বাংলাদেশের কৃষি :: বিভ্রান্তি, মিথ্যা এবং অলীক কল্পনার ভীড়ে একটি পর্যালোচনা

Posted: এপ্রিল 9, 2014 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: আলবিরুনী প্রমিথ

peasants-1কৃষি হচ্ছে জীবনজীবিকা, জীবনাচরণ, সংস্কৃতি, কৃষ্টি মোদ্দাকথা সামগ্রিক জীবনযাপনরীতি। কৃষির সাথে আমাদের সমাজের উৎপাদন, ভোগ, বিতরণ ও বিনিময়ের সম্পর্ক আছে যার ধরনের উপর আমাদের সমাজের বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছে। ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের কৃষকদের উপরে নানাবিধ নিষ্পেষণ, নির্যাতন ও অত্যাচার চলেছে। কৃষকেরাও মাথা নত হবার নয়। তারা বারবার শত্রুর মোকাবেলা করেছে। বিদ্রোহ করেছে, জীবন দিয়েছে তবু রণে ক্ষান্ত দেয়নি। কৃষকের চিরন্তন জীবনজীবিকার লড়াইয়ের পালা চলতেই থাকে। তাদের নিয়ে আমাদের দেশের শাসকশ্রেণীর পদলেহন করা বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে আমরাও ইনিয়েবিনিয়ে জয়গাঁথা রচনা করি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কৃষক পীড়নে আমরাও কোন না কোনভাবে তাদের কোলাবরেটর। তাই এই জনপদে কৃষক নিপীড়নের ইতিহাস দীর্ঘ তেমনি দ্বান্দ্বিকভাবে তাদের প্রতিরোধবিদ্রোহের ইতিহাসও প্রাচীন।

ভারত উপমহাদেশের কৃষির প্রারম্ভিক ইতিহাস

ব্রিটিশ বণিকরা ভারত উপমহাদেশে আসবার পূর্বে এখানের অর্থনীতি ছিলো গ্রামভিত্তিক, যৌথ উৎপাদনমূলক, স্বয়ম্ভর, অপরিবর্তনশীল। কার্ল মার্ক্সের বর্ণনামতে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতীয় সমাজে পণ্যবিনিময় ছাড়াই জটিল শ্রমবিভাগের দৃশ্য দেখা যায়। সেই সময়ে যৌথভাবে জমি চাষ করার পর রাজা বা বাদশাহর ফসল পরিশোধ করে অবশিষ্টাংশ ভোগের জন্য সকলের মধ্যে বন্টন করা হতো। উদ্বৃত্ত অংশ বাজারের পণ্য হয়ে বিক্রি হতো। পুনরায় উৎপাদিত সামগ্রী সকলের মাঝে বন্টন করা হতো, যার মধ্যে প্রকৃত উৎপাদনকারীরা ছাড়াও ছিল মধ্যস্বত্বভোগী মণ্ডল ও তার অন্যান্য সহকারীবৃন্দ। এই ভূখণ্ডে প্রাচীন ও মধ্যযুগের গ্রামগুলোতে ইউরোপের সামন্তযুগের পার্থিব ও আধ্যাত্মিক লর্ডের উপস্থিতি না থাকলেও উৎপাদন কাঠামোয় ফসল এবং জিনিস খাজনার চরিত্র ছিলো অভিন্ন।

মুঘল আমলে সুবাদারের অধীনে বারভুঁইয়া, সরকার, চাকলা, পরগনা ও মৌজাওয়ারীভাবে সম্রাটকে দেয়া ফসল ও জিনিস খাজনা ভিত্তিক যে ‘স্বর্ণযুগীয়’সামন্তপ্রথা চালু ছিলো, সেখানেও ভূমির উৎপাদন প্রণালী ছিলো অপরিবর্তনশীলযাকে মার্ক্স ‘এশিয়াটিক সমাজ’বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই এশিয়াটিক সমাজে উৎপাদন কাঠামোতে সামন্ততান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যই প্রধান ছিলো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে সেই এশিয়াটিক সমাজ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের স্বার্থে অনেকটা প্রাকপুঁজিবাদী ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক সমাজের ধাঁচে ভারতবর্ষে একটি সুনির্দিষ্ট সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন কাঠামো দেখা যায়, যা ১৭৯৩ সালে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তঅনুযায়ী জমিদাররা আদায়কৃত রাজস্বের নয়দশমাংশ কোম্পানির কাছে হস্তান্তরিত করবে। এই হিসেব মতো একটা নির্দিষ্ট অংক জমিদারদের দেয় রূপে নির্দিষ্ট থাকে। বছরের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই নির্দিষ্ট রাজস্ব কোম্পানির ঘরে জমা দিলে বংশানুক্রমে জমিদাররা জমির স্বত্বাধিকারী এবং ভবিষ্যতে জমির মূল্য যাই হোক, তাতে তাদের সাথে কোম্পানির বন্দোবস্তের কোন পরিবর্তন হবেনা। সে বন্দোবস্ত অপরিবর্তনীয় এবং চিরস্থায়ী।

এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে এদেশের ভূমি ব্যবস্থার মধ্যে একটা আমূল পরিবর্তন দেখা গেলো। পূর্বে যে জমির মালিক ছিলো কৃষিকার্যরত খোদ কৃষক সেই জমির মালিক এবার হলো পূর্ববর্তীকালের রাজস্ব আদায়কারী সরকারী এজেন্ট জমিদার। এই মালিকানার ফলে জমিদাররা ইচ্ছামত জমি ক্রয়বিক্রয়, বিলিব্যবস্থা সবকিছু করারই অধিকার লাভ করলো। এর ফলে কোম্পানি জমির উপর তাদের দাবী চিরকালের মত ছেড়ে দিলেও, তার বিপরীতে জমি থেকে একটা নির্দিষ্ট অংকের মুনাফা তাদের নিশ্চিত হলো। ব্রিটিশদের হাতে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতের স্থবির উৎপাদন কাঠামো ধ্বংস হওয়ার পর সেই ধ্বংসযজ্ঞের উপর কৃষিতে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা বিকাশের প্রভূত সম্ভাবনা দেখা দিলেও ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্যবাদী শোষণের স্বার্থেই সেই পথে পা বাড়ায়নি। ব্রিটিশদের চক্রান্তে যা হলো, সেটা হচ্ছে ভারতীয় নব্যবণিক পুঁজি, তথা জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঠেকানোর জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্তহয়ে উঠলো স্থানীয় বণিক পুঁজিকে জমিদারী ক্রয়ে খাটিয়ে সম্ভাবনাময় দেশীয় বণিক পুঁজিপতিদেরকে মূলত প্রজাসাধারণের খাজনাখাওয়া, অলস ভোগবিলাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রক্রিয়া মাত্র।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ভারত উপমহাদেশে যেই ভূস্বামী বা জমিদার শ্রেণীর সৃষ্টি হলো তাদের সাথে ইউরোপের সামন্ত ভূস্বামীদের পার্থক্য ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ। সবচাইতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হলো এখানে যে, এই শ্রেণীর নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে কিছু ছিলোনা। তারা ছিলো ঔপনিবেশিক শাসকদের অধীনস্থ ও তাদের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল একটি শ্রেণী। ব্রিটিশ বাণিজ্য নীতির ফলে সেই সময়ে যেসব ব্যবসায়ী স্বাধীন বাণিজ্যের চেষ্টা করেন সেগুলো টিকতে পারেনি। তাই ব্যবসায়ী পরিবারগুলির অধিকাংশই উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেই ব্যবসাবাণিজ্যের ঝুঁকির মধ্যে না গিয়ে অর্থনৈতিক জীবনকে সুনিশ্চিত করার জন্য ভূসম্পত্তি ক্রয় করে পরিণত হয়েছিলেন জমিদারে। সেই কারণে আঠারো ও উনিশ শতকে যেই জাতীয় পুঁজি সেই সময়ে গঠিত হয়েছিলো তার বিনিয়োগ শিল্পে এবং বৃহৎ বাণিজ্য ক্ষেত্রে না হয়ে তা ব্যয় হয়েছিলো ভূসম্পত্তি ও জমিদারী স্বত্ব ক্রয়ের জন্য। এই কারণে বাংলাদেশে মধ্যশ্রেণী নামে যে শ্রেণীটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি গঠিত হয়ে বিশিষ্ট চরিত্র অর্জন করেছিলো সেই শ্রেণীর উদ্ভব শিল্প বুর্জোয়া, এমনকি বাণিজ্যিক বুর্জোয়া থেকেও বিশেষভাবে হয়নি। হয়েছিলো মধ্যস্বত্বভোগী ভূস্বামী শ্রেণীর থেকে।

ব্রিটিশরা এই দেশ থেকে সশরীরে বিদায় নেওয়ার পর ১৯৫১ সালে জমিদারী প্রথা ও অন্যান্য মধ্যস্বত্ব বিলোপ করে সমাজে সৃষ্টি করা হলো ‘রাষ্ট্রজমিদার’ও ‘স্বাধীন প্রজার’মধ্যে সরাসরি ভূমিখাজনা সম্পর্ক। এর ফলে উৎপাদন কাঠামোর বহিরাবরণে চিরায়ত (Classical)সামন্তবাদ বিদায় নিলেও তার জের থেকে গেলো। জমির উপর যে নতুন ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলো সেটা লক্ষ লক্ষ ক্ষুদে ও প্রান্তিক কৃষকদের গলায় আধাসামন্ততন্ত্রের ফাঁস পরিয়ে রাখলো যুগের পর যুগ ধরে বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানে। আইয়ূব খানের আমলে পশ্চীম পাকিস্তানের যে ভূমি সংস্কার করা হয় তার মূল লক্ষ্য ছিলো কৃষি উদ্বৃত্তকে শিল্প ক্ষেত্রে যথাসম্ভব আকর্ষণ করা। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সে ধরনের কোন ভূমি সংস্কারই হয়নি। বরং ১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের সময় মালিকানার উর্ধ্বতম সিলিং ১০০ বিঘা নির্দিষ্ট হলেও আইয়ূব খানের আমলে তা পুনরায় নির্দিষ্ট করা হয়েছিলো ১২৫ একর বা ৩৭৫ বিঘায়। এর থেকে সেই আমলে পূর্ব পাকিস্তানে কৃষি উদ্বৃত্তকে শিল্প ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার বিষয়ে পাকিস্তানী শাসকদের নীতি কি ছিলো তা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। পশ্চিম পাকিস্তানে যেখানে ভূমি সংস্কার করে কৃষি উদ্বৃত্ত শিল্পে বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছিলো সেখানে পুর্ব পাকিস্তানে ভূমি মালিকানার সিলিং বৃদ্ধি করে কৃষি উদ্বৃত্তকে জমি ক্রয়ের দিকেই পরিচালনা করা হলো।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মের পরেও এখানে কৃষকদের অবস্থানের গুণগত কোন পরিবর্তন ঘটেনি। গ্রামাঞ্চলে এবং সামগ্রিকভাবে দেশে ভূমি মালিকানা বিন্যাসে কার্যকর পরিবর্তন আসেনি। সংবিধানে আনুষ্ঠানিকতাভাবে ‘সমাজতন্ত্রের’তিলক লাগানো হলেও তার কনামাত্র প্রতিফলন কোথাও দেখা যায়নি। তা ছিলো স্রেফ বাগাড়ম্বরপূর্ণ। যেমন মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ভূমিনীতিতে ঘোষণা করেছিলো যে, তারা পরিবার প্রতি জমির সিলিং ১০০বিঘা নির্ধারণ করবে। সাথে ছোট কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, সমবায় কৃষি এবং উন্নত পদ্ধতির চাষ আবাদের কথাও বলা হয়েছিলো। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ যে সেখানে বর্গাদারী প্রথার বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারিত হয়নি যেই বর্গাদারী প্রথা এই দেশে ছিলো সামন্তবাদের সবচাইতে জঘন্যঅবশেষ। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কৃষি উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা ‘সবুজ বিপ্লবের’বিস্তৃতি ৭০ দশক পর্যন্ত সেভাবে ঘটেনি। কৃষিতে এই ‘নতুন প্রযুক্তির বিস্তার’এবং ‘গ্রাম উন্নয়নে গ্রামীণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অংশগ্রহণ’এর লক্ষ্যে তাদের ধরণে ভূমি সংস্কারের গুরুত্ব ইউএসএইড এর প্রকল্পেও ব্যক্ত হয়।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের ফসল হিসাবে সামরিক উর্দি পরা অফিসার জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা অধিগ্রহণের পরেও কৃষকদের অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং অবনতিই হয়েছিলো। তার সরকার কৃষক, ক্ষেতমজুর, গরিব চাষীদের ধ্বংস করার মহাপরিকল্পনায় কাতরে টাকা ঢালতে লাগলো দেশের ভেতরের মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া, উঠতি পুঁজিপতি, জোতদার এবং বিদেশী অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান। জিয়াউর রহমানের খালকাটা কর্মসূচীপ্রকৃতপক্ষে দাতাসংস্থাসমূহের ফাড একশন প্রোগ্রাম বা ফ্যাপ বাস্তবায়ন করার প্রতিফলন মাত্র। যত্রতত্র খাল কেটে ক্ষুদে চাষীর দুইএক বিঘা জমিও শেষ করে দেওয়া হলো। জিয়াউর রহমান এতেই ক্ষান্ত দেননি। তিনি সর্বপ্রথম এই ভূখন্ডে কৃষকদের ক্ষয়রাতি বানিয়ে দিলেন। স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটার জন্য তিনি চালু করলেন ফুড ফর ওয়ার্ক বা কাজের বিনিময়ে খাদ্য এবং খয়রাতি সাহায্য। বাংলার কৃষক সেই সাহায্য গ্রহ করতে বাধ্য হয়ে খয়রাতি হয়ে গেলো। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের কৃষককে খালের জলে ভাসিয়ে খয়রাতি বানিয়ে ছেড়ে দিলো। কৃষকরা বাঁচলে দেশ বাঁচবেবলে যারা আহ্লাদী করেন, তারা বর্তমানেও যেমন কৃষকের উপর নানাবিধ নিপীড়নে নিশ্চুপ থাকেন, সেই সময়তেও টুশব্দটি করেননি।

জিএম ফুড ও হাইব্রীড বীজ

বাংলাদেশের কৃষি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

বিশ্বের সর্বত্রই খাদ্য চক্রের উপর কর্পোরেট কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করে রেখেছে তাদের আগ্রাসী তৎপরতার মাধ্যমে। এই নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী ও পাকাপোক্ত করার জন্য নিত্যনতুন নয়া নয়া কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। যার অন্যতম হচ্ছে জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জেনেটিক খাদ্য উৎপাদন ও বাজার দখল করা। যেমন ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকা জিএম খাদ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য শ্রীলংকা সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন আইনের দোহাই তোলা এবং চাপ দিয়ে অবশেষে শ্রীলংকা সরকারকে বশে আনা হলো এবং তারা জিএম খাদ্যের উপর তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলো। ভোক্তাদের না জানিয়েই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দ্বারা বাজারকে জিএম খাদ্যে ছেয়ে ফেলার উদাহরণও আছে। ১৯৯৬ সাল থেকেই লেবেলবিহীন জিএম খাদ্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আসতে থাকে যেমন ভারত, কম্বোডিয়া, গুয়েতেমালা ইত্যাদি। বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার নামে জিএমএর উপাদান আছে এমন খাদ্য তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে রপ্তানি করা হয়, কিন্তু রপ্তানি করা এসব খাদ্যে কখনো জিএম এর লেবেল থাকেনা। এভাবে মানুষকে অজান্তে জিএম খাদ্যে অভ্যস্ত ও নির্ভরশীল করানো হচ্ছে।

বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার ‘বাণিজ্য সংক্রান্ত মেধাস্বত্ব চুক্তির’ আওতায় তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলোর উপর বিভিন্ন চাপ আর বল প্রয়োগ করা হয়, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের জন্য এমন আইন প্রণয়ন করা যাতে কোম্পানিগুলো বীজববৈচিত্র্যের উপর পেটেন্ট অধিকার লাভ করতে পারে। এসব আইন কৃষকের বীজ সংরক্ষণের অধিকার, বীজ ব্যবহারের অধিকার, বিনিময় ও সেগুলো বিক্রির অধিকারকে খর্ব করে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চায় খাদ্যের উপর ‘চিরস্থায়ী ব্যবস্থার’মতো সকল প্রকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। তারা সম্পূর্ণ খাদ্য চক্রের উপর খাদ্য ব্যবস্থা ও খাদ্য বাজারের উপর একক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে, যেন খাদ্য ব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি তাদের হাতেই থাকে। তাই তাদের বীজ পেটেন্ট করা জরুরী।

তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশের অধিকাংশ কৃষক একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সামন্তবাদী নিষ্পেষণের শিকার হচ্ছে। ক্ষুদ্রায়তন কৃষি অর্থনীতির বদৌলতে জমির ক্ষুদে ব্যক্তিগত মালিকানা, বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসন একবিংশ শতাব্দীর সামন্ততন্ত্রের অন্যতম প্রধান দুইটি চরিত্র। এছাড়া জৈব প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো বীজসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের উপর কৃষকের নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে তোলা। প্রথম প্রজন্মের উচ্চপ্রযুক্তির মূল লক্ষ্য ছিলো বীজকে আগাছা এবং কীটনাশকবান্ধব করে তোলা। বর্তমানে জৈব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যেসব গবেষণা হচ্ছে তার উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থের উপর নির্ভর করে। সাধারণ কৃষকের চাহিদা আদপেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা পালন করেনা।

জিএম খাদ্য থেকে সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় বায়োটেক কোম্পানিগুলো। সে কারণেই তারা জিএম খাদ্যশস্য চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ধনী দেশের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ও সরকার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য দরিদ্র দেশগুলিকে অর্থ সাহায্য পাইয়ে দিতেও আগ্রহী। আর এই প্রক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হলো দরিদ্র দেশগুলো দেনার দায়ে আবদ্ধ হয়ে গেলে ধনী দেশগুলো শস্য সরবরাহ করার সুযোগ পায়। এসব কারণেই দরিদ্র দেশের কৃষকদের উপরে জিএম খাদ্যশস্য জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলে আসছে।

কৃষিকাজের মূল উপকরণ হলো বীজ। কৃষকরা এই বীজ স্বাধীনভাবে পেয়ে থাকে। যুগযুগ ধরে প্রাকৃতিকভাবে কৃষকরা উৎপাদিত বীজ চাষাবাদ, সংরক্ষণ ও বিনিময় করে থাকে। কৃষকরা বীজ সংরক্ষণে লোকায়ত জ্ঞান ব্যবহার করে। এই প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে কোম্পানিগুলো কৃষকের সংরক্ষিত বীজকে হটিয়ে তাদের তৈরী হাইব্রীড প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তথাকথিত উন্নতমানের হাইব্রীড বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যই হলো কৃষকরা যেন নিজস্ব জাতের পুনরোৎপাদনশীল বীজের সংরক্ষণ করতে না পারে। তারা নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ করতে না পারলে প্রতিবছর তারা কোম্পানির কাছ থেকে বাড়তি দামে হাইব্রীড বীজ কিনতে বাধ্য হবে। এই বীজ বন্ধ্যা হওয়ায় তা পুনোরোৎপাদনের জন্য সংরক্ষণ করা যায়না। এর ফলে কৃষকরা ক্রমেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এছাড়া হাইব্রীড চাষে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, যা জমির উর্বরতা শক্তিকে ধ্বংস করে ফেলে। এই বীজের খাদ্যগুণ কম, স্বাস্থ্য পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। যেসব দেশ হাইব্রীড ধান উৎপাদনে মনোযোগ দিয়েছে সেখানে উৎপাদন বাড়লেও উন্নত হয়নি জনগণের জীবনযাত্রার মান। বেড়েছে নির্ভরশীলতা, আয় বৈষম্য। হাইব্রীড চাষের মাধ্যমে কৃষি বৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, যা ক্রমান্বয়ে সমগ্র প্রাণবৈচিত্র্যের উপর প্রভাব ফেলছে। এই অবস্থা গোটা কৃষি অর্থনীতিকেই ইতোমধ্যে প্রচন্ড রূপে হুমকির মুখে ফেলেছে।

ক্ষুদ্র ঋণ :: বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির কফিনে শেষ পেরেক

disaster_in_potato-1বর্তমানের বিশ্বব্যবস্থায় উৎপাদনশীল খাতের যা প্রবৃদ্ধি, তার থেকে হাজার গুণ বেশী বেগে লাফিয়ে এগোচ্ছে অর্থকরী খাত। ব্যাংক, বীমা, শেয়ার বাজার ইত্যাদির উল্লম্ফন সেই চিত্রই প্রদর্শন করে। এমন একটি খাতের মধ্যে ‘ক্ষুদ্র ঋণ’ব্যবস্থাও অন্যতম। এই ব্যবস্থাকে ‘দারিদ্র্য বিমোচনের’আদর্শ মডেল হিসাবে তথাকথিত পত্রপত্রিকা, মিডিয়ায় তুলে ধরবার অপচেষ্টা করা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণই ভিন্ন। ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে কয়েকটি জিনিস লক্ষ্য করা দরকার। এক, এর পরিমাণ যেহেতু বেশ কম তাই ব্যবহারের ক্ষেত্রও সীমিত। দুই, প্রতি সপ্তাহে দেয় কিস্তি পরিশোধে যোগ করতে হয় শতকরা ২০ ভাগ (হিসাবটি ২০০৭ সালের, বর্তমান হিসাব লেখকের এই মূহুর্তে অজানা)। ফলে বিনিয়োগকারীর টাকা প্রতি সপ্তাহে নিয়মিতভাবে কমপক্ষে শতকরা ২০ ভাগ লাভসহ উঠে না আসলে তা পরিশোধ সম্ভব হয়না। একবার ছেদ পড়লে ঋণগ্রহীতাদের পক্ষে সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তিন, পরিবারে অন্য কোন আয়ের উৎস না থাকলে দীর্ঘকাল প্রতি সপ্তাহে এই কিস্তি পরিশোধ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত ঋণগ্রহীতার আয়ের উপার্জনের পথ যদি কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তার কিস্তি পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। চার, এই মডেলে অনুমান করা হয়েছে বাজার প্রক্রিয়া, কাজের সুযোগ, অবকাঠামো, ক্ষমতা কাঠামো ইত্যাদি অনুষঙ্গগুলো সবই অনুকূল। কিন্তু বাস্তবে এসবের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পাঁচ, যদি ঋণগ্রহীতা বা তার পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে যেহেতু চিকিৎসা ব্যবস্থা ক্রমশই বেসরকারীকরণের দিকে যাচ্ছে এবং ব্যয়বহুল হচ্ছে, তাই পুরনো ঋণশোধ দূরের কথা তাকে নতুন ঋণে দারস্থ হতে হয়। ছয়, ক্ষুদ্রঋণ সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব কেবল উচ্চতর সুদে লগ্নিতে এবং কেনাবেচার ব্যবসাতে। সেই হিসেবে এই ঋণ ঋণের বাজারই সম্প্রসারিত করে গুণিতক হারে। উৎপাদনশীল খাতে এর ব্যবহার নগণ্য

উল্লিখিত বিষয়সমূহের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। বাংলাদেশে এনজিও মডেল, বিশেষত ক্ষুদ্রঋণকেন্দ্রিক তৎপরতার বিস্তার অনেক দ্রুতহারে ঘটেছে। এই ক্ষেত্রে মুনাফার হার অনেক উঁচু, মূলধন সংবর্ধনের হার অনেক বেশী। এসব অন্তর্নিহিত সমস্যা নিয়ে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের মিডিয়া, বিদ্বৎসমাজ কিংবা নীতিনির্ধারকরা মুখে কূলুপ এঁটে রাখেন। এই মডেলের আচ্ছন্নতা মানুষকে দারিদ্র্যের কারণ অনুসন্ধান থেকে বিরত রাখছে। কারণ দারিদ্র্যের প্রকৃত কারণসমূহ টিকে থাকাটাই এই এনজিও মডেলের মূল উদ্দেশ্য।

পরিশেষে বলা যায়, নানাবিধভাবেই বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এমতাবস্থায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের যোগানদার কৃষকেরা। এই কৃষকরা না বাঁচলে আমরাও বাঁচবোনা তাতে কোন সন্দেহ নেই।।

তথ্যসূত্র

) বাংলাদেশের কৃষিঃ ধনতান্ত্রিক না আধাসামন্ততান্ত্রিক ? সম্পাদনায় আবু ইউসুফ

) চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক: বদরুদ্দীন উমর

) বাংলাদেশের কৃষক ও আন্দোলন: বদরুদ্দীন উমর

) বিশ্ব পুঁজিবাদ এবং বাংলাদেশের অনুন্নয়ন: আনু মুহাম্মদ

) কর্পোরেট বিশ্বায়ন ও কৃষির রাজনীতি: আহমেদ স্বপন মাহমুদ

—————————————-

আলবিরুনী প্রমিথ :: লেখক, গল্পকার, এক্টিভিস্ট।

(লেখাটি মঙ্গলধ্বনি‘র ৩য় প্রিন্ট সংখ্যায় [অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যা] প্রকাশিত হয়েছে।)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s