লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

Russian President Putin shakes hands with Bangladesh PM Hasina during their meeting in Moscow's Kremlinএ বছরের প্রথম দিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সরকারি সফরে রাশিয়া গমন করেনপ্রায় ৪০ বছর পর এটি ছিল বাংলাদেশ থেকে শীর্ষ পর্যায়ে রাশিয়ায় দ্বিপক্ষীয় সফরসফরকালে সে দেশের সাথে তিনি কয়েকটি চুক্তি করেছে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল গত ১৫ জানুয়ারি,০০০ কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত হাসিনাপুতিন ঋণচুক্তিএছাড়া অন্য যে কয়টি চুক্তি সে সময় সম্পাদিত হয়েছিল তার মধ্যেপাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা ৪,০০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তিটি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যগত ২ অক্টোবর শেখ হাসিনা রূপপুরে এই প্রকল্পের প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেনবুধবার বেলা ১১:১২ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেনএ সময় তার সঙ্গে ছিলেনপরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু,বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানরোসাটম ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের (আইএইএ)এরকর্মকর্তাগণ

Ruppur-atomicপ্রাথমিক পর্যায়ে ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি এবং পরবর্তী সময়ে একই ধরণের আরেকটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হবে বলে জানা গেছেপ্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারবিনিয়োগের ৯০ ভাগ বহন করবে রাশিয়া সরকারআর ১০ ভাগ করবে বাংলাদেশএই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রূপপুরে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছেপ্রকল্প উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই প্রকল্প জাতির স্বপ্নপূরণ করবেএক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা চিন্তাভাবনা, প্রকল্প ও পরিকল্পনার ফলশ্রুতিতে চালু হওয়া এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশে নতুন যুগের সুচনা করবেআজ নিঃসন্দেহে জনগণের জন্য একটি আনন্দের দিন

অন্যদিকে পরদিন ৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুরে বুয়েটের কাউন্সিল ভবনে বুয়েট ও রোসাটমের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ভিভিইআর নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর অ্যান্ড ইটস্ সেফটি ফিচারসশীর্ষক সেমিনারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় রাশিয়ার সর্বাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের হেড অব কনস্ট্রাকশন ইগোর কারালেচেঙ্কো তিনি আরো বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশে নতুন যুগের সূচনা করবেএ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বাংলাদেশের সাথে রাশিয়ার যে চুক্তি হয়েছে তাতে পরিবেশগত নিরাপত্তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছেতার কাছ থেকে আমরা জানতে পারি যে,এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নাকি সর্বোচ্চ ৮ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধে সক্ষম হবেএছাড়া অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমনকি বৃহদাকার বিমানের আঘাতে সেটির কিছুই হবে নাজনাব কারালেচেঙ্কো চুক্তির বিষয়ে উল্লেখ করে বলেন, “রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার ও রাশিয়ার মধ্যে দুটি চুক্তি হয়েছেবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত কাজ শুরুর বিষয়ে আগামী ডিসেম্বরে তৃতীয় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে এবং পরবর্তীতে চতুর্থ বা শেষ চুক্তিটি হবে একটি সাধারণ চুক্তি‍” যদিও এই চুক্তিগুলোতে ঠিক কী কী আছে অথবা থাকবে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেন নি

বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিষয়ে তেমন বিশেষ জানাশোনা নেইএই প্রকল্পকে ঘিরে এক ধরণের ধোঁয়াশা তৈরি করায়েছেএটা কি বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনকবে নাকি অমঙ্গলজনক সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণার যথেষ্ট অভাব রয়েছেঅনেকেই মনে করেন যে করেই হোক এখন আমাদের আরো বিদ্যুৎ প্রয়োজনআবার বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন দেশ হতে যাচ্ছে এমন চিন্তার বশবর্তী হয়েও অনেকে গর্ববোধ করতে পারেনপারমাণবিক প্রকল্পের বিপবিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেসম্বন্ধে বেশির ভাগ মানুষই অবগত নন

এ পর্যন্ত বিশ্বে যে কয়েটি উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যাল্ড, প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের চেরনোবিল এবং অতি সম্প্রতি জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়থ্রি মাইল আইল্যান্ডে ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ যেদুর্ঘটনাটিঘটে তারপর এখন পর্যন্ত নতুন আর কোনো পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেনি যুক্তরাষ্ট্রঅন্যদিকে এই ঘটনার পর কেবল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের ইস্যু নিয়েই ১৯৮ সালে সুইডে নিউক্লিয়ার পাওয়ার রেফারেন্ডা অনুষ্ঠিত হয়১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলতৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিয়েভ(বর্তমানে ইউক্রেনের রাজধানী) শহরের উপকণ্ঠ চেরনোবিলে একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারটি রিঅ্যাক্টরের একটিবিস্ফোরিত হয়েতার তেজস্ক্রিয় মৌল ছড়িয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু অঞ্চলে এরপর থেকে আজ পর্যন্তচেরনোবিল শহর পরিত্যক্ত নগরী হিসেবে ঘোষিতপ্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চেরনোবিল দুর্ঘটনায় সব মিলিয়ে প্রায়১০,০০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে এরমধ্যেশুধু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে বন্ধ করতেই প্রয়োজন হয়েছিল ৪০০ কোটি ডলার

চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনমত শক্তিশালী হয় বিভিন্ন উন্নত পুঁজিবাদী দেশ পারমাণবিক বিদ্যুতের পরিবর্তে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেঅনেকেইধরে নিয়েছিলেন পরমাণু জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিন শেষ হয়ে এসেছেএরমধ্যে ২০১১ সালের ১১ মার্চ সুনামির আঘাতে জাপানের ফুকুশিমায়ঘটে যায় ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয় বিপর্যয়ের পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঐ ধরণের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো হয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অথবা ভবিষ্যতে নতুন করে আর স্থাপনের পরিকল্পনা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে ফুকুশিমায় বিপর্যয় সংঘটিত হওয়ার পর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে গত বছরের মে মাসে জাপানের ৫০টি চুল্লির সবগুলোই বন্ধ করে দেয়া হয়পরবর্তীতে সেগুলো সচল করার উদ্যোগ জনগণের বিরোধিতার মুখে পড়েদেশটির একতৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ হয় পারমাণবিক উৎস থেকে আর আধুনিক এবং উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশ হিসেবে জাপানের মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ খুবই বেশিসেই জাপানের জনগণকে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎহীনতার ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা সম্ভব হয় নি এই মুহূর্তে কোনো ধরণের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়াই চলছে সে দেশের সমস্ত কর্মকাণ্ডজার্মানি কেবল নতুন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ বাতিলইকরে নি,একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রগুলো

fukushima-nuclear-power-plantজাপান, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ রাখা সহ পুরোনো কেন্দ্রগুলো একে একে বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ নিলেও এদিক থেকে ফ্রান্সের অবস্থান কিছুটা ভিন্নতাদের সরকার এখন পর্যন্ত সেগুলো বন্ধের বিষয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে নিফ্রান্সের ফ্লামেনভিলে ১,৬৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটি ২০০৬ সালে শুরু করা তার নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলেছে এবং তাদের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৬ সালের পর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়ে এটি উৎপাদনে যেতে পারবেকিন্তু সেদেশের জনগণ বসে নেইতারা ঠিকই সরকারের ওপর ব্যাপকভাবে চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছেন এই সমস্ত পারমাণবিক প্রকল্প বন্ধের জন্যআশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৭৭ শতাংশই পূরণ হয়ে থাকে এই বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে

কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুতের ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল এই শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর জনগণ কেন এতো ব্যাপকভাবে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন?কেবল দুর্ঘটনাগুলোই কি এর একমাত্র কারণ?জার্মানির মেইঞ্জের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কেমিস্ট্রির বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে জানাচ্ছেন যে,বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব চেরনোবিল কিংবাফুকুশিমার মতো পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেএমনকি আগে যেমনটা আশঙ্কাকরা হয়েছিল, বিপদের ঝুঁকি তার চেয়ে প্রায়২০০ গুণবেশিইনস্টিটিউটের পরিচালক ওগবেষক দলটিরপ্রধান জস লেলিভেল্ড বলেন, ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়সমীক্ষায় দেখানো হয়, বিশ্বে এখন যতোগুলো পারমাণবিক চুল্লি সক্রিয় রয়েছেতারএকটিতে প্রতি১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একবার দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছেবর্তমানে বিশ্বে সব মিলিয়ে পারমাণবিক চুল্লির সংখ্যা প্রায় সাড়ে চারশর মতো

কিন্তু কেবল দুর্ঘটনাই একমাত্র কারণ নয় যার জন্য বিশ্বের জনগণ এখন পারমাণবিক প্রকল্পের বিরোধিতায় রাস্তায় নেমে এসেছেনএই দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট বিপর্যয়ের ভয়াবহতা যে কতো ব্যাপক হতে পারে সেটা উপলব্ধিতে নিয়েই তারা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন উন্নত রাষ্ট্র জাপানফুকুশিমা নিয়ে এখনো পর্যন্ত সীমাহীন সঙ্কটের মধ্যে রয়েছেফুকুশিমার চতুর্থ রিঅ্যাক্টরটির বর্জ্য অপসারণ সেটিকে ঝুঁকিমুক্ত করারজন্য অতিসম্প্রতি সে দেশের সরকার বাড়তি ৫০ কোটি ডলার ব্যয়ের কথা ঘোষণা করেছেকিন্তু গত ৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে বলেছে, এর ফলেও তেজস্ক্রিয়তা মুক্ত হওয়া সম্ভব হবে নাগত অগাস্ট মাসেনির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান টেপকোজানিয়েছে, তিনশ টন তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত পানি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে গেছে,যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবেজাপানের ঊর্ধ্বতন দুই হাজার বিজ্ঞানীর সংগঠন সায়েন্স কাউন্সিল অফ জাপান এক গবেষণায় বলেছে, পরবর্তী এক প্রজন্মের ভেতর ফুকুশিমা আর বসবাসযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা নেইআন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনগ্রিনপিস সম্প্রতি বলেছে, ফুকুশিমার ট্র্যাজেডির পরে এটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে যে, পারমাণবিক কেন্দ্র আসলেই মারাত্মক বিপজ্জনকবিশ্বে যে ৪৩৬টি রিঅ্যাক্টর রয়েছে তা কোনোক্রমেই মানুষের ভুলত্রুটি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা বিপর্যয়ের ঊর্ধ্বে নয়গ্রিনপিস আরো জানিয়েছে,ফুকুশিমার মানুষ ভয়াবহ পর্যায়ে ক্ষতির শিকার হয়েছেবিশেষ করে দুর্ঘটনার পরে ওই শহরের ,৬০,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে১৯৮৬ সালে চেরনোবিলদুর্ঘটনায় পর ঐ শহরটিও পরিত্যক্ত হয়েছে,থাকবে আরো বহু যুগ

কিন্তু দুর্ঘটনা ছাড়াও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বায়ুমণ্ডল, পরিবেশ ও প্রাণিজগতের ওপর প্রভূত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেসে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদেরমধ্যে কোনো সন্দেহ নেইযুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ডিপার্টমেন্টের(ডিওই) তথ্যমতে,যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর যে পরিমাণ ক্লোরোফ্লুরোকার্বন(সিএফসি) গ্যাস নিঃসরণ হয় তার শতকরা ৯৩ ভাগই হয়ে থাকে পারমাণবিক কেন্দ্রে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের জন্য পৃথিবীর ওজোন স্তরের জন্য ক্ষতিকর এই সিএফসি গ্যাসের উৎপাদন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে মনট্রিল প্রটোকলে সুতরাং একথা প্রমাণিত যে ওজোন স্তরের ক্ষতি এবং বিশ্বের উষ্ণায়নের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অন্যতম দায়ী একটি উপাদানকিন্তু কেবল সিএফসিই নয়,পারমাণবিক শক্তি থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বনডাইঅক্সাইডও উৎপাদিত হয় পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের জন্যবিপুল পরিমাণে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যয় হয়যা মূলত কাজে লাগে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, পরমাণু রিঅ্যাক্টর এবং কুলিং টাওয়ার নির্মাণেপরমাণু রিঅ্যাক্টর প্রতি বছর বায়ুমণ্ডলে ও পানিতে প্রচুরতেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ছড়ায়এসব আইসোটোপের তালিকায় আছে ক্রিস্টন, জেনন, আর্গনের মতো নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহ, যেগুলো চর্বিতে দ্রবণীয় এবং রিঅ্যাক্টরের আশপাশে বসবাসরতমানুষেরনিঃশ্বাসের সঙ্গে তা ফুসফুসের মাধ্যমে প্রজনন অঙ্গসহ দেহের চর্বিযুক্ত টিস্যুতে স্থানান্তরিত হতে পারেতদুপরি তেজস্ক্রিয় মৌলগুলো হতে নিঃসরিত গামা রশ্মি ডিম্বাণু ও শুক্রাণুতে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিয়ে সূচনা করতে পারে বংশানুক্রমিকব্যাধিরট্রিটিয়াম নামক হাইড্রোজেনের একটি আইসোটোপও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়যা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় পানি উৎপন্ন করেএই পানি ত্বক, ফুসফুস এবং পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে আর ডিএনএ মলিকিউলে ঢুকে যেতে পারেযার পরিণাম হলো বড় ধরণের বিপর্যয়

২০০৮ সালে জার্মান সরকার তাদের ১৬টি পারমাণবিকবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশে বসবাসকারী শিশুদের ওপর কিক স্টাডি নামে একটি গবেষণা চালায়গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে যতোই যাওয়া যায় শিশুদেহ ক্যান্সার,বিশেষত লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ততো বাড়তে থাকেওই গবেষণা থেকে জানা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মাঝে বসবাসকারী শিশুদের লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তার বাইরে বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় অন্ততপক্ষে দ্বিগুণগবেষণায় দেখা যায়, পরমাণু রিঅ্যাক্টরের আশপাশে অবস্থিত লোকালয়গুলোতে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তহয়ে মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২৬২৮ জন, যখানে গড়পড়তা স্তন ক্যান্সারজনিত মৃত্যুহার হচ্ছে প্রতিলাখে ২০২১ জনযুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ডিপার্টমেন্টের গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে পুরনো পরমাণু কেন্দ্রগুলোর আশপাশে স্তন ক্যান্সারজনিত মৃত্যুহার ১৯৫০৫৪ থেকে ১৯৮৫৮৬ সময়কালে বেড়েছে শতকরা ৩৭ ভাগ,যেখানেপুরোদেশজুড়েগড়েতাবেড়েছেমাত্রশতাংশ

এসবই বিপজ্জনক স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি যার জন্য বিশ্বের জনগণ এখন বিশাল আকারে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করছেনজাপানে ১৯৪৫ সালে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ছাড়াও যে তেজস্ক্রিয়তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তার ফলাফল প্রজন্মান্তরে ভোগ করছেন সেখানকার জনগণমৃত, বিকলাঙ্গ ও বিকৃত শিশু জন্ম নেয়া ছাড়াও সেখানে ক্যান্সার সহ অন্যান্য রোগে মৃত্যুর হার অস্বাভাবিক রকম বেশি একই অবস্থা দেখা গেছে চেরনোবিলেওসেখানে শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলফলাদি ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাদ্য যা জন্মায় তা খাওয়ার উপযোগী নয়একই অবস্থা দেখা গিয়েছে ফুকুশিমাতেও

এখন দেখা যাক বাংলাদেশের কী অবস্থা। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব সরকারের সময়ে রূপপুরের ঐ একই স্থানে সর্বপ্রথম একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কথা ছিল। পারমাণবিক কেন্দ্রে fission (পদার্থের নিউক্লিয়াসকে ভেঙে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে তাপ উৎপন্ন হয় তা দিয়ে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন জেনারেটর চালানো হয়। এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করা হয় এক ধরণের কন্ট্রোল রড। এই কন্ট্রোল রডকে সব সময় শীতল রাখার প্রয়োজন হয়, তা নাহলে সেটি উত্তপ্ত হয়ে সংঘটিত হতে পারে ভয়াবহ পারমাণবিক বিস্ফোরণ। ফুকুশিমাতে সেটিই ঘটেছিল। যাই হোক, রূপপুরে এই শীতলীকরণের জন্য সে সময় কুল্যান্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল পার্শ্ববর্তী পদ্মার পানিকে। যেকোনো কারণেই হোক তখন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয় নি। ভারত নদীর উজানে ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার ফলে এই পানির প্রবাহ কমে গেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ৫০ মেগাওয়াটের জায়গায় এখন বলা হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ে ১,০০০ এবং পরবর্তীতে আরো ১,০০০ অর্থাৎ মোটমাট ২,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা!!! পানির প্রবাহ যেখানে এতোটা কমে গেছে সেখানে এই পানিকে কুল্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করে কীভাবে প্রায় ৪০ গুণ ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক প্রকল্পকে শীতল রাখা সম্ভব সেটা ভাবনার বিষয়। পর্যাপ্ত পানি পাওয়া না গেলে এর পরিবর্তে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের কথাও শোনা যাচ্ছে।

হোক পদ্মার পানি কিংবা ভূগর্ভের, contaminationরোধ করার উপায়টা কী হবে?কুল্যান্ট হিসেবে ব্যবহৃত পানির সাথে সাধারণত তেজস্ক্রিয় পদার্থ মিশে যায় এবং ইউরেনিয়ামের মত আইসোটোপ হাজার হাজার বছর ধরে থেকে যায়এই তেজস্ক্রিয়তা জমিনের আর সকল পদার্থেও সংক্রমিত হয়ে গোটা ভূগর্ভকেই করে তুলবে দূষিত, ভয়াবহ রকমে বিষাক্ততাছাড়া পদ্মার পানিকে কুল্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করলে ভাটি এলাকাগুলোকেও তা দূষিত করে তুলবে সুতরাং পানির পর্যাপ্ততাই এখানে একমাত্র বিবেচ্য নয়,এই পানিকে পরিশুদ্ধকরণের সমস্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণকিন্তু এই পরিশুদ্ধকরণের প্রযুক্তিটা কী?এসব প্রশ্ন সামনে চলে এলে তা এড়িয়ে যাওয়ার জন্যএয়ার কুলিং সিস্টেমের কথাও বলা হয়ে থাকে কিন্তুএর জন্য কুলিং টাওয়ার স্থাপনের প্রয়োজন হবেসে জন্য যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে তার হিসাব প্রকল্পের সামগ্রিক বিবেচনার মধ্যে নেই

এবার আলোচনা করা যেতে পারে এর প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কেরূপপুরের পারমাণবিক প্রকল্পটিতে রাশিয়ার তৈরি VVER-1000প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হবেএই রিঅ্যাক্টরকে নিরাপদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে রোসাটমের পক্ষ থেকেবলা হচ্ছে এটা নাকি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধে সক্ষমঅথচ এই রিঅ্যাক্টরের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই পাশ্চাত্য মহলে রয়েছে বিতর্কইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ এই রিঅ্যাক্টর ক্রয়ের জন্য চুক্তি করেও পরবর্তীতে তা বাতিল করেছে ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুযায়ী এই রিঅ্যাক্টর নিরাপদ নয়পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত হওয়ার জন্য শর্ত রয়েছে যে তাদেরকে VVER-1000রিঅ্যাক্টর ব্যবহারকারী সব পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করতে হবে এই রিঅ্যাক্টরের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলোএতে কুল্যান্ট হিসেবে পানি সরবরাহের মাত্রার সামান্য তারতম্যেই কন্ট্রোল রডের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে পুরো প্ল্যান্টই পরিণত হতে পারে একেকটি পরমাণু বোমায়পদ্মা নদীর পানি প্রবাহে অপর্যাপ্ততার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছেসেদিক থেকে এই রিঅ্যাক্টর যে অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ সে কথা বলাই বাহুল্য

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কুদাঙ্কুলামে রাশিয়া ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে সেখানে এর বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণ বহু আগে থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেনবহু বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, লেখক, পরিবেশবাদী, সাংবাদিকও এর বিরোধিতা করেছেনঅতি সম্প্রতি এই প্রকল্পের যন্ত্রপাতিতে ত্রুটি পাওয়া গেছে২০০১ সালে কেন্দ্রটির কাজ শুরু হয় ২০১২ সালে এটি চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তুসম্প্রতি একদল ভারতীয় বিজ্ঞানী ও গবেষক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিদর্শন করতে গেলে এতে নিম্নমানসম্পন্ন ও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়এই পরিদর্শনের পর এ বিষয়ে বিশিষ্ট ভারতীয় বিজ্ঞানী ও গবেষক ভি টি পদ্মনাভনস্ক্যান্ডালস ইন দ্যা নিউক্লিয়ার বিজনেসশীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেনঐ প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল (ইস্পাতনির্মিত সিলিন্ডার যার ভেতর রিঅ্যাক্টর কোর থাকে) তৈরি করা হয়েছে তিন দশকের পুরোনো ও বাতিল মডেলের সাহায্যে জিও পডোলস্ক নামক যে রুশ কোম্পানি এই যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে তাদের ক্রয়বিষয়ক পরিচালক সের্গেই সুতভকে রুশ ফেডারেল প্রসিকিউটর এ বছরেরই প্রথম দিকে গ্রেপ্তার করে বুলগেরিয়া, ইরান, চীন ও ভারতের পারমাণবিক প্রকল্পের বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের জন্য নিম্নমানের সস্তা ইস্পাত সরবরাহের অভিযোগে

উল্লেখ্য, কুদাঙ্কুলামে সরবরাহকৃত প্রেশার ভেসেলগুলো কেবল পুরোনো মডেলেরই নয়, সেগুলো ত্রুটিপূর্ণও বটেসেই ত্রুটি কী ধরণের?ভারতরাশিয়ার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এই ভেসেলগুলো সরবরাহ করা হয় নিএই চুক্তিটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে, সেখানে ভেসেলের মাঝামাঝি স্থানে কোনো ঝালাই থাকার কথা উল্লেখ ছিল নাকিন্তু কুদাঙ্কুলামের পারমাণবিক কেন্দ্রে ব্যবহৃত ভেসেলের মধ্যবর্তী দুইটি স্থানে ঝালাই করা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে ঝালাই থাকার অর্থ হলোএই ভেসেল অতিদ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বড় ধরণের দুর্ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে বর্তমানে তাই এই ধরণের ভেসেল বাতিল মাল হিসেবেই বিবেচিত হয় রাশিয়ার সরবরাহ করা এসব নিম্নমানের যন্ত্রপাতির ত্রুটি চিহ্নিত করতে না পারায় সমালোচনার মুখে পড়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (এনপিসিআইএল) অন্যদিকে কুদাঙ্কুলামের চুল্লির জন্য সরবরাহ করা সামগ্রীতে ত্রুটি থাকার বিষয়টি প্রকারান্তরে রোসাটমও স্বীকার করে নিয়েছে

ওপরের ঘটনাটা বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, বাংলাদেশের আমদানিকৃত যে রিঅ্যাক্টরকে অত্যন্ত উন্নতমানের এবং তৃতীয় প্রজন্মের হিসেবে সরকারি রুশ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বারবার বলা হচ্ছে এবং ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্যক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে তাকে পরিচিত করানো হচ্ছে, সেই একই রিঅ্যাক্টর কুদাঙ্কুলামে সরবরাহ করা হয়েছিলঅর্থাৎ কুদাঙ্কুলামে ব্যবহৃত এবং রূপপুরে ব্যবহার্য রিঅ্যাক্টর একই মডেলের যারা ভারতের কাছে এ ধরণের ত্রুটিপূর্ণ জিনিস গছিয়ে দিতে পারে বাংলাদেশে ক্ষেত্রে তারা যেতা করবে না সেটা অবশ্যই নিশ্চয়তা সহকারে বলার কোনো উপায় নেই তাছাড়া ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এ ধরণের ত্রুটি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সমর্থ হলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল নেই

পারমাণবিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে যে বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার তা হলো এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গএই বর্জ্য নিয়ে কী করা হবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্টবক্তব্য কোথাওশোনা যাচ্ছে নাবাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই বর্জ্য রাশিয়া তাদের দেশে নিয়ে যাবে বলে প্রচার করা হলেও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছেপারমাণবিক বর্জ্য কোনো সাধারণ নিরীহ বিষয় নয় পারমাণবিকবিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করার পর জ্বালানির যে অংশটুকু বর্জ্য হিসেবে পড়ে থাকে সেটা অত্যন্ত তেজস্ক্রিয়সৃষ্ট এইতেজস্ক্রিয়তার প্রভাব মানবদেহ থেকে শুরু করে প্রাণপ্রকৃতির জন্য অত্যন্ত মারাত্মকসবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলোএই তেজস্ক্রিয়তার আয়ু এক কিংবা দুই বছর ন, নয় এক কিংবা দুই যুগ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি,পারমাণবিক বর্জ্যের তেজস্ক্রিয়তা টানা ১০,০০০ বছর বিদ্যমান থাকে!! আইএইএএর দেয়া তথ্যমতে, একটি পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল (২০,০০০ ঘনমিটার) নিম্ন ও মাঝারি এবং আরো ৫০,০০০ ব্যারেল (,০০০ ঘনমিটার) উচ্চমাত্রার বর্জ্য উৎপন্ন হয় যদিও উৎপাদনক্ষমতার ভিত্তিতে তা কমবেশি হতে পারেএ কারণে অন্যান্য দেশে পাহাড়ের অনেক নিচে কিংবা গভীর সমুদ্রের তলদেশে বিশেষ ব্যবস্থায় বর্জ্যপুঁতে রাখা হয়অথবা মরুভূমিতে মাটিচাপা দেয়া হয়যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে মরুভূমিতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের জন্য বোমা তৈরি করে প্লুটোনিয়াম নিষ্কাশনের জন্য যে অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়েছিল তা ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ড কেন্দ্রে মজুদ করে রাখা হয় (এর ফলে পার্শ্ববর্তী কলম্বিয়া নদীতে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে) এছাড়া লাসভেগাস থেকে কিছুটা দূরবর্তী পাহাড়ের অনেক নিচে বর্জ্য চাপা দিয়ে রাখা হয়

sheikh-hasina_ruppur-1বাংলাদেশ একটি জনবসতিপূর্ণ দেশএখানে এমন কোনো জনবিরল পাহাড় কিংবা বিস্তীর্ণ মরুভূমি নেই যেখানে এ কাজ করা যেতে পারেতাই প্রথম দিকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ে এই বর্জ্য ডাম্প করার কথাবার্তা কিছু শোনা গেলেও সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়ার দিকটি চিন্তা করে সেসব কথা এখন আর কেউ বলছেন না রাশিয়া এই বর্জ্য নিজেদের দেশে নিয়ে যাবে এ ধরণের কথাবার্তা বলা হলেও কোন পথে কিংবা কোন প্রক্রিয়ায় এই স্থানান্তর হবে তার কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেইজাহাজে করে সমুদ্রপথে এই বর্জ্য পরিবহন যে প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়তাছাড়া এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ রয়েছে অন্যদিকে রাশিয়ার হাতেও এমন কোনো প্রযুক্তি নেই যার দ্বারা তারা এই বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে পারেসুতরাং বাংলাদেশে উৎপন্ন বিদ্যুতের জন্য রাশিয়া এই বর্জ্য তাদের দেশে নিয়ে বিপদের বোঝা ঘাড়ে তুলবে এমন চিন্তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এই বর্জ্যের দায়ভার যে করেই হোক পরিশেষে যে বাংলাদেশের কাঁধেই বর্তাবে সেটা এখনি বলে দেয়া যায়

সরকার জনগণকে পারমাণবিক প্রকল্পের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে আশ্বস্ত করার হাজার চেষ্টা করলেও তারা আশ্বস্ত হতে পারেন না বিভিন্ন যুক্তিসঙ্গত কারণেইকারণগুলোর মধ্যে মারাত মুস্তাফিনের বক্তব্যও অনেকাংশে দায়ী কে এইব্যক্তি যিনি এ বিষয়ে কথাবার্তা বলার অধিকার রাখেন?তার বক্তব্যকে গ্রাহ্য করতে হবেই বা কেন?হবে, কারণ তিনি হচ্ছেন রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান জেএসসি অ্যাটমেনার্গোপ্রোকটএর মহাপরিচালকরাশিয়ার পরমাণু শক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট নিউক্লিয়ার ডট আরইউকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের স্থান হিসেবে রূপপুর অত্যন্ত জটিল একটি জায়গাঅন্য একটি বিদেশি কোম্পানির করা সমীক্ষার তথ্যাদি পরীক্ষা করে তারা দেখেছেন যে, এই এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন বেশ জটিল তিনি আরো বলেন, রূপপুর জায়গাটি পদ্মার তীরবর্তী পলিগঠিত একটি অঞ্চলএলাকার মাটি নরম প্রকৃতিরএখানে ১,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দুইটি চুল্লি স্থাপন করা সম্ভব নয় বলেই তিনি মনে করেন এদিকে আইএইএএর সাবেক পরিচালক (তেজস্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ) জসিমউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, রূপপুর প্রকল্পটি একটি ভূচ্যুতির ওপর অবস্থিত এ ধরণের ভূচ্যুতি ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা উৎসস্থল হয়ে থাকে কাজেই জায়গাটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ

যখন নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাই এলাকাটিকেআখ্যায়িত করছেনভূমিকম্পপ্রবণ হিসেবে তখন সম্ভাব্য বিপর্যয়ের পর যারা হবেন র প্রাথমিক শিকার তাদের মানসিক অবস্থা কী হতে পারে সেটা সহজেই অনুমেয়। ফুকুশিমার বিপর্যয়ের পর এর ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মানুষজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই পরিধির মধ্যে বসবাসরত লোকজনকে সরিয়ে নিতে হলে সেই সংখ্যাটা কতো হবে?আর সরিয়ে তাদের নেয়া হবেই বা কোথায়?তাছাড়া বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অবস্থাটা কী সে খবরও নেয়া দরকার। কিন্তু শুধু রূপপুর তো নয়, সারা বাংলাদেশই বর্তমানে ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেদেশের বিশেষজ্ঞগণ সম্ভাব্য ভূমিকম্পে শহরাঞ্চলের সাধারণ অট্টালিকা বিধ্বস্ত হয়ে কী পরিমাণ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতে পারে সে বিষয় নিয়ে চিন্তিত আরযে দেশে ভূমিকম্প না হতেই নির্মাণ ত্রুটি ও দুর্নীতির কারণে তাসের ঘরের মতো ভবন ধসে পড়ে, নির্মাণাধীন অবস্থায় ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে পড়ে মানুষ মৃত্যুবরণ করে, সেখানে মাঝারি আকারের ভূমিকম্পের ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কী অবস্থা হবে এবং তার ফলস্বরূপ মানুষপ্রকৃতিপরিবেশের ওপর আঘাতের মাত্রাটাকেমন হতে পারে সেটা নিয়ে দায়িত্বশীল মহলের কোনো গভীর চিন্তাভাবনা আছে বলে মনে হয় না

প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়ের ৯০ ভাগ বহন করবে রাশিয়াএর মানে হলো তারা এই অর্থ বাংলাদেশকে ঋণ হিসেবে প্রদান করবে কিন্তু এই ঋণ তো সুদসমেত এ দেশের মানুষকেই পরিশোধ করতে হবে। ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি রিঅ্যাক্টরের মূল্য কতো?সরকার বলছে ১৫,০০০ কোটি টাকার মতো হবে। কিন্তু ৩০,০০০ কোটি টাকার নিচে একটি ‘আধুনিক’, ‘নিরাপদ’ চুল্লি কীভাবে নির্মাণ সম্ভব?২০১১ সালে ভিয়েতনামের নিন থুয়ান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য রাশিয়া থেকে ১,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি রিঅ্যাক্টর প্রতিটি ৩৬,০০০ কোটি টাকায় কেনার চুক্তি হয়েছে। তুরস্কের আক্কায়ু পারমাণবিক কেন্দ্রের জন্য রাশিয়ার থেকে মোট ৪,৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রিঅ্যাক্টর ক্রয় করা হয়েছে ১.৬ লক্ষ কোটি টাকায়, তাতে প্রতি ১,০০০ মেগাওয়াটে খরচ পড়ে ৩৩,৩০০ কোটি টাকা। সুতরাং এরচেয়ে অর্ধেকেরও কম দামে বাংলাদেশকে যে রিঅ্যাক্টর সরবরাহ করতে যাচ্ছে রাশিয়া তা আবার নিরাপদ, আধুনিক হবে এবং ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্যক্ষমতাসম্পন্নও হবে, এটা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কী হতে পারে! তাছাড়া রাশিয়া নিজেই স্বীকার করেছে একবার নির্মাণ শুরু হলে শেষ পর্যন্ত এর ব্যয় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা তারা বলতে পারে না। রাশিয়ার এই স্বীকারোক্তির বাস্তব এবং ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।

ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোতে ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২ কোটি ডলার। ১৯৮৩ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর সেই ব্যয় দাঁড়ায় ২১০ কোটি ডলারে। ১৯৮৩ সালে তাদের দ্বিতীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৬০ কোটি ডলার। নির্ধারিত সময়ের ১৮ বছর পর এর ব্যয় দাঁড়াল ১,০০০ কোটি ডলার! তৃতীয়টি স্থাপনের প্রায় ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ করতেই ব্যয় হয়ে যায় ২,০০০ কোটি ডলার। ব্রাজিল সরকার পরে এটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

ফিলিপাইনে ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল ইলেকট্রিক ৭০ কোটি ডলার খরচে দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দ্যায়। ১৯৯২এর শেষে সবকিছু মিলিয়ে এই প্রকল্পে খরচ দাঁড়ায় ২৫০ কোটি ডলার। ফিলিপাইন সরকার নিয়োজিত একটি কমিশন কেন্দ্রটিতে প্রায় ৪ হাজার ত্রুটি খুঁজে পায় এবং একে অপারেশনে যাওয়ার অনুপযোগী বলে ঘোষণা দ্যায়। ম্যানিলার ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে বাতান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৮৫ সালে। কিন্তু নিরাপত্তা ও ব্যয়জনিত কারণে এর পরিচালনা স্থগিত করা হয়। এই কেন্দ্রের কারণে ফিলিপাইন সরকার ৫,০০০ কোটি ডলার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে ফিলিপাইনের জনগণের কাঁধে সুদের বোঝা চেপেছিল দৈনিক ১৭,০০০ ডলা, ২০০৩এর শেষে যা পরিণত হয় ১২০ কোটি ডলারে। এই বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ফিলিপাইন সরকার ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস ইলেকট্রিক কোম্পানি শেষপর্যন্ত আদালতে মুখোমুখি হয়। এক পর্যায়ে ১৯৯৫ সালে ফিলিপাইন সরকার ওয়েস্টিংহাউসকে ১০,০০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ এবং এর সঙ্গে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব ধরণের দায়দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালে অপর একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০ কোটি ডলার। শেষ পর্যন্ত প্রকৃতব্যয় হয় ৮০০ কোটি ডলার। নির্ধারিত সময়ের ১০ বছর পরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করেছিল।

ওপরের উদাহরণগুলো থেকেই এ কথা বেশ স্পষ্ট, সরকার যে ১৫,০০০ কোটি টাকার মধ্যে চুল্লি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেশবাসীকে দিয়ে চলেছে তা এক অমূলক ব্যাপার। এই ব্যয় শেষতক শুধু যে বৃদ্ধিই পাবে তাই নয়, সেটি কয়গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে তারও কোনো নির্দিষ্টতা নেই। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ সরকার ঋণ হিসেবে গ্রহণ করবে রাশিয়া থেকে এবং সুদসমেত তা বহন করতে হবে এ দেশের জনগণকেই। এ কথা তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, এই বিপুল অঙ্কের ঋণ এ দেশের জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এমন একটি জিনিসের কারণে যা ভবিষ্যতে তাদের জন্য পরিণত হতে পারে ভয়াবহ মৃত্যুকূপে। তবে পারমাণবিক কেন্দ্রের সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ভয়াবহতা যে তাৎক্ষণিকতা ও মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং এর দুর্বিষহ পরিণতি কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত ভোগ করতে হবে সে বিষয়ে পূর্বেই কিছুটা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। চেরনোবিলের দুর্ঘটনার পর শহরটি পরিণত হয়েছে একটি পরিত্যক্ত ভূতুড়ে নগরীতে। একই অবস্থা ফুকুশিমায়ও। বাংলাদেশে তেমনটি ঘটলে রূপপুরের বেলায় যে এর অন্যথা হবে সেটা মনে করার কোনো কারণ নেই।

এসব ছাড়াও বড় আকারে প্রশ্ন রয়েছে ঋণকৃত অর্থের পরিমাণ ও তার ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে। গত জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা রাশিয়ায় গিয়ে ৪,০০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি করেছেনযে বিষয়ের উল্লেখ শুরুতেই করা হয়েছে।বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রাকনির্মাণকাজের জন্য এই পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে মর্মে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছেঅথচ বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো,এ কাজে সর্বোচ্চ ১৫০২০০ কোটি টাকার বেশি লাগার কথা নয়এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কী কারণে ঋণ হিসেবে নেয়া হচ্ছে এবং তা কোন কাজে ব্যয় হবে এই প্রশ্নটি বেশ জোরেশোরেই উত্থাপিত হওয়া দরকার

গত ২ অক্টোবর প্রকল্প উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণকে যে বিশাল স্বপ্নের কথা শুনিয়েছেন এবং তার মন্ত্রীপ্রতিমন্ত্রী থেকে শুরু করে তাদের বশংবদ প্রচারযন্ত্র যে আওয়াজ প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেতার বিশ্বাসযোগ্যতা কতোটুকু সে বিষয়ে অনেক অনেক প্রশ্ন রয়েছে। যেখানে বিশ্বের দেশে দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনগণ সক্রিয় সোচ্চার হয়ে উঠছেন, যখন উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো পারমাণবিকনির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসের দিকে ঝুঁকছে তখন বাংলাদেশ নতুন করে এই মূর্তিমান বিপদ ঘাড় পেতে নিতে যাচ্ছে। এ কথা বলা বাহুল্য দেশগুলো যে এখন নিজেদের পারমাণবিক প্রকল্পসমূহ বন্ধ করে দিচ্ছে সেটা তারা হাসিমুখে করছে না। একান্ত বাধ্য হয়েই এ কাজ তাদের করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের ওপর প্রচণ্ড নির্ভরশীলতা সত্ত্বেও ভবিষ্যতে বিপর্যয়ের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই এই যন্ত্রণাদায়ক কাজটি করতে তারা বাধ্য হয়েছে এমন একটা পরিস্থিতিতে যেখানে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুতের ওপর কোনো নির্ভরশীলতা এখন পর্যন্ত নেই এবং পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই, সেখানে এই নির্ভরশীলতা এবং বিপদের আশঙ্কা নতুন করে সৃষ্টি করতে যাচ্ছে দেশের সরকার। এর পেছনে বিশাল অঙ্কের দুর্নীতির আভাস রয়েছে। এই গণবিরোধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের জনগণের সোচ্চার হওয়া এবং তা প্রতিরোধে এগিয়ে আসা এ সময়ের সবচেয়ে জরুরি কাজ।।

—————————————-

আবিদুল ইসলাম :: লেখক, এক্টিভিস্ট।

—————————

তথ্যসুত্র

. Nuclear Power Still a Deadly Proposition – Helen Caldicott, August 17, 2004.

. Kudankulam Nuclear Power Plant: A Threat to South India – V. T. Padmanabhan, countercurrents.org, March 27, 2011.

. Nuclear Disasters Worldwide: 1952-2011, Infochange, May, 2011.

. A Nuclear Plant, and a Dream, Frizzles – Norimitsu Onishi, The New York Times, February 13, 2012.

. Is the Reactor Pressure Vessel at Koodankulam Safe? – V. T. Padmanabhan, R. Ramesh & V. Pugazhendi, countercurrents.org, August 14, 2012.

. Outrage Over Safety Issues at Indian Nuke Plant – K. S. Harikrishnan, Inter Press Service, June, 2013.

. All Eyes on Rooppur: Interview of Marat Mustafin, General Director of JSC Atomenergoproekt with nuclear.ru, The Daily Star, September 22, 2013.

. http://en.wikipedia.org/wiki/Bataan_Nuclear_Power_Plant

. জাপানের শেষ পারমাণবিক চুল্লি বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু, দৈনিক প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৩।

১০. ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দুশ্চিন্তা, দৈনিক প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৩।

১১. রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন দুরূহ হতে পারে, দৈনিক প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৩।

১২. সমীক্ষা ছাড়াই নির্মাণকাজের উদ্বোধন আগামীকাল, দৈনিক সকালের খবর, অক্টোবর ১, ২০১৩।

১৩. রূপপুর অপেক্ষার অবসান, বাংলানিউজ.কম, অক্টোবর ২, ২০১৩।

১৪. “রূপপুরে বিপজ্জনক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ কর!” বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের লিফলেট, কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক ৩৩, তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা (৫ম তলা) ঢাকা থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত, অক্টোবর ৪, ২০১৩।

১৫. “রূপপুরে বিপজ্জনক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ রুখে দাঁড়াও” জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের লিফলেট, ৩৩, তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা (৫ম তলা) ঢাকা থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত, অক্টোবর ৭, ২০১৩।

১৬. পারমাণবিক বিদ্যুৎ ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ, আমাদের বুধবার, অক্টোবর ৯, ২০১৩।

১৭. রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের কি সমস্যা? – দেবাশীষ সরকার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৩।

১৮. রূপপুর নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধনঃ মূল্যায়ন দেবাশীষ সরকার, অক্টোবর ২, ২০১৩।

(লেখাটি মঙ্গলধ্বনি‘র ৩য় প্রিন্ট সংখ্যায় [অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যা] প্রকাশিত হয়েছে।)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s