পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও আমি নিজে পুরুষতন্ত্রের শিকার!

Posted: মার্চ 24, 2014 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: মেহেদী হাসান

smash_the_patriarchyউপরের শিরোনাম দেখে অনেকেই হয়ত চমকে উঠবেনকিভাবে, কিভাবে এটা সম্ভব!

বলছি, একে একে গুটিকতক

প্রথমেই বলে নেই পুরষতান্ত্রিক সমাজের প্রথা মেনে বিয়ে করাটা আমার কাছে খুবই ন্যাক্কারজনক ও অমানবিক একটা কাজ বলে মনে হয়। কেন মনে হয়? কারন হলবিয়ে হচ্ছে এমন একটি প্রথা যা পুরুষ কর্তৃক নারী শোষণের অনেক বড় হাতিয়ার বা বিস্তৃত একটা ক্ষেত্র এবং আদিম সমাজে নারীর ঐতিহাসিক পরাজয় প্রক্রিয়ার সমান্তরালে এই প্রথার আবির্ভাব যেখানে পুরুষের উত্তরাধিকারকে সুনির্দিষ্ট করার জন্য নারীকে একগামী হওয়ার কড়া নির্দেশ প্রদান করে এবং বিপরীত ক্ষেত্রে পুরুষের জন্য রয়ে যায় সমাজে চালু থাকা নারীর গণিকাবৃত্তি এবং পুরুষের বহুবিবাহের ফলে সামষ্টিক যৌনকাজের বিস্তৃত পরিসর। সমাজের মানুষের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের সহযোগীতায় বিয়ের জাঁতাকলে ফেলে একজন পুরুষ খুব সহজেই একজন নারীর (নারীটি যদি অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বীও হয়, আর তা না হলে তো কথাই নেই) উপর যথেচ্ছ ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ ও ধারাবাহিক নীরব ধর্ষণ চালানোর বৈধ অধিকার হাতিয়ে নেয় এবং পরিণত করে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রমাত্রে, গৃহস্থালী কাজ করার দাসীতে। বর্তমান সমাজে বিয়ে প্রথাই কেবল একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রে স্বামী বা প্রভূর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার এখতিয়ার প্রদান করে থাকে। যাহোক, আমি দীর্ঘ অধ্যবসায়ে, একজন মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার তাগিদে নিজের মধ্যকার নির্যাতক, শোষক, ধর্ষক, এই প্রবৃত্তিগুলোকে বেশ মাত্রায় কমিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি বা সযত্নে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি।

সুতরাং ক্ষয়িষ্ণু এবং সুপ্তাবস্থায় থাকা প্রবৃত্তিগুলোকে জাগিয়ে তোলার বা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রের বা অধিকারের ন্যূনতম প্রয়োজন আমার যেমন নেই ঠিক তেমনিভাবে মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে তা প্রচন্ডরকম ক্ষতিকারকও বটে। অথচ বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় প্রথা মেনে বিয়ে না করলে আমি কোন মেয়েকে শারিরীক এবং মানসিকভাবে কাছে রাখার বা সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার অধিকার হারাবো। যদিও বা পাওয়া যায় তাহলেও সেটা কিছুদিনের জন্যঅন্য কোন পুরুষের সাথে মেয়েটির বিয়ে নামক কার্য সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সংক্ষিপ্ত সময়কালেও হয়ত শুধু মানসিকভাবেই কাছে পেতে পারব শারিরীকভাবে নয়। ক্ষেত্রবিশেষে সম্ভব হলেও সামাজিকভাবে প্রচন্ডরকম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরী করে, পুরুষ হিসেবে আমার ক্ষেত্রে যতটা নয় মেয়েটার ক্ষেত্রে অনেক বেশী রকমভাবে। আবার কোন মেয়ের (দাসত্ব মনোভাব পোষণকারী মেয়েদের ক্ষেত্রে, আমাদের সমাজে এধরনের মেয়ের সংখ্যাই বেশী) সাথে প্রণয় সম্পর্কের শুরুর দিকে তাকে না বলাটা উচিত কাজ হবে না যদি বলে নেই যে, “তোমার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বা সম্পর্ক দীর্ঘায়িত করার জন্য কঠোর শর্তগতভাবে তোমার অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সকল ধরনের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়ভার কাঁধে নেওয়ার কোন ধরনের সদিচ্ছাই আমার মধ্যে নেই” এবং এধরনের দায়িত্বের বোঝা সামলানোও আমার পক্ষে হয়ত সম্ভবপর হবে না, যেখানে আমার নিরাপত্তাই চরমভাবে বিঘ্নিত তাহলে কেউ আমার সাথে প্রণয় সম্পর্কের সূত্রপাত করার স্পর্ধা দেখাবে এমনটা মনে হয় না।

নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভার কাঁধে না নিলে যেখানে তার সাথে কোন যৌন প্রণয় উৎসারিত শারিরীক সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়া যায় না, বিপরীত ক্ষেত্রে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভার কাঁধে নিলে শারিরীক সম্পর্কে জড়িত হতে ন্যুনতম যৌনপ্রনয়েরও প্রয়োজন পড়েনা, সেখানে ব্যাপারটাকে নারীর বৈধ গণিকাবৃত্তি ছাড়া আর কি নামে সম্বোধন করা যায়! অবৈধ গণিকাদের যেখানে খদ্দের অনির্দিষ্ট এবং বহুসংখ্যক এবং বৈধ গণিকাদের খদ্দের সুনির্দিষ্ট এবং একজনপার্থক্য এটুকুই। তবে অবৈধ গণিকাদের যৌনকাজ বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে খদ্দেরের দাসত্ব করার প্রয়োজন পড়েনা তবে বৈধ গণিকাদের সকল ক্ষেত্রেই তার সুনির্দিষ্ট খদ্দেরের দাসত্ব করতে হয়।

কোন নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হওয়ার কারনে ভয়ানক রকমভাবে ব্যার্থ হব একজন পুরুষের অনেক বড় একটা আকাঙ্ক্ষার, পিতা হওয়ার, নিবৃত্তি সাধনে। আমাদের সামাজে বিয়ে বহির্ভূত সন্তান অবৈধ এবং সমাজের জন্য কলঙ্কস্বরূপ, নানা ধরনের ক্ষতির কারন ও অশুভের আমদানিকারক হিসেবে চিহ্নিত হয়। ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত “গেম অফ থ্রোন” শিরোনামের একটা মেগা টিভি সিরিয়ালে বিয়ে বহির্ভূত মিলনের ফসল, সমাজের চোখে অবৈধ সুতরাং অবিবাহিত একজনকে যুবক, সে কোন নারীর (বেশ্যা) কাছে গমন করতে ভয় পায় প্রচন্ডরকম যৌনাকাঙ্ক্ষা নিজের ভেতরে পোষণ করা সত্ত্বেও কারন সে তার মত আরেকজন অবৈধ মানুষকে কোনভাবেই সমাজে প্রবেশ করাতে চায় না (তখনকার দিনে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু ছিল না); অবৈধ হওয়ার মনোযাতনা তার মত আর কয়জন মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব! সমাজে ঐ চরিত্রটির মত অবৈধ না হয়েও অন্যের মনোবেদনার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কারনেই যতটুকু বুঝতে পারি, তাতেই সমাজের চোখে একজন জারজকে উৎপাদন করার ইচ্ছা খুব বেশী বোধ করতে পারিনা নিজের মধ্যে প্রচন্ডরকম পিতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বোধ করা সত্ত্বেও। আরেকটি বিষয় হল, পুরুষতন্ত্রে আগাগোড়া মোড়া সমাজের কোন মেয়েই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে অবিচল মেয়েদের ক্ষেত্রেও পুরুষতন্ত্রের চোখে অবৈধ সন্তানকে পেটে ধরার সাহস দেখাবে না (আমাদের সমাজে এধরনের কোন উদাহরণ এখন পর্যন্ত আমার জানামতে নেই, যদিও মাঝে মাঝে অনেক মেয়েকেই নারীর স্বাধীনতা অর্জনের তাগিদে রাস্তায় নামতে দেখা যায়)

দুর্ঘটনাবশত প্রেমের ফসলকে কেউ নিজের গর্ভে ধারণ করে ফেললেও বুঝে উঠার সাথে সাথে সন্তানের প্রতি তার ভালবাসার ন্যূনতম ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও যথাশীঘ্র গর্ভপাত ঘটাবে এবং যদি তা করা কোনক্রমে সম্ভবপর না হয়ে উঠে তাহলে সন্তানটি জন্মের পূর্বেই নির্ঘাত আত্মহত্যা করে বসবে(আমাদের সমাজে এধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে)। সমাজে বিয়ে বহির্ভূত সন্তান যদিও বা শত নিগ্রহ সহ্য করে টিকে থাকতে পারে, কুমারী মায়ের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও সমাজ তাকে দেয় না। পুরুষতন্ত্রের হাতে প্রতিনিয়ত ক্ষণে ক্ষণে শত শত মৃত্যুবরণ করার পূর্বেই নিজের হাতেই নিজের জীবনাবসান ঘটায়। সুতরাং মানবিক মানুষ হওয়ার ইচ্ছা পোষণে আবশ্যিকভাবেই আমাকে সন্তানের পিতা হওয়ার অধিকার হারাতে হবে এমনই একটা সমাজে আমাদের বসবাস। পাঠকের কাছে প্রশ্ন রাখি, কোনটি আমার পক্ষে উচিত কাজ হবেসন্তানের পিতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষার পরিপূরণ নাকি মানবিক বোধ সম্পন্ন মানুষ হওয়ার পথে অবিচল থাকা?

আধুনিক নারীবাদের বাইবেল কথিত “দ্বিতীয় লিঙ্গ” বইতে লেখক সিমন দ্যা বুভোয়ার (নারী) অনেকটা এরকম বলেছেন, “মানুষমাত্রেই নারী, পুরুষ নির্বিশেষেসহজাত আকর্ষণে বা মনোদৈহিকতায় কোমলতা, পেলবতা এবং স্নিগ্ধতার দ্বারা বেশীমাত্রায় আকৃষ্ট হয়;” যেগুলো নারীর শরীরেই তুলনামূলক বেশী ফুটে উঠতে দেখা যায়। পুরুষ হয়ে জন্ম নেওয়া বা অন্য যেকোন কারনেই হোক মেয়েদের প্রতি শারিরীকভাবে তো অবশ্যই, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা ধরনের নির্যাতন, নিগ্রহ ও শোষণের শিকার হওয়ার ফলবশত তাদের মধ্যে নানা ধরনের দোষত্রুটি, দাসত্ব মনোভাব জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও শারীরিক আকর্ষণের ফলশ্রুতি হিসেবেই হয়তমানসিকভাবেও তাদের সাথে মেশার আগ্রহ জন্মে। অথচ এই সমাজ ভয়ানকরকম পুরুষতান্ত্রিক হওয়ার কারনে মেয়েদের সাথে কথা বলার বা অন্তরঙ্গভাবে মেশার তেমন কোন ধরনের সুযোগ তৈরী হয় না। কারন, পুরুষতন্ত্রের চোখ রাঙ্গানিতে, আজো মেয়েরা পুরুষের তুলনায় অনেক কম ঘর থেকে বের হয়; রাস্তাঘাটে, খেলার মাঠে, নানা ধরনের পরিবহনে, শিক্ষায়তনগুলোতে (আশার কথা শিক্ষায়তনগুলোতে নারীর পাদচারণা আগের তুলনায় ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে), রেস্টুরেন্টে, ক্যাফেচাকফিস্টলগুলোতে, নানা ধরনের আড্ডার জায়গায় মেয়েদের উপস্থিতি খুবই কম। কিছুজনের উপস্থিতি যদিও বা লক্ষ্য করা যায়, অন্তত কাজের জায়গাগুলোতেও তাদের সাথে অন্তরঙ্গ হতে ভয়ানক রকম জড়তা এবং বাঁধো বাঁধো বোধ করি; কারন দেখা যায়, এদের মধ্যে কিছুজন বিবাহিত বা অধিকাংশই অন্য পুরুষের সাথে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কথিত প্রেমভালোবাসায় (পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রেমভালোবাসা মূলত পুরুষটা কোন একজন মানুষের শরীরমনের মালিক হওয়ার এবং নারীর ক্ষেত্রে কোন একজন মানুষের কাছে নিজের শরীরমনের অধিকার সম্পূর্ণরূপে দিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বা আকাঙ্ক্ষার সাথে মিশ্রিত এক ধরনের মনোদৈহিক বাসনা বৈ কিছু নয়।) জড়িত। আর বিবাহিতরা তো তাদের দাসমালিক সম্পর্ককে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নথিভূক্ত করে ফেলেছে। ফলে, মেয়েদের সাথে নিবিড়ভাবে মিশতে ইচ্ছা হলেই মনে হতে থাকে এমন একজন মানুষের সাথে আমি কথা বলছি বা মেশার চেষ্টা করছি যার শরীরমনের মালিক সে নিজে নয় অপর একজন। কারো সাথে কথা বলতে গিয়ে প্রতিনিয়ত মাঝখানে অদৃশ্য শক্তিমান আত্মার মত আরেকজনের উপস্থিতি টের পাওয়ার অভিজ্ঞতাটা কারো কাছেই নিশ্চয় সুখকর হবে না। আমার কাছেও তা একধরনের বিড়ম্বনার মতই মনে হয় এবং সেই অদৃশ্য শক্তিমান আত্মাটির যেকোন মুহুর্তে আমার উপর হামলে পড়ার আশঙ্কায় ভীত হয়ে থাকি সবসময়। এই যে এরকম মনে হওয়া তা শুধু শুধু নয়, নানা ধরনের ঘটনাউপঘটনা আমার মধ্যে এধরনের মনে হওয়ার ছাপ জোরালোভাবে মেরে দিয়েছে। কোন রকমশর্তহীনভাবে কাছে পাওয়ার বাসনাটাকেই প্রেমভালোবাসার একমাত্র এবং উৎকৃষ্ট সংজ্ঞা বলে মানি। অথচ আমাদের সমাজেপুরুষতন্ত্রের সদর্প উপস্থিতি থাকা পর্যন্ত সেরকমটি হওয়ার কোন জো নেই। সমাজে পুরুষতন্ত্রের উপস্থিতির কারনেই সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত যারা তাদের সাথে মেশার সুযোগটুকুও হারাই।

এর পরেও উপরের শিরোনাম দেখে কোন পাঠকের চমকে উঠার আর কোন বাড়তি কারন থাকতে পারে বলে মনে হয় না।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s