লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

modi-21হিন্দুত্ববাদের ধ্বজা উড়িয়ে নরেন্দ্র মোদি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসছেন এই সম্ভাবনা জোরদার হওয়ায় আমাদের দেশের লোকজনের উদ্বেগের শেষ নেই। এসব ব্যক্তির মোটামুটি একটা ধারণা হলো এই যে: ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র, সে নিজ দেশের এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তান সহ অন্যান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমঅধ্যুষিত দেশের জনগণের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন। মোদি এবং তার নেতৃত্বাধীন দল বিজেপি হচ্ছে এই মতাদর্শের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। সুতরাং মোদি ক্ষমতায় এলে ভারতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধি পাবে, আমাদের দেশের ওপর তারা আরো বেশি আগ্রাসী নীতি চাপিয়ে দেবে। মূলধারার সংবাদ মাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবীগণ যেভাবে মোদিকেন্দ্রিক রাজনীতির পক্ষেবিপক্ষে প্রচারণা চালায় এবং সেটা করতে গিয়ে তারা যে ভাষা ও চিন্তাধারার প্রয়োগ করে তাতে ধারণাটা অনেকটা এভাবেই আকার লাভ করে।

অথচ এভাবেই যদি সবাই বিষয়টাকে দেখতে শুরু করে তাহলে ভারতের শাসক শ্রেণীর বিশেষ ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। তাতে আর যাই হোক, জনগণের সাথে শাসক গোষ্ঠীর মূল দ্বন্দ্বটি সেখানে আড়ালে রয়ে যায়। ভারতের অভ্যন্তরে কী ঘটে চলেছে সে বিষয়ে আমাদের দেশের জনগণ অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় আছেন। ১৯৯১ সালে অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সে দেশের ‘অর্থনৈতিক সংস্কারে’ হাত দেয়ার পর ভারতীয় পুঁজিপতিরা সাম্রাজ্যবাদী বৈশ্বিক পুঁজির সাথে একীভূত হয়েছে। ঐ সময়কালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং মার্কিননেতৃত্বাধীন এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নয়াঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের যে পরিণতি ঘটেছিল ভারত কোনোভাবেই তার থেকে ব্যতিক্রমী কিছু ছিল না। ১৯৫০ সালে ভি. বেলাবুশেভিচ তার নিবন্ধে ভারতের শাসক গোষ্ঠীর মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া চরিত্রের যে দিকগুলো উন্মোচন করেছিলেন ১৯৯০ সালের পর তার সে পরিচয়টাই প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। মার্কিন ও অন্যান্য পশ্চিমা এবং সেই সাথে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় রাষ্ট্রসমূহের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সাথে ঐক্যবদ্ধভাবেই ভারতের ‘জাতীয়’ পুঁজি তার নিজের দেশে নির্মম শোষণ জারি রেখেছে; খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন, আদিবাসীদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ এবং ‘উন্নয়ন’এর নামে জমি দখল, বাঁধ নির্মাণ, স্বাধীনতাকামী ও সাম্যবাদী আন্দোলন দমন এসবের তীব্রতা এবং মাত্রা বেড়েছে বহুগুণ।

এটা স্পষ্টভাবেই মনে রাখতে হবে যে, ভারতের শাসকগোষ্ঠী, তাদের মিডিয়াবুদ্ধিজীবী প্রভৃতি যখন খুব জোরের সাথে উন্নয়নের কথা বলে তখন তারা ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবনের উন্নয়নের কথা মনে করে তা বলে না, তারা যেটা বলে তার অর্থ হলো বৃহৎ পুঁজিপতি এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী মুরুব্বিদের মুনাফা হাতানোর সম্ভাবনা, সম্পদ ও চাকচিক্য বৃদ্ধির সুযোগের বিস্তার, মোট কথা নিজেদের শ্রেণীভাগ্যের উন্নয়ন। এ কারণেই উন্নয়নের হাজারো গালগল্প ছড়ানোর পরও সে দেশের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, নারীধর্ষণের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় অবস্থায় থেকে যায়, অজ্ঞতাঅন্ধতাকুসংস্কারের প্রভাব এখনো গ্রামাঞ্চলগুলোতে স্বমহিমায় বিদ্যমান। উন্নয়ন ও বঞ্চনার চরম বৈপরীত্য সেখানে চমৎকার সহাবস্থান করে।

ভারতের এই উন্নয়ন দর্শন এবং শোষণমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যারা লড়াইসংগ্রাম সংগঠিত করছেন, অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছেন, সেইসব স্বাধীনতাকামী এবং সাম্যবাদী নেতাকর্মীদের বিষয়ে বঙ্গীয় মুসলমানদের মধ্যে কোনো সহানুভূতি নেই। একজন কিষেণজির হত্যাকাণ্ড, অনুপ চেটিয়ার বন্দিত্ব, সাইবাবার গ্রেপ্তার কিংবা শর্মিলা ইরম চানুর দশকব্যাপী অনশন তাদের মধ্যে কোনো সাড়া জাগায় না। অথচ কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী আন্দোলন আসাম কিংবা মণিপুরের লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং জঙ্গলমহালের আদিবাসী উচ্ছেদ পরস্পর সম্পর্কিত বিষয়, দিল্লির শিখ গণহত্যা আর গুজরাটের নৃশংসতা একই হাতের বিভিন্ন অঙ্গুলির সঞ্চালনে সংঘটিত হয়। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মাওবাদীদেরকে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সর্বপ্রধান হুমকি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কেন? উন্নয়ন তত্ত্বের মতোই, এই নিরাপত্তার বয়ানও কোনো সর্বজনীন বিষয়কে ধারণ করে না। সর্বোচ্চ শাসক গোষ্ঠী এবং তাদের প্রচারযন্ত্র কর্তৃক যখন নিরাপত্তার কথা বলা হয়, তখন জনগণের নয়তার অর্থ দাঁড়ায় ভারতীয় পুঁজিপতি এবং তাদের মুরুব্বি সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্বার্থের নিরাপত্তা। কেননা সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা তো শাসক গোষ্ঠীই দিল্লিকাশ্মীরগুজরাটঅযোধ্যাইমফলনন্দীগ্রামঝাড়খণ্ডে বিভিন্নভাবে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে। ভারতের অতীত ও সাম্প্রতিক ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল নয়।

টাটাবিরলাআম্বানিবেদান্তবাজাজ সহ তাদের বৃহৎ পুঁজির মালিকেরা ভারতে যেভাবে কাজ করছে এবং যেভাবে তারা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ক্রমাগত মিলিত হচ্ছে, সেটা বাংলাদেশ সহ প্রতিবেশী অপরাপর রাষ্ট্রের জনগণের প্রতিও তাদের নীতিকে নির্ধারণ করছে। এর প্রতিফলন ঘটছে তাদের বিভিন্ন আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে। বাংলাদেশে অনেকেই আছেন যারা রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, হাসিনামনমোহন চুক্তি, ফারাক্কাটিপাইমুখ বাঁধ, তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ প্রত্যাহার, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড প্রভৃতি নিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা বলছেন। এটা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিপ্রেক্ষিতজ্ঞানের অভাবে এটা অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রবনামরাষ্ট্র চিন্তাধারার দিকে অগ্রসর হয়, যা তার অনিবার্য পার্শ্বফল হিসেবে গোটা বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। কিন্তু ভারত তো তার নিজের রাষ্ট্রেই জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত, তাই টিপাইমুখ বাঁধ মণিপুরের জনগণকে পানিশূন্য করলেও নিজেদের স্বার্থে তাকে সেটা করতেই হয়। এ কারণে সে দেশের জনগণের লড়াই আর আমাদের দেশে ভারতীয় আগ্রাসী নীতির প্রতিরোধসংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নেই।

ভারতে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদের নগ্ন ও বেপরোয়া প্রচার লড়াইয়ের এই বৃহৎ পরিসরের ক্ষেত্রটিকেই আড়াল করে, মূল দ্ব্ন্দ্বসঙ্কট প্রসঙ্গে উভয় দেশের মানুষের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন রাখে। বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো রাহুল গান্ধি এবং মোদি উভয়ের পেছনে অর্থব্যয় করলেও তারা মনে করে এই মুহূর্তে মোদিই পারেন ভারতের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে, তারা যেসব সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে সেখান থেকে তাদেরকে উদ্ধার করতে। এ কারণেই তার পেছনে তারা বেশি পরিমাণে টাকাপয়সা খরচ করেছে। হিন্দুত্ববাদ এখানে ভারত সহ সমগ্র দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে তাদের পুঁজির শাসন অক্ষুণ্ন রাখার এক প্রবল শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হতে চলেছে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s