জোনাহ রাস্কিন

অনুবাদ: মেহেদী হাসান

প্রথম পর্বের পর

death-of-a-red-heroineরেড হিরোইন” প্রসঙ্গে বলতে গেলে, যে ডেথ অফ এ রেড হিরোইন উপন্যাসের শিরোনামে যে নির্দেশিত হয়েছে, প্রথম হতেই সে রহস্যময়, যতক্ষণ পর্যন্ত না একেবারে শেষের দিকে পাঠক তার সমন্ধে সত্যটি জানতে পারে। কোন সময়ই সে উপন্যাসে জীবন্ত অবস্থায় আবির্ভূত হয় নাযদিও তাকে ফ্লাশব্যাকে দেখানো হয়এমনকি তার মৃত্যুর পর পুলিশ তার নামের সাহায্যেও তাকে শনাক্ত করতে পারে নি। তার ময়না তদন্তে বের হয়ে আসে যে, নিহত হওয়ার অল্পকিছুক্ষণ পূর্বে সে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিল। উপন্যাসটির প্রথম উত্তেজনাকর লাইনটিতে, জিয়ালং বলে, লাশটি পাওয়া যায় ১৯৯০ সালের ১১ মে বিকেল ৪৪০ মিনিটে, পশ্চিম সাংহাই থেকে প্রায় বিশ মাইল দূরবর্তী বেইলী ক্যানেলের বহির্মুখে। পরবর্তী বাক্যে সে পুলিশ বাহিনীর সদস্য গাও জিলিং নামের চেনের একজন সহকর্মী এবং পুরাতন বন্ধুর সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়। তৎপরবর্তীতে একটা লম্বা অনুচ্ছেদে, জিয়ালং একের পর এক উল্লেখ করতে থাকে, “একটি পারমানবিক পরীক্ষা কেন্দ্র”, “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” এবং “সাংহাইতে একটি আমেরিকান কোম্পানী” এর কথা।

উপন্যাসটির প্রথম পাতায়, জিয়ালং পরিচয় করিয়ে দেয়, সত্যিকারের পিজার সাথে, এটাই সেই মূল ভাব যা গল্পটিকে সম্মুখ দিকে চালিত করে নিয়ে যাবে। এরপর, পরবর্তী ৪৬৩ পৃষ্ঠা জুড়ে লেখক সুতাগুলোকে একত্রে বয়ন করতে থাকে যা উপন্যাসটিকে গঠন করে তোলে; রেড হিরোইনের দৃষ্টিগ্রাহ্য জীবন এবং তমসাচ্ছন্ন মৃত্যু, একজন কমিউনিস্ট পার্টি সভ্য, গনমাধ্যমে গুয়ান নামে জনপ্রিয়; গোয়েন্দা চেনের গল্প এবং ভ্রমনকে সে গ্রহণ করে রহস্যটিকে উন্মোচন করতে, যা অবশ্য তাকে সচেতন করে তোলে তার নিজস্ব খন্ডিত স্বত্বা; সমাজতান্ত্রিক চীনের জীবনমরণ সংগ্রাম, দুইটি সাংঘর্ষিক স্বরূপ সমন্বিত একটি জাতির বিষয়ে। গুয়ান– “রেড হিরোইন” এর মতচীনের আছে একটি সর্বজনীন প্রতিকৃতি যা পুরো বিশ্বের সম্মুখে প্রদর্শিত হয় এবং আছে একটি একান্ত প্রতিকৃতি যার বেশীরভাগ অংশ ঢাকা থাকে। গুয়ানের মত, দেশটির আছে একটি ভাবমূর্তি যা গনমাধ্যমে পরিবেশিত এবং অনেকবেশী ভিন্ন গুপ্ত বাস্তবতা।

গোয়েন্দা উপন্যাস বুর্জোয়া সমাজের ভন্ডামী, কপটতা, এবং মোনাফেকীকে ছেঁকে তুলতে দীর্ঘকালব্যাপী একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহৃত হয়ে আসছে। নিশ্চিতভাবেই, এডগার এলান পো, আধুনিক গোয়েন্দা আখ্যানের জনক, এর দ্যা মার্ডারস ইন দ্যা রু মর্গ উপন্যাসে সুস্পষ্ট কোন রাজনৈতিক লক্ষ্যউদ্দেশ্য ছিল না, তবে ইতোমধ্যে এই আঙ্গিকটি ১৯২০ এর দশকে ড্যাশিয়েল হ্যাম্মেট পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, এটা এখন সুস্পষ্টভাবে মার্ক্সবাদী ধরনে গৃহীত হচ্ছে। হ্যাম্মেটরেড হার্ভেস্ট (১৯২৯) এবং দ্যা মল্টেজ ফালকন (১৯৩০) বইয়ের লেখকএকজন মার্ক্সবাদী এবং আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্য ছিলেন। পিঙ্কারটন গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করা এবং গোয়েন্দা গল্প লেখা তাকে মার্ক্সবাদের দিকে ধাবিত করে। পরবর্তীতে ম্যাকার্থিজম* এর সময়ে কারো নাম বলে দেওয়ার বদলে বরঞ্চ সে হাজত বাস করেছিল। র‍্যামন্ড চ্যাদলার তার দ্যা বিগ স্লীপ (১৯৩৯) শিরোনামের একটি উপন্যাসে এই বিধ্বংশী ঐতিহ্যটাকে চালিয়ে নিয়ে যায় যা লস এঞ্জেলসের একজন গোত্রপিতাকে ধ্বংশ করে ফেলে যে একটি তেল খনির মালিক ছিল, অর্কিড সংগ্রহ করত এবং তার অবাধ্য কন্যাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। একটা সময়, হলিউড গোয়েন্দা গল্প এবং খুনের রহস্য আখ্যানকে ব্যাবহার করত মূল কর্তৃপক্ষের প্রবঞ্চনাকে প্রতিফলিত করতে, যেমন রোমান পলনস্কির চলচ্চিত্র, চীনাটাউন(১৯৭৪)- যা নির্মিত হয়েছিল ওয়াটারগেটকে কেন্দ্র করেযা অজাচার ও হত্যাকে সম্পৃক্ত করে ক্যালিফোর্নিয়ার সেচ এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের ষড়যন্ত্রের সাথে, এবং এটা শেষ হয় পুলিশ কর্তৃক বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার মধ্য দিয়ে।

চেন সিরিজের উপন্যাসে, জিয়ালং দেখায় যে কমিউনিস্ট সমাজের লুক্কায়িত খুতগুলো তুলে ধরতে, উঁচু স্থানের অপরাধকে নিচু স্থানের অপরাধপ্রবনতার সাথে সংযুক্ত করতে এবং মানব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানবাত্মার বলাৎকারকে সীমালংঘনের সাথে জোড়া লাগাতে গোয়েন্দা চরিত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারন গুয়ান নিহত হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিল, অপরাধটি যৌন মোড়কে ঢাকা। কারন সে একজন কমিউনিস্ট, এটা একটা রাজনৈতিক ঘটনা। যৌনতা এবং রাজনীতি ডেথ অফ এ রেড হিরোইন উপন্যাসে জট পাকিয়ে আছে। একজন বিবাহিত পুরুষের সাথে গুয়ানের প্রণয় সম্পর্ককে সুস্পষ্টভাবে বিস্তারিত তুলে ধরার মাধ্যমে জিয়ালং চলে যায় চীনা সমাজের পিউরিটান সুলভ মুখোশের আড়ালে অভ্যন্তরস্থ উত্তেজক যৌনক্রিয়াকে প্রকাশ করতে। একজন কমিউনিস্ট মডেল ধাবিত হয় একজন বুর্জোয়া গৃহবধূ হওয়ার দিকে।

অপরাধ এবং কমিউনিজম সংক্রান্ত গল্প তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, লেখক চীন ছেড়ে গেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেছে। এখনও, যদি আমি সাদামাটা ভাবে বলি, এটাই মনে হয় যে, সে নিজেকে চীনের বাইরে নিয়ে গেছে বটে, তবে সে তার নিজস্ব পরিচয়গত জায়গায় চীনকে ধারণ করে আছে। কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়, চীনে থাকাকালীন সময়ে জিয়ালং যতটুকু ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালীন সময়ে তারচেয়ে অনেক বেশী চীনা হয়ে উঠেছে। সে নিশ্চিতভাবেই চীনকে তার উপন্যাসে নতুন করে সৃষ্টি করেছে, এবং যদিও সে প্রত্যেকদিন মিসৌরিতে বাস করে, তবে তার মনটা অবশ্য পড়ে থাকে সাংহাইতে।

গুয়ানের খুনের রহস্যকে উন্মোচন করতে চেনের ভ্রমণ তাকে নিয়ে যায় চীনা ভূখন্ডের গুয়াংযৌতে যেখানে সে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্রগুলোকে জড়ো করে, মূল সন্দেহভাজন সমন্ধে, যে একজন আলোকচিত্রী, একজন বিখ্যাত ব্যাক্তি এবং কমিউনিস্ট পার্টির সর্বজন শ্রদ্ধেয় সভ্যের সন্তান। চেন চোখ বুলিয়ে নেয় সমাজের উচ্চপদস্থ অংশসম্পদশালী, সুবিধাপ্রাপ্ত এবং দুর্বিনীতএর উপর। সে অবশ্য আরো ঘুরে বেড়ায় প্রান্তিক নরনারীদের জগতের অভ্যন্তরে যারা যৌনশিল্পে তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং নিজস্ব শরীরের সাহায্যে জীবনযাপন করে।

একটি শিল্প গেরোতে ভাবটিকে বেঁধে জিয়ালং সমাধা করে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা সে ডেথ অফ এ রেড হিরোইন উপন্যাসের প্রথমভাগেই তুলে ধরে। খুনের রহস্য উন্মোচন করতে তার একগুয়ে গোয়েন্দা কার্যক্রম সামনের দিকে এগিয়ে চলতে থাকে, যখন লেখক সকল মূল জিনিসপত্রগুলো একত্রে রাখে এমন একটি সমাজের জিগসঅ পাজল* এর মধ্যে যা অর্ধেক সমাজতান্ত্রিক এবং অর্ধেক পুঁজিবাদী। চেন নিজেই হয়ে উঠে কমিউনিস্ট পার্টির অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু। পর্যবেক্ষণকারীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়, অনুসন্ধানকারী নিজেই শিকার হয় অনুসন্ধানের, যখন ঘটনাটি তাকে ভয়ানকভাবে কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তর চক্রের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে। কিছু পার্টি সভ্যের দৃষ্টিতে চেনের পুলিশি কার্যক্রম পার্টিকে একই সাথে এটার নিজস্ব ভাবমূর্তিকে ধ্বসিয়ে ফেলতে পারে এবং সমাজ চায় এটাকে সুরক্ষা করতে।

তথ্যউপাত্ত গুলো প্রভাব বিস্তারকারী এবং উৎকণ্ঠায় পূর্ণযেমন হয় হাম্মেট এবং চ্যাদলারের গোয়েন্দা উপন্যাসে, এবং সাহিত্যের অন্যক্ষেত্রে, বালজাক এবং স্তাদালের সমাজ সংক্রান্ত বড়মাপের উপন্যাসগুলোতে। চতুর্দিকে শ্লেষের ছড়াছড়ি, যখন তাদের ভাঁজগুলো খুলে পড়ে তখন তাদের দেখতে অনেক আনন্দদায়ক মনে হয়। চেন তার ইনস্পেক্টর পদমার্যাদা থেকে বিচ্যুত হয়, গুয়ানের মামলা থেকে বরখাস্ত হয়, এবং সাংহাই মেট্রোপলিটান ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের ডিরেক্টর হিসেবে উচ্চ বেতনের চাকরীতে পদন্নোতি লাভ করে। যখন সে এটাকে সমাধান করে ফেলে, সর্বশেষ মীমাংশাসূচক প্রমাণটিকে বের করে আনে ঠিক তখনই তাকে এই মামলা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।

ইনস্পেক্টর চেন শিখে ফেলে কিভাবে তার দুইটি পরিচয়কে জোড়া লাগাতে হয়ঃ একটি হচ্ছে একজন কমিউনিস্ট কর্তৃক আরকজন কমিউনিস্ট হত্যা ঘটনার তদন্তকারী গোয়েন্দা পুলিশ হিসেবে; আরেকটি হচ্ছে নিজেই কমিউনিস্ট পার্টির একজন মেম্বার হিসেবে। একটি ক্রান্তিলগ্নে, সে তার সাবেক প্রেমিকার নাগাল পায় যে বেইজিং এ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় পরিষদের সাথে সম্পৃক্ত। সৌভাগ্যবশত, বেইজিং কেন্দ্রীয় পরিষদ এই ঘটনার মধ্যস্থতা করে, দোষীকে শাস্তি দেওয়া, এবং এটা নিশ্চিত করা যে ন্যায় বিচার একরকমভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। চেন এই মামলার সুরাহা করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার জন্য কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সন্মাননা পায় না। তাকে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে দূরে রাখা হয় যেখানে বলা হয় খুনী একজন বুর্জোয়া অবক্ষয়ী এবং একজন পুরাতন কমিউনিস্টের দূর্নিতিবাজ পুত্র। পার্টি নিজের ঘর পরিষ্কার করে এবং ভাবমূর্তি রক্ষা করে।

পাঠক জিজ্ঞেস করতে পারেন, ডেথ অফ এ রেড হিরোইন উপন্যাসটি কি একটা কমিউনিস্ট বিরোধী প্রচারণা? আমি এই প্রশ্নটি সমন্ধে অনেক ভেবেছি এবং আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, এটা তা নয়। বাস্তবিক, উপন্যাসটি যেকোন ধরনের সাহিত্য বিবেচনায় একজন কমিউনিস্টের সবচেয়ে সহানুভূতিশীল প্রতিকৃতি উপহার দিয়েছে। একজন নিবেদিত প্রাণ পার্টি সভ্য হিসেবে, চেন অতীত বিধূরতায় অনুভব করতে পারে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পূর্বের পুরাতন দিনগুলোর কথা এবং চীনের পুঁজিবাদের দিকে যাত্রার এবং সম্পত্তি ব্যাক্তিগত হওয়ার পূর্বের সময়গুলোর কথা। উপরন্তু পুরাতনপন্থী কমিউনিস্ট, যারা নিজেদেরকে গর্বের সহিত ডাকত “বলশেভিক” বলে তাকে তার পথের প্রতিটি পদক্ষেপে সহযোগিতা করেছে এবং উৎসাহ দিয়েছে, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয় ভাবেই। উইলিয়াম হিনটনের ক্লাসিক উপন্যাস ফানসেন (১৯৬৬) এর পাঠকদের নিঃসন্দেহে স্মরণ হবে আঞ্চলিক এবং জাতীয় পর্যায়ে পার্টির অভ্যন্তরীন কার্যক্রমের জীবন্ত বর্ননার কথা। জিয়ালং কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরের টানাটানি, ধাক্কাধাক্কির এরকমই একটি জটিল চিত্র পরিবেশন করেছেন, এবং উপন্যাসের ভেতরে এমনকি ডেং জিয়াওপিং এর জন্য প্রশংসা আছে।

এটা জানা কথা, ইনস্পেক্টর চেন সিরিজের লেখক নিজে কমিউনিস্ট নয়, তবে যে কেউ তাকে যথাযথ ভাবে একজন ঐতিহাসিক বস্তুবাদী, মানবতাবাদী, এবং আগাপাশতলা দ্বান্দ্বিক শাস্ত্রে পন্ডিত আখ্যা দেবে। তার উপন্যাস পড়ার নানা ধরনের আনন্দের মধ্যে একটি হচ্ছে প্রতিদিনের জীবনযাপনের বুনন যা তারা সরবরাহ করে। তাদের অনুভব যথার্থ, তাদেরকে আসল মনে হয় সেই পথে যেখানে শুধুমাত্র একজন লেখক অন্তরঙ্গ ও ঘনিষ্ঠভাবে চীনা সমাজের সাথে সম্পৃক্ত জানা ও বোঝার আশায়। চেন সিরিজের উপন্যাসে, আমরা চীনকে দেখি চীনাদের ভেতর দিয়ে, প্রাশ্চাত্য চোখ দিয়ে নয়, এবং দেখি একটি বহুমুখী সমাজ হিসেবে।

জিয়ালং যেমন কবিতা এবং সংস্কৃতির প্রতি ঠিক তেমনি ভাবে রাজনীতি এবং অর্থনীতির প্রতি আসক্তিকেও মূল্যায়িত করে। ডেথ অফ এ রেড হিরোইন উপন্যাসটি কবিতার পংক্তি এবং টি এস এলিয়টের পরোক্ষ উল্লেখে সমৃদ্ধ। নারী চরিত্ররাপুলিশদের স্ত্রী, ঠিক তেমনি ভাবে নারী প্রতিবেদক এবং কমিউনিস্ট পার্টির নারী সভ্যগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এবং তারা পুরুষ চরিত্রের মতই জটিলতায় ভরপুর। একটি প্রাচীন চীনা প্রবাদ বলে, “নারী স্বর্গের অর্ধেকটা ধরে রাখে, ” এবং তারা নিশ্চিতভাবেই চেন সিরিজের উপন্যাসের অধিকাংশটা ধরে রাখে।

উপন্যাসের শেষের দিকে, মূল চরিত্রকে ভাল না বেসে অথবা অন্তত পছন্দ না করে পারা যায় না, যদিও এটা পরিষ্কার যে সে ত্রুটিপূর্ণঃ একজন কর্মিষ্ঠ যে মামলাটিকে আকড়ে ধরে, সে খুব নিবিড় ভাবে অনুসন্ধান চালায় এবং যে নিজের জীবনকে ঢেলে দেয় অন্যদের জীবনের মাঝে কারন তার নিজস্ব জীবনকে প্রায়ই তার কাছে অনেক বেশী নীরস বলে মনে হয়। সৌভাগ্যবশত, তার আছে নিজের কবিতা এবং কল্পনাশক্তি ঘুরে দাঁড়ানোর এবং উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে যখন সে একজন প্রেমিকা খুঁজে পায় এবং যখন সেই প্রেমিকাটি তাকে আনন্দ এনে দেয়, তার অবশ্য নিজের মা ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য। বইটির একেবারে শেষের আগের দৃশ্যে, চেন তার মায়ের সাথে দেখা করে, এবং তার মা তাকে তার পুলিশের দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেয় এবং তাকে বলে, “কিছু একটা কর দেশটার জন্য”।

শেষ দৃশ্যে, চেন সাংহাইয়ের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে, “কাল্পনিক নগর” যেটাকে সে ভালবাসে এবং খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে “একজন ফেরীওয়ালা চাকায় চালিত একটি গ্যাসের চুল্লীর উপরে একটা বিশাল কড়াইয়ের মধ্যে পিঠা ভাজছে”। সে নিজেকেই বলে যে এটা হচ্ছে “ছোটবেলা হতেই তার পরিচিত একটি দৃশ্য, পার্থক্য শুধুমাত্র তখনকার দিনে কয়লার স্টোভ ব্যাবহৃত হত”। চেন জানে যে চীন পরিবর্তিত হয়েছে অপরিবর্তনীয়ভাবে, এবং যা নানা ভাবেই, ডেথ অফ এ রেড হিরোইন উপন্যাসে দেখা যায়, এটা এমন একটা সমাজ যেখানে মানুষজন কমিউনিস্ট পার্টির কল্যানে বস্তুগতভাবে ভালই আছেভাল বাসস্থান এবং ভাল খাওয়াদাওয়া১৯৪৯ সালে যেমন ছিল তার চেয়ে ভাল। জিয়ালং সমকালীন চীনে বস্তুগত উন্নতি সাধনকে সামনের কাতারে নিয়ে আসে। সাংস্কৃতিক বিপ্লব ব্যাপারে সে সুস্পষ্টভাবেই অসন্তুষ্ট ছিল, তবে অন্য অনেক সমকালীন লেখকদের মত, এই অসন্তুষ্টিকে সে নিজেকে দখল করে ফেলার অনুমতি দেয় নি। তার মধ্যে আছে কান্ডজ্ঞান এবং হাস্যরসের সমাহার।

গল্পের শেষে, ইনস্পেক্টর চেন একটি নতুন জীবন শুরু করে। বাস্তবিক, সে ফিরে আসে উত্তরকালীন পাঁচটি উপন্যাসের মধ্যে যা আমেরিকান পাঠকএবং সমস্ত বিশ্বের পাঠকরাআবিষ্কার করে, যেন তারা ডুবে গেছে রহস্য এবং অপরাধ, ভালবাসা এবং আবেগ, হত্যা এবং সৃষ্টির জগতের মধ্যে। দ্যা মাও কেস উপন্যাসে চেন চেয়ারম্যান মাও এর উত্তরাধিকার ব্যাপার নিয়ে কাজ করে, এবং হোয়েন রেড ইজ ব্ল্যাক উপন্যাসে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উত্তরাধিকারের দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে। ডেথ অফ এ রেড হিরোইন উপন্যাসটি শুরু করার সময়, জিয়ালং জানত না কিভাবে গোয়েন্দা উপন্যাস লেখতে হয়; ইতোমধ্যে সে কাজটি শেষ করে আনে, পরিণত হয় তার শিল্পকৌশলের একজন মোক্ষম ব্যাক্তিতে।

ঐ রহস্যটি উত্তরভাগগুলোতে প্রবাহিত হয় যা তার চীনা কমিউনিস্ট পুলিশকে প্রবেশ করায় নতুন এবং আকর্ষণীয় মামলাগুলোতে, এবং যা দেখায় জিয়ালং হচ্ছে সমকালীন চীন সমন্ধে গুরুত্বপূর্ন একজন লেখক উইলিয়াম হিন্টন এবং এডগার স্নো এর মত, রেড স্টার ওভার চায়না উপন্যাসের লেখক। তারা যেমন তার নিজস্বভাবে সেও ঠিক তেমনি শক্তিশালী এবং মৌলিক রাজনৈতিক লেখক, এবং প্রায় প্রত্যেক পৃষ্ঠাতে সে একজন নিখুঁত শিল্পীও বটে।

ফয়েল*- যে ব্যাক্তি বা বস্তু বৈপরীত্যের মাধ্যমে অন্য ব্যাক্তি বা বস্তুর গুনাবলীকে প্রকট করে তোলে।

ম্যাকার্থিজম*- যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদ জে আর ম্যাকার্থির নামানুসারে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫০ এর দশকে সন্দেহভাজন কমিউনিস্টদের খুঁজে বের করে সরকারী চাকরী থেকে অপসারণ।

জিগসঅ পাজল*-এক ধরনের খেলা, যে খেলায় কাঠ ও বোর্ডের উপর কোন ছবি বা মানচিত্রকে সাটা হয় এবং পরে তাকে অনেকগুলো অসমান টুকরোয় কাটা হয়; পরে খেলোয়ার ঐ টুকরোগুলোকে জোড়া দিয়ে পুরা ছবিটি পুননির্মাণ করে।।

** কমিশার রাশিয়ার সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক কর্মকর্তা।

(শেষ)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s