মার্কিন জেল পরিষেবা – এক অন্ধকারের গল্প

Posted: জুলাই 2, 2014 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

 

লিখেছেন: সব্যসাচী গোস্বামী

private-prisons-for-profitদুনিয়ার দিকে দিকে গণতন্ত্রের ঠিকাদার হয়ে বসে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ঘেষা প্রচারমাধ্যমগুলোও মার্কিনি গণতন্ত্রের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, অথচ মার্কিন জেলগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে যে সেখানে কি ব্যপক পরিমানে মানবাধিকারকে পদদলিত করা হয়। এ এমনই এক দেশ, যেখানে কারান্তরালে রয়েছেন প্রায় ২৫ লক্ষ সেই দেশেরই সহনাগরিক। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। প্যারোল এবং প্রবিশন ধরলে সংখ্যাটা আরো বেশি। জনসংখ্যার শতকরা ৩.২ শতাংশ। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বলা যায়, প্রতি ৩১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকের মধ্যে অন্ততঃ একজন জেলে আছেন! পৃথিবীর বন্দী সংখ্যার ২৫ শতাংশই মার্কিনি বন্দী। ক্যালিফোর্ণিয়ার প্রিজন ফোকাসের মতে “মানব সমাজের ইতিহাসে আর কোন সমাজে এত বেশি সংখ্যক সহনাগরিককে বন্দী করে রাখা হয়নি”। ইন্টার ন্যাশানাল সেন্টার ফর প্রিজন স্টাডিজের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যা অনুপাতে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ বন্দী আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতি লাখে ৭১৬ জন। এই অনুপাতে দ্বিতীয় স্থানে আছে রাশিয়া। প্রতি লাখে ১২১ জন (ভারতও অবশ্য পিছিয়ে নেই সারা বিশ্বে বন্দী সংখ্যার নিরিখে ভারতের স্থান পঞ্চম!)। কালো চামড়ার মানুষরা আমেরিকায় জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ, অথচ মোট বন্দীদের ৬০ শতাংশই হলো কালো চামড়ার মানুষ। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী আফ্রোআমেরিকান পুরুষদের প্রতি তিনজনে একজন, কোন না কোন ক্রিমিনাল জাস্টিস সুপারভিশনের আওতায় আছেন। ৩০ বছর বয়সী কৃষাঙ্গ পুরুষদের প্রতি ১০ জনে ১ জন জেলে আছেন। বন্দিদের অনুপাত দেখলেই তথাকথিত ‘সভ্য’দের বর্ণবিদ্বেষ চোখে পড়বে। পরিসংখ্যান বলছে ১ কোটি ৪০ লক্ষ শ্বেতাঙ্গ এবং ২৬ লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ মাদকাসক্ত, অর্থাৎ মাদকাসক্তের অনুপাতে শ্বেতাঙ্গরাই অনেক বেশি। প্রায় ৫ গুণ বেশী। অথচ মাদক সংক্রান্ত মামলায় শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় ১০গুন বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ জেলে বন্দী!

এখানে চালু একুশে আইন

অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতে মার্কিন বিচার ব্যবস্থায় তিনটি খুব বড় দূর্বলতা রয়েছে – ১) এটা বড় বেশি সংখ্যক মানুষকে বড্ড বেশি দিনের জন্য জেলে রাখে। ২) এরা এমন বহু কাজকে অপরাধ বলে চিহ্নিত করে, যেগুলো আদৌ অপরাধ নয়। ৩) এই বিচার ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি আদৌ বোঝা যায় না।

মার্কিনি আইনগুলো, বিশেষতঃ ফেডারেল আইনগুলো এতো অস্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে যে, নাগরিকরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে আদৌ তারা আইনভঙ্গ করছেন কিনা!

আইনে, সাজার প্রশ্নেও রয়েছে ব্যপক তারতম্য ও বৈষম্য। যেমন ৪ আউন্স মারিজুয়ানা (এক ধরণের নিষিদ্ধ মাদক) সহ ধরার পড়ার সাজা টেক্সাসে ২ বছরের জেল, একই পরিমান মারিজুয়ানার জন্য নিউইয়র্কে সাজা হলো কমপক্ষে বাধ্যতামূলক ১৫ বছর জেল! ১৩ টা প্রদেশে চালু হওয়া থ্রিস্ট্রাইকস্‌ আইন যার বলে কোন নাগরিক তিনটে মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে আজীবন জেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে তা কার্যকর করতে ২০টা নতুন ফেডারেল জেল চালু করা হয়েছে। এই অদ্ভুত আইনে একজনকে ২বার সাইকেল চুরি এবং একবার গাড়ি চুরির অপরাধে ২৫ বছর সাজা দেওয়া হয়েছে, এমনও উদাহরণ আছে।

জেল বেসরকারিকরণ

গ্লোবাল রিসার্চ সেন্টার জানাচ্ছে, মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রে এক নতুন ধরণের মানব শোষন চালু হয়েছে। এখানে জেলগুলি তুলে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি কর্পোরেট পুঁজির হাতে। এটাকে বলা হচ্ছে ‘জেল ইন্ডাস্ট্রি’। সরকার ন্যুনতম চুক্তির বিনিময়ে এগুলো তুলে দিচ্ছে বেসরকারি ধনকুবের মালিকদের হাতে। তারা সাধারণ বন্দীদের ন্যুনতম মজুরির বিনিময়ে এখানে সারাদিন ক্রিতদাসের মতো খাটায়। মুনাফাভিত্তিক এই জেলগুলোর তত্ত্বাবধান করে বেসরকারি তত্ত্বাবধায়করা। যারা কাজ করবেন না, তাদের বেঁচে থাকার ন্যুনতম সুবিধাটুকুও মিলবে না। প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ নামমাত্র বাধাধরা মজুরীর বিনিময়ে (ঘন্টায় ২৫ সেন্ট) এখানে কাজ করেন। যারা এ কাজে অরাজি, তাদের জন্য আগেই বলেছি, জুটবে না ন্যুনতম বেঁচে থাকার সুবিধা, থাকতে হবে সলিটারি সেলের অন্ধকারে রাতদিন বন্দী। এরা এমন একজন শ্রমিক যাদের ছুটি দিতে হয় না। এদের জন্য মানতে হয় না, ন্যুনতম শ্রম আইন। শ্রমিক অসন্তোষ বা ধর্মঘটের ভয়ও অনেক কম।

প্রসঙ্গতঃ বলা ভাল এই জেল বেসরকারিকরণ শুরু হয়েছে গত শতকের আশির দশকে। রেগন ও সিনিয়র বুশের জমানায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে ক্লিনটনের শাসনে তা সর্বোচ্চ গতি পায়। সে সময় ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার বাজারে বেসরকারি জেলগুলোর শেয়ারের ঊর্দ্ধগতি ছিল বেশ তেজি। ফলশ্রুতিতে বিচার বিভাগ জেল কর্পোরেশনগুলির সাথে এমন চুক্তি করে, যাতে বৈধ কাগজ না থাকা শ্রমিকদেরও কয়েদ রাখার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়।

এই প্রিজন ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু উৎপাদনে অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলির থেকে পিছিয়ে নেই। লেফ্‌ট বিজনেস অবজার্ভার জানাচ্ছে, এই সব জেলগুলিতে উৎপাদন হয় মিলিটারি হেলমেট, এলুমিনিয়াম বেল্ট, শার্ট, প্যান্ট, তাবু, ব্যাগ এধরণের সামরিক সরঞ্জামের ১০০ শতাংশ। পাশাপাশি ইকুপমেন্ট এসেম্বলিংয়ের ৯৮ শতাংশ, রঙতুলির ৯৩ শতাংশ, রান্নার স্টোভের ৯২ শতাংশ, বডি আর্মারের ৪৬ শতাংশ, গৃহ সরঞ্জামের ৩৬ শতাংশ, হেডফোন, মাইক্রোফোন, স্পিকারের ৩০ শতাংশ, অফিস আসবাবের ২১ শতাংশ । সবই আমেরিকার বন্দী শ্রমিকরা উৎপাদন করেন।

প্রগ্রেসিভ লেবার পার্টির এক মুখপাত্র একে নাৎসী জমানার সাথে তুলনা করেছেন। বলা বাহুল্য সস্তা শ্রম যোগানের স্বার্থেই, কর্পোরেট সংস্থাগুলো চায় বেশী সংখ্যক মানুষ যাতে বন্দী থাকে। যাতে সস্তা শ্রমিক সরবরাহের এই ধারা বজায় থাকে। তাই তারা এমন সাযুজ্যপূর্ণ ভাবে আইন আনতে চায়, যাতে ছোটখাটো অপরাধেও মানুষ জীবনভর জেলে আটক থাকে। এই সবই কিন্তু করা হয় ‘উন্নয়নের’ স্বার্থে এবং মার্কি সমাজের ‘নিরাপত্তা’র কারণে!!

 

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s