লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

Irom_Chanu_Sharmilaইরোম শর্মিলা চানু, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নন, তথাপি তিনি মণিপুরের জনগণের আন্দোলনসংগ্রামের অনস্বীকার্য প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছেন। অথচ কর্পোরেট মিডিয়ার প্রচারণায় না থাকায় তার অব্যাহত নীরব আন্দোলন থেকে গেছে অনেকাংশেই পর্দার আড়ালে, অনেকের কাছেই এই ইতিহাস এখনো অজানা। একটি গণবিরোধী আইন বন্ধের দাবী, তথা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ বছর ধরে চলমান অনশনের ইতিহাস মানব সভ্যতায় বিরল। অথচ, তাকে নিয়ে লেখালেখিও যে খুব হয়েছে এমনটি নয়। উল্লেখ করার মতো গুটিকয়েক প্রকাশনা আর গ্রেপ্তারকৃত অবস্থায় কর্পোরেট মিডিয়ার কয়েক সেকেন্ডের খবরই কেবল তার জন্য বরাদ্দ ছিল।

ইরোম শর্মিলার এই সংগ্রাম বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, তা মণিপুরের নারীদের, মুক্তিকামী জনগণের ঐতিহাসিক লড়াইসংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। ইতিহাসে একক কোনো ব্যক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেন না, তথাপি ইতিহাসে ব্যক্তির অবদান অনস্বীকার্য। ইরোম শর্মিলা অনশনের মাধ্যমে যে বার্তা জনগণের কাছে পাঠাচ্ছেন, তা জনগণের নিকট পৌঁছানোটা জরুরী। আর তা হলো একটা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের লেবাসে মুড়িয়ে চলতে দেওয়া যায় না, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়েই যার যার জায়গা থেকে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। যে বিরাজনীতিকরণের রাজনীতির চর্চা সমাজে চলমান, তার বিপরীতে খানিক ভাবতে কি শেখায় না ইরোম শর্মিলার এক যুগেরও বেশি সময়ের এই অনশন ??

এক.

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যে পরাকাষ্ঠা চলমান রয়েছে পুরো মণিপুর জুড়ে, আর এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে জনগণের, তথা নারীদের যে সরব অংশগ্রহণ, ইরোম শর্মিলার যুগাধিক সময়কালের অনশন সেই আন্দোলন সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা মাত্র, একে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। একদিকে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সন্ত্রাস, আর অপরদিকে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ভারত রাষ্ট্রের প্রতি তোষণ, আর বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান ও ব্যাপক গণসম্পৃক্ততার অভাব; এমতাবস্থায় ২০০০ সালে মালোম হত্যাকাণ্ডটি ইরোম শর্মিলাকে যেন কাঁপিয়ে দেয়! ২০০০ সালের নভেম্বরের ২ তারিখে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত ১০ জন যাত্রীকে গুলি করে হত্যা করে অসম রাইফেলসএর জওয়ানরা। আর যে আইনের দোহায় দিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী অতীতের মতোই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ইরোম শর্মিলা সিদ্ধান্ত নেন এই গণবিরোধী “আফসপা (AFSPA)নামক আইনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামার। তিনি ৫ নভেম্বর মালোম পৌঁছান, আর সেখান থকেই শুরু হয় তার অনশন আন্দোলন। উল্লেখ্য যে, এই আইনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবেই রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে যে কোনো নাগরিককে হত্যার লাইসেন্স দেওয়া হয়। এই বিতর্কিত, গণবিরোধী আইন নিয়েই ইরোম শর্মিলার সংগ্রাম। আমরা যারা বাংলাদেশের জনগণ, তাদের জন্যও ইরোম শর্মিলা, তথা মণিপুরের আন্দোলনসংগ্রাম সম্পর্কে জানাবোঝাটা জরুরী।

ইরোম শর্মিলার পরিচয়

এক যৌথ পরিবারে ১৯৭২ সালের ১৪ মার্চ ইরোম শর্মিলার জন্ম। ছোটকাল থেকেই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে মণিপুরের মুক্তিকামী জনগণের লড়াইসংগ্রামের ইতিহাস শুনে শুনেই তিনি বেড়ে উঠেছেন, ইমফলের আর দশটা সাধারণ পরিবারের সন্তানের মতোই। তার বাবা নন্দা সিং ছিলেন সরকারী পশু চিকিৎসা বিভাগের এক সহকারী কর্মী। মায়ের নাম সাখী দেবী। মণিপুরের অতি সাধারণ পরিবারের মতো এই পরিবারেও ঘরের মেয়েরা এখনো কাঠের টুলে বসে তাঁত বুনে।

ছোটকাল থেকেই শর্মিলা ছিলেন শান্তশিষ্ট এবং সেই সাথে জ্ঞান পিপাসু। মাধ্যমিকে পড়ার সময়েই স্কুলের পাঠ্যপুস্তক শর্মিলার কাছে অর্থহীন মনে হয়। কারণ, সে বইয়ে তিনি তার আশেপাশের মানুষের জীবনসংগ্রাম দেখতে পান না। স্কুলে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ “গণতান্ত্রিক”রাষ্ট্রের সংবিধান পাঠে তার মনে প্রশ্ন জাগে এরই নাম কী গণতন্ত্র?ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস পাঠে উত্তরপূর্বাঞ্চলের কথা প্রায় অনুল্লিখিতই থেকে গেছে। তার মনে প্রশ্ন জাগে তবে কি এই বিশাল ভূখণ্ড ভারতের অংশ নয়?ভারতের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় কেন এই ভূখণ্ড এতোটা পিছিয়ে পড়া?আর এথেকেই শর্মিলার আগ্রহ জন্মায় রাজনীতির প্রতি। মণিপুর রাজ্য জুড়ে বিদ্রোহী মুক্তিকামী সংগঠনগুলোর প্রতিও তার আগ্রহ জন্মায়। সময়সুযোগ পেলেই তিনি তাদের খবর ও পত্রিকা মনোযোগ সহকারে পড়তেন।

পাঠ্যবইয়ের প্রতি অনীহার কারণেই তিনবারের চেষ্টায় মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুলেও, উচ্চমাধ্যমিক পাস করতে পারেননি। টানাটানির সংসারে জীবিকার তাগিদে তিনি একটি সাংবাদিকতার কোর্সে ভর্তি হন, আর এসময়েই তার ভাবজগতে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বিভিন্ন বিষয়ে আর্টিকেল লেখা ছাড়াও তিনি কবিতা লিখতে থাকেন একের পর এক। এ যেন নিজের কাছেই নিজেকে নতুনরূপে আবিষ্কার! এভাবে তার বয়সী আর দশটা তরুণতরুণীর চেয়ে তিনি পৃথক চিন্তাচেতনার অধিকারী হয়ে পড়েন। এবং তিনি অনুধাবন করেন দিল্লির সাথে মণিপুরের কেবল ভৌগোলিক দুরুত্বই মুখ্য নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও সংস্কৃতিগতভাবেও তা এক দূরের রাজ্য।

শাসক শ্রেণী সমগ্র দুনিয়ার সামনে ভারতের উন্নতি গাঁথা ফেরি করে বেড়ালেও ইরোম শর্মিলার সামনে বাস্তবতা হলো মণিপুরিদের অধীনস্ততা। সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়শই তিনি পড়তেন বিদ্রোহীদের সাথে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষের খবর; অথবা খবরে থাকতো জওয়ানরা গ্রামে হানা দিয়ে ধরপাকড়, নির্বিচারে সাধারণ মানুষের উপর গুলি, এবং নারীর উপর যৌন নিপীড়ন, এমন সব খবর। সর্বত্রই ছিল সশস্ত্র বাহিনীর ত্রাস আর সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ, মণিপুর যেন সর্ববৃহৎ “গণতান্ত্রিক” রাষ্ট্রের এক কলোনি বিশেষ!

১৯৯০ এর দশকেই দাদীর মুখে শোনা নুপিলানের গণআন্দোলনের কয়েকজন আন্দোলনকারীর সাথে শর্মিলার পরিচয় হয়। আরো পরিচয় হয় কয়েকটি মৈরা পাইবি(নারীদের দ্বারা গঠিত সামাজিক সংগঠন) সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে। তাদের কাছ থেকে মণিপুরের নারীদের লড়াইসংগ্রামের ইতিহাস শুনে তিনি ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ হন। যার ফলে তিনি পরবর্তীতে সামাজিক আন্দোলনে আংশগ্রহণের তাগিদ অনুভব করেন। ঐতিহাসিকভাবে মণিপুরের সকল আন্দোলনেই রয়েছে নারীদের বিশেষ ভূমিকা। প্রথম (১৯০৪) ও দ্বিতীয় (১৯৩৯) নুপিলানেও গণআন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই শ্রমজীবী নারীরা। পরবর্তী সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনসংগ্রামেও মণিপুরের নারীদের ছিল অসামান্য ভূমিকা।

শর্মিলার সংগ্রামী জীবনে তাকে বেশ কয়েকবার হাজতবাস করতে হয়েছে। ২০০০ সালে মালোম হত্যাকাণ্ডের পর ইরোম শর্মিলার অনশন শুরুর তিন দিন পরেই পুলিশ তাকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারাবলে “আত্মহত্যার চেষ্টার অভিযোগ”এ গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে একই অভিযোগে ইরোম শর্মিলাকে স্বল্প সময়ের জন্য আটক রাখা হয়। তাকে জোরপূর্বক অনশন ভাঙানোর চেষ্টা করা হলেও তাকে টলানো যায়নি। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও মুখে কোন খাবার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে, তাকে নাকের মাধ্যমে তরল খাবার, পানীয় ও ভিটামিন দেওয়া হয়। শর্মিলার উপর আনীত অভিযোগের (আত্মহত্যার চেষ্টার অভিযোগ) মামলা এখনো চলমান রয়েছে। এ বছরের মার্চ মাসে দিল্লির এক আদালত ইরোম শর্মিলাকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাগারে প্রেরণ করে। ভারতের চলমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা দেখিয়ে দিলো, কি করে গণবিরোধী আইনকে “গণতান্ত্রিক” রাষ্ট্রের আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়; আবার সে গণবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে অনশন করলে, তাকে কি করে আত্মহত্যার চেষ্টা নামে আখ্যায়িত করা যায় ! আর সেটা আবার তারা করেছে শতভাগ আইনসিদ্ধ পন্থায়। এই লেখাটি যখন লিখছি, তখনো পর্যন্ত ইরোম শর্মিলা ভারত রাষ্ট্রের কারাগারে বন্দি।

দুই.

অহিংস আন্দোলন ও জনগণের আন্দোলন

কোন গণবিরোধী ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে, বা কোন নির্দিষ্ট দাবী আদায়ের লক্ষ্যে বহুকাল ধরেই অহিংস আন্দোলনের ধারাটি চলমান রয়েছে। এ অঞ্চলে এই অহিংস রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সহস্র বছরেরও বেশি পুরনো। যার নিদর্শন আমরা পাই বৌদ্ধ দর্শন, জৈন দর্শন বা চার্বাক দর্শনের মতো প্রাচীন দর্শন শাস্ত্রে। এই দর্শনসমূহ ভারতীয় সভ্যতারই নিদর্শন।

খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দেরও পূর্বে গৌতম বুদ্ধ বৌধিপ্রাপ্ত হন। আর তার সাথেই রচিত হয় এই অহিংস আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। তৎকালীন বৈদিক সংস্কৃতির ভয়ানক হিংসার আবহে অহিংসার আরাধিত বৌদ্ধধর্ম তৎকালীন মানবজীবনে প্রবাহমান অশান্তিকে নিরসন করতে না পারলেও এই দর্শনে ছিল মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পৃতির বাণী। এই অহিংস ধর্মতত্ত্ব ক্রমেই লোকপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং শীঘ্রই আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে, বিভিন্ন সময়ে অনেকেই অহিংস আন্দোলনকে রাজনৈতিক কর্মসূচীরূপে গ্রহণ করেছেন। এর পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে গণমানুষের সশস্ত্র প্রতিরোধও ছিল, আজও আছে।

মূলতঃ অহিংস মতবাদের মূল বিষয় হলো হিংসা, দ্বেষ, দ্রোহ, লোভ, মোহ বর্জন করা এবং অহিংসার মাধ্যমেই হিংসার উপর জয়লাভ করা। আধুনিককালে গান্ধির হাত ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের সময়কাল থেকে এই রাজনীতির সুত্রপাত ঘটে। কিন্তু আমরা সবাই জানি যে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে গান্ধির এই রাজনীতির বিপরীতে সশস্ত্র ধারার রাজনীতিও ছিল। যার সুত্রপাত ঘটেছিল সন্যাস ও ফকির বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে এবং এর ধারাবাহিকতা আজও চলমান। তবে৪৭এর পরেও ভারত রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও গণহত্যার প্রতিরোধে অনেক প্রতিরোধকর্মী, যারা প্রধানভাবে গণআন্দোলনের সাথে যুক্ত, তারা অহিংস পদ্ধতিটা সংগ্রামের ধারা হিসেবে গ্রহণ করেন। যেমন জেলে বন্দী থাকাকালে ভগত সিং ব্রিটিশ ও ভারতীয় বন্দীদের সমানাধিকারের দাবিতে, নিজেদের রাজবন্দী ঘোষণার দাবীতে অনশন করেন। অনেক বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও গ্রেপ্তারের পর জেলে দাবী পূরণে অনশন আন্দোলন করেছেন। তবে অনশনের দাবী পূরণ করতে যখন শাসক শ্রেণীর ভিত কেঁপে উঠে, তখন তা যেন জনগণের নিকট অপ্রকাশিত থাকে, সে চেষ্টাটাই শাসকশোষকেরা করে থাকেন। যেমনটা ইরোম শর্মিলার ক্ষেত্রে করেছেন, করছেন।

ভারতের জনগণের মাঝে সাংস্কৃতিকভাবে অহিংস আন্দোলনের একটা বড় প্রভাব রয়েছে। ইরোম শর্মিলার ১৩ বছরের অনশনেও রাষ্ট্রযন্ত্রের দালাল মিডিয়া তার কথা প্রকাশের ক্ষেত্রে মুখে কূলুপ এঁটে রাখে। কারণ তার অনশনের দাবীটা যে জনগণের দাবী; রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, তথা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপরীতেই যে শর্মিলার অবস্থান। তার কথা বললেই যে বলতে হবে মণিপুরে ভারতের সম্প্রসারণবাদী চরিত্রের ইতিহাস, বলতে হবে মণিপুরের মুক্তিকামী জনগণের লড়াইসংগ্রামের ইতিহাস। কারণ আমরা জানি, মানুষ মাত্রই ঐতিহাসিক মানুষ, ইতিহাস বিচ্ছিন্ন মানুষের কোন অবস্থান নাই। আজকের এই মানুষ কালক্রমে ঐতিহাসিক লড়াইসংগ্রামের মধ্য দিয়েই বর্তমানের মানুষে পরিণত হয়েছে। আর ইরোম শর্মিলা মণিপুরের জনগণের লড়াইসংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসেরই একটা অংশ, বিচ্ছিন্ন কেউ নন।

মণিপুরের ইতিহাস, আন্দোলনসংগ্রামের ইতিহাস

মেইতিরা মণিপুরে সংখ্যাগুরু জাতিগোষ্ঠি। এছাড়াও মণিপুরে রয়েছে মোটামুটি তেত্রিশটি জাতিগোষ্ঠি কোম, ভাইফেই, তাঙখুল, আনাল, চিরু, চোথে, গাঙতে, গুইতে, হ্‌মার, কবু, খারম, খইবু, খোঙজাই, কোইরেং, মাও, মারিং, মারাম, লমজঙ, থাউডাং, থাউগাল, লিয়াঙমৈ, জেমি, ঙাতে, চোংথু প্রভৃতি। এই জাতিগোষ্ঠিগুলোকে স্থানীয়ভাবে সাধারণত নাগা ও কুকিচীন, এই দুইভাগে ভাগ করা হয়। কিন্তু প্রতিটা জাতিগোষ্ঠিরই পৃথক নিজস্ব স্বকীয়তা বিদ্যমান রয়েছে। সেখানকার লড়াইসংগ্রামের ইতিহাসের সাথে সেই স্বকীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। আর এ লড়াই যেমনটা নিজেদের অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক সংগ্রাম, তেমনি নিজেদের স্বকীয়তা বাঁচিয়ে রাখার সাংস্কৃতিক আন্দোলনও।

প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে ৩৩ খ্রিস্টাব্দে মণিপুরে নিংথৌজা রাজবংশের সুত্রপাত হয়, আর তা অব্যাহত থাকে ১৮৯১ সাল অবধি। সেই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নোঙডা লাইরেন পাখাঙবা; আর তার রানি লেইমা লেইসনা। তাদের রাজধানী ছিল ইম্ফল উপত্যকার মাঝখানে কাংলায়। তখন থেকেই কাংলা সেখানকার জনগণের আরাধ্য স্থান।

বহু শতক হতেই মণিপুর রাজ্যটি এক মধ্যবর্তী পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর এমনটি হয়েছে মণিপুরের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই। মণিপুরের পূর্বে রয়েছে মায়ানমার (পূর্বনাম বার্মা), দক্ষিণে মিজোরাম রাজ্য, পশ্চিমে আসাম আর উত্তরে নাগাল্যান্ড। মূলতঃ ভারতের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার ট্রানজিট রুট হিসেবেই এই রাজ্যকে ব্যবহার করতো অভিযাত্রী, বণিক, মিশনারী ও সৈনিকেরা।

১৭০৪ সালে বঙ্গদেশ থেকে শান্তি গোস্বামী নামক এক বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারক মণিপুরে গিয়ে ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। ১৭১৩ সালে রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন মহারাজ গরিব নিয়াজ। তিনি বৈষ্ণব দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে জনগণের উপরেও এই ধর্মে দীক্ষা নেওয়াটা বাধ্যতামূলক করেন। কিন্তু জনগণের অনেকেই ধর্মান্তরিত হওয়ার পরেও সনাতনী আচার বাদ দেননি, ফলে তা সাংস্কৃতিকভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে উদার ভাবাদর্শ হিসেবে সামনে আসে।

রাজতান্ত্রিক মণিপুর রাজ্য সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার হয় বার্মিজ রাজ্য দ্বারা। ১৬৩৫ সালে বার্মার রাজা তার রাজধানী আভায় স্থানান্তরিত করেন। তখন থেকেই মণিপুরসহ পার্শ্ববর্তী আরো কয়েকটি রাজ্যের সাথে বার্মার বিরোধ দেখা দেয়। ১৭৬২ সালে বার্মাকে শায়েস্তা করতে তৎকালীন মহারাজা জয় সিং ইংরেজদের সহায়তা লাভের আশায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে একটি চুক্তি করেন। যে চুক্তিবলে ইংরেজরা সেখানে অবস্থানের, কারখানা ও দুর্গ নির্মাণের সুযোগ পায়। আর এভাবেই এই জনপদে সাম্রাজ্যবাদের পদচিহ্ন অংকিত হয়।

১৮১৯ থেকে ১৮২৬ সাল অবধি বার্মা ও মণিপুরের মধ্যে যে একটানা যুদ্ধ চলে, সেই যুদ্ধকে বলা হয় সপ্তবৎসরের ধ্বংসকাণ্ড। মহারাজা গম্ভীর সিংএর বাহিনী “কবো উপত্যকায়” প্রবল অস্ত্র সম্ভারে সজ্জিত বার্মিজ বাহিনীর কাছে পর্যুদস্ত হয় ব্যাপকভাবে। পরবর্তীতে, যুদ্ধবন্দী নারীদের ধান মাড়াইয়ের গানের সাথে পাঠানো সাংকেতিক তথ্যের উপর ভর করে সাজানো যুদ্ধ কৌশলে মহারাজা গম্ভীর সিং জয়ী হন। আর এ যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মহারাজার বাহিনীকে সহায়তা করায় চুক্তির শর্তমতো কবো উপত্যকাটি ইংরেজদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

১৮২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধে পরাস্ত বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) সাথে ইয়ানদাবু ট্রিটি স্বাক্ষর করে ইংরেজ বাহিনী। এই চুক্তি অনুসারে, আসাম ও মণিপুর রাজ্য বার্মা পরবর্তীতে নিজেদের দখলে না নেওয়ার অঙ্গীকার করে। ফলে আসাম, মণিপুর ও রাখাইন রাজ্যে পরিপূর্ণভাবে ইংরেজদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে আসাম রাজ্য সরাসরি কোম্পানি শাসনে অধীনে চলে আসে। পরবর্তীতে, সমগ্র মণিপুর এবং বার্মাও ইংরেজদের অধীনে আসে।

উনিশ শতকের শেষের দিকে তিন ধর্মের মানুষের আগমণ ঘটে মণিপুরে। এসময়ে “পাঙাল” বলে পরিচিত মুসলমান ও কিছু সংখ্যক ব্রাহ্মণ পুরুষ সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে, তারা মূল জনগোষ্ঠির সাথে মিলে যান। তবে এ সময়েই সেখানে আবির্ভাব ঘটে খ্রিস্টীয় মিশনারীর, যার মূল উদ্দেশ্য কেবল ধর্ম প্রচার নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদের হাতকে আরো এক প্রস্থ সুদৃঢ় করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। আর এক্ষেত্রে এরা জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তবে মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠি মেইতিদের সমর্থন তারা পায়নি, কিন্তু আরো পিছিয়ে থাকা জাতিগোষ্ঠিকে নানা প্রলোভনের মাধ্যমে কাছে টেনে এই মিশনারী নিজেদের জায়গা করে নেয়। তবে সাংস্কৃতিকভাবে মণিপুরের জনগণ সেই সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেনি। বরং যারা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন তারাও নিজেদের স্বকীয়তা ত্যাগ করেননি।

ইংরেজ উপনিবেশিক শক্তি ১৮৯১ সালে মণিপুর রাজ্য দখল করে নেয়। ২৭ এপ্রিল ১৮৯১ তারিখে খোঙজমের নির্ধারক যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সেখানে ইংরেজ শাসন কায়েম হয়। অসংখ্য মুক্তিকামীদের সেসময়ে হত্যা করা হয়, অথবা নির্বাসনে পাঠানো হয়। জনগণের আরাধ্য স্থান কাংলার চৌহদ্দিতে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়। রাজতন্ত্রের পতনের পর শুরু হয় ঔপনিবেশিক শাসন, আর জনগণ হতে থাকে আরো বেশি শোষিত।

Women_agitation_against_British_1939_(The_2nd_Nupi_Lan)১৯০৪ সালে মণিপুরের পুরুষদের কবো উপত্যকা থেকে কাঠ সংগ্রহে কাজে বাধ্যতামূলক নিয়োগকে কেন্দ্র করে মণিপুরের নারীরা আন্দোলন গড়ে তোলে, যা প্রথম নুপিলান নামে পরিচিত। বর্তমানে যেখানে নুপিলান কমপ্লেক্স অবস্থিত, সেখানে ব্রিটিশ বাহিনী আন্দোলনকারীদের উপর হামলে পড়ে। মূলতঃ এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মণিপুরের নারীরা আন্দোলনসংগ্রামের নতুন দিশা দেখিয়েছেন, যা আজ অবধি চলমান। ১৯০৭ সালে মহারাজা চূড়াচাঁদ সিং প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে সিংহাসনে আরোহন করলে জনগণের মাঝে আশার সঞ্চার হয়, কিন্তু সহসাই জনতা বুঝতে পারেন এই রাজা ইংরেজদের হাতের পুতুল ভিন্ন কিছু নন, এর বাইরে তার কোনো ক্ষমতা নেই।

ঔপনিবেশিক শোষণশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভুত অসন্তোষ ও ক্ষোভ খুব শীঘ্রই বিস্ফোরিত হয়। ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সালের অন্তর্বর্তী পর্বে ইংরেজ বাহিনীতে বাধ্যতামূলক ও বলপূর্বক নিয়োগের বিরুদ্ধে কুকি জাতিগোষ্ঠি বিক্ষোভ আন্দোলনে সামিল হয়; এই বিদ্রোহ মিটতে না মিটতেই ১৯২০২১ সালে দেখা দেয় বাজার বয়কট আন্দোলন। সমসাময়িক সময়ে বেশ কয়েকটি আন্দোলন শুরু হয় মণিপুর রাজ্য জুড়ে। সেসময়ে ২ টাকার মূল্যমান ছিল অনেক। অথচ বার্ষিক ২ টাকা জলকর ধার্য করা হয়, আর এর বিরুদ্ধে ১৯২৫১৯৩২ সালে গণরোষ বিস্ফোরিত হয় জলকর আন্দোলন রূপে। ১৯৩০৩২ সালে দেখা দেয় জালিয়াঙরঙ আন্দোলন, যা ছিল মূলত খ্রিস্টিয় ধর্মান্তরণের বিরোধিতায় এক জঙ্গী প্রতিবাদ।

nupi_lan১৯৩৯ সালে প্রবল বর্ষণের ফলে ধানের উৎপাদন ব্যহত হয়। কিন্তু মাড়োয়ারি বেনিয়ারা নানান ফন্দিতে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মজুদদারীর মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। এসময়ে মাড়োয়ারিরা এই ধানচালের একটা বড় অংশ রপ্তানি করতো কোহিমা, সাদিয়া, আইজল, লোকরা, দারাং, ইটানগরের আসাম রাইফেলস বাহিনীর ক্যাম্পেক্যাম্পে। তাই এই মজুদদারী ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ইংরেজ প্রশাসনের কোন মাথা ব্যাথা ছিল না।

১১ ডিসেম্বর ১৯৩৩ তারিখে মণিপুরের নারী সমাজ ব্রিটিশ রাজনৈতিক প্রতিনিধির কাছে মণিপুর থেকে বাইরে চাল রপ্তানির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করে। কিন্তু সেই আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন ব্রিটিশ রাজনৈতিক প্রতিনিধি। সাম্রাজ্যবাদীদের ঔদ্ধত্যে আহত নারীরা সহসাই ফুঁসে ওঠে, শুরু হয় গণপ্রতিরোধ, গণআন্দোলন। এই আন্দোলনসংগ্রাম দ্বিতীয় নুপিলান নামে পরিচিত। এটি ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মূলতঃ দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে, ১০ মে ১৯৪২ তারিখে সাম্রাজ্যবাদী জাপান ইম্ফলে বোমা বর্ষণের পর দ্বিতীয় নুপিলান স্তব্ধ হয়ে পড়ে। তবে এর রেশ রয়ে যায় পরবর্তীতে গড়ে উঠা সকল আন্দোলনসংগ্রামে।

১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট মণিপুরের মহারাজা বোধ চন্দ্র আর ইংরেজ সরকারের গভর্নর জেনারেল লুই মাউন্টব্যাটনের মধ্যে এক চুক্তির মধ্য দিয়ে মণিপুর রাজ্যকে ডোমিনিয়ান বা সায়ত্বশাসনের মর্যাদা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মণিপুর একটি স্বাধীনসার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হয়। ১৯৪৮ সালে গণভোটের মাধ্যমে মণিপুরের জনগণ রাজাকে সাংবিধানিক প্রধান নির্বাচিত করে, রাজার অধীনে একটি সরকার শপথ গ্রহণও করে। কিন্তু তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। এর পরের ইতিহাস নতুন আগ্রাসনের ইতিহাস। সেই সাথে সূচনা হয় ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের থাবা থেকে মুক্তির এক নতুন লড়াইয়ের।

তিন.

ভারত রাষ্ট্রের চরিত্র

কোন রাষ্ট্র যখন ঔপনিবেশিক কাঠামোয় গড়ে উঠা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে (যেমন সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন) প্রায় অপরিবর্তিত রেখে নিজেকে স্বাধীনসার্বভৌম বলে ঘোষণা করে, অখণ্ডতার বুলিতে জাতীয়তাবাদের গান শোনায়, তখন সেটি গণতন্ত্রের লেবাস ধরলেও, তা কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে পারে না। বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলো তেমনি নির্বাচন সর্বস্ব পোষাকী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাতে জনগণের নাম ভাঙিয়ে শাসক শ্রেণীর গণনিপীড়ন বলবৎ থাকলেও জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ণ থাকে সুদূর পরাহত।

চরিত্রগতভাবে ভারত সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে পরিচালিত হলেও ভারতের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই তার এক বিশেষ চরিত্র; তা হলো ভারতের সম্প্রসারণবাদী চরিত্র। ভারতের শাসক শ্রেণী ব্রিটিশ ভারতের সময়কালেই ক্ষমতা কাঠামোর নৈকট্যে থাকার ফলে দখলদারিত্বের বিদ্যাটা তাদের বেশ ভালোই জানা ছিল ডিভাইড এন্ড রুল। তাই ভারত বিভাগের পর পরই আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার করাটাই তাদের আরাধ্য হয়ে উঠে। সম্প্রসারণবাদী নীতিকে সামনে রেখেই ভারতের শাসক শ্রেণী ভারত রাষ্ট্রের জন্মলগ্নেই দখল করে নেয় কাশ্মির, উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য (সেভেন সিস্টারস); আশেপাশের অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে সামরিকবেসামরিক আগ্রাসন চালিয়ে ভারতের করদ রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র তখনই শুরু হয়। যা এখনো চলমান।

এখানে দেশেদেশে চলমান সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন সম্পর্কেও কিছু কথা বলাটা বাঞ্ছনীয়। কারণ সাম্রাজ্যবাদের এই রূপে গত কয়েক দশকে কিছু মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, আর তাই পরিবর্তন এসেছে তার আগ্রাসনের মাঝে, তার মার্কেট দখলের মাঝেও। বর্তমানে যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন আমাদের সামনে আবির্ভুত হয়েছে, তা হলো – “কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ”। কর্পোরেটদের অস্ত্র ব্যবসা; প্রাকৃতিক সম্পদ আর জলজমি, তথা মার্কেট দখলের জন্যই চলছে যুদ্ধ, কখনো গণতন্ত্রের নামে, কখনো বা সন্ত্রাস নির্মূলের নামে। এই আগ্রাসনে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে মেরিন সেনাদের হত্যাযজ্ঞে পাঠালেও, অযাচিত গোয়ান্দাবৃত্তির খড়গ পোড়ালেও, সেই আগ্রাসন কিন্তু হয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে, বিশ্বায়নের বুলি আওড়ে বিশ্বব্যাপী বাজার দখল করাটাই যার প্রধান লক্ষ্য।

ভারত নিজেই সাম্রাজ্যবাদ পীড়িত, এর শাসক শ্রেণী সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়। কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করেই চলতে হয় ভারতের শাসক শ্রেণীকে। তারা কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে করছে বিবিধ গোপন চুক্তি, আর এর ফলশ্রুতিতে কর্পোরেটদের হাতে জল, জঙ্গল, জমি, প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দিচ্ছে অকাতরে। গড়ছে “স্পেশ্যাল ইকোনমিক জোন”। কৃষকেরা না খেয়ে আত্মহত্যা করলেও তারা ঝোলায় জিডিপির মূলা! জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডও এখন পরিণত হচ্ছে কর্পোরেটের সামাজিক ব্যবসায়। অপরদিকে, জনগণের আন্দোলন সংগ্রামকে ধ্বংস করতে তারা তৈরী করে নিত্য নতুন গণবিরোধী আইন। এই আইন আবার শতভাগ সংবিধান সম্মত। আর এ থেকে সংবিধানের স্বৈরতান্ত্রিক চেতনা বেশ ভালোই আঁচ করা সম্ভব। একে তারা বলছে গণতন্ত্র! হ্যাঁ, এটিই সম্ভবতঃ সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত গণতন্ত্রের নমুনা!

তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের সাথে ভারতের ট্রানজিট বা করিডোর, টেলিকরিডোর ও বন্দীবিনিময় চুক্তি বিশেষ গুরুত্ববহ, কারণ এর সাথে জড়িত রয়েছে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের মুক্তিকামী জনগণের চলমান সংগ্রাম। অর্থনীতির লেবাসে বলা হলেও, ট্রানজিট নামের করিডোর বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও, উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে দখলে রাখার জন্য করিডোর ভারতের জন্য অপরিহার্য। বছরের পর বছর প্রবল সামরিক নিপীড়নে পিষ্ট উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের জনগণ অতীষ্ট। সশস্ত্র বিদ্রোহী দলগুলার উপর রাজনৈতিকসামরিক চাপ প্রয়োগ ও সমঝোতায় বাধ্য করার ক্ষেত্রে এই করিডোর তাদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত দলগুলোর প্রতি ভারতের নতুন মনোভাব এবং করণীয় করিডোরের বাস্তবায়নের সাথে জড়িত। বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডোর বেসামরিক খাত থেকে অনেক বেশি ব্যবহৃত হবে সামরিক খাতে। অর্থাৎ, সেভেন সিস্টারসএ সামরিক বাহিনীর জন্য রসদ ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে করিডোর ব্যবহার করা হবে। অপরদিকে, টেলিকরিডোর ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ ও উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে টেলিকম ও ইন্টারনেটে নজরদারী করার জন্যে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে আইসিটি অ্যাক্ট হয়েছে, সন্ত্রাস বিরোধী আইন সংশোধিত হয়েছে। আর বাংলাদেশের সাথে বন্দী বিনিময় চুক্তি না থাকায় আসামের বিদ্রোহী সংগঠন উলফার নেতা অনুপ চেটিয়াকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যেতে পারছিল না ভারত সরকার। বন্দী বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে বন্দী হস্তান্তর নিয়ে আর কোন জটিলতা থাকছে না। অর্থাৎ, এ চুক্তির ফলে, কোন বিদ্রোহী সংগঠনের সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে বাংলাদেশ তাকে ভারতের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবে।

উপরোক্ত আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার করতে পারলেও ভারত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মতো নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে অনেক ক্ষেত্রেই সক্ষম নয়।

সম্প্রসারণবাদী ভারতের দখলীকরণ

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের পরপরই শুরু হয় তার সম্প্রসারণবাদী নীতির প্রতিফলন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা ভারতপাকিস্তানের শাসক শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিলেও কোন কোন ভূখণ্ড তখনো ভারতপাকিস্তান কোন অংশের সাথে না গিয়েও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের একটি জম্মুকাশ্মির। ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭ পর্যন্ত তা ছিল স্বাধীন রাজ্য। প্রজাদের অসন্তোষ ও পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণের খবরে ২৬ অক্টোবর কাশ্মিরের মহারাজা হরি সিং শ্রীনগরে পালিয়ে যান এবং ভারতের সাথে একীভুত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করে মাউন্ট ব্যাটেন বরাবর চিঠি পাঠান এবং নিজেকে রক্ষার আবেদন জানান। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল নেহেরু সরকার ও মাউন্ট ব্যাটেনের মিলিত পূর্বপরিকল্পিত কাজ। পরবর্তীতে, জওহরলাল নেহেরু তার চিঠি ও ভাষণে বহুবার বলেছেন যে, কাশ্মিরের মালিক কাশ্মিরের জনগণ, তারাই সিদ্ধান্ত নিবে তারা কাদের সাথে থাকতে চায়। গণভোটের আশ্বাস দেওয়া হলেও, তা কেবলই বুলিসর্বস্ব। বাস্তবতা হলো এসবই হাতির বহিঃস্থ দাঁতের মতো সৌন্দর্য্য বর্ধনের উপকরণ মাত্র। কাশ্মির আজো লক্ষলক্ষ সেনাবাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত, যেখানে আজো কায়েম রয়েছে “মিলিটারি রাজ”। বর্তমানে কাশ্মিরের বেশিরভাগ অংশই ভারতের দখলে, একাংশ পাকিস্তানের দখলে, আর একাংশ চীনের দখলে। আর কাশ্মিরীদের মুক্তির সংগ্রাম আজো চলমান।

কাশ্মিরের মতোই বর্তমান ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহও ঐতিহাসিকভাবে ভারতের অংশ ছিল না। নানান ফন্দিফিকিরে তা দখল করা হয়েছে। তখন ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলে তিনটি রাজ্য ছিল, যার মাঝে মণিপুর ও ত্রিপুরা ছিল স্বাধীন রাজ্য, আর আসাম ছিল সরাসরি ইংরেজ শাসনের অধীন। ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই আসাম ভারতের অংশ। কিন্তু আসাম রাজ্যের স্বাধীনতার লড়াই অনেক পূর্ব হতেই চলমান থাকায় জাতিগত, ধর্মগত ও ভাষাগত পর্যায়ে আসামকে টুকরো টুকরো করা হয়। এ যেন “ডিভাইড এন্ড রুল” পলিসির পুনরুদ্ভাবন। ১৯৬৩ সালে গঠিত হয় নাগাল্যান্ড, ১৯৭২ সালে মেঘালয় ও মিজোরাম এবং ১৯৮৭ সালে গঠিত হয় অরুণাচল প্রদেশ।

৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ তারিখে ত্রিপুরার রাজা বীর বিক্রম কিশোর দেববর্মণ ভারত সরকারের সাথে একীভুত হওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এরই ফলশ্রুতিতে ১৫ সেপ্টেম্বর ত্রিপুরা ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়, এবং পরবর্তীতে তা তৃতীয় শ্রেণীর রাজ্যের মর্যাদা পায়।

১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর মহারাজা বোধ চন্দ্রের সাথে ভারত সরকারের এক চুক্তির মাধ্যমে মণিপুর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই চুক্তিটি ছিল মণিপুরের পরাধীনতার চুক্তি। এ চুক্তি মতে, মণিপুরের মর্যাদা হয় ভারতের এক প্রান্তিক তৃতীয় শ্রেণীর রাজ্য হিসেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ক্ষেত্রে মহারাজাকে জোরপূর্বক রাজি করানো হয়েছিল, যা রাজার বিশ্বস্তদের মাধ্যমেই করা হয়। ছলে বলে কৌশলে রাজাকে ভারত সরকারের অনুকূলে এনে মণিপুরের দখলীকরণ, ভারত রাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। সেই সাথে শুরু হয় মণিপুরে সম্প্রসারণবাদী ভারতের গণনিপীড়নের ইতিহাস।

manipur_protestপরবর্তীতে, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি, ভারতের সংবিধান রচনাকালেও মণিপুরকে এক তৃতীয় শ্রেণীর অঙ্গরাজ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৫৬ সালে মণিপুরকে প্রথম ইউনিয়ন টেরিটরি বা কেন্দ্রশাসিত অঙ্গরাজ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এবং ১৯৫৭ সালে অঙ্গরাজ্যের কাউন্সিলের নির্বাচন হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী নীতির স্বৈরশাসনের পোষাকী গণতন্ত্রের নমুনা। চারিদিকে ক্ষোভ, অসন্তোষ দেখা দেয়। অবশেষে নানা টালবাহানার পর ১৯৭২ সালে মণিপুরকে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যদিও রাজ্যটিকে কখনোই সম্প্রসারণবাদীরা আপন করে নেয়নি। যে কারণে তারা সেখানে উন্নয়নমূলক কোন পথ অনুসরণ না করে অশিক্ষা ও মাদক দ্রব্যের বিস্তারের পথটিই সুগম করেছিল। বিশেষতঃ সেখানে মদ্যপান মহামারীর আকার ধারণ করছিল। সেই সাথে চোরাপথে মায়ানমার থেকে আসতে থাকে হেরোইন, মরফিন, পেথিড্রিনের মতো মাদক দ্রব্য।

১৯৭৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর মণিপুরের নারীদের উদ্যোগেই গঠিত হয় “নিশা বন্‌ধ” নামে একটি সংগঠন। যার মূল কাজ ছিল নেশাজাত দ্রব্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা। এই আন্দোলন সমগ্র মণিপুরে ছড়িয়ে দিতেই ২১ এপ্রিল ১৯৭৬ এই রকমের সংগঠনগুলি এক সমাবেশের আয়োজন করে। আর সেখান থেকেই গঠিত হয় একটা কেন্দ্রীয় সংগঠন অল মণিপুর উইমেনস সোশ্যাল রিফরমেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সমাজ (এমডব্লিউএসআরডিএস) গঠিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে, পরবর্তীতে ৪ এপ্রিল ১৯৮০ তারিখে মদ্য ও মাদক দ্রব্য নিষিদ্ধকরণের দাবীতে রাজ্যব্যাপী বন্‌ধ (হরতাল) পালিত হয়।

চার.

বিদ্রোহী গ্রুপ ও সশস্ত্র সংগ্রাম

১৯৪৯ সালে ভারতের সম্প্রসারণবাদী নীতি অনুসারে মণিপুর ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হওয়ার পর থেকেই মণিপুরকে স্বাধীন করার জন্য, সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য বেশকিছু বিদ্রোহী গ্রুপ ক্রিয়াশীল থাকে। কেন্দ্রশাসিত রাজ্যে কেন্দ্র সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর স্বৈরশাসন ও গণনিপীড়নের কারণে ব্যাপক বৈষম্যমূলক সমাজে বিদ্রোহীদের প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত সমর্থনও ছিল। আর এটিই কেন্দ্রীয় সরকারের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

unlf-soldiers১৯৪৯ সালে ভারতের মণিপুর রাজ্য দখলের পর থেকেই মুক্তিকামী জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যা ১৯৬৪ সালে সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়। উত্তরপূর্ব ভারতের সবথেকে পুরনো সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনগুলির অন্যতম হলো ফেডারেল গভর্নমেন্ট অফ নাগাল্যান্ড (এফজিএন)। ১৯৬৫ সালে গঠিত এই সংগঠনটির মূল ভিত্তি ছিল উখ্রুলে; আর সেনাপতি ও তামেংলঙ জেলার জঙ্গলে চলতো সশস্ত্র প্রশিক্ষণ। পরবর্তীতে, এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড (এনএসসিএন)। ১৯৮৮ সালে সংগঠনটি দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এনএসসিএন (কে) এবং এনএসসিএন (আইএম)। ১৯৬৪ সালে অরাম্বব সমরেন্দ্র গঠন করেন ইউনাইটেড ন্যাশনাল বিবারেশন ফ্রন্ট (ইউএনএলএফ)। ১৯৭৭ সালে আর. কে. তুলাচন্দ্রের নেতৃত্বে গঠিত হয় পিপলস্‌ রিভলিউশনারি পার্টি অফ কাংলৈপক (পিআরইপিএকে), ১৯৭৮ সালে এন. বিশ্বেশ্বরের নেতৃত্বে গঠিত হয় পিপলস্‌ লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)

manipur_arm_struggleমণিপুরে বর্তমানে কমপক্ষে ৩৫টি সংগঠন সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িত রয়েছে। যার মধ্যে ইউএনএলএফ, পিআরইপিএকে, পিএলএ, এনএসসিএন (আইএম), এনএসসিএন (কে), রেভলিউশনারি পিপলস্‌ ফ্রন্ট (আরপিএফ), কাংলাই যাগল কান্‌না লুপ (কেওয়াইকেএল), কুকি ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (কেএনও), কুকি ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ), কুকি লিবারেশন অর্গানাইজেশন (কেএলও), কুকি লিবারেশন আর্মি (কেএলএ), জাউমি রেভলিউশনারি আর্মি (জেডআরএ), হমার পিপলস্‌ কনভেনশন/ডেমোক্রেটিক (এইচপিসিডি), কাংলৈপক কমিউনিস্ট পার্টি (কেসিপি), মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট পার্টি অফ মণিপুর (এমএলএম), কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওয়িস্ট) রয়েছে।

১৯৮০ সালে পিপলস্‌ রিভলিউশনারি পার্টি অফ কাংলৈপক (পিআরইপিএকে) থেকে একটি অংশ বেরিয়ে এসে গঠন করে কাংলৈপক কমিউনিস্ট পার্টি (কেসিপি)। বহুধা বিভক্ত কাংলৈপক কমিউনিস্ট পার্টি (কেসিপি)-এর একটি অংশ পরিচিত ছিল কাংলৈপক কমিউনিস্ট পার্টি (মাওয়িস্ট) নামে। ২০১১ সালে প্রথম পার্টি কংগ্রেসে পার্টির নাম পরিবর্তিত হয়ে গঠিত হয় মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট পার্টি অফ মণিপুর (এমএলএম)। এছাড়াও সম্প্রতি মণিপুরে ক্রমেই জনসম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওয়িস্ট), যে রাজনৈতিক দলটিকে ভারত সরকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে এক নম্বরে রেখেছে।

সীমাবদ্ধতা

এই সংগঠনগুলোর বেশিরভাগই মণিপুরকে ভারত থেকে স্বাধীন করতে তৎপর। কেউ এই প্রশ্নে জাতীয়তাবাদকে সামনে নিয়ে এসেছে, আবার কেউ কেউ আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন। কিন্তু সমগ্র রাজ্যের মেহনতিশ্রমজীবী জনগণের, তথা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির উপর কেন্দ্রীয় ভারতের শাসক শ্রেণীর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে সর্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে তারা সমর্থ হননি। নিজেদের রাজনৈতিকমতাদর্শিক চিন্তাই এই সীমাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। জাতীয়তাবাদ, কোন জাতির জাতিগত পরিচয়ের মাঝেই আবদ্ধ থাকে। তা যেমন অন্য জাতির মুক্তির লড়াইকে সহযোগী ভাবতে পারে না, তেমনি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির লড়াইকে নিজের লড়াই মনে করতে পারে না।

ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ মানব সমাজের দুইটি সংবেদনশীল অংশ, আর এ দুটোকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বিশ্বকে বিভক্ত করে বাজার দখলের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী ভারত নিজের সম্প্রসারণবাদী নীতিতেও এ প্রক্রিয়ারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ধর্মের নামে, জাতির নামে নিপীড়িত জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতীয় শাসকেরা শতভাগ সফল হলেও মুক্তিকামীরা নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই অসফল রয়ে গেছে। ভারতের শাসক শ্রেণীও তেমনটিই চায়। জাতিগতভাবে বিভক্ত জনগণকে শাসনশোষণ করাটা সর্বোতই সোজা।

অপরদিকে, বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্ত বিভিন্ন কারণে। কোথাও সংশোধনবাদ, কোথাও অতিবিপ্লবী, কোথাও বা প্রতিবিপ্লবী। যদিও জনগণের অগ্রসর একটা অংশ সর্বদাই বুঝতে সক্ষম যে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়তে হলে তার মূল্য রক্ত দিয়েই পরিশোধ করতে হয়। জনগণের মাঝে এদের গ্রহণযোগ্যতাও ছিল বেশ, কারো কারো ক্ষেত্রে এখনো গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আর এই গণআন্দোলন জোরদার না হওয়াতেই সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে দিকভ্রান্ত হয়েছে, বিভক্তিও এসেছে অনেক অনেক।

পাঁচ.

militarisation-2মণিপুরে অঘোষিতভাবে “মার্শাল ল” বা সামরিক আইন বলবৎ রয়েছে। এই অঞ্চলে বিদেশীদের প্রবেশাধিকারও সীমিত। যা প্রবেশাধিকার রয়েছে, তাতেও রয়েছে কড়া নজরদারী। মানবাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুদূর পরাহত। ভারতীয় আর্মি ও নিরাপত্তারক্ষীরা মণিপুরে কায়েম করেছে এক নারকীয় সন্ত্রাসের।

বিদ্রোহীদের সমূলে বিনাশের জন্য মণিপুরে পাঠানো হয়েছে সেনাবাহিনী। কিন্তু ওই বাহিনী বিদ্রোহীদের নামে যে কাউকে আটক, নির্যাতন, হত্যা করে চলেছে দেরারসে। বিদ্রোহীরা কোন অপারেশন চালালে সেই এলাকায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী অভিযান চালিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করে, এক কথায় বিদ্রোহীদের নাম ভাঙিয়ে তারা মণিপুরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কায়েম করে রেখেছে মণিপুরে।

১৯৮০ সালে মণিপুরের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী দোরোন্দ্রো সিং আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির দোহায় দিয়ে রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে সমর্পণ করেন। যা ছিল পুরো উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে কাশ্মিরের মতো সামরিকায়নের ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী চক্রান্ত। আর এর মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনের নামে রাষ্ট্রের সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা প্রদান করা হয়। আফসপা (AFSPA) হলো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সেই রক্ষাকবচ। সন্ত্রাস বিরোধী আইনের নামে সেখানে বলবৎ রয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়া “আফসপা (AFSPA)”-এর মতো সন্ত্রাসবাদী আইন।

আর্মড ফোর্সেস (স্পেশ্যাল পাওয়ারস) অ্যাক্ট, ১৯৫৮

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ, ও মিজোরামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অফিসার ও জওয়ানরা আর্মড ফোর্সেস (স্পেশ্যাল পাওয়ারস) অ্যাক্ট বা আফসপা (AFSPA) আইনবলে বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করে, অথবা অন্য কথায় বলা যায় এই আইনবলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে ১৯৫৮ সালে আইন আকারে উত্থাপিত ও ১৯৭২ সালে সংশোধিত আফসপা (AFSPA)নামক এই আইনের বয়ান নিম্নে তুলে দেওয়া হলো

. এই আইন অতঃপর আর্মড ফোর্সেস (স্পেশ্যাল পাওয়ারস) অ্যাক্ট, ১৯৫৮ হিসেবে উল্লেখিত হবে।

. এই আইন সমগ্র আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা রাজ্যে এবং অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরামের মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বলবৎ হবে।

() আর্মড ফোর্সেস বা সশস্ত্র বাহিনী শব্দবন্ধে এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সামরিক ও বিমান বাহিনী বোঝাবে;

() আর “উপদ্রুত অঞ্চল” শব্দবন্ধে বোঝাবে ৩নং বিজ্ঞপ্তি অনুসারে যে সকল অঞ্চল উপদ্রুত বলে ঘোষিত;

() সামরিক বাহিনী আইন, ১৯৫০ এবং বিমান বাহিনী আইন, ১৯৫০ এই দুয়ে যে সকল শব্দার্থ বা পরিভাষা সংজ্ঞায়িত হয়নি, সেগুলি ব্যতিরেকে এখানে প্রযুক্ত সকল টার্মের এবং তাদের দ্যোতনার ক্ষেত্রে উল্লিখিত ধারার অর্থ বহন করবে।

. কোনো রাজ্যে বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে উল্লিখিত রাজ্যের রাজ্যপাল বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রশাসক, কিংবা কোনো কেন্দ্র সরকারের প্রতিনিধি যদি মনে করে যে উক্ত রাজ্য বা অঞ্চলের সমগ্র বা কোন অংশকে উপদ্রুত বা বিপজ্জনক ঘোষণা করে স্থানীয় সরকারকে সহায়তার করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে ডাকা আবশ্যক, সেটা তারা ডাকতে পারবে; আর সেক্ষেত্রে রাজ্যপাল, প্রশাসক বা কেন্দ্রীয় সরকার, যেখানে যেমন প্রযুক্ত, সরকারি সমগ্র বা তার এক অংশকে “উপদ্রুত অঞ্চল” ঘোষণা করতে পারবে।

. এই আইনবলে কমিশনড, ননকমিশনড, ওয়ারেন্ট অফিসার বা সামরিক বাহিনীর সমপদমর্যাদার কোনো অফিসারের উপর নিম্নলিখিত দায়িত্ব ন্যস্ত করতে পারবে:

() তথাকথিত উপদ্রুত অঞ্চলে কোনো দুষ্কৃতিকারীকে দেখতে পেলে বা পাঁচজনের অধিক লোকের কোনো জটলা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বা আঘাত হানার মতো প্রাণান্তকর হাতিয়ার, বিস্ফোরকসহ লোকজনকে দেখে, আপন বিবেচনামতো, বিপজ্জনক মনে করলে যথাযথ হুঁশিয়ারি দিয়ে ওই সন্দেহভাজন দুষ্কৃতিকারীদের লক্ষ্য করে প্রাণহানির সম্ভাবনা সত্ত্বেও নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করতে পারবে;

() অফিসার যদি তার বিবেচনায় মনে করে যে সেখানে কোনো অস্ত্রভাণ্ডার লুকানো আছে বা কোনো শিবির বা ছাউনি থেকে সন্দেহভাজন দুষ্কৃতিকারীরা হামলা চালাতে পারে কিংবা সেখানে কোনো প্রশিক্ষণ শিবিরে বিদ্রোহীদের শিক্ষাদান চলছে তাহলে সেগুলি ওই অফিসার, নিজ বিবেচনেয়, ভেঙেচুরে দিতে পারবে;

() এই আইনবলে আদালতযোগ্য অপরাধে দোষী বা সম্ভাব্য দোষী কিংবা সন্দেহভাজন কাউকে ওই অফিসার কোনো প্রকার ওয়ারেন্ট ছাড়াই যেমন পাকড়াও করতে পারবে তেমনি তার বিবেচনামতো তার উপর জোরজুলুমও চালাতে পারবে;

() এই আইনবলে কোনোরূপ ওয়ারেন্ট ছাড়াই নিছক সন্দেহবশত ওই অফিসার যে কারও ঘরবাড়িতে তল্লাশি চালাতে পারবে; আর সেখানে সন্দেহভাজন লোক, বস্তুসামগ্রী, অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ বা বিস্ফোরক বস্তু মজুদ রয়েছে ধারণায় সেগুলি উদ্ধারেও নামতে পারবে; এবং সেই উদ্ধারকার্যে আবশ্যকমতো বলও প্রয়োগ করতে পারবে।

. এই আইনবলে ধৃত প্রত্যেককে অতি অবশ্য নিকটবর্তী থানায় অনতিবিলম্বে হাজির করতে হবে; এবং ওই অফিসারকে তার রিপোর্টে কীভাবে ও কী অবস্থায় আসামিকে পাকড়াও করা হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণও দিতে হবে।

. এই আইনে যে বিশেষ ক্ষমতা প্রদত্ত হয়েছে তারই বলে কারও উপর সংঘটিত কোনো অত্যাচারঅবিচারের বিরুদ্ধে কোনো ভুক্তভোগী/আসামি কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে কোনো ন্যায়ালয়ে বা কারও কাছে নালিশ জানাতে পারবে না বা কোনো আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না।

—————————————————–

উক্ত আইনের বয়ান থেকে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী পাঁচ বা ততোধিক লোকের জটলা দেখে, নিজ বিবেচনা মতো, তাদের বিপজ্জনক মনে হলে, নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করতে পারবে। কোনো স্থাপনা বা বাড়ীঘর বিদ্রোহীদের সাথে সম্পর্কিত মনে হলে, তা গুড়িয়ে দিতে পারবে। যে কাউকে সন্দেহভাজন মনে হলে, নিজ বিবেচনায় জেলজুলুম করতে পারবে। রাস্তায় যে কারো যে কোনো মালামাল নিজ বিবেচনায় লণ্ডভণ্ড করতে পারবে। আর এই হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, রাহাজানির বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী কোনো আদালতে নালিশও করতে পারবেন না। এই হলো পৃথিবীর বৃহত্তম “গণতান্ত্রিক” রাষ্ট্রের “গণতান্ত্রিক” আইন।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও জনগণের প্রতিরোধ

আর দশটা বুর্জোয়া সশস্ত্র বাহিনীর মতোই ভারত রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীও গড়ে উঠেছে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয়, গণবিরোধী চরিত্রের অধিকারী হয়ে, যারা জনগণ সম্পর্কে অন্তরে পোষণ করে “ব্লাডি সিভিলিয়ানস”এর ধারণা। এই বাহিনী মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক ভারতের বাহিনী। ভারত রাষ্ট্রের জন্মের পর এই বাহিনীকে নতুন গণতান্ত্রিক চিন্তায় সজ্জিত করা হয়নি, যে কারণে সশস্ত্র বাহিনীতে ঔপনিবেশিক চিন্তাচেতনা বেশ ভালোই হাওয়া পেয়েছে। আর পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় নারীর প্রতি অবমাননা, নিপীড়ন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। নারী এখানে কেবলই যৌনবস্তু ভিন্ন কিছু নয়। সেই সাথে তাদের গেলানো হয় জাত্যাভিমানের তীব্র পাওয়ারের বটিকা। উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে মোতায়েন সশস্ত্র বাহিনীগুলো, তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের জন্যই জাতিগত নিপীড়ন ও নারী নির্যাতনের পথ অনুসরণ করে। আর তা যে উপর তলার বসদের অগোচরে, এমনটিও নয়; বরং সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে রাষ্ট্রের উপর মহলের সুস্পষ্ট নির্দেশ।

fake_encounter-1১৯৭৮ সালে সশস্ত্র সংগ্রামরত পার্টিগুলো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আর তখন রাষ্ট্রীয় বাহিনী হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ আর লুণ্ঠনের এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরী করে, যেন কেউ সশস্ত্র সংগ্রামীদের সহযোগিতা না করে। সেই সাথে সুকৌশলে পার্টিগুলোর নেতাদের হত্যা করা হয়, যার ফলে সশস্ত্র সংগ্রাম সর্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। এরপর থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন পরিণত হয় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায়। আর এ খবর যেন মিডিয়াতে না আসে, সে বিষয়ে শাসক শ্রেণী ছিল সদা সোচ্চার, কারণ তাতে ভারত রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ভেঁক খসে পড়বে। মালোম হত্যাকাণ্ডের পর ইরোম শর্মিলার অনশন ও ইরোম শর্মিলার গ্রেপ্তারের পরই মণিপুরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কথা মণিপুর রাজ্যের বাইরের মানুষের নজরে আসে।

তবে মালোম হত্যাকাণ্ডেই সীমিত থাকেনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পরাকাষ্ঠা। বরং পরবর্তী সময়ে এখানে নারী নির্যাতন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ২০০৩ সালের ৪ অক্টোবর নান্দৈবম সঞ্জিতার উপর গ্রেনাডিয়ার রাইফেলসের জওয়ানরা নির্যাতন চালায়। ২০০৪ সালের ১১১২ জুলাই মধ্যরাতে থাঙজম মনোরমাকে ১৭নং আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা ধর্ষণ করে এবং বীভৎস কায়দায় হত্যা করে। জওয়ানরা মনোরমার বাড়ির দরজা ভেঙে তার মা ও দুই ভাইকে আহত করে, মনোরমাকে বিছানা থেকে টেনে বারান্দায় নিয়ে চোখ বেঁধে তার উপর নিপীড়ন চলতে থাকে কয়েক ঘন্টা যাবৎ। তার সারা শরীরে বেয়োনেট ও ছুরি চালানো হয়, এক সময় তাকে হত্যা করার পর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীরা চলে যায়। তাদের অভিযোগ ছিল মনোরমা বিদ্রোহী গোষ্ঠি পিএলএএর সাথে জড়িত!

manipur_women_protest-3এহেন পৈষাচিক নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনগণের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়, প্রতিবাদ উঠে সর্বত্র। আর কাংলা দুর্গের সিংহদ্বারে বারোজন মৈরা পাইবি আন্দোলনকারী নারী সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা হয়ে প্রতিবাদ জানান। কাংলা দুর্গে অবস্থানরত আসাম রাইফেলসের বিভিন্ন রেজিমেন্টের সামনে এই নির্ভীক প্রতিবাদী নারীরা তাদের পরিধানের যাবতীয় বস্ত্র খুলে ফেলেন। সাদা একটা ব্যানারে তারা নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যাতে লেখা ছিল – “ইন্ডিয়ান আর্মি, কাম এন্ড রেইপ আস” (এসো ভারতীয় সেনাবাহিনী, আমাদের ধর্ষণ করো!)। প্রতিবাদী নারীরা চিৎকার করে বলেছেন – “ইন্ডিয়ান আর্মি, রেইপ মি! ইউ আর অল মনোরমাস মাদারস।” (ইন্ডিয়ান আর্মি, আমাকে ধর্ষণ কর। আমরা সবাই মনোরমার মা)

প্রতিবাদকারীদের এই ছবি দেশেবিদেশে প্রচার হবার পর চারিদিকে নিন্দার ঝড় উঠে। প্রতিবাদী নারীরা নিজেদের বিবস্ত্র করে যেন ভারত রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের লেবাস খুলে স্বৈরতান্ত্রিক সম্প্রসারণবাদের চেহারা উন্মুক্ত করেছেন! কিন্তু তাতে ভারতের শাসক শ্রেণীর খানিক বিব্রতবোধ হওয়া ব্যতিত কিছুই হয়নি।

Irom_Chanu_Sharmila-2এখানেই শেষ নয়। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মণিপুরে হাজারেরও বেশি নারী রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এর বেশিরভাগই রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও প্রশাসনের চাপে থেকে গেছে অপ্রকাশিত। আর পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভ্রূণে সিক্ত কোনো বাহিনীর পক্ষে শিশ্নসর্বস্ব চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক। তার পক্ষে মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা করাটাও অনেকাংশেই আকাশকুসুম ভাবনা। ১৩ বছরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে পাঁচশোর বেশি, আর প্রতিবারই ছিল আফসপা (AFSPA) তাদের রক্ষাকবচ হয়ে। যার বড় প্রমাণ ২০০০ সালের নভেম্বরের ২ তারিখে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত ১০ জন যাত্রীকে গুলি করে হত্যা করে অসম রাইফেলসএর জওয়ানরা। মূলতঃ সেদিনের ঘটনা ছিল এমন ঐদিন বাসস্ট্যান্ডে একটা বাসের টায়ার ব্লাস্ট হলে রাষ্ট্র বাহিনী ধরেই নেয় যে, এটা বিদ্রোহীদের বোমা বিস্ফোরন। তারা বিষয়টির কোন রকম তদন্ত না করেই নির্বিচারে গুলি চালিয়ে আলোচিত দশ জনকে হত্যা করে। ইরোম শর্মিলা এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং গণবিরোধী – আইন বাতিলের দাবীতে গত ১৩ বছর অনশন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা এটা জানি যে, ভারত রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত আলোচিত ওই গণহত্যা নিয়ে তদন্ত পরবর্তী কোন মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে, তারা বারংবার চেষ্টা করেছে বলপূর্বক অনশনরত ইরোম শর্মিলার অনশন ভঙ্গ করানোর। ফলে ভারত রাষ্ট্রে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ইতিহাস রয়েছে, তেমনি রয়েছে জনগণের প্রতিরোধের ইতিহাস। ইরোম শর্মিলা সেই প্রতিবাদেরই এক জ্বলন্ত ইতিহাস।।

সহায়ক প্রকাশনা

বিশিষ্ট অধ্যাপক ও সোশ্যাল এক্টিভিস্ট দীপ্তিপ্রিয়া মেহরোত্রা কর্তৃক সম্পাদিত ২০০৯ সালে প্রকাশিত “বার্নিং ব্রাইট : ইরোম শর্মিলা এন্ড দি পিস স্ট্রাগল ইন মণিপুর” নামক গ্রন্থ; যা ২০১১ সালে পৃথ্বীশ সাহাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলায় অনুবাদ করেন বিশিষ্ট লেখক ও এক্টিভিস্ট মহাশ্বেতা দেবী।

বেশকিছু পত্রিকায় প্রকাশিত আর্টিকেল ও দৈনিক সংবাদপত্রের খবর।

ভারতের কয়েকটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইট।

বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকার ওয়েবসাইট।

——————————–

শাহেরীন আরাফাত :: লেখক, এক্টিভিস্ট।

৬ অক্টোবর ২০১৩

(লেখাটি মঙ্গলধ্বনি‘র ৩য় প্রিন্ট সংখ্যায় [অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যা] প্রকাশিত হয়েছে।)

ছবি:ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s