ক্রসফায়ার :: সাক্ষাৎকার ভিত্তিক বিশেষ প্রতিবেদন (প্রথম কিস্তি)

Posted: জুলাই 7, 2014 in সাক্ষাৎকার
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

bonduk(আমরা সাধারণত “ক্রসফায়ার”এর একমুখী প্রচারপ্রচারণাটাই শুনে থাকি, এমনকি একেই সত্য বলে ধরে নিই, কিন্তু তার অপরদিকের সত্যটা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় না, বা হতে দেওয়া হয় না। এই “ক্রসফায়ার”এর অন্তর্নিহিত কারণ এবং এর সাথে রাষ্ট্রের রাজনৈতিকতার সম্পর্কটাও তুলে ধরা হয়েছে নেসার আহমেদ সম্পাদিত ক্রসফায়ার’ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বইটিতে। বইটি হয়তো অনেকেই পড়েছেন, আবার অনেকেরই হয়তো তা এখনো পড়া হয়নি। আর এ জন্যই এই বইয়ের প্রতিবেদনসমূহ এখানে পর্যায়ক্রমিকভাবে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সম্পাদক)

ক্রসফায়ার’ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হতে

স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন

তালায় ক্রসফায়ার

চরমপন্থী কার্তিক ঋষি নিহত, অস্ত্র উদ্ধার, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও বগুড়ায় ক্রসফায়ারে আরো ৪ সন্ত্রাসী নিহত

রিপোর্ট ইয়ারব হোসেন/ মোজাফফর রহমান/জয়দেব চক্রবর্তী

গতকাল ভোর ৩টার সময় সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জিয়ালা নলতা নামক স্থানে পুলিশের সাথে ক্রসফায়ারে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল জনযুদ্ধ) নেতা কার্তিক ঋষি নিহত হয়েছে। এ সময় ২ পুলিশ আহত হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১টি পাইপগান, ১টি বন্দুক ও ৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে।

তালা থানার ওসি মশিউর রহমান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল দুপুরে তালা থানার পুলিশ তালার আমানুল্লাপুর গ্রামের অমূল্য ঋষির ছেলে কার্তিক ঋষি (৩৫)-কে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে তালা থানায় ৫টি হত্যাসহ ১১টি মামলা রয়েছে। পুলিশ তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রাতে তালা উপজেলার জিয়ালা নলতা এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার করতে যায়। রাত ৩টার সময় সেখানে পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা কার্তিক ঋষিকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এসময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে কার্তিক ঋষি নিহত হয় এবং পুলিশের নায়েক হুমায়ুন কবীর ও কনস্টেবল জাহাঙ্গীর হোসেন আহত হয়। সন্ত্রাসীরা ৪০ রাউন্ড এবং পুলিশ ১৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে ওসি জানিয়েছে। ঘটনাস্থলে সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া ১টি পাইপগান, ১টি বন্দুক ও ৩ রাউন্ড গুলি পুলিশ উদ্ধার করেছে। ওসি আরো জানান, ম্যাটিজস্ট্রেট দিপঙ্কর বিশ্বাসের উপস্থিতিতে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় নিহত কার্তিক ঋষির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। দুপুরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে মর্গে লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন শেষে লাশ তার স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।

কে এই কার্তিক?

তালা উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের আমানুল্লাহপুর গ্রামে ১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণ করেন কার্তিক ঋষি। তার বাবা অমূল্য ঋষি ঝুড়ি, ডালা তৈরি করে কোনো রকমে অভাবের সংসার চালাত। সংসারে দারিদ্র্যতার কারণে ছোট থেকেই উপজেলার খানপুর গ্রামে তার পিসির বাড়িতে থাকত। সেখানে প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া শেষে জড়িয়ে পড়ে অপরাধ জগতে। পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি আঞ্চলিক নেতা অশোক সাহার মাধ্যমে সে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে। পরবর্তীতে কার্তিক ঋষি তালা অঞ্চলের প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক পরিবারের সেল্টারে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ঐ পরিবারের এক নেতার ভাড়াটিয়া হিসেবে ১৯৯৫ সালে ৪ অক্টোবর ঘোনার বিলে তালার মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম ও স্কুল শিক্ষক আলাউদ্দিন মাহমুদকে তার সহযোগীদের মাধ্যমে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় কার্তিক ঋষি ছিল অন্যতম আসামি। ঐ মামলায় সে দীর্ঘদিন জেল হাজতে থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

গ্রেফতারের পূর্বে কার্তিক ঋষি

কার্তিক ঋষি দীর্ঘদিন পর জেল হাজত থেকে ছাড়া পেয়ে চরমপন্থি জনযুদ্ধের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তালার বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদাবাজি করতে থাকে। কার্তিক ঋষি তার সহযোগী হিসেবে গৌরীপুর গ্রামের মঞ্জু, মাহমুদপুর গ্রামের সিরাজ ও লিটন জনযুদ্ধের প্যাডে সম্প্রতি কাটিপাড়া গ্রামের অমল দাশের বাড়িতে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চিঠি দেয়। কলাপোতা গ্রামের মাস্টার প্রশান্ত সাধুর নিকট দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে বলে তালার ওসি শাহ মশিউর রহমান জানিয়েছেন।

যে স্থানে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে

জেলার সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসী জনপদ তালা সদর ইউনিয়নের জিয়ালা নলতা গ্রাম। এই গ্রামের পাশেই খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানা। পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী লুৎফর রহমানের বাড়ি এই গ্রামে। বুধবার রাত ৩টার দিকে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটার পর গতকাল সকালে সেখানে একাধিক ব্যক্তির সাথে আলাপ করলে তারা জানায়, গভীর রাতে হঠাৎ ৭/৮ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা গেছে। ঘটনাস্থলের দুশো গজ দূরে খেজুরবুনিয়া বাজার। কায়েকজন দোকানদার নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানায়, গুলির শব্দের কিছুক্ষণ পর পুলিশ আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তোলে এবং একটি লাশ দেখিয়ে বলে, সন্ত্রাসীদের সাথে গুলি বিনিময়ে চরমপন্থি কার্তিক মারা গেছে।

প্রথম ক্রসফায়ার

সাতক্ষীরাতে এই প্রথমবারের মতো সন্ত্রাসীদের সাথে পুলিশের বন্দুক যুদ্ধে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে চরমপন্থী কার্তিক ঋষি। কার্তিক ঋষি নিহত হওয়ায় তালা অঞ্চলে শান্তি ফিরে এসেছে।

স্বজনদের বক্তব্য

নিহত কার্তিক ঋষির স্বজনরা জানায়, এলাকার একটি পরিবারের সাথে কার্তিক ঋষির বেশ কিছুদিন যাবৎ বিরোধ চলে আসছিল। গত কয়েকদিন পূর্বে গ্রাম্য শালিশে কার্তিক ঋষিকে মারপিটসহ নাকে খত দেয়ানো হয়। উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ঐ পরিবারের লোকজন পুলিশকে দিয়ে কার্তিক ঋষিকে গ্রেফতার করে এবং তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

দৈনিক পত্রদূত, ১০ম বর্ষ, ৩৩৬ সংখ্যা, শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০০৫ সাল।

র‌্যাবের এনকাউন্টারে জনযুদ্ধের সাতক্ষীরা অঞ্চলের কমান্ডার শ্যামল নিহত

রিপোর্ট রঘুনাথ খা: র‌্যাবের সঙ্গে এনকাউন্টারে শ্যামল কুমার সরকার (৩০) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোরে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নগরঘাটা সরদারপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার ওসি আজম খান জানান, উপজেলার গোপালডাঙা গ্রামের পুলিশ বিহারী সরকারের ছেলে শ্যামল কুমার সরকার পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল জনযুদ্ধ) সক্রিয় সদস্য। তার বিরুদ্ধে তালা থানায় ১৯৯৫ সালের মোক্তার খা হত্যাসহ দুটি হত্যা মামলা, একটি অস্ত্র মামলা ও একটি চুরির মামলা রয়েছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় উপজেলার ৩০ মাইল এলাকা থেকে র‌্যাব৬ এর সদস্যরা তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য নগরঘাটা ইউনিয়নের সরদার পাড়ায় আসে। সরদার পাড়ার জাহাবক্সের ছেলে শহিদুল ইসলামের পুকুরপাড়ে পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা শ্যামলের সঙ্গীরা র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় র‌্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। দৌড়ে পালানোর সময় গুলিতে শ্যামল মারাত্মক আহত হয়। পরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে। ঘটনাস্থল থেকে ১টি পাইপগান, ৩ রাউন্ড গুলি ও ৩টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। এদিকে খুলনাস্থ র‌্যাব৬ এর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিহত শ্যামল একাধিক হত্যা মামলার আসামি। চাঁদাবাজ, ঘের দখলকারি ও পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (জনযুদ্ধ) কমান্ডার তপন মালিথার একান্ত সহযোগী এবং সাতক্ষীরা অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার। সে তালা ও পাটকেলঘাটা থানার জনযুদ্ধের তালিকাভুক্ত আসামি। জনযুদ্ধের অপর কমান্ডার অপুর সংস্পর্শে এসে সে জনযুদ্ধে যোগ দেয়। সে মোক্তার খা হত্যা মামলার ১নং আসামি। জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে সে জনযুদ্ধের সাতক্ষীরা অঞ্চলের কমান্ডার নিযুক্ত হয় এবং খুন, চাঁদাবাজি, ঘের দখলসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সে নিজ এলাকায় টিকতে না পেরে গোয়ালপোতা এলাকায় আশ্রয় নিয়ে পার্টির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করে আসছিল। শ্যামল মাঝে মাঝে অপরাধ সংঘটিত করে ভারতে পালিয়ে যেত বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত শ্যামল সরকারের মা কমলা রানি সরকার জানান, তার ছেলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সঠিক নয়। তাকে হত্যা করা হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ও যুগ্ম সম্পাদক ফিরোজ কামাল শুভ্র জানান, নিহত শ্যামল কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সে ছিল আওয়ামী লীগের খলিষখালি ইউনিয়নের কর্মী।

দৈনিক পত্রদূত, ১২বর্ষ ১১১ সংখ্যা, শনিবার, ২৭মে ২০০৬ সাল।

কার্তিক ঋষির স্ত্রী ও মেয়ের বক্তব্য

কানন

নেসার: আপনার নামটা আগে বলুন।

কানন: আমার নাম কানন।

নেসার: পদবি?

কানন: ঋষি।

নেসার: কার্তিক ঋষি আপনার কী হতো?

কানন: আমি কার্তিকের স্ত্রী।

নেসার: আপনার বাচ্চাকাচ্চা কয়টা?

কানন: তিনটি মেয়ে, একটা ছেলে।

নেসার: উনি মারা গেছেন কবে?

কানন: এই দুই বছর হচ্ছে।

নেসার: কত তারিখ, কত সাল, এটা কি বলতে পারবেন?

কানন: মাঘ মাসের ৬ তারিখে। আমরা বিটিরা [মেয়েরা] এম্নি, ভালো বলতি পারব না।

নেসার: কারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল আপনার স্বামীকে?

কানন: তখন? আমি তো চিনতি পারিনি। সাদা পোশাকে আইছিল। সাদা পোশাকে আইসে তারে উঠায়ে নিয়ে গ্যাছে। ওইযে, এই জাগারতে। আমার এই উঠানেরতে। খ্যাতাকাপড় সব নাড়ে দেয়া। ওই জাগারতে ধইরে নিয়ে গেল। ওই জাগায় বসেই কাজ করছিল।

নেসার: তার কাছে কি বন্দুক পেয়েছিল?

কানন: না, কিছুই পাইনি। আপনি এই গ্রামের লোকের কাছে শোনেন। দুইএক গ্রামের লোকের কাছে শোনেন। সবাই বলবে তার কাছে কোনো বন্দুক পায়নি [আশপাশের সমস্ত লোক কাননের এই বক্তব্যকে সমর্থন করেন]। আমরা গরিব মানুষ দাদা। বন্দুক দিয়ে কী করব?

নেসার: তিনি কি কোনো রাজনীতি করতেন?

কানন: কোনো কিছুই করতো না। হলাম ঋষি মানুষ আমরা। ওই কাজ কি করতি পারে?

নেসার: এখন আপনার সংসার কীভাবে চলছে?

কানন: এখন আমি ভিক্ষঝিক করে সংসার চালাচ্ছি। প্রত্যেকদিন ভিক্ষা না করলে আমার সংসার চলতেছে না। আমি প্রতিদিন ভিক্ষা করতি যাই।

নেসার: লেখাপড়া করে কেউ।

কানন: ছেলেডা এবার ক্লাস সিক্সে উঠেছে। আর পড়াতি পারব না। ছাড়ান দিয়ায় দেব। সংসার তো চলতেছে না।

নেসার: জমিজমা কতটুকু আছে?

কানন: কিছুই নেই আমার।

নেসার: এই ভিটা?

কানন: এই টুকু মানে এই ভিটাটুকু নিয়েও আমার খুব সমস্যা দেখা দিছে। এখানে আমি থাকতি পারব কি পারব না তাও উপর [ঈশ্বর] ভরসা। আমারে এই গ্রামে আর কেউ রাখতি চাচ্ছে না।

নেসার: আপনার বাবার বাড়ি কোথায়?

কানন: আমার বাবার বাড়ি তল্লাখানপুর।

নেসার: পেপারে তো লিখেছে র‌্যাব আপনার স্বামীরে মেরেছে তাইনা?

কানন: হ্যাঁ, পেপারে দেছে র‌্যাব মেরেছে। তবে আমরা পরে শুনলাম যে, এ র‌্যাবে করেনি। থানার পুলিশি এ কাজ করেছে।

নেসার: এই যে আপনার স্বামীকে ধরে বিনা বিচারে মেরে দিল? এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

কানন: আমার মতো ব্যক্তির স্বামীরে মারা কিন্তু সঠিক কাজ হয়নি। এর বিচার আসলে কিডা করবে? আমাদের কি বিচার করার লোক আছে? গরিব মানুষরা কি কোনো দিন বিচার পায়? তার পরে আমরা হলাম মুচি। ছোট জাতের পক্ষ হয়ে কে বিচার করে দেবে?

নেসার: কেউ কি রিপোর্ট দিয়েছিল? নাকি রাজনীতির কারণেই ধরেছিল?

কানন: না, এরে ধরে নিয়ে গেলি কিছু রিপোর্ট গেছে। আশপাশের লোকজনের। সামাজিকভাবে বিরোধী দলপার্টির লোকেরা রিপোর্ট দেছে। শুনলাম যে, ৬০ হাজার টাকা দিয়ে মারায় দেছে।

নেসার: কারা টাকা দেছে, নাম বলা যাবে?

কানন: তাই কি বলা যাবে? তবে আশপাশের সবাই জানে।

নেসার: আপনার শ্বশুরের নাম তো অমূল্য ঋষি?

কানন: হ্যাঁ।

নেসার: কার্তিক, উনি কি এক বাপের এক ছেলে ছিলেন?

কানন: না। তিনটি ছেলে ছিল। আগে দুটো মারা গেছে।

নেসার: কীভাবে মারা গেছে?

কানন: একটারে ভূতি চেপে মেরেছে। পরে একটা বিষ খেয়ে মরেছে। আর এ লোকেরে তো পুলিশি গুলি করে মারল।

নেসার: মারা যাওয়ার সময় উনার বয়স ছিল কত?

কানন: বাচ্চার বাবার? ধরো ৪০। চারডে বাচ্চার বাবা যখন হয়েছে, তখন ৪০ হবে।

নেসার: উনি মারা যাওয়ার পরে কি আর থানা থেকে পুলিশ এসেছিল?

কানন: না, আর আসেনি।

নেসার: কোনো সাংবাদিক?

কানন: না, আসেনি।

নেসার: আপনি কি কোনো কেস করেছেন?

কানন: না, করিনি। আমি বললাম না, কীভাবে করব? আমাদের তো লোক নেই। টাকা নেই। সমাজ নেই। ক্ষমতা নেই। পুলিশ এমনি এমনি ভালো লোকডারে মাইরে ফেলে দিল। পুলিশির নামে কেস করে কি বাঁচা যাবে? দেখেন আমার মন আজ ভালো নেই। কালকে রাত্রিতে সালিশ হয়েছে আমার নিয়ে। এখানে আমি থাকতি পারব কি পারব না তাই নিয়ে সালিশ। খুব কষ্টের ভিতর আছি আমি। এত কষ্টের ভিতর ঈশ্বর যেন আর কারো না ফেলায়। এত কষ্ট যে, আমি আমার বাড়ি থেকে বেরুতিই পারি না । এত হিংসার ভিতরে আমি আছি। আবার ভিখ না করলি পেট চলে না।

শাপলা

নেসার: তোমার নাম কি?

শাপলা: আমার নাম শাপলা।

নেসার: তোমার বাবার নাম?

শাপলা: কার্তিক।

নেসার: তোমার বয়স কত?

শাপলা: ১৫ বছর হবে।

নেসার: তোমার বাবাকে যেদিন ধরে তুমি কি সেদিন বাড়িতে ছিলে?

শাপলা: হু, ছিলাম।

নেসার: কোথায় থেকে ধরেছিল?

শাপলা: ওই ওই জাগারতে। ভোরের দিকি ধরিছিল।

নেসার: আর মারছিল কবে?

শাপলা: বুধবারের দিন ভোর বেলায় ধরেছে। আর ওই বুধবার দিন রাত সাড়ে তিনটার দিক মারা পড়েছে।

নেসার: মারছিল কোন জায়গা?

কানন: এদিক খেজুরবিনে, হাটখোলা কোনদিকি সেখানে।

নেসার: কতদূর এখান থেকে?

কানন: তো ম্যালা দূর। জ্যালা নলতা আছে ওই জায়গায়?

নেসার: তারপর লাশ?

কানন: লাশ পুলিশি নিয়ে গিছিল পোস্ট মাটামে। সেইখানতে আমরা আবার নিয়ে আইছি বাড়ি।

নেসার: তুমি কি পড়াশোনা কর?

শাপলা: ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়িছি।

নেসার: তোমার বাবা কি কাজ করত?

শাপলা: এমনি শিল্পকারখানার কাজ করত, বাশ কুঞ্চির কাজ।

নেসার: তুমি এখন কি কোনো কাজ করো?

শাপলা: না। মা ভিক্ষা করতি যায়। আমি ছোট ভাইবুন রাখি। সংসার দেখাশোনা করি।

নেসার: তোমার বাবা কি কোনো দল করত?

শাপলা: না।

নেসার: তোমার বাবা মারা যাওয়ার পরে কোনো চাপ এসেছে কি?

শাপলা: পাড়ার লোকের চাপ আছে। বাইরের লোকের চাপ আসিনি। তারা আমাগের এ্যানে থাকতি দেবে না। হ্যানতে চলে যাতি কয়। বলে তোর বাপের জন্য আমাগের অসুবিদা হবে।

৩১শে ডিসেম্বর রোববার, ২০০৬ সাল। সকাল ৮টা ১০মি. সাতক্ষীরা

শ্যামলের বোন ও মা’র বক্তব্য

মায়া, কমলা

নেসার: আপনার নামটা বলেন।

মায়া: মায়া সরকার।

নেসার: কয় ভাই বোন?

মায়া: আমরা হচ্ছে, ভাইডা তো মারা গেছে আর এখন আছি দুই ভাই বোন।

নেসার: আপনার ভাইকে ধরছিল কারা, বলতে পারবেন?

মায়া: পরে শুনেছি র‌্যাব। ভাইকে তো আগে ডেকে নি গিইল ওরা?

নেসার: কারা ডেকে নি গিইল?

মায়া: আমার ভাইরে মোবাইল করে ডেকে নি গিইল শিব। মোবাইল করে বিনিপোতায় ডেকে নি গিইল। ওই জাগার তে ওর ছয় দিনির পর লাশ হয়ে বাড়ি পাঠায় দিছে। ভ্যানে করে বাড়ি পাঠায় দেছে। এখন ওরা বলতেছে কী জুয়েলের বাড়িতে ৪ দিন আটক ছিল। এখন জুয়েলের বউ বলতেছে আমাদের বাড়ি ৪ দিন ছিল।

নেসার: লাশ পেয়েছেন কোথায়?

মায়া: সদরে।

নেসার: পুলিশের কাছে?

মায়া: আমরা যখন গিছি তখন পুলিশটুলিশ কিচ্ছু ছিল না। ওর লাশটা এক বারান্দায় পড়ে আছে। শুধু লাশটা বারান্দায় ফেলায় থুয়েছে।

নেসার: আপনার নাম?

কমলা: কমলা সরকার?

নেসার: আপনি?

কমলা: আমি শ্যামলের মা।

নেসার: মায়া, আপনার বাবা তো বাড়িতে থাকে না?

মায়া: না, ভারতে থাকে।

নেসার: আপনার বাবা কি রাজনীতি করেন?

মায়া: না। আমাদের অবস্থা তো ভালো। এত জমিজমাবাড়ি থুয়ে কেউ কি রাজনীতি করে?

নেসার: আর শ্যামল কোনো রাজনীতি কি করত?

মায়া: না। ওরে মিথ্যা কথা বলে ডেকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছে। চোখ বেন্ধে মাইক্রোতে করে নিয়ে গিইল। ডেকে নিয়ে গিইল শিব।

নেসার: শিব কী করে?

মায়া: জুয়েলের সাথে থাকত। বিএনপির নেতা সে।

নেসার: এবার আপনি বলুন, শ্যামল কত তারিখে মারা গেছে?

কমলা: বাবা আমার মাথার ঠিক নেই ।

নেসার: কয় মাস হবে?

কমলা: জ্যোষ্ঠি মাসে মারা গেছে।

নেসার: আপনার ছেলে কি কোনো রাজনীতি করত?

কমলা: না বাবা। বাচ্চার মা হয়ে আমি মিথ্যা কথা বলব না বাবা [এরপরে কমলা সরকার উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকেন। ফলে তার কথা আর ধারণ করা সম্ভব হয়নি]

নেসার: আপনারা কি মামলা করেছেন?

মায়া: না, মামলা করিনি। মামলা করলি তো বিচার পাব না। এখন তো বিএনপি সরকার। এই সরকার এর বিচার করবে না। এবাদে আমার বাবার নামে সন্ত্রাসী মামলা দেছে, জুয়েল মার্ডারের ব্যাপারে। পুলিশ রোজ আসতিছে বাড়ি। মিথ্যে মামলা সাজায়ে রোজ রাত্রে আসে। আমাদের ভয় দেখায়। আমরা এখন শুধু তিনজন মহিলা বাড়ি থাকি। বাড়িতে এসে অস্ত্র রেখে যাচ্ছে। ভয় দেখাচ্ছে। এসব অত্যাচার করছে আমাদের উপরে।

নেসার: মানে আপনার বাবা চলে যাওয়ার পরে এবং ভাই মারা যাওয়ার পরে, রাত্রে আপনাদের বাড়িতে অস্ত্র রেখে ভয় দেখানোসহ অত্যাচার করা হচ্ছে?

মায়া: হ্যাঁ, এরকমভাবে অস্ত্র দি যেয়ে পুলিশের কাছে খবর দিচ্ছে। পুলিশ এসে অস্ত্র নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শেষ করে দিচ্ছে সব।

নেসার: আপনাদের সংসার চলছে কীভাবে?

মায়া: আমরাই ঘের ক্ষেতটেত দেখাশোনা করি। এর পরই সংসার চলতিছে টুকটাক।

নেসার: কে কে আছেন এখন সংসারে?

মায়া: আমি, মা আর পিসিমা।

নেসার: কোনো পুরুষ লোক নেই সংসারে?

মায়া: না, কোনো পুরুষ লোক নেই।

নেসার: আপনার পিসিমার ছেলেমেয়ে?

মায়া: পিসিমার ছেলেমেয়ে নেই। তিনিই আমাদের মানুষ করিছেন।

নেসার: নির্বাচনের পর সরকার চেঞ্জ হলে, আপনারা কি র‌্যাবের বিপক্ষে মামলা করবেন?

মায়া: হ্যাঁ, করব।

নেসার: র‌্যাব তো সরকারি বাহিনী।

মায়া: হোক। বিনা বিচারে মারল কেন? আমার ভাই কি কোনো দল করত?

নেসার: আপনার বাবা তো এখন নাই?

মায়া: বাবা ভারতে চলে গেছে অনেক আগে। সে চলে যাওয়ার পরেই তো মিথ্যা করে কেস দিছে। আবার অস্ত্রপাতি থুয়ে যাচ্ছে।

নেসার: তা ধরেন শ্যামলের কোনো বিচার পেলেন না। তখন কী করবেন?

মায়া: বিচার যদি না পাই চলে যাব। সঠিক বিচার না পালি চলে যাব। কেন থাকব এদেশে। পুলিশ প্রত্যেক দিন এসে অত্যাচার করতিছে। অস্ত্র থুয়ে যাচ্ছে গোলার বেড়ায়। থুয়ে যেয়ে বলছে অমুকের বাড়িতে অস্ত্র পাইছি। পেপারে ফ্লাশ করছে। কিন্তু বাড়িতে তো কোনো লোকজন নেই। আমরা তিন মহিলা ছাড়া। পুলিশ আসতিছে রাত তিনডের সময়। এসে বলতিছে উঠো। তোমাদের বাড়িতি অস্ত্র পাইছি। এরেওরে সাক্ষী বানাচ্ছে। বলতেছে আমরাও সন্ত্রাসী।

নেসার: তাহলে, আপনারা মোট তিন ভাই বোন।

মায়া: হ্যাঁ, দুই ভাই এক বোন।

নেসার: শ্যামল কি সবার বড়?

মায়া: হ্যাঁ, সবার বড়।

নেসার: ছোট ভাই কি ভারতে?

মায়া: ছোট ভাই ভারতে পড়তিছে।

মাসি: আর এই যে, শ্যামল হলো ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে, যেমনি হচ্ছে কেসে ঢুকিই দেছে। ওই জুয়েলের বাবা মরে গেছে, সেই তে কেস ঢুকি দেছে। সেই তে কেস খাইয়ে খাইয়ে কেবলি বের করেনি আইছি সেই সময় মারায় দেছে। বাড়ির তি ডেকে নি গেছে। ওই হলো মাছ আনতি যেতে হবে হ্যাচারির, ও শুই ছিল। তারপরে হচ্ছে হ্যাচারিতি মাছ আনতি গেছে। ওই জাগারতে ওর ধরিছে। সে তখন ফুল সংসারি করছিল।

নেসার: বিয়ে করেছিল?

মায়া: হ্যাঁ।

নেসার: শ্যামলের কোনো ছবি আছে?

মায়া: না ছবি নেই। বিয়ের সময় উঠাইল। আমার ছোটভাই ইন্ডিয়ায় নিয়ে গেছে। দাদা মারা গেলে ও ভারতের থেকে বেড়াতে আসছিল। তারপর ছবি নিয়ে চলে গিইল।

নেসার: শ্যামলের বউ কোথায়?

মায়া: বাপের বাড়ি।

নেসার: বাপের বাড়ি কোথায়?

মায়া: বাপের বাড়ি হলো বলাবাড়িয়া।

নেসার: আবার কি বিয়ে করেছে?

মায়া: বিয়ে করবে। পেটে বাচ্চা ছিল নষ্ট করিছে।

নেসার: বলাবাড়িয়া কার মেয়ে?

মায়া: প্রভাত মাস্টার।

নেসার: আপনি কোন ক্লাসে পড়ছেন?

মায়া: এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি।

নেসার: আপনাদের গ্রামের নামটা কী?

মায়া: গোপালডাঙ্গা।

নেসার: এটা কোন ইউনিয়ন।

মায়া: এটা খলিশখালি ইউনিয়ন।

নেসার: কোন থানা এটা?

মায়া: এখন পাটকেলঘাটা থানা হইছে। আগে তালা থানা ছিল।

মাসি: এখন পাটকেলঘাটা থানা হইছে বুলেতো মেরে ফেলেছে। তালা থানা থাকতি এমন ছিল না।

২৪শে ডিসেম্বর, রোববার, ২০০৬ সাল। সকাল ১২টা ৩৭ মিনিট। পাটকেলঘাটাসাতক্ষীরা।

স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীর ভাষ্য

জাহাঙ্গীর আলম

নেসার: আপনি যে নামে সাক্ষাৎকার দিবেন, সেই নামটি আগে বলুন।

জাহাঙ্গীর: আমার নাম জাহাঙ্গীর আলম, তালা থানা, জেলা সাতক্ষীরা।

নেসার: আপনাদের অঞ্চলে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে যে শ্যামল নিহত হয়েছে তার বাবা পুলিনের বয়স কত হবে?

জাহাঙ্গীর: ৪৫ বছর হতে পারে আনুমানিক। মানে ৪৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে।

নেসার: আর পুলিনের যে ছেলে শ্যামল মারা গিয়েছে, তার বয়স?

জাহাঙ্গীর: শ্যামলের বয়স ২৪২৫ বছরের মধ্যে হবে।

নেসার: এখানে শ্যামলকে র‌্যাব ক্রসফায়ারে মারার পরে জুয়েল নামে আর একজনের মৃত্যু হতে দেখছি। এই দুই মৃত্যুর মধ্যে মনে হয় কিছু দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেটা কি বলবেন?

জাহাঙ্গীর: পূর্বের দ্বন্দ্ব বলতে জুয়েলের বাবা মার্ডারের সঙ্গে, জুয়েলের ধারণা যে, জুয়েলের বাবা মার্ডারের সঙ্গে পুলিন জড়িত। এই হচ্ছে দ্বন্দ্ব।

নেসার: এই ধারণাটা কী জন্য?

জাহাঙ্গীর: শোনা যায় যেটা মোক্তার খাঁ মানে জুয়েলের বাবাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) জনযুদ্ধ। আর এই দলের সঙ্গে পুলিন জড়িত। এবং জুয়েলের ধারণা পুলিনই তার বাবাকে হত্যা করেছে।

নেসার: মোক্তার খাঁ কি চেয়ারম্যান ছিল?

জাহাঙ্গীর: মোক্তার খাঁ এক সময় এই এলাকার চেয়ারম্যান ছিল। যখন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তখন চেয়ারম্যান ছিল না।

নেসার: মোক্তার খাঁ এমনিতে মানুষ হিসেবে কেমন ছিল?

জাহাঙ্গীর: আমার জন্ম তো ’৭১ এর পরে। তবে পুরনোকালের লোকমুখে শুনেছি ’৭১ সালে সে পাকিস্তানিদের পক্ষ নিয়ে এই অঞ্চলের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে অনেক নিপীড়ন চালিয়েছে। তাছাড়া, আমাদের এই অঞ্চলে ওই সময়ে ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাপক তৎপরতা ছিল। ফলে তাদের অনেক নেতা কর্মীর উপরে মোক্তার খাঁ’র অত্যাচার করার নাকি রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু ইদানীং এসে অর্থাৎ মারা যাওয়ার পূর্বে সে বেশ কিছুটা সমঝে চলতো। বেশ কিছুটা ভালো হয়ে গিয়েছিল।

নেসার: তাহলে, মোক্তার খাঁ মার্ডারের স্পষ্ট কোনো কারণ নেই? কেন তাকে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) জনযুদ্ধ মৃত্যুদণ্ড দিতে গেল?

জাহাঙ্গীর: কারণ যে নেই তা বলিনি। ’৭১এর ধারাবাহিকতায় যারা অত্যাচারিত হয়েছিল, সম্পদ হারিয়েছিল তার জের ধরে হয়ত বা ঘটনাটা ঘটতে পারে।

নেসার: মোক্তার খাঁর ছেলে জুয়েল মারা গিয়েছে শ্যামল মারা যাওয়ার আগে না পরে?

জাহাঙ্গীর: শ্যামলের মৃত্যুর পরে।

নেসার: তাহলে মোক্তার খাঁর মৃত্যুর সঙ্গে পুলিন জড়িত এই সন্দেহের জায়গা থেকে প্রতিশোধ হিসেবে পুলিনের ছেলে শ্যামলকে র‌্যাব দিয়ে হত্যা করানো হয়েছে কি?

জাহাঙ্গীর: হ্যাঁ, এটা অনেকেই মনে করিছে। জুয়েলের ধারণা তার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে পুলিন জড়িত ছিল।

নেসার: জুয়েল কি বিএনপি করত?

জাহাঙ্গীর: জুয়েল যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তখন সে সেই দল করিছে। প্রথম জীবনে মানে ছাত্রজীবনে সে জাতীয়তাবাদী ছাত্র দল করত। তারপরে নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ মানে এরশাদের দলে যায়। তাছাড়া, জুয়েল ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আসামি ছিল। এরপরে সে আবার আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। চারদল ক্ষমতায় আসার পরে সে আবার বিএনপিতে আসে। বর্তমানে সে যখন মারা গেছে, তখন সে বিএনপিতে ছিল। অর্থাৎ দল করার ব্যাপারে তার কোনো আদর্শ ছিল না। ক্ষমতা কুক্ষিগত করাটা ছিল জুয়েলের মূল বিষয়।

নেসার: এই অঞ্চলে চিংড়ি ঘের করার সময় সে নাকি অনেক জমি দখল করে নিয়েছে?

জাহাঙ্গীর: হ্যাঁ, এটা তো আছেই। এই যে দুধলায় গ্রামে তার মৃত্যুর আগে, মানে এক বছর পুরতিছে ঘেরটা হইছে। ইচ্ছা মতো সে দেড়দুইশত বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে। হারি দিলেও বেঁধেছে। না দিলেও বেঁধেছে। একদম ভয় দেখায়ে এটা নিয়েছে। তবে কিছু কিছু লোকের হারি দিয়েছে। সে যেহেতু ক্যাডার পুশে রাজনীতি করত। পুলিশ প্রশাসনের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল। ফলে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেনি। মূলত এসব ব্যাপারে প্রশাসন তাকে অনেক সহযোগিতা করেছে।

এমনকি এটাও এলাকার সমস্ত মানুষ জানে, তা হলো, ওই জায়গাটায় ওদের বাড়ি পার হয়ে পশ্চিম সাইডে ওখানে দুধলায় নামে একটা গ্রাম…, জুয়েলের বাড়ি তো দুধলায়তে। ওই দুধলায়ের পশ্চিম পাড়া বা বারই পাড়া। ওখানে জেলে সম্প্রদায়ের ও নমশূদ্র সম্প্রদায়ের বাস। ওটা একটা হিন্দু মহল। ওখানে কোনো মুসলমানের বাস নেই। এই সম্প্রদায়ের ওপরে জুয়েল ব্যাপক অত্যাচার করত। লোকমুখে যা প্রচারিত আছে, তা হলো, ওখানে অনেক নারীকে সে নির্যাতন করেছে; রাত্রে। এবং ওখানে যাওয়ার সময় সে একা যেত অস্ত্র নিয়ে। একাই যেত ওখানে আর আকামকুকাম করত। আর ভয় দেখাত। কেউ তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে অস্ত্রসহ ভয় দেখাত।

নেসার: জুয়েল কি ওখানেই মারা যায়?

জাহাঙ্গীর: হ্যাঁ, ওই গ্রামের মধ্যেই। একটা বাড়ির সামনেই মারা গেছে। এবং সে বাড়িটা ছিল এরকম, বাড়ির মূল পুরুষ কালা [কানে শোনে না], গৃহকর্তী সন্ধ্যার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়েন। বিদ্যুৎ নেই গ্রামে। আর ছেলেটার ঘের আছে বিলে, সে সন্ধ্যার আগেই ঘেরে চলে যায়। ওই বাড়িতে। আর জুয়েল যেদিন মার্ডার হয়েছে সেদিন এমপি সাহেবের উপস্থিতিতে মানে এমপি সাহেবের সামনে, ওসি আজম সাহেব, তার সঙ্গে ফোর্স ছিল ওখানে প্রায় ৮টা ৯টা বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালায়ে তছনছ করে দেছে। একদম ছাই ছাই করে দেছে। দুটোতিনটে গ্রাম্য মুদিখানার দোকানও ছিল; ওইসব দোকানপাট লুট করে ওখানে শ্মশান করে দেছে। ধরতে গেলে ’৭১ এর নির্যাতননিপীড়নও ফেল।

এমপির সামনে, প্রশাসনের সামনে মানে তাদের উপস্থিতিতে এ ঘটনাটা ঘটে। এরপরে ওই গ্রামে অনেক হিন্দু…, মানে আশপাশের গ্রামের অনেক পুরুষরা এখনো বাড়িতে আসেনি।

নেসার: যাক শ্যামলকে অ্যারেস্ট করেছিল কোন জায়গা থেকে?

জাহাঙ্গীর: শ্যামলকে অ্যারেস্ট করেছিল বিনের পোতা থেকে। ভিতর রাস্তায়। গাছায় যাওয়ার একটা ভিতর রাস্তা আছে, ওই রাস্তা থেকে।

নেসার: কারা করেছিল অ্যারেস্ট?

জাহাঙ্গীর: জানা গেছে র‌্যাবে করেছিল।

নেসার: তারপরে তাকে কোথায় নিয়ে যায়?

জাহাঙ্গীর: শোনা যায় খুলনাতে। খুলনায় র‌্যাবের যে হেড কোয়ার্টার ছিল, সেখানে। এই সংবাদটা জানা গেছে তিনদিন পরে। তার পূর্বে তো একটা আতঙ্কই ছিল। তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে মনে করে।

নেসার: মারা গেছে কত দিন পরে?

জাহাঙ্গীর: অ্যারেস্ট হওয়ার ৬ অথবা ৭ দিন পরে মারা হয়েছে। এবং ধরার তিনদিন পরে যখন ব্যাপারটা জানাজানি হয়েছে, তখন আমাদের অঞ্চলের আহম্মদ ভাইকে ডাকছিল র‌্যাবে। ডাকার পরে কী সব মিটিং সিটিং হয়েছে। সে ওখান থেকে মিটিং করে আসার দুই দিন পরে ক্রসফায়ারটা হয়েছে।

নেসার: শ্যামল কি দল করত?

জাহাঙ্গীর: না, দল করত শ্যামলের বাবা পুলিন। শ্যামল ব্যবসা আর ঘর সংসার করত। মূলত ওর বাবা দল করত। আর জুয়েলের বাবা মার্ডার হওয়ার কারণে, পুলিনের ছেলে হিসেবে শ্যামলকে ক্রসে দেয়া হয়েছে।

২৪ শে ডিসেম্বর, রোববার, ২০০৬ সাল, দুপুর ১টা ৩৫ মি. সাতক্ষীরা তালা থানা

মফস্বল সাংবাদিকদের ভাষ্য

সুমন

নাম শরিফুল্লা কায়সার সুমন। দৈনিক যায়যায়দিনের সাতক্ষীরা জেলার প্রতিনিধি। এবং মফস্বল নিউজ এডিটর, দৈনিক পত্রদূত সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত। আমি পেশাগতভাবেই সাংবাদিকতা করি।

নেসার: আমার প্রশ্ন হলো, দেশে চলমান যে, ক্রসফায়ার চলছে। সেখানে সাতক্ষীরাতেও দু’জন মারা গিয়েছে। এই ক্রসফায়ার ও মৃত্যুকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি।

সুমন: ক্রসফায়ার, আমরা যে যেভাবেই বলি না কেন? মানবাধিকারের কথা বলি আর অন্য কোনো প্রেক্ষাপটের কথা বলি; ক্রসফায়ারকে গ্রহণযোগ্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে একটা মানুষ তার যে কোনো অন্যায়, যে কোনো অপরাধের শাস্তি পেতে তার একটা বিচার ও তার একটা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিত। এবং তার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত।

আমি অন্য জায়গায় প্রেক্ষাপটের কথা বলব না। আমি আমার সাতক্ষীরা জেলার কথা বলব। সাতক্ষীরা জেলায় যে দুইজন নিহত হয়েছে, তারা আসলে সত্যিকার অর্থে সন্ত্রাসী কি না? সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই হত্যাকে কেন্দ্র করে, এই নিউজকে কেন্দ্র করে আমরা গিয়েছিলাম। তালার এই দুইটা অঞ্চলেই। দুইটা অঞ্চলে গিয়ে আমরা দেখেছি যে, একটা হচ্ছে খুবই দরিদ্র পরিবার। আর দুটো পরিবারই মাইনরিটি। হিন্দু পরিবার। তাদেরকে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের পরিচয় দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই পরিচয়টা কিন্তু তাদের বক্তব্য না। যারা নিহত হয়েছেন এটা তাদের কোনো পূর্ব ভাষ্যও না। আবার একই সঙ্গে এটা যে প্রতিবেশীরা দাবি করেছে সেটাও না। এই পরিচয়টি [জনযুদ্ধ] যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত র‌্যাব বা পুলিশ এদেরই বক্তব্য। এদেরই প্রেসনোটে দেয়া বক্তব্যই আজকে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে গোটা দেশের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে, তারা হচ্ছে এই রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং এরা সন্ত্রাসী। এদের নামে যে কোনো উল্লেখযোগ্য মামলা ছিল তাও না। আর কার্তিকের কথা বলতে গেলে বলতে হয় সে একজন ঋষি। ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষ, খুব দরিদ্র। তার স্ত্রী তো, শুধুমাত্র ভিক্ষা করেই এখন তার সংসার চালায়। আসলে আমাদের বিবেচনা করা উচিত ছিল অনেক আগে থেকেই। করবার সময় এসেছে আমি বলব না, অনেক আগে থেকেই বিবেচনা করবার দরকার ছিল যে, আমরা এ ধরনের হত্যাকাণ্ডগুলোকে কীভাবে গ্রহণ করব? আমরা এর প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ করতে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সত্যিকার অর্থে আজো দেখিনি।

আর না দেখার ফলেই এই ঘটনাগুলো ঘটে গিয়েছে নির্বিঘেœ। এটা নিয়ে সত্যিকার অর্থে কিছুই হয়নি। আর সাতক্ষীরাতে তালিকাভুক্ত যে সন্ত্রাসীদের সংখ্যা রয়েছে সেটি ১৫৯৬০। এটা হচ্ছে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। এছাড়া সন্ত্রাসীদের তালিকা আরো রয়েছে।

কিন্তু যে দুজনকে হত্যা করা হয়েছে তারা তালিকাভুক্ত ছিল না। তারপরেও তারা কিন্তু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। সাতক্ষীরায় যেসব খুবই আলোচিত হত্যাকাণ্ড হয়েছে অর্নব হত্যাকাণ্ড, সম আলাউদ্দিন হত্যাকাণ্ড, রিমু চৌধুরী হত্যাকাণ্ড, এভাবে সাতক্ষীরাতে অসংখ্য আলোড়িত হত্যাকাণ্ড রয়েছে। এদের হত্যাকারীরা কিন্তু কেউ ক্রসফায়ারের শিকার হয়নি। অর্থাৎ সাতক্ষীরাতে ক্রসফায়ারে যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের বাম ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত করেই করা হয়েছে। কিন্তু বিখ্যাত কিলার, বিখ্যাত অস্ত্রবাজ, বিখ্যাত চোরাকারবারি, এই জেলার শীর্ষ সন্ত্রাসী, গডফাদার এরা কেউ কিন্তু র‌্যাব বা পুলিশের গ্রেফতারের পর্যায়েও পড়েনি। এটাই হলো বাস্তবতা। ফলে আমি সাতক্ষীরার ক্রসফায়ারের ঘটনা দিয়ে গোটা দেশটার বিচার করি।

নেসার: আমার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা হলো, ক্রসফায়ারকেন্দ্রিক সংবাদের ক্ষেত্রে আমরা পত্রিকাতে দেখছি শুধু প্রেসনোট। বা রিপোর্টিঙের নামে র‌্যাব ও পুলিশের প্রেসনোট। একই সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই গল্প, একই ভাষ্য। এই যে সাংবাদিকতার নামে সরকারি প্রেসনোট প্রচার করা; এটাকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব?

সুমন: না, এটাকে আসলেই সাংবাদিকতা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কারণটা হচ্ছে আমরা যদি সাংবাদিকতার এথিক্সের কথা বলি, তাহলে, আমাকে স্পটে যেতে হবে। তাদের বক্তব্য নিতে হবে। আর যদি র‌্যাব বা পুলিশ বক্তব্য দিতে চায় এরা হচ্ছে পূর্ববাংলা, বা বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি বা জঙ্গি, এভাবে যাদের কথাই উল্লেখ করুক না কেন; তাদেরও একটা বক্তব্য থাকতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের কথা থাকতে পারে। প্রতিবেশীদের কথা থাকতে পারে। যেমন আমরা কার্তিক ঋষিদের পরিবারের কাছে গিয়েছিলাম কথা শুনতে। তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ভোরবেলা। তার কাছে কোনো অস্ত্র পায়নি। কিছুই পায়নি। তার ক্ষেত্রে যে এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারের কথা বলা হয় এটা কিন্তু সরাসরি এলাকাবাসী প্রত্যাখ্যান করেছে। তার পরিবার এ ভাষ্য প্রত্যাখ্যান করেছে। সবার জানা, তারা খুব দরিদ্র। মুচি সমাজের একদম নিরীহ মানুষ। তবে এলাকায় তার একটা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল মাত্র। ঋষি পাড়ায়, ঋষি মহলে তার একটা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল। একই সঙ্গে তার একটা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার কথা তারা কেউ বলেনি। এক্ষেত্রে তাদের বক্তব্যটা আসা বাঞ্ছনীয় ছিল। এটাই সাংবাদিকতার এথিক্সের মধ্যে পড়ে। এবং এটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সেদিক থেকে বলা যেতে পারে, সাংবাদিকতার এথিক্স ভায়লেট হয়েছে। অবশ্যই ভায়লেট হয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমরা এটাও বলতে পারি ইরাক যুদ্ধের সময় আমরা যেটা দেখেছি এমবেডেড জার্নালিজম। ওই মার্কিন সেনাদের ব্রিটিশ সেনাদের শয্যাসঙ্গী হিসেবে বেড মেট সাংবাদিকতার যে নতুন পথ রচনা হয়েছে। এক্ষেত্রেও আমি বলতে পারি যে, বেড মেটই শুধু নয় প্রেসনোটের একটা কালো দিক রচনা হয়েছে এর মধ্য দিয়ে। এটাকে হলুদ সাংবাদিকতা বলতে চাই না। এটা অবশ্যই বিকৃত সাংবাদিকতা। এক ধরনের বিকারগ্রস্ততা। আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভাষ্য আরো বাজে। ওটার কথা উল্লেখও করতে চাচ্ছি না।

৩১শে ডিসেম্বর, রোববার ২০০৬, দুপুর , ২টা ১২ মি. / সাতক্ষীরা

আবুল কালাম আজাদ

নেসার: আপনি আপনার নাম ও পেশার কথা আগে বলে নেন।

আজাদ: আমি আবুল কালাম আজাদ। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক পত্রদূত।

নেসার: সাতক্ষীরা থেকেই তো পত্রিকাটা প্রকাশিত হয়?

আজাদ: হ্যাঁ। সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৫ সাল থেকে পত্রদূত প্রকাশিত হচ্ছে। এবং আপনি তো জানেন এই পত্রিকার সম্পাদক স ম আলাউদ্দিন সাহেব, তিনি তার পত্রিকা অফিসেই কর্মরত অবস্থায় ঘাতকের গুলিতে প্রাণ হারান। ওই ঘাতকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী এ অঞ্চলে। আজকে তারা মিডিয়াকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। এই চেষ্টা তাদের দীর্ঘদিনের। যখন তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু হলো, লেখালেখি চলছে, সেই সময় থেকে তারা প্রেসকে কন্ট্রোল করার জন্য বিভিন্ন রকম তৎপরতা শুরু করে। সেই তৎপরতার অংশ হিসেবে তারা নিজেরাও দুইতিন বছর যাবৎ একটা পত্রিকা বের করছে।

এখন প্রশ্ন হলো দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে। আমাদের সাতক্ষীরা শহর থেকে ভারতীয় সীমান্ত হচ্ছে ৯ থেকে ১০ কিলোমিটার। কোথাও ১৪ কিলোমিটার। অতি অল্প দূরত্বের কারণে এখনকার সন্ত্রাসীরা সহজে ভারতে যেতে পারে। আবার ভারত থেকে চলে আসতে পারে। অস্ত্র সংগ্রহ করা তাদের জন্য খুবই সহজ ব্যাপার। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে আগ্নেয়াাস্ত্রের ঝনঝনানি এই এলাকায় আছে।

আবার যদি আমরা আর একভাবে বলি, তা হলো, পানি ছাড়া যেমন মাছ থাকে না, মাছ বাঁচতে পারে না, তেমনি এখনকার প্রভাবশালী, সরকারি দল বা বিরোধী দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বা তাদের ছত্রছায়াতেই এইসব চরমপন্থী দল পরিচালিত হয়। আমাদের এখানে এটা ওপেন সিক্রেট ব্যাপার।

গত দুই বছরে আমাদের কাছে অন্তত পক্ষে ১৫ বার চিঠি দেয়া হয়েছে। আমার অফিসে, আমার কাছেই ১৫ বার চিঠি দেয়া হয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। এটা করেছে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম.এল) জনযুদ্ধ। প্রথম যখন চিঠি আসল; অর্থাৎ আঞ্চলিক কমান্ডার তুষার এবং গফফারের বরাতে। এটা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলো। ন্যাশনাল পত্রিকাগুলোতে ঘটনাটি কভারেজ পেল। টেলিভিশন মিডিয়াতেও প্রচার হলো সংবাদটা। এরপরে পুলিশ তৎপর হলো। পুলিশি তৎপরতার পরে গফফার ওরফে তুষার অ্যারেস্ট হয়ে গেল। কলারোয়া থেকে। একজন চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে। সেই চেয়ারম্যানকে পুলিশ ধরার চেষ্টা করেও ধরল না। কারণ ওই চেয়ারম্যান ওখানকার যে এমপি সাহেব; তার ডান হাত বাম হাত হিসেবে সবাই চেনে।

নেসার: কোন দলের এমপি?

আজাদ: এমপি, বিএনপির। এমপি হাবিবুল ইসলাম সাহেব। যাক গফফার অ্যারেস্ট হয়েছে। গফফার জেলে আছে। কিন্তু সেই রকিব চেয়ারম্যান, যার বাড়ি থেকে সে অ্যারেস্ট হয়েছে। সেই রকিব চেয়ারম্যান কিন্তু গ্রেফতার হয়নি। পরে এটা নিয়ে আর কোনো তদন্ত হয়নি। এরপরে অসংখ্যবার আমাদেরকে চিঠি দেয়া হয়েছে। আমাদেরকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। টেলিফোন করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো সময় নিউজের প্রতিক্রিয়াতে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিরাও চরমপন্থীদের নাম করে হুমকি দিচ্ছে। দিয়ে থাকে। এখন এখানে একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে, আসলে এই যে অব্যাহতভাবে সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং যারাই এই তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত সেই সমস্ত চরমপন্থী, মানে আমরা যাদেরকে চরমপন্থী বলছি, দিনের বেলায় যাদেরকে চরমপন্থী বলছি, রাতের বেলায় তারা চরমপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই জানি। দিনের বেলা কিন্তু এরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আছে। যারা বর্তমানে সরকারে আছে, অতীতে সরকারে ছিল। তাদের কোনো না কোনো দলের সঙ্গে এই চরমপন্থীরা আছে। দিনের বেলায় তাদেরকে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টি বা আদারস কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবেই কিন্তু আমরা চিনতে পারি। এটা একদম দিবালোকের মতো পরিষ্কার বিষয়।

এদের দ্বারা প্রকাশ্যে ঘটনা ঘটালেও এদের কিছু হয় না। এদের নাম কেউ বলতে পারে না। কারণ নাম বলে কোনো লাভ হয় না। নাম বললে পুলিশের দিক থেকেও অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা, ভয়ভীতি, হুমকিধামকি দেয়া হয়। আবার তারা দিনের বেলায় যে দলটা করে, সেই দলের দিক থেকেও একটা চাপ তো থাকে। এবং যারা এটা প্রতিবাদ করবে, তাদেরকে সাপোর্ট করার মতো বর্তমানে কেউ নাই।

এমনকি আমরা যারা সংবাদপত্রের সঙ্গে আছি। আসলে এটা বলতে বাধা নেই; অধিকাংশ সংবাদপত্রই, মানে যারা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে; তার পাশে যে দাঁড়ানো দরকার; আজকের দিনে আমাদের সাংবাদিকরাও তা মনে করে না। করছে না। বা করতে পারছে না বিভিন্ন কারণে। ফলে এর মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি তৈরি হয়ে যাচ্ছে; আজকে আলাউদ্দিন সাহেবের হত্যা মামলার আসামিদের কারো কোনো সাজা হয়নি। আলাউদ্দিন সাহেবের হত্যা মামলার আসামি কিসলু, এর আগেও একাধিক হত্যা মামলায় তার যাবজ্জীবন জেল হয়েছে। সাজা হয়েছে। তাদের পরিবারের একাধিক ব্যক্তির যাবজ্জীবন জেল হয়েছে। তাদের বাড়ি থেকে অসংখ্য অস্ত্র উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। তারপরেও তারা প্রকাশ্যে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইলেকশন করছে। মেম্বার হচ্ছে। কমিশনার হচ্ছে। দুই ভাই এবার এমপি ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছে। এগুলো কিন্তু একদম প্রকাশ্য ব্যাপার।

আমি নীতিগতভাবে ক্রসফায়ারকে একদমই সাপোর্ট করি না। কিন্তু আজকে মানুষের মধ্যে ধারণা হয়েছে এদের তো বিচার হবে না। এদের ক্রসফায়ারেই যাওয়া উচিত।

পাশাপাশি ইরাক যুদ্ধের পরে তো আসলে বিশ্বব্যাপী যে মানবাধিকার আন্দোলন ছিল সেটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। মুখ থুবড়ে পড়ার মধ্য দিয়ে সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসি হয়েছে। এই যে ভিন্ন একটা দেশে গিয়ে, চেপে বসে, আমেরিকা যে কাজটা করল? এরপরে তো আসলেই মানবাধিকারের প্রশ্নটি গোটা বিশ্বব্যাপী আর নেই। বিশেষত আমেরিকার ইরাক দখলের পর থেকে। এই যে সামগ্রিক একটা ব্যাপার…, তার সঙ্গে আমাদের দেশে কোর্টে গেলে বিচার হয় না। কোর্ট পর্যন্ত যাওয়া যায় না। মামলার একটা সাধারণ এজাহার করতে গেলে ১৫ দিন ঘুরতে হয়। ঘুষ দিতে হয়। তারপরেও পুলিশ এজাহার নেবে কি নেবে না; তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। এরপরেও মামলা গ্রহণ করলে আসামিদের হুমকিধামকি রয়েছে। তারপরে যখন কোর্টে যাচ্ছে, সেখানে ন্যায় বিচার হচ্ছে না। বিচার বিভিন্নভাবে কেনা বেচা হচ্ছে। সবকিছুই আজকে প্রকাশ হয়ে পড়ছে। এতে করে স্বাভাবিকভাবে মানুষের মধ্যে কিন্তু একটা জায়গা তৈরি হয়ে গিয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। যে, আসলে ক্রসফায়ার আমরা সাপোর্ট করি আর না করি; আমার দিক থেকে এ ধরনের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সাপোর্ট করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের পজিটিভ জায়গা তৈরি হয়ে গেছে। দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। গোটা দেশ জুড়ে রাজনীতির নামে যে অনাচার চলছে। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের যে সংকট ইত্যাদি মিলিয়ে সৃজনশীল চিন্তাভাবনা কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি না। এটা আমাদের বড় ব্যর্থতা। আর সেই ব্যথর্তার জায়গা থেকে এধরনের একটা অমানবিক, অবৈধ, আইন বহির্ভূত কার্যক্রমকে মানুষ সাপোর্ট করে যাচ্ছে।

নেসার: আপনি যে কিসলুদের কথা বললেন। ওরা কোন দল করে?

আজাদ: আওয়ামী লীগ।

নেসার: আপনাদের সাতক্ষীরা অঞ্চলে ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয়েছে কয় জনার?

আজাদ: আমার জানামতে দুই জনার। প্রথমে কার্তিক ঋষি এবং নেকস্ট টাইমে শ্যামল।

নেসার: এবার আমার প্রশ্ন হলো, আপনি এতক্ষণ আপনার আলোচনায় জেলা সাতক্ষীরায় সন্ত্রাসের উদ্ভব, বিকাশ এবং সীমান্ত শহরের নানা প্রভাব আলোচনা করেছেন। কয়েকজন বিখ্যাত সন্ত্রাসীর নাম বলেছেন। তাদের এমপি প্রার্থী হওয়ার কথাও জানাচ্ছেন। কার্তিক ঋষি তো একজন মুচি। এবং আমাদের সমাজের সবচেয়ে নীচু বর্ণের ও আয়ের মানুষ। এবং তার সঙ্গে শ্যামল। ওরা কি আসলেই ওই মাপের কোনো সন্ত্রাসী ছিল? সমাজের উপরে তাদের ‘অবৈধ’ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কতটা?

আজাদ: কার্তিক ঋষি, মানে গ্রামের একজন সাধারণ ঋষি বা মুচি। আমি যতদূর জানি, মানে আমি ব্যক্তিগতভাবে, আমার রিপোর্টারদের কাছ থেকে যতটা খোঁজ খবর নিয়েছি; যেহেতু এটা সাতক্ষীরা অঞ্চলে প্রথম ক্রসফায়ার। ফলে অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি। কথাবার্তা বলতে হয়েছে। তার মধ্য থেকে আমরা যে তথ্য পাই, তাতে তার বাড়িতে মাঝেমধ্যে যাতায়াত করত চরমপন্থীরা। সেও মাঝেমধ্যে ওদের সঙ্গে ঘোরাফিরা করত। এই পর্যন্তই। তার বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারে দেয়ার মতো কোনো অভিযোগ…, মানে ক্রসফায়ারে দেয়ার এখন যে মানদণ্ড করেছে সরকার সেটা হলো তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকতে হবে, যে অভিযোগের বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। অন্তত পক্ষে দুইটা মার্ডার কেস থাকতে হবে। আমার জানা নেই আসলে কার্তিক ঋষির ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো বাস্তবতা আদৌ ছিল কি না?

এক্ষেত্রে আমার নিজের মতামত হচ্ছে যে, আরো একদুই হাজার সন্ত্রাসীর ক্রসফায়ারের পরে, মানে সাতক্ষীরায় যদি সব থেকে বড় টপ র‌্যাংকের সন্ত্রাসীদের তালিকা করা হয়, তাহলে, এক হাজার ১ নাম্বারে গিয়েও কার্তিক ঋষির নাম পড়বে কি না সন্দেহ। কার্তিক চরমপন্থী দলের সঙ্গে ছিল বিধায় সন্ত্রাসী নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমাদের এখানে তার চেয়ে তার বাবাদাদাঠাকুরদা, এরকম বড় বড় সন্ত্রাসী আছে আরো এক হাজার।

আর শ্যামলের যে ব্যাপার, ওর ব্যাপারেও আমরা যতদূর খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছিজেনেছি; মূলত শ্যামলের বাবা পুলিন হচ্ছে একজন চরমপন্থী। পুলিন এক সময়ে তার ইউনিয়নের মেম্বারও ছিল। শ্যামল মার্ডার হওয়ার আগের থেকেই আমরা পুলিনের নামটা জানি। পুলিন অস্ত্রধারী ব্যক্তি। তার কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে। ইতিপূর্বে সে সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে অবৈধ অস্ত্র জমা দেয়। সেক্ষেত্রে পুলিন ওখানকার নামকরা যে সব টেরর আছে, যে চরমন্থীরা আছে তাদের ২০৫০ জনের মধ্যে একজন হবে। পুলিনকে সবচেয়ে বড় বলব না। তবে ২০৫০ জনের মধ্যে পুলিন একজন হতে পারে।

কিন্তু ওই পুলিনের ছেলে আপনার শ্যামলকে, ওই শ্যামলকে প্রথমে একটা মার্ডার কেসের আসামি করা হয়েছিল। লক্ষ্মীকান্ত মার্ডার কেস। লক্ষ্মীকান্ত যখন মার্ডার হয়েছে, তখন শ্যামলের বয়স ছিল সম্ভবত, আমি লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তখন ওর বয়স ছিল ১০১১ বছর। শ্যামলের বয়স। এবং ওই মামলায় এফআইআরএ তার নাম ছিল না। পরবর্তীতে চার্জশিটে তার নামটা আসে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে ওখানে ওভাবে যাইনি। কিন্তু আমাদের লোকাল রিপোর্টাররা এই নিয়ে বেশ কিছু রিপোর্ট করেছে। অনেক রিপোর্ট আমরা ছেপেছি। অনেক রিপোর্ট আমরা ছাপতে পারিনি। সামগ্রিকভাবে খোঁজ খবরের যে বিষয়টি সেটা একই ব্যাপার। কার্তিক ঋষির চেয়ে সে বড় মাপের কিছু ছিল না। তবে নিঃসন্দেহে তার পিতা একজন বড়।

নেসার: মানে সন্ত্রাসী !

আজাদ: হ্যাঁ সন্ত্রাসী।

নেসার: এখন আমার প্রশ্ন হলো যে রাজনৈতিক দলগুলোকে আপনি চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী বলছেন তারা কিন্তু সেটা দাবি করে না। তারা নিজেদেরকে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে মনে করে।

আজাদ: আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে…, প্রায় ১৫২০ বছর আমি রাজনীতি করেছি। স্টুডেন্ট পলিটিক্স থেকে শুরু করে পরবর্তীতে এখানে অনেকগুলো গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ছিলাম। এবং বামপন্থী যে রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশে আছে তার মধ্যে মোটামুটি সবাই আমাদের দলকে চেনে, ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গেই আছি। আমি দীর্ঘদিন ছাত্রমৈত্রীর সেন্ট্রাল কমিটি, যুব মৈত্রীর সেন্ট্রাল কমিটির সঙ্গে ছিলাম।

আমি নিজেও জেলে ছিলাম। জেলে থাকাকালীন সময়ে এসব দলের অনেক বড় নেতাকে দেখেছি। সেই সময় তবু কিছু আদর্শবোধ, চেতনাবোধ এদের মধ্যে ছিল। এরা হয়ত তখন ওই মার্ক্সবাদের অ আ ক খ জাতীয় কিছু বইটই পড়ার পর কিছু হয়ত বুঝেছে। বড় বড় নেতা তারা। আমরা যখন রাজনীতি করতাম, স্টুডেন্ট পলিটিক্স করতাম, সেই সময়ের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি যে, আমাদের কলেজ লেভেলের সাধারণ কর্মীরা বামপন্থী রাজনীতি সম্পর্কে যতটুকু সচেতন ছিল; সেখানে ওদের জেলা কমিটি বা বিভাগীয় কমিটির অনেক নেতাদের সঙ্গে আমার কমবেশি পরিচিতি ছিল। তাদের কিন্তু ওই রাজনৈতিক মান ছিল না। ওর ধারে কাছেও ছিল না। তারা গল্প শুনতে আসত। তারা আমাদের কাছে গল্প শুনতি আসত। আমরাও যে ব্যাপক কিছু জানি তা না। আমরাও অল্প পড়াশোনা করেছি।

আর এখন বর্তমানে যারা আছে এরা ওই মাওবাদী, মাওসেতুং কোন দেশের বিপ্লবের নেতা? এটাও বলার মতো ৯০ ভাগ, মানে এখন যারা আছে তাদের ৯০ ভাগ বলতে পারবে না। মাওসেতুং এর নেতৃত্বে কোন দেশে বিপ্লব হয়েছে এ কথা; লংমার্চ কোন দেশে হয়েছে [হাসি] এ কথা এরা বলতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।

এরা দিনের বেলা, আমরা সবাই জানি; আমি যেটা আগেই বলেছি; এরা দিনের বেলা প্রকাশ্য কোনো না কোনো শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দল করে। আর এই দলেরই অস্ত্র নিয়ে রাত্রিবেলায় এরা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি এসব কিছু করে বেড়ায়। আর কিছু আপনার কমন লিফলেট আছে। আমি দেখেছি, খুলনা অঞ্চলে যতগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পরে যে লিফলেটগুলো দেয়া হয়েছে তার ম্যাক্সিমাম লিফলেটেই একই বক্তব্য প্রায়। শুধু নাম, ঘটনার স্থান, সময় কিছুটা এদিকওদিকে হয়ত, কিছু ১৯২০, ১৮১০, ১৫২০ এর বেশি ডিফারেন্স ওই ফিফলেটগুলোয় থাকে না। অর্থাৎ একটা লিফলেট লেখার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন লোক এদের মধ্যে কয়জন আছে? তারপরেও থাকতে পারে দুই একজন। একদম মতাদর্শিক লিডার থাকতে পারে দুই একজন। থাকতে পারে, যারা হয়ত জানে। কিন্তু রুট লেভেলে যারা কাজ করছে। মার্ক্সবাদ সম্পর্কে লেনিনবাদ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা আছে কি না সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

নেসার: দেখুন আমি আপনার আলোচনার প্রেক্ষিত ধরে বরং আর একটু ভিন্নভাবে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। প্রথমত ক্রসফায়ার সম্পর্কে রাষ্ট্রের ঘোষিত সিদ্ধান্ত ছিল সন্ত্রাস নির্মূল করার। এখন ধরুন সন্ত্রাসীরা জাতীয় পার্টির মধ্যে আছে। আওয়ামী লীগের মধ্যে আছে। বিএনপির মধ্যেও আছে। জামায়াতের মধ্যেও আছে। কিন্তু ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে দেখা গেল এসব কোনো দলের কোনো সন্ত্রাসীরা কিন্তু টাগের্ট নয়। এবং আপনিও যেটা বললেন, সাতক্ষীরাতে যদি ক্রসফায়ার দিতে হয়, তাহলে, এক হাজার জনের পরে কার্তিক ঋষির নাম আসে। সুতরাং যাদের টার্গেট করা হয়েছে আমরা স্বীকার করি আর না করি, আমরা স্বীকৃতি দেই আর না দেই, সরকারসহ সবাই যাদেরকে চরমপন্থী বলছে; প্রধানভাবে সেই মাওবাদীদেরকেই। তাদেরই হত্যা করা হচ্ছে। এখন ধরুন রাষ্ট্রের নিজস্ব বিচার বিভাগ আছে। আইন আছে। সংবিধান আছে। তার নীতিনৈতিকতা ও লজিক আছে। প্রতিদিন নিত্য নতুন লজিক উৎপাদনপুনরুৎপাদনের জন্য প্রতিষ্ঠানও আছে। প্রচার মাধ্যম আছে। বিশাল আমলা ও সেনাবাহিনী আছে। এত কিছু আয়োজন থাকার পরেও কার্তিক ঋষি কেন এবং কোন যুক্তিতে রাষ্ট্রের কাছে এত বড় থ্রেট হয়ে উঠেছে? যে তাকে বিনা বিচারে হত্যার পথ ধরতে হয়েছে? আর এই হত্যাকাণ্ডকে আমরা কীভাবেই বা মূল্যায়ন করব?

আজাদ: দেখেন আমি তো সেটা প্রথমেই বলেছি। এটা সম্পূর্ণই বেআইনি একটা বিষয়। ক্রসফায়ারকে বৈধ বলার কোনো সুযোগ নাই। এটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট একটা বেআইনি ব্যাপার। এটা এক কথায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।

নেসার: এটা তো একটা দিক। বিপরীতে প্রধান প্রধান দলের বিখ্যাত সব সন্ত্রাসীদের জীবিত রেখে এদেরকেই শুধু হত্যা করা হচ্ছে কেন?

আজাদ: একচেটিয়া একটা আধিপত্য তৈরি করার জন্য। এটা তো অবশ্যই। আজকে ধরেন যাদের মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক চেতনা আছে, যদিও আমি আগেই বলেছি এদের অধিকাংশের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক বোধ নাই। তারপরেও দুই একজনের মধ্যে যেটুকু আছে। সেটাকে আজ যদি নির্মূল করে দেয়া যায়, তাহলে, এই চেতনার ধারাটা শেষ হয়ে যাবে। ধারাটা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। কারণ বর্তমান জেনারেশনের মধ্যে, মানে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে আমরা তো আর রাজনীতি জানার মানুষ পাচ্ছি না। বর্তমানের ছাত্র রাজনীতি আর সেই জায়গায় নাই। রাজনীতিতে পড়াশোনার জায়গাটা শেষ হয়ে গেছে। আদতেই সেই বাস্তবতাটা আর নাই। অর্থাৎ এখন পরিস্থিতি এমনই যে, নতুন করে কর্মী তৈরি হওয়ার সেই মাত্রায় সুযোগ নাই। নতুন করে প্রজ্ঞাসম্পন্ন বামপন্থী নেতা পাওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু নাই। এখন পুরাতন যারা আছে, তাদের মধ্যে অনেকের পড়াশোনা আছে। কারো জানাবোঝা ছিল। কারো অভিজ্ঞতা ছিল। এগুলো মিলেমিশে কিন্তু একটা শক্তি। ফলে এজাতীয় লোকদের যদি শেষ করে দেয়া যায়, তাহলে, এক্ষেত্রে আপনার একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করা যাবে। অর্থাৎ আপনি যেটা বললেন, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির কোনো সন্ত্রাসীকে তো ক্রসে দেয়া হচ্ছে না। এদের দেয়া হচ্ছে না, কারণ সমাজে এদেরই আধিপত্য তৈরি করার জন্য জায়গা তৈরি করা হচ্ছে।

নেসার: এবার আমার প্রশ্ন হলো ক্রসফায়ার সংক্রান্ত রিপোর্টিঙের ক্ষেত্রে স্থানীয় পত্রিকা থেকে শুরু করে জাতীয় পত্রিকা পর্যন্ত আমরা একটা ঘটনা দেখছি। পুলিশের ভাষ্য অথবা র‌্যাবের ভাষ্য অথবা গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য দিয়ে রিপোর্টগুলো ছাপা হচ্ছে। মফস্বল সাংবাদিকদের এই যে রিপোর্টের ধরন, এটাকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি?

আজাদ: না, এক্ষেত্রে আমরা একশোভাগ ব্যর্থ রিপোর্টার। রিপোর্টাররা ব্যর্থই শুধু না…, আমি প্রথমেই আপনাকে যেটা বলেছি এখানে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে এমন এক ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। এই ভীতিকর অবস্থার সুযোগটা নিয়েছে যারা আজকে ক্রসফায়ার করছে, তারা। আজকে সরকার তাদের সঙ্গে নিয়ে এই সুযোগটা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে, আমি ইচ্ছা করলেও র‌্যাব অমুককে গুলি করে হত্যা করেছে বা পুলিশ অমুককে গুলি করে হত্যা করেছে একথাটা আর বলতে পারছি না। এই কথাটা যখন আমি বলব, তখনই আমার উপরে আর একটা প্রেসার আসবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের কথাবার্তা হয়। তারাও আমাদেরকে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে। আপনারা তো এদের কারণেই নিরাপত্তাহীন। এক্ষেত্রে আমি মনে করি না দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে যতগুলো সাংবাদিক মারা গেছে; এর সাথে চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা ছিল। তারা দায়দায়িত্ব স্বীকার করুক আর না করুক, এই সব হত্যাকাণ্ডের কোনোটারই সাথে চরমপন্থী কোনো রাজনীতির সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না। এই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যেকটা ঘটেছে কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। এখানে প্রেস ক্লাবের নির্বাচন আছে। চোরাচালানের ব্যাপার আছে। মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখালেখির বিষয় আছে। আরো আছে রাজনীতির বিষয়। এরকম অনেকগুলো ব্যাপার আছে। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে চরমপন্থীদের নাম ব্যবহার হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কোনো কোনো গ্রুপ যুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু নানামুখী প্রচারণায় তাদের নাম এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে সাংবাদিকদের মধ্যে একটা ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে অনেকেই উৎসাহ বোধ করছেন না। আবার অনেকেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে এই হত্যাকাণ্ডের স্বীকৃত দিচ্ছে হয়ত বা [এসময় একজন সংবাদকর্মী এসে পড়ায় আলোচনায় ছেদ পড়ে]

নেসার: হ্যাঁ, যা বলছিলেন? সাংবাদিকরা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে অনেক মারা গেছে। আপনাদের অনেকের জীবননাশের হুমকি দিয়েছে। এটা তো একটা দিক। তারপরেও তো কথা থাকে। প্রথমত সাংবাদিকতা একটা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। দ্বিতীয়ত ওই ঝুঁকির মধ্যেও তাদেরকে অ্যাথিক্যাল দিকটা রক্ষা করে চলতে হয়। এটাই তো সাংবাদিকতা। সে ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মতামত নেয়া। ঘটনাস্থলে যাওয়া। তার ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করা। সেটা কিন্তু মফস্বলের সাংবাদিকরা করতে পারেনি। বরং সরকার ক্রসফায়ার কেন্দ্রিক যে ন্যায্যতা দাবি করেছে, আপনারা কিন্তু সাংবাদিকতার নামে সরকারি সেই ন্যায্যতার শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন।

আজাদ: হ্যাঁ। এই অবৈধ কাজকে আমরা বৈধতা দিয়ে দিয়েছি। সরকারের ওই তথাকথিত বক্তব্য প্রচার করার মাধ্যমে। এটা ঠিকই। এটা তো আসলে আমি যেটা বললাম, সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে এক ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয় রয়েছে। এমনকি আপনিও জানেন, আপনার খুলনায় একজন সাংবাদিকের উপরে গ্রেনেড হামলা হলো। পরবর্তীতে দেখা গেল পুলিশের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে ইনভল্ব। সে পুলিশ কর্মকতা পরবর্তীতে অ্যারেস্ট হয়ে গেল।

এখন ধরেন আমাদের সাতক্ষীরায় স ম আলাউদ্দিন সাহেব নিহত হয়েছেন। এই পত্রদূত পত্রিকারই সম্পাদক। পত্রদূত পত্রিকার সম্পাদক নিহত হওয়ার পরে কিন্তু ওই একই ভাষ্য। বেশ কিছু সাংবাদিক, বেশ কিছু সংবাদপত্র চরমপন্থীদের কাজ, এভাবে লেখালেখি করা শুরু করে দেয়। কিন্তু যেটা আমাদের কাছে দিবালোকের মতো সত্য, আমাদের সামনেই তো ঘটনা ঘটল। আমরা সেখানে উপস্থিত; সেখানে কারা ছিল, কার গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, কে দৌড় মারল? আমরা দেখছি কিছু প্রভাবশালী চোরাকারবারি গডফাদার এখানে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। আমাদের এই প্রত্যক্ষ এভিডেন্স থাকার পরেও; আমাদের এখানে কিছু সাংবাদিক সেদিন চেষ্টা করেছিলেন এটা চরমপন্থীদের প্রতিশোধ এদিকওদিক বলার। এবং দুই একটা পত্রিকায় সে সময় এরকম দুইএকটা নিউজও ছেপেছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক মুভমেন্ট হওয়ার ফলে এটাকে আর ওই চরমপন্থীদের তৎপরতা বলে, এই মামলার প্রকৃত হত্যাকারীদের আড়াল করার চেষ্টা সফল হয়নি।

কিন্তু সাতক্ষীরার বাইরে যে সাংবাদিকদের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তার অধিকাংশইহয়ত বা চরমপন্থীদের ব্যবহার করা হতে পারে; কিন্তু আজকে মানিক সাহা, সে বাম রাজনীতির বড় শত্রু হয়ে গেল এটা কেমন কথা? সাংবাদিক ছাড়া কি আমাদের অঞ্চলে বড় কোনো শ্রেণীশত্রু নাই? বরং সাধারণ মানুষের পক্ষে যদি কিছু লেখালেখি করে থাকে তো এরাই করেছে। আজকে যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এরাই করেছে। আসলে এখানে কিছু বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। চরমপন্থী নামটা ব্যবহার হলে পুলিশও একটু সুবিধা পায়। পুলিশ বেশ সুবিধা পায়। যেহেতু চরমপন্থীরা করেছে ফলে যে কোনোভাবেই তদন্ত করে ছেড়ে দেয়া যায়। অ্যাভিডেন্সের আর দরকার হয় না। ১৬১ ধারায় নিজেরাই থানায় বসে একটা চার্জশিট তৈরি করে দিতে পারে। আসলে প্রভাবশালীদের মৃত্যু হলে পুলিশকে যে ধরনের আন্দোলন সংগ্রামের মোকাবেলা করতে হয়; সেই ধরনের আন্দোলনসংগ্রাম ফেইস করতে হয় না চরমপন্থীদের নামটা দিলে। আর চরমপন্থীদের হয়ে কেউ না কেউ তো ফোন করছে। ফ্যাক্স পাঠাচ্ছে। আর এভাবেই জিনিসগুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ফলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই সব সাংবাদিকদের হত্যাকাণ্ড ঘটনাগুলোর সাথে তাদের লেখালেখি কেন্দ্রিক বিরোধ রয়েছে সমাজের প্রভাবশালীদের সাথে। আরো অন্যান্য বিরোধও আছে। যার সাথে চরমপন্থী রাজনীতির কোনো বিরোধ আছে বলে আমি মনে করি না। এই সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে আমি বলতে চাচ্ছি, ক্রসফায়ার নামে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত স্বরূপ আমরা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি।

নেসার: আমাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আজাদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

৩০শে ডিসেম্বর, শনিবার ২০০৬ সাল। সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মি. সাতক্ষীরা

Advertisements
মন্তব্য
  1. চলুক। মন্তব্যের ভাষা নাই।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s