শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ ও প্রচলিত শ্রম আইন – শ্রম অধিকার সংকোচন আইন ও মালিক শ্রেণীর রক্ষাকবচ

Posted: এপ্রিল 11, 2014 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , ,

লিখেছেন: শামীম ইমাম

Labor_Lawঅতীতের সরকারগুলোর মতো বর্তমান মহাজোট সরকারও প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি না মেনে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে গত ১৫ জুলাই ২০১৩ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পাশ করে এবং ২২ জুলাই বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ নামে গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। এখন থেকে এটাই আইন হিসেবে গণ্য হবে এবং তার কার্যকারীতা শুরু হবে।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৮ম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার শ্রম আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি না মেনে বিরোধী দলের সাংসদদের আলোচনার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সময় না দিয়ে খুবই স্বল্প সময়ের লোকদেখানো আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ নামের আইনটি (২০০৬ সনের ৪২ নং আইন) পাশ করে। সংসদে বাংলাদেশ শ্রমবিল, ২০০৬ উত্থাপনের পূর্বে দেশের শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের মতামত জানার জন্য মতামত সংগঠিত করার জন্য নেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় কার্যকর উদ্যোগ। মূলত শ্রমিক স্বার্থের পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সুপারিশও গ্রহণ করা হয়নি। সঙ্গতকারণেই ৪ দলীয় জোট সরকারের বাইরের জাতীয় শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো এই আইনটিকে অগণতান্ত্রিক শ্রম আইনহিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ প্রকৃত অর্থে দেশের পূর্বেকার (এই শ্রম আইন অনুমোদনের আগ পর্যন্ত) শ্রম আইনগুলোর সংশোধিত, পরিবর্তিত ও সমন্বিত রূপ। এই সমন্বয়ের কাজটি ১৯৯২ সালে শ্রম আইন কমিশনএর মাধ্যমে শুরু হয়। পূর্বেকার শ্রম আইনের ২৭টি আইন রহিত করে তাদের সমন্বয়ে নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনগুলোতে মূলত কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের চাকরির শর্তাবলী, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ন্যূনতম মজুরী নির্ধারণ ও মজুরী পরিশোধ, শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান, শ্রম কল্যাণ, শিশুশ্রম, শিল্প পরিসংখ্যান সংগ্রহ, অভিবাসন, পরিবহন সেক্টর, সংবাদপত্র, চাবাগান, ডক, খনি, হোটেলরেস্তোরা, রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের চাকরির শর্তাবলী ইত্যাদি সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ প্রণয়নের পর থেকেই জাতীয় গণতান্ত্রিক শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন সহ শ্রমিক সংগঠনগুলো গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রচলিত শ্রম আইনের অগণতান্ত্রিক ধারাসমূহ বাতিল করে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে শ্রম আইন সংশোধন কমিটি গঠন করে। এ কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি সংশোধন প্রস্তাবও দেয়া হয়। দীর্ঘ আলাপআলোচনা ও সংশোধন প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষিতে শ্রম আইন সংশোধন কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল কিছু সংশোধনী গ্রহণ করা হবে। অথচ সত্য হলো শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দেয়া সংশোধনীগুলোর একটিও গ্রহণ করা হয়নি। গ্রহণ করা হয়েছে মালিকদের পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাব। শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ আবার একই সত্য তুলে ধরলো সেটি হচ্ছে মালিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি তথা মহাজোট ও জোট সরকারের মধ্যে আসলে কোন পার্থক্য নাই। অথচ, আওয়ামী লীগ গত নির্বাচনে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ওয়াদা করেছিল আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন করবে।

ইতোমধ্যেই দেশের রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে মহাজোট সরকারের শ্রম (সংশোধন) আইনের শ্রমিক ও শিল্প স্বার্থ বিরোধী অগণতান্ত্রিক ধারা সমূহ বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাপীও সমালোচিত হয়েছে মহাজোট সরকারের সদ্য পাশ করা শ্রম (সংশোধন) আইন। বিশ্বের ১৫৩ দেশের ৩০৮টি সংগঠনের এফিলিয়েটেড সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি) সংশোধিত শ্রম আইনের সমালোচনা করে বলেছে, সংশোধিত শ্রম আইন আন্তর্জাতিক মানের অনেক নিচে অবস্থান করছে। ট্রেড ইউনিয়ন বিরোধী মনোভাবের কারণে আইনের মধ্যে থেকেই সংগঠিত হওয়ার সুযোগ থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করা সহজ হবে। তারা বাংলাদেশ সরকারকে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার বাস্তবায়ন, কারখানার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগত সুবিধার উন্নয়নে ‘সিরিয়াস’হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এই সংস্থার পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য মূল আবেদনকারী সংগঠন, মার্কিন শ্রমিক সংগঠনগুলোর বৃহত্তম জোট আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার এ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন (এএফএলসিআইও) এই সংশোধনী সম্পর্কে তাদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে। তাদের মতে, সংশোধিত শ্রম আইনটিতে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইনটি পুরো খতিয়ে দেখে পরবর্তীতে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা বলে সংস্থাটির মুখপাত্র বলেছেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে রানা প্লাজার ঘটনা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে এই তড়িঘড়ি সংশোধন করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, সংশোধিত নতুন আইনের ফলে ইউনিয়ন করা আরও কঠিন হবে। সংগঠনটির এশিয়া ডিরেক্টর ফিল রবার্টসন বলেছেন, নতুন আইনে সরকার সচেতনভাবেই শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার সীমিত করে দিয়েছে। তারা এখনো ঝুঁকি ও শোষণের মধ্যে থাকবে। সংস্থাটির মতে, সংশোধিত শ্রম আইনে বাংলাদেশ সরকার অনুসমর্থিত আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮এ স্বীকৃত অধিকার সমূহ বাস্তবায়ন করা হয়নি। সংশোধিত এই আইনে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের চেয়ে আগের পার্টিসিপেশন কমিটিসেফটিকমিটির দিকেই বেশী নজর দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস সংশোধিত শ্রম আইনকে হাফহার্টেড বা অসম্পূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। পত্রিকাটির মতে, নতুন আইনটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কর্মরত ৪০ লাখ শ্রমিককে বিপজ্জনক কর্ম পরিবেশ থেকে খুব কমই সুরক্ষা দেবে। এতে দূর্বলতা রয়েই গেছে। ভবন ধস, অগ্নিকাণ্ড সহ অন্যান্য কারণে শত শত মানুষের মৃত্যুর যে সব ঘটনা ঘটেছে, সে ধরনের পরিস্থিতি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেই আইনটিতে। (দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৩ জুলাই ২০১৩।)

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ প্রণয়নের পর থেকেই জাতীয় গণতান্ত্রিক শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন, গার্মেন্টস শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ সহ শ্রমিক সংগঠনগুলো গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল। এই দাবিতে চলমান আন্দোলনের পাশাপাশি রানা প্লাজাভবন ধসে ১১৩০ জন শ্রমিকের মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়া ও কয়েক হাজার শ্রমিক আহত হওয়া এবং তাজরিনে আগুনে পুড়ে ১২৫ জন শ্রমিক নিহত ও কয়েকশ শ্রমিক আহত হওয়ার ঘটনায় এই সেক্টর অস্থিতিশীল হয়ে উঠায় বিদেশী বিনিয়োগ হুমকীর মুখে পড়ার আশংকায় মুনাফার অবাধ প্রবাহ রক্ষার স্বার্থেই ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মস্থলে জীবনের নিরাপত্তার বিধান সম্বলিত শ্রম আইন প্রণয়নের চাপ আইএলও সহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মহল থেকেও ছিল। যার ধারাবাহিকতায় বর্তমান শ্রম (সংশোধন) আইন।

এক

কী আছে মহাজোট সরকারের শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩

বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ এর শ্রমিক ও শিল্প স্বার্থ বিরোধী কয়েকটি অগণতান্ত্রিক ধারা:

) শ্রম (সংশোধন) আইনের ২০৫ ধারায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণমূলক কমিটির (Workers Participatory Committee)বিধান রেখে বলা হয়েছে, “যে প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন নাই সেই প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অংশগ্রহণ কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধিগণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করিতে পারিবে।”এটা হলে আর ইউনিয়ন করার সুযোগ থাকবে না। মালিকরা বলবে শ্রমিকদের অংশগ্রহণমূলক কমিটি আছে, এটাই সিবিএ’র মতো কাজ করছে। মালিক ও মালিকের আস্থাভাজন শ্রমিকের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি কার্যত ট্রেড ইউনিয়নের বিকল্প রূপেই থাকবে। এটা কখনোই ট্রেড ইউনিয়নের বিকল্প হতে পারে না। কারণ, ট্রেড ইউনিয়ন হচ্ছে শ্রমিকদের দ্বারা এবং শ্রমিকদের জন্য গঠিত সংগঠন। যেহেতু এই আইনে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের কোন বাধ্যবাধকতা নাই, সেহেতু এই কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে কার্যত কারখানায় শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের বিষয়টি দীর্ঘসূত্রিতার দিকে ঠেলে দেওয়া হলো।

) () ১৭৯ ধারায় বলা হয়েছে একটি প্রতিষ্ঠানে ৩টির বেশী ইউনিয়ন থাকতে পারবে না। এবং ৩৫ জনের বেশী ইউনিয়ন কর্মকর্তা থাকতে পারবে না। বাংলাদেশ সরকার অনুসমর্থিত আইএলও কনভেনশন ৮৭ অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানে কয়টি ইউনিয়ন থাকবে বা কতজন কর্মকর্তা হবেন তা শ্রমিকরাই নির্ধারণ করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে শ্রমিকদের সে অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে।

() ১৮০ () ধারায় বলা হয়েছে কারখানায় কর্মরত শ্রমিক ছাড়া কেউ ট্রেড ইউনিয়নের কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য হতে পারবে না। অর্থাৎ ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবে না। অথচ, মালিকদের সমিতির ক্ষেত্রে এরূপ কোন বিধিনিষেধ নাই। বৈষম্যমূলকভাবে শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ব খাতের শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী কমিটিতে এরূপ ব্যক্তির সংখ্যা মাত্র ১০% রাখা হয়েছে। এ ধারার কারণে যে কোন সময় মালিক কোন শ্রমিককে ছাঁটাই করলে সে আর ইউনিয়ন করতে পারবে না। কারণ ছাঁটাই করা শ্রমিক তখন কারখানার বাইরের লোক বলে বিবেচিত হবে। ফলে তিনি আর ইউনিয়নের সদস্য থাকতে পারবেন না ইউনিয়ন করতে পারবেন না। শ্রমিকরা আইন জানা, শিক্ষিত, দক্ষ নেতৃত্ব কর্তৃক পরিচালিত হওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। মালিকদের ক্ষেত্রে এরূপ কোন বিধিনিষেধ রাখা হয়নি যা বৈষম্যমূলক। এই ধারাটির মাধ্যমে শ্রমিকদের নিজেদের পছন্দ মতো নেতা নির্বাচন ও সংগঠন করার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। যা বাংলাদেশ সরকার অনুসমর্থিত আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ পরিপন্থী। পূর্বেকার ১৯৬৯ সালের আইনে কারখানার শ্রমিক না হয়েও ২৫% অশ্রমিক সরকারী ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উভয় খাতের যে কোন কারখানায় ইউনিয়ন করতে পারতো। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে শ্রমিকদের পূর্বে অর্জিত সে অধিকারও হরণ করা হলো।

() পূর্বেকার আইনে একই ধরনের বা একই প্রকারের শিল্পে নিয়োজিত বা শিল্প পরিচালনারত প্রতিষ্ঠানগুলোতে গঠিত দুই বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন নিয়মানুযায়ী সিদ্ধান্ত নিলে ফেডারেশন গঠন ও রেজিস্ট্রেশন করার জন্য দরখাস্ত করতে পারতো। সংশোধিত আইনে ২০০ () ধারায় থাকা “দুই বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন”এর পরিবর্তে “পাঁচ বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন এবং একাধিক প্রশাসনিক বিভাগে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন”শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন করার কাজটি আরো কঠিন করে দেওয়া হলো।

) () ধারায় বলা হয়েছে কারা সংগঠন করতে পারবে না, আর কারা শ্রম আইনের আওতায় পড়বেনা। এই ধারার মাধ্যমে অসংগঠিত বা অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদেরকে শ্রম আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এ ধারা বৈষম্যমুলক এবং অগণতান্ত্রিক। কারণ, শ্রমিকের অধিকার এবং শ্রম আইনের আওতা থেকে কোন শ্রমিককে বাদ দেয়া যায় না। অথচ, বাংলাদেশের শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৯০% হচ্ছে অসংগঠিত শ্রমিক।

) (১০) ধারায় বেসরকারি শ্রমিক ১০ বছর পর্যন্ত চাকরি করলে ১টা এবং ১০ বছরের অধিক চাকরির জন্য দেড়টা গ্রাচ্যুইটি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ বর্তমানে সরকারি/রাষ্ট্রায়ত্ব খাতের প্রতিষ্ঠানে বছরে ২টা গ্রাচ্যুইটির বিধান আছে। এবং তা ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক কলকারখানার শ্রমিকরাও ভোগ করছেন। শ্রমিকের চাকরীর স্থায়ীত্ব রক্ষায় কার্যকর কোন ব্যবস্থা না রেখে অর্থাৎ ছাঁটাই, ডিসচার্জ, টারমিনেশন, ইস্তফা সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহে প্রয়োজনীয় সংশোধনী না আনায় এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকের প্রাপ্য কমিয়ে দেয়া হলো। তা ছাড়া সমকাজে সমমজুরির পরিবর্তে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের শ্রমিকদের মধ্যে বৈষম্যও সৃষ্টি করা হলো।

) (১১) ধারায় আউটসোর্সিংএর বিধান রাখা হয়েছে। এটা থাকলে ঠিকাদার কর্তৃক নিয়োগকৃত শ্রমিক দিয়েই কাজ চালাতে চাইবে মালিক। ফলে নিয়মিত চাকরি বলে আর কিছু থাকবে না। শ্রমিকদেরকে আইন অনুযায়ী অনেক প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা সহজ হবে।

) ২৩ () ধারায় বলা হয়েছে, “মালিকের অধীন তাঁহার বা অন্য কোন শ্রমিকের চাকরী সংক্রান্ত ব্যাপারে ঘুষ গ্রহণ বা প্রদান; প্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃঙ্খল বা দাঙ্গাহাঙ্গামামূলক আচরণ, অথবা শৃঙ্খলা হানিকর কোন কর্ম; করার এই অসদাচরণের জন্য কোন শ্রমিককে বরখাস্ত করা হইলে তিনি কোন ক্ষতিপূরণ পাইবেন না। তবে এইরূপ ক্ষেত্রে অন্যান্য আইনানুগ পাওনাদি যথানিয়মে পাইবেন।”ফলে ১০/১৫ বছর চাকরি করে একজন শ্রমিককে প্রায় শূন্য হাতে চলে যেতে হবে। এটা মালিকের হাতে একটা ভয়ঙ্কর অস্ত্র। অসদাচরণের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে মালিক কারখানা বা কারখানার বাইরের যে কোন ঘটনায়দুর্ঘটনায় শ্রমিকের উপর দোষ চাপাতে পারবে। এই ধারার অপপ্রয়োগের সম্ভাবনা অনেক বেশি। অতীতে এ ধরনের আইনের শিকার হয়েছে শ্রমিক। বাস্তবে এটা একটা চূড়ান্ত রকমের স্বৈরতান্ত্রিক আইনে পরিণত হবে।

) ২৭ এর ৩ () ধারায় মালিকের হাতে এমন অধিকার দেয়া হয়েছে যে, যা প্রয়োগ করে কোন শ্রমিক বিনা অনুমতিতে ১০ দিনের অধিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে শ্রমিকের সমস্ত পাওনা থেকে মালিক তাকে বঞ্চিত করতে পারবে।

) ৪৬ ধারায় নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাসই রাখা হয়েছে। প্রসূতিদের জন্য সর্বত্র ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রযোজ্য। এ আইন বৈষম্যমূলক। কারণ, রাষ্ট্রায়ত্ব খাতের নারী শ্রমিক সহ অনেক ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস রয়েছে। সাভারের ‘রানা প্লাজায়’দুইজন নারী শ্রমিকের সন্তান প্রসব এবং সন্তান সহ নির্মম মৃত্যুর ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলোতে মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার চিত্র।

) আগের আইনে চাকুরি অবসানের সাত দিনের মধ্যে প্রদেয় মজুরি পরিশোধের বিধান ছিল। বর্তমানে এ আইনের ১২৩ () ধারায় এখন তা ৩০ দিন ধার্য করা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের হয়রানি ও ভোগান্তি আরো বাড়বে।

১০) ১৫৫ ধারায় ক্ষতিপূরণ বণ্টনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে– ‘জখমের ফলে মৃত শ্রমিক সম্পর্কে প্রদেয় ক্ষতিপূরণ শ্রম আদালত ভিন্ন অন্য কোন পন্থায় পরিশোধ করা যাবে না।’এ ধারাটি থাকলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে।

১১) ২১১ ধারায় ধর্মঘট করার গণতান্ত্রিক অধিকারকে আগের থেকে আরও কঠিনতর করা হয়েছে যা এই অধিকার খর্ব করার নামান্তর। কারণ, পূর্বেকার আইনে তিনচতুর্থাংশ শ্রমিক ধর্মঘট করার জন্য মত দিলে ধর্মঘট করা যেত। সংশোধনীতে ‘তিনচতুর্থাংশ’এর পরিবর্তে ‘দুইতৃতীয়াংশ’করা হয়েছে।

১২) ধারা ২৩৪ এর-() উপধারা ()-এর দফা ()-এর পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত নতুন দফা () এ বলা হয়েছে, ‘এর মালিক প্রত্যেক বৎসর শেষ হইবার অন্যূন নয় মাসের মধ্যে, পূর্ববর্তী বৎসরের নীট মুনাফার পাঁচ শতাংশ (%) অর্থ ৮০:১০:১০ অনুপাতে যথাক্রমে অংশগ্রহণ তহবিল, কল্যাণ তহবিল এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলে প্রদান করিবে।’ পূর্বেকার আইনে মুনাফার ৫% সকল শ্রমিকদের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু মালিকরা তা কখনো দিতে চাইতো না। এবারকার সংশোধনীর ফলে মুনাফার অংশ পাওয়া শ্রমিকদের জন্য আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। শ্রমিকরা বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকরা মুনাফার অংশ পাবে না এবং ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী শিল্পের তালিকা যত বাড়বে শ্রমিকের প্রাপ্য অধিকার তত কমবে। শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্য মুনাফার অংশ তাঁকে সরাসরি দেয়াই সঙ্গত। শ্রমিকের টাকায় অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিল করা মাছের তেলে মাছ ভাজার নামান্তর।

নতুন এই সংশোধনীতে প্রচলিত আইনের অন্যান্য অগণতান্ত্রিক অনেক ধারার মধ্যে ২৬ ধারাটি বহাল রাখা হয়েছে। ২৬ ধারা অনুযায়ী যে কোন শ্রমিককে ১২০ দিনের বেতন দিয়ে অথবা ৪ মাস আগে নোটিশ দিয়ে ছাঁটাই করার ক্ষমতা মালিকের হাতে দেয়া আছে। এ ধারার বিরুদ্ধে পাকিস্তান আমলেও শ্রমিকরা আন্দোলন করেছিল। তখন এটা ছিল ১৯() ধারা। এ ধারা বলবৎ থাকলে শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা বলে কিছু থাকবে না। এই ধারার অপব্যবহার করে মালিকরা শ্রমিকদের সংগঠন করার তথা ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার বাধাগ্রস্থ করবে। এছাড়াও জারী রাখা হয়েছে ধারা ১৭৯ (), যেখানে বলা হয়েছে কোন কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য ঐ কারখানার মোট কর্মরত শ্রমিকের মধ্যে কমপক্ষে ৩০%কে সদস্য হতে হবে। এই আইনটির কারণে সরকার ও মালিকের দালালমুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার কাজটি আরো কঠিন হয়েছে। কারণ, আমাদের দেশের অনেক কারখানাতেই এখন শ্রমিকের সংখ্যা এত বেশী যে (যেমন অনেক গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ হাজার) তাদের মধ্য থেকে ৩০% কে সদস্য করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা প্রায় দূঃসাধ্য একটি কাজ।

এই আইনের ধারাগুলো এই নিষ্ঠুর সত্য পুনরায় তুলে ধরেছে যে, সবসময়ে আমাদের দেশের আইনের ধারাগুলো এমনভাবে লেখা হয় যা মালিকশ্রেণীকেই রক্ষা করে। যে আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে রক্ষা পেতে পারে শোষক মালিকশ্রেণী তথা শাসক গোষ্ঠি; কিন্তু শ্রমিকরা তা পারে না!

মহাজোট সরকারের এই শ্রম (সংশোধন) আইনএ শ্রমিকদের প্রাণের দাবি তাদের সবচেয়ে মৌলিক দাবি ট্রেড ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা বিপত্তি রহিত করা হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় আরো কঠিন করা হয়েছে। পূর্বে প্রাপ্ত অনেক সুবিধা থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে। The Principle of Natural Justice’অনুযায়ী ইতিমধ্যে অর্জিত কোন অধিকার কর্তন করা যায় না। শ্রম আইন সংশোধনের নামে যা করা হয়েছে তা কার্যত শ্রম অধিকার সংকোচন আইন। এ আইন প্রবর্তিত হলে শ্রমিক সংগঠন ও আন্দোলন করার গণতান্ত্রিক অধিকার সহ মৌলিক অধিকার সংকুচিত হবে। এই শ্রম আইন কার্যত মালিকশ্রেণীর স্বার্থেই প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সংবিধান এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুসমর্থিত আইএলও কনভেনশন ৮৭ (সংঘবদ্ধ হওয়ার স্বাধীনতা ও সংগঠনের অধিকার সংরক্ষণ কনভেনশন) ও ৯৮ (সংগঠন করার ও যৌথ দরকষাকষির অধিকার কনভেনশন)-কে খর্বিত ও তাচ্ছিল্য করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ সংশোধনকল্পে অতীতের সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় কার্যত কোন রীতিনীতি, নিয়ম পদ্ধতি না মেনে গত ক্ষমতাসীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর পক্ষে রাষ্ট্রপতি ডিসেম্বর’০৭ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধনী অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারী করেন। তখন যৌক্তিক কারণেই দেশের রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে উক্ত সংশোধনী অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি জানানো হয়। যে কারণে তৎকালীন সরকার সংশোধনী অধ্যাদেশের পুরোটার পরিবর্তে একাংশ গেজেট আকারে প্রকাশ করতে বাধ্য হয়।

দুই

কী ছিল বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর শ্রমিক ও শল্পি স্বার্থ বিরোধী কয়কেটি অগন্তান্ত্রকি ধারা:

এক. নতুন শ্রম আইনের ধারা ১০০ তে বলা হয়েছে, “কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠানে সাধারণত: দৈনিক ৮ ঘন্টার অধিক সময় কাজ করিবেন না বা তাহাকে দিয়ে কাজ করানো যাইবে না : তবে শর্ত থাকে যে, ধারা ১০৮ এর বিধান (অধিককাল কর্মের জন্য অতিরিক্ত ভাতা) সাপেক্ষে, উক্তরূপ কোন শ্রমিক দৈনিক ১০ ঘন্টা পর্যন্তও কাজ করিতে পারিবেন। অর্থাৎ, আইনের এই ধারার মাধ্যমে মালিক পক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদেরকে অতিরিক্ত খাটানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য শ্রমিকের সম্মতির প্রয়োজন হলেও এখানে তা স্পষ্ট করা হয় নাই। তাছাড়া ইতোপূর্বে খাওয়া ও প্রার্থনা বিরতিসহ কর্মঘন্টা হিসাব করা হলেও নতুন আইনে খাওয়া ও বিশ্রামের জন্য বিরতি ব্যতিত সময়কে কর্মঘন্টা বলা হয়েছে। আমরা জানি, অতীতে আইন লঙ্ঘন করে মালিকপক্ষ ৮ ঘন্টা কর্মঘন্টার জায়গায় শ্রমিকদের ১২১৬ ঘন্টা কাজ করিয়েছে এখনও করাচ্ছে (যেমনগার্মেন্টস সেক্টরে)। এরকম একটি পরিস্থিতিতে এই ধারাটি প্রণয়নের ফলে মালিকপক্ষ দ্বিগুন মজুরীর টোপ দিয়ে, এর অপব্যবহার করে দৈনিক কর্মঘন্টাকে ৮ ঘন্টা থেকে ১০ ঘন্টায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরী হয়েছে। অথচ দৈনিক কর্মঘন্টা ৮ ঘন্টার দাবি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি দাবি, একটি স্বীকৃত মানবাধিকার। যার ব্যতিক্রমের কোনো সুযোগ নেই। এছাড়াও আইনানুযায়ী, ইতোমধ্যে অর্জিত ও ভোগ করা কোন অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করার কোনো নিয়ম নেই।

দুই. এই শ্রম আইনের ধারা১৮০ তে বলা হয়েছে, “কোন ট্রেড ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি উহার কর্মকর্তা অথবা সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা থাকিবার যোগ্য হইবে না, যদি – () তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া থাকেন। অথবা ধারা ১৬২()() অথবা ধারা২৯৮ এর (ভবিষ্যৎ তহবিল এবং ট্রেড ইউনিয়ন তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ এর দণ্ড) অধীন কোন অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হইয়া থাকেন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর দুই বৎসর কাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে; () যে প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হইয়াছে সে প্রতিষ্ঠানে তিনি শ্রমিক হিসাবে নিয়োজিত বা কর্মরত না থাকেন।”

পুরাতন আইনে একসময় কর্মরত ছিলেন এমন অবসরপ্রাপ্ত, চাকরিচ্যুতদের প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার অধিকার ছিলো। কিন্তু এখন চাকরি নিয়ে মামলা লড়া শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার সুযোগ থাকলো না। এছাড়া অতীতে রাজনৈতিক কর্মীরা শ্রমিকদের সংগঠিত করার লক্ষে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতেন। নতুন আইনে সেই অধিকার খর্ব করা হয়েছে। এই আইন কার্যকর হলে বর্তমানে দেশের নেতৃস্থানীয় অনেক শ্রমিক নেতা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে আর ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবেন না। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ মনে করেন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন অভিজ্ঞ পোড় খাওয়া শ্রমিক নেতৃবৃন্দ শূণ্য করা এবং আন্দোলনের মাঠপর্যায়ে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে শিক্ষিত রাজনীতি সচেতন সংগঠকদের আগমন বন্ধ করার জন্যই সরকার মালিকশ্রেণীর পক্ষে এই ধারা প্রণয়ন করেছে। শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে/শিল্পাঞ্চলে বড়ো কোনো আন্দোলন সংগঠিত হলে মালিকপক্ষ আন্দোলনকারী শ্রমিক, শ্রমিক নেতৃবৃন্দের নামে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করে। অতীতের এবং সাম্প্রতিক সময়ে কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও মজুরী বৃদ্ধির আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে আশংকা করে একথা অনায়াসে বলা যায় যে, মালিকরা ইউনিয়নকর্মীদের চাকরিচ্যুত করে/মিথ্যা মামলা দিয়ে এই ধারার ব্যাপক অপব্যবহার করবেন।

তিন. এই শ্রম আইনের ধারা১৯০ এ বলা হয়েছে, “() এই ধারার অন্য বিধান সাপেক্ষে, শ্রম পরিচালক কোন ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রি বাতিল করিতে পারিবেন, যদি – …. () উহা কোন অসৎ আচরণ করিয়া থাকে;” আবার, ধারা১৯৬এ শ্রমিকের পক্ষে অসৎ শ্রম আচরণ শিরোনামে বলা হয়েছে, “মালিকের বিনা অনুমতিতে কোন শ্রমিক তাহার কর্মসময়ে কোন ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকিবেন না: তবে শর্ত থাকে যে, কোন প্রতিষ্ঠানের যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক এর ট্রেড ইউনিয়ন কাজকর্মে নিয়োজিত থাকার ব্যাপারে এই উপধারার কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না। যদি উক্তরূপ কর্মকাণ্ডে এই আইনের অধীন কোন কমিটি, আলাপআলোচনা, সালিশ মধ্যস্ততা অথবা অন্য কোন কর্মধারা সম্পর্কে হয় এবং মালিককে তৎসম্পর্ক যথাসময়ে অবহিত করা হয়।” এই ধারা দুটির মাধ্যমে কোনো মালিক যদি তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করতে চান তাহলে তিনি সহজেই তা করতে পারবেন। শুধু তাই নয়, ধারা দুটির মাধ্যমে শ্রমিকদেরকে তার ইচ্ছামতো ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত বা দূরে রাখতে পারবেন। যা মূলত আইনী লেবাসে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার খর্ব বা খন্ডিত করার শামিল।

চার. এই আইনের ধারা২১১() –এ বলা হয়েছে, “যদি কোন প্রতিষ্ঠান নতুন স্থাপিত হয়, অথবা বিদেশী মালিকানাধীন হয়, অথবা বিদেশী সহযোগিতায় স্থাপিত হয়, তাহা হইলে উক্তরূপ প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন শুরু হওয়ার পরবর্তী তিন বৎসর পর্যন্ত ধর্মঘট কিংবা লকআউট নিষিদ্ধ থাকিবে। তবে, উক্তরূপ প্রতিষ্ঠানে উত্থিত কোন শিল্পবিরোধ নিষ্পতির ক্ষেত্রে এই অধ্যায়ে বর্ণিত অন্যান্য বিধান প্রযোজ্য হইবে।”

এই ধারার ফলে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনী অধিকার সংকুচিত হলো খন্ডিত হলো। মালিক শ্রেণীকে তিন বছরের জন্য আইনী বাধ্যবাধকতার উর্ধ্বে থাকার সুযোগ করে দেওয়া হলো। ফলে মালিকপক্ষ তিনবছরের জন্য ‘যাহা চাহে মন’ অর্থাৎ ইচ্ছামতো কারখানা পরিচালনা করতে পারবেন। আর শ্রমিকরা সংগঠনসংগ্রাম করার স্বাধীনতাসহ সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। বঞ্চিত হলো আইএলও সনদে স্বীকৃত মৌলিক মানবাধিকার থেকে। আইনের উর্ধ্বে থাকার এই আইনী ছাড়পত্র অধিক সময়কাল কাজে লাগাতে মালিকশ্রেণী কর্তৃক তিন বছর পরপর কারখানার নাম পাল্টানোর বা অন্য কোন ফাঁকফোকর বের করার আশংকা এক্ষেত্রে থেকেই যায়। অর্থাৎ নতুন এই আইনে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সংকুচিত/খন্ডিত করা হয়েছেরাজনৈতিক কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার অধিকার হরণ করা হয়েছে।

পাঁচ. পূর্বেকার আইনে ছিল, কোনো কারণ না দেখিয়ে মালিক শ্রমিকের চাকরি অবসান করতে পারবেন না। তবে মাসিক বেতনভুক্ত/নিযুক্ত শ্রমিকদেরকে ১২০ দিনের লিখিত নোটিশ অথবা ১২০ দিনের মজুরী দিয়ে বিদায় করতে পারবেন। অন্যান্য শ্রমিককে ৬০ দিনের লিখিত নোটিশ অথবা সমপরিমাণ মজুরী দিয়ে বিদায় দিতে পারবেন। এবং তৎসহ প্রতি এক বছরের বা ছয়মাসের অধিককালের চাকরির জন্য তিরিশ দিনের করে মজুরী ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিশোধ করবেন। [১৯৬৫ সনের শ্রমিক নিয়োগ (স্থায়ী আদেশ) আইন, ধারা১৯ এবং ১৯৬৮ সনের শ্রমিক নিয়োগ (স্থায়ী আদেশ) বিধিমালা, ধারা১৬ দ্রষ্টব্য]

এছাড়াও ঐ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী একজন শ্রমিক তাঁর চাকরির অবসান করতে চাইলে, মাসিক মজুরীতে নিযুক্ত শ্রমিকের ক্ষেত্রে এক মাসের নোটিশ, অন্য শ্রমিকের ক্ষেত্রে চৌদ্দ দিনের নোটিশ, লিখিতভাবে মালিককে প্রদান করতে হতো। যিনি তাঁর চাকরি অবসান করেন তিনি ধারা১৯ এর () উপধারায় বর্ণিত কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন না। কিন্তু তিনি এই আইনের অধীনে বা প্রচলিত অন্য কোনো আইনে অন্য কোনো সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা থাকলে তা অবশ্যই পাবেন।

অথচ নুতন আইনের ধারা২৬ (এ ধারার বিরুদ্ধে পাকিস্তান আমলেও শ্রমিকরা আন্দোলন করেছিল। তখন এটা ছিল ১৯() ধারা।) এ অন্যান্য শ্রমিকের ক্ষেত্রে ৬০ দিনের লিখিত নোটিশ অথবা সমরিমাণ মজুরী দিয়ে চাকরি অবসান করার আইনটি বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় এই আইনের ধারা২৭() এ স্বেচ্ছায় শ্রমিক কর্তৃক চাকরি অবসানের/ছাড়ার জন্য ৬০ দিন আগে নোটিশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে (পূর্বেকার আইনে যা ছিল ৩০ দিন)। অথচ সরকারী চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রেও ৬০ দিন আগে নোটিশ দেওয়ার কোনো বিধান নাই। উপরন্তু এই আইনানুযায়ী [ধারা২৭()] নোটিশ না দিলে নোটিশ মেয়াদের জন্য সমপরিমাণ অর্থ মালিককে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যা পূর্বেকার আইনে ছিলো না। এই আইনে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়া স্থায়ী শ্রমিক বাদে অন্যান্য শ্রমিকদেরকে অত্র আইনে বা প্রচলিত অন্য কোনো আইনের অন্য কোনো সুযোগ সুবিধা ভোগ করা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। স্থায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও দৃশ্যত নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হলেও [ধারা২৭()] কার্যত অধিকাংশরাই তা পাবেন না। অর্থাৎ, নতুন আইনে শ্রমিকদেরকে টারমিনেশন বেনিফিট থেকে বঞ্চিত করার মালিকদের আরও পাওয়ার এবং শ্রমিকদের না পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ছয়. পূর্বেকার আইনে অগ্নিকান্ডের ক্ষেত্রে সতর্কতা, অগ্নিকান্ডের ক্ষেত্রে পালানোর পন্থা, অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং পানি সরবরাহ অর্থাৎ আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে ব্যবস্থার উল্লেখ ছিলো, বর্তমান আইনে তা অনেক শিথিল ও কম বা ফাঁক রাখা হয়েছে। [১৯৬৫ সনের কারখানা আইনের ধারা২২() এবং ১৯৬৯ সনের কারখানা বিধিমালা ধারা৫১, ৫২ দ্রষ্টব্য] সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিক, এলাকাবাসী ও জাতীয় দৈনিক থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী আমরা জানি, এই আইন প্রণীত হওয়া পর্যন্ত আগুনে পুড়ে এবং আগুন থেকে বাঁচতে গিয়ে প্রায় ১,০০০ শ্রমিক নিহত ও কয়েক হাজার শ্রমিক আহত হয়েছে। এমতাবস্থায়, যেখানে পূর্বের থেকে কড়া আইনসহ দায়ী খুনী মালিকের কঠোর শান্তির বিধান রাখার দরকার ছিলো, দরকার ছিলো আরও কার্যকরী নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সেখানে তা না করে আরও শিথিল ও কম কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অথচ নতুন আইনে মালিকের ক্ষতি বা বিনষ্টির জন্য শ্রমিকের মজুরী কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে (ঐ ধারা১২৭)

সাত. এই শ্রম আইনের চতুর্থ অধ্যায়ের প্রসূতি কল্যাণ সুবিধাশিরোনামের ধারা অনুযায়ী, নারী শ্রমিক সন্তান প্রসবের আগে ৮ সপ্তাহ এবং পরে ৮ সপ্তাহ সর্বমোট ১৬ সপ্তাহ সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি বা প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা ভোগ করবেন। তবে পূর্বেকার মতো এখন আর কোন মাতার সুবিধাজনক সময়ে (এতোদিন বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য মায়েরা সন্তান জন্মের পর অপেক্ষাকৃত বেশী দিন ছুটি নিতেন।) এই ছুটি ভোগ করতে পারবেন না। আবার এই আইনের ধারা২৮৬ তে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা না দেওয়ার জন্য শাস্তি রাখা হয়েছে তিন মাসের দণ্ড বা মাত্র পাঁচহাজার টাকা জরিমানা। এর ফলে একজন মালিককে মাতৃত্বকালীন সুবিধা দিতে গিয়ে সেখানে চার মাসের ছুটিসহ চার মাসের বেতন (মনেকরি ৩,০০০ X= ১২,০০০ টাকা) দেওয়ার পরিবর্তে শুধুমাত্র ৫,০০০ টাকা জরিমানা দিলেই চলবে, সেখানে তিনি সাধারণত দ্বিতীয় ব্যবস্থাটিই গ্রহণ করবেন। কারণ, জরিমানা দেওয়াটাই মালিকের জন্য লাভজনক। ফলে আইনের এই শুভংকরের ফাঁকির কারণে এই মাতৃত্বকালীন সুবিধার আইনটি দৃশ্যত থাকলেও কার্যত : মাতৃত্ব কল্যাণ ছুটির সুবিধা থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বা সে সুযোগ তৈরী করে দেওয়া হয়েছে।

আট. এই আইনের অপরাধ, ণ্ড এবং পদ্ধতিশিরোনামে একটি অধ্যায়ে ধারা২৯৪, ২৯৫, ২৯৬ অনুযায়ী কোনো শ্রমিক বেআইনী ধর্মঘটে গেলে, বেআইনী ধর্মঘট বা লকআউটে প্ররোচিত করলে, ঢিমে তালের কাজে অংশগ্রহণ বা প্ররোচিত করলে এক বছরের দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অথচ ধারা৩৩ এর অধীনে বেআইনী লেঅফ, ছাঁটাই, ডিসচার্জ, বরখাস্ত, অপসারণ অথবা কোনো কারণে চাকরির অবসান ইত্যাদির জন্য মালিক কর্তৃক শ্রম আদালতের কোনো আদেশ অমান্য করার জন্য শাস্তি রাখা হয়েছে মাত্র তিন মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা। আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য (অর্থাৎ, মালিক পক্ষের অগ্নিকান্ড না ঘটার জন্য বা অগ্নিকান্ড থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি না থাকার কারণে শ্রমিকদের মৃত্যু) মালিকপক্ষের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো শাস্তির বিধান রাখা হয়নি।

মালিকের দায়িত্বহীনতা ও নির্মাণ সংক্রান্ত নিয়মনীতি না মেনে বিদ্যমান নির্মাণ ও রক্ষনাবেক্ষণ আইন লংঘনের কারণে কারখানাসমূহে যেসব দুর্ঘটনা (যেমন২০০৫ সালে সাভারের স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসে পড়ে ৭৭ জন, ভিন্নমতানুযায়ী শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা, ২০০৬ সালে তেজগাঁও এর ফিনিক্স টেক্সটাইল ধসে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা যা আসলে খুনের সমতুল্য) ঘটেছে তার জন্য মালিক বা সংশ্লিষ্টদের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে মাত্র ৪ বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, ….(ধারা৩০৯)। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে এর থেকেও ছোট অপরাধের জন্য বেশী শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়াও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলিতে নারী শ্রমিকদের সাথে অশালীন আচরণ ও তাদের সম্ভ্রমহানীর ঘটনা অহরহ ঘটলেও এই অপরাধের জন্য শাস্তি রাখা হয়েছে মাত্র তিন মাসের কারাদন্ড বা একহাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। যা নারীর প্রতি উল্লেখিত আচরণ উসকে দিতে পারে বা বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, নতুন আইনে শ্রমিকদের জন্য কঠোর শাস্তি ও মালিকদের জন্য কম শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

নয়. সার্ভিস বুক একজন শ্রমিকের শ্রমজীবনের অভিজ্ঞতার স্মারক। নতুন আইনের ধারা৬ অনুযায়ী প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য সার্ভিস বুক রাখতে বলা হয়েছে, কিন্তু তা থাকবে মালিকের কাছে; যদিও এই আইনে আরও বলা হয়েছে – “যদি কোন শ্রমিক সার্ভিস বইয়ের একটি কপি নিজে সংরক্ষণ করিতে চাহেন তাহা হইলে নিজ খরচে তিনি তাহা করিতে পারিবেন।”কিন্তু কারখানা পরিবর্তন করলে শ্রমিকের সার্ভিস বই মালিক যদি ফেরত না দেয় তবে তা উদ্ধার করার বা পাবার কোনো উপায় বলা হয়নি নতুন আইনে। বর্তমানে অনেক কারখানা রাজধানী শহরের বাহিরে দূরবর্তী অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে। কোনো শ্রমিক যদি নতুন স্থানে চাকরি করতে যেতে না চায় তাহলে তার চাকরি সেই মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে। ঐ সব কারখানার শ্রমিকদের জন্য নতুন শ্রম আইনে আইনগত সুরক্ষার কোন বিধান নাই। ফলে ঐ শ্রমিক ইতোমধ্যে যে কয়বছর চাকরি করেছেন সে জন্য তার প্রাপ্ত সুবিধাদি ভোগ করা থেকে বঞ্চিত করাও সহজ হবে। অথচ নতুন আইনে এই সুবিধাদি প্রাপ্তির কোনো ব্যবস্থা নাই। ফলে, খুব স্বাভাবিকভাবে মালিকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন শ্রমিকরা হবেন ক্ষতিগ্রস্ত।

দশ. শ্রমিকরা যদি নিম্নতম মজুরী বোর্ডের কোনো সিদ্ধান্ত মানার অযোগ্য মনে করেন তাহলে তারা কোথায় প্রতিকার পাবেন এই শ্রম আইনে তার কোনো উল্লেখ নাই। বরং নতুন আইনের ধারা১৪০() এ বলা হয়েছে নিম্নতম মজুরী চূড়ান্ত হলে, “তৎসম্পর্কে কোনভাবে কোন আদালতে বা কোন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রশ্ন করা বা আপত্তি উত্থাপন করা যাইবে না।”এর ফলে সুবিধাবাদী ও মালিকের পোষা শ্রমিক নেতাদের কোনোভাবে বোর্ডের সদস্য করে, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ আরও বাড়লো হওয়ার সম্ভাবনাও তাই।

এগারো. এই আইনের ধারা২৮ অনুযায়ী, শ্রমিকের চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের বয়স ৫৭ বছর করা হয়েছে (বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ঐ বয়স ৬০ বছর)। এর ফলে সকল কারখানার ৫৭ বছরের বেশী বয়সের শ্রমিকেরা নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই চাকরি হারাবেন। এই আইন কার্যকর হওয়ার ফলে অবসর এ যাওয়া শ্রমিক পরিবার চরম অর্থনৈতিক সংকট সহ সামাজিকভাবে চরম নিরাপত্তাহীনতায় পতিত হবেন। ট্রেড ইউনিয়নগুলো সিনিয়রঅভিজ্ঞ শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে হারাবেন, হবেন ক্ষতিগ্রস্ত। প্রচলিত প্রথা হচ্ছে, যতোদিন শারীরিক সামর্থ্য থাকবে ততোদিন শ্রমিকরা কাজ করবে। উল্লেখ্য, শ্রমিকের চাকরি জীবনের অবসান ঘটাতে বয়সের মানদণ্ড আরোপ না করার জন্য ২০০৫ সালে উচ্চ আদালতে একটি রায়ও (৪২ ডিএলআর) হয়েছিলো। এই আইনের মাধ্যমে সংকুচিত হবে শ্রমিকদের চাকরির ক্ষেত্র।

বারো. এই আইনের ধারা ২৯৯ বলা হয়েছে, “কোনো ব্যক্তি অরেজিস্ট্রিকৃত অথবা রেজিস্ট্রি বাতিল হইয়াছে এমন কোনো ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্তি সংক্রান্ত কোনো কর্মকাণ্ড ব্যতীত, অন্য কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করিলে অথবা অন্য কোনো ব্যক্তিকে উক্তরূপ কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত বা প্ররোচিত করিলে, অথবা উক্তরূপ কোনো ট্রেড ইউনিয়নের তহবিলের জন্য সদস্য চাঁদা ব্যতীত অন্য কোনো চাঁদা আদায় করিলে, তিনি ছয়মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডে, অথবা দুই হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে, অথবা উভয়দণ্ডেদণ্ডনীয় হইবেন। এই ধারা দেশের প্রচলিত সংবিধানের মৌলিকঅধিকার সংক্রান্ত ৩৭,(সমাবেশের স্বাধীনতা)ও ৩৮ (সংগঠনের স্বাধীনতা) ধারা পরিপন্থী এবং আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ পরিপন্থী। এই ধারা কার্যকর হলে শ্রমিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী প্রাপ্ত অধিকার খর্বিত হবে এবং ট্রেড ইউনিয়ন করা পূর্বের থেকে অনেক কঠিন ও দুরূহ হয়ে পড়বে।

তেরো. এই আইনে শ্রমিকের জন্য আইনের বাধ্যবাধকতা পূর্বের থেকে কঠিন ও কঠোর করা হয়েছে, অথচ মালিকের জন্য করা হয়েছে শিথিল ও নমনীয়। করা হয়েছে স্বজনপ্রীতি। যেমন, ধারা২১১()। এছাড়াও ধারা৩২ অনুযায়ী কোনো শ্রমিকের যে কোনো প্রকারে চাকরি অবসান হলে/চাকরিচ্যুত হলে মালিক কর্তৃক শ্রমিককে বরাদ্দকৃত বাসস্থান থেকে পুলিশ দিয়ে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করতে পারবে। অথচ শ্রমিককে মালিক পক্ষের অন্যায়অত্যাচারের থাবা থেকে পুলিশের মাধ্যমে রক্ষা পাওয়ার/প্রতিকার লাভের কোনো বিধান রাখা হয় নাই। এই ধারাটির অনুমোদন একভাবে দেশের বর্তমান সংবিধানের লংঘনও বটে। কারণ, সংবিধানের ‘মৌলিক অধিকার’ অধ্যায়ের ২৭ ধারায় বলা আছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।”সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষাকারী দেশের শোষক ও উৎপীড়ক শ্রেণীসমূহের সরকার ও আাইন প্রণেতাদের কাছ থেকে শ্রমিক স্বার্থের অনুকূল আইন প্রত্যাশা করা যায় কি?

চৌদ্দ. এই আইনে শ্রমের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে, অথচ শ্রম অনুযায়ী উপযুক্ত মজুরীসহ শ্রমিকের অধিকার ভোগ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি (যেমননবম অধ্যায় দ্রষ্টব্য।)

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ ও বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ এর কি কোনো ইতিবাচক দিক নাই?উত্তরে বলতে হয়, আছে। তবে তা প্রয়োজন অনুযায়ী মালিকদের স্বার্থরক্ষার ব্যবস্থার তুলনায় তেমন কিছুই নয়। অনেকটা জনমানবহীন মরুভূমিতে কয়েকদিনের পিপাসার্ত পথিকের এক আঁজলা জল পানের সুযোগ পাওয়ার মতো।

তিন

শ্রম আইন, ২০০৬ জারী থাকলে এবং শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ কার্যকর হলে দেশে অশান্ত শ্রম পরিস্থিতি তৈরী হবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিল্প খাত। কারণ, প্রচলিত শ্রম আইন ও এই নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে চরমভাবে শ্রমিক স্বার্থ তথা শিল্পের স্বার্থ বিরোধী অবস্থান নেওয়া হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য পক্ষপাতমুক্ত অবস্থান না নিয়ে একপাক্ষিকভাবে মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। দেশের প্রচলিত সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকারের চেতনাকে চরমভাবে খর্বিত করা হয়েছে। এই শ্রম আইন আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুসমর্থিত শ্রম অধিকারের বিধান আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ পরিপন্থী। দরকার অগণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও শ্রম (সংশোধন) আইন সংশোধন অথবা বাতিল করে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সহ শিল্প ও শ্রমিক স্বার্থ রক্ষাকারী গণতান্ত্রিক শ্রম আইন।

সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করে নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমাদের দেশের শ্রম আইন মূলত মালিকশ্রেণীর রক্ষাকবচ। মালিকের দ্বারা, মালিকের জন্য প্রণীত। এই আইন আমাদের দেশের মৌলিক শিল্প অথবা ভারী শিল্প রক্ষা ও বিকাশের সহায়ক নয়। বরং সারা পৃথিবীর শ্রমিকশ্রেণী সহ মানবজাতির দুশমন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থরক্ষাকারী বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিশ্রমিক স্বার্থ বিরোধী, প্রকৃত ও কার্যকর শিল্পায়নের ভিত্তি ধ্বংসকারী প্রেসক্রিপশনের প্রতিফলন মাত্র। শ্রমিকশ্রেণী তথা দেশজাতির মঙ্গল বা উন্নতি কামনাকারী কারো পক্ষেই এই ধরণের অগণতান্ত্রিক শ্রম আইন অনুমোদন করা বা মেনে নেওয়া উচিত নয়।

পূর্ব থেকে আজ অবধি শাসকশ্রেণীর সরকারগুলো কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে প্রণীত আইনগুলো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভোটের সময়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেও আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী আসলে শ্রমিকশ্রেণী নয়, ধনীক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত। শ্রমিকদের স্বার্থ বিরোধী কাজে ‘মীর জাফর’ এর ভূমিকায় ক্রিয়াশীল। কারণ, রাষ্ট্রটি ধনীক শ্রেণীর। আর রাষ্ট্রের ‘ম্যানেজার’ সরকার ধনীকবণিক সহ শোষক মালিক শ্রেণীর আরদালির ভূমিকা পালন করছে। সেজন্য গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নের দাবিতে গতানুগতিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও দেশব্যাপী অর্থনীতিবাদী স্বতোস্ফূর্ত আন্দোলনের বদলে বর্তমান শ্রম পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন তথা বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তন করে গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের সহায়ক শ্রেণীসচেতন কার্যকর শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ খোলা নেই। ভবিষ্যত শ্রমবীর শ্রমিকশ্রেণীর। মুক্তিকড়া নাড়ে দরজায়!

——————————————

শামীম ইমাম :: নির্বাহী উপদেষ্টা, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন

ইমেইল: shamim.uclb@gmail.com

২৩ জুলাই, ২০১৩

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s