেই তার সময় খরচ হয়ে যাবার কারণে, সে বাজার হারিয়েছে।

একটা কবিতা দীর্ঘ হবার কারণে, এতবড় ব্যাখ্যা? তখন বুঝিনি। এখন এই কথাটা অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বিক্রয়যোগ্য হলেই হবে না, সঠিক সময়ে বাজারে উপস্থিত হওয়া চাই। আবার এভাবেও বলা যায়, দীর্ঘ কবিতা পড়ার যুগ, কলযুগে পড়ে শেষ হয়ে গেছে।

মতিন ভাইয়ের কথা ছিল, যার লম্বা বাঁশ দরকার, সে ঠিকই তার কাঙ্খিত বস্তুর জন্য অপেক্ষা করবে। আমার এখন মনে হয়, দু’জনেই হয়ত ঠিক; পার্থক্য সংখ্যায়।

পাঠচক্রে বিরতি দিয়ে, সবাই চাঁদা দিত, চা নাস্তার জন্য। এই বিরতিটুকু ছিল হাঁফ ছেড়ে বাঁচার।

চন্দ্রমোহন বসাক স্ট্রিটে, মহসিন ভাইয়ের ছাপাখানা, হরপ্পা থেকে উন্মেষের আসর সরিয়ে নিয়ে আসা হল, মহসিন ভাইয়ের টিকাটুলীর বাসায়। অনেকের আসা কমে গিয়েছিল, আগেই। মনে পড়ে, সৈয়দ তারিক, মুনীর সিরাজকে আর দেখা যেত না। সমুদ্রদাও অনেকটা অনিয়মিত। নিয়মিতদের মধ্যে ছিলেন মতিন বৈরাগী, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, আশরার মাসুদ, মঞ্জুর সামস, কাজী মনজুর, সুনীল শীল।

তারিক ভাইকে দেখা যেত খুব কম। কিন্তু দেখলে ভয় পেতাম। মানুষ এত জানে কেমন করে? ভাবতে অবাক লাগত। সাহিত্য, ছন্দ নিয়ে কথা বলতে গেলে, বলে যেতেন কলকলিয়ে, যেন অপ্রতিরোধ্য ধারা। সৈয়দ তারিক ভাই যে আবার হাত দেখায় পারদর্শী, তা আমার জানা ছিল না, জানলাম বইয়ের দোকানে আড্ডা মারতে মারতে। আমার বন্ধু বেবীর হাত দেখে কী কী বলেছিলেন, আজ আর আমার মনে নেই।

মুনীর সিরাজ খুব গম্ভীর থাকতেন। মন্তব্য করতেন আরও কম। তাঁর কবিতা সব সময় প্রশংসনীয় হত। মতিন ভাইয়ের কাব্যজ্ঞান, কাব্যবোধ ছিল বেশ উঁচু। তাঁর নজর কাড়ার মত একখান কবিতাও লিখতে পারিনি।

সুনীল শীল সবার নজর কেড়েছিলেন। শুধু মতিন বৈরাগী নন, তিনি সমুদ্রদা, মহসিন ভাইয়ের কাছ থেকেও অকুণ্ঠ প্রশংসা পেতেন। খুব ভাল লাগত তাঁর কবিতা। কবিতা বলতে, তিনি বুঝতেন, খেঁটে খাওয়া মানুষের ঘাম আর রক্ত। শুনতে শুনতে শল্যগান মনে হয়নি, কখনো।

কারও নজর কাড়তে না পারলেও সমুদ্রার প্রশ্রয় পেয়েছিলাম।

৮৮র বন্যায় ঢাকা শহরের অধিকাংশ এলাকা ছিল পানির নিচে। পুরান ঢাকার রাস্তাগুলো বুক পানির নিচে। রাস্তায় নৌকা চলে। যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে, গরীব মানুষের আজাব হয় বেশি। এবারেও তাই হল। বস্তিবাসীরা দলে দলে এসে আশ্রয় নিতে লাগল, বিদ্যালয়গুলোতে। খাবার আর বিশুদ্ধ পানির অভাব।

ছুটে গিয়েছিলাম সমুদ্রদার কাছে। তখন তিনি প্রশিকায় কর্মরত। প্রথম কয়েকদিন দুই বস্তা করে আটার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। দুর্বার নামে আমাদের সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল, সদস্যরা, সবাই মিলে, রুটি বানিয়ে, সেগুলো বিলি করত। আমি আর মানিকদা সংগ্রহ করে আনতাম, কখনও নৌকায়, কখনও রিক্সায়। কী কারণে আটা দেয়া আর সম্ভব হয়নি, মনে নেই।

এরপর নারীপক্ষের দ্বারস্থ হয়ে কাজ চালিয়েছিলাম।

ত্রাণ কার্য চলা কালে ছবি তোলা নিষেধ ছিল।

সম্ভবত কলাবাগানের বাড়ীতে নিয়ে গিয়েছিলেন একদিন। তারপর বাসা বদল। বাসায় গাছের গুড়ি দিয়ে সাজানো বৈঠক ঘর।

সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম, কবিতা উৎসবে, কবিতা পাঠের কথা শুনে। সাথে প্রেমিকা থাকলে হয়ত পাঠ করে ফেলতাম। কিন্তু কার জন্য এই কাব্য, যে দুঃখে কবিতা, সেইই তো নেই আমার জীবনে। পাঠ করে আর কী হবে? তারপর আবার ছন্দহীন কবিতা।

বেকারত্ব, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ফসল চুরি, চিকিৎসা করতে না পারার ব্যর্থতা, সব মিলে, হতাশার শেষ প্রান্তে। বন্ধু বাদল এগিয়ে এসেছিল। দেড় লক্ষ টাকা দিয়েছিল, বইয়ের দোকান দেবার জন্য। ব্যবসা ছিল না আমার মগজে, তবুও পা বাড়ালাম।

আমাকে স্নেহ করেন, এমন অনেকে এসেছিলেন আমার ব্যবসা দেখার জন্য। মহসিন শস্ত্রপাণি, কামাল লোহানী, বশির আল হেলাল, আহমদ শরীফ। শরীফ স্যার, বাংলা একাদেমির সাবেক উপপরিচালক আবুল হাসনাত মহোদয়কে পাঠিয়েছিলেন, বুদ্ধি দিয়ে আমাকে সাহায্য করার জন্য। তিনি নিয়মিত হয়ে গেলেন, সেই সাথে তাঁর ছেলে মাহবুব; খুব ভাল কবিতা লিখত। জানিনা এখন কোথায় কেমন আছেন।

এখানে আসতেন কবি সুহিতা সুলতানা (ফেবুতে বন্ধুযোগের অনুরোধ পাঠিয়েছিলাম, ভুলে গেছেন, তাই আর যোগ করেননি। আমিও অনেককে ভুলে গেছি। তাই মন খারাপ করিনি) আসতেন, মনি হায়দার। অনেক দিন ধরে খুঁজে খুঁজে অবশেষে, হুমায়ুন কবীর ঢালী ভাইয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ হল। প্রখর স্মরণ শক্তি। অনেক কিছু এখনও মনে রেখেছেন। মিজানুর রহমান মিজানের ত্রৈমাসিক ‘গণিত সংখ্যায়’ বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন, ঐ সময়।

সমুদ্রদা থেকে গেলেন, দোকানের অংশ হয়ে। লেনদেনের চেয়ারে বসে, আমাকে হুকুম দিতেন, চাপুরী নিয়ে আসার জন্য। দ্বিতীয় তলায় ছিল, তরঙ্গদার খাবারের দোকান। সমুদ্রদার ছোট ভাই। দুপুরের খাবার ওখানেই খেতাম। দোকানে আড্ডা লেগে থাকত।

রবীন্দ্রনাথের খুব সুন্দর একটা ছবি এঁকে দিয়েছিল আজমীর। কত খদ্দের কিনতে চেয়েছে, বিক্রি করিনি। দেশ থেকে আসার পর, ঘর থেকে কে যেন, চুরি করে নিয়ে গেছে ছবিটা, আর উদ্ধার হয়নি।

দোকানে গান চলত সারাক্ষণ। শ্যামল আসত বাঁশী নিয়ে। সে খুব সুন্দর বর্ণিক। আসত রানা, অভী। নাট্য জগতের তরুণ বন্ধ বাপ্পী, সাথে বন্ধু সোমা, যার নাম ভুলে যেতাম বলে, দোকানে ঢুকেই বলত, আমাকে চিনতে পারছেন? আমি সোমা।

জানি না বাপ্পী, সোমা কোথায়, কেমন আছে।

একদিন হঠাৎ করেই বললেন, কলকাতা যেতে হবে। নিমন্ত্রণ এসেছে কলকাতা থেকে। সাহিত্যিকদের মিলন মেলা। আমাকেও যেতে বললেন। আমার লোভ যেমন হল, ভয়ও হল।

সড়ক পথে যাত্রা। আমরা চারজন, কামাল লোহানী, বশির আল হেলাল, সমুদ্র গুপ্ত ও আমি। ইমিগ্রেশনে দেখলাম এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কামাল লোহানী সবার আগে পাসপোর্ট দিলেন, ইমিগ্রেশন কর্ত্রী, কামাল লোহানীর মুখের দিকে তাকিয়ে, জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি স্বাধীন বাংলার কামাল লোহানী?

কামাল লোহানীকে চিনতাম সেই প্রেস ইনস্টিউট (?) থেকে। খুব অমায়িক ছিলেন। আমাদের এলাকায় ‘একুশে’এর অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন। সমুদ্রদাও ছিলেন। আমন্ত্রণ পত্র দিতে উনার অফিসের একজন কর্মাচারী, আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, তুমি কি স্যারকে চেনো?

মাথা ঝাঁকাতে দেখে বললেন, উনি তো ‘একুশে’ চেতনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। উনি কি আসবেন, উনাদের অনুষ্ঠান ফেলে তোমাদের অনুষ্ঠানে?

এবার আমার একটু মান হল। আমি বললাম, আপনি তো উনাকে চিনেন, উনার কাছ থেকেই জেনে নিয়েন।

বিখ্যাত মানুষদের সাথে পরিচয় থাকলে, অখ্যাত মানুষদের বিড়ম্বনা এবং সুখ দুইই থাকে।

পাঞ্জাবীপায়জামা পরিধান করা সুদর্শন কামাল লোহানীর উত্তর পেয়ে উনি সঙ্গে সঙ্গে উনার পা ছুঁয়ে ভক্তি করলেন, বিড়বিড় করে বললেন, আমার এত বড় সৌভাগ্য, এগিয়ে গেলেন বশির আল হেলাল, তারপর সমুদ্রদার দিকে, না তাকিয়ে উনার যাত্রা দেখে, আমি ভয়ে একটু পিছিয়ে গেলাম। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ওঃ আপনি তোকথা শেষ হবার আগেই সমুদ্রদা বললেন, ও কবিতা লেখে।

আমি সে দৃশ্য দেখে আপ্লুত।

সীমান্তের ওপারে তোরণ। গাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছেন আয়োজকরা। অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেলেন কলকাতার নামী হোটেলে, নাম ভুলে গেছি। গাড়ী, চালক, গাইড সব দিয়ে দেয়া হল। আরামের জীবন, রাজকীয় জীবন।

ঐ ক’দিনের খাবার ছিল আমার জীবনে শ্রেষ্ঠতম অর্জন। এত সুস্বাদু খাবার, এত পদ আঃ! খেয়েও সুখ, মরে গিয়েও সুখ। সুখের যেন শেষ নেই।

গাড়ীতে পরিচয় হল, লেখিকা সেলিনা হোসেনের সাথে। আমি বাংলাদেশ থেকে, শুনে উনি অবাক হলেন। সমুদ্রদা পরিচয় করিয়ে দিলেন, গল্পকার এবং কবি হিসাবে। কেননা ততদিনে বাজারে আমার গল্পের বই প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল, দু’টো। প্রথমটা ’৯২র দিকে, দ্বিতীয়টা ’৯৪র দিকে। সুতরাং আমি ফেলনা কেউ না। ছোট গল্প নিয়ে কথা বলতে বলতে সেলিনা হোসেন আমাকে বলে বসলেন, আপনি বক্তব্য রাখছেন না কেন?

লজ্জার কী কোন সীমা থাকে? থাকে না। আমি পারলে পাতালে প্রবেশ করি। সমুদ্রদা দিলেন, প্রবল উৎসাহ। বেঁচে গেছি, অনেক বলে কয়ে।

সারাদিন আলোচনা, পাঠ চলে উপরে। আমি নিচে আড্ডা মারি যাকে পাচ্ছি, তার সাথেই।

মানিকদার সাথে দেখা করতে গিয়ে মন খারাপ করে ফিরে এলাম। উনি যেন কত বদলে গেছেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বিদায় দিলেন। অবাক লাগল। এক সময় দিনের পর দিন আড্ডা দিয়েছি। আর আজ যেন প্রায় অচেনা এক মানুষ।

আমাদের থাকতে দেয়া হয়েছিল এক বিলাসী হোটেলে। নাম ভুলে গেছি।

অন্যান্য প্রদেশ থেকে আগত কবিদের সাথে রাতে আড্ডা হত। সমুদ্রদার সাথে আমার তর্ক শুরু হয়ে গেল দেশ বিভাজন নিয়ে। উনি বললেন, দেশ বিভাজন ইতিহাসের অনিবার্য্য ফল।

ক্ষতির প্রশ্নে বললেন, অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যাবে।

আমি বুঝাতে চাইলাম, অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়ে ভয়ংকর যে ক্ষতি হয়ে গেছে, বা হচ্ছে তা পুষিয়ে নেয়া যাবে না। সেই ক্ষতিটার নাম সাংস্কৃতিক ক্ষতি। একজনের নাম মনে আছে, বিহারের কবি বিদ্যুৎদা আমার বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

আমাদের তুমুল তর্কের কারণে পাশের কক্ষ থেকে কামাল লোহানী এস উঁকি দিয়ে গেলেন। ঐটুকু আমাদের চুপ হয়ে যাবার জন্য যথেষ্ট ছিল।

দুর্বারের অনুষ্ঠানের ঘটনা মনে পড়ে গেল। আয়োজক এবং সংগঠক হিসাবে আমি বিপুল হট্টগোলের মধ্যে যা বলেছিলাম, কারও কানে পৌঁছেছিল কিনা, জানতে পারিনি। সমদ্রদাও সেই হট্টগোলের মধ্যে বক্তব্য দিলেন। কামাল লোহানী মঞ্চে উঠে দিলেন, হুংকার। কণ্ঠ তো নয় বজ্রপাত। ঠাঠা পড়লে যা হয়, তাই। সব চুপ।

আমরাও চুপ করে শুয়ে পড়লাম।

সে সময় পবিত্র সরকার, কামাল লোহানী, বশির আল হেলাল, অভিন্ন বানান নিয়ে ঘরোয়া আলোচনা করেছিলেন। বাংলা একাডেমির প্রমিত বানান সেই আলোচনার ফসল কিনা, জানি না।

পরিচয় হয়েছিল, জিয়াদ আলীর সাথে। তিনি জহির রায়হানের নিখোঁজ হবার সময় ঢাকায় ছিলেন। সেই ঘটনা নিয়ে একটা লেখা তৈরী করেন। এক কপি আমাকে দিয়ে দিলেন, ঢাকায় এনে কোন পত্রিকায় ছাপাবার জন্য। ভেবেছিলাম, জহির রায়হানের উপর আরও কিছু লেখা সংগ্রহ করে, একটা পুস্তিকা বের করব। অনেক নাহওয়ার মধ্যে এও ‘ন’এর ঘরে বন্দী হয়ে থাকল।

সমুদ্রদা আমাকে নিয়ে গেলেন, কবি কাজল চক্রবর্ত্তীর বাসায়। উদ্দেশ্য, কাজলদাকে দিয়ে উনার পরিচিত কোন ডাক্তারকে আমার চোখ দেখানো। কাজলদা, তাঁর মোটর বাইকে বসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, একজন চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক চোখ দেখে, বলে দিলেন, শংকর নেত্রালয়ায় যেতে।

নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম, একজন লেখকের বাসায়। সে কি আয়োজন। খাবারের আগে খুব সম্ভবত অনীলদা আমাকে বলেছিলেন, লেখাটা ছাড়বেন না। এত অল্প বয়সে মাটির এত কাছাকাছি, খুব ভাল লেগেছে গল্পটা। কথা বলছিলেন, ‘গ্রাস’ গল্পটি পড়ে। এই গলপটি উন্মেষে পাঠ করেছিলাম, মহসিন ভাই বলেছিলেন, একটা ধ্রুপদী গল্প হতে পারত, কিন্তু গল্পটির মৃত্যু ঘটিয়েছে লেখক। জানি না, কেন; তবুও বিবেচনায় নেইনি। আরও একজন বন্ধু বলেছিলেন, গল্পটির অপমৃত্যু নিয়ে।

কয়েকজন ঠিকানা নিলেন এবং নিজেদের ঠিকানাও দিলেন। লেখা চাইলেন, বললাম দেব। মনে মনে ভাবলাম, আমি তো লেখক নই। এত লেখা কোথায় পাব? সবচেয়ে বড় কথা, আমার মত অলসের দ্বারা প্রচার যে হবে না, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম।

আয়োজকদের গাড়ীতে করে আমরা চলে এলাম বর্ধমানে। থাকার ব্যবস্থা হল, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। দিন ভর ঘুরে ঘুরে দেখলাম।

কামাল লোহানী ও সমুদ্রদাকে সম্বর্ধনা দেবে, পৌরপিতা (?)। কামাল লোহানী মঞ্চে। সমুদ্রাকে তখনও ডাকা হয়নি। এমন সময় একজন সমুদ্রদাকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনার আসল নাম কি দাদা?

সমুদ্র গুপ্ত।

না, না বলুন না।

ঐ যে স্বপনকে জিজ্ঞেস করুন। এমন ভঙ্গিতে বললেন, যেন বাংলাদেশের কোন হর্তাকর্তা আমি। আমিও জোর দিয়ে বললাম, হ্যাঁ, উনার নাম তো সমুদ্র গুপ্ত।

এখানে এক দম্পতির সাথে পরিচয় হয়েছিল। নিমন্ত্রণ করে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। নাম খুব সম্ভবত নজরুল ইসলাম। বিয়ে করেছিলেন, হিন্দু; ছেলের নাম রেখেছেন, হিন্দু মুসলিম মিলিয়ে। এখন আর মনে নেই, সেকি কৃষ্ণ মোহামম্মদ না অন্য কোন নাম।

সন্ধ্যায় আসর বসল। স্থানীয় এক নেতা + সাহিত্যিক এলেন, উনার সাহিত্য কর্ম নিয়ে, আর ক্যাম্পাসের বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী। ঘরোয়া আড্ডা।

যতটুক মনে পড়ে, আমি কিছুটা সমালোচনা করেছিলাম, এই বলে; লেখায় জনগণের কথা বলতে যা বলা হয়েছে, তা উপরে উপরে।

নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে বলতে চলে এল, শিল্প। খুবই জটিল আলোচনা। আলোচনা জটিল হয়ে গেলে, আমি সাধারণত কেটে পড়ি। এখন কেটে পড়ার উপায় নেই, বসে রইলাম, কখন আলোচনা শেষ হবে এ আশায়। আলোচনা শেষ হলেই রাজকীয় খাবারের ডাক পড়বে।

একজন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাদের এই তরুণ দাদা তো কিছু বলছেন না।

কিছু যে জানি, সুযোগ পেয়ে বলে দিলাম, শিল্পের জন্য শিল্প বলে কোন কথা নেই। তুলি, কলম কাগজ এমন কোন উপকরণ নেই, যেখানে ঘাম নেই। আর কী কী বলেছিলাম, মনে নেই। আমার কথা শুনে অনেকে আমার ডায়েরিতে তাদের নাম ঠিকানা দিয়ে যোগাযোগ রাখতে বলেছিলেন।

নিজের হাতে নাম ঠিকানা দিয়েছিলেন, Indranil Kandilal, Krishna Malik, Sabyasachi Dhar, Prasun Mitra, Nabadita Basu, মলয় শংকর মণ্ডল, সুপর্ণা সেন, মনীষা রায় ও অপর্ণা মুখার্জী।

পরের দিন সকালটা ছিল খুব উত্তেজনাকর। ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত নাট্যকার হাবীব তানভীর আসবেন। আমাদের জন্য সে ছিল এক সৌভাগ্য। আয়োজকরা উনার সাথে আমাদের সকালের জলখাবারের সময় সাক্ষাতে ব্যবস্থা করলেন। কথা বললেন, আমি বাদে সবাই। কোন রকম সুযোগ পেয়ে আমি বলতে পেরেছিলাম, ঢাকায় আপনার আগ্রা বাজার দেখার সুযোগ হয়েছিল। খুব খুব ভাল লেগেছিল। ভেরি ভেরি হ্যাপি। এই রকম ইংরেজি। হাবীর তানভীর বিয়ে করেছিলেন একজন হিন্দুকে, জেনে ভাল লেগেছিল, উনার মেয়েও বিয়ে করেছিলেন একজন হিন্দুকে। ধর্ম এখানে কোন বাঁধ নয়। হয়ত ধর্মকে ধারণ করেছিলেন, তাই ধর্মধারী হয়ে উঠেননি।

কোথায় হারিয়ে গেল, সেইসব দিন।

ফোনে কথা হত, মহসিন শস্ত্রপাণি ও সমুদ্রদার সাথে। সমুদ্রদা প্রায়ই আক্ষেপ করতেন, দেশে চলে আসার জন্য। ফোনে কথা বলতে বলতে, একদিন বললেন, স্বপন ফোনে কথা ঠিকমত শোনা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কথার মধ্যে জল পড়ছে। তারপর দিন ফোন করে সমুদ্রদাকে কবিতাটা শোনালাম,

কথার মধ্যে জল পড়ে,

আমি ডুব সাঁতারে হাতড়ে ফিরি কথার জল।

কথার মাঝে কথা ঝাপসা হয়ে আসে,

আমি হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসি, কথার কুয়াশায়।

কথার মাঝে, কথা খেই হারিয়ে,

ভেসে যায় কথার জলে। ।”

লেখালেখিতে উৎসাহ দিতেন। কবিতার বই বের করব, শুনে খুশী হলেন। আমি বললাম, কিন্তু আপনাকে সনদপত্র দিতে হবে। উনি দিয়ে দিলেন, ‘আলো আঁধারের খেয়ায়’।

ফোনে কথা হলে, দেশে চলে আসার তাড়া দিতেন। কিছু একটা করা দরকার। উনার কথা শুনে মনে হচ্ছিল, খুব অস্থির হয়ে উঠেছেন। প্রশ্ন করেছিলাম, দেশে এসে কি করব?

অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন দেখছি।

সমুদ্রদার মুখে এ কথা শুনব, ভাবতে পারিনি। তাঁর কবিতায়, কথায়, আলোচনায় সব সময় শ্রমিক কৃষকদে মুক্তি কথা বলতেন, দ্বিধাহীনভাবে।

আপনার ভাবনায় অনেক পরিবর্তন সমুদ্রদা। আপনি একাই ভাবছেন?

বহুমুখী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। হ্যাঁ, অনেকে ভাবছে, খুব জোর দিয়ে বললেন।

শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে এটা না হলে, পরিণতি হবে ’৭১এর মত।

এবার আর ভুল হবে না।

সে পথে যাত্রা শুরু করার আগেই, তিনি অসুস্থ হয়ে গেলেন। কাইয়ুমের কাছে খবর পেলাম; চিকিৎসা ব্যয়বহুল। ভারতে নিয়ে যেতে হবে। যতটুকু পেরেছিলাম, এগিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু থামাতে পারিনি। সমুদ্রদার অসুখের কথা জেনেছিলাম, বাংলাদেশ থেকে ফোনে। পরের ফোনটা পেলাম বাংলাদেশ থেকে নয়, কলকাতা থেকে, কাজলদার ফোন; সমুদ্রদা নেই।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s