Maithon_dam_india-1[*এটাকে ঠিক লেখা হিসাবে না ধরে একটা লেখার আংশিক খসড়া পাঠ হিসাবে বিবেচনা করলে ভাল করবেন, প্রিয় পাঠক নেসার আহমেদ]

নদীকেন্দ্রিক ভারতের তৎপরতা

ভারত ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে পানি এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। বাংলাদেশে ক্ষমতা চর্চাকারী সরকারিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এ বিষয়ে নির্বিকার। কিন্তু ভারতের অবস্থান একদম বিপরীত। ওই রাষ্ট্রের কোনো কোনো প্রদেশে নির্বাচনের ইস্যু হিসাবে ‘জল ঘোলার’ রাজনীতি এখন প্রকট। বিশেষত প্রতি গ্রীষ্মেই দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় ২৮ কোটি মানুষ তীব্র খরার কবলে আক্রান্ত হন। তাদের কাছে তখন খাদ্যবস্ত্রের চেয়ে তৃষ্ণা নিবারণের প্রশ্নটা প্রধান হয়ে ওঠে। যাকে ভিত্তি করে ১৯৯০ সালের পর থেকে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের ভোটের রাজনীতিতে পানি ইস্যুটি ভোটব্যাংক হিসাবে কাজ করে।

অন্যদিকে যারা ভারতের রাজনীতি সম্পর্কে অল্প বিস্তার খবরবার্তা রাখেন, তারা জানেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রীম কোর্টের এস কুমার, এস এইচ কাপাড়িয়া এবং এ কে পাটনায়েকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ একটি মামলার রায়ের প্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২৭ শে ফ্রেব্রুয়ারিতে ভারতের নদীসংযোগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের উপরে নির্দেশ দিয়েছে। যার অংশ হিসাবে ভারত সরকার কেনবেতোয়া সংযোগকারী কৃত্রিম খাল তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে। যা বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে বাধ্য। অথচ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রতিবাদই জানানো হয় নি। ভারতের উপরে চাপ প্রয়োগ করা তো আরো পরের প্রশ্ন। বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করা যেত। সেটাও হয় নি। আমাদের জেনে রাখা দরকার, নদীর পানি বণ্ঠন নিয়ে দ্বিপাক্ষিকবহুপাক্ষিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৯৬৬ সালে হেলসিংকিতে গৃহিত একটা আন্তর্জাতিক আইন বা নীতিমালা গৃহিত হয়। যার ৪ ও ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত দেশ, অভিন্ন নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনা করবে। অন্য কোনো দেশ যাতে বড় কোনো ক্ষতির সম্মুখিন না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখবে। ওই একই আইনের ২৯ () নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অভিন্ন নদীর উপর যে কোনো প্রস্তাবিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং ইনস্টলেশনের ব্যাপারে নদী অববাহিকায় অবস্থিত অন্য যে কোনো রাষ্ট্রের যদি স্বার্থহানির সম্ভাবনা থাকে তাহলে ওই বিষয়ে পার্শ্ববর্তী দেশকে নোটিশ করবে। নোটিশ গ্রহীতা দেশটি যেন প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সম্ভাব্য ফলাফল বিচার করতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি সরবরাহ করবে। প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্থ দেশকে ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব ওই আইনে রয়েছে।

১৯৯৭ সালে গৃহিত জাতিসংঘের জলপ্রবাহ কনভেনশনের (UN Convention on the Law of Non-Navigational Uses of International Water Courses)১২ নং আর্টিকেলে ঠিক একই ধরনের কথা বলা হয়েছে। ৩৫টি দেশ কর্তৃক রেটিফাই হলে ওই কনভেনশনটি আইনে পরিনত হবে। এ পর্যন্ত ৩৪টি দেশ প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। কিন্তু ভাটির দেশে হিসাবে বাংলাদেশ ওই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। তার সঙ্গে ভারতও। ফলে প্রস্তাবটি আইনি মর্যাদা পায়নি। বাংলাদেশ কার্যত প্রস্তাবটি অনুমোদন না করে ভারতের স্বার্থই রক্ষা করেছে।

১৯৯৬ সালে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে একটা অধীনস্ততামূলক গঙ্গা চুক্তি হয়েছিল। যার সংবাদ আমরা সবাই কমবেশি জানি। ভারত এখন আর ওই চুক্তি আমলে নিচ্ছে না। চুক্তির সমস্ত ধারা লঙ্ঘন করছে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল উভয় দেশের সীমানার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত আন্তর্জাতিক নদনদীর পানির অংশিদারিত্ব পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করা হবে। নিজ নিজ দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, নদী অব্বাহিকার উন্নয়ন এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উভয় দেশের জনগনের পারস্পরিক মঙ্গলের স্বার্থে জলসম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহারে উভয় দেশ সচেষ্ট থাকবে। কিন্তু ওই চুক্তির কোনো ধারা পরবর্তীতে ভারতের দিক থেকে আর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। অথচ ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণাঞ্চলের সব নদীগুলিই আজ মৃত প্রায়। আবার বেশ কিছু জেলার মাটি ও পানি লবণাক্ততার শিকার। কিন্তু এই বাস্তবতা নিয়ে ১৯৯৬ সালের পরে ক্ষমতাসীন কোনো সরকারের উচ্চবাচ্চ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় নি।

ভারত ইতোমধ্যে তার উত্তরপূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি নদীগুলিতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অনেকগুলি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। যার মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের একাধিক শাখা নদীর উপরে ডিহিং বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প, সুবানসিড়ি বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প, লোহিত বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প, নোয়া ডিহিং বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প, কুলশি বহুমুখি বাঁধ প্রকল্পসহ মেঘনার শাখা নদীর উপর যদুকাটা ও সোমেশ্বরী বহুমুখি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অন্যতম। আমরা এটাও জানি যে বাংলাদেশের মোট পানি প্রবাহের ৬০ শতাংশ আসে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে। ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যে আমরা সবাই অবগত। সেখানে ব্রহ্মপুত্রের উপরে বাঁধ এবং তার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশকে যে মরুভূমিতে পরিনত করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা বর্হিভূত রাজনৈতিক দলগুলি ভারতীয় নীতির কাছে এতটাই নতজানু যে, তাদের মুখে কোনো টু শব্দ নাই।

একইভাবে সিলেটের সারি নদীর উজানে মেঘালয়ে বাঁধ দিয়ে ১২৬ মেগাওয়াট মাইনথ্রু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রতি চালু করেছে ভারত। মেঘনার অন্যতম উৎস নদী সুরমাকুশিয়ারার উজানে বারাক নদীতে টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আয়োজন করছে। যা দেশের হাওড় অঞ্চলবাসির জীবনজীবিকার উপরে সরাসরি আঘাত। যা কর্মমুখোর মানুষগুলিকে ইনভারমেন্টাল রিফিউজিতে পরিনত করবে। বদলে দেবে ওই অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্যের সার্বিক কাঠামো। অথচ এদেশের প্রতিটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সমস্ত হায়া লজ্জ্বা ঝেড়ে ফেলে ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছে।

তিস্তা নদীও এই প্রক্রিয়ার বাইরে নয়। তিস্তা নদীর উজানে সিকিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ব্যরেজে পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বাংলাদেশের অংশ পানিশুণ্য হয়ে পড়ে ও পড়ছে। পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত সব নদীর উজানে ভারত একতরফা ভাবে বাঁধ নির্মাণ করায় সবগুলি নদী তার নব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। মহানন্দা এবং করতোয়া নদীর ওপর বাঁধ দেয়ার কারণে করতোয়া, চাওয়াই, কুরুম, হাতুড়ি, নাগর, টাঙ্গন, চিলকা প্রভৃতি নদীর অববাহিকা জুড়ে মারাত্মক বিরুপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছে। এসব নদীতে এখন বর্ষা মৌসুমেও পানি থাকে না। ভারত তাদের ব্যরেজে আটকানো পানি ফিডার ক্যানেলের সাহায্যে হলদিবাড়ি, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও বিহারের সেচকার্যে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যতগুলি যৌথ নদী রয়েছে, তার প্রত্যকটি ভারতের তথাকথিত উন্নয়ন আগ্রাসনের শিকার। নদীগুলি যৌথ হলেও অসংখ্য ড্যামবাঁধজলবিদ্যুৎ নির্মাণ করছে ভারত। নদীগুলি যৌথ হলেও বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রয়োজন মনে করে নি ভারত। আর বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর পক্ষ থেকে জোরাল কোনো প্রতিবাদও করা হয় নি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়গুলি উত্থাপন করা হয় নি। এর কারণ আর কিছুই নয়, গোটা উপমহাদেশব্যাপী বিশ্বব্যাংক এবং কর্পোরেট জগতের লুণ্ঠনের যে নীলনকশা, তার অংশ হিসাবেই বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা বর্হিভুত তথাকথিত বুর্জোয়া দলগুলি নির্বিকার।

নদী ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশ মূলত একটি নদী মাতৃক দেশ। নদনদী পরিবেষ্টিত নিম্ন সমতলভূমি বিশিষ্ট অঞ্চল। নদনদীই এদেশের বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলকেই নদনদী থেকে পৃথক করা যায় না। যদিও এদেশে নদনদীর সংখ্যা কত সেই পরিসংখ্যান নিয়ে বেশ কিছু বিরোধ রয়েছে। কারো মতে, এই সংখ্যা ২২৫টি। যার মধ্যে উপনদীর সংখ্যা ১০৮টি। আর শাখা নদী ১১৭টি। আবার কারো মতে এ সংখ্যা ২৩৫টি। কারো হিসাবে ৩০০টি। তবে খাল, বিল, ছড়া, শাখা ও উপনদী মিলিয়ে এই সংখ্যা প্রায় ৭০০। যার মধ্যে ১৭০টি রয়েছে সুন্দরবনে। নদী নিয়ে এই মতভেদের কারণ হলো ৭০ বছর পূর্বে যেখানে নদী ছিল, আজ সেই জায়গা আবাদভূমি। আবার একটা শাখা বা উপনদী নানা স্থানে নানান নামে অভিহিত হওয়ার কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এদেশে নদনদীর সংখ্যা অনেক হলেও কোনোটাই বিচ্ছিন্ন নয়। একে অন্যের সাথে প্রাকৃতিকভাবেই সুশৃঙ্খল রূপে সংযোজিত। ফলে একক কোনো নদী নয়, দেশের ছোট বড় সব নদীর পূর্ণাঙ্গ পরিচিতিই হলো এ দেশের সামগ্রিক নদীর ইতিহাস।

এ সব নদনদীর মধ্যে ভারত থেকে ৫৪টি ও বার্মা থেকে ৩টি মোট ৫৭টি নদী নানা শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা যদি বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব যে, ’৭১ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে নদীপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪,০০০ কিলোমিটার। যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৮,৪০০ কিলোমিটারে। এখন দেশে শীতকালে ৬০/৬৫টি নদীতে কোনো রকমের পানি প্রবাহ থাকে। যার মধ্যে অচিরেই আরো ২৫টি নদী শুকিয়ে যাবে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ আবার চীন, ভূটান, নেপাল ও ভারত এই চারটি দেশের ১.৫৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার অববাহিকার পানি নিষ্কাশনের আধার। এক সময়ে প্রায় ৬ মিলিয়ন কিউসেক পানি পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও তার শাখাপ্রশাখা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। বছরে প্রায় আড়াই কোটি বিলিয়ন টন পলি বহন করত এই নদীগুলি। যে পলিমাটিকে ভিত্তি করে ১,৪৪,০০০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ হিসাবে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। যে গঠন প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে শুধু ভারতই নয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও যখন কোনো নদনদী স্বাভাবিক গতির বিপক্ষে অবস্থান নেয়া হয়, তখন তার বিরুপ প্রতিক্রিয়া আমাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার উপরে পড়তে বাধ্য। ফলে ভারতের এক তরফা পানি প্রত্যাহার, বাঁধ নির্মাণ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিক্রিয়া আমাদের সামগ্রিক জীবনের উপরে যে মারাত্মক আঘাত হানছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন কি খোদ ভারতও তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার বাইরে নয়। এই যে বাস্তবতা সেটা সামনে রেখে কিছু প্রশ্নে অনুসন্ধান জরুরী। যাকে আমরা উন্নয়ন বলছি। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার আলোচিত প্রেক্ষাপট অনেক বৃহৎ। সেক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়কে ছুঁয়ে যাব মাত্র। যাতে করে উন্নয়নের ধারাবাহিকতাটা আমরা ধরতে পারি।

ভারতের আন্তঃনদীসংযোগ পরিকল্পনা বা ইন্টারলিংকিং অব রিভারস প্রজেক্ট

“…it is paradoxical to see floods in one part of the country while some other parts face drought. This drought-flood phenomenon is a recurring feature. The need of the hour is to have a water mission which will enable availability of water to the filds,villages,towns and industries throughout the year even while maintaining environmental purity. One major part of the water mission would be net working of our rivers. Technological and project management capabilities of our river net working a reality with long-term planning and proper investment…”

২০০২ সালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে যে ভাষন দেন, এটি তার অংশ বিশেষ। ওই সময়ে সারা ভারত জুড়ে আন্তঃনদীসংযোগ পরিকল্পনা বা ইন্টারলিংকিং অব রিভারস প্রজেক্ট নিয়ে জোর বিতর্ক চলছে। তারও প্রায় ১০ বছর পূর্ব থেকে মামলামোকদ্দমা, রাজনৈতিক বিতর্ক, আন্দোলন ছিল একটা চলমান প্রক্রিয়া। ঠিক এধরনের পরিস্থিতিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি যে ভাষন রাখেন, তা নিয়ে খোদ ভারতেই আরেক ধাপ বিতর্কের জন্ম হয়।

অবশ্য ভারতের রাষ্ট্রপতি তার ভাষনে যা বলেছিলেন, তার বাস্তবতা কিছুটা হলেও রয়েছে। যেমন ‘কোথাও খরা, কোথাও বন্যা’ এই দুটোই বর্তমান ভারতের বাস্তবতা।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো এটা কি অভিশাপ, নাকি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময়তা?

রাষ্ট্রপতির ভাষণে যে দৃষ্টিভঙ্গিটা স্পষ্টভাবেই বর্ণিত হয়েছে তাহলো তিনি বিষয়টিকে অভিশাপ হিসাবে দেখেছেন। আর সমাধান হিসাবে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের সমর্থনে বক্তব্য রেখেছেন। অর্থাৎ বড় বড় নদীর ‘উদ্বৃত্ত’ পানি অপেক্ষাকৃত শুকনা নদীতে নিয়ে যাওয়া। এবং খরা মোকাবেলা করা। একই সাথে সেচের সুবিধা ও কৃষি উন্নতির প্রশ্নও এখানে জড়িত। প্রথমেই আমাদের জেনে রাখা দরকার, ভারত সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বললেও তার অর্থের যোগানদাতা কিন্তু বিশ্বব্যাংক। দাবীটা ভারতের নদী বিশেষজ্ঞদের।

ভারত সরকার যে আন্তঃনদীসংযোগ পরিকল্পনা বা ইন্টারলিংকিং অব রিভারস প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে, এটাকে বলা যেতে পারে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী প্রকল্প। যার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬০ হাজার কোটি টাকা। যা উত্তর ভারতে সেচখাতে মোট ব্যয়ের ১০ গুণ। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে ৮০টি বড় বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করতে হবে। ১২,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল খাল কাটতে হবে। শাখা খালের দৈর্ঘ্য হবে আরো দীর্ঘ। ৭৯,২৯২ হেক্টর বনাঞ্চল ধ্বংস করতে হবে। বাস্তুচ্যুত হবেন ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ। হিসাবটা অবশ্য সরকারি।

পরিকল্পনাকারিদের হিসাব মতে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যে লক্ষ্য অর্জন হবে সেগুলা হলো

) ৩৫ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে ১৭০ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য নিশ্চিত হবে। যা ভারতের খাদ্য নীতিকে আরও সুরক্ষা দেবে।

) ১০১ জেলা ও পাঁচটি মেট্রোপলিটন শহরে নিরাপদ পানির চাহিদা মেটানো যাবে।

) ৩৪,০০০ মেগাওয়াট শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

) খরা ও বন্যার কবল থেকে ভারতের চীরস্থায়ী মুক্তি ঘটবে।

) অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্যের উন্নতি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে খালের যে নেটওয়ার্ক, সেটা তৈরির সময় কত শত হেক্টর কৃষি জমি খালের গহব্বরে যাবে সেই হিসাব প্রকল্পে উল্লেখ নাই। একইভাবে গঙ্গাব্রহ্মপুত্র সংযোগ খালটি আসাম সীমান্ত থেকে ফারাক্কায় আসার পথে ছোটবড় ৫০টি নদী অতিক্রম করার সময় কি ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। তারও কোনো উল্লেখ ওই প্রকল্পে নাই। একইভাবে এই দুই নদীর পানি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেলে গাঙ্গেয় বদ্বীপের নদীব্যবস্থাপনার কি প্রতিক্রিয়া হবে? প্রকল্পে সে বিষয়টি কিন্তু উল্লেখ নাই। অর্থাৎ শুধু বাঙলাদেশ নয় গোটা পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহারও এক ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পড়বে। তারপরও এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার জন্য কেনবেতোয়া সংযোগ খাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। যে সংবাদ আমরা ভারতীয় কিছু পত্রিকায় প্রকাশ হতে দেখেছি।

আলোচনার শুরুতেই আমরা বলেছি ভারত সরকারের এই পরিকল্পনা বিশ্বব্যাংকেরই পরিকল্পনা। প্রকল্প অর্থায়ান যে অর্থের প্রয়োজন হবে তার প্রধানাংশ আসবে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ আকারে। আর যে সেচ ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, ওই সেচের পানি কৃষককে কিনতে হবে বাজারমূল্যে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থাগুলির কাছ থেকে। যা আমরা পরবর্তী আলোচনায় অল্পবিস্তার তুলে ধরার চেষ্টা করব।

কবে থেকে ভারতে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ভাবনা শুরু

ভারতবাংলাদেশের অনেক নদী বিশেষজ্ঞ দাবী করেছেন সম্প্রতি এনডিএ সরকারের আমলে প্রথম এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনার সুত্রপাত হয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বিষয়টি এমন নয়। কারণ ইতিহাস বলছে ১৮৫৮ সালে ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ হাইড্রলিক ইঞ্জিনিয়ার কর্নেল আর্থার কটন উড়িষ্যার মহানদী সম্পর্কে এক রিপোর্ট হজির করেছিলেন। ওই রির্পোটে প্রথম এই প্রস্তাবনা ছিল। যেখানে বলা হয়েছিল, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে যদি সেচ এবং নৌচালনার জন্য অজস্র সংযোগ খালের মাধ্যমে একটা মালা গাঁথা যায়, তাহলে কৃষি এবং বাণিজ্যের সুরাহা হবে। কটন সাহেবের প্রস্তাব নিয়ে সেদিন ব্রিটিশ সরকার মাথা ঘামায়নি। কারণ ব্যাপারটি ছিল প্রচুর ব্যয়সাপেক্ষ।

এরপরে ১৯৭২ সালে ভারতের শক্তি ও সেচ মন্ত্রী কে.এল রাওএর প্রস্তাব ছিল গঙ্গা ও কাবেরীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য ২,৬৪০ কিলোমিটার লম্বা খাল তৈরি করার। তৎকালীন সময়ে ওই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার কোটি টাকা। সেটাও প্রচুর ব্যয়সাপেক্ষ বলে বাতিল হয়ে যায়।

১৯৭৭ সালে ক্যাপ্টেন দস্তর কমিটি আরেকটি পরিকল্পনা হাজির করেন। তিনি হিমালয় থেকে নিঃসৃত নদীগুলি নিয়ে একটি মালা গাঁথার প্রস্তাবনা দেন। যেখানে হিমালয় সংলগ্ন ৪,২০০ কিলোমিটার খালসহ আরো ৯,৩০০ কিলোমিটার খাল কেটে দক্ষিণ ভারতীয় শহর দিল্লি ও পাটনার মধ্যে সংযোগ তৈরি করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এই প্রস্তাব বাস্তবয়নে যে বিপুল ব্যয় এবং কিছু টেকনিক্যাল বা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে প্রস্তাবটি খারিজ হয়ে যায়। অর্থাৎ উপরে উল্লেখিত তথ্যগুলি যে বাস্তবতা আমাদের সামনে হাজির করে সেটা হলো খোদ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কথা নানা জন নানাভাবেই উত্থাপন করেছেন। যে ধারাবাহিকতা এখনও বর্তমান।

আর এর পরের খবর তো আমরা জানি। ২০০২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষনে আলোচিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কথা ঘোষনা করেন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রঞ্জিত কুমার কৃত এক মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘কেন্দ্রীয় সরকার যেন অবিলম্বে নদীসংযোগ প্রকল্প রূপায়নের জন্য একটি স্পেশাল কমিটি নিয়োগ করে’। তার পরপরই বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে সারা ভারতে। যে বিতর্ক এখনও চলছে। তবে এপ্রসঙ্গে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে দু’চার কথা বলা দরকার। বা জেনে রাখা আমাদের জন্য জরুরী।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আন্তঃনদী সংযোগ রায় নিয়ে বিতর্ক

ভারতের শীর্ষ আদালত বা সুপ্রীম কোর্টর দাবী ছিল তাদের বিভিন্ন রাজ্যের মতামতের উপর ভিত্তি করে ওই নির্দেশনামা জারি করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত রাজ্যগুলির মধ্যে একটা ঐক্যমত তৈরি হয়েছে। রাজ্যগুলি নদীসংযোগ প্রকল্প বিষয়ে সহমতে পৌছেছে। যার ভিত্তিতে এই রায় প্রদান করা হলো।

কিন্তু বিষয়টি আদতেই এমন নয়, এটা একটা মিথ্যার বেসাতি। এর কারণ হলো দিল্লিসহ যে আঁঠাশটি অঙ্গরাজ্যের কাছে কোর্ট থেকে এ বিষয়ে মতামত জানাতে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। তার মধ্যে মাত্র দশটি রাজ্য উত্তর পাঠায়। বাদবাকি রাজ্যগুলি মতামত পাঠানোর ক্ষেত্রে নিরাবতা পালন করে। সুপ্রিম কোর্ট দাবি করেছে, তাদের এই নিরবতাই সম্মতির সুচক। আর যে রাজ্যগুলি উত্তর পাঠিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে রাজস্থান, গুজরাট, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, বিহার, পাঞ্জাব, আসাম ও কেরেলা।

এর মধ্যে রাজস্থান, গুজরাট, তামিলনাড়ু প্রস্তাবিত নদীসংযোগ প্রকল্পের পক্ষে মত দিয়েছে।

রাজস্থান পার্বতীকালিসিন্ধচম্বল নদীর মধ্যে সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

গুজরাট সরকার সম্মতি দেওয়ার পরেও বলেছে, নদী ও নদীজল বিষয়সমূহ সাংবিধানিক ব্যবস্থানুযায়ী রাজ্যতালিকাভুক্ত। তাদের আরো দাবী ন্যাশনাল কমিশন ফর ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার রিসোর্সেস ডেভলাপমেন্ট সংস্থাকে এই পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার সময় অবশ্যই সমস্ত রাজ্য সরকারের সম্মতি নিতে হবে।

বিহার সরকার প্রশ্ন তুলেছে, নদীসংযোগের ফলাফল হিসেবে কৃষিউৎপাদনের যে উন্নতি ঘটবে, সেটা কি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের যে ব্যয় তার নিরিখে যথেষ্ট? একই সাথে যে সব অববাহিকা অঞ্চলকে ঘাটতি অঞ্চল বলা হচ্ছে, তারা কি যথাযথভাবে সেচপদ্ধতির অপরাপর পথের যথেষ্ট অনুসন্ধান করেছে? বিহার সরকারের আরো মতামত ছিল, প্লাবন বা বন্যা সাময়িক সমস্যা। এটা সারা বছর থাকে না। সে কারণে বন্যা সম্ভাবিত নদীগুলিকে উদ্বৃত্ত নদী অববাহিকা বলে সাবস্ত করা ঠিক হবে না। সারা বছরের জলসম্পদের হিসেব কষে উদ্বৃত্ত ও ঘাটতির প্রশ্নটি ভাবা দরকার।

আসাম, সিকিম ও কেরালা সরকার আলোচ্য প্রকল্পটির বিরুদ্ধেই মত দিয়েছে। তাদের দাবি হলো, ওই অঞ্চলের জলসম্পদের সম্পূর্ণ মালিকানা তাদেরই। এক্ষেত্রে কোনো প্রকারের হস্তক্ষেপ করা যাবে না। করা হলেও সেটা তারা মেনে নিবে না।

মধ্যপ্রদেশ সরকারের মতামত ছিল, নদীসংযোগ প্রশ্নটি কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকারভূক্ত। অতএব কেন্দ্রীয় সরকার যে সিদ্ধান্ত নিবেন মধ্য প্রদেশ সরকার তা মেনে নিবে।

ফলে যে মতামতের উপর ভিত্তি করে ভারতের শীর্ষ আদলত এই রায় দিয়েছিল, সেটা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। সব রাজ্যের মতামত এটা নয়। সব রাজ্যের মতামতের নামে সুপ্রিম কোর্ট থেকে এটাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং ভারত সরকার ওই রায়কে বেদবাক্য মনে করে প্রকল্প বাস্তবায়নে তৎপর এখন। এক্ষেত্রে একটা কথা বলা খুবই জরুরী, সেটা হলো ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের অনেক বিচারকই আজ শেয়ার বাজারের কারবারি। কর্পোরেটদের মুনাফার ভাগ অনেক বিচারকের পকেটস্থ হয়। ফলে জনগুরুত্বপূর্ন অনেক মামলার রায় জনগনের পক্ষে না গিয়ে সেটা কর্পোরেটদের স্বার্থ রক্ষা করে। আলোচিত মামলার রায় তার একটি দৃষ্টান্ত।

ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যখন আলোচিত ঘটনার উপরে রায় ঘোষনা করে তখন ওই দেশের ৬২জন বিশিষ্ট নাগরিক এবং বিশেষজ্ঞ, আদালতের আদেশ মুলতবি করার জন্য আবেদন করেছিলেন। যার মধ্যে ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় জলসম্পদ সচিব রামস্বামী আয়ার, সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ এ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, দক্ষিণ এশিয়ার বাঁধনদী ও জনগনের মধ্যে নেটওয়ার্কের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিমাংশু থাক্কার, পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক্তন সদস্য অধ্যাপক বৈদ্যথান, বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দী, জেএনইউর অধ্যাপক অরুন রায়, বিশিষ্ট সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারসহ আরো অনেক ব্যক্তিত্ব। তাঁরা আবেদনপত্রে যে বিষয়গুলি উত্থাপন করেছিলেন, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি ছিল

) দেশের কোন কোন অঞ্চলে নদীজলের সমস্যা আছে এবং তার জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সেসব আগে খতিয়ে দেখতে হবে। অঞ্চলনির্দিষ্ট সমস্যার অঞ্চলভিত্তিক সমাধানের কথা ভাবা উচিৎ। সেটা না করে ঢালাও ভাবে গোটা দেশের নদীসংযোগের কথা বলে নদীর মানচিত্রটাকেই পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা চলছে। এতে করে প্রকৃতিক বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবি।

) ন্যাশনাল ওয়াটার গ্রিড বা জাতীয় জলসম্পদের অন্তর্জাল তৈরির কথা বলা হচ্ছে। এখানে নদীর প্রাণসত্তা ও সজীবতার কথা ভুলে গিয়ে দেশের নদীগুলিকে নিছক পাইপ লাইন ভাবা হচ্ছে।

) এই প্রকল্পে ৮০টি বাঁধের কথা বলা হয়েছে। এগুলি নির্মিত হলে পরিবেশগত বিপর্যয় যে ঘটবেই তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাছাড়া শুধুমাত্র ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স বা পরিবেশগত ভারসাম্যের সমস্যা নয়, বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হবেন। তাঁদের জীবনজীবিকার বিপুল সমস্যা তৈরি হবে। নদীগুলির স্বাভাবিক গতিপথ, স্বভাবগত ছন্দ বিপর্যস্ত হবে।

) খরাপীড়িত অঞ্চলে বন্যার জল নিয়ে যাওয়ার চিন্তাটাও যথেষ্ট ভ্রান্তিপূর্ণ। কারণ তাঁদের ভাষায়, ‘flood moderation’ করা আদৌ সম্ভব নয়। ফলে দেশের বিভিন্ন উচ্চভুমি ও শুকনো অঞ্চলে জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার ধারণাটি নিতান্তই অবৈজ্ঞানিক।

) উদ্বৃত্ত জলের অববাহিকা (surplus basin) থেকে ঘাটতি জলের অববাহিকায় (deficit basin) জল পাঠানোর চিন্তাতেও রয়েছে একটা মস্ত গলদ। বস্তুত উদ্বৃত্ত আর ঘাটতি অঞ্চলের এসব ধারনাগুলি যথেষ্ট গোলমেলে ও ধোঁয়াশে। যেসব নদীতে উদ্বৃত্ত জলের প্রবাহ আছে সেগুলি বহু উদ্দেশ্যসাধক হতে পারে, অন্যদিকে ঘাটতি অঞ্চলগুলিতে জল ব্যবহারের যে কোনো অপচয় ঘটবে না তার কি কোনো নিশ্চয়তা রয়েছে?

) এই শেষাক্ত যুক্তির নিরিখে একথাও অবশ্যই বলা যায় যে, সতর্ক, সংযত, বিরোধমুক্ত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ (sustainable) নদীশাসন এবং জল ব্যবহারের পরিচালনাগত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে আমাদের মুখ্য লক্ষ্য, নদীসংযোগ করে এক নদীর জল অন্য নদীতে নিয়ে যাওয়া কোনো সুস্থ চিন্তা নয়।

) এই প্রকল্প রূপায়িত হলে দুই বা ততোধিক নদী অববাহিকার মধ্যে নতুন নতুন বিরোধের দ্বার খুলে যাবে। আমাদের দেশে এমনিতেই জল নিয়ে আন্তঃরাজ্য বিরোধের শেষ নাই।

) কেবল দেশের অভ্যন্তরেই এই বিরোধ থেমে থাকবে না। আন্তর্জাতিক স্তরেরও এই বিরোধের আশঙ্কাও রয়েছে।

মোটামুটি এই ছিল ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তিজনের দাবি।

এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রায়কে প্রশ্ন করে ভারতের নদী বিশেষজ্ঞ রামস্বামী আয়ার প্রশ্ন তুলেছেন, সত্যিই কি জাতীয় স্বার্থ এই প্রকল্প দ্বারা নিষ্পন্ন হবে? ২০১২ সালের ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় এক স্বাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “Has it been examined? They (বিচারকরা ) have just cited one report of the NCAER (National Council for Applied Economic Research). What about economists like prof [A] Vaidyanathan, ecologists like Dr. Jayanat Bandyooadhyay, and hundreds of other experts? Why is it thai when some of us drafted a statement asking for a reconsideration of the judgement, so many distinguished experts fully endorsed it? … If they all agree that it is bad project, is that not a matter for reflection?”

এছাড়া ২০০২২০০৩ সালে ভারতীয় আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে Economic and Political Weeklyতেই ওই প্রকল্পের বিরুদ্ধে ১০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। একইভাবে Seminar, Frontline, Down To Earthইত্যাদি পত্রিকাতে নদীসংযোগের বিরোধীতা করে অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়। তারপরও কিন্তু আমরা দেখছি কেনবেতোয়া সংযোগ খাল নির্মানের তোড় জোড় চালিয়ে যাচ্ছে ভারত সরকার।

প্রাক ঔপনিবেশিক আমলে বাঙলার কৃষি ও বন্যা নিয়ে কিছু তথ্য

আলোচনার এই অংশটি গোটা ভারতকে নিয়ে নয়, প্রথমেই এটা আমাদের মাথায় রাখা দরকার। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু প্রধানত বাঙলা। প্রাক ঔপনিবেশিক বাঙলা। কারণ গোটা ভারতকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার প্রেক্ষিত অনেক বৃহদ হতে বাধ্য। যা এই ক্ষুদ্র পরিসরে সম্ভব নয়। একই সাথে সেটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপারও। ফলে বাঙলার ওপর নানান জনের মতামতকে ভিত্তি করে একটা ছোট খাট বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা প্রথমে করা যাক। যার প্রয়োজনীয়াতা পাঠককুল সহজেই অনুমান করে নিতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

১৬৬০ সালে বার্নিয়ারের ভ্রমণ বৃত্তান্তের ওপর লেখা বইটি আমাদের অনেকেরই পড়া। ওই বইয়ে যে তথ্যগুলি রয়েছে তাহলো, কৃষি উৎপাদনে বাঙলা ছিল মিশরের থেকেও সমৃদ্ধ। এখান থেকে প্রচুর পরিমানে তুলা, রেশম, চাল ও মাখন রপ্তানি হতো; স্থানীয় চাহিদা মেটাতে উৎপন্ন হতো গম, সব্জি, দানাশস্য; পালন করা হতো হাঁস, মুরগি, শুকুর, ভেড়া এবং ছাগল। এছাড়া পাওয়া যেতো নানা ধরনের মাছ। রাজমহল থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রাপথে বার্নিয়ার গঙ্গার দুপাড়ে অসংখ্য খাল দেখেছিলেন। তিনি বলেছেন ওই খালগুলি সেচ ও নৌপরিবহনের জন্য কাটা হয়েছিল।

আবুল ফজল তার আইনি আকবরী বইয়ে বলেছেন, বাঙলার অধিকাংশ নদীর প্লাবনভূমিতে নানা ধরনের ধান চাষ হয়; মাটি এতই উর্বর যে একটি ধান গাছ থেকে দুইতিন সের ফলন হয়। কোনো কোনো জমিতে বছরে তিনবার ফসল ফলে। ধান গাছ এত দ্রুত বেড়ে ওঠে যে, বন্যার পানিতে কখনোই ডুবে যায় না।

আর একজন ব্রিটিশ প্রশাসক, নাম হ্যমিল্টন সাহেব, বর্ধমান জেলার কৃষি নিয়ে ১৮১৫ সালে মন্তব্য করেছিলেন,বর্ধমান জেলা কৃষি উৎপাদনে ভারত শ্রেষ্ঠ। আর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তাঞ্জোর।

বাঙলার কৃষি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আরো মতামত রয়েছে। তারা বলছেন, বাঙলার কৃষকরা বহু শতাব্দী ধরে অসাধারণ দক্ষতার সাথে নদীর পলিসিক্ত পানি কৃষিজমিতে ব্যবহার করতেন। তাঁরা জানতেন বন্যার পানিতে যে পলি ভেসে আসে সেটা প্লাবনভুমির উর্বরতার মুল উৎস। বর্ষার সময় নদী ফুলে ফেপে উঠলে কৃষকরা খাল কেটে সেই পানি কৃষিজমিতে ঢুকিয়ে দিতেন। ওই পানির সাথে ভাসমান মিহি পলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ত। আর অপেক্ষাকৃত মোটা দানার বালি স্রোতের টানে সাগরের দিকে বয়ে যেত। নদীর বহমান স্রোতে ভাসমান পলি প্লাবনভূমির কৃষি ব্যবস্থাকে লালন করেছে আবহমান কাল ধরে। বিশেষজ্ঞরা এই ব্যবস্থার নামকরণ করেছিলেন প্লাবন সেচ বা ওভারফ্লো ইরিগেশন। তাছাড়া বন্যা প্লাবনভূমিতে যেমন নতুন পলি ছড়িয়ে দিত, তেমনি নদীখাকে গভীর করতো। পানিপলি ও কৃষির এই আন্তঃসম্পর্কটা ছিল বাঙলায় কৃষি ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি।

তাছাড়া, এদেশে বৃষ্টিপাত ছিল বরাবরই মৌসুমীবায়ু নির্ভর। ‘বর্ষার চার মাস বৃষ্টি আর আট মাস খরা’ এই উপমহাদেশেরই প্রকৃতিক বৈশিষ্ট্য। ফলে মানুষ আবহমান কাল থেকে চেষ্টা করেছে বর্ষার পানি সংরক্ষন করে খরা মৌসুমে ব্যবহার করতে। প্রাক ঔপনিবেশিক আমলে খালসহ দীঘি ও পুকুরে পানি সংরক্ষনের ব্যবস্থা ছিল। তখন কখনও কোথাও মাটির নীচের পানি ব্যবহার করা হলেও তা করা হয়েছে খুবই সংযতভাবে। এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর খরা মৌসুমেও নদীকে সজিব রাখতে সাহায্য করতো।

মার্ক্সএঙ্গেলসএর মতামত

আমরা অনেকেই মার্ক্সএঙ্গেলসএর লেখার সাথে পরিচিত। ভারত বিষয়ক বিস্তর লেখালেখি তাদের রয়েছে। আমরা কম বেশি সবাই জানি, মার্ক্সএঙ্গেলস ভারতীয় সমাজ বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় মডেল ভারতের ক্ষেত্রে আরোপ করতে যান নি। তার বিপরীতে তাঁরা ভারতীয় সমাজ বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ও ভৌগলিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যাকে হাইড্রোলিক থিথিস বলা যেতে পারে। যার মধ্যে কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে অঞ্চলিক পরিবেশ, মাটির প্রকৃতি, পানির প্রাপ্যতা, রোদের স্থায়ীত্ব, বিদ্যমান প্রযুক্তি, শ্রমের সামাজিক সংগঠন এবং সেচ ব্যবস্থা ছিল গুরুত্বপুর্ণ। যার উপর নির্ভর করে ভারত উপমহাদেশে যে কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছিল, সেটা ছিল ইউরোপ থেকে একদম পৃথক। ইউরোপে যেমন মধ্যযুগে রোদের সীমিত স্থায়ীত্বের কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শ্রমের চাহিদা ছিল কেন্দ্রিভূত। ফলে তাদের কৃষি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদক কৃষক সমাজকে সামন্তপ্রভূর উপর নির্ভরশীল করে এক সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বেঁধে ফেলে দেয়া হয়। যাকে বলা হয়েছে ভূমিদাস প্রথা। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে ভূপ্রকৃতিগত কারণে শ্রম নিবিড়তার বিপরীতে সেচ কৌশল ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়।

মূলত কোনো দেশের উৎপাদন সম্পর্ক (relation of production)ও উৎপাদন অবস্থার (condition of production)মধ্যে একটা আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। মূলত এই মতানুযায়ী, উৎপাদন সম্পর্ক নির্ভর করে উৎপাদিকা শক্তি বিকাশের উপর। আর উৎপাদনের অবস্থা হচ্ছে, সামগ্রিক যে অবস্থার মধ্যে উৎপাদন চলছে সেই অবস্থার যোগফল। যাকে এক কথায় ভৌগলিক, নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক বিষয়াবলির সম্বম্নিত রূপ বলা যেতে পারে। যার উপরে ভিত্তি করে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ এক এক দেশের অবস্থান অনুযায়ী এক এক ধরনের হতে পারে। আবার এক একটা দেশের মধ্যেও ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্রতার কারণে তা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। যার উদাহরন আমরা মার্ক্সের গোথা কর্মসূচির আলোচনাতেও স্পষ্টভাবেই পাব। আর এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে মার্ক্সএঙ্গেলস ভারতীয় সমাজব্যবস্থা বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভূগোল বা সেচব্যবস্থা নির্ভর কৃষিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছিলেন।

মূলত প্রাক ঔপনিবেশিক ভারতে মৌর্য আমল থেকে যারাই এই উপমহাদেশের ক্ষমতা দখল করেছে, বৃহৎ সাম্রাজ্য নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। সাম্রাজ্য ভেঙে ছোট বড় রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করেছে। শাসক হিসাবে তাদের প্রত্যেককেই সেচব্যবস্থার প্রতি যত্নশীল হতে হয়েছে। যা উপমহাদেশের কৃষকরা দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। তাকেই সযন্তে লালন করতে হয়েছে। সরকার এবং প্রসাসন ওই ব্যবস্থাপনার পৃষ্টপোষকতা করেছে। কিন্তু এসব কিছুর পরিবর্তন ঘটে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক আমলে। পশ্চিমা উন্নয়নের সুবাদে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত দখল প্রক্রিয়া লুণ্ঠন এবং দুর্ভিক্ষের সূচনা

বাঙলার নদী ও কৃষি নিয়ে প্রকৃত গবেষণা শুরু হয়, ঔপনিবেশিক আমলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসকদের হাত ধরে। একইভাবে বাঙলায় লাগাতার দুর্ভিক্ষের সূচনাও ওই কোম্পানির শাসন পর্ব থেকেই। অবশ্য এর একটা দীর্ঘ ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে। উপমহাদেশের উন্নয়ননদীপানিবন্যাকৃষিদুর্ভিক্ষ ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে গেলে, ইতিহাসের এই পর্ব এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাতে করে আলোচনাটা অসম্পূর্ণ থাকতে বাধ্য। ফলে আমরা খুব সংক্ষেপে কিছু বিষয়কেন্দ্রিক তথ্যের ওপর চোখ বুলিয়ে যাব।

পলাশি যুদ্ধের পর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে বাঙলা চলে যায়। এরপর ১৭৬১ সালে ভারতে অবস্থিত পন্ডিচেরিতে ফরাসি ঘাঁটি দখল করে নেয় তারা। তারপর তারা কর্ণাটক দখল করে। ১৭৯০৯২ এবং ১৭৯৯ সালে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাঁর সাম্রাজ্য দখল করে। ১৮০৩ সালে উড়িষ্যা দখল করে। ১৮২৪২৬ সালে বার্মার সাথে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আসাম, আরাকান এবং টেনাসেরিসের উপকুল দখল করে। ১৮৪৩ সালে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেলুচ এবং সিন্ধু দখল করে। ১৮৪৫৪৬ এবং ১৮৪৮৪৯ সালে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাঞ্জাব দখল করে।

এক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো ১৮৫০ সালের পূর্ব পর্যন্ত একমাত্র বাঙলা ছাড়া ভারত উপমহাদেশের আর কোথাও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনক্ষমতা স্থায়িত্ব পায় নি। ফলে বাংলার রাজস্বের ওপর ভর করেই তাদেরকে আলোচিত দখলাভিযান সম্পন্ন করতে হয়েছে। একই সাথে এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যা আমাদের ইতিহাসবিদরা এড়িয়ে যান। সেটা হলো, বাঙলার রাজস্ব হাতে পাওয়ার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাণিজ্যের শর্ত হিসাবে ব্রিটেন থেকে আর একটি মূদ্রাও আমদানি করতে হয়নি। বাঙলার রাজস্ব তাদের সেই প্রয়োজন মিটিয়েছে। অর্থাৎ বাঙলার রাজস্বের ওপর ভর করে কোম্পানি যেমন সারা ভারতে দখলাভিযান চালিয়েছে, তেমনি বাঙলার রাজস্ব তাদের বাণিজ্যের মূলধনও যুগিয়েছে। এটা ঘটেছিল একদম ঔপনিবেশিকতার সুচনা পর্বে। আর গোটা ভারত দখলের উদ্দেশ্য ছিল উপমহাদেশের রাজস্বের উপরে দখলিস্বত্ব কায়েম করা। ভারতের আভ্যন্তরীন ও বহির্বাণিজ্যের ওপর একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা। আমরা ইতিহাসের এই অধ্যায়টি বোঝার স্বার্থে খোদ ব্রিটেনের দিকে নজর দিতে পারি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ভারত দখলে তৎপর। ওই একই সময়কালে ব্রিটিশ শাসককুলকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই আফ্রিকা মহাদেশে উপনিবেশকরনের অভিযান সংগঠিত করতে হয়েছে। ষোড়শ শতাব্দির প্রথম থেকেই রানী প্রথম এলিজাবেথ এবং দ্বিতীয় ফিলিপের শাসনামলে ইংল্যান্ড এবং স্পেনের মধ্যে উপনিবেশ দখলের ঘোরতর যুদ্ধ চলে। ওই সময়ে ব্রিটেনের জাতীয় আয়ের ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয় শুধুমাত্র যুদ্ধখাতে। ১৭৭৬ থেকে ১৭৮২ পর্যন্ত ব্রিটিশদের বৃহৎ উপনিবেশ আমেরিকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে এবং ১৭৮২ সালে ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হয়ে যায়। ১৭৭৮৮৪ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশফ্রান্স যুদ্ধ চলে। আর এ সব কিছু মিলিয়ে ব্রিটিশদের জাতীয় সঞ্চায়কে একদম পঙ্গু করে দেয়। সেক্ষেত্রে ভারতই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু তখন বাঙলা ছাড়া আর কোথাও কোম্পানির শাসন ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয় নি। পরবর্তীতে ভারতে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দখলাভিযান চালানো হয়েছিল প্রধানভাবে ভারত উপমহাদেশের ট্যাক্সের ওপর ভর করে। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষার প্রধান ব্যয়ও চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল ভারত উপমহাদেশের জনগণের ওপর।

ভারত উপমহাদেশে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলের শুরু থেকেই গোটা বাঙলা কোম্পানির ভয়াবহ লুণ্ঠনের শিকার হয়। এর বড় নজির হলো ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ। ওই দুর্ভিক্ষে বাঙলার প্রায় ১ কোটি মানুষ মারা যান। এ সম্পর্কে মার্ক্সএর একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তিনি ওই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘১৭৬৯ থেকে ১৭৭০ সালের মধ্যে সমস্ত চাল কিনে নিয়ে এবং প্রচুর দাম না পাওয়া পর্যন্ত তা বেচতে অস্বীকার করে একটি দুর্ভিক্ষ বানিয়ে তোলে ইংরেজরা…’। অর্থাৎ ১৭৬৯ সালে ১ টাকায় ১১৭ সের চাল বাজার থেকে কিনে ফেলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারিরা। ১৭৭০ সালে ১ টাকায় ৩ সের চাল বিক্রি করে তারা। খাদ্যের এই একচেটিয়া ব্যবসার কারণে ১ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। তারপরেও তাদের রাজস্ব আদায়ের কমতি ছিল না। ১৭৬৯ সালে তাদের রাজস্ব আদায়ের পরিমান ছিল ১,৫২,০৪,৮৫৬ টাকা। ১৭৭১ সালে ১ কোটি মানুষের মৃত্যুর পরেও তাদের রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১,৫৭,২৬,৫৭৬ টাকা। এর পরে ১৮২৫ থেকে ৫০ সালের মধ্যে দুইবার, ১৮৫১ থেকে ১৮৭৫ এর মধ্যে ছয়বার, ১৮৭৬ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে মোট আঠারো বার আঞ্চলিক পরিসরে দুর্ভিক্ষ হয়েছে কোম্পানির একচেটিয়া খাদ্য ব্যবসার কারণে। যাতে ৩ কোটি ভারতীয় মারা যান। যার মধ্যে ১৯০০ সালেই মারা গিয়েছিলেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। আবার ১৯১৮১৯১৯ সালের যে দূর্ভিক্ষ তাতেও প্রান হারান প্রায় ১ কোটি মানুষ। ১৯৪২৪৩ সালের দূর্ভিক্ষে মারা পড়েন ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। যার মধ্যে এক বাঙলাতেই মৃতের সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ। সোজা ভাষায় বলা যেতে পারে ব্রিটিশরা তাদের গোটা শাসনামলে সাম্রাজ্য অক্ষুন্ন রাখা এবং লুটপাট বহাল রাখার স্বার্থে ভারতীয়দের নৃসংশভাবে খুন করে।

ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি খাদ্যের এই একচেটিয়া বাণিজ্যের পাশাপাশি বিদেশি বাজার দখলে বাণিজ্যিক কৃষির ওপর মারাত্মকভাবে গুরুত্বারোপ করেছিল। যা ভারতীয় কৃষকদের ওপর কৃত্রিমভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়। যেমন আফিম, পাট, তামাক, নীল, আঁখ, গম, তুলা, চা চাষ ইত্যাদি। এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ। এতে করে জনগণের মৌলিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষি জমি অপ্রতুল হয়ে ওঠে।

আবার যতটা খাদ্য উৎপাদন হত, তার একটা বড় অংশ বিদেশে রপ্তানি করত তারা। যেমন এক ১৮৯৪ সালে ভারত থেকে ৮,৫৮,০০০ পাউণ্ড মূল্যের খাদ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ১৮৫৭ সালে ৭৯ লাখ পাউন্ড, ১৯০১ সালে ৯৩ লাখ পাউন্ড এবং ১৯১৪ সালে ১৯৩ লাখ পাউন্ডের খাদ্য ভারত থেকে বিদেশে রপ্তানি করে ব্রিটিশ বনিকরা। এভাবে খাদ্যের একচেটিয়া বাণিজ্য, উৎপাদিত খাদ্যের বিদেশে রপ্তানি এবং কৃষিকে বাণিজ্যিকরণ ইত্যাদি মিলিয়ে নিয়মিত খাদ্য সংকট সৃষ্টি এবং উন্নয়নের নামে মানুষ খুনের একটা পাকা বন্দোবস্ত গড়ে ওঠে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকেই।

আর লুন্ঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে পুঁজি পাচারের বিষয়। এ বিষয়ে ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডিগবির তৎকালিন সময়ে একটা হিসাব দাখিল করেছিলেন। তার মতে, ১৭৫৭ সালের পলাশি যুদ্ধ থেকে ১৮১৫ সালে ওয়াটারলু যুদ্ধ পর্যন্ত এই ৫৮ বছরে ভারত থেকে ৫০০ কোটি পাউন্ড বিদেশে পাচার করে ব্রিটিশরা। আমরা আগেই বলেছি ১৮৫৮ সালের পূর্বে একমাত্র বাঙলা ছাড়া ভারতের আর কোথাও কোম্পানির শাসনাবস্থা কায়েম হয় নি। ফলে পাচার হওয়া ৫০০ কোটি পাউন্ডের প্রধানাংশই বাঙলার।

এর বাইরে আরো কিছু গবেষকের ভিন্ন ভিন্ন পর্যালোচনা রয়েছে। যেমন উত্তর আমেরিকাতে শিল্পায়ন হয়েছিল প্রধানত তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে। ওই শিল্পায়নে প্রধান বিনিয়োগকারিরা ছিল ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ রাজকর্মচারি ও ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা। ১৯১৩ সালে আলোচিত এই কর্মচারি ও ব্যবসায়ীরা মিলে আমেরিকার শিল্পায়নে ৭৫ কোটি পাউণ্ড বিনিয়োগ করে। এবং প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে আমেরিকান সরকারের ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের সিকিউরিটি ঋন ক্রয় করে ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ রাজ কর্মচারিরা। এসব বিনিয়োগ যে সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এছাড়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাঙলা দখল করার পর ভারতের গোটা অর্থনীতিকে তাদের অনুকুলে আনার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল। যেমন ১৭৭১ সালে তারা মুর্শিদাবাদে মোঘলদের গড়ে তোলা রাজকীয় কোষাগারটি কলকাতায় স্থানান্তরিত করে। কোষাগারের ওপর থেকে জগৎ শেঠদের সমস্ত প্রভাব ছেটে ফেলে দেয়া হয়। বাঙলার গোটা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রনের জন্য হেস্টিংস ১৭৭৩১৭৭৪ সালের মধ্যে ঢাকা, পাটনা ও মুর্শিদাবাদে জগৎ শেঠদের সমস্ত টাকশালগুলি বন্ধ করে দেয়। তার বিপরীতে ব্রিটিশ মার্কেন্টাইল ব্যাংক, চার্টার্ড ব্যাংকের শাখা স্থাপন করে। এসব ব্যাংকগুলি থেকে নোট ইস্যূ, আমদানিরপ্তানি, বড় বড় ব্রিটিশ পাইকারদের অর্থ যোগান দেয়া হতো। এবং এক পর্যায়ে এসব প্রক্রিয়া ভারতীয় অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। মুলত নদীপানিবন্যাদুর্ভিক্ষউন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে ইতিহাসের এই পর্বকে আড়াল করা মুস্কিল। এর অন্যতম কারণ হলো আলোচিত সমস্ত আলামতের জন্ম হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে। যার ধারাবাহিকতা আজও চলমান। ফলে বিষয়গুলি একটু ঝালিয়ে নেওয়া দরকার।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাঙলায় তাদের শাসনক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জন্ম দেয়এটা আমাদের সবার জানা। মূলত এই ব্যবস্থাটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসকদের সাথে তাদের সৃষ্ট স্থানীয় জমিদার ও ভূস্বামীদের মধ্যকার যে সম্পর্ক, তারই আইনগত রুপ। যে আইনের সাথে খোদ উৎপাদক কৃষকদের কোনো যোগসুত্র ছিল না। কৃষকদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদের ন্যায্যতা দেয়া হয় এই আইনে। ফলে লাখ লাখ চাষী পরিবার তাদের বংশানুক্রমিক রায়তারী ভূমিস্বত্ব হারিয়ে ফেলেন এই আইনে। এই ব্যবস্থায় জমিদারকে ভূমিপ্রকৃতির একচ্ছত্র মালিক হিসাবে ঘোষণা করা হয়। আর উৎপাদক কৃষককে বানান হয় জমিদারের প্রজা। এছাড়া এই আইনে ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি ছাড়াই জমিদারদের জমি বিক্রি, দান, বন্ধক এবং যে কোনো প্রয়োজনে ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ফলে প্রাক ঔপনিবেশিক আমলের ভূমি ব্যবস্থাপনা এই নতুন আইনের ফলে একটা ভিন্নতর সম্পত্তিসম্পর্কের জন্ম দেয়। যেমন প্রাক ঔপনিবেশিক যুগে জমিদারদের পক্ষে জমি থেকে উৎপাদক কৃষককে উচ্ছেদের কোনো ক্ষমতা তাদের ছিল না। উৎপাদক কৃষক জমিদারের অধিনস্ত প্রজা হিসাবে গণ্য হতো না। জমি কেনাবেচাদানবন্ধক দেয়ার কোনো অধিকার জমিদারের ছিল না। কৃষি জমি কৃষির কোন প্রয়োজনীয়তা থেকে ব্যবহার করা হবে, সেই কর্তাস্বত্বার অধিকারী ছিল উৎপাদক কৃষক সমাজ। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কৃষকের হাত থেকে এই সব অধিকার কেড়ে নেয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সেদিন জমিদাররা আরেকটি ভিন্নমাত্রার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্জন করে। সেখানে জমিদাররা তাদের রাজস্ব আদায়ের অধিকার অপরের কাছে বিক্রি করে দেয়ার ক্ষমতা পেয়েছিল। বাণিজ্যিকভাবেই তারা তা বিক্রি করে দিতে পারতো। ফলে কোম্পানি সৃষ্ট জমিদারি ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত হয়ে আরেকটি মধ্যশ্রেণীর বিকাশ ঘটে। যারা ইজারাদারউপইজারাদারপত্তনীদার, নায়েব, গোমস্তা নামে খ্যাত। অর্থাৎ সব মিলিয়ে উৎপাদক কৃষকের উপর একটি দীর্ঘমেয়াদী শোষনের শৃঙ্খল তৈরি করে কোম্পানি। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উৎপাদক কৃষকের গোটা উদ্বৃত্ত ছিনিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ভূমি রাজস্ব চিরকালের মতো নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। ফলে কৃষকের কাছ থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বছরেও দুর্যোগহীন বছরের মতোই রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। আবার রাজস্ব আদায়ের ঊর্ধসীমা না থাকায় কৃষকদেরকে সীমাহীন লুণ্ঠনের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়।

১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নগদ অর্থে রাজস্ব প্রদানের রেওয়াজ চালু করে। ফলে নগদ অর্থে খাজনা পরিশোধের বিষয়টি কৃষক সমাজকে দুরাবস্থার মধ্যে ফেলে। নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তা থেকে গ্রামীন অর্থনীতিতে মহাজনদের এক কাঠামোগত কর্তৃত্ব গড়ে তোলা হয়। এবং মহাজনের ঋনের সুদ পরিশোধের মূল্যরূপে শস্য অধিগ্রহণের ব্যাপক রেওয়াজ গড়ে ওঠে। মহাজনদেরকে পাওনা আদায়ে কৃষক পীড়নের অধিকার দেয়া হয়। মূলত কর্নওয়ালিস ও ওয়েলেসিস জমিদারদের স্বার্থ রক্ষায় কৃষকদের ওপর নিপীড়ন করে তাদের পাওনা আদায়ের যে আইন তৈরি করেছিল। মহাজনদের পাওনা আদায়ে সেই আইনি অধিকার তাদেরও দিয়েছিল।

১৭৯৯ সালে কোম্পানি আরো একটি আইন চাল করে। যে আইনে উৎপাদক কৃষকের ঘোষিত ৬ দিনের মধ্যে রাজস্ব পরিশোধ করা ছিল বাধ্যতামূলক। কৃষক ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের সহায় সম্পদ ক্রোক করার অধিকার জমিদারদের দেয়া হয়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের শাসনামলের এক পর্যায়ে রূপোর তৈরি টাকার টাকশাল বন্ধ করে দেয়। এবং রোপ্যমানের বিপরীতে স্বর্ণমান চালু করে। বিনিময় হার বৃদ্ধি করাসহ ভারতীয় মুদ্রাকে ব্রিটিশ পাউন্ডস্টারলিঙের অধীনস্ত করে। ফলে ব্যবসাবাণিজ্যে অসম হারসহ রপ্তানীকারক বণিকরাই প্রধানভাবে লাভবান হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি ছিল গ্রামীন জনগণের ওপর মারাত্মক আঘাত স্বরুপ। কারণ গ্রামীন জনগণ তখন রূপোর টাকার মূল্যমানের অবস্থান থেকে তাঁদের সঞ্চয়ের প্রধান অংশটা অলঙ্কার সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে সঞ্চয় করতেন। ফলে রূপোর টাকার মান পড়ে যাওয়া এবং ভারতীয় মুদ্রা ব্রিটিশ পাউন্ডের অধীনস্ত হওয়াতে শ্রেণীগতভাবে উৎপাদক কৃষক এবং নিন্মআয়ের জনগোষ্ঠি একদম নিঃস্ব হয়ে পড়েন। ব্রিটিশরা মূলত এসব কর্মপন্থা গ্রহণ করেছিল খুবই সুচিন্তিতভাবে। কারণ তাদের হাতেই শিল্পবিপ্লবের জন্ম হয়েছে। ভারতেও তার শাখাপ্রশাখা গড়ে উঠেছে। শিল্পের সস্তা শ্রমিকের চাহিদা বজায় রাখতে নানা প্রক্রিয়া অবলম্বন করে কৃষি থেকে উৎপাদক কৃষককে উদ্বাস্তুতে পরিণত করে।

জেমস রেনেল এর মানচিত্র ও বাঙলার বন্যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে দেখার সূচনা

পলাশি যুদ্ধের পর, ১৭৬৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জেমস রেনেলকে বাঙলার মানচিত্র তৈরি করার দ্বায়িত্ব দেয়। প্রায় ১৪ বছর জরিপ এবং আরো ২ বছর সব তথ্য একত্র করে ১৭৮০ সালে লন্ডন থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘এ বেঙ্গল অ্যাটলাস’। যেটাকে বাঙলার আধুনিক মানচিত্র বলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে শাসক হিসাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য ছিল তিনটি। কৃষির আরো অধিক উৎপাদন, উৎপাদিত ফসল নদী পথে সহজে পাচারের ব্যবস্থা করা এবং বাঙলার বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা। এসব কারণে তাদের সামনে বাঙলার নির্ভুল মানচিত্র তৈরি করা ছাড়া অপর কোনো বিকল্প ছিল না।

কোম্পানি ক্ষমতা দখল করার পর পর বাঙলার বন্যাকে প্রকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা শুরু হয়। কারণ বন্যার ফলে রাজস্ব সংগ্রহে বিঘ্ন ঘটতো। এই পরিস্থিতিতে জেমস রেনেলের মানচিত্রকে ভিত্তি করে তারা নদীর ওপর পাড় বাঁধ দেয়া শুরু করে। কিন্তু বাঁধ বন্যাকে পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অন্যদিকে, পূর্বে যে প্রাকৃতিকভাবেই পানি নিকাশি ব্যবস্থা ছিল, তাকেও ধ্বংস করে দেয়। বাঙলায় বন্যার পানি ও পলির সাথে কৃষি ব্যবস্থার যে সম্পর্ক ছিল, বাঁধের কারণে সে ব্যবস্থাপনা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যাকে সম্পূর্ণতই প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা বলা চলে। শুধু তাই নয় ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কোনো কোনো অঞ্চলে নদীর পানি খাল কেটে কৃষি জমিতে নিয়ে যাওয়া শুরু করে। কৃষকদেরকে সেচের পানি কিনতে বাধ্য করে। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম পানির বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়।

মুলত বর্তমান সময়ে উপমহাদেশের জনগণ বন্যা এবং খরা নামের যে প্রকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে বাস করছে, এটা সম্পূর্ণতই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট। দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে একই কথা বলা যায়, যার একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র আমরা উপরেই দেখেছি।

অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সৃষ্ট জমিদার ও ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা নদীর পাড় বেঁধে বাঁধ তৈরি করে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্য ভাগ থেকে শুরু হয় আবার রেলপথ নির্মাণ। এ দুইটি প্রক্রিয়ার সাথে বাঙলার ভূগোল বদলে যাওয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সম্পর্ক রয়েছে কৃষি উৎপাদন বদলে যাওয়া ইতিহাসের। বন্যার প্রকপ বাড়ার ইতিহাস। মহামারি আকারে ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস। উইলিয়াম উইলক্স ‘দ্য এন্সিয়েন্ট সিস্টটেম অব ইরিগেশন ইন বেঙ্গল’ বইটিতে বিস্তারিত তথ্যসহ বিষয়টি আলোচনা করেছেন। ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতায় তিনি দামোদর নদীর ওপর পাড় বাঁধকে ‘শয়তানের শৃঙ্খল’ হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তৎকালীন নদী বিশেষজ্ঞ সতীশচন্দ্র মজুমদারএর মত ছিল, পাড় বাঁধ দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ আসলে উত্তর প্রজন্মকে বন্ধক রেখে বর্তমানের স্বার্থ হাসিল করা বোঝায়। মূলত ব্রিটিশদের লক্ষ্য ছিল মুনাফা করা। পরিবেশের ভারসাম্য বা আগামী প্রজন্মের ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব তাদের ছিল না।

ব্রিটিশদের নদীতে পাড় বাঁধ এবং রেললাইন স্থাপন নিয়ে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ১৯১৩ সালে বর্ধমানের মহারাজ প্রতিবাদ করেন। ওই বছর ওই অঞ্চলে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল সেটা প্রতিকারের উপায় হিসাবে মহারাজার নেতৃত্বে ৭লাখ মানুষের স্বাক্ষরিত একটা আবেদনপত্র ব্রিটিশ সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়। কিন্তু কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া সরকারের দিক থেকে গ্রহণ করা হয় নি। ১৯১৭ সালে আবারো ওই অঞ্চল যখন বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে, তখন বাঙলার বড় লাট লর্ড রোনাল্ডশে পাঞ্জাব থেকে বি আর সুবারওয়াল নামের একজন ইঞ্জিনিয়ারকে বিষয়টি তদন্ত করতে বলেন। তার পরেই মধ্যপ্রদেশে কর্মরত ই এল গ্লাস নামের অপর এক ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়োগ দেন। গ্লাস পাঁচ বছর গবেষণার পর ১৯২২ সালে তার প্রতিবেদন জমা দেন। ১৯২২ সালেও আরেকটি ভয়াবহ বন্যা হয়। গ্লাসের যে প্রতিবেদন, সেখানে প্রথম দামোদরের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু স্রোতরোধী জলাধারবাঁধের প্রস্তাব করা হয়েছিল। যে প্রস্তাবের মধ্যে দামোদরবারাকের সংযোগস্থলের ৯০ কিলোমিটার উজানে পার্জোরি গ্রামের কাছে একটি এবং বরাকরদামোদর সংযোগের ৬৪ কিলোমিটার উজানে পালকিয়া গ্রামের কাছে অপর আরেকটি জলাধারবাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ওই প্রস্তাব গৃহিত হয় নি। গৃহিত না হওয়ার কারণ হলো দামোদর উপত্যাকায় অনেকগুলি কয়ালাখনি ছিল। যার মালিক আবার ইউরোপীয়ানরা। তাদের সংগঠন থেকে ওই অঞ্চলে জলাধারবাঁধ নির্মাণের আপত্তি করা হয়। ফলে ওই প্রকল্প বাস্তবয়নে ব্রিটিশ সরকার আর অগ্রসর হয় না। এর পরে ১৯৩৫ সালে ওই অঞ্চলে আবারো বন্যা হয়।

অন্যদিকে ১৯২১ এবং ১৯২২ সালের যে বন্যা, সেটা নিয়ে বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ও দায়ী করেছিলেন ইংরেজ শাসকদের বাঁধ ও রেলপথ নির্মাণকে। তিনি তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘বিষ্ণুপুরের রাজা বিষ্ণুপুরেই থাকিতেন এবং প্রজাদের শাসন করিতেন। তিনি শত শত বাধ নির্মাণ করিয়াছিলেন। বর্ষাকালে এই সব বাঁধে জল ভর্তি হইয়া থাকিত এবং গ্রীষ্মকালে জলাভাবের সময়ে তাহা কাজে লাগিত’। ইংরেজদের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে লালমাটির দেশ বাঁকুড়াবিষ্ণুপুরের পাথুরে জমিতে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ওই জলসেচ পদ্ধতির প্রতি ইংরেজ শাসকদের উপেক্ষা আর অবজ্ঞার কাহিনী খুবই মর্মান্তিক’।

চিরস্থায়ী বন্দোদস্তের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ওই অঞ্চলে) সর্বাপেক্ষা বড় ভূস্বামী হইয়া উঠিলেন। জগতে এইরূপ অস্বাভাবিক দৃষ্টান্ত দেখা যায় নাইপ্রবাদ আছে, যাহা সকলের কাজ তাহা কাহারও কাজ নয়, – ‘ভাগের মা গঙ্গা পায় না’। সুতরাং যে জলসেচ প্রণালী বহু বছর ধরিয়া বহু যত্নে, কৌশলে ও দূরদর্শিতার সহিত প্রবর্তিত হইয়াছিল, তাহা উপেক্ষিত ও পরিত্যক্ত হইল’। আর ‘তাহার ফলে বাঁকুড়ার আধিবাসীরা এবং কিছু পরিমাণে অন্যান্য জেলার লোকেরাও বহু দুঃখ ভোগ করিয়া আসিতেছে’।

ওই একই সময়ে ব্রতচারী সমাজের প্রতিষ্ঠাতা গুরু দত্ত ছিলেন ইংরেজ সরকারের উচ্চ রাজকর্মচারী হিসেবে বাঁকুড়ার ম্যজিস্ট্রেট ও কালেক্টর। তার মতামত ছিল, ‘পশ্চিমবঙ্গে পুকুর, বাঁধ প্রভৃতি জলসেচ প্রণালীর সহিত তাহার পল্লীধ্বংসের কাহিনী ঘনিষ্টভাবে জড়িতযে কোনোও জেলায় গেলে দেখা যাইবে অনাবৃষ্টির পরিণাম হইতে আত্মরক্ষার জন্য ও জল সঞ্চয় করিয়া রাখিবার উদ্দেশ্যে, সেকালের জমিদারেরা অসাধারণ দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার সহিত অসংখ্য বাঁধ ও পুকুর কাটিয়াছিলেন। এই বাঁধ ও পুকুর নির্মাণের জন্য বাঁকুড়াই বিখ্যাত ছিলএকদিকে মল্লভূমির জমিদারেরা, অন্যদিকে বিষ্ণুপুরের রাজারা এই কার্যে বিশেষরূপে উদ্যোগী ছিলেনছোট ছোট খাল দ্বারা বড় বড় বাঁধগুলি পুষ্ট হইতবড় বাঁধ হইতে চতুর্দিকের জমিতে জলসেচন করা হইতমানুষ ও পশুর জন্য ইহা ব্যবহৃত হইত’।

তিনি আরো বলেন, ‘বাঁকুড়া আজ মরা পুকুরের দেশ। বহু বাঁধ একেবারে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে; কতকগুলির সামান্য চিহ্নমাত্র আছে (কিছু) পঙ্কিল জলপুর্ণ সামান্য ডোবাতে পরিণত হইয়াছেজেলার প্রায় ৩০৪০ হাজার বাঁধ, পুকুর প্রভৃতি ছিল; উপেক্ষা, অকর্মণ্যতা ও ঔদাসীন্যের ফলে ঐগুলি ধ্বংস হইয়া গিয়াছেজেলাতে যে দারিদ্র্য, ব্যাধি, অজন্মা, ম্যালেরিয়া, কুষ্ঠব্যাধি প্রভৃতির প্রাদুর্ভাব হইয়াছে, তাহা ওই প্রাচীন জল সরবরাহ ব্যবস্থা নষ্ট হইয়া যাইবার প্রত্যক্ষ ফল’।

আর প্রফল্লচন্দ্রএর মন্তব্য ছিল, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’র ফলে জমির উর্বরতা বাড়লেও ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব বাড়বে না, একই থাকবে। আর তাই জলসেচ ব্যবস্থার সংস্কারে ব্রিটিশ সরকারের এত ঔদাসীন্য, এত উপেক্ষা। ‘ইহার তুলনায় সিন্ধুদেশের শুস্ক মরুভূমির জন্য গভর্নমেন্টের অতিমাত্রার কর্মোৎসাহ লক্ষ্য করিবার বিষয়’। ‘সুক্কুর বাঁধের ফলে যে জমির উন্নতি হইবে, সেখানে লম্বা তুলার চাষ ভাল হইবে’। অর্থাৎ বাঙলার আদায়কৃত রাজস্ব সেদিন বাঙলায় ব্যয় না করে ব্রিটিশ ঔপনবেশিক শক্তি সেটা ব্যয় করেছিল সিন্ধু প্রদেশের তুলা চাষের জন্য। এর কারণ হলো এতে করে তুলার জন্য ব্রিটিশদের আর আমেরিকার উপরে নির্ভর করা লাগবে না। অতি স্বল্প খরচে বয়নশিল্পের কাঁচামাল হিসাবে তুলা তারা ভারতেই উৎপাদন করতে পারবে।

১৯২২ সালের বন্যা নিয়ে ‘ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান’এ একটা প্রতিবেদন বের হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনেও বন্যা সম্পর্কিত রিপোর্টে বন্যার জন্য নদীকে নয়, অতি বৃষ্টিকেও নয়, দায়ী করা হয়েছিল স্বার্থান্ধ ব্রিটিশের ভ্রান্ত রেল্পথ নির্মাণ পদ্ধতিকে। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘সরকারের প্রতি লোকের অসন্তোষ বৃদ্ধির কারণ এই যে, তাদের বিশ্বাস রেললাইন নির্মাণের ত্রুটিই বন্যার কারণ। সেখানে বন্যার পানিনিষ্কাশনের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি’। মূলত ১৯২০ সালে উত্তরবঙ্গের রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল ত্রুটি ছিল পানি নিষ্কাশনের জন্য যথেষ্ট পরিসরে কালর্ভাট নির্মাণ না করা।

১৯২২ সালের ২১ নভেম্বর আনান্দবাজার পত্রিকার রির্পোটে বলা হয়, ‘রেললাইনউত্তরবঙ্গের অশেষ দুঃখের কারণ। আদমদীঘি ও নসরতপুর অঞ্চলের গ্রামবাসীরা,বগুড়া জেলা ম্যাজিস্টেট মারফত দরখাস্ত করে যে, দুই স্টেশনের মধ্যে রেলওয়ে লাইনে সংকীর্ণ কালভার্টের পরিবর্তে চওড়া সেতু করা হোক, তাহা হইলে প্রবল বর্ষার পর উচ্চভূমি হইতে যে জলপ্রবাহ আসে, তাহা বাহির হইবার পথ পাইবে’। বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়এর মত ছিল, ‘আসল ঘটনা এই যে, বিদেশী আংশদারের স্বার্থের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া রেলপথ ও বাঁধগুলি নির্মিতবহু স্বভাবিক জলনিকাশী পথ মাটি দিয়া বন্ধ করিয়া ফেলা হয়, অথবা তাহাদের পরিসর কমিয়ে এত কম করা হয় যাতে সরু কালর্ভাটেই কাজ চলে যায়’।

ওই সময়ের একজন খ্যাতনামা স্থপতি ড, বেল্টলিকএর মন্তব্য ছিল, ‘যে সমস্ত ইঞ্জিনিয়ার এই অঞ্চলে জেলা বোর্ড ও রেলওয়ের রাস্তাগুলি নির্মাণ করেন, তারা দেশের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ লইয়া মাথা ঘামান নাই। রাস্তা ও রেলওয়ে বাঁধগুলিতে যে কালভার্ট বা পয়োনালীর ব্যবস্থা করা হইয়াছে, তাহা যথেষ্ট নহেবন্যা যে প্রায় বাৎসরিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে তাহার কারণরেলওয়ে লাইন তৈরি করবার ত্রুটির দরুন বাঙলার নদীগুলির স্বাভাবিক কার্যে বাধা সৃষ্টি করা হইয়াছে’।

১৯৩১ সালে আবারও একটা বন্যা হয়েছিল উত্তর ও পূর্ববঙ্গে। যা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অসংখ্য গ্রামকে প্লাবিত করে। পূর্বের সমস্ত বন্যার চেয়ে তার ব্যাপকতা ছিল অনেক বেশি। এই বন্যা সম্পর্কে ১৯৩২ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়এর মন্তব্য ছিল, ‘ব্রহ্মপুত্র নদীর গর্ভে প্রায় ২৫ বর্গমাইল স্থান গত বছর ভীষণ বন্যায় বিধ্বস্থ হইয়াছিলএই অঞ্চলের লোকবসতির পরিমাণ প্রতি বর্গমাইলে প্রায় ৮ শতধরিয়া লওয়া যাইতে পারে যে, বন্যায় প্রায় বিশ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্থ হইয়াছে এবং প্রায় ৪ লক্ষ গৃহ বিধ্বস্ত হইয়াছেবন্যায় বাঙলাদেশের ৮ কোটি হইতে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হইয়াছে। হিমশিলার মত ইহা সম্মুখে যাহা পাইয়াছে, সমস্তই ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছে’।

এই সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করেই ১৯৩০ সালে তৎকালীন নদী বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম উইলকক্স কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘বাঁধ নির্মাণ করার অসরতা প্রমাণিত হইয়াছে। তবু এই সমস্ত অপকার্য নিবারণ করিবে কে? পক্ষান্তরে, ভবিষ্যৎ বন্যার সতর্কতার ব্যবস্থা স্বরূপ আরও বেশি বেশি বাঁধ নির্মিত হওয়া আশ্চর্যের নহে’। মোটামুটি এই হলো ঔপনিবেশিক আমলে নদীতে পাঁড় বাঁধ দেয়া এবং রেললাইন স্থাপনের ফলাফল। খুব সংক্ষিপ্তভাবে হলেও নদীতে পাড় বাঁধরেলপথ স্থাপন এবং তার সাথে বন্যার আন্তঃসম্পর্কটা আমরা সহজেই অনুমান করে নিতে পারি।

মূলত ঊনবিংশ শতাব্দি থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিক উদ্দ্যেশে নদীকে ব্যবহার করতে গিয়ে যতটা সুফল তারা আশা করেছিল। তার থেকে কুফলের মাত্রা অনেক বেশি। ডাব্লিউ এ ইংলিশ নামে তৎকালীন এক নদীবিজ্ঞানি এক্ষেত্রে মন্তব্য করেছিলেন, ‘সঞ্চয়ের লক্ষ্যে আমরা জলাধার তৈরি করেছি, সেচের প্রয়োজনে নির্যাসের মতো নদীর পানি টেনে নিয়েছি এসব হয়েছে প্রকৃতির ভারসাম্য বিরোধী কাজ। আমরা ভাঙন প্রতিরোধ করি, নদীখাদ খনন করে পলি বালি তুলি; মনে রাখি না যে নদী চেয়েছিল ওই খাতেই পলি বালি পড়ে থাকুক। আমাদের এই সব কাজ সীমায়িত হওয়া প্রয়োজন। পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করে মানুষের বোধের ওপর’।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ১৮৫৫ সালে হাওড়া থেকে রাণীগঞ্জ পর্যন্ত উঁচু বাঁধের উপর দিয়ে রেললাইন নির্মাণ করে। রেললাইন যাতে ডুবে না যায় সেই জন্য তারা উঁচু বাঁধের ব্যবস্থা করে। রেললাইন বসাতে গিয়ে বাঁধের মাটি নেওয়া হয় লাইন বরাবর গর্ত করে। এতে করে বন্যার প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়। বেড়ে যায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ। কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

১৯০৭ সালে ইন্ডিয়ান মিরর পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়, রেললাইনকে বাঁচাতে গিয়ে দামোদরের পূর্ব পাড় বরাবর বাঁধ দেওয়ার পর বর্ধমান ও হুগলি জেলার জলাভূমি ও দীঘিগুলি মজে যায়। বাঁধের কারণে আর ওই জলাশয়গুলি পুনরুজ্জিবীত হওয়া সম্ভব হয় নি। ১৯১৭ সালে একইভাবে তৈরি করা হয়েছিল হাওড়াবর্ধমান কর্ড লাইন। এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসকরা চেয়েছিল দামোদর নদীকে বেঁধে ফেলে তার বন্যাকে রোধ করতে। ঊনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগে পানাগড় থেকে উলুবেড়িয়া পর্যন্ত দামোদরের বাম পাড়ে বাঁধ দিয়ে, সমস্ত শাখা নদীগুলি থেকে দামোদারকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ফলে একটা বড় নদীর সাথে শাখা নদীর যে সম্পর্ক সেই যোগসুত্রটা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে কৃষির সাথে নদীর যে আন্তঃসম্পর্ক ছিল, তাও ধ্বংস হয়ে পড়ে।

১৮৬৫ সাল থেকে ওই অঞ্চলে বন্যা এবং দুর্ভিক্ষ একটা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যার কিছু কিছু চিত্র উপরে উল্লেখিত হয়েছে। এই বাঁধের প্রতিক্রিয়াতে কৃষকদের যে বিক্ষোভ, সেটা সামাল দিতে ১৮৭৪ সালে জামালপুর রেগুলেটর তৈরি করা হয়। ১৮৮১ সালে জুজুট স্লুইস তৈরি করা হয়। জুজুট থেকে জামালপুর পর্যন্ত ইডেন খাল কাটা হয়। কিন্তু কৃষির সমৃদ্ধি প্রাকঔপনিবেশিক অবস্থায় আর কোনো ভাবেই ফেরানো সম্ভব হয় নি।

ভারতের নদী বিশেষজ্ঞ রাধাকমল তাঁর “দ্য চেঞ্জিং ফেস অব বেঙ্গল”, “স্টাডি অব রিভারাইন ইকোনমি” বইয়ে খুব পরিস্কারভাবে ওই সময়কার পরিস্থিতি উল্লেখ করেছেন। তিনিই প্রথম বলেন, সকলের অলক্ষ্যেই বদলে যাচ্ছে নদীমাতৃক বাঙলার চিত্র। তার মতে, এখন শীতের শেষে প্রায় সব নদী শুকিয়ে যায়। দামোদর, কাঁসাই, অজয় বা ময়ূরাক্ষীকে দেখলে মনে হয় মরুভূমি। এপ্রিল মাসে বালির মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ক্ষীণ ধারাও হারিয়ে যায়। একই চেহারা উত্তরবঙ্গের কুলিক, আত্রেয়, পুনর্ভবা সহ আরো অনেক নদীর ক্ষেত্রে সত্য। মূলতঃ ঔপনিবেশিক পরম্পরা এবং পশ্চিমা কূটকৌশলের ওপর ভর করে যে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেটা ছিল নদী ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ। বন্যা নিয়ন্ত্রণে শক্ত করে পাড় বাঁধ দেয়া, সেচের জন্য আড়াআড়ি বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ, গভীরঅগভীর নলকূপের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে পানি তোলা, পুকুরজলাভূমি বুজিয়ে ফেলা, এসব কিছুই করা হয়েছে উন্নয়নের দোহায় পেড়ে। যার ফলাফল সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই প্রত্যক্ষ করে আসছে সবাই।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে একইভাবে বদলে দেয়া হয়েছিল উড়িষ্যার মহানদী বদ্বীপের চিরায়ত কৃষি অর্থনীতি। মহানদী বদ্বীপে পাড় বাঁধ দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিত্তবান জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করা। যাতে করে তারা বছরান্তে নিয়মিত খাজনা দিতে পারে। ফলে মোঘল এবং মারাঠা আমলে যে কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল, সেটা সম্পুর্ণতই ধ্বংস হয়ে যায়। তার বিপরীতে বিরূপ একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলে ঔপনিবেশিক শাসকরা। মূলতঃ মহানদী পাহাড় থেকে নেমে সমতলভুমিতে আসার পর একাধিক শাখায় বিভক্ত হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মহানদীর এই পয়েন্টটি হলো বেশ প্রশস্ত এবং অগভীর। এবং বন্যা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। কৃষকরা তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন, সেখানে প্রকৃতিকে সৃজনশীলভাবে ব্যবহারের একটা পদ্ধতি ছিল। তারা জানতেন বন্যার পানির সাথে পলি ভেসে আসে যা জমির উর্বরতা বড়ায়। ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমায়; প্রচুর মাছের ডিম ও নানা জৈব পদার্থ ভেসে আসে। এবং বন্যা হলেও তার পানি দুতিন দিনের মধ্য নেমে যায়। ফলে তারা প্রথম থেকেই ছিলেন মহানদীর ওপর বাঁধ দেয়ার বিরোধী। তার পরেও ব্রিটিশরা মহানদীতে বাঁধ দিয়ে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার সাথে মানিয়ে চলার ধরণকে ধ্বংস করে দেয়। ঠিক তেমনি মহানদীর ওপর নির্ভরশীল অপরাপর নদীর সংযোগ সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। শাখা নদীগুলি শুকিয়ে যায়।

১৯৪০ সালের পর নদীকেন্দ্রিক আরেকটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে ব্রিটিশরা। যার নামকরণ করা হয়েছিল বহুমুখী নদী পরিকল্পনা। কিন্তু তার বাস্তবায়ন শুরু হয় ’৪৭ উত্তর ভারতে। ব্রিটিশরা এসময়ে বুঝতে সক্ষম হয়েছিল যে, বাঁধ দিয়ে নদী বেঁধে ফেলাতে তার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আর তাদের গড়ে তোলা খালের মধ্যমে সেচব্যবস্থাও তেমন আর কাজে আসছে না। তার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেড়ে গিয়েছে বহুগুণ। দামোদর ও মহানদীর বাঁধের অভিজ্ঞতা তাদের একই শিক্ষা দেয়।

১৯৪৩ সালের দামোদর নদীর যে ভয়াবহ বন্যা, সেটা ব্রিটিশদের গড়ে তোলা যাবতীয় ব্যবস্থা মূলত অচল করে দেয়। আবার ওই একই সময়ে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ। বন্যার তোড়ে দামোদরের বাঁধ, জিটি রোড ও রেললাইন ভেঙে গিয়ে কলকাতা উত্তর ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে যুদ্ধের রসদ পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর বন্যার ভয়াবহতা আঘাত হানে হাজার হাজার পরিবারের ওপর। ওই সময়ে কলকাতার রাজপথে অভুক্ত অবস্থায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, তার প্রধানাংশ ছিল দামোদারের বন্যার শিকার। তৎকালীন বাঙলার ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ফ্রামজি নামের এক ইঞ্জিনিয়ারকে সিন্ধু প্রদেশ থেকে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য নিয়ে আসে। তার পরামর্শ মোতাবেক ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে বাঁধের ফাটল রোধে মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়। কিন্তু পানির তোড়ে সে মাটি হাওয়া হয়ে যায়।

এখানে যে বিষয়টি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এই উপমহাদেশের অসংখ্য নদনদীর মধ্যে এক গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র প্রতি বছরে যে ১৬৭ কোটি টন পরিমাণ পলি বহন করে। ইউরোপআমেরিকার সব নদী মিলিয়ে তা করে না। পাশাপাশি বর্ষাকালে মহানদী বা দামোদর যত পানি বহন করে আনে তা কোনো জলাধার নির্মাণ করে ধারণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া নদীর পাড় উঁচু করলেই যে বন্যা ঠেকানো যায় না সেটা যেমন বাস্তব তেমনি উঁচু পাড় উপচে পানি একবার কৃষি ক্ষেতে ঢুকে গেলে তা বের হওয়ার রাস্তা পায় না। এর ফলাফল হলো পানি জমে ফসল পচে যাওয়া, ম্যালেরিয়ামশার বংশবৃদ্ধি হওয়া। ওই সময়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটেছে ম্যালেরিয়ার কবলে পড়ে। এর প্রত্যেকটি প্রতিক্রিয়া ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে উপমহাদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন।

৪৭ উত্তর ভারতে বড় বড় বাঁধ নির্মাণ করেও সেচের চাহিদা মেটান যায় নি। যেমন মহানদী খাতের উপরে হিরাকুদ এবং দামোদরবরাকর নদীর খাতে মাইথন, তিলাইয়া, পাঞ্চেৎ, কেনার এবং পরবর্তীতে বিহার সরকারের উদ্যোগে তেনুঘাটে আরো একটি বড় বাঁধ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রনের স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যায়। উজানে অতিবৃষ্টি হলেই জলাধার থেকে পানি ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এতে করে পানির তোড়ে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যায়। আবার জলাধারগুলি পলি জমে তার ধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে টান পড়ে সেচের পানিতে। ফলে নিরুপায় কৃষকরা মাটির নিচের পানি তুলে ঘাটতি মেটায়। কিন্তু অপ্রতিহত চাহিদা মেটানোর মতো পানিও নিচের জলভাণ্ডারে নেই। বর্ষায় যতটা পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে তার চেয়ে অনেক বেশি পানি টেনে তোলার ফলে অনেক জায়গায় পানির স্তর বহু নিচে নেমে গিয়েছে। নিচের স্তরের পানি আর্সেনিক ও ফ্লুওরাইডে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। আর সেই বিষ খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে ধান, সবজি, ফলমূল সবকিছুই বিষাক্ত করে ছাড়ছে। একইভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের যে প্রবাহ খরা মৌসুমে নদীকে যেভাবে সজীব রাখতো। ওই প্রকৃতিক চক্র ভেঙে পড়েছে। মূল নদী থেকে শাখা নদী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেগুলি আজ মৃত প্রায়। বালিতে ঢেকে গেছে। অবহেলায় মজে গেছে।

একটা পাহাড়ি ছোট নদীর ওপর সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা

নেপাল, হিমালয় ও উত্তর বিহারের বেশ কিছু ছোট নদীর মধ্যে যে কার্যকরণ সম্পর্ক রয়েছে, সেটা প্রত্যক্ষ করা যায় তরাইডুয়ার্স অঞ্চলে। সিকিম ও ভুটানের বৃষ্টি ও জঙ্গলবহুল পাহাড় থেকে ছোট বড় অনেক নদী নেমে এসেছে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং এর সমতল অংশে। এখানে নদীনালাখোলাঝোরার সংখ্যা অগণিত। এক জলপাইগুড়িতে ছোট নালা বা ঝোরার সংখ্যা বাদ দিলে মহানন্দা তিস্তা পূর্ব ব্রহ্মপুত্রের আগ পর্যন্ত করলা, ধল্লা, জলঢাকা, কালজানি, রায়ডাক ইত্যাদি মিলিয়ে নদীর সংখ্যা ১২’র উপরে। এই সব নদীর মধ্যে সংযোগসম্পর্ক তুলে ধরতে গবেষকরা একটা অখ্যাত নদীর চিত্র সামনে এনেছেন। নদীটির নাম নেওরাক। এই নদীর দৈর্ঘ্য ৬০ কিলোমিটার। গভীর ও দুর্ভেদ্য জঙ্গল এবং গিরিখাদের মধ্য দিয়ে সেটা বয়ে চলেছে। দার্জিলিং পাহাড় থেকে নেমে আসা ৯টি বড় ঝোরার পানিতে পুষ্ট হওয়ার পর গরু বাথান এর পরে এসে মাল নালা ও কুর্তি নদীর পানি এসে নেওরায় পড়েছে। এর পর চা বাগানের মধ্যে এসে আরো কিছু খালের পানিতে পুষ্ট হয়েছে। তারপরে নেওরা মিলিত হয়েছে ধল্লাতে। আর ধল্লা তিস্তাতে মিশেছে। এভাবে তিস্তা, তোর্সা, ধল্লা, কালজানি ইত্যাদি উত্তর বাংলার বেশ কিছু নদী বাংলাদেশে এসে যমুনা, আর পরে পদ্মায় মিলিত হয়েছে। অর্থাৎ আমরা যে নেওরাক নামের একটা ছোট পাহাড়ি নদীকে বেছে নিয়েছি তারও একটা ইতিহাস রয়েছে। নদীটির একটা স্বচ্ছন্দ গতি ছিল। এমন কি নৌযোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। যা আজ বিলুপ্তির পথে।

হিমালয় পর্বতের সিংগালিলা রেঞ্জের পশ্চিমের ঢাল কোশি আর পূর্বের ঢাল তিস্তার অববাহিকা। কোশি এবং তার সহায়িকা নদী নেপালের পাহাড় থেকে যত মাটিবালি যে গতিতে সমতলে নিয়ে আসে, পুর্ব দিকের বনের ঘনত্বের কারণে ভুমিক্ষয়ের কবল থেকে ওই অঞ্চল রক্ষা পায়। দার্জিলিং এবং সিকিম পাহাড়ে অরণ্য ও ঘাসগুল্মে মাটির উপরে শক্ত আচ্ছদন থাকার ফলে প্রবল বৃষ্টির তোড়ে মাটি তো ধুয়ে যায়ই না বরং অনেক বেশি পানি হিউমাসের মধ্যে এবং মাটির নিচে জমা হয়। এক সময়ে ওই পানিই ঝর্ণা বা ঝোরা বয়ে এসে সমতলে পৌছে নদীতে রূপ নেয়। অনেক ধারা একত্রে মেশে। এভাবে হিমালয় এবং তরাই অঞ্চলে বৃষ্টির বিপুল জলরাশিকে আলোচিত এসব ঝোরাখালছোট নদী ইত্যাদি খুবই সুষ্ঠুভাবে ধারণ এবং বিতরণ করার ক্ষেত্রে আবহমান কাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। প্রাকৃতিক এই ইকোলজিক্যাল সিস্টেমের কারণে ভারতের উত্তর বাঙলাসহ বাংলাদেশের একটা বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে, বিশেষত গঙ্গাপদ্মাব্রহ্মপুত্রের নিম্ন অঞ্চলকে সরস রাখতো। পানি জমতে দিত না। এর প্রভাব ছিল আলোচিত সমগ্র অঞ্চলের বনঅরণ্য ও কৃষির ওপর। বনের ঘনত্ব্ব ও বৈচিত্র্য একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সমৃদ্ধি ও শৃঙ্খলা অটুট রাখতো, অন্যদিকে সেই শৃঙখলার ওপর নির্ভরশীল ছিল বহু গ্রাম এবং জনপদের জনগোষ্টি। এই যে আলোচিত ইকোলজিক্যাল সিস্টেম ও তার ওপর নির্ভরশীল মানুষ এবং প্রাণী জগৎ, সেখানে কিন্তু আমাদের আলোচিত অখ্যাত নদী নেওরারও একটা ভূমিকা ছিল বা আছে। অর্থাৎ একটা বৃহৎ সংযোগসম্পর্কের সেও একটা অংশ ছিল। কিন্তু সে ভূপ্রকৃতি বা ইকোলজিক্যাল সিস্টেম এখন বদলে গেছে। এর অন্যতম কারণ হলো ঔপনিবেশিক আমলে আলোচিত অঞ্চলগুলিতে চা বাগান তৈরি হওয়া। এবং প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যে টিকে থাকা ঘনবনকে উপড়ে ফেলে পাইন বাগান তৈরি করা। চা বাগান তৈরির সময় যাদেরকে স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ করে আনা হয়েছিল, তারা যেমন জীবনযাপনের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তেমনি চা শ্রমিক হিসাবে এখানে কাজ করলেও এই অঞ্চলের প্রাকৃতিকতা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারনা ছিল না। ফলে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটতে খুব বেশি সময় লাগেনি। মূলত এটা হলো একটা পাহাড়ি নদীর ছোট গল্প। এবার আমরা সমতলের ছোট নদীর ভূমিকার ওপর কিছু কথা জেনে নিতে পারি।

সমতলের ছোট নদী

ছোট নদী নিয়ে কথা বলতে গেলে মূলত দুই ধরনের নদী পাওয়া যাবে। ফলে কোনো কোনো নদী বিশেষজ্ঞ ছোট নদীকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। উপনদী ও শাখা নদী হিসাবে।

উপনদী মূলতঃ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পানি বহন করে নিয়ে এসে মূল নদীতে মেশে এবং নদীর পানি বৃদ্ধি করে। আর শাখা নদী হলো সেগুলি, যা মূল নদী থেকে পানি বহন করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যায়। এর মধ্যে উপনদীগুলি প্রধানভাবে বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টির সময় ঝরে পড়া পানি একটা খাদ ধরে চলতে চলতে ছোট নদীর জন্ম হয়। সাধারণতঃ বৃষ্টির ওই সময়টুকু বা তার থেকে দুইতিন মাস বেশি এই সব নদীর আয়ু। বাংলাদেশে এধরনের অসংখ্য নদীর অস্তিত্ব এক সময়ে ছিল। যা এখন নাই। আবার ভারতের রাজস্থানের কিছু অঞ্চলে এ ধরনের নদীর অস্তিত্ব রয়েছে।

এছাড়া ভারতের পুরুলিয়ার আদ্রা ও হুড়ার মাঝামাঝি জায়গায় দুটিতিনটি ছোটখাটো জলধারা কাশিপুরের কাছাকাছি জমা হয়ে একটা ঝিল বা জলাভূমি তৈরি করেছে। এই ঝিলের উপচে পড়া পানি থেকে ছোট একটা ধারা মাঠ পেরিয়ে রওনা করে। সেই নদীটির নাম দ্বারকেশ্বর বা ধলকিশোর। তার বা দিকে আরেকটি সংযোগ নদীর নাম কুমাসিনালা। এভাবে ছোট বড় অনেক নালাধারা মিলিয়েই দ্বারকেশ্বরের জন্ম। এবং প্রতিটি খালনালাকে ভিত্তি করেই কিন্তু গড়ে উঠেছিল অসংখ্য জনপদ। সেসব জনপদের মানুষজন আবার তাদের জীবনযাত্রার সাথে মিলিয়ে পার্শ্ববর্তী নালাখাল বা ছোট নদীর নাম রেখেছে।

বাংলার বাইরেও জলাভূমি থেকে অনেক নদীর জন্ম হয়েছে। মূলত এসব জলাভূমিগুলি ভূপৃষ্ঠের অনেক নিচু জায়গা। এখানে মাটির তলা থেকে উঠে আসা একটা পানির স্রোত থাকে। আর তার সাথে অনেক বড় অঞ্চলের গড়িয়ে আসা বৃষ্টির পানি মিলে ওই জলাভূমির জন্ম হয়। এবং এক পর্যায়ে ওই পানি নিষ্কাশনের পথ ধরেই কিছু নদীর জন্ম হয়। আসামের স্বর্ণবিল থেকে এভাবে জন্ম নিয়েছিল ৭টি নদী। একইভাবে বাংলাদেশের চলনবিল থেকে একসময়ে ছোটমাঝারি মিলিয়ে প্রায় ২০টি জলধারা জন্ম নিয়েছিল। এর মধ্যে কোনোটা ছোট নদী হিসাবে খ্যাত ছিল। বাংলাদেশের হাওড় অঞ্চলেও একসময় এ ধরনের ছোট নদীর অস্তিত্ব ছিল। মূলত এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছোট নদী বা উপনদীর পানির প্রবাহ কমে গেলে যেমন বড় নদীর পানি প্রবাহে টান ধরে তেমন শাখা নদীর পানি প্রবাহ কমে গেলে তার উপরে নির্ভরশীল বাস্তুতন্ত্র বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। এর বাইরেও আরো কিছু প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যেমন, ২০০০ সালের সেপ্টম্বর মাসে টানা তিনদিনের বৃষ্টির ফলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যে বৃষ্টি হয়েছিল তার ফলে বনগাঁও, নদীয়া, বীরভুম এবং উত্তর চব্বিশ পরগানার একটা বিস্তৃর্ণ অঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এক অঞ্চলের পানি অন্য অঞ্চলে ঢুকে যায়। টানা সূর্যের তাপেও কিন্তু ওই পানি বাষ্পীভূত হয়ে উবে যায় নি। পূর্বে ওই অঞ্চলে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একটা প্রাকৃতিক সিস্টেম ছিল। সেটা হলো ইছামতির পথ ধরে বৃষ্টি বা বর্ষার পানি নেমে যাওয়া। কিন্তু বর্তমানে ইছামতি নদীতে মাছের ঘের, নদীর মাঝে পার্ক নির্মাণ, নদী বেঁধে ফেলে তার বুকের উপরে রাস্তা নির্মাণ এবং কৃষি ক্ষেত তৈরি হওয়াতে, এখন আর ইছামতির অস্থিত্ব নাই। ফলের বনগাঁবসিরহাট ও বারাসাতের পানি নিষ্কাশনের পথ এখন রুদ্ধ। অর্থাৎ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরে যে উন্নয়ন শুরু হয়েছে। তারই অব্যাহত গতি আমাদের প্রাকৃতিকতা জনজীবনসহ মানসিকতারও ধ্বস নামিয়েছে।

সাতচল্লিশ উত্তর ভারতের নদীকেন্দ্রিক প্রকল্প ও পশ্চিমা মডেলের ফলাফল

সাতচল্লিশ উত্তর ভারতে নদীকেন্দ্রিক ভাবনার যাত্রা শুরু হয় ধরতে গেলে মেঘনাদ সাহার হাত ধরে। যাকে সমন্বিত প্রকল্প বলা হয়ে থাকে। যদিও এই ভাবনার জন্ম হয়েছিল খোদ ব্রিটিশ আমলে।

১৯১২ সালে পদ্মা নদীর ওপর হার্ডিঞ্জ সেতু নির্মিত হয়। কিন্তু তার স্থান নির্বাচন নিয়ে ছিল মতবিরোধ। ১৯৩১ সালে পদ্মার পানি যখন ফুলেফেপে উঠে বিপদজনক অবস্থায় পৌছে যায় তখন নদী বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে শুরু হয় নতুন ভাবনা। যার মধ্যে স্যার ফ্রান্সিস ছিলেন অন্যতম। তার বক্তব্য ছিল, বন্যা থেকে বাঙলাকে রক্ষা করতে হলে একটা নদী গবেষনাগার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। যেখানে হিমালয়সঞ্জাত নদীগুলির সারা বছরের পানি প্রবাহের মাত্রা, দীর্ঘকালের সঞ্চিত হিসাব থেকে নির্ণীত বছরের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ইত্যাদির সঠিক তথ্য ছাড়া বাঙলার নদীসমূহের যথার্থ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। স্যার ফ্রান্সিসের এই প্রস্তাব মেঘনাথের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তিনি এই আলোকে তার ভাবনাগুলিকে কেন্দ্রীভূত করেন।

১৯৩১ সালের আগস্ট মাসে ছিল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ৭০তম জন্ম বার্ষিকী। এই উপলক্ষে স্মারণিকা গ্রন্থে Need for a Hydraulic Research Laboratory in Bengalপ্রবন্ধে তিনি বললেন, বন্যানিয়ন্ত্রণ, উন্নত সেচব্যবস্থা মাধ্যেমে কৃষিকার্যে সহায়তা ও জলবিদ্যুৎপ্রকল্প তৈরি করতে বার্নিনভিয়েনা ও আমেরিকায় যেমন বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। খানিকটা সেই ধাঁচে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অধীনে বাঙলায় তেমন কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি হওয়াটা খুব জরুরি। সেখানে বৃষ্টির পরিমাণ, পানিপ্রবাহ, পলিসঞ্চয় ও ভূসংস্থানের যাবতীয় তথ্যাবলি সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত হবে। যাতে প্রয়োজনে বাঁধের স্থান ও প্রাকৃতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা সহজ ও ত্বরান্বিত হতে পারে।

এরপর ১৯৩৪ সালে মুম্বাইএ ভারতীয় বিজ্ঞান ও নদী এবং পদার্থ বিজ্ঞানের আলোকে যে সভা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণের একাংশে তিনি বলেন, নদীর যেমন কল্যাণকর রূপ রয়েছে। তার ব্যনায় মাটি উর্বর হয়, সভ্যতার বিকাশ ঘটে, তেমনই তার সংহাররূপও আছে, আর তা এমনই ভীষন যে, কিছু মানুষের ধনপ্রাণ শুধু নয়, একএকটি সভ্যতারও সে বিলোপ ঘটাতে পারে চোখের পলকে। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নদীর এই রুদ্ধচণ্ডাল স্বভাবকে আমাদের আয়ত্বে আনি। তাকে কল্যাণকর করে তুলি।

তারও পূর্বে, অর্থাৎ ১৯২২ সালে বন্যার প্রকোপ নিয়ে ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে একটা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ছিলেন একজন সদস্য। তার সহায়তায় মেঘনাদ একটা খসড়া রিপোর্ট হাতে পান। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ১৭৮৭ সালের পূর্বে বাংলার নদীতন্ত্র এমনই ছিল, যাতে সারা রাজ্যে জলের বন্টন ছিল মোটামোটি সমান। স্বল্পমেয়াদী বন্যা হলেও তার জল নেমে গেছে দ্রুত, দেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ছিল না। ফসল হয়েছে প্রচুর, ভূমিক্ষয়েরও সমস্যা ছিল না। ১৭৮৭ সালের পর থেকেই অবস্থার অবনতি হয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণপশ্চিমের গঙ্গা ও তার উপনদী মহানন্দা, আর উত্তরপূর্বে উপনদী তিস্তাসহ ব্রহ্মপুত্র এসব জলধারা একত্রিত হয়েছে গোয়ালন্দের কাছে। এই সম্মেলিত জলধারা দক্ষিণ সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের জলধারা এমনিতেই উঁচু, তার ওপর অতিবৃষ্টির জল যুক্ত হলে সম্মিলিত জলধারার ধারণক্ষমতা টুটে যায়। তার ওপরে বাঙলার মাটি নরম বলে এই অবস্থায় গতিপথ রুদ্ধ হওয়াতে নদী বারংবর নতুন পথ খোঁজে, বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। মেঘনাদ সাহা এই রিপোর্টকে সামনে রেখে ১৯৩২ সালে Catastrophic Floods in Bengal and How They Can Be Combated, Modern Review 51নামে যে প্রবন্ধ লিখেন, সেখানে যে বিষয়টি কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে ছিল তাহলো খাল কেটে গতিপথ তৈরি করে দিলে, পানির সুষম বন্টন ঘটবে, নদীর গতিপথ বদলানোর প্রবণতা কমে যাবে।

১৯৩৯ সালে মেঘনাদ সাহা জাতীয় পরিকল্পনা সমিতি শক্তি ও জ্বালানি উপসমিতির সভাপতি এবং নদী নিয়ন্ত্রণ ও সেচ উপসমিতির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৪৩ সালে দামোদরের যে ভয়াবহ বন্যা তাকে সামাল দিতে গঠন করা হয়েছিল ‘দামোদর অনুসন্ধান কমিটি’। বর্ধমানের মহারাজা হন সভাপতি, Bengal River research Institute এর অধিকর্তা নলিনীকান্ত বসুকে করা হয় সচিব। এবং মেঘনাদসহ সেচ দপ্তরের মুখ্য ইঞ্জিনিয়ার বি এল সুবারওয়াল, লাহোর সেচ গবেষণা কেন্দ্রের অধিকর্তা কানওয়ার সেইন, পুনের নদী গবেষণাগারের অধিকর্তা সি সি ইংলিশ, কলকাতা বন্দর সংস্থার নদী সংরক্ষক এম কিলফোর্ড, বাংলার বনরক্ষক হার্ট, বিহার বনদপ্তরের বি এল সাভারওয়াল এবং বিহার সেচ দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার এল আর সাভারওয়াল। এই কমিটিতে বন্যাপ্রতিরোধে নদীতে পাড় বাঁধ নির্মাণের অসারতা নিয়ে কমিটির ভারতীয় সদ্যসরা একমত হলেও ইউরোপীয় সব সদস্যরা একমত ছিলেন না। ১৯৪৪ সালে ওই কমিটির খসড়া প্রতিবেদন বের হয়। যেখানে নদীতে পাড় বরাবর বাঁধ নির্মাণের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করা হয়েছিল। তার পরিবর্তে আড়াআড়ি স্রোতরোধী কয়েকটি জলাধারবাঁধ নির্মাণ ও ভূমিক্ষয়রোধী বনসৃজনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। ওই বৈঠকে মেঘনাদের প্রস্তাব ছিল পানির বহুমাত্রিক ব্যবহার। যেমন জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, জল সেচ ও পরিবহনের গুরুত্ব ইত্যাদি। ওই প্রস্তাব গৃহিত হয় নি তখন।

ইতিমধ্যে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সুচনা হয়েছে। ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ও আমেরিকা সরকারের যৌথ উদ্যোগে বিজ্ঞানকে কিভাবে যুদ্ধের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, সেটা নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের দুই দেশে সফরের আয়োজন করে তারা। যার মধ্যে অন্যতম সদস্য ছিলেন মেঘনাদ সাহা। ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় বিজ্ঞানিরা যখন আমেরিকাতে পৌছালেন, ওই সময় মেঘনাদ টেনিস ভ্যালি প্রকল্পটি স্বচক্ষে দেখেন এবং তার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন।

১৯৪৬ সালে মেঘনাদ The Planning for the Damodar Valleyনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। ১৯৪৬ সালের মার্চে ছোট লাট হথোর্ন লুই হীরাকুদে মহানদীর উপরে একটি জলাধারবাঁধের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত করে। পরে নেহেরু সরকার ওই একই প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে। ১৯৪৮ সালের মার্চে দামোদর ভ্যালি বিলটি পেশ করেন মিঃ গ্যাডগিল এবং সেটা অনুমোদিত হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালের ৭ জুলাই দামোদর নিগম তৈরি হয়। মেঘনাদ সাহা এই প্রকল্পের এক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

দামোদর ভ্যালি প্রকল্পের ক্ষেত্রে মূলতঃ ৪টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ১) বন্যা রোধ করা, ) দামোদর উপত্যাকাতে চাষের জন্য সারা বছর পানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা, ) শিল্প ও পারিবারিক ক্ষেত্রে নিরবিচ্ছিন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা, ) নদীর নাব্যতা যথা সম্ভব বজায় রাখা।

এছাড়া মেঘনাদ দামোদর ভ্যালি প্রকল্পের ক্ষেত্রে নদী উৎসের উচ্চতাসহ স্থিতিশক্তির পরিমাণ কোথায় কতটা, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শক্তি পাওয়া সম্ভব, পানির সঙ্গে বয়ে আসা পলির পরিমান এবং এই জলাধারের আয়ু কত, এসব হিসাব করেই মেঘনাদ এগিয়েছিলেন। আর তাঁর কৃতিত্ব এখানে যে, তিনি তাঁর জীবদ্দশায় তা চালু করতে পেরেছিলেন। কিন্তু দামোদর উপত্যাকা ঘিরে মেঘনাদসহ ভারতীয় অপরাপর যে সব বিজ্ঞানীদের উচ্চাশা ছিল, তা সফল হয় নি। বিশেষতঃ চাষীরা সময়মতো চাষের জন্য পানি পান নি। অতিবৃষ্টিতে জলাধার বাঁচাতে পানি ছাড়তে হয়েছে। এর ফলে গোটা উপত্যকা অঞ্চলে চাষের জমিসহ চাষিদের ঘরবাড়ি বন্যার তোড়ে খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছে। এসব কিছুই ঘটেছে মেঘনাদের জীবদ্দশাতে। এর বাইরে দামোদর ভ্যালির সুচনা পর্বেই ব্যাপক অর্থের দুর্নীতি হয়। ১৯৫৬ সালে লোকসভার সদস্য হিসাবে খোদ মেঘনাদ সাহা নিজে বিষয়টি নিয়ে ঝড় তুলেছিলেন। দুর্নীতি প্রমাণিতও হয়। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থাকে। তারপরও দামোদর ভ্যালির গুরুত্ব হলো এই বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভারতে নদী বিজ্ঞানের গোড়া পত্তন হয়।

অন্যদিকে, শুরুতেই দামোদর প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় আরো বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসে। যার মধ্যে প্রধান সমস্যাটি হলো নদীর তীরবর্তী অঞ্চল বা উপত্যকা অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসনের সমস্যা। এই উচ্ছেদ বলতে মানুষের সংস্কৃতির শিকড় থেকেই মূলোচ্ছেদ ঘটে। যা নিয়ে তৎকালীন ভারতীয় অপরাপর বিজ্ঞানীসহ খোদ বিজ্ঞানী মেঘনাদের ভাবনার মধ্যে বিষয়টি ছিল না। এছাড়া যেখানে বাঁধ তৈরি হয়, তার স্রোতধারার প্রভাব শুধু ভাটি অঞ্চলেই নয় উজানের বিস্তৃত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এবং চাষের জন্য যে সেচ, ওই পানিতে আশানুরূপ পলি থাকে না। পলি জমতে থাকে জলাধারের তলদেশে। এবং ’৪৭ উত্তর ভারতে বিজ্ঞানী মেঘনাদের মডেলকে সামনে রেখে ৫১ হাজার জলাধারবাঁধ তৈরি করে ভারত। কিন্তু তারা কোথাও কাঙ্খিত উন্নয়ন ঘটাতে পারে নি। যার নজির উদাহরণ হিসাবে অনুসরন করা যেতে পারে।

নয়াউদারনৈতিক ভারতে খনিজ সম্পদভুমিনদী দখলের মডেল উড়িষ্যা

এই পর্বের আলোচনার শুরুতেই আমরা ১৮৯১ সালে প্রকাশিত আমেরিকান সায়েন্টিফিক জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধের একটা অংশের উপর নজর বুলিয়ে নিতে পারি। ওই প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, ‘লোহা হলো আমাদের সভ্যতার ভিত্তি। এর ক্ষমতা আর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে অতিরঞ্জন সম্ভবতবু আমরা সেই যুগের দিকে এগিয়ে চলছি, এমন কি এখন আমরা হয়তো দাঁড়িয়ে আছি সেই যুগের দোরগোড়ায়, এই যাদুকরি ধাতুর (লোহার) বৈপ্লবিক স্থানচ্যুতি ঘটবে। সব ধরনের আপাতশক্তি সত্ত্বেও লোহার স্পষ্টই দুর্বলতা রয়েছে। আদ্রতার সাথে লড়াই চলে সর্বত্র, বিভিন্ন ধরনের গ্যাস ও তাপমাত্রা এর আয়ুক্ষয় করে দেয়, অবিরাম ধাক্কা ও গতি কেলাসিত করে জীবনীশক্তি কমায়, এ্যাসিড একে আত্মসাৎ করে। দুর্বলতার সবকটি লক্ষণ, কিংবা যদি শুধু একটি বা দুটি লক্ষণও অন্য কোনো ধাতু থেকে অপসরণ করা যায়, তাহলে সেটাই হবে ভবিষ্যতের ধাতু’।

উপরের এই আলোচনা থেকে আমরা খুব সহজেই সেই ধাতুর নাম অনুমান করে পারি। বর্তমান যুগে তার হলো অ্যালুমিনিয়াম।

ইতিহাসে পিয়ের বার্থিয়ের নাম আমাদের কাছে ঠিক অতটা পরিচিত নয়। যতটা বক্সাইড পরিচিত। কিন্তু পিয়ের বার্থিয়ের আবিস্কৃত ধাতুটি বর্তমান সভ্যতার চালক হিসাবেই গণ্য হচ্ছে। ১৮২১ সালে তিনি দক্ষিন ফ্রান্সের লে বক্স নামে একটা গ্রামে লাল কাঁকুরে মাটি খুজে পান। ওই গ্রামের নামেই বিশেষ লাল বর্ণের কাঁকুরে মাটির নামকরণ করেন বক্সাইট। বক্সাইটে রয়েছে ধাতব আকরিকের যৌগ। পরবর্তীতে ওই একই দেশের আরো দুজন বিজ্ঞানী মর্ভিউ আর ল্যাভোসিয়ের আরেকটি ধাতু আবিস্কার করেন। যার নামকরন করেন তারা অ্যালুমাইন। এর চার বছর পরে ক্রিশ্চিয়ান ওরস্টেড পরিক্ষাগারে প্রথম সাদা এই ধাতুকে পৃথক করেন। যা বর্ণের দিক থেকে উজ্জল। একই সাথে পালকের মত হালকা। এভাবে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বক্সাইট থেকে অ্যালুমিনিয়ামের পৃথকীকরণ সম্ভব হয়। আমরা এটাও জানি, বিশ শতকের ইতিহাসে এই অ্যালুমিনিয়াম থেকে জাহাজ, বিমান, মোটরগাড়ি, ক্ষেপনাস্ত্র, যুদ্ধাস্ত্র, উপগ্রহের যন্ত্রাংশ, মোবাইল ফোন, বিয়ারের ক্যান ইত্যাদিসহ আমাদের জীবনযাত্রার অংশ হিসাবে হাজার হাজার সামগ্রী উৎপাদন ও নির্মাণ হচ্ছে। ফলে বর্তমান বিশ্বে বক্সাইট বলতে অ্যালুমিনিয়াম বোঝায়। আর অ্যালুমিনিয়ামের অর্থ হচ্ছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসহ জীবনযাত্রার আধুনিকতা।

বক্সাইট যে পৃথিবীর সমস্ত দেশেই পাওয়া যায়, তা নয়। আবার সেটা পাওয়া গেলেও গুণগত মানের ফারাক রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে আবিস্কৃত ও সঞ্চিত মোট বক্সাইটের আট ভাগের এক ভাগ রয়েছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। গুণগত দিক থেকে তা এতোই উৎকৃষ্ট যে, পৃথিবীর অপর দুই একটা দেশেই কেবল তার সন্ধান মেলে। ফলে বক্সাইট উত্তোলনে ভারতের ক্ষমতাসীন সব রাজনৈতিক দলমিডিয়ামধ্যশ্রেণীসহ দেশিবিদেশি কর্পোরেট পুঁজি ভীষন তৎপর। আর তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছু ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ।

মূলত অ্যালুমিনিয়াম এমন এক আশ্চর্য ধাতু। যা সহজে যেকোনো ধাতুর সঙ্গে সহজে মিশিয়ে তৈরি করা যায় নানা উপযোগী যৌগ। যা ওজনে খুব হালকা, নমনীয়, মজবুত, এবং উজ্জ্বল। স্থায়ীত্বের দিক থেকেও অন্য ধাতুর চেয়ে অনেক বেশি টেকসই। ফলে আমরা যদি ধাতুর নিরিখে বিভিন্ন যুগের ইতিহাসকে ভাগ করি, তাহলে তামা ব্রোঞ্জ এবং লোহার পরেই আসবে অ্যালুমিনিয়ামের যুগ। শুধু তাই নয় বর্তমানে এক একটা দেশের সভ্যতার উন্নয়নের পরিমাপ করা হচ্ছে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহারের নিরিখে। যেমন ইউরোপআমেরিকায় বছরে মাথা পিছু অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ৩০ কেজি, সেখানে ভারতে ৬৫০ গ্রাম। যদিও এই হিসাবের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের পরিমাণ ধরা নাই।

অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো বক্সাইট। যাকে আমরা সাধারনত লাল কাঁকুরে মাটি বলে থাকি। যা পাহাড়ের ৩০ থেকে ১০০ ফুট গভীরতায় ছড়িয়ে থাকে। বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি খুঁড়ে তাকে তুলে আনতে হয়। আর ঠিক এই তুলে আনার সময় পাহাড়ের প্রাণবৈচিত্র ও অসংখ্য ঝর্ণাধারা ধ্বংস করেই তা উত্তোলন করতে হয়। তার পরে আসে পরিশোধনের পর্ব।

পরিশোধনাগারে প্রথমে বক্সাইট থেকে তৈরি হয় সোডিয়াম অ্যালুমিনেট বা অ্যালুমিনা। এই প্রক্রিয়ার সময় বর্জ্য হিসাবে যে লাল তরল মাটি পরিত্যক্ত হয় সেটা খুবই বিষাক্ত। সাধারণ হিসাব হলো ৮ টন বক্সাইড থেকে ১ টন অ্যালুমিনা পাওয়া যায়। আর বাদবাকিটা বর্জ্য হিসাবে পরিত্যাক্ত হয়। যা উদ্ভিদ ও প্রানী জগতের জন্য খুবই বিষাক্ত। যার মধ্যে ইউরেনিয়াম ও টাইটেনিয়াম ছাড়াও একাধিক ভারি ধাতু থাকে। যা আশেপাশের নদীনালা, খালবিলের পানিকেই শুধু বিষাক্ত করে না, ভূগর্ভস্থ্য পানিও দূষিত হয়ে পড়ে। একই সাথে নির্গত হয় প্রচুর গ্রীনহাউস গ্যাস। অর্থাৎ মানুষপ্রকৃতিউদ্ভিদজীবজগৎ মিলিয়ে যে বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। খনি থেকে বক্সাইট অহরণ ও অ্যালুমিনায় রুপান্তর প্রক্রিয়ার সাথে সেই বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস সরাসরি সম্পর্কিত। এর পরের ধাপটি অ্যালুমিনা থেকে অ্যালুমিনিয়ামে রূপান্তর প্রক্রিয়া।

সাধারণত ২ টন অ্যালুমিনা থেকে ১ টন অ্যালুমিনিয়াম পাওয়া যায়। কিন্তু ১ টন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন করতে গেলে গড়ে ১৫০০ টন পানি ও ১০ টন বিশুদ্ধ বায়ুর প্রয়োজন হয়। একই ভাবে অ্যালুমিনা থেকে অ্যালুমিনিয়ামের রূপান্তর প্রক্রিয়ার সময় অক্সিজেনের সঙ্গে অ্যালুমিনিয়ামের আণবিক গাঁটছড়া ভাঙতে গেলে প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ প্রবাহ। এক্ষেত্রে সাধরণ হিসাব হলো ১ টন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনে ১৩,৫০০ থেকে ১৭,০০০ কিলোওয়াট প্রতিঘন্টা বিদ্যুৎ প্রয়োজন। অর্থাৎ, এই সহজ হিসাব থেকে আমরা অনুমান করে নিতে পারি অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনে কি পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ খরচের বিষয় রয়েছে। ফলে অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনে বিদ্যুৎ ও পানির প্রকৃত মূল্য যোগ হলে তার মূল্য দাঁড়াবে রূপার থেকে বেশি। এই অন্যতম কারণে অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনের শুরু থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে জলবিদ্যুৎ।

বিশ শতকের মাঝামাঝিতে ইউরোপআমেরিকা ও কানাডায় যতগুলি অ্যালুমিনিয়াম কারাখানা গড়ে উঠেছিল। তার প্রয়োজনেই গড়ে তোলা হয়েছিল বড় বড় বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ফলে তাদের প্রায় সমস্ত বড় বড় নদীতে বাঁধ দিতে হয়েছিল। এসব বাঁধ ও অ্যালুমিনিয়াম কারখানার দূষণের মাত্রা এমন একটা পর্যায়ে উপনিত হয় যে, তাকে কেন্দ্র করে ওই সব দেশগুলিতে অসংখ্য রাজনৈতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন গড়ে ওঠে। তাদের সম্মিলিত আন্দোলনের চাপে ওই সব দেশের সরকারগুলিকে জনস্বার্থেই পরিবেশ রক্ষার আইন তৈরি করতে হয়। একই সাথে তারা নয়াঔপনিবেশিক নীতির মাধ্যমে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টিকারি কারখানা এবং বাঁধ এই দুইকেই ঠেলে দেয় তাদেরই এককালের সৃষ্ট উপনিবেশগুলিতে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে লাভের প্রধানাংশ অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানিগুলির থলিতে গেলেও, বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয়ক্ষতির সমস্ত দায়দায়িত্ব বহন করতে হয় নয়াঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলিকে। এবং ওই দেশগুলির প্রান্তিক মানুষকে।

মূলতঃ এককালের এসব ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মধ্যে ঔপনিবেশিক প্রভুদের তত্ত্বাবধানে যে সব সংস্থা ও শিল্পকারাখানা গড়ে উঠেছিল। সেই সব সংস্থা ও শিল্পকারখানার মালিকদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে পরিবেশ বিপর্যয়কারী শিল্পগুলি ইউরোপ আমেরিকা থেকে এসব দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আমাদের আলোচিত ভারত প্রধানভাবে এই প্রক্রিয়ার শিকার।

অন্যদিকে, বাস্তবতা হলো এমন ভারতের যেখানেই বক্সাইটের মজুত বা খনিজ সম্পদের মজুত আছে, সেখানেই কমবেশি ছোট বড় নদী রয়েছে। ফলে বাঁধ এবং কারখানা নির্মাণের প্রযুক্তি অত্যান্ত চড়া সুদে বিনিয়োগ করে কর্পোরেট সংস্থাগুলি অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। তার পরিসর আরো বাড়িয়ে যাচ্ছে।

সারা পৃথিবীব্যাপী যেসব কোম্পানি অ্যালুমিনিয়াম বাণিজ্যের জাল বিস্তার করে রেখেছে তার মধ্যে আমেরিকার অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি অব আমেরিকা (অ্যালকোআ), অ্যালুমিনিয়াম কম্পানি অব কানাডা (অ্যালকান) এবং ব্রিটিশ অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি অন্যতম। আমরা উপরের আলোচনায় দেখেছি, ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে হীরাকুদের বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ের উড়িষ্যার শেষ ব্রিটিশ গভর্নর এবং ’৪৭ উত্তর ভারতের জওহরলাল নেহেরু মিলিয়ে দুই দুইটি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ওই বাঁধের। হীরাকুদের বাঁধ নির্মাণের সময় বলা হয়েছিল, এতে করে মহানদীর বন্যা রোধ করা সম্ভব হবে। কমপক্ষে ৮ লাখ একর জমি সেচের আওতায় আনা যাবে। কিন্তু বাঁধ নির্মাণের পর দেখা গেল তিন লাখ একর জমি সেচের আওতায় আনা গিয়েছে। আর বাঁধ নির্মাণ করতে গিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার একর জমি চিরতরে পানির নিচে তলিয়ে যায়। ২৮৫টি গ্রামের ২ লাখ মানুষকে চিরতরের জন্য তাদের ভুমিজীবনজীবিকা থেকে উৎখাত করা হয়। বাঁধ যখন নির্মাণ করা হয়েছিল তখন এসব পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কথা ওই প্রকল্পে উল্লেখ ছিল না। একইভাবে উল্লেখ করা ছিল না, ওই বাঁধ থেকে যে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে তার প্রধানাংশ যাবে অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি অব ইন্ডিয়ার (ইনডাল) ঘরে। ইনডাল মূলতঃ ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কোম্পানি হলেও তার জন্ম হয়েছিল দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্রের চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয়তা থেকে। নেহেরুর আমলে ইনডালের ফাদার কোম্পানি ছিল অ্যালকান বা অ্যালুনিয়াম কোম্পানি অব কানাডা। যারা তৎকালীন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ একটি সংস্থা। অ্যালকানের বাজারের চাহিদার সাথে সম্পর্কিত করে ভারতের ইনডাল অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন করেছে। ভারতীয় জনগণের চাহিদা থেকে বা নিজের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা থেকে নয়। কথাটির গুরুত্ব হলো এখানে যে, অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের সাথে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ শিল্পের একটা সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যে আলোচনা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

আমাদের জেনে রাখা জরুরী যে, দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বে যত অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন হয়েছিল। তার ৯০ শতাংশ ব্যবহার হয়েছিল যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজনে। এ তথ্যের সাথে তৎকালীন আমেরিকান অ্যালোমিনিয়াম সংস্থা অ্যালকোআর নথিপত্র ঘাটলে, যুদ্ধ ওই কম্পানির জন্য কি পরিমাণ মুনাফা অর্জনের সহায়ক হয়েছিল, তা বোঝা যাবে।

দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনে নাৎসি জার্মান ছিল সবচেয়ে এগিয়ে। অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের ওপর ভর করে হিটলার এক বিশাল সামরিক বিমানবাহিনী তৈরি করে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে ব্রিটেন এবং আমেরিকাতেও বিশাল সামরিক বিমানবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। শুধু বিমানবহরই নয় রণতরিগুলো তৈরিতে অ্যালুমিনিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ধাতু হিসাবে তখন থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে।

আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, অ্যালুমিনিয়ামের সাথে অক্সিজেনের বিক্রিয়া ঘটিয়ে প্রথম গ্রেনেড উদ্ভাবন হয়। যে সফলতার পুরুস্কার হিসাবে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম মিলস নাইট উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীতে, অ্যালুমিনিয়ামের সাথে যৌগ লবণ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নাপাম বোমা। ১৯৪৫ সালে প্রথম ডেসডনে নাপাম বোমার ব্যবহার করা হয়। যার প্রতিক্রিয়াতে ২৫ হাজার অসামরিক নাগরিক মারা যান। তারপরে কোরিয়ার যুদ্ধ ও ভিয়েতনামের যুদ্ধে ব্যাপক পরিমানে নাপাম বোমা ব্যবহারের কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। নাপাম বোমার বিস্ফোরণে তীব্র তাপমাত্রা সৃষ্টি হয়। যা মানুষের দেহের চামড়া ধীরে ধীরে ঝলসে দেয়। পানিতে নেমেও দেহ ঝলসে যাওয়া রোধ করা সম্ভব হয় না।

পরবর্তী সময়ে অ্যালুমিনিয়াম নাইট্রেড ও অ্যালুমিনিয়াম পাউডারের সংমিশ্রণে আরেকটি মারাত্মক বোমা তৈরি করে পশ্চিমারা। যার নাম হলো ডেইজি কাটার। একটা ৭ টনি ডেইজি কাটার বোমার বিস্ফোরণে যে বায়ু চাপ সৃষ্টি হয়, তার চাপ প্রায় ৩ একর এলাকার প্রতিবর্গ ইঞ্চিতে ১ হাজার পাউন্ডের মত। এবং তার প্রতিক্রিয়াতে ওই এলাকার প্রতিটি মানুষ তাৎক্ষনিক মারা যাওয়াই শুধু নয় সমস্ত ঘর বাড়ি ধুলিসাৎ হয়ে যায়। এই ডেইজিকাটার বোমা ব্যবহার করে আমেরিকা ভিয়েতনামকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। আর ৯০ সালের পর থেকে আমরা আমেরিকার ইরাক এবং আফগাস্থানে দখলাভিযানে ব্যাপক মাত্রায় ওই বোমা ব্যবহার করতে দেখেছি। এখন প্রশ্ন হলো, লোহার পরবর্তী ধাতু হিসাবে যে অ্যালুমিনিয়ামের জয়জয়াকার তার কতটা মানুষের জীবনের প্রয়োজনে ব্যবহার হচ্ছে। আর কতটা গণহত্যার প্রয়োজনে ব্যবহার হচ্ছে, তার হিসাব মেলান আজকের দিনে একটা জরুরী কাজ। প্রশ্নটা এই কারণে জরুরী যে, ভারত রাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ২০২০ সালের মধ্যে তাকে সুপার পাওয়ার হয়ে ওঠতে হবে। অস্ত্র শক্তিতে চীনকে হারিয়ে দিতে হবে। আর সেটা করতে গেলে দরকার অত্যাধুনিক আণবিক ক্ষেপনাস্ত্র ও বোমারু বিমান। ফলে মাটির নিচে ‘অলস’ পড়ে থাকা অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত, ম্যাগানিজ, তামা, নিকেলের উত্তোলন ভারতের জন্য জরুরী। যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের মতো ভারতের তূলা যেমন ম্যাঞ্চেস্টার ঘুরে ফিরে আসত শিল্পজাত পণ্য হয়ে, তেমনি লক্ষকোটি বছরের সঞ্চিত আকরিক উন্নতমানের যুদ্ধাস্ত্র হয়ে ফিরে আসবে ভারতে। যা সমূদ্রপথে রওনা হওয়ার জন্য ১৮০টি ব্যক্তিগত বন্দর থাকার পরেও আরো ১০০টি বন্দর তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। যার মালিকানা সম্পূর্ণই কর্পোরেটদের। আর তার মধ্যে ১৪টি নির্মিত হতে যাচ্ছে আমাদের আলোচিত উড়িষ্যাতে। একারণে ভারতের কোস্টাল রেগুলেটরি জোনকেন্দ্রিক যে আইন ছিল, তা শিথিল করা হয়েছে। উপকূলের প্রায় ২০ কোটি মানুষের রুটিরুজি সেখানে বিপন্ন। ৬,০০০ কিলোমিটার ব্যাপ্ত উপকূল ভূমির অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল থেকে সোনালি বিকেলবেলা হারিয়ে গিয়েছে। আর আলোচিত উড়িষ্যার ক্ষুদ্রজাতিসত্তার মানুষে এখন উন্নয়ন নামক এক পরিস্থিতির শিকার। তারা প্রধানভাবে ভারতীয় সরকার, অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত উৎপাদনে নেতৃত্বদানকারী কর্পোরেট সংস্থার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।

উড়িষ্যা প্রধানভাবে খনিজসম্পদে ভরপুর অঞ্চল। তার দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে চুনাপাথর, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ, গ্রাফাইট ও কোয়ার্জাইটের মতো খনিজ সম্পদ এবং বিপুল বনসম্পদ।

উড়িষ্যার কলিঙ্গনগরে রয়েছে বক্সাইটের একটা বড় মজুত। তার নিচেই লাঞ্জিগড়ে রয়েছে বেদান্ত অ্যালুমিনিয়ামের পরিশোধনাগার। যার পরিশোধন ক্ষমতা বছরে ৩ মিলিয়ন টন। তাদের লক্ষ্য ছিল পরিশোধনগারের ক্ষমতা বাড়িয়ে প্রায় ১৬ মিলিয়ন টন করা। এটা করা সম্ভব হলে নিয়মগিরির বক্সাইট পরিশোধন করতে লাগবে ৫ বছর। এখন সুদূর ছত্তিশগড়ের কোবরা থেকে মালগাড়িতে এসে শয়ে শয়ে ট্রাক বোঝাই হয়ে চলে যাচ্ছে লাঞ্জিগড়ের রিফাইনারিতে। দুই পাশের সমস্ত গাছপালাঝোপঝাড় ঢেকে গেছে লাল বক্সাইটের ধূলোয়।

বেদান্ত রিসোর্সেস ভারতীয় নাম হলেও এই কোম্পানিটি মুলতঃ ব্রিটেনের। অস্ট্রেলিয়া ও জাম্বিয়াতে তাদের অ্যালুমিনিয়াম, সিসা, দস্তা, ও লোহার খনি রয়েছে। তাছাড়া চার্চ অব ইংল্যান্ড ও নরওয়ের পেনশন ফান্ডের ২০ মিলিয়ন ডলার বেদান্তে বিনিয়োগ করা রয়েছে। উড়িষ্যায় বেদান্তসহ কর্পোরেট কোম্পানিগুলির টাকায় পুলিশ ক্যাম্প বসানো হচ্ছে। থানার পুলিশ কোম্পানির বুলডোজার পাহারা দিচ্ছে। তারা কর্পোরেট কোম্পানির হয়ে স্থানীয় আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করছে। সরকারি প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জমির দালালি করছে। একর প্রতি পঁয়ত্রিশ হাজার টাকায় আদিবাসীদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করে, তারা সেই জমি বিক্রি করছে ৩ লাখ টাকা একর। মিডিয়ার প্রধানাংশ কর্পোরেটদের দখলে। এমন কি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অনেকে তাদের নিয়ন্ত্রণে। যেমন, যে সুপ্রিম কোর্টে বেদান্তের মামলার শুনানি চলছিল। ওই এজলাসের একজন বিচারপতির নিজেরই বেদান্ত কোম্পানির শেয়ার ছিল। এছাড়া ওই দেশের গৃহমন্ত্রী সরকারে যোগদান করার পূর্বে তারও বেদান্তের শেয়ার ছিল। তিনি মন্ত্রী হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত বেদান্ত/ স্টারলাইটের একজন ডিরেক্টর ছিলেন। শেয়ারের লগ্নি টাকা জনপ্রিয় হওয়া এবং খুব দ্রুত বড়লোক বনার ইচ্ছা থেকে ভারতের মধ্যবিত্তরা এখন কর্পোরেট জগতের নিয়ন্ত্রণে।

এই উড়িষ্যাতেই রয়েছে নীলাচল ইস্পাত, মেসকো, জিন্দাল, ভিসা, ভূষন স্টিল, মৈঠান ইস্পাত, মহারাষ্ট্রের সিমলেস, টাটাসহ আরো অনেকগুলি বিদেশি কোম্পানি। তাদের প্রয়োজনে শুধু খনিজসম্পদই নয়, বিভিন্ন প্রকল্পের নামে জমি দখলের হিড়িক পড়ে গেছে। যেমন বেদান্তপুরির কাছে একটা বিশ্বমানের ইউনিভার্সিটি বানানোর জন্য ৬ হাজার একর জমি নিয়ে রেখেছে। অথচ আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ডের জমির পরিমান মাত্র ৬শ একর। অক্সফোর্ডের আরো কম। কিন্তু যাদের একটা পাঠশালা বানানোরও অভিজ্ঞতা নাই তাদের দেয়া হয়েছে ৬ হাজার একর জমি।

উড়িষ্যার পস্কো আন্দোলনের ভবিষৎ

পস্কো দক্ষিণ কোরিয়ার ইস্পাত কোম্পনি। উড়িষ্যার পারাদ্বীপের কাছে তাদের ১২০ কোটি টন ইস্পাত নির্মাণ কারাখানার ছাড়পত্র দেয়া হয়েছিল ওই দেশের কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে। এই ইস্পাত কোম্পানি গড়ে তুলতে গেলে ১১টি গ্রামের সমস্ত মানুষকে উচ্ছেদ করতে হবে। একইভাবে সুন্দরগড় জেলার লৌহ আকরিক খনি তৈরির সাথে উচ্ছেদ হবে আরো কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠির মানুষ। বিষয়টি নিয়ে ২০১২ সালের ৩০ শে মার্চ আদালতে একটি মামলা হয়। যা প্রফুল্ল বনাম কেন্দ্রীয় সরকারের মামলা নামে খ্যাত। বিচারক কেন্দ্রের ছাড়পত্রের উপর স্থগিতাদেশ জারি করে নতুন কমিটি গঠন করে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ ও বন দপ্তর দ্বারা গঠিত মীনা গুপ্তা কমিটি ওই প্রকল্পকে ভারতের পরিবেশ আইন, বন সংরক্ষণ আইন, উপকুল আইন ও তাদের চলতি আইন বিরোধী মত জানিয়ে প্রকল্পকে বেআইনি বলে ঘোষনা করে। আর এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং উড়িষ্যা রাজ্য সরকার গোটা প্রকল্পটিকে কয়েকভাগে বিভক্ত করে আলাদা আলাদা ছাড়পত্র দিয়ে চলেছে। যাতে করে তাদের আকরিক উত্তোলন, বন্দর স্থাপন, টাউনশিপ গঠন, পানীয়জলের বাণিজ্যের মধ্যে যেন কোনো যোগসুত্র ধরা না পড়ে। এর পর ২০১৪ সালের মার্চে খোদ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয় থেকে প্রকল্পটির ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।

মূলতঃ পস্কো প্রকল্পের সাথে কেবল কয়েকটি গ্রাম উচ্ছেদের প্রশ্নই জড়িত নয়, এটা ভারতের ওপর বহুজাতিক কোম্পানির এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় হস্তক্ষেপ। যা ভারতের সার্বভৌমত্ব, পরিবেশ, কৃষি, মৎসজীবী এবং আদিবাসীদের ওপর সরাসরি আঘাত হানবে। পারাদ্বীপে প্রাইভেট পোর্ট গড়ে তোলার অনুমোদন সরকারি বন্দরের গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। জটাধারী মোহনায় হাজার হাজার মৎসজীবীদের জীবিকা অর্জনের পথ থেকে তাদের উচ্ছেদ করবে। দৈনিক কয়েক কোটি লিটার পানীয় জল মহানদী থেকে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে সেখানকার পাঁচটি জেলার কৃষিকাজের সেচব্যবস্থার সমস্ত পানি টেনে নিবে। জগৎসিংপুরের ৩০ হাজার মানুষকে তাদের জীবনজীবিকা থেকে উচ্ছেদ করবে।

২০১১ সালে মনমোহন সরকার শর্তসাপেক্ষে এই প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল। তারপর থেকে জগৎসিংপুরে পুলিশী সন্ত্রাসের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের কাজ চলতে থাকে। পাশাপাশি চলে জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলন। ঠিক নিলগিরিতে বেদান্ত প্রকল্পের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধের মতো। এই পস্কো প্রকল্পে অনুমোদনে নরেন্দ্র মোদিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমরা গত পর্বে একটা হিসাব দেখেছি, যেখানে ইস্পাত উৎপাদনে কি পরিমাণ পানি ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ফলে আলোচিত এই প্রেক্ষিত থেকে আমাদের বিবেচনায় নেয়া দরকার ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প সম্পর্কের বিষয়াবলী। মডেল উড়িষ্যা নিয়ে আর দুটি বিশেষ তথ্য দিয়ে আমরা অন্য আলাপচারিতায় ঢুকব।

আমরা প্রত্যকেই সারা বিশ্বের আদিবাসীদের নিয়ে খোদ জাতিসংঘের মায়াকান্নার ইতিহাস জানি। আর আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য তাদের অনেক পদের ফান্ডের খবরাখবর রাখি ও জানি। উড়িষ্যাতে আদিবাসীদের মধ্যে আদিবাসীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটা সাহায্য সংস্থা ‘অগ্রগামী’ কাজ করতো। তাদেরকে সরাসরি ফান্ড করতো জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট বা আইএফএডি। এই ফান্ডের মধ্যে কৃষির কথা থাকলেও তারা উড়িষ্যাতে রাস্তাঘাট করার কাজটিতে প্রধানভাবে গুরুত্ব দেয়। আর তাদের রাস্তা বানানো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হতে না হতেই কিন্তু আদিবাসীদের জমি থেকে উচ্ছেদ এবং জমি বিক্রির পথ পরিস্কার হয়। এবং তার লেজে লেজেই পৃথিবীখ্যাত সব কর্পোরেট সংস্থাগুলি শত শত একর জমি কিনে ফেলে। উড়িষ্যার আদিবাসীরা যখন কর্পোরেট সংস্থার সাথে জাতিসংঘের উন্নয়ন নামক ফান্ডের সংযোগ সম্পর্ক বুঝতে পারে, তখন প্রতিরোধে নামেন তারা। কিন্তু পুরো পরিস্তিতি তার আগেই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে আদিবাসীদের রক্ত ঘামে উড়িষ্যা গড়ে উঠেছে। যারা বনকে আবাদী জমিতে রূপান্তরিত করেছে। যারা ঘাম ঝরিয়ে বুনো পাথুরে জমি বশে এনেছে তারা সবাই ছিল প্রাকঔপনিবেশিক আমলে রাজার নিষ্কর প্রজা। একারণে তাদের কোনো দখলিপাট্টা ছিল না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৯১৭১৮ সালে তারা কিছু জমিতে সেটেলমেন্ট করে। আর যারা বংশপরম্পরা জমি চাষ করে আসছিল। প্রকৃতিক সম্পদ কৌম প্রথায় ভাগ করে নিয়ে সম্পদ ভোগ করত। তাদের এই প্রথা ঔপনিবেশিক শাসকরা মেনে নেয়। ’৪৭ উত্তর ভারতে ক্ষমতাসীন প্রতিটি সরকার জমি সেটেলমেন্টের কথা বললেও তা করেনি। অর্থাৎ, ১৯১৭১৮ সালের পরে আর কখন আদিবাসী অঞ্চলে সেটেলমেন্ট হয় নি। জমির পাট্টা দেয়ার অঙ্গীকার করে কোনো সরকার তা বাস্তবায়ন করে নি। উড়িষ্যাতে চলমান যে উন্নয়ন এবং জাতিসংঘের রাস্তা বানানো প্রকল্প। সেই প্রকল্পের সুত্র ধরে প্রথমেই পাট্টাহীন আদিবাসীরা অবৈধ দখলদার হিসাবে চিহ্নিত হন। আর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বুলেটের আঘাতে জমি থেকে উচ্ছেদ হন।

আর শেষ বিষয়টি হলো উড়িষ্যার মধ্যবিত্তের ইতিহাস মূলতঃ দুইভাগে বিভক্ত। ঔপনিবেশিক পর্বে উড়িষ্যার মধ্যবিত্তরা একটি দেশপ্রেমের জায়গা থেকে জ্ঞানচর্চাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অপরাপর জাতিগোষ্ঠির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। ’৪৭ উত্তর ভারতে মধ্যবিত্তদের দৃষ্টিভঙ্গি একদম বদলে যায়। জ্ঞানের বদলে মেটারিয়াল লাইফ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের কাছে বড় মাপের আমলা হওয়ার বাসনা প্রধান হয়ে ওঠে। আর বর্তমান ভারতে প্রতি বছর যে আইএএসএর তালিকা, সেখানে উড়িষ্যা সবচেয়ে উপরে। বিদেশী ডিগ্রি ক্রয়েও তারা পিছিয়ে নেই। একটা বিদেশী ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারা অথবা কর্পোরেট সংস্থায় ভাল পদের একটা চাকরি উড়িষ্যার মধ্যবিত্তের মধ্যে নতুন সামাজিক মর্যাদা দান করছে। আর এই নব্যমধ্যবিত্তরাই কর্পোরেটদের প্রধান সমর্থক হয়ে উঠেছে। নতুন এই গড়ে ওঠা মধ্যবিত্তের মধ্যে খোদ আদিবাসীদের একটা অংশও কিন্তু রয়েছে। এই আলোচনায় উড়িষ্যাকে মডেল ধরার অন্যতম কারণ হলো গোটা ভারতে যে আদিবাসী সম্প্রদায় রয়েছে, তার প্রায় ২৩ শতাংশ বসবাস করেন উড়িষ্যাতে। এবং ভারত সরকার তাদেরকেই ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে কর্পোরেট দুনিয়ার সস্তা দিনমজুরে পরিণত করতে তৎপর এবং আদিবাসী নারীদেরকে স্বল্পমূল্যের বেশ্যা বানানোর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু করেছে। আর এই বিষয়টি খোদ আদিবাসী সমাজের মধ্য যে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া, সেটা ইচ্ছাকৃভাবেই অনুল্লেখিত রাখতে হলো।

ভারতের কেন্দ্র রাজ্য সরকারের ব্যবসায়িক বিদ্যুৎ নীতি

ভারতের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিদ্যুতের মুল্য এবং প্রধান গ্রাহক নির্বাচনের জন্য ২০১২ সালের ১৭ই জুলাই দিল্লিতে যোজনা কমিশনের পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারগুলির একটা সভা ডাকা হয়েছিল। সভার উদ্যক্তা ছিলেন জাতীয় যোজনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান মন্টক সিং আলুওয়ালিয়া।

সভায় তিনি রাজ্য সরকারগুলিকে যে নির্দেশ দেন তাহলো দেশের বিদ্যুৎ মাশুল আন্তর্জাতিক বাজারের সমান করতে হবে। বিদ্যুতের ব্যাপক মাশুল বৃদ্ধি ঘটলেও বৃহৎ শিল্প, কারখানা, বিগবাজার, মল ইত্যাদির ক্ষেত্রে মাশুল কমাতে হবে। রাজ্য সরকারগুলিকে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে হবে।

মূলতঃ ’৪৭ উত্তর ভারতের অর্থনীতিকে পুনর্গঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯১০ সালের ব্রিটিশ প্রবর্তিত বিদ্যুৎ আইন সংশোধিত করে ১৯৪৮ সালে একটা আইন এবং ১৯৫৬ সালে আরেকটি স্পালাই কোড তৈরি করা হয়েছিল। যে আইনে বিদ্যুৎকে পণ্য নয়, বরং উন্নয়নের মাধ্যম হিসাবে দেখা হতো। ঠিক এই অন্যতম কারণে বিদ্যুৎ খাত ছিল সরকারের অধীন। আর সরকার এই খাতে ভর্তুকি দিয়ে কমমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। ১৯৯১ সালে মনমোহনের নেতৃত্বে যখন নয়াউদারনৈতিক অর্থনীতির নামে ভারতকে কর্পোরেট সংস্থাগুলির কাছে কাছা খুলে উদাম করে দেয়া হয়, তখন তার সাথে সম্পর্কিতভাবে বিদ্যুৎ আইন ২০০৫ তৈরি ও চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে ভারত সরকার। যে আইনে বিদ্যুৎকে এখন আর উন্নয়নের মাধ্যম হিসাবে দেখা হচ্ছে না। দেখা হচ্ছে খোলা বাজারের পণ্য হিসাবে। এবং খোলা বাজারের নিয়ম অনুযায়ী ভারতের বিদ্যুৎ খাত তুলে দেয়া হবে সাম্রাজ্যবাদের পুঁজির কাছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বন্টন নিয়ন্ত্রণ হবে কর্পোরেটদের মাধ্যমে। আর যেখানে সরকারি ব্যাবস্থাপনা থাকবে, সেখানে প্রধান গ্রহক হিসাবে বৃহৎ শিল্প, কারখানা, বিগবাজার, মল ইত্যাদি ক্ষেত্রে মাশুল কমাতে হবে। অর্থাৎ, যে সব ক্ষেত্রগুলি ইতোমধ্যেই কর্পোরেটরা দখল করেছে। আর বিপরীতে ক্ষুদ্র কুঠির শিল্প, গার্হস্থ্য শিল্প এবং পরিবারে যে বিদ্যুৎ ব্যয় হয়, তার যে মূল্য কর্পোরেট সংস্থাগুলি নির্ধারন করে দিবে, সেটাই পরিশোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার যে সাবসিডি ইতিমধ্য দিয়ে এসেছে তা আর দেয়া হবে না। একই সাথে বাজারের নিয়মানুযায়ী রাজ্য সরকারেরও দেয়া চলবে না। আমাদের মনে রাখা দরকার বর্তমান যুগে পেট্রলডিজেল নির্ভর হলে ওই এনার্জি দখলে যে যুদ্ধ চলছে এবং দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে ভারত সরকারের দৃষ্টি সম্পূর্ণতই অন্যদিকে। সেটা হলো জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে। যে উদ্যেশকে সামনে রেখে তারা আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের অধীনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর ওই বিদ্যুতের মূল গ্রাহক কারা তা উপরের তথ্যচিত্রে স্পষ্ট।

বহুজাতিক কোম্পানির যাঁতাকলে ভারতের পানি ও কৃষি সম্পদ

ভারত সরকার ইতোমধ্যে গোটা ভারত জুড়ে যে সব বড় বড় বাঁধ ও ড্যাম নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। সেখানে ভারত সরকারের প্রচারিত তথ্যের মধ্যে কৃষির উন্নয়ন একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সরকারের দাবী আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তারা ১৭০ কোটি মানুষের খাদ্য সুনিশ্চিত করতে চায়। আর ভারত সরকার তাদের এই পরিকল্পনাকে আবার দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। যেখানে পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসাবে বিবেচিত হবে। ফলে খুব সংক্ষেপে আমরা পানির সাথে জীবনের সম্পর্ক এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে পানির যে ভূমিকা, সে সম্পর্কিত কিছু তথ্যের উপর নজর বুলিয়ে নিতে পারি।

সাধারণভাবে আমরা যে তথ্যটি জানি, তাহলো পৃথিবীতে এযাবৎ আবিস্কৃত প্রায় ১০ লাখ প্রাণী ও সাড়ে তিন লাখ উদ্ভিদের অস্তিত্ব রক্ষার সাথে বা তাদের জীবন চক্রের সাথে পানির একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পানি প্রতিটি জীবের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাছাড়া আমরা প্রতিদিনই যে ভাত,মাছ,সব্জি ইত্যাদি যা খাবার খাই তার প্রত্যকটির মধ্যে পানি রয়েছে। যেমন সব্জির মধ্যে পানির উপাদান হলো ৭০ ভাগ, ডিমের মধ্যে ৭৩ ভাগ, চালগম প্রভৃতি শস্যের মধ্যে ৪৭ ভাগ, দুধের মধ্যে ৮৮ ভাগ। আর মানুষের শরীরের ৭০ শতাংশই হলো পানি। এর পরে আমাদের প্রতিদিনের রান্না, কাপড় কাচা, থালাবাটি ধোয়া, গোসল করা, রাস্তাঘাট পরিস্কার করাসহ হাসপাতাল, সেবাকেন্দ্র এবং আধুনিক শিল্পকারখানা ইত্যাদি সবকিছুই আসলে পানির ওপরে নির্ভরশীল। ফলে গড় হিসাবে একজন মানুষের প্রতিদিন নিরাপদ পানির প্রয়োজন হয় ১৩৬.৩৮ লিটার। হাসপাতালের জন্য মাথাপিছু প্রয়োজন ২২৭.৩০ লিটার এবং সেবাকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজন মাথাপিছু ১৮১.৮৩ লিটার পানি। এছাড়া আমাদের শরীরের মধ্যে টিস্যু থেকে যতটা ফ্লুয়িড নষ্ট হয়, তা পুরন হয় পানির মাধ্যমে। পানিই মানব শরীরের রক্ত লসিকার তরলতা অব্যাহত রাখে। শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের হতে সাহায্য করে। দ্রবীভূত খাদ্যকে বহন করে। হজমি রস ক্ষরনে অন্যতম ভূমিকা রাখে। দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনের কাজ করে। দেহতাপ বিভাজনের কাজ করে। মানুষের মত সকল প্রাণি যগতের ক্ষেত্রে পানি এই একই ভুমিকা রয়েছে।

আবার যে খাবার খেয়ে আমরা জীবন ধার করি, সেই ফসল ফলাতেও প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। যেমন বর্তমানে ২৫০ গ্রাম আলু ফলাতে পানির প্রয়োজন হয় ২০০০ গ্যালন। একটা ভুট্টাগাছ জন্মান ও তার থেকে ফসল পেতে পানির প্রয়োজন হয় ৫০ গ্যালন। এক কেজি মাংস উৎপাদনে লাগে ১,৬০০ গ্যালন পানি। এক কেজি চাল উৎপাদনে লাগে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ গ্যালন পানি। এবং একটন গম ফলাতে লাগে ৪৪,০০০ হাজার গ্যালন পানি।

ঠিক একইভাবে শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে এক টন সিমেন্ট উৎপাদনে লাগে ৪ টন পানি। এক টন স্টিল উৎপাদনে লাগে ১৮ টন পানি। এক টন কাগজ উৎপাদনে লাগে ২ থেকে ১০ লাখ লিটার পানি। এক টন জ্বালানির জন্য প্রয়োজন হয় ২০,০০০ লিটার পানি। প্রতিটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে এক টন দহন প্রক্রিয়াতে লাগে ৬০০ টন পানি। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এক টন কয়লার জন্য লাগে ৩,০০,০০০ লিটার পানি। এক টন অপরিশুদ্ধ পেট্রোলিয়ামের জন্য লাগে ৩০,০০০ লিটার পানি। রসায়ন শিল্পের বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদনে টন প্রতি লাগে ৫০,০০০ থেকে ৪০,০০,০০০ লিটার পানি। বয়ন শিল্পে টন প্রতি লাগে ৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ লিটার পানি। খনিজ শিল্পের এক টন আকরিক উত্তোলন করতে লাগে ৩,০০০ লিটার পানি। ৪০,০০০ টন ব্লাস্ট ফার্নেসের জন্য লাগে ৬০,০০০ লিটার পানি। এক টন বিস্ফোরক উৎপাদদনে লাগে ৮,০০,০০০ লিটার পানি। এভাবে আমরা যদি বর্তমানে উৎপাদিত প্রতিটি ভোগ্যপণ্য, বিলাস জাতীয় পণ্যসহ শিল্পজাত উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যের হিসাব ধরি, তাহলে আমরা দেখব পানি একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে বর্তমানে বিবেচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বে শুধুমাত্র মানুষের প্রয়োজনে যে পানির ব্যবহার হচ্ছে, তার পরিমাণ হলো ৩ হাজার ঘন কিলোমিটার। আর বিশ্বের সমস্ত নদনদী মিলিয়ে গড়ে ৪০ হাজার ঘন কিলোমিটার পানি প্রতিবছর প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে যায়। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ও কর্পোরেটেদের লক্ষ্য হলো পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক চক্র ভেঙে ফেলে দিয়ে ৪০ হাজার ঘন কিলোমিটার পানিকে বাণিজ্যের অধীনে নিয়ে আসা। আর এটা করা সম্ভব হলে প্রতি বছর এই একটি খাত থেকেই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার মুনাফা করা সম্ভব। যার বৃহত্তর পরিক্ষা ক্ষেত্র ভারতেই গড়ে উঠতে যাচ্ছে।

পাশাপাশি বর্তমানে যে প্রাকৃতিক সম্পদের তীব্র সংকট চলছে তার মধ্যে পানি সম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে বিশ্বের ৮০টি দেশে এই সংকট খুব প্রবল। যার মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের ১৪ টি এবং মধ্য প্রাচ্যের ১১টি দেশ রয়েছে। আলোচিত ভারতের কিছু প্রদেশও এই অবস্থার বাইরে নয়। অর্থাৎ গত শতাব্দীর ’৯০ দশকের মাঝামাঝি থেকে বিশ্বের মোট ৪০ শতাংশ মানুষ পানি সংকটের মধ্যে রয়েছে। আগামমী ২০২০ সালের মধ্যে বর্তমানের চাহিদার চেয়েও আরো ৪০ শতাংশ বেশি পানির প্রয়োজন হবে। কৃষির জন্য প্রয়োজন হবে আরো ১৭ শতাংশ বেশি পানির। আর ২০২৫ সালের মধ্যে পৃথিবীর নানা দেশের আরো তিনচতুর্থাংশ জনগণ চরম পানি সংকটে পড়বে। এসব তথ্যগুলি আমরা এমন সময় পাচ্ছি, যখন বিশ্বের ১২০ কোটি মানুষ এখনও নিরাপদ খাবার পানি থেকে বঞ্চিত। নিরাপদ পানির অভাবে প্রতি বছর ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটছে।

বর্তমান এবং আগামী দিনের এই পানি সংকট অতিক্রম করতে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে জাতীয় স্তরে যেমন অনেক সভাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক স্তরেও সভাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। একইভাবে আজকের দিনে পানি সংকটকে কেন্দ্র করে কর্পোরেট সংস্থাগুলির তৎপরতা ভয়ঙ্করভাবে বেড়ে গিয়েছে।

মূলতঃ ’৮০ দশক থেকে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনায় যে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের নামে যে সংস্কার শুরু হয়। সেখানে পানিকে একটা অর্থনৈতিক পণ্য হিসাবে সুপারিশ করা হয়েছিল। এবং ’৯০ এর দশক থেকে দেশিবিদেশী নানা সংস্থার হাতে মানুষ ও জীবজগতের জীবনদায়ী এই পানি সম্পদকে বাণিজ্যিকভাবে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেয়া শুরু হয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা সম্মেলনের মিনিস্টিরিয়াল বৈঠকে প্রতিযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্যসুবিধা ইত্যাদি প্রশ্নে যে সব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সেদিন, সেখানে আর্টিকেল ৩১ () ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ, গ্যাটস বা জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড ইন সার্ভিসেসএ যে বেসরকারিকরণের কথা বলা হয়েছে, সেখানে পানিকে পরিষেবা খাতে ফেলা হয়। আর যার মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের ‘মুক্ত বাণিজ্য’ করা যাবে, বলে সম্মেলনে উপস্থিত এক্সিকিউটিভরা স্বাক্ষর করে। এর ফলে পৃথিবীর আরো অনেক দেশের মতো ভারতেও তাদের আইনসভা বা পার্লামেন্টের সমর্থন ছাড়াই ওই নিয়ম বলবৎ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বালকো কেস নামে একটা মামলা হয়েছিল। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দেয়, সেখানে বলা হয়েছে অর্থনৈতিক নীতি বা বেসরকারিকরণ বা উদারীকরণের সাথে সম্পর্কিত বা তার সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে ভারতীয় কোনো কোর্ট হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। অর্থাৎ, পানিঅরণ্য বা প্রাকৃতিক সম্পদ হিসাবে জমি এই সবকিছুই এখন ‘মুক্ত বাণিজ্যের’ অধীন। যা দেশিবিদেশি, যে কোনো কর্পোরেট সংস্থা ক্রয় করতে পারবে। তাদের সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। আর এক্ষেত্রে পানি বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী পানি এখন উন্মুক্ত পণ্যে পরিণত হওয়াতে এই একটি খাত থেকে কর্পোরেট সংস্থাগুলি পানি বিক্রির ব্যবস্যা করে বছরে ১ ট্রিলিয়ান ডলারের অধিক মুনাফা কামায় করবে।

গ্যাটসএর ওই মিটিং এর পরে পৃথিবীর নানা দেশে পানির বেসরকারি খাতে বাণিজ্য শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট সংস্থাগুলি তাদের থাবা বিস্তার করেছে। এসব কোম্পানির মধ্যে সুজেজ, ভিভেনডি, আগুয়াল দ্যা বার্সেলোনা, টমস ওয়াটার, স্যার, বেশটেল, এনরন, মনসান্টো রয়েছে।

পানির এই বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ রয়েছে। যার মধ্যে পৌরসভা বা মহানগরগুলিতে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যে সরবরাহ ব্যবস্থা এতোদিন ধরে গড়ে উঠেছিল। তা এখন কর্পোরেটদের দখলে চলে যাচ্ছে। এর ফলে এইসব সংস্থায় যারা এককালে কর্মরত ছিলেন, তাদেরকে অযোগ্যতার দোহায় দিয়ে ছাঁটাই করা হচ্ছে। তাছাড়া পূর্বে জনজীবনের সাথে সম্পর্কিত এই খাতে যে ভর্তুকির ব্যবস্থা ছিল, সেটা ক্রমশ উঠে যাচ্ছে। নতুন করে কাঠামো বিন্যাসের ফলশ্রুতিতে ধনী, মধ্যবিত্ত, গরীব প্রত্যককেই এক হারে পানির মুল্য পরিশেধ করতে হচ্ছে ও হবে। পানির সেই মুল্য নির্ধারণ করবে কর্পোরেট সংস্থাগুলি। সারা বিশ্বব্যাপী পানি বাণিজ্যিকীকরণের এই যে প্রক্রিয়া, ভারত তার বাইরে নয়। ভারতের প্রতিটি শহর, নগর ও মহানগরের পানি ব্যবস্থাপনা ক্রমশ কর্পোরেটদের দখলে চলে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে ভারতের দিল্লী, কর্ণাটক, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, উত্তর প্রদেশ, বিহার ইত্যাদি রাজ্যগুলির পানি পরিশোধন করা ও সরবরাহ করার দায়িত্ব আজ কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে। ফরাসি কোম্পানি সুয়েজ ও ভিভেনডি, মার্কিন কোম্পানি বেকটল, ব্রিটিশ টেমস ওয়াটার এবং অ্যাঙলিয়ান ওয়াটার সার্ভিসেসএর মতো কম্পানিগুলি ভারতের আলোচিত নগরগুলিতে পানি ব্যবসার সুত্র ধরে প্রবেশ করেছে। ভবিষ্যতে ভারতের প্রতিটি রাজ্যনগরমহানগরশহরসহ গ্রাম পর্যন্ত তাদের এই বাণিজ্যের পরিধি ক্রমাগতভাবে বেড়ে যাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ভারতের নানা খাতে যে ঋণ দিচ্ছে, সেখানে পানির বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে, ঋণ প্রদানের প্রধান শর্ত হিসাবে রেখেছে। একইভাবে ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স কর্পোরেশন কর্তৃক বন্টিত তহবিল বিতরণের ক্ষেত্রে পানিকে বানিজ্যিকীকরণের জন্য ১২টি শর্ত রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি শুধু নগরই নয়, ভারতের নদনদী ও সেচ ব্যবস্থা আজ কর্পোরেটদের দখলিভুক্ত হতে চলেছে। যেমন তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার জনগণের সমস্ত স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ওই রাজ্যের ভবানি নদীকে মার্কিন বেকটেল, লার্সেন টুর্বো’র মত কর্পোরেটের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।

১৯৯৮ সালে ছত্তিশগড়ের দুর্গ শহরের কোল ঘেষে বয়ে চলা শেওনাথ নদীর ২৩ কিলোমিটার স্থানীয় ব্যবসায়ী কৈলাস সোনির কাছে বিক্রি করে দেয় ছত্তিশগড় রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন নিয়ে। যে শেওনাথ নদী কয়েক শতাব্দী ধরে তার দুই পাড়ের মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের উৎস হিসাবে কাজ করেছে। গ্রামবাসীরা নদীর পানিতেই গোসলসহ যাবতীয় গৃস্থলির কাজ সেরেছেন। তাদের পালিত জীবের প্রয়োজনীয় পানির উৎস ছিল এই নদী। এর বাইরে কয়েক শতাব্দী ধরে দুই পাড়ের মানুষ এই নদীর পানির উপরে ভর করে তাদের কৃষি ও সেচের কাজটি করেছেন। মানুষের মাছের উৎস হিসাবে দুই পাড়ের মানুষদের কাছে এই নদী একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে। ১৯৯৮ সালের পরে যে ব্যবসায়ী এই নদী ক্রয় করেছে, তার পাড়ে মোহলাই গ্রামে তিন কিলোমিটার লম্বা একটা জলাধার নির্মাণ করেছে। সেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। যেখান থেকে দুই দশকে তার আয় হবে ৬০০ কোটি টাকা। এভাবে নদী লিজ দেয়ার ফলে ওই নদীর পানির উপর ভিত্তি করে এককালে যে চাষবাস হয়েছে, সেটা যে শুধু বন্ধ হয়ে গেছে তাই নয়, নদী লাগোয়া ১ কিলোমিটারের মধ্যে নলকুপ বসান নিষিদ্ধ আজ। নদীতে মাছ ধরা, গোসল করা, কাপড় কাচা, সব কিছুই নিষিদ্ধ এখন। ফলে বহুদিন গোসল করতে না পারার কারণে অসংখ্য মানুষ এখন চর্মরোগের শিকারই শুধু নয় তাদের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে।

এবার আসা যেতে পারে দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লবের সেচব্যবস্থা সম্পর্কে

আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, ভারত সরকার তাদের কৃষিক্ষেত্র দেশিবিদেশি কর্পোরেটদের কাছে উন্মুক্ত করে দিয়েছে, কথিত মুক্তবাণিজ্যের দোহায় দিয়ে। এতে করে বর্তমান ভারতের কৃষিব্যবস্থা আর ভারতের জনগণের খাদ্য সংস্থানের বা খাদ্য নিরাপত্তার জায়গা থেকে বিবেচিত হচ্ছে না। আর এই পথ অবলম্বন করতে গিয়ে কৃষি উৎপাদনের সমস্ত উপকরণ থেকে ভর্তুকি তুলে নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে সার, বীজ, সেচ অন্যতম। ফলে বর্তমানে কৃষির উৎপাদন পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

আবার কৃষি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সমস্ত বাধা নিষেধ তুলে নেয়া হয়েছে। যার ফলাফল হলো ভারতের কৃষিপণ্যকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ভর্তুকি প্রাপ্ত রপ্তানিমুখী কৃষির সাথে। ফলে ভারতের একজন উৎপাদক কৃষক ভয়াবহ রকমের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে তারা উৎপাদিত মূল্যের চেয়ে অনেক অল্প মূল্যে কর্পোরেট সংস্থার কাছেই তাদের ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে।

একইভাবে ভারত সরকার কৃষির আধুনিকায়নের নামে যে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চলেছে, সেখানে সেচ প্রক্রিয়াটি তুলে দেয়া হচ্ছে কর্পোরেট সংস্থার হাতে। যার পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ প্রথম নেয়া হয়েছে উড়িষ্যাতেই। সেখানে সেচযোগ্য পানির মুল্য বেড়ে গিয়েছে পূর্বের চেয়ে তিনগুণ। ফলে ছোট ও মাঝারি কৃষকের পক্ষে আজ আর কোনোভাবেই কৃষিকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা কৃষি শ্রমিকে পরিণত হয়েছে।

তাছাড়া দ্বিতীয় ‘সবুজ বিপ্লব’ নামে ভারত যে তকমা তুলে ধরেছে, তার সাথে নিন্মবর্গের জনগণের কোনো সম্পর্ক নাই। কারণ ভারত এমনই একটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রের অর্ধেক মানুষ অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। অথচ ওই ভারত রাষ্ট্রে, ২০০০০১ সালে তার সরকার গুদামে ৪ কোটি ৫৫ লাখ টন সরকারি টাকায় কেনা খাদ্য ৫ টাকা ৬৫ পয়সা কেজি দরে কারগিল এক্সপোর্ট কর্পোরেশনের মতো বহুজাতিক কোম্পানির কাছে রপ্তানির জন্য বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। অথচ ওই চাল দিয়ে ভারতের ৬০ কোটি গরীব মানুষকে ৬ মাস দুই বেলা পেটপুরে ভাত খাওয়ানো যেত। সাধারণ মানুষ তখন খোলা বাজার থেকে সর্বনিন্ম দর হিসাবে ১১ টাকা ৩০ পয়সা প্রতি কিলো চাল কিনতে বাধ্য হয়েছে। আর এখানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো ভারতের যে সরকারি খাদ্যগুদাম, সেখানে সর্বোচ্চ ২.৫ টন খাদ্য মজুদ করা যায়। সেখানে ওই রাষ্ট্রের জনগণের টাকায় অতিরিক্ত চাল কিনে তাতে ভুর্তুকি দিয়েই সরকার কারগিলের হাতে তুলে দিয়েছিল। এটাই ভারত সরকারের বর্তমান খাদ্য নীতি।

এরপর ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে, ভারতের সমস্ত রাজ্যের কৃষি বিপনন মন্ত্রীদের এক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে তৎকালীন ভারতের কৃষি মন্ত্রী, রাজ্যের মন্ত্রীদের একটা প্রাথমিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশটা হলো সমস্ত রাজ্য সরকারগুলিকে দেশিবিদেশি কর্পোরেট সংস্থার কাছে কৃষি জমি লিজ দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব আইন বাধা হয়ে আছে, তা বাতিল করতে হবে। ভারত সরকার তাদের এই নতুন পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে যে বিষয়ের ওপর সবচেয়ে গুরুত্ব দেয় সেটা হলো কয়েকজন কৃষক মিলে তাদের জমি এক সঙ্গে লিজ দিবেন কোনো কর্পোরেট কোম্পানিকে। চলতি বাজার অনুযায়ী লিজের মূল্য ঠিক হবে। এরপর ওই কোম্পানি সেই কৃষকদেরকে জমি চাষের দায়িত্ব দেবে। উৎপাদিত ফসল যাবে কোম্পানির ঘরে। এতে করে একদিকে যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। অপরদিকে, কর্মসংস্থানের সুযোগসহ নতুন কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ সম্ভব হবে। অব্যবহৃত জমিও চাষের আওতায় আসবে। মূলতঃ এই ব্যবস্থাটি আর কিছুই নয়, গোটা কৃষি ব্যবস্থাপনাকে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেয়ার একটা পদ্ধতি। অর্থাৎ, কৃষি উৎপাদন, কোন জমিতে কোন ফসল চাষ হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উৎপাদিত পণ্যের কতটা রপ্তানি হবে, কতটা ওই দেশের জনগণের খাদ্যসংস্থানের জন্য ব্যবহৃত হবে, তার সমস্ত পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে কর্পোরেট সংস্থাগুলি। অর্থাৎ, একদিকে কৃষির আমদানিনীতি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাজারি মূল্য প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে ভারতের কৃষক। তারপরও এতো কাল ধরে তাদের যে টুকরো টুকরো জমিগুলি এযাবৎ তাদের জীবনজীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবহার হয়ে আসছিল, তা এখন তারা নতুন নতুন আইনের ফলশ্রুতিতে কর্পোরেট সংস্থার কাছে লিজ দিতে বাধ্য হবে। আর এক পর্যায়ে তারা বহুজাতিক কোম্পানির দক্ষ কৃষি শ্রমিকে পরিণত হবেন।

পাশাপাশি ভারত সরকারঘোষিত দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের ঘোষিত পরিকল্পনায় গোটা ভারত জুড়ে জিন পরিবর্তিত শস্য চাষের তোড়জোর শুরু করা হয়েছে ২০১২ সাল থেকে। ওই বছর ভারতের বায়োটেকনোলজিক্যাল অথরিটি অব ইন্ডিয়া সংক্ষেপে BRAIনামে একটা সংস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই সংস্থার যে আইন, তার ৬২ ধারায় বলা হয়েছে ‘যদি উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া জিন প্রযুক্তির বিরোধিতা কেউ করে, তাহলে তার তিন মসের জেল এবং পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে’।

এই আইনে উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয় নি। কারা সেই বৈজ্ঞানিক প্রমাণের উপযুক্ততা নির্ধারণ করবে, সেটা স্পষ্ট করা হয় নি। কিসের ভিত্তিতে শাস্তি দেয়া হবে, তাও জানাতে ওই সংস্থা বাধ্য নয়। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, এই সংস্থাটি হবে আমলানির্ভর। অর্থাৎ, কর্পোরেট জগতের সাহায্যপুষ্ট আমলাদের মাধ্যমে বায়োটেকনোলজিক্যাল অথরিটি অব ইন্ডিয়া, এই আইনি প্রক্রিয়ার বলে যে দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের নামে জৈব কৃষির সূচনা করতে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যে কোনো প্রতিবাদীকণ্ঠ রোধ করার জন্য এই আইন গড়ে নেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাজার পদের দুর্নীতির প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকারের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই ভারত সরকার জৈব কৃষির প্রচলন করতে যাচ্ছে। তার খারাপ কোনো প্রক্রিয়া প্রতিরোধের বিধান ওই আইনে নাই। এর পূর্বে ভারতে জিন পরিবর্তিত (জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বা জিএম) শস্য চাষের অনুমতি দেওয়ার অধিকার ছিল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাপ্রুভাল কমিটি বা GEACএর। এই সংস্থাটি কোনো জিন পরিবর্তিত ফসলকে ছাড়পত্র দিলেও যে কোনো রাজ্য সরকার নিজ রাজ্যে সেই ফসল চাষ নিষিদ্ধ করতে পারতো। GEACএর পরিবর্তে BRAI সংস্থাটি হবে সম্পূর্ণ আমলানির্ভর। আর BRAIযদি কোনো জিনপরিবর্তিত ফসল চাষের অনুমতি দেয়, তাহলে যে কোনো কর্পোরেট সংস্থা তাদের লিজ নেয়া বা ক্রয়কৃত জমিতে এবং যে কোনো রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়াই চাষ করতে পারবে। এছাড়াও এই সংস্থা তার জিনপ্রযুক্তি সম্পর্কিত যে কোনো তথ্য গোপন রাখতে পারবে, আইনেই সে কথা বলা আছে। কারণ জিন প্রযুক্তিতে অগ্রসর কর্পোরেট সংস্থাগুলি বিশেষত মনসান্টো, সিনজেন্টা, কার্গিলের মতো দানবগুলি ভারতের বাজারে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। মূলতঃ তাদের স্বার্থ থেকেই ভারত সরকার এই সংস্থা গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও ইতোপূর্বে গোটা ভারত জুড়ে বিটিশস্য নিয়ে একটা বিতর্ক ছিল। বিটি হলো ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিসএর সংক্ষিপ্ত নাম। ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস নামক এক ব্যাকটেরিয়ার বিশেষ জিন কোনো ফসলের কোষে প্রবেশ করলে বিটি ফসল তৈরি হয়। এই বিটি জিনগুলি ফসলের প্রত্যকটি কোষে কয়েক ধরণের বিষাক্ত প্রোটিন তৈরি করে, যা খেলে পতঙ্গ মারা যায়। মনসান্টো কোম্পানি ভারতে প্রথম বিটি তূলা চাষের উদ্যোগ নেয়। বলা হয়েছিল, বিটি তূলা চাষ করলে কোনো পোকা আক্রমণ করবে না। অন্ধ্র প্রদেশে ২০০০ সালে চাষিরা ঋণ করে খুব চড়া দামে বা ৭০গুন বেশি দামে বিটি তূলার চাষ করে। কিন্তু বাস্তবে বিটি তূলার খেত পোকার আক্রমণে উজাড় হয়ে যায়। এর ফলাফল ছিল প্রায় লক্ষাধিক চাষির আত্মহত্যা। সেই মনসান্টোর মতো কোম্পানির স্বার্থেই ভারতের কৃষিক্ষেত্রেকে উজাড় করে দেয়া হচ্ছে দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের নামে।

এই দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের স্বার্থে ভারত সরকার যে নতুন বীজ আইন তৈরি করেছে, সেখানে বলা হয়েছে চাষিকে যে কোনো বীজ চাষ করতে গেলে তা সরকারিভাবে নথিভুক্ত হতে হবে। নথিভুক্ত নয় এমন কোনো শস্যের বীজ কৃষি ক্ষেত্রে বপনের উদ্দেশ্যে কেউ বিক্রি করতে পারবে না। বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে ভারত সরকারের এই নতুন বীজ আইন এতোটাই দানবীয় যে, তা ওই দেশের কৃষক সম্প্রদায়ের সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে মনসান্টোর মতো দানবিক কোম্পানিকে আরো তরতাজা হতে সাহায্য করছে।

মূলতঃ দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে উল্লেখিত কর্পোরেটদের পরামর্শ অনুযায়ী। তারা বলছে, খাদ্য উৎপাদন বড়াতে গেলে পূর্বের প্রযুক্তি দ্বারা আর সম্ভব নয়। ফলে অতি উৎপাদনের জন্য চাই নতুন বীজ যা বায়ু থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য, যেমন নাইট্রোজেন জোগাড় করতে পারবে। ফলে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হবে কম। অন্যদিকে, এই ফসল নিজ থেকে পোকামাকড় প্রতিরোধক। এই জিন পরিবর্তিত বীজের চাষ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে প্রধানভাবে দেশীয় বাজারের জন্য। স্বল্প দামে আমজনতার মুখে খাদ্য যোগানোর তাগিদে। এর কারণ হলো এখনো ভারতে ৩৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে। যা যে কোনো সময়ে রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে, ভারতে যেসব নদীতে বাঁধ দিয়ে মিঠা পানির আধার গড়া হচ্ছে, যা সেচ প্রকল্পভুক্ত সেখানে উৎপাদিত ফসল পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতন ইউরোপীয়ানসহ দেশীয় বিত্তবান নাগরিকদের জন্য চাষের ব্যবস্থা করা হবে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয়ান গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি তাদের নাগরিকেদের জন্য আর্সেনিকমুক্ত পানি ও জিন পরিবর্তিত খাদ্যের বদলে জৈব পদ্ধতিতে উৎপন্ন রকমারি খাদ্যশস্য, ফলমূল, সবজি তাদের বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। যেখানে বাঙলাদেশ, ভারত ও আফ্রিকার কিছু রাষ্ট্র প্রবেশাধিকার পাবে। এক্ষেত্রে আমাদের জেনে রাখা দরকার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি তাদের পরিবেশরক্ষা সহ পানি সংরক্ষণের নীতি গ্রহণ করেছে ধরতে গেলে ১৯৯০ সাল থেকে। ফলে তারা তাদের দেশের জনগণের জন্য খাদ্য উৎপাদনে তাদের মিঠা পানিসম্পদ ব্যবহারবায়োটেকনোলজিক্যাল অথরিটি না করে, আর্সেনিক মুক্ত উন্নতমানের খাদ্য ভারত থেকেই পেয়ে যাবে। এখানে হিসাবটি হলো এমন যে, ১ টন গম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন গড়ে ১১৬০ কিউবিক মিটার পানি। এখন ইউরোপীয়ানরা যদি ভারত থেকে আর্সেনিক মুক্ত মিঠা পানি ও জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত এক টন গম আমদানি করে। তাহলে তার নিজের দেশের ওই ১১৬০ কিউবিক মিটার মিঠা পানির যেমন মজুত থাকে, তেমনি ভারত থেকে আমাদানিকৃত গমের পিঠে চেপে সমপরিমাণের মিঠা পানি অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে ভারত সরকার আজ বিভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে যে সেচ ও কৃষির কথা বলছে, তা প্রধানভাবে ইউরোপআমেরিকাসহ তার দেশের বিত্তবান শ্রেণীর জন্য উৎপাদিত। যার সাথে ওই রাষ্ট্রের ১৭০ কোটি জনগণের যে দোহায়, তার কোনো সম্পর্ক নাই।

আমাদের আরো জেনে রাখা দরকার মানুষের প্রয়োজন মেটাবার মতো উদ্ভিদ সারা পৃথিবীতে সমানভাবে পাওয়া যায় না। ভ্যাভিলভ (১৯৩৫), হারল্যান (১৯৭১) প্রমুখ বিজ্ঞানীগণ পৃথিবীতে উদ্ভীদের যে মানচিত্র তৈরি করেছেন, সেখানে অঞ্চল বিশেষের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যে ১) চীন, ) ভারত ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, ) মধ্য এশিয়া, ) এশিয়া মাইনর, ) ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ) মেক্সিকো, ) ইথিওপিয়া, ) চিলি ও আমাজন অঞ্চলে সর্বাধিক পরিমাণে উদ্ভিদ পাওয়া যায়। এই তালিকার প্রতি দৃষ্টি দিলে ইউরোপীয়ানরা যাকে তৃতীয় বিশ্ব বলে থাকে, এটা সেই তৃতীয় বিশ্বভুক্ত অঞ্চল। এই আলোচিত অঞ্চলের একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এর প্রথম গুরুত্ব হচ্ছে আলোচিত এই অঞ্চলটি ক্রান্তীয় বা উপক্রান্তীয় অঞ্চল হওয়ার কারণে যাকে আমরা প্রাগঐতিহাসিক হিমযুগ বলে জানি, সেই হিমযুগে এই অঞ্চলটি বরফে জমে যায় নি। ফলে এখানকার উদ্ভিদকূল অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায়। আর দ্বিতীয় ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো পৃথিবীতে প্রথম যে সভ্যতা বা কৃষি সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল, তা আলোচিত এই অঞ্চলেই। তারাই প্রথম মানুষের চাহিদা মেটানোর মতো নানা জাতের উদ্ভিদকে চিহ্নিত করেন। সেই উদ্ভিদের শারীরবৃত্ত সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন। তাদের চাষ পদ্ধতি আবিস্কার করেন। বিভিন্ন গুণসম্পন্ন জাত সৃষ্টি করেন। আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই জ্ঞান রক্ষা করেন। তাকে আরো উন্নত করেন। আমাদের আলোচিত এরকম প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ হলো ভারত। সেখানে প্রাণবৈচিত্র যেমন ভরপুর, তেমনি কৃষকরা বংশ পরম্পরায় অভিজ্ঞ। এই অন্যতম কারণে সারা বিশ্বের বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলি ভারতে তাদের ফুড হাব গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আর অভিজ্ঞ কৃষকরা হবেন এই পরিকল্পনার যোগ্য শ্রমিক।

অন্যদিকে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য ২০০৫ সালে ভারত এবং মার্কিন সরকারের মধ্যে US-India Knowledge Initiative on Agriculture, Education, Teaching, Research, Service and Commercial Linkagesনামে একটা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছে। চুক্তিটি ১২৩ নং চুক্তি নামে আভিহিত। যাকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এগ্রিকালচার নলেজ ইনিসিয়েটিভ বা একেআই বলা হচ্ছে। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ভারত সরকার মূলতঃ তার সমস্ত কৃষিব্যবস্থাপনা কর্পোরেটদের হাতে তুলে দিয়েছে। এই চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ভারতের শিক্ষা, গবেষণা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, শিল্পসহ বহুজাতিক সংস্থার হাতে কৃষি পণ্যের বাজার উন্মুক্ত করে দেয়ার বাধ্যবাধকতা। অর্থাৎ, ভারতের শিক্ষা কি হবে, কোন বিষয়ের ওপর গবেষণা করতে হবে, কি ধরনের কৃষিব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে, খরচের কত অংশ বেসকারিকরণ হবে, তার সব কিছুই চুক্তিতে নির্দিষ্ট করা রয়েছে। আলোচিত একেআই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন যৌথ বোর্ড গঠন করা হয়েছে, সেখানে মার্কিন সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা হচ্ছে পৃথিবীর এক নম্বর খুচরো পণ্যের কারবারি ওয়ালমার্ট, সবচেয়ে বড় খাদ্য ব্যবসায়ী ড্যনিয়েল মিডল্যান্ড এবং রাসায়নিক পদার্থ, বীজ ও জৈব প্রযুক্তি গবেষণা নিয়ন্ত্রয়কারী একচেটিয়া কারবারি মনসান্টো। চুক্তি অনুযায়ী, এসব কোম্পানি কৃষি উৎপাদনের প্রাথমিক স্তর থেকে বন্টন পর্যন্ত সামগ্রিক প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার এসব কোম্পানির সাথে উপচুক্তি করেছে টাটাআম্বানিমিত্তালদের মতো ভারতীয় কোম্পানি, যারা চুক্তিভিত্তিক চাষ করিয়ে উৎপাদিত ফসল বিদেশে পাঠাবে। এখন এই চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের জন্য লাখ লাখ হেক্টর জমি প্রয়োজন।

ভারত সরকারের যে বিদ্যুৎ পরিকল্পনা তার সাথেও ফুড হাবের একটা সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, ওয়ালমার্টের মতো আলোচিত কর্পোরেট সংস্থাগুলি ভারতের প্রতিটি গ্রামে একটি করে হিমাগার বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণ সহজতর হয়। ভারতের ৫,৮৭,০০০টি গ্রামে কর্পোরেটদের স্বার্থে একটি করে হিমাগার তৈরি করতে গেলে কি পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন, সেটা সহজেই আমারা অনুমান করে নিতে পারি।

ভারত সরকার আজ যে দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের গল্প শোনাচ্ছে, তার পূর্বে প্রথম সবুজ বিল্পবের একটা কেচ্ছা রয়েছে। সেই সম্পর্কে দুইচার কথা না বললেই নয়। আমার এই পর্বের আলোচনাতেই পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চল প্রাণবৈচিত্রে ভরপুর তার উল্লেখ করেছি। পৃথিবীতে যারা আজ বীজ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে, প্রথম সবুজ বিপ্লবের আমলে তাদের হাতে ছিল হাইব্রিড বা শংকারায়ন করার প্রযুক্তি। তারা এসব দেশের বীজ দখলের যে তৎপরতা শুরু করে, সেখানে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিয়ষক প্রতিষ্ঠান ‘ফাও’ সবচেয়ে নিয়ামক ভূমিকা রাখে। ফাওএর তৎপরতায় গঠন হয় ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব প্লান্ট জেনেটিক রিসোর্স নামের একটি কমিটি। যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, জিন ব্যাংক গঠন করা। বিশ্বব্যাংক ১১ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন দেয়। কথা ছিল গবেষণালদ্ধ উৎপন্ন ফসল, বীজের ৫৭ শতাংশ পাবে উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ। ১০ শতাংশ পাবে গবেষণা সংস্থা। এবং বাদবাকি অংশ দক্ষিণের দেশসমূহ। আর চুক্তি অনুযায়ী, সংগৃহিত বীজের এক সেট থাকবে উৎস দেশগুলিতে। কিন্তু বাস্তবতা একদম বিপরীত ধর্মী হয়ে যায়। ১৯৮৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব প্লান্টের গবেষনায় সংগৃহিত ১,২৫,০০০ বীজের মধ্যে ৪৩ শতাংশ পায় উত্তরের দেশসমুহ। ৪২ শতাংশ গেল আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রগুলিতে। আর দক্ষিনের ভাগে পড়ল মাত্র ১৫ শতাংশ বীজ। উৎসদেশ সমুহে যে এক সেট থাকার কথা ছিল সেই অঙ্গীকারও বাস্তবায়ন হলো না। অর্থাৎ খোদ জাতিসংঘের কৃষি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের তৎপরতায় ১৯৮৫ সালের মধ্যে ১,২৫,০০০ রকমের জার্ম প্লাজম উৎসদেশগুলি থেকে কর্পোরেটদের কাছে পাচার হয়ে যায়। ফলে বর্তমানের ভারতে কোন ফসলের উৎপাদন হবে না হবে, সেটা কর্পোরেট সংস্থাগুলি নির্ধারণ করতে সক্ষম। কারণ বর্তমানে তাদের হাতেই রয়েছে সারা বিশ্বের জার্ম প্লাজমের মজুদ ভাণ্ডার। যা খোদ ভারতের হাতেও নেই।

ভারতের বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আমলা এবং কর্পোরেটদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক

যারা ভারতের রাজানীতি গতের অল্পবিস্তর খবরবার্তা রাখেন, তারা একটি তথ্য কমবেশি সবাই জানেন ওই দেশের সুপ্রিমকোর্ট, বিদেশী ব্যাংকে ভারতীয়দের গচ্ছিত অবৈধ কালো টাকার মালিকদের নাম প্রকাশ করাসহ টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্পষ্টতই নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সরকারের আমলেই সুপ্রিম কোর্টের ওই রায় কার্যকর করা হয়নি।

মূলতঃ ভারতীয় অর্থনীতিতে কালো টাকার প্রভাব এতটাই যে, তা অবৈধ হলেও সরাসরি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্র করে। ’৬০ এর দশকেই বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় অর্থনীতিবীদ ডি.কে রঙ্গনেকর একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি সমান্তরাল অর্থনীতির কলেবর বৃদ্ধি, স্বীকৃত বৈধ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও সম্প্রসারণের পক্ষে বিপদ হয়ে দাঁড়ায়,তবে নিশ্চিতভাবে বুঝতে হবে কালো টাকার বহর এতো বৃদ্ধি পেয়েছে যে, অবৈধ লেনদেন ভীষণভাবে বেড়ে গেছে, তার জটিলতা বিপদজ্জনক মাত্রা পেয়েছে। সমান্তরাল অর্থনীতির ব্যাপক প্রসারেরে সাথে সাথে কলো টাকার কলেবর বৃদ্ধি, দেশের সম্পদ ও আয় বৈষম্য বাড়িয়ে চলেছে। স্তরীভূত এই সমাজে ‘কালো ধনী’ ব্যক্তির জন্ম হচ্ছে যারা একটা কালো ধনী শ্রেণীর উদ্ভব ঘটাচ্ছে। এটা আর নেহাৎ তুচ্ছ বিষয় হিসাবে থাকছে না, তা অর্থনীতির উপরিভাগে শক্ত বুনিয়াদের ওপর নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। এই কালো ধনীদের জাঁকজমকমূলক ভোগ, তাদের কুরুচিসম্পন্ন পছন্দের ক্রম, অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারণকারী উপাদান হিসাবে কাজ করছে। এই ধনীদের সমাজের সর্বস্তরে আবাধ বিচরণ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি, সিদ্ধান্তগ্রহণে তাদের গুরুত্ব আজ আর কারও অজানা নয়’।

ডি কে রঙ্গনেকর যখন এই মন্তব্যটি করেন, ওই একই সময়ে তিনি ভারতীয় অর্থনীতিতে কালো টাকার একটা হিসাব দাখিল করেছিলেন। সেই হিসাব অনুযায়ী,১৯৬১৬২ সালে ওই টাকার পরিমাণ ছিল ১,৮৭৫ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমানের ভারত কিছু কালো টাকার মালিকানায় সারা পৃথিবীতে ছাড়িয়ে গেছে। যেমন ১৯৭৫৭৬ সালে ভারতের জাতীয় আয়ের ১০ শতাংশের মধ্যে কালো টাকা সীমিত ছিল, ১৯৮৩৮৪ সালে তা পরিণত হয়,সরকারি হিসাবে জাতীয় আয়ের ২১ শতাংশ,বেসরকারি হিসাবে, ৪৮ শতাংশ আর ১৯৮৭৮৮ সালে তা ছিল জাতীয় আয়ের ৫১ শতাংশ ১৯৯৪৯৫ সালে পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটির হিসাব অনুযায়ী, কালো টাকার পরিমাণ ছিল ১১,০০,০০০ কোটি টাকা। আর সেখানে ভারতের অভ্যন্তরীণ মোট জাতীয় আয় ছিল ৮,৪৩,২৯৪ কোটি টাকা। আর ২০০৮ সালের সুইস ব্যাংকে জমা কালো টাকার হিসাব যুক্ত করলে সেটা ভারতের মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের থেকেও বেশি।

ভারতের কালো টাকার পরিমাণ সম্পর্কে ২০০৬ সালে Global Financial Integrity Study (GFI)যে পরিসংখ্যান তুলে ধরে, সেখানে দেখা যায় সুইস ব্যাংকসহ বিদেশি ব্যাংগুলিতে যে কালো টাকা জমা রয়েছে,তার পরিমাণ ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় ৭০ লক্ষ কোটি টাকা। ২০০২০৬ সালের মধ্যে সুইস ব্যাংকে মোট জমার পরিমাণ ছিল ১৩৬ বিলিয়ন ডলার। যার মধ্যে ভারতের অংশ ছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া সুইস ব্যাংকের ২০০৮ সালের হিসাবে দেখানো হয়েছে মালিকানার দিক থেকে কালো টাকার মালিক হিসাবে ভারত প্রথম স্থানে রয়েছে। তাছাড়া International Tax Justice Networkএর হিসাব অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে কালো টাকার যে হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, সেটা এরকম ভারতের ১৪৫৬ বিলিয়ন ডলার, রাশিয়ার ৪৭০ বিলিয়ন ডলার, ইংল্যান্ডের ৩৯০ বিলিয়ন ডলার, ইউক্রেনের ১০০ বিলিয়ন ডলার এবং চিনের ৯৬ বিলিয়ন ডলার। এবং ওই ২০০৮ সালে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের হিসাব মতে, ভারতের বাজারে ৬,১৮,৭১৩ কোটি কালো টাকার প্রচলন রয়েছে। এটা হলো ঘটনার একটা দিক। আর বাইরেও আরো চমকপদ কিছু বিষয় রয়েছে।

ভারতের অর্থনীতিতে জোয়ার আনতে যে দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা বিনিয়োগ হয়ে থাকে, তার নাম মরিশাস দ্বীপ। ভারত মহাসাগরে এই ছোট্ট দ্বীপটির অধিবাসীর সংখ্যা মাত্র ১২ লাখ। ওই দ্বীপের চালু অর্থনীতির পরিমাণ ভারতীয় অর্থনীতির ১৫০ ভাগের ১ ভাগও নয়। অথচ ভারতের অর্থনীতিতে মোট বিদেশি বিনিয়োগের ৪০ শতাংশ আসে এই ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র থেকে। এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এই লগ্নিকৃত পুঁজির ওপর ভারত সরকারের কোনো করের চাপ নাই। কারণ ভারতীয় আইন অনুযায়ী, কোনো লগ্নি পুঁজির ওপর দুইবার কর বসানোর নিয়ম না থাকায় (Double Taxation Avoidance)স্বেচ্ছায় ছাড়া পেয়ে যায় মরিশাসের পুঁজি। অথচ খোদ মরিশাসে ওই পুঁজি আদৌ কোনো কর প্রদান করে কিনা সেই তথ্যও ভারত সরকারের হাতে নাই।

এক্ষেত্রে আমাদেরকে একটি কথা গুরুত্বের সাথে মনে রাখা দরকার, তা হলো ১৯৮০ সালের পরে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ ট্যাক্স হ্যাভেন, কর্পোরেট হ্যাভেন, অফশোর ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টার পরিচালনা করার জন্য ছোট বড় মিলিয়ে মোট ৪২টি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। মরিশাস তাদের মধ্যে একটি। ঠিক একই ধরনের আরেকটি রাষ্ট্রের নাম হলো কেম্যান আইল্যান্ডস। এই দেশের জনসংখ্যা মাত্র ১০ হাজার। আর এখানে রেজিস্টার্ড কর্পোরেটে সংস্থার সংখ্যা ১১ হাজার। এসব দেশে আলোচিত কর্পোরেটদের কার্যকলাপ এতোই গোপনীয় যে, তাদের দিক থেকে প্রকাশিত তথ্যের বাইরে অপর কোনো তথ্য পাওয়া মুস্কিলের। এখানে যে বাস্তবতা আরো ভয়াব,তা হলো সারা বিশ্বের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রধাংশের কাছে তাদের আস্থাভাজন চরিত্র তৈরি হয়েছে। এর কারণ হলো সারা বছর এসব কর্পোরেট সংস্থার হিসাব নিকাশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে কিছু তথাকথিত অডিট ফার্ম। এই অডিট ফার্মগুলি জনগণের জ্ঞাতার্থে সার্টিফিকেট দেয় যে, কর্পোরেট সংস্থাটি আইনমাফিক ও যথাযথভাবে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই অডিট সংস্থাগুলি খোদ কর্পোরেটদেরই অঙ্গসংস্থা। ভারতের বাইরে ট্যাক্স হ্যাভেন বা কর্পোরেট হ্যাভেন ও অফশোর ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারে নামে অতি ক্ষুদ্র দেশগুলিতেই ভারতীয়দের কালো টাকার পরিমাণ অতি অল্প সময়ে খুব দ্রুতই বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের সুনিদির্ষ্ট রায় থাকার পরেও ক্ষমতাসীন সরকারগুলির পক্ষ থেকে ওই টাকা উদ্ধারের তৎপরতা যেমন চালানো হয় নি, তেমনি কাদের টাকা সেখানে গচ্ছিত, সে নাম উদ্ধার করতে কোনো সরকার একটা পদক্ষেপও নেয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো ভারতের ক্ষমতাসীন প্রত্যকটি রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীসহ অনেক বাঘা বাঘা আমলা, বিচারপতি, সেনাকর্মকর্তাদের কালো টাকা এসব দেশের ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে। তার সমস্ত তথ্য প্রমান কর্পোরেট পরিচালকদের আঙুলের ডগায় রয়েছে। ফলে কর্পোরেটদের নির্দেশিত পথে না চললে এ মুহূর্তের মধ্যে গোটা আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতীয় কোন রাজনৈতিনেতৃত্বের কোথায় কত টাকা গচ্ছিত রয়েছে, তা প্রকাশ হয়ে পড়বে। একই অবস্থা হবে ওই দেশের বাঘা বাঘা আমলাদের। ফলে কর্পোরেটদের নির্দেশিত পথেই ভারত রাষ্ট্রের কর্ণধারদেরহাঁটতে হচ্ছে।

পরিশেষে যে কথাটি বলা বিশেষভাবে দরকার তা হলো, বর্তমান বিশ্ব এমনই এক পর্যায়ে উপস্থিত হয়েছে যে, এখন পুঁজির সংকট বলতে যা বোঝায়, তা আর নেই। বরং পুঁজির আধিক্যই এখন সমস্যা। কারণ কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে খুব দ্রুত মুনাফা করা সম্ভব, সেটা বাঁছাই কারাই এখন পুঁজিপতিদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। ১৯৯০ সালে যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছিল। ঠিক একইভাবে উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির ধ্বস নামে ওই একই সময়কালে। যার বড় প্রমা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর ১৯৯০ সালের পর থেকে শেয়ার বাজারে ফটকা কারবারি করতে গিয়ে অসংখ্য কর্পোরেটদের তল্পিতল্পা গোটাতে হয়েছে। ফলে কর্পোরেট সংস্থাগুলির এখন লক্ষ্য হলো টেকসই সম্পদে পুঁজি বিনিয়োগ করা। যার মধ্যে জমি, খনিজসম্পদ, পানি, কৃষি ইত্যাদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় কর্পোরেটদের পচ্ছন্দের তালিকায় যে রাষ্ট্রের নাম প্রথমে রয়েছে, সেটা হচ্ছে ভারত। ২০০৫ সালে ভারতীয় সংসদে স্পেশাল ইকোনমিক জোন বা সেজ (SEZ)আইন পাশ হওয়ার পর প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১০টি করে প্রকল্পের অনুমোদ দেয়া হয়। আর দুই বছরের মাথায় ৬ শতাধিক অনুমোদন পায়। সেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ভারত সরকার ১৮৯৪ সালে তৈরি জমি অধিগ্রহণ আইন বেছে নিয়েছে। লক্ষ কোটি মানুষকে তাদের ভুমি থেকে উচ্ছেদ করে সেই ভূমি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দিচ্ছে। অর্থাৎ, ভারতের ক্ষমতাসীন শাসকরা খোদ তাদের নিজের দেশকে কর্পোরেটদের কাছে শত শত ভাগে টুকরা করে বিক্রি করে দিচ্ছে। আমরা এই পর্বের আলোচনা শুরু করেছিলাম ভারতের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রঙ্গনেকরের বক্তব্য দিয়ে। তার ভাষায় একটা দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকা প্রভাব বিস্তার করলে তার পরিতি কি হতে পারে, বর্তমানের ভারত তার প্রকৃষ্ট উদাহর। কর্পোরেট দুনিয়া এই কালো টাকার সুত্র ধরে শুধু ভারতের রাজনীতিতেই প্রভাব বিস্তার করে নি। আইন, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, সংস্কৃতি ইত্যাদি সব কিছু নিয়ন্ত্র করতে এক আইন বহির্ভুত ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করেছে। আর সেই অবৈধ ক্ষমতা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে উঠেছে।

উপসংহারে যে কথটি বলা প্রয়োজন, তা হলো ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ সম্পর্কটি শুধুমাত্র নদীপানিবিদ্যুৎ ইত্যাদি দিয়ে বোঝার ক্ষেত্রে কিছু সংকট রয়েছে বলেই আমার ব্যক্তিগত ধারণা। ফলে আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে আরেকটু বৃহ পরিসর থেকে জানা বোঝার ইচ্ছা থেকে নোট আকারে লেখাটি তৈরি করা। এর অন্যতম উদ্দেশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত বিরোধিতার একটা শক্ত অবস্থান রয়েছে, কিন্তু সেই অবস্থানটি একদম সাম্প্রদায়িক উপাদানে ভরপুর। অর্থাৎ, হিন্দুমুসলমান নির্ভর দুই ধরণেজাতীয়তাবাদ দ্বারা নির্মিত এবং বহুল প্রচারিত। এতে করে উভয় দেশের শাসক শ্রেণী ও তাদের স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের লাভ হলো,তারা এই উভয় দেশেরওপর কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্র ও খবরদারি খুব সহজে আড়াল করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এমন যে, উভয় দেশের কর্পোরেট বিরোধী লড়াইআন্দোলন একত্রিত না হলে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প রোধ করা যাবে না বলেই আমার ধারণা। ধন্যবাদ।।

১৭ই জুন, ২০১৪ সাল।।

Advertisements
মন্তব্য
  1. পিয়াস বলেছেন:

    আপনাদের নিতি ও আদর্শ আমার খুব
    ভালো লাগে… আমিও আপনাদের পথের
    কান্ডারী হতে চাই…
    দয়া করে আপনাদের মুল্যবান
    মতামত জানাবেন….
     Reply

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s