সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের বার্তা

Posted: জুন 26, 2014 in অর্থনীতি
ট্যাগসমূহ:, , , ,

লিখেছেন: ফারুক আহমেদ

Budget-2014-15বাজেট ঘোষনার আগে এবং পরে কিছু মানুষের মুখে কতকগুলো শব্দ উচ্চারিত হয়ে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। প্রবৃদ্ধি, জিডিপি, উচ্চাভিলাষী, বরাদ্দ, উন্নয়ন ইত্যাদি শব্দগুলোর সাথে সাধারণ মানুষের এক অর্থহীন পরিচয় ঘটে। এসব নিয়ে অর্থনীতিবীদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নীতি নিধারকগণ বিচার বিশ্লষণ করেন, কাগজের পর কাগজ খরচ করেন, কথার পর কথা বলেন। খুবই প্রয়োজনীয় কাজ, সন্দেহ নেই। দেশ, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এসব অপরিহার্য্য বটে। যে কোন কিছু করতে গেলেই হিসাবের প্রয়োজন আছে। যারা এই বাজেটের কেন্দ্রে তাদের নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার জন্য হলেও একটা হিসাব আবশ্যই থাকতে হয়। সেদিক দিয়ে তাঁদের দিক থেকে বিচার করলে বাজেট নিয়ে এসব তৎপরতা কোন গুরুত্বহীন ব্যাপার নয়।

কিন্তু সাধারণ মানুষ, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ, ৪৩ বছরের বাজেটের কার্যক্রমে যাঁরা প্রান্তিকজন, তাঁদের জন্য বাজেট কি বার্তা নিয়ে আসে? গবেষকদের গবেষণার কেন্দ্র থেকে বহুদুরে ছিটকে পড়া এসব মানুষদের আর্থসামাজিক জীবনে এ বাজেটের প্রভাব কি?এসব মানুষ বাজেটের পর সর্বপ্রথম কোন সব বিষয়ের খোঁজ খবর করেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য কোন বিশষজ্ঞ গবেষণার প্রয়োজন হয় না। খোলা চোখে তাঁদের জীবনের দিকে তাকালেই সে চিত্র চোখে পড়ে।

শেষের প্রশ্নটি থেকে বলা যায়, কোন কোন জিনিসের দাম বাড়লো এর খোঁজখবর করাই সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ দিক।কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ হলো, সেসব বরাদ্দের কোনটি ন্যূনতম চাহিদার কত অংশ, কোনটিতে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বরাদ্দ, এসব বরাদ্দের অর্থ খাতওয়ারী কিভাবে খরচ হয়েছে এবং হবে, গত অর্থ বছরের এসব বরাদ্দের খবর কি, সেসব হিসেব বর্তমান অর্থবছরের বাজেটে এসেছে কিনা বাজেটের কেন্দ্র থেকে বহুদুরে ছিটকে ফেলে দেওয়া কিন্তু দেশের অর্থনীতির চাকা নিরন্তর বহন করে চলা বিপুল সাধারণ মানুষের এসব খোঁজখবর করার কোন অবস্থা নেই। শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী, সরকারিবেসরকারি চাকরিজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালা সহ সর্বস্তরের খেটে খাওয়া মানুষতো বটেই এমনকি মধ্যবিত্তদেরও এসব বাজেটের কেন্দ্র থেকে অনেক দুরে রাখা হয়। এসব মানুষের জীবনে বাজেটের গুরুত্ব এখানেই, তা হলো তাঁর জীবনের উপর বাড়তি কত টাকার চাপ পড়ল। এসব মানুষের জীবনে এ চাপ হলো সারা বছরের জন্য স্থায়ী চাপ। এর বাইরে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারের চাপতো আছেই। কখনো হঠাৎ দাম বৃদ্ধি করে, কখনো তার উৎপাদিত পণ্যের দাম কমিয়ে এক একটা ঘাতে মানুষের জীবনকে পর্যুদস্ত করার ব্যবস্থাতো আছেই। সাধরণ মানুষ বাজেটকে দেখেন তাদের জীবনের বার্ষিক অর্থনৈতিক নিপীড়নের স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে।

সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক জীবনের মানের দিকে তাকালে তাকে দুইভাগে ভাগ করে দেখা যেতে পারে। শ্রমিক, কৃষকসহ খেটে খাওয়া বিভিন্ন পেশার মানুষের বাসস্থানের মানের দুর্দশা নিয়ে তাঁদের নিজেদের ভাববার অবস্থা নেই। অন্নবস্ত্রের সংস্থানে জীবন ধারণের সংকুলানই তাঁদের আর্থসামাজিক জীবনের মান নির্ধাারক।অপরদিকে মধ্যবিত্তদের জন্য একটি ন্যূনতম বাসস্থানে থেকে অন্নবস্ত্রের সংস্থান করে কষ্টে সন্তানদের জন্য সাধারণ শিক্ষা নিশ্চিত করাই তাঁদের আর্থসামাজিক জীবনের মান নির্ধারণের মাপকাঠি। এই সমস্ত মানুষ প্রতিদিন বহুবার কর দেন।বাজেটে সে সব করকে ক্রয় কর নামের পরিবর্তে ভ্যাট নাম দিয়ে তাঁরা যে প্রতিনিয়ত কর দিচ্ছেন তা অস্বীকার করা হয়। বাজেটে অস্বীকার করলেও ভ্যাট বৃদ্ধির চাপ তাঁদের আর্থসামাজিক জীনকে পিষ্ঠ করে চলেছে প্রতিটি বাজেটে। এবারের বাজেটেও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। এ্ই যে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভ্যাটের নামে বিপুল পিরমাণে ক্রয় কর দিয়ে চলেছেন তাঁর পরিমাণ কত এবং এর কত অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হলো এবং কত অংশ যাদের মারফত দেওয়া হলো তারা মেরে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে গেল অর্থনীতিবীদগণ অন্য অনেক কিছু নিয়ে গবেষণা করলেও এ নিয়ে তাঁদের গবেষণা বা হিসেব বলে কিছুই নেই। কিন্তু পরিহাসের ব্যাপার হলো আয়করের জন্য আয়ের ন্যূনতম সীমার পরিমাণ নির্ধারণ। এই সীমা নির্ধারণ থেকেই বুঝা যায় সাধারণ মানুষের জীবনের মান স¤পর্কে বাজেটের কেন্দ্রে থাকা উপরওয়ালাদের দৃষ্টিভঙ্গি। বাৎসরিক দুই লক্ষ বিশ হাজার টাকা আয়ের ন্যূনতম সীমা হিসেবে ধরা হয়েছে, যে সীমা থেকে আয়কর দিতে হবে। বর্তমান বাজার মূল্যের নিরিখে মাসিক আঠরো হাজারের সামান্য উপরের আয় অর্থনীতির বিবেচনায় কোন সীমা নির্দেশ করে?  দারিদ্র সীমা কত টাকা?  সেই সীমা কি গ্রামশহরে একই রকম?  এই সীমা এভাবে নির্ধারণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ যে প্রতিনিয়ত কর দিয়ে যাচ্ছে সরকার তাকে অস্বীকার করছে।

বহুবছর ধরে সরকারের একশ্রেণির সমালোচকদের সমালোচনার যে সাধারণ দিক এবং সে অনুযায়ী মূল কথা তা হলো উচ্চাভিলাষী বাজেট। এর মধ্যদিয়ে তারা আদতে সরকারের সমালোচনা বা প্রশংসা যাই করুণ না কেন এতে সাধারণ মানুষের কিছুই যায় আসে না। এভাবে যাদের সমালোচনা করা হয় এবং যারা সমালোচনা করেন এ বাজেটের কেন্দ্রে যে তারাই এবং উচ্চাভিলাষ যে তাদেরই তা তারা জানেন। বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির কোন তথ্য থাকে না। এ নিয়ে সমালোচকদেরও কোন মাথা ব্যথা নেই, কারণ এর ভার তাদের মাথায় বহন করতে হয় না। সাধারণ মানুষের আয় বাড়ে না বটে কিন্তু এই মুদ্রাস্ফীতির ভার বহন করার জন্য তাঁদের মাথায়ই টান পড়ে।তাই শ্রমজীবীতো বটেই মধ্যবিত্তের জীবনেও বাজেট যে বার্তা নিয়ে আসে তা জীবনের ব্যয়ভার বহনের জন্য বাড়তি টাকার বার্তা। বাড়তি টাকা মানে বাড়তি শ্রম।পরিবারের একজনের মাথায় সে বাড়তি শ্রম সয় না। তাই অকালে হলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের সেই শ্রমে মাথা দিতে হয়। পরিবারের একাধিক সদস্যের রোজগারে কোন রকমে তারা জীবনের জন্য অর্র্থের ব্যয় সংকুলানের যোগান দিয়ে যায়। যে সব পরিবারে বর্তমান অবস্থা ধরে রাখতে বাড়তি ব্যয় সংকুলানের জন্য মাথা দেওয়ার মত বাড়তি কেউ থাকে না প্রতিবছর বাজেট তাঁদের জীবনে নিয়ে আসে অন্য বার্তা। বাজেটে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গালভরা বুলির নীচে চাপা পড়ে তাঁদের জীবন মান নিুগামী হতে থাকে। এই হলো সাধারণ মানুষের জন্য বাজেটের চিত্র এবং তাঁদের জীবনে বাজেটের গুরুত্ব।অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, উচ্চাভিলাষ এসবই বাজেটের কেন্দ্রে থাকা মানুষদের জন্য। বাজেট হলো লুটপাটের মাধ্যমে এর কেন্দ্রে থাকা মানুষদের সম্পদ দখলের জন্য বাৎসরিক ভাগবাটোয়ারার এক নিরাপদ দলিল।।

০৭/০৬/১৪

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s