জন এম. কোয়েইটজি

অনুবাদ: বখতিয়ার আহমেদ

m-j-coetzeeনাথানিয়েল হ্যাথর্ন তার ‘স্কারলেট লেটার’এ লিখেছিলেন, “একটি উপনিবেশ যখন কোথাও শেকড় গাড়ে, নিতান্তই বাস্তব প্রয়োজনে, একেবারে শুরুতেই যে পদক্ষেপটি নেয় তা হল অধিকৃত ভূমির একটি অংশে গোরস্থান এবং আরেকটি অংশে কারাগার স্থাপন”। উপনিবেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকাও এর ব্যতিক্রম নয়, দেশটির সারা মুখ জুড়ে গুটি বসন্তের দাগের মত ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কারাগার, হ্যাথর্ন যাদের নাম দিয়েছিলেন “সভ্য সমাজের কালো ফুল”। এই কারাগারগুলোর ছবি তোলা, এমনকি ছবি আঁকাও রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ। আমার জানা নেই পৃথিবীর আর কোন দেশে কারাগারের দৃশ্যরুপ পরিবেশন নিষিদ্ধ করে এরকম আইন আছে কিনা, হয়তো আছে। কিন্তু তারপরও দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে এই আইনের কিছু আলাদা প্রতীকি উপযোগ আছে। আইনানুযায়ী এই কারাগারগুলোর, যার বেশির ভাগেরই অবস্থান লোকালয় থেকে দূরে মরুভূমির মাঝখানে, আশেপাশে ক্যামেরা বহন নিষিদ্ধ। যেন এগুলোর পাশ দিয়ে যে যাত্রীরা যাবেন, পরে আর তাদের কেউই ঠিক বলতে পারবেননা আসলে কি দেখেছেন যাত্রার এই একঘেয়ে ধুসরতার মাঝখানে। শেষমেশ হয়তো বিভ্রম হিসেবেই মেনে নেবেন।

আইনটির বাস্তব প্রয়োজন অবশ্য এত জটিল নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার আইনপ্রণেতাদের একটা সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে যা কিছু তাদের শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের বিব্রত করবে, বিপত্তি ঘটাবে, সে সবকিছুকেই দৃষ্টিসীমার বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। অন্য মানুষেরা যদি ক্ষুধায় ধুঁকতে থাকে, তাহলে তাদের শহরের বাইরে মরুভূমির ঝোপেঝাড়ে পাঠিয়ে দেয়া হোক যাতে তাদের পড়ে থাকা শীর্ণকায় শরীরগুলো দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন না করে। যদি তাদের কাজ না থাকে, দলে দলে আসতে থাকে শহরের দিকে, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়া হোক, কারফিউ দেয়া হোক, নতুন আইন হোক ভিখারি, ভবঘুরে আর শহরের অবৈধ বাসিন্দাদের ঠেকাতে, আইন ভঙ্গকারীদের কয়েদ করা হোক দূরে কোথাও, দৃষ্টি ও শ্রবণের বাইরে। যদি কালাদের কোন বস্তিতে আগুন লাগে, কোন ক্যামেরা যেন সেখানে না যায় (ছবিহীন সংবাদ অনেক বেশি সহনীয় ঠেকে শ্বেতাঙ্গ পাঠকের কাছে, ফলত পরিস্থিতিও আরো স্বস্তিকর ও সহনীয় হয়ে উঠে!)। মোটামুটি এই হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার আইন ও শাসন ব্যবস্থার কর্ম ও যুক্তি পরম্পরা। কারাগার ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার আর যে জায়গাটির ছবি তোলা যায় না তা হচ্ছে জোহান্সবার্গের গুপ্ত পুলিশ সদর দপ্তর, যে চত্বরটির যথোচিত নামকরণ হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বালথাজার জোহান্স ভস্টারের নামানুসারে। ভস্টারের পৃষ্ঠপোষকতাতেই এই কুখ্যাত সংস্থাটি বর্তমানের এই মূর্তিমান বিভীষিকার ইমেজটি গড়ে তোলে। ভস্টার চত্বরের এই ভবনে বিগত কয়েক যুগে অজানা সংখ্যক রাজবন্দীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। বলা বাহুল্য যে তারা সবাই জীবিত ফেরেনি। এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য ক্রিস্টোফার ভ্যান উকের “ইন ডিটেনশন” কবিতাটি:

সে পড়ে গেছে নয় তলা থেকে।

সে ফাঁস লাগিয়ে মরেছে নিজের গলায়।

সে মরেছে বাথরুমে সাবানে পা পিছলে।

সে মরেছে গলায় ফাঁস লাগিয়ে।

সে মরেছে এক টুকরো সাবানে পা পিছলে।

সে মরেছে নয় তলা থেকে পড়ে।

সে ফাঁস লাগিয়ে মরেছে নয় তলায়।

সে পড়েছে নয় তলা থেকে সাবানে পিছলে পা।

সে ঘুমের মধ্যে পড়ে গেছে সাবান থেকে।

সে ফাঁস লাগিয়ে মরেছে নয় তলায়।

সে ধুয়ে গেছে নয় তলায় ঘুমের মধ্যে।

সে গা ধুতে গিয়ে ফাঁসি নিয়েছে সাবানের সাথে।

গুপ্ত পুলিশের হেফাজতে এই তথাকথিত আত্মহত্যা বা অপমৃত্যুর বিবৃতিমালা, ভ্যান উক যেগুলো গেঁথেছেন নিজের কবিতায়, সরকারী সংস্থা কর্তৃক মৃতদেহগুলোর দায়সারা গোছের ময়নাতদন্ত ও তার প্রহসনমুলক রিপোর্ট ইত্যাদি মিলিয়ে এই জায়গাটির উপরেও ছড়িয়ে আছে যন্ত্রণা আর আতঙ্কময় বাস্তবতার এক নিশ্চলনিষ্ঠুর চাদর। ভ্যান উকের এই কবিতা তাই নরকের দরজায় আগুন হাতে ব্যঙ্গ নৃত্যের শামিল, কোন মৃত্যুর নয়, এ হচ্ছে সংবাদ মাধ্যমে দেওয়ার জন্য পকেটে তৈরি রাখা পুলিশি বিবৃতিগুলোর প্যারোডি।

বছর কয়েক আগে আমি নিজেও “ওয়েটিং ফর দ্য বারবারিয়ান” নামে একটি উপন্যাস লিখেছি একজন নীতিবোধতাড়িত মানুষের জীবনে এরকম একটি টর্চাররুম অভিজ্ঞতার অভিঘাত নিয়ে। আমি একা নই, টর্চার রুমের অন্ধকার আকৃষ্ট করেছে আরো অনেক দক্ষিণ আফ্রিকান লেখককে। এর কারণ কি? আমার মনে হয় এর সম্ভাব্য কারণ দুটি। একদিকে এই টর্চার রুমের মধ্য দিয়ে কর্তৃত্ববাদ ও তার শিকারদের সম্পর্ক একটি নগ্ন ও তীব্র প্রতীকি ব্যঞ্জনা পায়। অন্যদিকে এই সেই স্থান যেখানে আইনি বৈধতার ছত্রছায়ায় সীমাহীন অবৈধ বলপ্রয়োগ করা হয় একজন ব্যক্তি মানুষের শারিরীক অস্তিত্বের উপর যার লক্ষ্য তাকে ধ্বংস করা না হলেও নিদেন পক্ষে তার ভেতরের প্রতিরোধের শক্তিটুকু ধ্বংস করা।

যা হোক, পাঠক আসুন রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে অভিযুক্তদের প্রকৃত অবস্থা কি হয় তাই দেখা যাক। ভস্টার চত্বরের গুপ্তপুলিশ সদর দপ্তরে তাদের উপর যা করা হয় কোন বিচারেই তা আইনসিদ্ধ নয়। আইনের ধারা অনুযায়ী, একমাত্র আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটককৃত কোন ব্যক্তির শরীরে কোন ধরনের আঘাত বা নির্যাতন করবার আইনি এখতিয়ার রাখেনা। কিন্তু আইনেরই অন্য একটি ধারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে রক্ষাকবচ হিসেবে এই ধরনের সমস্ত অভিযোগ থেকে গুপ্তপুলিশ সদস্যদের রক্ষা করে। আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, নির্যাতনের প্রমাণ দাখিল, সাক্ষী হাজির করা ইত্যাদি নানা জটিলতার কারণে কোন ভুক্তভোগীর পক্ষে পুলিশের বিপক্ষে কোন অপরাধ প্রমাণ করাই মুশকিল যদি না তারা অত্যাচার করবার ক্ষেত্রে একবারে অভাবিত রকমের অসতর্ক থাকে। অসহায় সন্দেহভাজন বন্দীরা জানে যে তাদের উপর পুলিশ যাই করুক না কেন, কিছুতেই পুলিশের কিছু হবে না এবং এ কথাটি এই বর্বরদেরও জানা আছে। আর এভাবেই টর্চার রুমগুলো হয়ে উঠে বিকৃতকাম বর্বরদের ক্রীড়াক্ষেত্র যেখানে তারা সব ধরনের নৈতিক বা শারীরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে আরেকজনের শরীরের উপর নিজের বিকৃত কল্পনার পুরোটাই চরিতার্থ করতে পারে।

টর্চার রুম তাই প্রকৃত প্রস্তাবে একটি অতিমানবিক অভিজ্ঞতার জায়গা যেখানে নিপীড়ক ও নিপীড়িতের মধ্যবর্তী কোন শক্তি নেই যা এই অতিমানবিক জিঘাংসাকে রোধ করতে পারে আর এটাই সম্ভবত দ্বিতীয় কারণ যা একে দক্ষিণ আফ্রিকার উপন্যাসিকদের মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। “ডাবলিং এন্ড ইনসেস্ট/রিপিটেশন এন্ড রিভেঞ্জ: এ স্পেকুলেটিভ রিডিং অফ ফকনার” শিরোনামে ফকনারের উপন্যাসের বিচারমূলক পাঠ দাঁড় করাতে গিয়ে জন টি ইরউইন টর্চার রুমের সাথে উপন্যাসিকের এই সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেন এভাবে “তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠের দরজার সামনে, ভিতরে যাওয়ার উপায় তার নেই, একজন উপন্যাসিক হিসেবে তাকে কল্পনা করে নিতে হয় দরজার ওপাশে কি ঘটে। প্রকৃতপক্ষে, ভিতরে প্রবেশের অক্ষমতাই ডালপালা মেলতে সাহায্য করে তার ভেতরের কল্পনাকেবলতে গেলে শিল্পের ভ্রুণকে।” একই সাথে ফ্রয়েড ও হেনরী জেমসের অনুগামী হিসেবে ইরউইন উপন্যাসিককে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন যিনি এই বদ্ধ দুয়ারের সামনে দঁড়িয়ে মুখোমুখি হন এক অমোঘ নিষেধাজ্ঞার, এই নিষেধাজ্ঞা যে দৃশ্য তার কাছ থেকে ঢেকে রাখে, তিনি নিজের মনে তৈরি করেন তার প্রতিরূপ, সৃষ্টি করেন দৃশ্যের সম্ভাব্য সব চরিত্র এমনকি তাদের এই টর্চার রুমে আসবার ইতিবৃত্ত পর্যন্ত। কাজেই টর্চার রুম কেন আফ্রিকার উপন্যাসিকদের নিজের সামনে টেনে আনে, আমার এই প্রশ্নের উত্তর বোধ করি এভাবে দেওয়া যায় –এই নিষেধাজ্ঞার দেয়ালে ঢাকা, কদর্য, কুহেলিকাময় গুহাগুলো তৈরি করে রাষ্ট্রই উপন্যাসিকের কল্পনার ভিত গড়ে দেয়, উপন্যাসে বাস্তবতার প্রতিরূপায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত হাজির করে।

এভাবে রাষ্ট্রের কদর্য গুহাগুলোর রহস্যময়তাকে সাহিত্যিক কল্পনার উপলক্ষ করাটা কিছুটা অস্বস্তিকরও বটে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় এসব বিষয়ে নিজেকে জড়াবেন কি জড়াবেন না সেটা একজন লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হচ্ছে তিনি এর অশ্লীল ও কদর্য দিকগুলো উপেক্ষা করবেন নাকি নিজের প্রতিরুপায়নে নিয়ে আসবেন সেগুলোও। কিভাবে লেখক এই খেলায় রাষ্ট্রের নিয়মের বাইরে থেকে নিজের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করছেন, নিজের কল্পনায়, ভাষায় কিভাবে এই পাশবিক নির্যাতন আর করুণ মৃত্যুগুলো ফুটিয়ে তুলছেন সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মনে হয়। নিপীড়কের মুখাবয়ব তৈরি করতে গিয়ে লেখক প্রায় একই রকম জটিল দ্বিতীয় একটি সমস্যাটিতে পড়েন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ন্যুরেমবার্গ বিচার বা জেরুজালেমে এডলফ আইখম্যানের বিচারের সময় অপরাধীদের পিগমি সদৃশ্য অবয়বের ক্ষুদ্রতা আর কৃত অপরাধের পর্বতপ্রমাণ রূপের বিস্ময়কর বৈসাদৃশ্য আমাদের একটি নৈতিক প্যারাডক্সের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। একই প্যারাডক্সের ছায়া আমরা দেখতে পাই দক্ষিণ আফ্রিকার দুটি ঘটনায় –১৯৭৭ সালে পুলিশি হেফাজতে কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তি আন্দোলনের কর্মী স্টিভ বাইকোর মৃত্যু এবং ১৯৮২ সালে একই জায়গায় নেইল অ্যাগেট নামে কালোদের ট্রেড ইউনিয়নের একজন শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তার তথাকথিত আত্মহত্যা। এই দুটি ঘটনার বিচার দায়ীদের শাস্তি না দিতে পারুক কিন্তু গুপ্ত পুলিশকে অন্ধকারের আড়াল থেকে জনগণের সামনে নিয়ে এসেছিল তাদের যাবতীয় কীর্তির বর্ণনাসহ।

লেখক তাহলে টর্চার রুমের এই নিপীড়কদের কিভাবে পরিবেশন করবেন তার পাঠকদের সামনে? গুপ্তচর কাহিনীর কায়দা যদি তিনি এড়িয়ে যেতে চান, তিনি যদি তাদের শয়তানের প্রতিমূর্তি বা ব্ল্যাক কমেডির চরিত্র বা মুখাবয়বহীন যন্ত্রমানব কিংবা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই কাজে নিয়োজিত ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন না করেন তাহলে তার সামনে আর কোন রাস্তাই বা খোলা থাকে?

কাজেই টর্চার চেম্বারের কাল্পনিক রাস্তা সব সময়ই জটিল ধাঁধাঁর মত এবং অসংখ্য খানাখন্দে ভরা। ফলে একাধিক লেখকই এতে আছড়ে পড়েছেন বা পথ হারিয়েছেন। একটা উদাহারণ দেয়া যাক, ১৯৭৬ এর অভ্যূত্থানকে ঘিরে রচিত সিফো সেপামলার উপন্যাস “এ রাইড অন দ্য হুইর্লউইন্ড” প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। এ উপন্যাসের এক জায়গায় তিনি টর্চার রুমে বোনগি নামের এক নারীর উপর পুলিশি নির্যাতনের বর্ণনা লিখছেন এভাবে– “বোনগির জীর্ণ বক্ষবন্ধনিটি খুলে ফেলা হলে তার স্ফীত স্তন আর স্তনবৃন্ত উম্মুক্ত হয়ে পড়ল দুই পুলিশের সামনে…. ঠান্ডা মাথায় লোহার সাঁড়াশিটি এবার এক বৃন্ত থেকে ছাড়িয়ে অন্য স্তনের বৃন্তে রেখে সজোরে চাপ দিল পুলিশটি। বোনগি আবারও যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল, তার কোমল, বাদামি গাল বেয়ে বেয়ে পড়ছে অশ্রু।” পৈশাচিক অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে সেপামলা শেষ পর্যন্ত যৌনতার আশ্রয়ই নিচ্ছেন! শুধু তাই নয়, তার বর্ণিত নিপীড়কেরা একাধারে যেমনমূর্তিমান শয়তান, তেমনি অতি সহজেই যেন মানবিক হয়ে উঠছে– “তরুণ পুলিশটি অসুস্থ বোধ করছিল…. তার সাজসজ্জার গভীরে একটি ক্ষীণ মানবিকতার অন্তস্রোত ছিল…. সে ছিল দ্বৈতসত্তায় বিভাজিত। তার কাজের ধরণটি ছিল এমনই যে স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্যই নিজের সত্তাকে ভেঙ্গে দুই টুকরা করা ছাড়া আর উপায় ছিলনা।”

এই একই অভ্যূত্থান নিয়ে একই সনে প্রকাশিত হয় মনগানে সেরোতের উপন্যাস “টু এভরি বার্থ ইট্‌স ব্লাড” যা সেপামলার উপন্যাসের চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি শক্তিশালী। অত্যাচারী পুলিশটি শয়তান নাকি মানুষ এই জাতীয় পলকা বিচারে তিনি যেতে নারাজ। তিনি নিজেকে বেঁধে রাখেন অত্যাচারের বাস্তব শারিরীক অভিজ্ঞতার মধ্যেই। শুধু তাই নয়, টর্চার চেম্বারের ভীতিকর সেই আবহকেও তিনি শব্দে প্রকাশের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেলেন, “ঘাম, কাগজ, তামাক আর পুরনো আসবাবের মিলিত গন্ধ যা প্রায় সব সরকারি প্রতিষ্ঠানেই পাওয়া যায়, শুধু দেয়ালে ঝুলানো সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিটি ব্যতিক্রম। অজস্র কাউন্টার আর ফাইল ক্যাবিনেটের গায়ে লেগে আছে না জানি কত মানুষের কান্না, ঘাম, বমি আর রক্তের দাগ। যারা এখানে এসে ফিরে গেছে তাদের, যারা আর ফিরে যেতে পারেনি তাদেরও। সেই সব মানুষদের আত্মা যেন ভেসে বেড়ায় এই ছোট্ট প্রকোষ্ঠের বাতাসে, রক্ত বা বমির দাগের মত যাদের কখনই সাফ করা যাবেনা।”

বোঝাই যায় যে এই লেখাগুলোর এক ধরণের তমসাচ্ছন্ন কাব্যিকতা আছে যা আরো অনেক বেশি ফুটে উঠেছে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত নিপীড়ন আর প্রতিরোধ নিয়ে লেখা অ্যালেঙ্ লা গুমার উপন্যাস “ইন দ্য ফগ অফ সিজনস্‌ এন্ড” এ। ফ্লবার্টের সময় থেকে এই ধরনের বাস্তবধর্মী উপন্যাসগুলো সমালোচনার মুখে পড়েছে নীচতা, কুৎসিত ও কদর্যতার প্রতি ঝুঁকে পড়বার দায়ে। উপন্যাসিক যদি এই কদর্যতার মাঝেই তার কাব্যিক প্রকাশের উপলক্ষ্য খুঁজে পান তাহলেই কি তাকে শিল্পের গায়ে কাদা মাখানোর দায়ে অভিযুক্ত করা যায়? লেখালেখির একেবারে শুরু থেকেই লা গুমা, এই অবহেলিত, নির্বাসিত লেখক সম্প্রতি মৃত্যু যার নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনেছে কিউবায়, নিজের গদ্যে কেপ টাউনের বৃষ্টি ভেজা, আবর্জনাময় বস্তির গভীর বিষন্ন জীবনের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নিরাপত্তা পুলিশকে তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেন, তার সাধারণ, অগভীর চিত্রের মধ্যেও কাব্যিকতার একটি গভীর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। পুলিশকে অশুভ ও শয়তানের প্রতিমূর্তি হিসেবে উপস্থাপনের প্রচলিত ফাঁদ এড়িয়ে তিনি প্রায় সমান আতঙ্ক ছড়িয়ে দেন তাদের পারিপার্শ্বিক সমতলের বিমূর্ত গভীরতায়: “পালিশ করা জানালার পাশে কর্কশ আসবাব আর সরকারী চিত্রকলা যেন আতঙ্কেরই আরেক মাত্রা….এই স্বাভাবিক চিত্রের উপর ধুলোআবর্জনার স্তর যেন মাকড়শার জালের মত ভয়াবহ এক সুপ্ত বাস্তবতা ছড়িয়ে দিয়েছে।” পুলিশের এই জিজ্ঞাসাবাদকারীদের জগতকে একটি কৃত্রিম আবহ বা তমসাচ্ছন্ন কাব্যিকতা দিয়ে প্রকাশ যে শুধুমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকার লেখকেরাই করেছেন তা নয়। গিলো পন্টেকরভোর চলচ্চিত্র “দ্য ব্যাটল অফ আলজিয়ার্স”ও এই একই সমালোচনার আওতায় চলে আসে। আমি বলছি না যে অত্যাচারের স্বরূপকে কোনভাবে ছোট করে দেখাতে হবে, বরং আমি শুধু এর একটি ব্যতিক্রম হিসেবে বলতে চাই ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ব্রেটেন ব্রেটেনবাখের “ট্রু কনফেশন অফ এন আলবিনো টেরোরিস্ট” এর কথা যেখানে তিনি নিজের অভিজ্ঞতায় নিবিড় পর্যবেক্ষনে পাঠককে একটি মানস জগতের হদিস জানান যেখানে এই পুলিশদের বসবাস। তিনি তাদের দেখিয়েছেন এক একটি থেঁতলে যাওয়া মানব সত্তা হিসেবে যারা সকাল বেলা নাস্তা সেরে সন্তানদের চুমু খেয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসে অফিসে, এই নির্মম অত্যাচার শুরু করতে। এই পরিবেশনের ফলে উপন্যাসটি অনেক বেশি প্রামান্য হয়ে উঠে। কোন কোন ক্ষেত্রে যদিও এই টর্চার রুমের ভিতরের বাস্তবতায় কাল্পনিক অনুপ্রবেশ নিয়ে ব্রেটেনবাখ চতুর সন্দেহে ভোগেন, তারপরও তিনি তার কাব্যিক কল্পনাকে ছড়িয়ে দেন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার আনাচেকানাচে, তার ভাষায়, “অন্তরীণ প্রকোষ্ঠে, যেখানে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ক্রমাগত চরম নিঃসঙ্গ কিছু মানবিক সত্তার জন্ম দিয়ে চলে।”

যদিও নাদিম গর্ডিমারের কোন সৃষ্টিই রাজনৈতিক মাত্রাহীন নয়, তবু তার লেখায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার গোপন জগতের কোন প্রত্যক্ষ বিবেচনা নেই। কিন্তু তারপরেও তার উপন্যাস “বারগারস ডটার”এর একটি অধ্যায়ে আমরা একই নৈতিক বিবেচনার ক্ষেত্র পেয়ে যাই যা আমি আমার এই লেখায় তুলে ধরবার চেষ্টা করছি। এই অধ্যায় পড়তে গিয়ে নিঃসন্দেহে পাঠকের মনে পড়ে যাবে দস্তভয়স্কির “ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট”এর কথা।

উপন্যাসটির মুখ্য চরিত্র রোজা বার্গার জোহান্সবার্গ শহরের উপকন্ঠে ঘোড়ার পিঠে আনমনা হয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখে একটি গাড়িতে গাধা জুড়ে তাতে চেপে বসেছে তিন সদস্যের এক পরিবার। গাড়ি চালাতে চালাতে কর্তাটি নির্মম চাবুক চালিয়ে যাচ্ছে সেই গাধার পিঠে। সেখানে লেখকের বর্ণনা, “প্রতিটি আঘাত যেন খসে পড়ছে আঘাত করবার নির্মম ইচ্ছে থেকে, এই ইচ্ছে থেকে খসে পড়া চাবুকের যেন নিজেরই একটি আলাদা শক্তি আছে, এ যেন অত্যাচারীর ইচ্ছা নিরপেক্ষ অত্যাচার, নিপীড়কহীন নিপীড়ণ, হাজার বছর ধরে মানুষ নিজের যে নৃশংসতাকে বশে আনবার চেষ্টা করছে, সেটাই যেন চলে গেছে মানবিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে।”

এই দৃশের সামনে রোজা বার্গারের প্রতিক্রিয়া কি হবে? সে কি এই চাবুক থামাবে, নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে কি তাকে আটক করাবে পুলিশ দিয়ে, দাঁড় করাবে বিচারের সামনে? কিন্তু তাতে লাভ কি? এই “গরিব, বর্বর, কালা আদমি” কি বুঝবে নিষ্ঠুরতাহীন জীবনযাপনের মর্ম, সে কি বুঝবে যে অপরকে আঘাত করবার অর্থ নিজেকেই আঘাত করা? অথবা সে খুব সহজে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারে, যা করছে করুক এই লোকটি। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তাকে এ সন্দেহ নিয়েই বাঁচতে হবে যে তার চলে আসার কারণ এই যে যদি লোকটি তাকে ভাবে রোজা “সেই সব শাদা মানুষদের একজন যাদের মানুষের চেয়ে জানোয়ারের জন্য মমত্ববোধ অনেক বেশি।” শেষ পর্যন্ত রোজা ঘোড়া হাঁকিয়ে চলে যায় এবং তার কদিন পরেই দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করে, যেখানে তাকে প্রতিদিনই এরকম হাজারো অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। ভুল হবে যদি এই অধ্যায়টি কেউ সংকীর্ণ প্রতিকী অর্থে পাঠ করেন। চালক এবং ঘোড়া এখানে অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের রূপক নয়। নাদিমের “নিপীড়কহীন নিপীড়ণ” শব্দবন্ধটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। রোজার স্মৃতিতে এই গাধার পিঠে বৃষ্টির মতো চাবুকের শব্দ চিরকাল বাজতে থাকবে, ভেসে উঠবে প্রাণীটির যন্ত্রণাকাতর মুখ। এই দৃষ্টিভঙ্গীর পেছনে আমরা যেন নৈতিকতার উর্ধ্বে থাকা দান্তের নরকের ছায়া দেখতে পাই। কারণ নৈতিকতামাত্রই মানবিক, কিন্তু যে চাবুক চালাচ্ছে এবং যার পিঠে তা পড়ছে দুজনই এখানে সেই মানবিকতার বাইরের অস্তিত্ব, এক কঠোর, অমানবিক জগতের বাসিন্দা। তিনি রোজা বার্গারকে নিজের জায়গাতেই রেখেছেন, মানবিকতার আওতাতেই। দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করবার মধ্য দিয়ে রোজা মূলত পালাতে চায় তার অস্তিত্বের সমান্তরাল কিন্তু ভয়াবহ বিপরীত এক জগতের কাছ থেকে, জোহান্সবার্গ থেকে আধ ঘন্টা ঘোড়া ছোটালেই যে জগত, অন্ধ শক্তি আর নিঃশব্দ কাতরতার এক জগত, ভালমন্দ বিবেচনার যে রীতি, তা এখানে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক।

নিজের ভেতরের এই অন্ধকার মুহুর্তগুলো কিভাবে পেরিয়ে যাবে রোজা, উপন্যাসের পরের অধ্যায়গুলোতে গর্ডিমার এই প্রশ্ন নিয়েই নাড়াচাড়া করেছেন। তারপর দেখা যায় এক সময় রোজা ফিরে এসেছে তার জন্মভূমিতে এবং অপেক্ষায় আছে এই অন্ধকার থেকে মানবিক মুক্তির। এটা কোন কৃত্রিম আশাবাদ নয়, না রোজার, না গর্ডিমারের। কোন বিপ্লব এই নিষ্ঠুরতা বা যন্ত্রণার অবসান ঘটায় না, এমনকি হয়তো নিপীড়নও থামায় না। রোজা অপেক্ষায় থাকে কবে পুরো সমাজের অবয়ব জুড়ে প্রকৃত মানবিকতা জারি হবে, সমস্ত মানবিক কর্ম, এমনকি প্রানীর সাথে মানুষের আচরণ পর্যন্ত দায়বদ্ধ থাকবে সেই নৈতিকতার কাছে। সেই সমাজেই কেবলমাত্র নিপীড়নের প্রতি লেখকের, কর্তৃত্বের, কর্তৃত্বপূর্ণ বিচারের দৃষ্টি স্বচ্ছ হবে, অর্থবহ হবে। অত্যাচারকে পর্যবেক্ষণ তখন শুধু আর ভয়ঙ্করের মোহদৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনা, উপন্যাস জীবনের পুরো জমিনটুকুই বিচরণের ক্ষেত্র হিসেবে পেয়ে যায়, এমনকি অন্ধকূপকেও একটি জায়গা সেখানে করে দেওয়া যায়।।

(অনেক পুরানা অনুবাদ। ২০০৩ সালে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত। তখন বুঝিনি অনুবাদটা এক দশক পরের বাংলাদেশের জন্য এত প্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। সে সময় লেখাটা অনুবাদের জন্য হাতে তুলে দিয়েছিলেন যুগান্তরের তৎকালিন সাহিত্য সম্পাদক শহীদুল ইসলাম রিপন। আর এখন অনলাইনে তোলা গেল বন্ধু লুনা রুশদির উসকানিতে। অনুবাদক)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s