মাও সে-তুঙ-এর উত্তরাধিকার ও চীনের ‘সংস্কার’-এর বর্তমান অভিমুখ

Posted: মার্চ 24, 2014 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

china-congress-1বর্তমানে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তবে দেশটি ক্রমশ বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে আরও সমন্বিত হচ্ছে। আর চীন যদিও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, সেদেশের নিম্ন মজুরির দরুন বিশ্বের বহুজাতিক সংস্থাগুলি দেশটির থেকে বিপুল মুনাফা লুটছে।

স্পষ্টতই ব্যাপক মাত্রায় বিনিয়োগের ও রপ্তানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে চীন। আর সেদেশের রপ্তানির দুইতৃতীয়াংশই বিক্রি করা ও জাহাজে তেলা হচ্ছে অচীনা কোম্পানিগুলির সম্পূর্ণ বা আংশিক মালিকানাধীন কারখানার থেকে। এদিকে আমরা লক্ষ্য করছি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’র বাগাড়ম্বর। যে বক্তব্যের সারমর্ম কার্যত ধনবাদ। তাদের তরফে মার্ক্সবাদলেনিনবাদ ও মাও সেতুঙএর চিন্তার উল্লেখ এখন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। যা ঐ পার্টির ক্ষমতায় টিকে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজনীয়।

১৯৭৬ সালে মাও সেতুঙএর মৃত্যুর পর দেঙ জিয়াও পিঙ’র দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী সিপিসি’র নেতৃত্ব কব্জা করে। আর পুঁজিবাদী পথ অনুসরণ করে। বাজারমুখী ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ’এর মাধ্যমে ‘চীনের বৈশিষ্ট্যসহ সমাজতন্ত্র’র নামে আসলে গড়তে থাকে চীনের বৈশিষ্ট্যসহ ধনতন্ত্র। যে প্রক্রিয়ার ভিত্তি ছিল মূলত বিদেশী বিনিয়োগ ও রপ্তানি। জোর দেওয়া হয় উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে। কিন্তু অবনতি ঘটে উৎপাদন সম্পর্কের। ক্রমশ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারীকরণ করা হতে থাকে। কাজ হারান লক্ষ লক্ষ মানুষ। চাষিদের অধিকারও খর্ব করা হয়। আর ছাঁটাই করা হয় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি।

সম্প্রতি সিপিসি’র সাধারণ সম্পাদক সি চিনপিং’র নেতৃত্বে আরও এক দফা বাজারমুখী পুনর্বিন্যাস কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। সেদেশের সংবাদসংস্থা শিনহুয়ার রিপোর্ট থেকেও স্পষ্ট, সরকারিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বর্তমানে চীনে বাজারের ভূমিকা। যা ছিল ‘বুনিয়াদি’ তা হয়ে উঠেছে ‘নির্ধারক’। এর ফলে জনসাধারণের সামাজিক অবস্থার আরও অবনতি হবে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়বে। যা আড়াল করে ক্রমবর্ধমান জনবিক্ষোভ প্রশমনের উদ্দেশ্যে চীনের সরকার অবশ্য কিছু প্রসাধনী পরিবর্তনের ঘোষণা করছে।

এদিকে অর্থনৈতিক বদ্ধদশা ও মন্দায় বিপর্যস্ত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা। যেখানে চীনে উৎপাদিত পণ্যদ্রব্যের চাহিদা কমেছে। ফলে চীনের শিল্পক্ষেত্রে অস্থিরতা বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখন সিপিসি নেতৃত্ব ঘোষণা করছেন, বিদেশী পুঁজির উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস ও অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেবেন তারা। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, চীনের রপ্তানিভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তন করা সহজ নয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চীনে পারিবারিক ভোগব্যয় ২০১২ সালে দাঁড়ায় সেদেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি)-র প্রায় ৩৬ শতাংশে, যা ১৯৮৫ সালের ৫১ শতাংশের থেকে অনেক কম। আর চীনের জিডিপিতে শ্রমিকদের আয়ের অংশভাগ ২০০৫ সালে কমে দাঁড়ায় ৩৭ শতাংশে, যা ১৯৮০’র দশকে ধারাবাহিকভাবে ৫০ শতাংশের উপর ছিল। এদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রকাশ, সেদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লক্ষ কৃষক জমি হারাচ্ছেন। চীনে আয়ের অসাম্যও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সার্ভে আন্ড রিসার্চ সেন্টার ফর চায়না হাউসহোল্ড ফিনান্স’র একটি সমীক্ষায় যেমন দেখা গিয়েছে, সেদেশের জিনি কোএফিশিয়েন্ট ২০১০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ০.৬১, যা এক দশক আগের ০.৪১২’র থেকে উপরে ছিল। ফলে চীনে বাড়ছে গণবিক্ষোভ। যা দমন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সেদেশের সরকার।

স্পষ্টতই মাও সেতুঙএর যুগে স্বাধীন চীনের সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের যে ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, সেই ইতিবাচক উপাদানগুলির ক্রমাগত ক্ষয় ঘটানো হচ্ছে। আর বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, চীনে বাজারমুখী সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনীতির যে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটছে, তা দক্ষতা অর্জনের কারণে নয়; বরং উল্লেখযোগ্য মাত্রার সাম্য কায়েম করা সম্ভব হয়েছিল মাও সেতুঙের যুগে সেদেশে যে পরিকাঠামোর মাধ্যমে, তার ইচ্ছাকৃত ক্ষয়ের দরুন।

এদিকে সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া সূত্রে প্রকাশ যে, সম্প্রতি সিপিসি’র সাধারণ সম্পাদক সি চিনপিং “মাওবাদ এবং ১৯৮০’র দশকের গোড়ায় দেঙ’র পেশ করা ধারণা চীনের বৈশিষ্ট্যসহ সমাজতন্ত্রের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাখ্যা” দিতে গিয়ে দাবি করেছেন, এই বিষয় দুটি “পরস্পরবিরোধী নয়”। বাস্তবে অবশ্য উল্লিখিত প্রথম বিষয়, অর্থাৎ মাও সেতুঙএর মতাদর্শ বৈষম্য দূরীকরণের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার পথ দেখায়। যার থেকে একেবারেই উল্টো বর্তমানে সিপিসি’র অনুসৃত দেঙপন্থী “সমাজতান্ত্রিক বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কার”এর অভিমুখ। যা কার্যত পুঁজিবাদের পুন:প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অসাম্যের বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।

এদিকে বিপ্লবী নেতা ও আধুনিক চীনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুঙএর ১২০তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে গত ২৬ ডিসেম্বর। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুঙ। তার নেতৃত্বে চীনে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়; সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করা হয় গণযুদ্ধের পথে। আর প্রতিষ্ঠিত হয় চীন গণপ্রজাতন্ত্র। সমাজতন্ত্র অভিমুখী দীর্ঘ পথে সামাজিক প্রগতির সঙ্গে সমাজের গণতন্ত্রীকরণের সংযুক্তির ধারণাকেও বাস্তবায়ন করা হয় গণলাইনের পন্থা অবলম্বনে।

চীনা গণতান্ত্রিক ও জাতীয় বিপ্লব, সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংগ্রাম এবং সেদেশে পুঁজিবাদের পুন:প্রতিষ্ঠা রোধ করতে সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় মার্কসবাদলেনিনবাদকে মাও সেতুঙ নতুন এক তৃতীয় স্তরে বিকশিত করেন। তবে মাও সেতুঙএর বৈপ্লবিক অবদানকে, বিশেষত তাঁর শিক্ষার সার্বজনীন চরিত্রকে অস্বীকার করতে চায় দক্ষিণপন্থী ও সংশোধনবাদী শক্তি।

মাও সেতুঙএর মতাদর্শের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা অবশ্য স্পষ্ট। চীনের প্রকৃত কমিউনিস্টরা যেমন তথাকথিত ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের’ বিরোধিতার ক্ষেত্রে এখনও মাও সেতুঙের মতাদর্শকে ভিত্তি করেই এগোনোর চেষ্টা করছেন। নয়াউদারতাবাদী বিশ্বায়নের থেকে উদ্ভূত দারিদ্র্য ও বৈষম্যের মতো গুরুতর সমস্যা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তে, বিশেষত নিপীড়িত দেশগুলিতে বিকল্প পথের সন্ধান করছেন মেহনতি জনসাধারণ; যাদের র‍্যাডিকাল অংশ আকৃষ্ট হচ্ছেন মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদএর প্রতি। আর সেই মতাদর্শকে নিজ নিজ দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন। ফলে মাও সেতুঙের উত্তরাধিকার বহন করছেন প্রকৃতপক্ষে তারাই।।

তথ্যসূত্র

[] Pete Dolack, “A ‘Communist’ Party? Really?: More Capitalism for the Chinese”, Dec 13-15, 2013

http://www.counterpunch.org/2013/12/13/more-capitalism-for-the-chinese/

[] Ibid

[] James Pomfret, “Special Report: Freedom fizzles out in China’s rebel town of Wukan”, Feb 28, 2013

http://www.reuters.com/article/2013/02/28/us-china-wukan-idUSBRE91R1J020130228

[] Jennifer Duggan, “Income inequality on the rise in China”, Jan 12, 2013

http://www.aljazeera.com/indepth/features/2012/12/2012122311167503363.html

[] “Party newspaper praises Mao’s role ahead of 120th birthday”, Dec. 23, 2013

http://news.xinhuanet.com/english/china/2013-12/23/c_132989570.htm

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s