লিখেছেন: সৌম্য মণ্ডল

NOTA_Indiaপ্রত্যেক কমিউনিস্ট মাত্রই জানে যে ভোট হলো কৌশল মাত্র, তাই প্রত্যেকবারের ভোটের মতো এইবার ১৬ তম লোকসভা ভোটেও কৌশলের ছড়াছড়ি। জ্ঞানীগুণীবিজ্ঞ ‘কমিউনিস্ট’ নেতারা বুদ্ধিদৃপ্ত কায়দায় প্রত্যেক ভোটে কৌশলের খেল খেলে যান, যেন বিরাট কিছু একটা হয়ে যাচ্ছে। তবে কৌশলটা যে কি, সেটা সবারই জানা, তথাকথিত মূল ধারার বাম দলগুলো সারা বছর মুখে পুঁজিবাদের বাপ বাপান্ত করে ছাড়লেও (অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ, কেরলার মতো যেখানে তারা ক্ষমতায় ছিল বা আছে, সেখানে বিদেশি পুঁজিতো প্রগতিশীল, তার ফিরিস্তি দেওয়া হয়), সব দক্ষিনপন্থী দলগুলোর সাথে সমদূরত্ব বজায় রাখার কথা বললেও, বাম = প্রগতিশীল, শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান; এরকম একটা হাবভাব এর মাধ্যমে একটা লেফট ব্র্যান্ড তৈরী করে, নিচুতলায় আন্দোলন শক্তিশালী করার স্বার্থে সংগ্রামী বাম সংগঠনগুলোর সাথে ঐক্য তৈরী করার ব্যাপারে নাক সিট্কালেও ভোটে এর ঠিক আগে সাধের ‘বৃহৎ বাম ঐক্যের’ কথা ভুলে গিয়ে এই কথিত কমিউনিস্ট সংগঠনগুলো দক্ষিনপন্থী দলগুলোরই হাত ধরে, কখনো আরজেডি, কখনো মুলায়াম, কখনো জয়ললিতা।

যে বাম দলগুলো পশ্চিমবঙ্গে ‘বাম ফ্রন্ট’ এর রিক, তারা অন্য রাজ্যে আবার অন্য সমীকরণে ভোট লড়ে। প্রত্যেকবার ভোটের আগে ‘বাম বিকল্পের’ কথা বলা হয়, কখনো বা তৃতীয় বিকল্প। এই বাম বিকল্প বা তৃতীয় বিকল্প যে আসলে কিসের বিকল্প (!), এর বিকল্প নীতি কিভাবে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএএর থেকে আলাদা, সেটা বাম শাসিত রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিকনীতি দেখলে বোঝা সম্ভব নয়, আর খাতায় কলমে যে বিকল্প নীতির কথা বলা হয়, তার ভিত্তিতে বাম নেতারা চন্দ্র বাবু নাইডু, জায়লালিতা, মুলায়াম, মায়াবতীতো দক্ষিনপন্থীদের কাছে বার বার পাত্তা না পেয়েও কেন ব্যর্থ প্রেমিকের মতো তৃতীয় বিকল্পে যোগ দেওয়ার কথা বলতে যান, তার রহস্য যে ‘বিকল্প নীতি’তে নাই, নিপাট ভোটের অঙ্কে আছে, সেটা বলাই বাহুল্য। জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ ক্তিশালী হওয়ার পর থেকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাকে ঠেকাতে প্রত্যেক ভোটে কংগ্রেসকে সমর্থন করা রেওয়াজ, থুড়ি কৌশলে দাঁড়িয়েছিল। এই নির্বাচনের বাজারে আসরে নেমেছে আম আদমি পার্টি (আপ)। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সংসদীয় বাম দলগুলো বারানসী কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীকে হারাতে আম আদমী পার্টিকে সমর্থন দেয়া পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করেছে।

ভারত মতো দেশে যেখানে শ্রমিক কৃষকএর লড়াইসংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে, যেখানে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার প্রায় ১০০ বছর হয়ে যাচ্ছে আর ক’বছর পর, সেখানে সংসদীয় ভোট রাজনীতির পথে হেঁটে, থুড়ি কৌশল করে, এখনো পর্যন্ত ওই ‘কমিউনিস্ট’রা নিজেরা কেন বেশিরভাগ কেন্দ্রে প্রার্থী দিতে পারেনা, কেন নিজেরা হিন্দু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে না দাঁড়াতে পেরে কংগ্রেস বা আম আদমি পার্টির লেজ ধরতে হয়, তার রিভিউ তথাকথিত মূল স্রোতের, ‘মাওবাদী নৈরাজ্যের’ বিরোধী, ‘দায়িত্ববান’ এই সব ‘কমিউনিস্ট’ পার্টিগুলো করবে কী? কোন এক সকালে, এক মহান কোনো জাদুবলে যদি হিন্দু সম্প্রদায়িকতা দেশ থেকে অবলুপ্ত না হয়, তাহলে প্রত্যেক নির্বাচনে হিন্দু ফ্যাসিবাদকে ঠেকাতে ওই কমিউনিস্টরা যদি আপ ও কংগ্রেসএর মতো দক্ষিনপন্থী দলগুলোকেই সমর্থন দিতে ব্যস্ত থাকে, তাহলে বিপ্লব করবে কে?? সেটা ব্রহ্মাই জানেন!!!

এই নির্বাচনের বাজারে নতুন এক কৌশলের আমদানি হয়েছে, নোটা NOTA (none of the above)। ভারতের আগে ১৩ টি দেশে যথা ফ্রান্স, গ্রীস, ক্রে, চিলি, বাংলাদেশ, নেভাদা, ফিনল্যাণ্ড, আমেরিকাতে NOTA চালু হয়েছে। ভারত ১৪ তম। ভারতে পিইউএলসি (PUCL) সহ একাধিক মানবধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভোটযন্ত্রে NOTA বোতামের জন্য ন্যায্য দাবি তুলে আসছিল। এইবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পি সাথাশিভমএর নেতৃত্বে একটি বেঞ্চ জানিয়েছে যে, গোপন ভোট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো প্রার্থী পছন্দ নয়, এটা জানানো গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিয়। এই ব্যাপারটা বুঝতে ভারতীয় গণতন্ত্রের ৬৫ বছর লেগে গেলেও অভিনন্দন জানাই। আর এই আনন্দে কিছু প্রগতিশীল মানুষ NOTA-তে ভোট দেয়ার প্রচারে নেমে পড়েছে। এমন কি MKP- মতো কিছু বাম সংগঠন, যারা আগে প্রার্থী দিত, তারাও এবার প্রার্থী না দিয়ে মালিক শ্রেণীর সমস্ত দলগুলোকে প্রতাখ্যান করে NOTA-তে ভোট দেবার কথা প্রচার করছে। কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন ভোট বয়কটএর বিরোধিতা করে NOTA-তে ভোট দেওয়ার কথা বলছেন

DAFODWAM তার প্রচারপত্রে লিখেছে, “তবে কি ’৭০এর স্লোগান ভোট নয় অস্ত্র ধর? না। ব্যাপক মানুষ এর সমর্থন, আন্দোলন ছাড়া বয়কট বা সসস্ত্র সংগ্রাম স্বৈরতন্ত্রের রাস্তা পরিস্কার করে দেয়…” এই প্রচারপত্রে NOTA-তে ভোট দেওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো NOTA আসার আগে DAFODWAM কি অন্য পার্টিকে ভোট দিত, নাকি তারা ‘স্বৈরতন্ত্রের রাস্তা পরিস্কার’ করতো? NOTA-তে ভোট দেওয়ার মানে হলো প্রার্থী পছন্দ নয়। কিন্তু ‘ভারতের গণতন্ত্র’ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোট দেওয়ার যেমন অধিকার দেয়, তেমনি ভোটে লড়ারও অধিকার দেয়। তাহলে আপনার মতে সব প্রার্থী খারাপ হলে আপনি সততার প্রতিমূর্তি নিজে ভোটে দাঁড়াচ্ছেন না কেন? আপনার যদি এক্ষেত্রে মনে হয় যে, পুঁজিপতিদের সমর্থন ছাড়া, ভোটে লড়া সম্ভব নয়, এই ভোট ব্যবস্থাটাই অগণতান্ত্রিক, তাহলে আপনি কেন ‘প্রার্থী পছন্দ নয়’ থেমে থাকছেন, কেন ভোট বয়কট করছেন না? আর যারা ‘মালিকশ্রেণীর সমস্ত দলগুলোকে প্রতাখ্যান করে’ NOTA-তে ভোট দেবার কথা প্রচার করছেন, তাদের কি ভোটারদের এটা জানাবার দায়িত্ব বর্তায় না যে, ভোটে দাঁড়ানো কোন কোন দল মালিকশ্রেণীর দল? ভোটে দাঁড়ালেই কোনো দলকে মালিকশ্রেণীর দল বলা যায় কিনা? এসইউসিআই (SUCI), সিপিআই লিবারেশন, রেডস্টার এরাও মালিকশ্রেণীর দল কিনা? আপনারা একসময় ভোটে দাঁড়াতেন আজ NOTA আসার পর কিভাবে ভোটে দাঁড়ানোটা মালিকশ্রেণীর দল হওয়ার মাপকাঠি হলো? আর ভোটে দাঁড়ানোটা যদি মালিকশ্রেণীর দল হওয়ার মাপকাঠি না হয়, তাহলে আপনারা NOTA-তে ভোট দিতে বলে আপনারা যে দলগুলো শ্রমিকশ্রেণীর দল বা মালিকশ্রেণীর দল নয়, তাদের ভোট থেকে বঞ্চিত করে দুর্বল করছেন কেন? আর আপনারা যখন মালিকশ্রেণীর দলগুলোকে ভোট না দেবার কথা বলছেন তখন আপনারা শ্রমিকশ্রেণীর দল হয়ে ভোটে দাঁড়াচ্ছেন না কেন? আপনারা যদি মনে করেন সমস্যা প্রার্থীতে নয়, সমস্যা মালিকশ্রেণীসংসদীয় ব্যবস্থায়, তাহলে ভোটে বয়কট করছেন না কেন? NOTA বা ভোট দেওয়ার প্রচারের মাধ্যমে যদি মানুষকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করা যায়, তাহলে ভোট বয়কট এর প্রচারের মধ্য দিয়ে সেটা না হওয়ার কারণটা কি?

কিছু গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ব্যক্তি, সংগঠন ও কিছু বাম সংগঠন আসা করেছে যে NOTA গণতন্ত্রকে প্রসারিত করবে। দুর্নীতিগ্রস্থ, জনবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপে রাখবে, বেশির ভাগ মানুষ যদি কোন দলকেই না পছন্দ করে, তাহলে হয়তো রাজনৈতিক দলগুলো জনবিরোধী, পরিবেশ বিরোধী নীতিগুলোকে লাগু করবে না। এ যেন গান্ধী হৃদয় পরিবর্তনের গল্প! জনতার অভিমানে শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলোর হৃদয় নরম হয়ে যাবে, তাদের অন্তর কেঁদে উঠবে আর পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে পথ করবে যে, আজ থেকে আমরা জনগণের অনুগত হয়ে থাকবো, আর চুরি করবো না, আর পার্লামেন্টে প্রভুর টেন্ডার পাস করবার জন্য আত্মনিয়োগ করবো না! আমার মনে হয়, যারা এসব ভাবছেন হয় তারা অতি সরল মতি ভালো মানুষ, যারা জানেনই না যে, আমাদের দেশের শ্রেণীচরিত্র, সামন্ত শো, সামন্ত মূল্যবোধ, বর্ণবাদী সংস্কৃতি, দালাল বুর্জোয়ারা দেশ শাসন করছে, ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র কেবলই তাদের মুখোশমাত্র, বাস্তবে এর পিছনে রয়েছে ভয়ানক শ্রেণী একনাকতন্ত্র। অথবা জেনে বুঝে শাসকশ্রেণীবেঁধে দেওয়া গণ্ডির মধ্যে মানুষকে টেনে আনতে চাইছেন, অথবা নিজের দেশটাকে এখনো বোঝেনইনি, নয়তো তথাকথিত মূল স্রোতের বাম দলগুলোর মতো কৌশল করে মরতে বসেছেন। যে সমস্ত দেশে NOTA চালু হয়েছে সেখানে গণতন্ত্র কতোটা প্রসারিত হয়েছে, র শাসকশ্রেণীর দুর্নীতিগ্রস্থ দলগুলোই বা কতোটা চাপে থেকেছে, তার উদাহরণ কি আমাদের সামনে নেই? মানবধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, reformist বা সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে NOTA-র যা গুরুত্ব, কমিউনিস্ট বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও যদি সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করা হয়, তাহলে কমরেড, আপনি বুর্জোয়া ডেমোক্রেসি মোহে ডুবে যাচ্ছেন না তো? এই প্রশ্ন তোলা থাকলো। NOTA হলো অচ্ছু মানুষের মন্দিরে ঢোকার অধিকার পাওয়ার মতো। যেটা অবশ্যই ভালো। কিন্তু ওমন্দিরটা অচ্ছুতের শোন মুক্তির কেন্দ্র নয়, সেটা শোষন টিকিয়ে রাখারই প্রতিষ্ঠান, শোনকে নায্যতা দেওয়ারই প্রতিষ্ঠান সেটা ভুলে গেলে চলবে না।।

সৌম্য মণ্ডল :: লেখক, এক্টিভিস্ট (পশ্চিমবঙ্গ)

 

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s