লিখেছেন: নেসার আহমেদ

rana_plaza-1২৪ এপ্রিল, ২০১৩ সাল। ঐদিন সাভারে রানাপ্লাজা ভবন ধ্বসে হাজারের ঊর্ধ্বে কর্মরত শ্রমিক খুন হন। চরম নৃশংসতম ও ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের নজির গোটা বিশ্বের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে মেলা ভার। হত্যাকাণ্ড আমাদের জনজীবনের পরে গভীর ছাপ রেখেছে। একইভাবে ক্রেতা রাষ্ট্রগুলোর জনগণের পরেও। শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনাসমালোচনা, প্রস্তাবনা ও রাজনীতি। যা দেশীয়আন্তর্জাতিক সব স্তরেই আজ চলছে। আমরা কেউই এই প্রতিক্রিয়ার বাইরে নই। ফলে সময়ের দাবি অনুযায়ী কিছু কথা বলা জরুরি

১৯৭৬ সালে নুরুল কাদের খান নামে একজন ডাকসাইটে আমলার হাত ধরে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু। চট্রগ্রামের কালুরঘাটেদেশগার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ঐ বছর ঐ কারখানা থেকে ১২ হাজার মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। তারপর থেকে এ দেশের রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা এবং তত্ত্বাবধানে এই শিল্পের উথান ঘটে। যেমন:দেশে বিজিএমইএএর সদস্যভুক্ত গার্মেন্টসের সংখ্যা বর্তমানে ৫৫০০টি। বিকেএমইএএর সদস্যভুক্ত গার্মেন্টসের সংখ্যা ১৮০০। এর বাইরে রয়েছে তালিকাবিহীন কারখানা শত শত। এবং পোশাকশিল্পের সাথে সম্পর্কিতভাবে সংযোজন শিল্প গড়ে উঠেছে আরো ৪৭টি। এ সব কিছু মিলেমিশে বিদেশী ক্রেতাদের প্রয়োজনে পোশাক তৈরি করছে। শিল্পের এই শাখায় বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার মধ্যে আবার ৬০ শতাংশ বা ১২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক প্রতি বছর এক ইউরোপীয়ান ইউনিয়নই ক্রয় করে থাকে। দেশের ৭৫ ভাগ রপ্তানি খাতের আয় এই শিল্প থেকেই আসে। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এ দেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। বিদেশী বায়াররা গড়ে ৫ ডলারে এক পিস কাপড় বানিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে সেটা ৩৫ ডলার করে বিক্রি করে। আর প্রতিটি পোশাক তৈরির জন্য এদেশের শ্রমিকরা পান গড়ে ৫ সেন্ট। শিল্পের এই খাতে কর্মরত বিদেশী বায়ারের সংখ্যাও কম নয়। এক ভারতের প্রায় ৪০০টি বায়িং এখানে কাজ করছে। শ্রীলঙ্কার বায়িংয়ের সংখ্যা এর কাছাকাছি। তাদের শত শত টেকনিশিয়ান ও কর্মকর্তারা এখানে কর্মরত রয়েছে। রয়েছে পোশাকশিল্প খাতে তাদের বড় মাপের বিনিয়োগ। সব কিছু মিলিয়ে দেশের জিডিপি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে এই শিল্পের ‘অবদানের’ কথা আমরা জানতে বাধ্য হই। কারণ আমাদের রাষ্ট্রের কর্ণধার মালিকপক্ষ এবং অর্থনীতিবিদরা প্রতিনিয়ত সবাইকে সেটা স্মরণ করিয়ে দেন। তারা আরো দাবি করেন, শিল্পের এই শাখায় যে হারে প্রবৃদ্ধি ঘটছে তার উপরে ভিত্তি করে ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের আয় ও জীবনযাত্রার মান ইউরোপকে ছাড়িয়ে যাবে। আর উন্নয়ন তরিকার নেতানেত্রীরা এই শিল্পের উত্থানের সাথে দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি যুক্ত করেন। তত্ত্বায়ন করেন। নারী মুক্তির দৃষ্টান্ত হিসাবে বিশ্বদরবারে নজির উপাস্থাপন করেন। কারণ, এই খাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ লাখ। যার ৯০ শতাংশ আবার নারী শ্রমিক। অর্থাৎ, সব কিছু মিলিয়ে আমাদের দেশে পোশাক শিল্পের মালিকরা একটা সফল খাতের উদ্যোক্তা শ্রেণী হিসাবে সমাজে পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত, এবং সম্মানীয়। কিন্তু তারপরেও দেশে এই একটি মাত্র খাতেই ঘটে চলেছে প্রশ্নহীন ও নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড। ফলে রাষ্ট্রসরকার এবং উদ্যোক্তা হিসাবে মালিকশ্রেণী কেউই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন।

পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরুর প্রক্রিয়া

garments_bangladesh-11১৯৭৬ সালে যখন এই শিল্প যাত্রা শুরু তখন সেটা গড়ে উঠেছিল সমস্ত আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে এবং বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে। অর্থাৎ, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে শিল্পকারাখানা গড়ে তুলতে গেলে ঐ দেশের প্রচলিত শ্রমআইন, শিল্পআইন, পরিবেশ আইন ও অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা হিসাবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশে পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে তার সব কিছুই পাশ কাটান হয় প্রথম থেকেই। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার আওতায় আনা হয় দেশীয় মালিকশ্রেণী ও কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে। আর উৎপাদক শ্রমিকদেরকে মালিকপক্ষের স্বেচ্চাচারিতা ও দয়ার উপরে ছেড়ে দেয়া হয়। সোজা ভাষায় মালিকশ্রেণী ও কর্পোরেটদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা আর বিপরীতে উৎপাদক শ্রমিকদের আইনিভাবেই নিরাপত্তাহীনতার কাঠামোয় বেঁধে এ শিল্পের যাত্রা শুরু। ফলে সূচনা থেকেই পোশাকশিল্পের সাথে শ্রমিক বিদ্রোহ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যার প্রতিক্রিয়ায় আপাত শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা ও নিরেপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো তার খোলস ছেড়ে সন্ত্রাসের খড়গ নামিয়ে আনছেবিদ্রোহীশ্রমিকদের পর। এদেশে যতবার পোশাকশ্রমিকরা তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছেন ততবারই তাদের পরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে এসেছে। যে সন্ত্রাসের চরিত্র সব সময়ে ছিল সশস্ত্র। নেমে এসেছে মালিকপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাস। এভাবে রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাস, বিপরীতে শ্রমিকদের প্রতিরোধ, ন্যায় ভিত্তিক আন্দোলন, এই দুই প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অবস্থার কিছুটা বদল ঘটে ১৯৯০ সালে। ঐ বছর শিল্পের এই শাখায় লাগাতার আন্দোলন ও বিদেশী রাষ্ট্রের চাপ অবস্থা বদলের ক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা পালন করে। শ্রমিকদের দিক থেকে বরাবরই দাবি ছিল ন্যূনতম মজুরি, কাজের নির্দিষ্ট শ্রম ঘন্টা, নিয়োগপত্র প্রদান, মার্তৃকালীন ছুটি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং সুষ্ঠুকর্মপরিবেশ বাস্তবায়ন। আর বিদেশী বলতে প্রধানভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়নগুলির চাপ ছিল শিশুশ্রম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। মার্কিন ট্রেড ইউনিয়নগুলির দাবি ছিল বাংলাদেশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও শিশুশ্রম ব্যবহারের ফলে এদেশে তৈরি পোশাক উৎপাদনে উৎপাদন খরচ কম। ফলে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের শ্রমিক সংগঠনের চাপে মার্কিন কংগ্রসে একটা বিল উত্থাপন করতে বাধ্য হয়। যার প্রতিক্রিয়াতে বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজার রক্ষা করে। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, পশ্চিমা দেশগুলির শ্রম আইনে উৎপাদন ক্ষেত্রে চাইল্ড লেবার, বন্ডেড লেবার, ফোর্স লেবার এবং প্রিজন লেবার একদম নিষিদ্ধ। ফলে তারা যে সব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে, সেখানে আলোচিত চার ক্যাটাগরির শ্রম প্রয়োগ করে উৎপাদিত পণ্য প্রবেশ করলে সেটা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সংগঠিতই হয়েছে প্রধানভাবে চাইল্ড লেবার, বন্ডেড লেবার এবং ফোর্স লেবারকে ভিত্তি করে। আর মার্কিনি ট্রেড ইউনিয়ন সমূহের চাপ ছিল শুধুমাত্র চাইল্ড লেবার ইস্যু নিয়ে। তারপরেও মার্কিনি ট্রেড ইউনিয়নের চাপে এবং ’৯০ সালে ধারাবাহিক শ্রমিক বিদ্রোহে কিছুটা হলেও এদেশের সরকার ও মালিকপক্ষ নড়ে চড়ে বসতে বাধ্য হয়। সরকার ও মালিকপক্ষ অঙ্গীকার করে, শিল্পের এই শাখা থেকে শিশু শ্রম অপসারণের,অবকাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার। এসব ঘটনাসমূহের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় মালিকপক্ষ নিজস্ব জমিতে বিশাল বিশাল কারখানা গড়ে তুলতে থাকে। এবং সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের শুরুও ঠিক এই সময় থেকে। অর্থাৎ, ভাড়া বাসার দুর্বল অবকাঠামোর সময় থেকে নয়। ১৯৯০ সালের পরে গড়ে ওঠা সর্বাধুনিকঅবকাঠামো থেকে। যা চলছে একের পর এক লাগাতারভাবে। যার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ রানাপ্লাজায় শ্রমিক হত্যা সংগঠিত হয়। আমরা সবাই নানাভাবে তৎপর হয়ে উঠি। আমাদের সরকার, প্রশাসন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, রাজনৈতিক ও সাংকৃতিক কর্মী, সাধারণ মানুষ সবাই যার যার মত করে ঈমানী পরীক্ষা দেয়া শুরু করে। সঙ্গে চলে বিশ্লেষণ হাজিরের চেষ্টা। অনেকে জনমত গঠনে রাজনৈতিক কর্মসুচি দেন। কিন্তু পরিস্থিতি কোনোভাবে যে স্বাভাবিক নয় আজ অব্দি, মাঝেমধ্যে ফুসে উঠছে শ্রমিক অঞ্চল, তার বড় প্রমা। শ্রমিকরা জীবনজীবিকার নিরাপত্তায় আন্দোলন করছেন। দাবি আদায়ে রাস্তায় নামছেন। রাজপথ অবরোধ করছেন। অবরোধ করছেন কারখানাসমূহ। বিপরীতে সরকারমিডিয়া ও মালিকপক্ষের ভাষায় সেই আন্দোলন বরাবরের মতই নৈরাজ্য হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। কখনো মালিকপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করছে। রাষ্ট্রপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী অতীতের মত খোলস ছেড়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপরে কাঠামোগত সন্ত্রাস নামিয়ে আনছে। রাষ্ট্রআইনপ্রশাসন ও রাষ্ট্রের সশস্ত্রবাহিনী একজোট হয়ে মালিকপক্ষকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিচ্ছে। তারপরেও পরিস্থিতি বিষ্ফোরণ উন্মূখ। কারণ অসংখ্য অবিচারসহ মৃত্যুর যে মিছিল শুরু হয়েছে পোশাকশিল্প ঘিরে, তা রোধ করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ আজো গৃহিত হয় নি। না সরকারের দিক থেকে। অথবা বিদেশী ক্রেতা বা দেশীয় মালিকশ্রেণীর পক্ষ থেকে। ফলে শ্রমিকরা তাদের জীবনজীবিকার সংগ্রামের অংশ হিসাবে প্রতিরোধী হবেন। এটাই বাস্তবতা। অর্থাৎ রাষ্ট্র যেখানে মৃত্যুর মিছিলকে পাকাপোক্ত করে, সেখানে প্রতিরোধও অবশ্যম্ভাবী। স্বাভাবিক। আর এই বাস্তবতাকে ঘিরে রয়েছে জিজ্ঞাসা। সমাজের সর্বস্তরে সেই জিজ্ঞাসা। গণহত্যা আয়োজনকারী উন্নয়নকে ঘিরে সেই জিজ্ঞাসা। যে উন্নয়ন সমাজে মিথ আকারে বিরাজ করছে এখনো।

তাজরিন

দুর্ঘটনাষড়যন্ত্র’ ‘গণহত্যা না শুধুই শ্রেণীগণহত্যা

garments_fire_bangladesh_tazrin_fashionsসমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দরবারে এভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তাজরিন প্রসঙ্গ নিয়ে আজ আলোচনা করা খুব জরুরী

২৪শে নভেম্বর, ২০১২ সালে আশুলিয়ার নিশ্চন্তপুরে তাজরিন ফ্যাশনস গার্মেন্টসে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সংবাদটা বেশ পুরানো। তবে সেখানে নিহত হয়েছিলেন শতাধিক শ্রমিক। তাজরিন ফ্যাশনের মূল প্রতিষ্ঠান তুবা গ্রুপ। তাদের তথ্য অনুসারে আরো ১৩টি শিল্প প্রতিষ্ঠান এই গ্রুপের রয়েছে। সেই বিবেচনায় তুবা গ্রুপকে একটা বড় মাপের গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি বলা যেতে পারে।

তাজরিনে আগুনে পুড়ে শতাধিক শ্রমিক মারা যাওয়ার পর বিজিএমইএ পক্ষ থেকে দাবি করা হয় প্রতিষ্ঠানটি ছিল ‘এ’ ক্যাটাগরি তালিকাভুক্ত। একই সাথে বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন দাবি করেতাজরিন ছিল কমপ্লায়েন্ট ফ্যাক্টরি। অর্থাৎ, মালিকদের ভাষায় ‘কমপ্লায়েন্সের’ অর্থ হলো ঐ কারখানায় শ্রমিকের জন্য শ্রমবান্ধব কর্মপরিবেশ বহাল ছিল। আর ‘এ’ ক্যাটাগরির অর্থ হলো ঐ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। আমরা এটাও জানি যে, অগ্নিকাণ্ডের সময় ঐ কারখানায় তৈরি হচ্ছিল ওয়ালমার্ট এবং ডিজনি মত বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলির পোশাক। এসব ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলি কোনো ফ্যাক্টরিতে কাজ করার পূর্বে তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের নিরিক্ষকদের দিয়ে কারখানাগুলির কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার দিকগুলো খতিয়ে দেখে। পরীক্ষা করিয়ে নেয়। একই সাথে ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলির চাহিদা মাফিক পোশাক তৈরি এবং সরবারহ করে থাকে তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের বায়াররা। অর্থাৎ, পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কোম্পানি, আন্তর্জাতিক নিরীক্ষক, আন্তর্জাতিক বায়ার এবং তাজরিনের মালিক ও বিজিএমিএর ভাষায় আলোচিত পোশাক কারখানাটি ছিল ক্যাটাগরি ও কমপ্লায়েন্সভুক্ত। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায় ঐ কারখানায় আগুন লাগা এবং ব্যাপক প্রাণহানীর ব্যাখ্যা কি?সেই ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ষড়যন্ত্র নামক এক তত্ত্বায়নকে হাজির করে। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি বকেয়া বেতনবোনাস এবং বেতনবৃদ্ধির দাবিসহ কারখানার কর্মপরিবেশ নিয়ে শ্রমিকরা যখনই আন্দোলন করেছেন তখন মালিকপক্ষ ষড়যন্ত্র নামক এক তত্ত্ব হাজির করতো। আর আগুন লাগার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনানামে এক মহানবাণী আমাদের শোনাত। সেই ‘ষড়যন্ত্রের’ তত্ত্ব ইলাস্টিসিটির মত টেনে লম্বা করে তাজরিনের আগুন লাগার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। একটা গণতান্ত্রিকসরকার ব্যবস্থার প্রধান। জনগণের ভোটে নির্বাচিত ‘সরকার’। মহান মুক্তিযুদ্ধনেতৃত্ব দানকারী সরকার। আর রানা প্লাজার ক্ষেত্রে মাঠে চালান করার চেষ্টা করা হয় পিলার নাড়ানোর তত্ত্বমুলতঃ ১৯৯০ সালের পর থেকে পোশাকশিল্পে ধারাবাহিক আগুন লাগা ও শ্রমিক খুনের রাজনীতিকে দুর্ঘটনাহিসাবে হাজির করা গেলেও তাজরিনের ক্ষেত্রে গেলানো যাচ্ছিল না আর। নতুন তত্ত্বায়নের প্রয়োজন ছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী পোশাকশিল্পের মালিকদের পক্ষ হয়ে সেই কাজটি করেন। আমাদের ধরে নেয়া ঠিক হবে না দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি। তিনি এবং তার সরকার অবশ্যই একটি ব্যবস্থাপনার প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রীর মতামত আমাদের রাষ্ট্র ও ব্যবস্থাপনারই প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে পোশাকশিল্পের মালিকের ভাষা ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষা যখন এক হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের শ্রেণী নিরেপেক্ষতা বরাবরের মত আবারো উন্মোচিত হয় পড়ে। রাষ্ট্রসরকারমালিকপক্ষ ও বিদেশী ব্যবসায়ীরা মিলেমিশে যে একই কাতারভুক্ত বা শ্রেণীভুক্ত তাজরিনের আগুনে কয়লা হওয়া শ্রমিকের লাশ আমাদেরকে সেটা পষ্টাপষ্টি দেখিয়ে দেয়। যার বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন শ্রেণীগতভাবে উৎপাদক শ্রমিকরা। যাদের প্রধানাংশই আবার নারী। এবং তারা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সেই নারী যারা সম্পুর্ণতই সহায়সম্বলহীন। সমাজের সবচেয়ে নিচু তলায় যাদের জন্ম। মানুষ হিসাবে যাদের নেই ন্যূনতম ক্ষমতাবোধ। ফলে শ্রমিক হিসাবে তারাই তো মর্যাদাহীন এবং বার্গেনিং ক্ষমতাহীন হবেন এটাই তো স্বাভাবিক। রাষ্ট্র এবং প্রচলিত ব্যবস্থা সমাজ জীবনে তাদেরকে পতিত করে রেখেছে আবহমান কাল ধরে। দুর্বল এই জনগোষ্ঠিকে হিসাবে নিয়েই পোশাকশিল্প গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে শ্রেণীগতভাবে তারাই বলি হয়েছেন তাজরিনে। অতীতে হয়েছেন ভবিষ্যতেও হবেন। কারণ, খুবই সুচিন্তিতভাবে কর্পোরেট দুনিয়ার স্বার্থে তাদেরকে বলির আয়োজন করা হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। দেশের পোশাকশিল্প নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই আমাদেরকে এ বিষয়ে স্পষ্ট থাকা দরকার। এবার আমরা আমাদের রাষ্ট্র এবং মালিক পক্ষের দাবির সাথে আগুন লাগার সময়ে তাজরিনের প্রকৃত অবস্থা মিলিয়ে নিতে পারি।

tazrin_workers_death_body-1তাজরিনের অগ্নিকাণ্ডের পরপরই ঐ ফ্যাক্টরি একাধিকবার পরিদর্শন করেন বাংলাদেশের স্থপতি ইনস্টিট্টিউটের সভাপতি মোবাশ্বের হোসেন। তিনি সংবাদপত্রে দাবি করেন, ঐ প্রতিষ্ঠানে নির্মাণবিধি একেবারেই মানা হয়নি। আমরা তাঁর মতামতকে ভিত্তি ধরে পরিস্থিতির যাচাইবাছাই করে নিতে পারি। প্রথমতঃ তাজরিনের প্রতিটি ফ্লোরে তিনটি করে সিড়ি ছিল। সব সিড়িই ভবনের ভিতরে নেমে নিচ তলায় এসে মিশেছে। এবং নিচ থেকে উপরে আট তলা পর্যন্ত উঠার এই সিড়িকে দেয়াল দিয়ে পৃথক করা হয় নি। দ্বিতীয়তঃ বিজিএমইএ তথ্যমতে, একটা ‘এ’ ক্যাটাগরির কারখানার নিচ তলায় থাকতে হবে গাড়ির গ্যারেজ। ২য় তলা থেকে শুরু হবে কারখানা। কিন্তু তাজরিনের ক্ষেত্রে খোদ বিজিএমিএ নীতিমালা ভঙ্গ করে নিচতলার পুরোটাই বানানো হয়েছে ওয়্যার হাউস। যেখানে মজুত ছিল পেট্রোলিয়াম বায়োপ্রোডাক্ট হিসেবে অ্যাক্রিলিক ইয়ান এবং ফ্লিজ ফেব্রিক। যা অতি দাহ্য পদার্থ। তুবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি দেলোয়ার হোসেন নিজে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়ে ছিল, তাজরিনের নিচ তলাকে অন্য কারখানার সুতা ও কাপড় বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হত। আগুন লাগে নিচ তলার এই ওয়্যার হাউসে। ওয়্যার হাউসের সাথেই ছিল জেনারেটর রুম। সেখান থেকেই আগুনের সুত্রপাত। অতি দাহ্য পদার্থে আগুন লাগার সাথে সাথেই প্রচণ্ড কালো ধুয়াতাপ ও শিখা একত্রিত হয়ে তিনটি সিড়ি বেয়ে আকাশমুখি হয়। ফলে ঐ পথ বেয়ে নিচে নামা বা ছাদ বেয়ে উপরে উঠা সম্ভব ছিল না কোনো শ্রমিকের পক্ষে। কারণ কল্পিত হাবিয়া দোযখের আগুন থেকেও ঐ মূহুর্তে তাজরিনের সিড়ি পথ ছিল কয়েক হাজারগুণ গনগনে। যার বড় প্রমান হলো শ্রমিকের কয়লা হওয়া লাশ। তৃতীয়তঃ পোশাকশিল্পে কমপক্ষে ৪২ ইঞ্চি যে বিকল্প সিড়ি বা ফায়ার এক্সিট নির্মাণ করা বাধ্যতামুলক। তার অস্তিত্ব তাজরিনে মেলেনি। চতুর্থতঃ রাজস্ব বিভাগের নির্দেশ মোতাবেক কারখানা ও ওয়্যার হাউস কোথায় কিভাবে নির্মাণ করতে হবে, সেই নীতিমালাও তাজরিনের ক্ষেত্রে অমান্য করা হয়েছে। পঞ্চমতঃ পোশাক কারখানার ফায়ার সার্ভিসের ম্যানুয়াল অনুযায়ী ওয়্যার হাউসের মধ্য দিয়ে কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ লাইন যেতে পারবে না। এমন কি এর পাশে কোনো ধরণের জেনারেটর থাকতে পারবে না। কারখানার প্রতিটি তলায় কার্বন ডাইঅক্সাইড সমৃদ্ধ অগ্নিনির্বাক যন্ত্র ও শুকনা রাসায়নিক গুড়া সংরক্ষিত থাকতে হবে। প্রতিটি ফ্লোরে কমপক্ষে দুটি পয়েন্টে অগ্নিনিরোধক পয়েন্ট থাকতে হবে। প্রতিটি পয়েন্টে ২০০০ লিটার ধারনক্ষমতা ড্রাম ও চারটি বালতি থাকতে হবে। ধোঁয়া নির্ণয়ক যন্ত্র ও হোস রিল থাকতে হবে। কারখানার অবস্থান হবে খোলা মেলা জায়গায়। এর কোনো কিছুই তারিনের ক্ষেত্রে মানা হয়নি। তারপরে তাজরিন ছিল বিজিএমইএ ও ওয়ালমার্টের মত ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলোর কাছে ‘এ’ ক্যাটাগরি ও কমপ্লায়েন্সভুক্ত কারাখানা। যেখানে হরদম ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলো কাজ করিয়ে আসছিল। ষষ্টতঃ বাংলাদেশের শ্রমআইন অনুযায়ী,কারখানায় কাজের সময় গেটে তালা মেরে রাখা সম্পূর্ণতই বেআইনি। কর্মরত অবস্থায় গেটে তালা মারার কারণে দুর্ঘটনাকালীন সময়ে যদি শ্রমিকরা বের হতে না পারেন এবং তাদের মৃত্যু ঘটে, তাহলে দেশের প্রচলিত আইনে সেটা হত্যাকাণ্ড। তাজরিনের ক্ষেত্রে ঘটেছে সেটাই। প্রতিটি সিড়ির মুখে কলাপসিবল গেটে তালা মেরে রাখা হয়েছিল। ঐ তালা কেটে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া লাশ বের করে আনেন ফায়ার ব্রিগেডের উদ্ধার কর্মীরা। আমরা ইতিপূর্বেও দেখেছি মালিকপক্ষ তাদের প্রোডাকশন ঠিক রাখার জন্য, অর্থাৎ প্রতি শ্রমঘন্টায় নির্দিষ্ট পরিমানে কাজ আদায় করতে প্রতিটি ফ্লোরে কলাপসিবল গেটে তালা মেরে বন্ধ করে রাখে। তাজরিনের ক্ষেত্রেও দেশের শ্রমআইন ভঙ্গ করে এই একই কাজ করা হয়েছে। এত অব্যবস্থাপনার পরেও ফায়ার ব্রিগেড থেকে এই কারখানার যেমন অনুমোদন মিলেছে তেমনি অনুমোদন মিলেছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। আমাদের জেনে রাখা দরকার বাংলাদেশে পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরুর সময় থেকে অর্থাৎ ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রতিটি নতুন কারখানার অনুমোদনের বিষয়টি ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্ত বিনিয়োগ বোর্ডের এখতিয়ারে। এই সবকিছু মিলিয়ে মালিকপক্ষ এবং সরকার যে দাবিই করুক না কেন, প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রচলিত শ্রমআইন ও শিল্পআইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আরো হাজারো কারখানার মত তাজরিনও গড়ে উঠেছে। যা এদেশের পোশাকশিল্পের মালিকদের ভাষায় ‘এ’ গ্রেড ও ‘কমপ্লায়েনস’ভুক্ত প্রতিষ্ঠান। আর এটায় যদি বাস্তবতা হয়, তাহলে বিবা সি গ্রেডভুক্ত কারখানাগুলির দশা আসলে কি, সেটা যে কোনো সচেতন মানুষ সহজেই অনুমান করে নিতে পারেন।

এবার আসা যেতে পারে মৃতের সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবনিকাশ নিয়ে। যা আমরা অতীত ধারাবাহিকতার প্রকাশ হিসাবে তাজরিনের ক্ষেত্রেও ঘটতে দেখছি। আমাদের প্রশ্ন হলো কতজনের মৃত্যু ঘটেছিল তাজরিনে?সরকার এবং মালিক পক্ষের দাবি ১১২জন। আসলে কি তাই?আমরা সরকার এবং মালিকপক্ষের দাবি যাচাইবাছাই করে নিতে পারি।

তাজরিনের অগ্নিকাণ্ডের পর যারাই ঐ কারাখানা পরিদর্শনে গিয়েছেন, তাদের কেউই মালিকপক্ষ এবং সরকারের ১১২ জনের সংখ্যাতত্ত্ব মানেননি। মানতে পারেননি। কারণ ঐ কাখানার ৬টি করে প্রোডাকশন লাইনে মোট ৬০ জন শ্রমিকের কাজ করার ব্যবস্থা ছিল। এই হিসাবে প্রতি ফ্লোরে ৩৬০ জন করে ৮তলা ভবনে কর্মরত ছিলেন ২,৮৮০ শ্রমিক। কলাপ্সিবল গেইটে তালা লাগানো থাকায় শ্রমিকরা বাঁচার আশায় জানালার কাচ ভেঙে, গ্রিল ভেঙে, এক্সস্ট ফ্যান ভেঙে লাফিয়ে হাতপাদাঁতমুখ ভেঙে খুইয়ে শেষ চেষ্টা করেছেন। তাঁদের এই যে বাঁচার চেষ্টা, সেক্ষেত্রে এই পদ্ধতি (লাফিয়ে) অবলম্বন করে কতজন মানুষের পক্ষে বাঁচা সম্ভব?হিসাবটা দোতলা থেকে আট তলা পর্যন্ত ধরা হলে?

কি অমানুষিক লাড়াই না করতে হয় জীবনযাপনের জন্য আমাদের দেশের পোশাকশিল্পের কর্মরত নারী শ্রমিকদের। জীবন্ত অবস্থায় বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম মজুরির লড়াই। শ্রমঘাম ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। কর্মপরিবেশ পাবার লড়াই। যৌন নিপীড়ন বিরোধী লড়াই। আর সে লড়াই তাঁদের লড়তে হয় মালিকের বিরুদ্ধে। মালিকের পোষা মাস্তানদের বিরুদ্ধে। পুলিশশিল্পপুলিশের বিরূদ্ধে। রাষ্ট্রের অভিজাত বাহিনী হিসাবে খ্যাত র‍্যাবের বিরুদ্ধে। আর যখন তারা মৃত্যু কূপে পতিত হন, তখন দোযখের চেয়ে হাজারগু নির্মম প্রকৃতির বিরুদ্ধে। উপরে উল্লেখিত প্রতিটি লড়াইয়ের নিদর্শন বাংলাদেশের পোশাক কারখানার ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে। তাজরিনে ক্ষেত্রেও সেটা ছিল। তারপরেও স্বয়ং রাষ্ট্র যখন মালিকদের হয়ে লাশগুমের রাজনীতি করে। সেই রাষ্ট্রের কবর খনন ছাড়া শ্রমজীবীদের অন্যকোনো পথ আসলেই খোলা থাকে না। এই যে লাশগুমের রাজনীতি সেটা যে তাজরিন থেকেই শুরু হয়েছে তা নয়। অতীত সরকারও সেটা করেছে। যেমন ২০০৫ সালে রানাপ্লাজার মত স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের ভবন ধ্বসে কমপক্ষে ২৫০০ শ্রমিক আটকা পড়েন। ঐ কারখানার মালিক ছিল বিএনপিজামাত জোট সরকারের যে কোনো একজন এমপির ঘনিষ্ট আত্মীয়। শুধুমাত্র এই আত্মীয়তার কারণে স্পেকট্রামের মালিককে বিচারের আওতায় আনা হয় না। দেশবাসী সেদিন প্রত্যক্ষ করেন ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়তা দেশের প্রচলিত আইনকানুনের কত ঊর্ধ্বে! বিএনপিজামাত জোট সরকার সেদিন অবৈধভাবে নির্মিত নয়তলা ভবন ধ্বসের ঘটনাটিকে শুধুমাত্র দুর্ঘটনাহিসাবে চালিয়ে দেয়। একই সঙ্গে ২৫০০ চাপা পড়া শ্রমিকের মধ্য থেকে মাত্র ৮০ জনের লাশ হাজির করে। ঐ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশের হাইকোর্ট, চার মাসের মধ্যে ঘটনার তদন্ত করে রির্পোট দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিল। বিএনপিজামাত জোট সরকার হাইকোর্টের নির্দেশেকে সরাসরি বৃদ্ধা আঙ্গুল প্রদর্শন করে। কোর্টও চুপসে যায়। ফলে তদন্ত নির্দেশটি আঁতুর ঘরে মারা পড়ে। একইভাবে ২০০৬ সালে চট্টগ্রামের কেটিএস কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসে তাজরিনের মত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। শতশত শ্রমিক আটকা পড়েন গেট বন্ধ থাকায়। লাশের হিসাব দেয়া হলো ৬২ জনের। একই ঘটনা ঘটেছে হামিমের ক্ষেত্রেও। এভাবে ১৯৯০ সালের পর থেকে যতগুলি পোশাক কারখায় আগুন লেগেছে, একমাত্র তাজরিন ছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাহিসাবে চালানো হয়েছে। আর প্রত্যকটি ক্ষেত্রে আগুন লেগেছে পোশাক মালিকদের অবৈধ্য ব্যবস্থাপনার কারণে। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে শ্রমিকের লাশগুমের রাজনীতি করেছে স্বয়ং রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের লাশগুমের রাজনীতিটা এতটায় শক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে গেছে, সেটা এতটাই নির্লজ্জভাবে চলছে যে, স্বজন হারানো মানুষের লাশ, তার প্রিয়জনদের পাওয়ার অধিকার আজ আর এই রাষ্ট্র স্বীকার করছে না। চালাচ্ছে পরিসংখ্যানগত কারচুপি। ফলে নিহতরা নিখোজের তালিকাতে ঠাঁই না পাওয়াই প্রতিটি ঘটনার পর স্বজনেরা খুজে ফেরেন তাদের প্রিয়জনকে। তাজরিনের ক্ষেত্রে আমরা সেই একই চিত্র দেখতে পাই। ‘পরিচয়বিহীন’ বেওয়ারিশ লাশের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে আজো ছুটচ্ছেন মানুষ।

এবার আসা যেতে পারে ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব সম্পর্কে। ২৪শে নভেম্বর তাজরিনে আগুন লাগে। রাষ্ট্রীয়ভাবে একদিনের শোকদিবস ঘোষনা করা হয়। সোমবার জাতীয় সংসদে নিহত শ্রমিকদের জন্য গৃহীত শোক প্রস্তাবের উপরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘ষড়যন্ত্র’এর কথা বলেন। তিনি এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন, যার অর্থ দাঁড়ায় পোশাকশিল্পে বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ করার জন্য একটা মহল ষড়যন্ত্র করছে।

মুলত ঘটনা ছিল এরকম, ২৬শে নভেম্বর আশুলিয়ার ‘ডেভেনিয়ার’ গার্মেন্টসে আগুল লাগার একটা সংবাদ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হলো ঐ আগুন লাগিয়েছে একজন নারী শ্রমিক। যার নাম সুমি। সে মাত্র ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে এই আগুন লাগানোর কাজটি করে। সেটা দেখে ফেলে আর একজন শ্রমিক। আগুন নেভানও শ্রমিক। এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী দাবি করলেন তিনি স্বচোখে সিসিটিভি ক্যামেরায় তা দেখে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী এই কথা বলার মধ্য দিয়ে দেশবাসিকে যা বোঝাতে চাইলেন সেটা হলো শ্রমিকরা বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে নিজেরাই নিজেদেরকে হত্যা করছে। আগুনে পুড়িয়ে নিজেরই স্বশ্রেণীর মানুষকে কয়লা বানাচ্ছে। তার বিপরীতে মালিকপক্ষ দেশের বেকার জনসমষ্টির জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। নারীর ক্ষমতায়ানের অবদান রাখছে। দেশের জন্য বৈদেশিক মূদ্রা আনছে। বিদেশী মূদ্রার রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। জিডিপি উন্নয়নে ভূমিকা রাখচ্ছে। ঐদিন প্রধানমন্ত্রী সংসদে যা খোলাখুলি বলেননি, সেই কথাটাই বললেন দেশের অর্থমন্ত্রী। দেশের পঞ্চম টেক্সবাংলা২০১২এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে শিল্পখাতের প্রসার হলেই ঐসব শিল্পকারখানাকে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ধরণের দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। এধরণের ঘটনা আগেও ঘটতে দেখেছি। এসব ঘটনা শিল্পকারখানাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র। সাভারের আশুলিয়ায় তাজরিন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। ঐ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত এই বক্তব্য রাখেন। এবং সেটা দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে। ঐ অনুষ্টানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের অর্থমন্ত্রী এহেন বক্তব্য রাখার মধ্য দিয়ে সরাসরি লুটেরাখুনি মালিকদের পক্ষে অবস্থান নেন। প্রধানমন্ত্রী ও দেশের অর্থমন্ত্রী এই বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্র কর্তৃক তাজরিন ঘটনার পুনাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন ও তার প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পূর্বেই। আমাদের প্রশ্ন হলো এদেশের বিচার ব্যবস্থা কিকোনো ঘটনা তদন্ত হওয়ার পূর্বেই রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগকে চুড়ান্ত মন্তব্য করার অধিকার দিয়েছে?যদি না দিয়ে থাকে তাহলে এই ক্ষমতাচর্চার যোগসুত্রগুলি আমাদের বুঝে নেয়া জরুরী। কারণ আমরা পূর্বেই বলেছি যে, ২০১২ সালের মধ্যবর্তী সময়কাল পর্যন্ত দেশের পোশাকশিল্পের অনুমতি পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণতই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর নির্ভর। এবং আমরা এটাও জানি দেশের সর্বোচ্চ আদালত আদেশ দেয়ার পরেও বিজিএমিএর অবৈধ ভবন স্বগর্বে আজো দাঁড়িয়ে আছে। এটা শুধুমাত্র শ্রেণীগত মিত্রতার বিষয় নয়। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মালিকশ্রেণীর অবৈধ ক্ষমতাচর্চার বিষয় এখানে যুক্ত। যা থেকে উভয়ই বৈষয়িকভাবে লাভবান হয়ে থাকে। অবৈধ সম্পদ ও বিত্তে ফুলেফেঁপেউঠে উভয়ই। যে চর্চা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে কেন্দ্র করে। কর্মমূখর মানুষগুলকে কয়লা বানিয়ে। এই অন্যতম কারণে পোশাকশিল্পে লাগাতার হত্যাকাণ্ডের পরেও আজ পর্যন্ত কোনো ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জণসম্মুখে প্রকাশ করা হয় নি। অতীতের মত এবারো তাজরিনের মালিক দেলোয়ার হোসেন ও চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তারকে আইনের আওতায় আনা হয় নি। বিজিএমিএ তাদের সদস্যপদ বাতিল অথবা স্থগিত করেনি। তারা স্বদর্পে বিজিএমিএর নির্বাচনে ঘুরে বেড়িয়েছে। তারপরেও আমরা ষড়যন্ত্র নামক তত্ত্বকে একেবারেই উড়িয়ে দিতে পারি না। এবার সেদিকেই নজর দেয়া যাক।

তবে হ্যাঁ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমাদেরও প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৯০ সালের ২৭শে দিসেম্বর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্তরে অবস্থিত সারাকা গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ডে আমারা মালিকসহ ২৭ জনকে মৃত্যুবরণ করতে দেখি। তারপর থেকে এপর্যন্ত আর কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কর্মকর্তাসহ কোনো মালিকের মৃত্যু হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের সময় কোনো মালিক কারখানায় উপস্থিত ছিল সে সংবাদও আমরা পাইনি। এটা কি অলৌকিক কোনো বিষয় অথবা সৃষ্টিকর্তার বিশেষ রহমত? যা শুধুমাত্র তাদের উপরেই বর্ষ হয়ে চলেছে?নাকি অন্য কিছু?

গার্মেন্টস সম্পর্কে যারা খোঁজ খবর রাখেন তারা ভালভাবেই জানেন এই কারখানা আগুনে পুড়লে বা তার সাথে শত শত শ্রমিক পুড়ে কয়লা হয়ে গেলেও মালিকের কোনো ক্ষতি নেই। তার কারণ হলো, কারখানা আগুনে পুড়ে গেলে ব্যাংকের টাকা মাফ পাওয়া যায়। সেটা না হলেও সুদের ঋন মাফ হয়ে যায়। তাছাড়া একটা কারখানায় লগ্নি করা পুঁজি উঠে আসতে সর্বোচ্চ সাত বছর সময় লাগে। এর বাইরে ইন্সিওন্সের কারবার তো রয়েছেই। রাষ্ট্রের দিক থেকে প্রয়োজন ছিল এই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা। রাষ্ট্র তা করেনি। অতীতে আমরা পাট শিল্পের ক্ষেত্রে পাটের গোডাউনে আগুন লাগিয়ে অনেককে ফুলে ফেঁপে উঠতে দেখেছি। তাজরিনের ক্ষেত্রেও আমরা একই বিষয় লক্ষ্য করি। এই কারখায় আগুন লেগেছিল ২৪ তারিখে। মালিক পত্রিকার কাছে আহাজারি করেছে চীন থেকে ৫০০ টন সুতাকাটিং ও সেলাই মেশিন পুড়ে যাওয়ার জন্য। তার মুখ থেকে তারই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকের জন্য একটি কথাও উচ্চারিত হয়নি। ২৭শে নভেম্বর আমরা এও লক্ষ্য করলাম তাজরিনের মালিক কর্ণফুলি ইন্সিওরেন্স কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণের চেক গ্রহণ করছে। আমাদের প্রশ্ন হলো, ক্ষয়ক্ষতির হিসাবকিতাব কি আগেই করা ছিল?বাতাসে শ্রমিকের লাশের গন্ধ ও তাদের স্বজনদের মাতম থামার আগে, মানুষের মন থেকে দগদগে ঘা শুকানোর আগে ক্ষতিপূরণের চেক মেলে কিভাবে?যদি ক্ষতির অংক আগেই কষা না থাকে?ঘটনার রাষ্ট্রীয় তদন্ত হওয়ার আগে মালিকপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ফয়সালা হয় কিভাবে?এটা কি নিছক ষড়যন্ত্রনা অন্য কিছু?ফলে আমাদের প্রশ্ন হলো, যে ব্যবস্থাপনার কারণে কারাখানায় আগুন লাগলে মালিক বেঁচে থাকে, আগুন লাগা নামক প্রকল্পের ভিত্তি আরো মোটাতাজা হয়, বিপরীতে শুধুমাত্র শ্রমিকরা আগুনে পুড়ে কয়লা হন?সেটা কি শুধুই গণহত্যা?নাকিশ্রেণীগণহত্যা?এই মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে খোদ শ্রেণীর রাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

garments_fire_bangladesh-3তাজরিনের আলোচিত শ্রেণীগণহত্যা অনুষ্টিত হওয়ার পর পর ৫ই ডিসেম্বর, ২০১২ সালে রাজউকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকা ১৯৯৭ সালের ৪ আগষ্ট থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের (ডিএমডিপি) আওতাভুক্ত। ফলে ঐ অঞ্চলে যে কোনো ধরণের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন ও ছাড়পত্র গ্রহণ করা বাধ্যতামুলক। সেদিক থেকে তুবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশনস ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউক থেকে কোনো ধরণের অনুমোদ বা ছাড়পত্র নেয়া হয়নি। রাজউক আরো দাবি করে,শুধু তাজরিনই নয় আশুলিয়াসহ আলোচিত এলাকায় প্রায় সব ভবনই রাজউকের অনুমোদনহীন। অর্থাৎ, প্রকৃত বিচারে এই দায় কি রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্ণধাররা এড়াতে পারেন?প্রশ্নটা আসছে এ কারণেই যে, আমরা পূর্বেই বলেছি পোশাকশিল্পের চুড়ান্ত অনুমোদন ছিল সম্পূর্ণতই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর নির্ভর। দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দপ্তরের (প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর) হালহকিকত যদি এটাই হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের অপরাপর প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আমরা সহজেই অনুমান করে নিতে পারি। এবং তাজরিনের অগ্নিকাণ্ডের পর পর আরো যেসব তথ্য আমাদের সামনে আসে তা হলো ১৯৯০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়াতে জনরোষ এড়াতে ১৯৯৭ সালে বিজিএমইএ একটি স্থায়ী ফায়ার সেফটি সেল গঠন করার কথা দেশবাসীকে জানিয়েছিল। যেখানে এই সেলের দায়িত্ব থাকবে পোশাক কারখানাগুলিতে শ্রমিকদের অগ্নিপ্রতিরোধ, অগ্নিনির্বাপন, প্রাথমিক চিকিৎসাসহ জরুরী উদ্ধার অভিযানে প্রশিক্ষন দেয়া। কিন্তু তারা যে ঘোষণাই দিক না কেন সেটা তারা কার্যকর করেনি। তাজরিনের ঘটনার পর পর বিদেশী পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়ারস ফোরামের পক্ষ থেকে জেসিপেনির কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধান জেনিফা কে. জব্বার জানান যে, বিশ্বের নামী দামী ব্র্যান্ডের জন্য যে সব বিদেশী ক্রেতা তৈরি পোশাক কেনেন তাদের জন্য বাংলাদেশ খুবই লোভনীয় জায়গা। কিন্তু ক্রেতাদের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হলো অগ্নিকাণ্ড। তিনিও ভবন নির্মাণের অনুমোদন এবং ফায়ার লাইসেন্স দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে, বিদেশী ক্রেতারা এক্ষেত্রে দায় কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না। তারাও ঘটনাসমূহের জন্য সমানভাবে দায়ী। যেমন, ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় পোশাকশিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে একটা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রিটেইলার, বাংলাদেশের কারখানা মালিকদের প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধিসহ ওয়াশিংটন ভিত্তিক কারখানা পর্যবেক্ষক গ্রুপ ওয়ার্কার রাইটস কনসটিয়ামেরনির্বাহী পরিচালক স্কট নোভাও উপস্থিত ছিলেন। আরো ছিলেন আর্মস্টারডাম ভিত্তিক ক্লথস ক্যাম্পেইনেরআন্তর্জাতিক সমন্বয়কারী ইনেকে জেলডেন রাস্ট। সভার প্রস্তাবনা ছিল বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলিতে বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনিরাপত্তার জন্য গ্লোবাল রিটেইলাররা কিছু বাড়তি অর্থ প্রদান করতে পারে কি না?এবং আমরা এটাও জানি যে, ঐ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বিরোধীতাকারী শক্তি ছিল ওয়ালমার্ট। বৈঠকে ওয়ালমার্টের এথিকাল সোর্সিং ডিরেক্টর শ্রীদেবী কালাভাকোলানু প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করেন। তার বক্তব্য ছিল বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ব্যবস্থার উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়াটা হবে বিশাল ব্যয়বহুল। এ ধরণের বিনিয়োগ করা ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলোর জন্য আর্থিকভাবে বাস্তব সম্মত হবে না। অপরদিকে, স্কট নোভার মতামত ছিল ওয়ালমার্টসহ অন্যান্য রিটেইলাররা বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করতে যে পরিমানে ব্যয় করে, তার তুলনায় কারখানাগুলির অগ্নিনিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য খরচ হবে খুবই যত সামান্য। তারপরেও ঐ বৈঠক বিফল হয় গ্লোবাল রিটেইলাদের কারণে। কারণ তারা এ প্রশ্নে বাড়তি একটা পয়সা খরচ করতে প্রস্তুত ছিল না।

তাজরিনের শ্রেণীগণহত্যার পর পর আমরা ৭ই ডিসেম্বর সংবাদ মাধ্যমে জানছি স্থানীয় ও রপ্তানি বাজারে পোশাকের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের সাথে কাজ শুরু করেছে চীন। এই লক্ষ্যে গত ৬ই ডিসেম্বর বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে চীনের সাথে তাদের একটা সমঝোতাচুক্তি স্বাক্ষর হয়। সেখানে বিজিএমইএ পক্ষ থেকে সফিউল ইসলাম এবং চীনের সিএনটি এসির পক্ষ থেকে লিন ইয়নফেং স্বাক্ষর করে। আমরা এটা জানি যে, চীন ২০১১ সাল থেকে তাদের স্থায়ীয় বাজারের জন্য বছরে ৩৫০ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করে থাকে। ঐ চুক্তি স্বাক্ষরের পর চীন বিদেশী বাজারের জন্য বাংলাদেশ থেকে পোশাক উৎপাদন করতে আগ্রহী বলে জানায়। মূলত বর্তমান বিশ্বে তৈরি পোশাকের বাজারের আয়তন হলো ৪০০ বিলিয়ন ডলার। যার ৩৭ শতাংশ এখনো চীনের দখলে। আর বাংলাদেশের দখলে প্রায় ৫ শতাংশ। চীন তাদের পোশাক বাণিজ্যের একটা অংশ বাংলাদেশে পাঠাতে আগ্রহী। তারা বাংলাদেশের অবকাঠামো বিশেষত গ্যাসবিদ্যুত ও আইনগত বিষয়ে খোঁজখবর করছে। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা দরকার যে বর্তমানের চীন, সে নিজেই তার দেশের কর্মরত শ্রমিকদের উপরে ভয়াবহ নিপীড়নসহ অতিমাত্রায় পরিবেশ দূষ করে চলেছে। তাদের দেশে যে গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠছে, তার সাথে পরিবেশের মূল্য বিচার করে তারা তাদের পোশাকশিল্পের শাখা বাংলাদেশে ট্রন্সফার করে চাইছে। এ ফলাফল হবে আরো ভয়াবহ। অর্থাৎ, তাজরিনের শ্রেণীগণহত্যা সংগঠিত হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্বের ক্রেতা সাধারণের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক নিয়ে যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, সেটা সামাল দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং মালিকশ্রেণী যে বিকল্প বাজারের সন্ধান করছে, সেখানে চীন হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। যার অর্থ হলো রাষ্ট্র এবং মালিকশ্রেণীর পক্ষ থেকে পোশাক শিল্প ঘিরে যে খুনের আয়োজন, সে জায়গা থেকে তারা সরতে নারাজ। এই খাতের উন্নয়নে তারা মোটেই আগ্রহী নন। আগ্রহী হলে চীনের মত একটি উগ্র পরিবেশ ধ্বংসী এবং শ্রমিক নিপীড় রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করার প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু সেটাই ঘটেছে এক্ষেত্রে।

রানাপ্লাজা

rana_plaza-4তাজরিনে শ্রেণীগণহত্যা সংগঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রমালিকপক্ষবায়ার এবং ব্র্যান্ড কোম্পানির দিক থেকে যে ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেটা হলো তারা সবাই সতর্ক হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরণের দুর্ঘটনা রোধে সবাই তৎপর। ফলে অনেকেই বেশ কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলেন। কিন্তু গত ২৪শে এপ্রিল, ২০১৩ সালে রানাপ্লাজা ধ্বসে পড়ে। একই সাথে ধ্বসে যায় সকলের দেয়া সমস্ত ধরণের প্রস্তুতি। আমরা সবাই জানি যে, ২৩শে এপ্রিল ঐ ভবনে ফাটল দেখা গিয়েছিল। তারপরেও পোশাকশিল্পের মালিকরা শ্রমিকদের ঐ মৃত্যুকুপে কাজে যোগাদানে বাধ্য করে। যার পরিণতিতে পোশাকশিল্পের ইতিহাসে ভয়াবহ শ্রেণীগণহত্যা সংঘটিত হয়। এই ঘটনায় ১১২৭ জন শ্রমিক, শ্রেণী গণহত্যার শিকার হন। চিরকালের মতো পঙ্গু হয়েছেন হাজারের উর্দ্ধে। এখনোনিখোঁজ মানুষের সংখ্যা কয়েক শত। একই সাথে ঐ ভবন ধ্বসের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে আরো বেশ কিছু দিক উন্মোচিত হয়। যা এদেশের রাষ্ট্রকাঠামো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে সামনে চলে আসে।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মালিকদের সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তারা অনিয়মিত বেতন প্রদান করে শ্রমিকদের কাজে যোগদানে বাধ্য করে। যাকে বলা হয় আইন বহির্ভূত চাপ বা মানসিক চাপ প্রয়োগ। যাকে শিল্পক্ষেত্রে (ফোর্স লেবার)একটা বিশেষ ধরণ হিসাবে গণ্য করা হয়। রানাপ্লাজায় অবস্থিত ৫টি গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে ঘটেছিল সেটাই। মাসের শেষ। ফলে মালিকের নির্দেশ অমান্য করার উপায় ছিল না শ্রমিকদের। কাজে যোগদান করতে অস্বীকার করলে সারা মাসের মজুরী থেকে বঞ্চিত হতেন শ্রমিকরা। ফলে অনোন্যপায় হয়েই তারা ঐ মৃত্যু কূপে ঢোকেন। ২৩ তারিখে ঐ ভবনের ফাটল দেখা দিলে ভবনে অবস্থিত ব্র্যাক ব্যাংকসহ সমস্ত দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কারখানাগুলি বন্ধ করা হয়নি। এমন কি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ বা শিল্পপুলিশ কাউকে ঐ ভবন বন্ধ করে শ্রমিকদের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার ন্যূনতম উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এমন কি সরকারি পর্যায়ে পোশাকশিল্প দেখভাল করার যে ১৮ জনের একটি কেন্দ্রীয় টিম রয়েছে। যাদের দায়িত্ব হলো পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলো সরাসরি খতিয়ে দেখা। ২৩ তারিখে টেলিভিশনে সংবাদ প্রচার হওয়ার পরেও এই টিমের কোনো ধরণের তৎপরতা দেশবাসী কারোরই নজর পড়েনি। এমন কি বিজিএমইএরও কোনো ধরণের তৎপরতা দেখা যায়নি।

মালিকদের সম্পর্কে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো তারা কর্মরত নারী শ্রমিকদের মাতৃকালীন ছুটি দেয় না। তারও বড় প্রমান হল ঐ ধ্বংস্তুপের মধ্যে দুইজন নারীর সন্তান প্রসব। অর্থাৎ, শিল্পের এই শাখায় নারী শ্রমিকরা মাতৃকালীন ছুটি ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য হন। যার অর্থ হলো নো ওর্য়াক, নো পেএরভিত্তিতে শিল্পের এই শাখা সংগঠিত করা হয়েছে। এটা সবার সামনে আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে পড়েছে।

মালিকশ্রেণী সম্পর্কে আরও একটি বড় অভিযোগ হলো তারা শ্রমিকদের কোনো নিয়োগপত্র দেয় না। ফলে চাকরির ক্ষেত্রে শিল্পের এই শাখায় শ্রমিকদের কোনো স্থায়ীকরণের ব্যবস্থা নেই। এই অন্যতম কারণে মালিকরা ইচ্ছামত শ্রমিক ছাটাই ও নিয়োগ করতে পারে। শ্রমিকের এই অনিশ্চিত জীবনযাপনের কারণে মালিকপক্ষ তাদেরকে মানসিকভাবে জিম্মি করে যেমন অস্বাভাবিক নিন্মহারে মজুরি প্রদান করে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ এড়াতে লাশগুমের রাজনীতিও করতে পারে। আমরা এর বড় প্রমা রানাপ্লাজায় অবস্থিত ৫টি গার্মেন্টসের ক্ষেত্রেও পায়। কতজন শ্রমিক রানাপ্লাজায় আটকা পড়েছিলেন তার হিসাব স্বয়ং রাষ্ট্র জানে না। মালিকপক্ষের সংগঠন বিজিএমইএ জানে না। কারণ, কারো কাছেই প্রকৃত কোনো তথ্য ছিল না। অথবা খুনি মালিক ও তাদের সংগঠন বিজিএমইএ পক্ষ থেকে প্রকৃত তথ্য প্রদান করার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে আসে না।

পাশাপাশি কর্মরত শ্রমিকদের সম্পর্কে তথ্য না থাকার কারণ হলো এদেশে পোশাকশিল্পকে সংগঠিত করাই হয়েছে অস্থায়ী শ্রম ব্যবস্থাপনাকে ভিত্তি করে। কাঠামোগতভাবে স্থায়ী শ্রমের ভিত্তিতে শিল্পের এই শাখা সংগঠিত হলে শ্রমিকদের যেমন স্থায়ী নিয়োগ পত্র দেয়া হতো,তেমনি প্রতিটি কারখানার কর্মরত শ্রমিকদের জীবনবৃত্তান্তের ডাটাবেইজ সংরক্ষকরা থাকতো। অস্থায়ী শ্রমের ভিত্তিতে পোশাকশিল্প সংগঠিত হওয়ার কারণে মালিকপক্ষ যেমন দেশবাসীর সামনে কর্মরত শ্রমিকদের প্রকৃত পরিসংখ্যান হাজির করতে পারেনি, তেমনি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সামনে কোনো ধরণের গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য দিতে পারেনি। ফলে রানাপ্লাজার প্রথম দিনে যেমন কোনো কোনো পত্রিকার সংবাদ ছিল, ওখানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার। দুইদিন পরে সংখ্যাটি নেমে আসে ৬ হাজারে। তারপরে ৪ হাজারে। আর রাষ্ট্র বরাবরের মতই মালিকশ্রেণীর পক্ষ হয়ে লাশগুমের সমস্ত তৎপরতা চালিয়ে গেছে। যেমন ২৭শে এপ্রিল সন্ধ্যার পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রানাপ্লাজার পুরোএলাকার উপরে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। উদ্ধার অভিযানের সমস্ত তৎপরতা সেনাবাহিনীর আওতায় নিয়ে আসা হয়। এবং আমরা প্রত্যক্ষ করি, উদ্ধার অভিযানের সময় প্রথম পর্যায়ে পুলিশের তালিকায় যেখানে নিখোজ শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১৩০০ জন। সেখানে সেনাবাহিনীর তালিকায় ঠাই মিলেছিল ১৪৯ জনের। পরে জনগণের চাপে সেনাবাহিনী লাশ কারচুপির রাজনীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না, স্পেকট্রামের নয়তলা ভবন ধ্বসে যে শত শত শ্রমিক সেদিন নিহত হয়েছিলেন। ঐ উদ্ধার তৎপরতার নেতৃত্ব দিয়েছিল দেশের সেনাবাহিনী। এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসাবে সেদিন সেনাবাহিনী স্পেকট্রামের লাশগুমের রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল বলে অনেকের অভিযোগ। তারা পূর্বের মতই একই প্রক্রিয়াতে রানাপ্লাজার সমাধান চেয়েছিল। কিন্তু জনগণের প্রতিরোধের কারণে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। একই সাথে আমাদের একথাও মনে রাখা দরকার যে, বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং তুরস্কের সেনাবাহিনী কর্পোরেট সেনাবাহিনী হিসাবে খ্যাত। যেমন তাদের কাঠামোগত বাণিজ্যের দিক থেকে তেমনি বহুজাতিক সংস্থার স্বার্থ সংরক্ষণের দিক থেকে এই তিনটি দেশের সেনাবাহিনী সর্বদাই ক্রিয়াশীল। রানাপ্লাজার পরে পোশাক কারখানায় নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে পরিস্থিতির যে উন্নতি হয়েছে একথা বলা যাবে না। কারণ মালিক পক্ষের দুই সংগঠন শ্রমিকদের ডাটাবেইজ তৈরি করার ঘোষণা দিয়ে সময় বেঁধে দিলেও, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের সদস্যভূক্ত কারখানা মালিকদের ২০ শতাংশও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসেনি।

২০০৫ সালে বিএনপিজামাত জোট সরকারের শাসনামলে স্পেকট্রাম ও তেজগাঁয়ের ফিনিক্স টেক্সটাইল মিলের ভবন ধ্বসে শত শত শ্রমিকের মৃত্যুর পর মালিকপক্ষ এবং রাষ্ট্রের দিক থেকে জানানো হয়েছিল তারা এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। রানাপ্লাজার পরে দেখা গেল যে পরিস্থিতি একচুল নড়নচড়ন হয়নি। বরং দেশের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার নাগরিকদের উদ্দ্যেশে বললেন, শুধু পোশাকশিল্পই নয়, ঢাকা শহরে যত বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে তার ৯০ শতাংশের বিল্ডিং কো মানা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর পর আমরা জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাকালে দেশের অর্থমন্ত্রীর কাছে পোশাকশিল্পের মালিকদের ১০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দসহ সরকারি খাস জমি দাবি করতে দেখি। এবং মালিকপক্ষের ভাষ্য মতে, দেশের এক হাজারের ঊর্ধ্বে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা রয়েছে। যার কারণেই সরকারি খাস জমি এবং স্বল্প সুদে ১০ হাজার কোটি টাকা এই খাতে প্রয়োজন। রানাপ্লাজার পর পর বিজেএমইএ এবং বিকেএমইয়ের পক্ষ থেকে তাদের সদস্যভুক্ত প্রতিটি কারখানার কাঠামো সংক্রান্ত নকশা জমা দেয়ার শেষ দিন ২৩শে মে পার হয়ে গেলেও অদ্যাবধি ৩৭ শতাংশের ঊর্ধ্বে নকশা জমা পড়েনি। অর্থাৎ, গত তিন দশক ধরে পোশাকশিল্পের মালিকরা সরকারকে উৎসে মাত্র ০.৮০% কর দিয়ে থাকে। বিপরীতে এ শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাচামাল আমদানির জন্য সম্পূর্ণ শুল্ক ছাড় পেয়ে থাকে। প্রতি ডলারের বিনিময়ে ৫ থেকে ২৫ ডলার করে জনগণের টাকা প্রণোদনা হিসাবে ছাড় পেয়ে থাকে। এর বাইরে ব্যাংকের ও ইনসিওরেন্সের শত শত কোটি টাকা লোপাট করার পর শিল্পের এই শাখা সম্পর্কে যে সব তথ্য এখন পাওয়া যাচ্ছে, তা রীতিমত ভয়াবহ এবং আতঙ্কজনক। অর্থাৎ, একটি দুটি নয় পোশাকশিল্পের নামে কয়েক হাজার মৃত্যু ফাঁদ তৈরি করেছে তারা। এটা আর কিছুই নয়, সবচেয়ে কম খরচে লুন্ঠনমূলক পদ্ধতিতে দ্রুত এবং সর্বোচ্চ মুনাফা কামাইয়ের একটা ব্যবস্থা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায়। অর্থাৎ, রানাপ্লাজার ক্ষেত্রে আমরা যা দেখেছি নিন্মমানের উপাদান সমগ্রী ব্যবহারের সাথে নকশাবিহীন ভবনের কারণে যে শ্রেণীগণহত্যা সংগঠিত হয়েছে। সেখানে রানাপ্লাজা শেষ কথা নয়, এই আয়োজন গোটা পোশাকশিল্প ঘিরে গড়ে উঠেছে। এবং রাষ্ট্র সেখানে শ্রমিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং নিন্মতম মজুরি নিশ্চিত না করে এই লুন্ঠন প্রক্রিয়াকে আরো শক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড় করিয়েছে। এর সাথে আমরা যদি দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিল্ডিং কোডেরঘোষণাকে হিসাবে নি, তাহলে আমরা এদেশের উন্নয়ন তরিকার একটা দিশা পেতে পারি। অর্থাৎ, রানাপ্লাজার পর পর দেশের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে ঢাকা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে যদি ৬ মাত্রার (রিখটার স্কেল)একটা ভূমিকম্প হয়। তাহলে তাৎক্ষনিকভাবে ৭০ হাজার বাড়ি ধ্বসে পড়বে এবং আরো একলক্ষ বাড়ি বসবাসের অনুপোযোগীয় হয়ে যাবে। অর্থাৎ, এক রানাপ্লাজার ঘটনা দেশের সমস্ত রিসোর্সকে একত্রিত করে একটা বিল্ডিংয়ে চাপা পড়া মানুষদেরকে আমরা ১৫ দিনেও উদ্ধার করতে পারিনি। আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছে চাপা পড়া মানুষদেরকে তিল তিল করে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত। সেখানে গত ৪ বছরে আমাদের শাসকরা ‘উন্নয়ন’এর নামে এদেশকে কোথায় দাড় করিয়েছে, সেটা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় অত্যন্ত স্পষ্ট।

ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গ

rana_plaza_unidentified_people-4১৯৯০ সালের পর থেকে যে ধারাবাহিক শ্রেণীগণহত্যা পোশাকশিল্পে সংগঠিত হচ্ছে সেখানে ক্ষতিপূরনের বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্নাকারে আসে। এক্ষেত্রে আমরা তাজরিনকে নজির হিসাবে সামনে আনতে পারি। আমরা আগেই দেখেছি ঐ কারখানায় নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১১২ জন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ত্রাণতহবিল থেকে প্রত্যেক নিহত পরিবারকে ২ লাখ টাকা করে দিয়েছেন। শ্রমমন্ত্রনালয়ের তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে পরিবার প্রতি ১ লাখ করে টাকা। দেশে ব্যাংকগুলি মিলিতভাবে দিয়েছে ১লাখ করে টাকা। লি অ্যান্ড ফোং নামের হংকং ভিত্তিক একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে পরিবার প্রতি ১ লাখ করে টাকা। আরো কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মিলিতভাবে দিয়েছে পরিবার প্রতি ১ লাখ করে টাকা। আর পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন পরিবার প্রতি দিয়েছে ১ লাখ করে টাকা। এখন আমরা যদি উপরের তালিকার দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে দেখব যে, এর মধ্যে ক্ষতিপূরণের টাকা নেই বললেই চলে। এই টাকার প্রধানাংশ খয়রাতি সাহায্য বা ভিক্ষা। ফলে প্রশ্ন দাড়ায় তাজরিনের মালিক প্রকৃত অর্থে ক্ষতিপূরণের জন্য কত টাকা ব্যয় করেছে?এর উত্তর হচ্ছে ক্ষতিপূরণ বাবদ আদতেই তার কোনো টাকা ব্যয় হয়নি। কারণ বিজিএমইএ ঘোষণা দিয়েছিল তারা পরিবার প্রতি ১ লাখ করে ক্ষতিপূর দিবে। যার অর্থ হলো বিজিএমইএ সংগঠনভুক্ত গার্মেন্টসের সংখ্যা ৫৫০০। তার মধ্যে তাদের হিসাবে চালু কারখানার সংখ্যা ৩৫০০টি। তাজরিনে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১১২ জন। ফলে ১১২ জনকে ১ লাখ করে ক্ষতিপূর দিলে টাকার অংক দাঁড়ায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকা। ৩৫০০টি কারখানার মালিকের মধ্যে ঐ টাকা বন্টন হলে প্রতি কারখানা মালিকের ভাগে পড়ে ৩২০০ টাকা। অর্থাৎ, তাজরিনের মালিককে বড় জোর এই ৩২০০ টাকা গুনতে হয়েছে। আর ১১২ জন শ্রমিকের উপরে এই ৩২০০ টাকা বণ্ঠন হলে মাথা পিছু খরচ হয় ২৮ টাকা ৫৮ পয়সা। অর্থাৎ, এদেশের পোশাকশিল্প যে শুধুমাত্র সস্তা শ্রমকে ভিত্তি করে সংগঠিত হয়েছে তা নয়। মূল বিষয়টি হলো এই খাতে সস্তা শ্রমের চেয়ে জীবনের মূল্য আরো সস্তা। জীবনের মূল্য কোনোভাবেই মাথাপিছু ঐ ২৮ টাকা ৫৮ পয়সার ঊর্ধ্বে নয়। এক্ষেত্রে আমদের মনে রাখা দরকার ২০০৬ সালে বিএনপিজামাত জোট সরকার যে শ্রম আইন করেছে এটাই তার ফলাফল। ঐ আইনে ক্ষতিপূরন ধরা হয়েছিল মাথা পিছু ১ লাখ টাকা। অথচ আমরা যদি বৃটিশ ঔপনিবেশিক আইনের প্রতি দৃষ্টি দেই তাহলে দেখব, ১৮৫৫ সালের দুর্ঘটনার আইন অনুযায়ী তাজরিনের ক্ষেত্রে শ্রমিক পরিবারগুলি ক্ষতিপূরণ পেতেন পরিবার প্রতি ৪৮ লাখ টাকা। অথবা ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানী স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের করা শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণ মিলত প্রায় ১২ লাখ টাকা। ২০০৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত দেশে ১৮৫৫ এবং ১৯৬৫ সালের শ্রমআইন কার্যকর ছিল। ২০০৬ সালের পরে ঐ আইন দুটি তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এবং ২০০৬ সালের এই আইন করাই হয়েছে কিছু লুটেরা শিল্পপতিসহ বহুজাতিক কর্পোরেশনের স্বার্থ থেকে।

এবার আসা যেতে পারে, দেশে বীমা আইন সম্পর্কে। ২০০৬ সালের আইন অনুযায়ী একটি কারখানায় ২০০ জন শ্রমিক কাজ করলে তাঁদের গোষ্ঠিবীমার আওতায় আনা ছিল বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে ঋণপত্র খুলতে গেলে বীমার নথি দেখাতে হয়, বিধায় পোশাক কারখানার মালিকরা বীমা করতে বাধ্য হন। তবে সেটা ২০ জনের অধিক নন। এটা আমরা তাজরিনের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করেছি। ঐ কারখানায় শ্রমিক মারা গিয়েছিলেন সরকারি হিসাব মতে ১১২ জন। কিন্তু তাজরিনের মালিক গোষ্ঠিবীমা করেছিলেন ২০ জনের। ফলে মাত্র ২০টি পরিবারই ক্ষতিপূরণ হিসাবে ১ লাখ করে টাকা পাবেন। অথচ ২০০ জন শ্রমিকের একটি কারখানায় বীমা সংক্রান্ত ব্যয় মাসে ১ হাজার ৪১৭ টাকা। শ্রমিক প্রতি ব্যয় মাত্র ৭ টাকা। কিন্তু ২০ থেকে ১০০ জনকে বীমার আওতায় আনতে গেলে মালিকদেরকে প্রিমিয়ারের জন্য বছরে বাড়তি ব্যয় করতে হবে ৮৫ হাজার টাকা। এভাবে দুইশত থেকে হাজার জনকে বীমার আওতায় আনতে গেলে প্রিমিয়ার ব্যয় আরো বেড়ে যায়। ফলে মালিকদের কাছে এই টাকা শ্রমিকদের পিছনে ব্যয় করার থেকে শ্রমিকদেরকে পুড়িয়ে হত্যা করাটা লাভজনক, বিধায় তারা ২০ জনের ঊর্ধ্বে গোষ্ঠি বীমা করতে চায় না। এর বিপরীতে তারা তাদের কারখানার যন্ত্রপাতি ও মালামালের বীমা করে। কারখানা ক্ষতিগ্রস্থ হলে মালিকরা তাৎক্ষনিক বীমার টাকাও পেয়ে থাকে। যেমন তাজরিনে আগুন লেগেছিল ২৪ তারিখে। আর মালিক তার বীমার ২৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল ২৭ তারখের মধ্যে। এই প্রশ্নে আরেকটি কথা বলা জরুরী, সেটা হলো ২০০৬ সালের আইনে যেখান ২০০ জনের গ্রুপবীমা ছিল বাধ্যতামূলক। সেখানে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৩ সালের শ্রম আইনে সংখ্যাটি করেছে মাত্র ১০০ জন। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে শ্রমিকদের জীবনের মূল্য আরো সস্তা করা হয়েছে। পাশাপাশি তাজরিনের ক্ষেত্রে বিজিএমইএ কিছু টাকা ব্যয় করলেও রানাপ্লাজার ক্ষেত্রে তারা এক টাকাও ক্ষতিপূরণ বাবদ ব্যয় করেনি। এমনি কি বায়ারদের কোনো ফোরামও ক্ষতিপূরণের ধারে কাছে যায়নি।

রাষ্ট্র নাগরিকতা এবং নারী শ্রমিক

গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিকদের প্রসঙ্গে আলাপচারিতা করতে গেলে রাষ্ট্র এবং নাগরিকতার প্রশ্নটি সামনে চলে আসা স্বাভাবিক। এই প্রশ্নে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক এবং জনগণের মূল দাবি হলো একজন নাগরিকের কর্মক্ষমতা নিয়োগ করার দায়িত্ব সরকারের। এবং কর্মক্ষম মানুষটির সংসার চালানোর মত বেতনের ব্যবস্থা করার দায়দায়িত্বও সরকারের। সেখানে যে বিষয়টি সুনির্দিষ্ট, তাহলো ঐ বেতনে কর্মক্ষম মানুষটির পরিবারসহ মাথা গোজার ঠাঁই হতে হবে। বাজার থেকে চালডালমাছমাংদুধডিম কেনার মত সক্ষমতা থাকবে। অসুস্থ্যকালীন নিরাপত্তাও ঐ বেতনের মধ্যে নিশ্চিত থাকবে। কর্মক্ষেত্র থেকে নিরাপদে গৃহে ফিরে আসতে পারার গ্যারান্টি থাকবে। একই সাথে তাদের সন্তানদের দক্ষ নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠার ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে একজন নাগরিক যেন সুস্থ্য এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে তার প্রজাতিগত সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে। সমাজে বসবাস করতে পারে। তার কর্মসংস্থানের সাথে বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই সব ন্যূনতম জীবনবিধান নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব সরকার এবং রাষ্ট্রের উপরে বর্তায়। এসব আইনি দায়দায়িত্ব পালনের জন্যই জনগণ রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকার গঠনের ক্ষমতা দেয়। সরকার নাগরিকদের অধিকার রক্ষার জন্য নতুন নতুন আইন তৈরি করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। সেই আইন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দিয়ে বাস্তবায়ন করার দায়িত্বও সরকারের উপরে বহাল থাকে। কারণ সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করার ক্ষমতা সরকারেরই থাকে। জনগণ এই ম্যান্ডেট সরকারকে দেন। এবং সংসদে দাঁড়িয়ে সাংসদরা এই শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো যদি সরকার এবং রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালন না করে তাহলে এই ব্যবস্থাকে কি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক বলা যাবে?প্রশ্নটা এই কারণে জরুরী যে, গত তিন দশক ধরে গার্মেন্টস সেক্টরে যে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বারংবার দাবি উচ্চারিত হচ্ছে, তার মধ্যে প্রধান প্রধান বিষয়গুলো হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত কাজের পরিবেশ থাকতে হবে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টুলস থাকতে হবে। সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত ফায়ার গার্ড থাকতে হবে। প্রতিটি কারখানায় এমারজেন্সি সেফটি দরজা থাকতে হবে। প্রতিটি কারখানায় পর্যাপ্ত পানির ট্যাংক থাকতে হবে। ফায়ার ডিপার্টমেন্টের সাথে প্রতিটি কারখানার প্রতিনিয়ত জীবন্ত যোগাযোগ থাকতে হবে। এবং কর্মরত শ্রমিকদের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। প্রতি মূহুর্তে সেগুলি ইন্সপেকসনের আওতায় থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে এই প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গৃহিত হাওয়ার পরেও কর্মরত প্রতিটি শ্রমিকের জন্য ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা করাও বাধ্যতামূলক। আর এই বিষয়গুলি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।

Garment workers shout slogans during a rally demanding an increase to their minimum wage in Dhakaএর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিয়োগপত্র থাকা, নিয়মিত মজুরির নিশ্চয়তা থাকা, ওভার টাইম নিশ্চিতভাবে পাওয়া, প্রতিদিন ৮ ঘন্টা শ্রমসময় নিশ্চিত থাকা, সাপ্তাহিক ছুটি নিশ্চিত থাকা, মার্তৃকালীন ছুটি নিশ্চিত থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনশারিরীক নির্যাতন ও মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকা। এগুলোও নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের। কিন্তু আলোচিত এই বিষয়গুলো যখন অনিশ্চিত থাকে এবং তারপরেও যখন গার্মেন্টস শিল্পের অনুমোদন মেলে তখন শ্রমিকদের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য প্রধান দায়দায়িত্ব কোনো সরকারই এড়াতে পারে না। সেক্ষেত্রে আমরা প্রত্যক্ষ করছি, এযাবৎ কোনো সরকারই এসব ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহ করেনি। বিপরীতে মাত্র ৫০০০ হাজার মালিক এবং গুটি কয়েক বিদেশী কর্পোরেট সংস্থার মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লুটের জন্য এই রাষ্ট্র এবং সরকারগুলো ৪৫ লাখ শ্রমিককে ‘শ্রেণীগত’ভাবে গণহত্যার আয়োজন পাকাপোক্ত করেছে। এটাই আজ তিন দশকের বাস্তবতা। মানুষ হিসাবে শ্রমিকদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেয়া হয়নি আজো। ফলে রাষ্ট্র এবং সরকার কোনোভাবেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। এমন কি তাদের চলমান ‘উন্নয়ন’ তরিকা। কারণ গ্রাম এবং শহরের সবচেয়ে দুস্থ ক্ষমতাহীন নারীদের নিয়ে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে। তাদের চরম সামাজিক ও মানসিক অনিশ্চিয়তাসহ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার সুযোগ নিচ্ছে গুটিকয়েক মালিক এবং বিদেশী বড় বড় চেইন শপের মালিকরা। যাদের ব্র্যান্ড আইটেমের চাহিদা বিশ্বব্যাপী। যার মধ্যে ওয়ালমার্টের মত ক্রিমিনাল কর্পোরেট কোম্পানি রয়েছে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না, গত ১০ই ডিসেম্বর ২০১২ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে একটা ঘুষ কেলেঙ্কারি উত্থাপিত হয়েছিল। সেখানে ঘটনাটি ছিল এই ভারতের খুচরা বাজারে সরাসরি বিনিয়োগের জন্য ওয়ালমার্ট ভারতের ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতাদের ক্রয় করতে ৩০ লাখ ডলার বা ভারতীয় ১২৫ কোটি রুপি ঘুষ প্রদান করে। তাদের এই অবৈধ লেনদেনের সাথে মার্কিন আইন প্রণেতারা সরাসরি জড়িত ছিল। পাশাপাশি মার্কিন রাষ্ট্রের বিচার মন্ত্রনালয়ের সুত্র ধরে ২০১৩ সালের মে মাসে এনটিভি অনলাইন পত্রিকা জানায়, ওয়ালমার্টের বিরুদ্ধে ‘পরিবেশ দুষণএর দায়ে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ফ্রান্সিসকোয় মামলা হয়েছিল। এই মামলায় ওয়ালমার্টের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তারা ১১ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়। আমরা আরো জানি যে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ওয়ালমার্ট। প্রতি বছর তারা ১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কিনে থাকে। অন্যদিকে, গত ৪২ বছরের বাংলাদেশে যারাই রাষ্ট্র ক্ষমতাসীন হয়েছে, তারাসহ দেশের আমলারা রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতা কাঠামো ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি করেছে। ঘুষদুর্নীতির সাথে আমাদের রাষ্ট্রের সরকার এবং আমলারা ওতপ্রেতভাবে জড়িত। ফলে ভারতের মত রাষ্ট্রের কর্ণধারদের যেখানে ওয়ালমার্টের মত কর্পোরেটরা ক্রয় করতে সমর্থ্য। সেখানে আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতা এবং আমলারা যে আরো স্বল্পমূল্যে বিক্রি হবেন, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এটাই যখন বাস্তবতা সেখানে ওয়ালমার্টের মত কর্পোরেট কোম্পানিগুলির জন্য এদেশের সম্পদ এবং উৎপাদক শ্রমিকদেরকে যে খুনের ব্যবস্থা করা হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একই সাথে আমাদের আরো মাথায় রাখা জরুরী যে, শুধু স্বস্তা শ্রমের কারণেই বাংলাদেশে পোশাকশিল্প গড়ে উঠেছে বিষয়টি আদতেই তা নয়। সস্তা জীবনের পাশাপাশি ‘প্রাকৃতিক পরিবেশ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বাংলাদেশে পারিবেশগত আইনের দুর্বলতার কথা আমরা সাবাই জানি। এই আইনি দুর্বলতা করে রেখেছে স্বয়ং রাষ্ট্র এবং সরকারগুলো। সেটা করা হয়েছে সম্পূর্ণতই বিদেশীদের স্বার্থ থেকে। যার ফলশ্রতিতে বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্পখাতে শুধুমাত্র ২০০০ বড় মাপের ডাইং থেকে প্রতি বছর ৫০ হাজার কোটি গ্যালন মিঠা পানি ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ, তারা গভীর নলকুপের সাহায্যে এই পানি তুলে, সেটাকে পুরা মাত্রায় বিষাক্ত করে আবার নদীখালবিলে ছড়াচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকার নিজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই ধরণের পরিবেশ বিধ্বংসী পথ বেছে নিবে না। এই পথে তারাই হাটবে যারা কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে নিজেদেরকে সম্পুর্ণ উলঙ্গ করে বিকিয়ে দিয়েছে। ফলে যারা উন্নয়ন তরিকার দোহায় পাড়েন, বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের দোহায় দেন, তারা কিন্তু ভুলেও পোশাকশিল্প খাতে, সম্পদ হিসাবে মিঠা পানি ব্যবহারে প্রসঙ্গটি তুলেন না। সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। কিন্তু তারও একটি ব্যবহার মূল্য এবং বাজার মূল্য রয়েছে। আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে প্রতি বছর ব্যবহৃত ৫০ হাজার কোটি গ্যালন মিঠা পানির মূল্য কিন্তু আমাদের বর্তমানের জাতীয় বাজেটের কয়েকগুন বেশি। শাসকেরা আমাদের এই অমূল্য সম্পদ কর্পোরেটদের আরো অধিক মুনাফার স্বার্থে কোনো ধরণের মূল্য যোগ না করেই তুলে দিয়েছে। এই অন্যতম কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাথে শুধুমাত্র সস্তা শ্রম ও শ্রমের লিঙ্গকরণের প্রশ্নটি জড়িত নয়। এর সাথে শ্রেণীগণহত্যা এবং আমাদের সম্পদ লুন্ঠন ও প্রকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের আয়োজন সরাসরি সম্পর্কিত। একই সাথে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এসব বিষয়গুলি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম, নাগরিকের স্বার্বভৌমত্ব, তাদের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির সাথে সম্পর্কিত বিষয়। যার সাথে আরো সম্পর্কিত রয়েছে রাষ্ট্র এবং সরকারের গণতান্ত্রিকতার পরম্পরা। ফলে যারা নিজেদেরকে রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে গণ্য করেন, যারা বাংলাদেশকে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিবেদিত কর্মী হিসাবে মনে করেন, যারা লিঙ্গীয় সম্পর্কের দিক থেকে নারী মুক্তির কথা ভাবেন, আমাদের সবার জন্য আলোচিত সামগ্রীকতা নিয়ে ভাবনা পুনর্গঠন করা একান্তভাবেই জরুরী। তাজরিন ও রানাপ্লাজার শ্রেণীগণহত্যা এসব মৌলিক প্রশ্নকে আরো জীবন্তভাবে আমাদের সামনে আজ উত্থাপন করেছে। কোনো রাজনৈতিক কর্মী গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে এই সব জীবন্ত অধ্যায়গুলিকে কোনভাবেই পাশ কাটাতে পারেন না।।

৭ই অক্টোবর, ২০১৩ সাল, ঢাকা।

নেসার আহমেদ :: লেখক, গবেষক।

(লেখাটি মঙ্গলধ্বনি‘র ৩য় প্রিন্ট সংখ্যায় [অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যা] প্রকাশিত হয়েছে।)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s