লিখেছেন: আনোয়ার হোসাইন ফার্মার

জিন কি?

monsantoপৃথিবিতে ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত যত জীবন আছে প্রত্যেকেরই দেহকোষে ডিএনএ নামক রাসায়নিক পদার্থ আছে। অন্যভাবে বললে, ডিএনএ ছাড়া কোন জীব বা জীবনের অস্তিত্ব নেই। যে কোন জীবের জন্মগত সকল বৈশিষ্ট্য এই ডিএনএ দ্বারাই নির্দিষ্ট হয়। যেমন ধরা যাক, একটি আম গাছ, তার সমস্ত দৈহিক বৈশিষ্ট্য, পাতার আকার, ফলের আকার, কাঠের ঘনত্ব, ফলের মিষ্টতা এর প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট হয় এক বা একাধিক নির্দিষ্ট প্রোটিনের ওপর! এক্ষেত্রে একএকটি নির্দিষ্ট প্রোটিন উৎপন্ন হবে কিনা, হলে কতটা পরিমানে হবে তা নির্ভর করে সুত্রের আকারের ডিএনএ অনুর এক একটি অংশের ওপর। ডিএনএ এই রকম এক একটি অংশকে বলে জিন। দেহকোষের ক্রোমাজোমে অবস্থিত এই জিনগুলিই জীবের জন্মগত যাবতীয় বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। জীব যত উন্নত হয়েছে, তার দেহকোষে জিনের সংখ্যাও তত বেড়েছে।

জিন কি সম্পদ?

প্রযুক্তির উন্নতির ফলে কোন একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক জিনকে সনাক্ত এবং অপসারণ করে অন্য প্রজাতির একটি জীবের দেহকোষে স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে বর্তমানে। যেমন ধরা যাকজোনাক পোকার আলোর জন্য দায়ী জিনটিকে আলাদা করে যে তামাক গাছ তৈরি হয়েছিলো তাতে রাতের বেলা আলোর বিকিরণ ঘটে। এই প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে বিভিন্ন প্রজাতির নানান বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক অসংখ্য জিনকে অর্থনৈতিক উৎপাদনের কাজে লাগানো সম্ভব হলো। একত্রে যে জীবটির অর্থনৈতিক মুল্য দুই পয়সাও ছিলোনা, ক্ষেত্রবিশেষে সেটিই হয়ে উঠলো অর্থনৈতিকভাবে মহামুল্যবান! অন্যভাবে বলতে গেলে, উদ্ভিদ বা প্রাণী জগতে অর্থনৈতিকভাবে মুল্যহীন বলে কিছু রইলো না আর! যেমন ধরা যাক, একটি ব্যাঙের কোন অর্থনৈতিক মুল্য ছিলো না একশো বছর আগে। বা উৎপাদন পক্রিয়ায় এর কোন ভূমিকাই ছিলোনা প্রধানত। কিন্তু যখনই আলুর পচনরোধক হিসেবে ব্যাঙের একটি জিন আলুতে প্রতিস্থাপিত করা হলো তখন পরোক্ষভাবে ব্যাঙই হয়ে উঠলো অর্থনৈতিকভাবে মহামুল্যবান। যাতে শুধু ব্যাঙ নয়, বরং ব্যাঙের একটি ডিমের অর্থনৈতিক মূল্যও হতে পারে কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলার।

সম্পদের সংজ্ঞা অনুযায়ী যে সব প্রাকৃতিক উপাদান কোন না কোনভাবে এমনকি পরিবর্তিত রুপেও মানুষের কাজে লাগে বা চাহিদা মেটায় তাই সম্পদ। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এ পর্যায়ে এসে অনায়াসেই বলা যেতে পারে ‘প্রতিটি জীব মানেই সম্পদ’। যেহেতু অদূর ভবিষ্যতে এ জিন প্রতিস্থাপন পক্রিয়া আরো বহুগুণে বাড়বে, এবং বিজ্ঞানীরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে নিবেন প্রয়োজনীয় এবং কাঙ্খিত জিনটিকে। আর এ জন্যই এখন থেকে প্রতিটি জীব বা উদ্ভিদকে সম্পদ ঘোষনা করে সংরক্ষ করতে হবে অদূর ভবিষ্যতে জিন সম্পদ সংগ্রহের জন্য!

জিন সম্পদের ভাণ্ডার ও রক্ষণাবেক্ষণ

বাংলাদেশের সুন্দরবনেই আছে অন্তত বিশ হাজার প্রজাতির জীবন! অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত থাকলে যা প্রাকৃতিকভাবেই টিকে থাকবে হাজারহাজার বছর। এক্ষেত্রে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, গত একশো বছরে বনের আয়তন কমেছে অর্ধেক! এবং পরিবেশপ্রকৃতি বিনষ্টের ফলে বিলুপ্ত হয়েছে বহু প্রজাতির উদ্ভিদ, মাছসহ বিভিন্ন প্রাণী বৈচিত্র্য। যা নিঃসন্দেহে অপূরণীয় ক্ষতি। এছাড়া উদ্ভিদ বা জীবের জার্মপ্লাজমকে (যেমন বীজ, পরাগ, কন্দ, শুক্রাণু, ডিম্বাণু ইত্যাদি) কৃত্তিম উপায়ে ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষ করা হয়। ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণের পর উক্ত জীব বা উদ্ভিদ প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট জীবের জিন ব্যবহারে অসুবিধা নাই। এক্ষেত্রে জিনবাহী প্রজাতির কয়েকটি কোষ যদি পরিক্ষাগারের কালচার মিডিয়ামে রাখা থাকে, তাহলেই সেই বিশেষ জিনকে ব্যবহার করা যাবে। আর এভাবেই জীবকে অতিক্রম করে জিনই হয়ে উঠলো প্রধান সম্পদ।

তবে জিনকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক শ্রমের প্রকৃতি অত্যন্ত জটিল। জীববিজ্ঞানের উচ্চতর পাঠ্যপুস্তকের সাথে সম্যক পরিচয় না থাকলে এই জটিলতা উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। “আনুবীক্ষণিক দেহকোষের এক ক্ষুদ্র অংশ নিউক্লিয়াস, তার মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার জিন। বাহ্যিক গড়ন দেখে দুটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক জিনের মধ্য পার্থক্য বোঝা অসম্ভব। এ প্রার্থক্য আছে তাদের রাসায়নিক প্রকৃতিতে বা ভিন্ন ভিন্ন প্রোটিন তৈরির ক্ষমতায়। অতি জটিল ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিপুল জিনের ভিড় থেকে এক একটি নির্দিষ্ট জিনকে পৃথক করতে হয়, ততোধিক জটিল এক প্রক্রিয়ায় ঐ বিচ্ছিন্ন জিনটিকে অপর কোন জীবের কোষে প্রতিস্থাপিত করতে হয়। মোটামুটি কথা হলো এ কাজের জন্য পরিকাঠামো, পুঁজি ও মেধার এক বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। উদারহণ স্বরুপ বলা যেতে পারে, তেঁতুলের টকের জন্য দায়ী জিনটিকে মিষ্টি লাউয়ে প্রতিস্থাপন করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে এ ধরণের একটি ল্যাবরেটরিজে যে স্বচ্ছজলের বন্দোবস্ত করা লাগবে তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনেও দরকার বিশপঁঞ্চাশ কোটি টাকা। যা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো খরচ করে থাকে আরো ততোধিক মুনাফা অর্জনের জন্য।”

কিন্তু সময়ের দাবি হচ্ছে শুধু বহুজাতিক কোম্পানি নয়, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এ সম্পর্কে আমাদেরও বিস্তর জানতে হবে এক্ষুনিই। একশো বছর আগে আমাদের এসব নিয়ে না ভাবলেও চলতো, তখন কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রধান শর্তই ছিলো প্রাকৃতিকভাবে সংকরায়ন এবং হাজারহাজার জাতের মধ্য থেকে উচ্চফলনশীল জাতটিকে বেছে নিয়ে ঠিক মৌসুমে চাষাবাদ করা। এবং এ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সি (প্রজাতিকে প্রাকৃতিকভাবে সংকরায়ণ বা বিকশিত করার পদ্ধতি বিশেষ) বাড়িয়ে উচ্চফলনশীল সংকর জাত তৈরি করা।

কিন্তু পুঁজির বিকাশের পাশাপাশি বিকাশ ঘটেছে মুনাফার কলাকৌশলেরও। এবং উদ্ভিদ বা জীব হয়ে উঠেছে শুধুমাত্র পণ্য! এক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে পরিস্থিতি আরো পাল্টে গেছে আমাদের অগোচরে। উদ্ভিদের জায়গা দখলে নিয়েছে উদ্ভিদের জিন। জিন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং চিহ্নিতকরণ ও পূণরায় প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া আমাদের মতো দরিদ্র এবং সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাকগোষ্ঠি কর্তৃক ক্ষমতা দখলে থাকা দেশগুলোকে ঠেলে দিয়েছে বিপদের মুখেও।

উদ্ভিদের উৎপাদন ক্ষমতা ও জিন

কোন উদ্ভিদের উৎপাদন ক্ষমতা নির্ভর করে তার সালোকসংশ্লেষের হারের উপর এবং তার সালোকসংশ্লেষের ফলে উদ্ভুত পদার্থের কতটা তার ফল বা বীজ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে তার উপরে। যা সনাতন সংকরায়ন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে উৎকর্ষের শেষ সীমা স্পর্শ করা হয়েছিলো আগেই। ফলে বহুজাতিক বীজ কোম্পানিরা জিন প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধির স্বপক্ষে যত কথাই বলুক না কেন, আদতে নতুন করে উৎপাদন বাড়ানোর দাবি অযোক্তিক, অবৈজ্ঞানিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আর ক্ষেত্রবিশেষে যেটুকু উৎপাদন বাড়তি হচ্ছে তার জন্য কৃষককে উচ্ছমুল্যে বীজ কেনা থেকে শুরু করে সারকীটনাশক কেনা বাব দায় পরিশোধও করতে হয় অনেক বেশি। এবং তা বহুজাতিকের কৃতিত্বও নয়, কোনমতে

কৃষিতে বহুজাতিকের আধিপত্যের সূচনা

rice-farmerকৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের সূচনা হয় ষাটের দশকে। এ সময় ফোর্ড ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ও ইউএস এইডের টাকায় গঠিত কনসালটেটিভ গ্রুপ ফর ইনটিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল রিসার্চ(C.G.I.A.R)সারা পৃথিবী জুড়ে সবুজ বিপ্লবের কর্মসূচী হাজির করে। এই কর্মসূচী অনুসারে ভারতে তথাকথিত হাই ইল্ডিং ভ্যারাইটি (HYB)বা উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ শুরু হয়। এই উচ্চফলনশীলগুলি হলো রাসায়নিক সারে সংবেদনশীল খর্বাকৃতির গাছ। এদের দেহের গড়ন সীমাবদ্ধ হওয়ার ফলে মূল থেকে শোষিত ও সালোকসংশ্লেষের ফলে উৎপন্ন পুষ্টির অর্ধেকই ধানের দানার পুষ্টি বাড়ানোর কাজে ব্যবহার হয়। এ সমস্ত খর্বাকৃতির ধানগাছ তৈরি হয়েছিলো তাইওয়ানের ডিজিওগেন নামক একটি জাতের সাথে দেশি ধানের সংকরায়নের মাধ্যমে। সবুজ বিপ্লবের ফলে ঐরকম কয়েকটি উচ্চফলনশীল ধান সমগ্র দেশ জুড়ে চাষ করা শুরু হয়ে গেলো। ফলে ভারতে যে হাজার হাজার দেশি জাতের ধান চাষ হতো, তা ক্রমশই বন্ধ হয়ে গেলো। এক্ষেত্রে ধানের বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা সাধারণত এক বছরের বেশি না থাকায়, এবং কৃষক পরপর কয়েক বছর নিজেদের স্থানীয় জাতের ধান চাষ না করায় তাদের বীজধান নষ্ট হয়ে গেলো। উল্লেখ্য, এসময় চাষীরা উচ্চফলনশীল ধান চাষ করেছিলো মূলত তিনটি কারণে.ঠিকমতো সার, জল, কীটনাশক প্রয়োগ করতে পারলে এর ফলন বেশি। ২.চাষীকে দিয়ে উচ্চফলনশীল চাষ করানোর জন্য প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিলো। ৩.চাষীকে ঋণ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিলো এবং সারে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিলো।

আর পুরো মহাদেশব্যাপি যখন কথিত সবুজ বিপ্লব সম্পূর্ণ হচ্ছিলো এবং উচ্চফলনশীলের ব্যাপক চাষাবাদের ফলে যখন দেশি জাতগুলি বিলুপ্ত হতে শুরু করে, তখন ১৯৭৪ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশন এবং রকফেলার ফাউনডেশন গঠন করে “ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব প্লান্ট জেনেটিক রিসোর্স” বা IBPGR। এ সংগঠন দুটি ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (FAO)এর সমগ্র পরিকাঠামো ব্যবহার করে সারা পৃথিবী থেকে (প্রধানত তৃতীয় বিশ্ব থেকে) আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন উদ্ভিদের হাজার হাজার প্রজাতি বা ভ্যারাইটির জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করতে শুরু করে। IBPGRবেশ কিছু সংস্থার মাধ্যমে এই সংগ্রহের কাজটি সম্পূর্ণ করে। এ সমস্ত সংস্থাগুলির উপর তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশের সরকারের কোনপ্রকার নিয়ন্ত্র ছিলো না।

হ্যাঁ, বর্তমান পৃথিবীতে সংগৃহীত জার্মপ্লাজমের এক চতুর্থাংশই উক্ত IBPGR-এর কাছে রক্ষিত আছে। এবং সংগ্রহ করার সময় তারা যে কথা বলেছিলো, “সংগৃহীত উদ্ভিদের একটি সেট যে দেশ থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে সেই দেশেই থাকবে”,সংগ্রহ এবং প্রয়োজন শেষে চুড়ান্ত বৈঈমানির নজির সৃষ্টি করে উক্ত চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে বিশ্বব্যাপী কথিত সবুজ বিপ্লবের প্রবক্তারা..! উল্লেখ্য যে সবুজ বিপ্লবের আগে শুধুমাত্র ভারতেই ছিলো, বেয়াল্লিশ হাজার ধানের জাত। বর্তমানে যা দুই হাজারেরও কম। আর অবলুপ্ত ওসব ধানের জাতগুলোই আছে এখন শুধুমাত্র IBPGR-এর সংগ্রহে।

এক্ষেত্রে গত একশো বছরে যেসব প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ, শস্য বীজ, প্রজাতি বহুজাতিকরা জোচ্চুরি ও কৌশল খাটিয়ে স্থানীয় ভান্ডার থেকে অবলুপ্ত করিয়েছে, এবং নিজেদের করায়ত্ত্ব করেছে সেসবই এখন আবার উচ্ছমূল্যে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসছে

প্রসঙ্গত প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ, কৃষি, সার, কীটনাশক সম্বন্ধে আজকাল বহু আলোচনা হচ্ছে! তা থেকে নিশ্চয় মোটাদাগে সবাই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, কৃষক এখন বহুজাতিক কোম্পানি ও বিভিন্ন লুটেরা গোষ্ঠির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রায়। এবং গত বিশত্রিশ বছর ধরে কথিত উচ্চফলনশীল ফসল চাষাবাদের নামে কৃষি জমিতে ব্যাপক মাত্রায় রাসায়ানিক সার ব্যাবহারের ফলে জমির উর্বরতা হারিয়েছে। বা রাসায়ানিক সার জমিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটিশিয়ামের যোগান দিলেও জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ, বোরন, তামা, মলিবডেনাম, লোহা প্রভৃতির যোগান দিতে পারেনা। তাই এই অনু খাদ্যগুলি জমি থেকে স্থায়ীভাবে অপসারিত হয়েছে! এমতাবস্থায় বহুজাতিকরা বাজারজাত করতে শুরু করে অনুখাদ্য সার! আবার জৈবসার ব্যবহার না করায় জমির যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে বহুজাতিকরা বাজারে ছেড়েছে তাদের পেটেন্টকৃত জৈব সার ও জীবানু সার! অন্যদিকে রোগপোকার উপদ্রব বাড়লে অতি উচ্চফলনশীল জাতও অতিনিন্ম ফলন দিতে শুরু করে। আবার ঘুরে ফিরে কিছুদিন পরপর পোকামাকড়রাও শক্তিশালী এবং অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে, তখন আবার প্রয়োজন হয় ধানের জাত পাল্টানোর বা অবলুপ্ত ভ্যারাইটিগুলোর সমন্বয়ে নতুন জাত উদ্ভাবন। যা আদিমকাল থেকেই কৃষক করে আসছিলো প্রতিবছর। কিন্তু কৃষক চাইলে এখন আর স্থানীয় বীজে ফিরতে পারবেনা, কারণ তার কাছে থাকা বীজ ধান অথবা ফসলের বীজ ততদিনে নষ্ট হয়ে গেছে বা মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, যা শুধু রক্ষিত আছে কুখ্যাত জোচ্চোর সংস্থা IBPGR-এর কাছে। যেহেতু কোন ফসলের বীজেরই অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা থাকেনা দুচার বছর পর, তাই থাকেনি কৃষকের ভাণ্ডারের বীজও! আর এভাবেই সুযোগ, চাহিদা আর বীজের বাজার সৃষ্টি করে বহুজাতিক কোম্পানিরা শুরু করেছে কথিত উচ্চফলনশীল, কথিত প্রতঙ্গ প্রতিরোধী জাত, এবং প্রতঙ্গ বিনাশী কীটনাশক ও অনু খাদ্য বা জৈব সারের ব্যবসা।

প্রশ্ন হচ্ছে বহুজাতিকরা যেসব বীজ, জৈবসার বা জীবানু সার তাদের নামে পেটেন্ট করে বাজারজাত করছে তার মালিকানা কার?

ষাটের দশকে তারাইতো এগুলো সংগ্রহ করে নিজেদের করায়ত্ত্ব করেছে সংরক্ষণের নামে। বা এখন যেসব উচ্চফলনশীল বানাচ্ছে সেগুলোইতো একসময়ে এখানকার মাঠে মাঠে চাষাবাদ হওয়া প্রজাতি।

তাহলে তারা যদি স্বত্বাধিকারী বনে যেতে পারে, তবে হাজার বছর ধরে বিশ্বব্যাপীযেসব কৃষকেরা এসব জাত, বীজ, প্রজাতি রক্ষা করে এসেছে, প্রাকৃতিক ভাবে সংকরায়ণ করে নতুন জাত সৃষ্টি করেছে, তাদের প্রাপ্তি কি?

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, বহুজাতিকরা এখাতে বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু কৃষকওতো মেধা খাটিয়েছে, শ্রমপুঁজি ইত্যাদি খাটিয়ে প্রাকৃতিকভাবে এ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়েছে!

এক্ষেত্রে উল্লেখ থাকে যে, বিবর্তন একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। এবং সমস্ত প্রজাতির মধ্যেই তা সক্রিয়, এ পক্রিয়া কখনোই থেমে থাকে না। এক্ষেত্রে বহুজাতিকরা কোন একটি প্রতঙ্গপ্রতিরোধী ভ্যারাইটি তৈরি করলে সেই প্রতঙ্গটিও বিবর্তনের মাধ্যমে উক্ত ভ্যারাইটিকে আক্রমণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। এমনকি বর্তমানে প্রকৃতিতে যতগুলো ক্ষতিকর পতঙ্গ আছে সবগুলো প্রতিরোধী ভ্যারাইটি বা কোন নতুন উচ্চফলনশীল তৈরি করা হলেও বিবর্তনের মাধ্যমে কিছুদিন পর বহু পতঙ্গ উক্ত ফসলটিকে আক্রমন করার সক্ষমতা অর্জন করবে। নিকট অতীতে ভারতের “বোলগার্ড” তুলা চাষের অভিজ্ঞতা এ মতকে আরো শক্তিশালী করে।

ক্ষেত্রবিশেষে দেখা গেছে মাত্র দশবারো প্রজন্ম পরপর কীটপতঙ্গরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারে। আর পতঙ্গদের মধ্যে বিবর্তনের এ ধারা বহুজাতিকরা ষাটের দশকে জেনেছে বলেই তারা শুধু দু’একশো প্রজাতির উদ্ভিদ সংগ্রহ করে ক্ষান্ত হয়নি, বরং পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিকভাবে মুল্যবান প্রায় সব প্রজাতিই হাতিয়ে নিয়েছে চরম অপকৌশলে ও স্বৈরাচারী কায়দায়।

ষাটসত্তরের দশকে জঘন্য মিথ্যাচার আর কূটচালের আশ্রয় নিয়ে এবং বহুজাতিকরা ফাও (FAO)এর মতো তাদের দালাল প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিশ্ব থেকে কৃষকের বীজ কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করে, এবং প্রায় কোনরুপ প্রতিরোধ ছাড়াই তারা সফলও হয়। তারপর থেকে কি হচ্ছে তা উপরিউক্ত আলোচনা ছাড়াও কৃষি সম্পর্কে খোঁজ খবর যারা রাখেন তারা সকলেই কমবেশি জানেন।

বর্তমান বিশ্বে বহুজাতিক কোম্পনিগুলো ক্রমশই আধিপত্য কায়েম করছে কৃষিকে কেন্দ্র করে। এ আধিপত্য বিস্তারের পথ সবচেয়ে বেশি সুগম হচ্ছে কৃষিতে ‘টার্মিনেটর’ প্রযুক্তি যোগ হওয়ার পর থেকে।

যাতে কৃষকরা বহুজাতিকের কথিত উচ্চফলনশীল কিনতে পারবে, কিন্তু সে ফসল বীজ হিসেবে পরের বছর ব্যবহার করা যাবেনা। বা ফসল ফলবে কিন্তু সে ফসলের বীজ হবে বন্ধ্যা। আর এই টার্মিনেটর প্রযুক্তির উদ্ভাবকই আমেরিকান কোম্পানি মনসান্টো। মনসান্টোর হয়ে আর্ন্তজাতিক সংস্থাগুলোর নির্দেশে এ সংশ্লিষ্ট আইনও পাশ হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের কৃষি প্রধান বিভিন্ন দেশে!

এছাড়া বীজ ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট ও জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মনসান্টো আরেকটি বিষ ছেড়েছে বাজারে। নাম– ‘রাউন্ড আপ’! কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি আগাছা নাশক।

আদতে তা উদ্ভিদ নাশক। এবং তা ব্যবহার করতে হয়, ‘রাউন্ড আপ রেডি ফসলে’!

তাতে একদিকে উদ্ভিদ ধংস হয়, আরেকদিকে নির্দিষ্ট বীজ বা রাউন্ড আপ ফসলের বীজের বাজার সম্প্রসারণ হয়।

কৃষিতে চূড়ান্ত কতৃত্ব কায়েমে আরেক জৈব প্রযুক্তির নাম ‘ভার্মিনেটর প্রযুক্তি’। এ নতুন প্রযুক্তিতে ইঁদুরের চর্বি কোষের একটি বিশেষ জিনকে বীজ বন্ধ্যাত্বকরণের জন্য ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে টেট্রাসাইক্লিন বা অন্য রাসায়নিক ব্যবহার করে ঐ জিনটিকে প্রয়োজনমতো সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যাবে। অথ্যাৎ কোম্পানি নির্ধারিত একটি বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করে বন্ধ্যা বীজের বন্ধ্যাত্ব কাটানো যাবে। নতুন এ প্রযুক্তি বিশেষ কয়েকটি জিনের সজ্জাক্রমকেও নষ্ট করে দিতে পারে, যাতে বীজ থেকে চারা গজালেও কয়েকটি বিশেষ গুণ সেই ফসলে আর দেখা যাবে না। ইঁদুরের জিন এ প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয় বলে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভার্মিনেটর প্রযুক্তি’।

এ প্রযুক্তি কাজে লাগবে কৃষক যখন টার্মিনেটর প্রযুক্তি প্রত্যাখ্যান করতে চাইবে তখন, বা যে বীজের ফসল আবার বীজ হিসেবে ব্যবহার করা যায়না বলে কৃষকরা যখন বেঁকে বসতে চাইবে তখন। তখনই ‘ভার্মিনেটর প্রযুক্তি’ খ্যাত এ বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষককে বীজ উৎপাদনের সুবিধা দেওয়া হবে, (ভেবে দেখুন, কৃষককে সনাতন জায়গায় নিয়ে আসা হলো আবার, মাঝখান থেকে কৃষিতে বাড়তি খরচাপিয়ে দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হলো হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার!) যাতে কৃষক আবারো বীজের মালিকানা পেতে শুরু করবে। আর ততদিনে বহুজাতিকের মুনাফা হয়ে উঠবে ভার্মিনেটর প্রযুক্তি নির্ভর, কারণ ভার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্র ব্যাপক। এ প্রযুক্তিতে উদ্ভিদ জীবনের মূল ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রিত হবে রাসায়ানিক ব্যবহারে। যেমন অঙ্কুরোদগম, পাতা গজানো, ফুল ফোটানো, ফল পাঁকানো সহ যাবতীয় সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হবে ভার্মিনেটর প্রযুক্তিতে। বা ততদিনে কৃষকের উৎপাদিত শষ্য স্তরে স্তরে আটকে থাকবে! ধানক্ষেতে শীষ আসবে কিন্তু ধান বেরুবেনা ততক্ষন পর্যন্ত, যতক্ষন না চড়া দামে কিনে মনসান্টোর (বহুজাতিকের) রাসায়ানিক স্প্রে করা হচ্ছে জমিতে। অর্থ্যাৎ টার্মিনেটর আর ভার্মিনেটর প্রযুক্তির যাঁতাকলে পিষ্ট হবে কৃষি, কৃষক, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রকৃতি।

এপর্যায়ে কেউ যদি ভেবে থাকেএখানে কল্পবিজ্ঞান বলা হচ্ছে, বা ভাববাদ চর্চা করা হচ্ছে, অথবা কেউ যদি এও মনে করে, ভার্মিনেটর প্রযুক্তি এলে কৃষকের লাভ হবে, তবে সে হয়তো বোকার স্বর্গে বাস করছে, নয়তো তিনি মনসান্টোর দালালী করছেন

কারণ ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবও হয়েছিলো, কৃষকের দূরাবস্থা দূরীকরণে, যা আদতে কৃষকের পরিচয়কেই পাল্টে দিয়েছে। প্রকৃতির সন্তান কৃষক হয়ে উঠেছে বহুজাতিকের হাতের পুতুল, বলির পাঁঠা।

এ পর্যায়ে প্রশ্ন হচ্ছে, কৃষিতে বহুজাতিকের একচেটিয়া অধিপত্যের ফলে কি লাভ হয়েছে কৃষকের? বা কথিত টার্মিনেটর, ভার্মিনেটর, রাউন্ড আপ রেডি ফসলে কতটা উৎপাদন বেড়েছে, এবং তুলনামূলকভাবে কতটা উৎপাদন ব্যায় কমেছে কৃষিতে। এ প্রসঙ্গে ভারতে বিটি তুলা চাষাবাদ এবং এতে কৃষক পরিবারে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দু’লাখ কৃষকের আত্মহত্যার খবর এবং জমিতে সারকীটনাশক ব্যবহারের উচ্চমাত্রা থেকে যে কেউই ধারণা নিতে পারবেন।

প্রসঙ্গত বিটি বেগুন

সরকারের শেষ সময়ে একের পর এক জিএমও ফসলের অনুমোদন দিয়ে চলেছে পরিবেশ ও কৃষি মন্ত্রণালয়। গড়ে অনুমোদনের হিড়িকে দেশ থেকে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে রফতানিকারক, কৃষক, পরিবেশবাদী ও স্বয়ং সরকারি উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগও। চলতি সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিসরে জিএমও ফসল আলু ও ধান গোল্ডেন রাইসের অনুমোদন দেয় সরকারের জাতীয় জৈব নিরাপত্তা কমিটি। এর আগে গত মাসে জিএমও বিটি বেগুনের চারটি জাতের অনুমোদন দেয় সরকার। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে বাংলাদেশ কৃষিজাত পণ্য বিদেশে রফতানি করে প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আয় করে থাকে। দেশের বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফলমূল ও কৃষিজাত পণ্যের প্রধান ক্রেতা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যসহ একাধিক দেশ। সীমিত পরিমাণে সুগন্ধি চাল ও এক লাখ টনের অধিক আলু বিদেশে রফতানি হয়ে থাকে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি সবজি রফতানি হয় ইউরোপে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে জিএমওবিরোধী আন্দোলন অনেক শক্তিশালী হওয়ায় এর আগে জিএমও ফসল ও খাদ্যের ওপর নানা বিধিনিষেধ জারি করা হয়। গত আগস্টে ইতালি সরকার দেশটিতে জিএমও ভুট্টা আবাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ইউরোপে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য এক ধরনের আলু ও ভুট্টার জিন বিকৃত করে উত্পাদন করা হলেও এ দুটি ছাড়া সেখানে সব ধরনের জিন বিকৃতি করে জিএমও উত্পাদন নিষিদ্ধ। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন এবং অস্ট্রিয়াসহ বেশ কিছু দেশে জিএমও খাদ্য উত্পাদন পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান তিনটি ফসলের জিএমও চাষাবাদ শুরু হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে কৃষিজাত পণ্যের রফতানির ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়বে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগের বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, জিএমও ফসল উত্পাদনের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক কোনো ব্যবস্থা দেশের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রগুলোর নেই। এমনকি বিদেশে কৃষিপণ্য আমদানি ও রফতানির সঙ্গনিরোধের দায়িত্বে নিয়োজিত বিভাগকেও আগে জানানো হয়নি। অথচ দেশে জিএমও ফসল উত্পাদন হলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কৃষিজাত পণ্য রফতানি করতে হলে জিএমও সম্পর্কিত বিভিন্ন দেশের বিধিনিষেধের আওতায় পড়তে হবে; বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের। কারণ সেখানের ভোক্তারা সবচেয়ে বেশি সচেতন। তাদের দিকে থেকে প্রথমেই বলা হবে যে কৃষিপণ্যটি বিদেশে পাঠানো হচ্ছে সেটি যে জিএমও না সেটা প্রত্যয়ন করে পাঠানোর। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ ধরনের বাধার মুখে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সেটা অনুসরণ করে। ফলে সবজি রফতানিতে ধস নামতে পারে। ফল, সবজি ও কৃষিপণ্য রফতানিকারকদের সংগঠন বিএফভিএপিইএর সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, জিএমও ফসল উত্পাদনে রফতানিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকলে রফতানিকারকদের আগে থেকেই জানানো প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আমাদেরকে অবহিত করা হয়নি।

এছাড়া বিটি বেগুন চাষাবাদ প্রসঙ্গে নিন্মোক্ত প্রশ্নগুলোরও কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি

. বহুজাতিক কোম্পানিরা যে জীনের পেটেন্ট নিচ্ছে তার আদি উৎস আমাদের কৃষক! এক্ষেত্রে কোম্পানি মুনাফা পেলে কৃষকরা কেন পাবেনা? বা হাজার বছর ধরে এ জিনগুলোর মালিকানা তো কৃষকেরই ছিলো! বা জিনগুলোতো হুট করে আকাশ থেকেও পড়েনি, বহুজাতিকের ল্যাবরেটরিতেও উৎপন্ন হয়নি! বরং স্থানীয় কৃষকের উদ্ভিদ বা ফসলেই ছিলো! গুলো বহুজাতিকরা শুধু বিকৃত ও প্রতিস্থাপন করেছে মাত্র! তাহলে মালিকানা কেন তাদের হবে?

. প্রতি দশবারো প্রজন্ম অন্তর কীটপতঙ্গরা পাল্টে যায়, বা প্রচলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে, সেক্ষেত্রে উচ্চফলনশীলের নতুন জাত বের করতে হয় পোকা ঠেকাতে, সেক্ষেত্রে বিটি বেগুন কিভাবে স্থায়ী সমাধান হলো?

. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত না করে কৃষিতে কথিত উচ্চফলনশীল জাত আমদানির নামে যে উৎপাদন ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে, এবং বিদেশ তথা কর্পোরেট নির্ভরতা তৈরি করা হচ্ছে, এতে দেশের লাভ কি?

. স্থানীয় বীজ ভান্ডার ধংস করে পুরোপুরি বিদেশ তথা কর্পোরেট নির্ভর হয়ে পড়া একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে বা বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে পড়লে, বা অদূর ভবিষ্যতে মনসান্টো থেকে যদি বীজ না পাওয়া যায়, তখন স্থানীয় এবং সনাতন বীজ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রস্তুতি কি?
. পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়া বিটি চাষাবাদের অনুমতি দেওয়ায়, এর থেকে মানবদেহে স্বাস্থহানীকর রাসায়ানিক উপাদান, বা কৃষিপ্রাণপ্রকৃতিপরিবেশে কোন বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিক কি ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা আছে বাংলাদেশ সরকারের? বা কি প্রস্তুতি আছে?

. এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী মনসান্টো কি দায় পরিশোধ করবে, এবং কোন প্রক্রিয়ায় ক্ষতিপূরণ নির্দিষ্ট করা হবে এবং আদায় করা হবে? বা ক্ষতিপূরণের বাধ্যবাধকতা চুক্তিতে আধো রাখা হয়েছে কিনা?

. বিটি চাষে কোম্পানি যে হারে উৎপাদন ও লাভ দেখাচ্ছে, কৃষক পর্যায়ে তা পরিলক্ষিত না হলে, বা বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের ক্ষেত্রে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষকের ক্ষতিপূরণ কে দিবে? তথা সরকার নাকি মনসান্টো? বা ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির দাবী কৃষক করতে পারবে কিনা? অথবা দেশের আইন আদালতে কৃষকের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির বন্দোবস্ত করা হয়েছে কিনা?

. বিটি বেগুন বীজ বাজারজাতকারী কোম্পানি মনসান্টো আমেরিকার এবং মাহিকো ভারতের কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও কেন নিজেদের দেশে উক্ত বীজ বাজারজাতে প্রতিরোধের শিকার হয়েছে? সেক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তারা বাংলাদেশে বাজারজাতের অনুমতি পেলো?

পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় ফাঁকিবাজি ও সৃষ্ট অরাজকতা তাবৎ দুনিয়ার কৃষকদের (কৃষি প্রধান অঞ্চল) শত শত বছর ধরে বঞ্চিত রেখেছে সকল প্রকার মৌলিক অধিকার থেকে। কৃষক বললে আজকের দিনে যে দৃশ্যপট চোখে ভেসে উঠে তাও শত বছরের পুরোনো। বাংলাদেশের পেক্ষাপটে এ চিত্র আরো ভয়ানক। আশির দশকের শুরু থেকে এদেশের কৃষকরা নিজের জমি থেকেও উচ্ছেদ হয়ে আসছে রাষ্ট্রের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কূফল স্বরুপ! কৃষিপ্রধান দেশটিতে কৃষকের স্বার্থ থেকেছে বরাবরই উপেক্ষিত। উপরন্তু সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ফলেও অবাধে নষ্ট হয়েছে কৃষি জমি, নদী, জলাশয়, বিল ইত্যাদি সহ কৃষিজ উপকরণ। এক্ষেত্রে কৃষিজ উৎপাদনের প্রধানতম শর্ত বীজ ভান্ডারে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির দোরাত্বতো বেশি সীমা লঙ্গন করেছে যে, আজকের দিনে তা গণআন্দোলন ছাড়া প্রতিরোধও কঠিন হয়ে উঠেছে। এতে কাগজে কলমে স্বাধীনস্বার্বভৌম দেশটির স্বাধীনতা নিয়েও অনায়াসে প্রশ্ন তোলা যায়। এবং এ ভূখন্ডের মানুষের বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় ও মানুষ্য উপযোগী খাদ্য প্রাপ্তির প্রশ্নে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একটি লড়াইয়ে জয়লাভের শর্তও। কৃষকের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে জাতীয় মুক্তি অর্জনের প্রশ্ন। বীজভাণ্ডার রক্ষার আন্দোলন হয়ে উঠেছে দেশরক্ষা আন্দোলন। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও স্বাস্থঝুঁকি দূরীকরণের শর্তের সঙ্গে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই ও পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙ্গে নতুন উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রবেশের শর্ত।

আধুনিক কৃষি ও কৃষিতে শ্রেণীদ্বন্দ্বের কয়েকটি দিক

. বিশ্বায়নের ফলে সারা বিশ্বের চাষীরা কয়েকটি শক্তিশালী বহুজাতিক কোম্পানির আক্রমনের মুখে পড়েছে, সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানিগুলো কৃষকের সামনে সরাসরি শ্রেণী শত্রু হিসাবে হাজির হচ্ছে। আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে।

. প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে জমির গুরুত্ব কমছে! আগে জমিই ছিলো উৎপাদনের প্রধান উপকরণ। জমি হাতে থাকলেই কৃষি উৎপাদন সম্ভব ছিলো, কিন্তু বর্তমানে জমি অনেক কৃষি উৎপাদনের একটি মাত্র। এখন কেবল জমি থাকলেই কৃষি উৎপাদন সম্ভব নয়, আরো অনেক কিছু প্রয়োজন, যেমনজল, সার, কীটনাশক, উচ্চফলনশীল বীজ। এর ফলে জমির মালিকানা লাভের প্রতি কৃষকের তীব্র আকাঙ্খা কমছে।

. সরকার কর্তৃক ফসল উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে দ্রুত। বরং উৎপাদন হবে বহুজাতিকের ইচ্ছে অনুযায়ী। বা কোন এক ফসল উৎপাদন হবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, কোনটি অনেক কম, আর তা নির্ভর করবে, মৌসুমে নির্দিষ্ট বহুজাতিক কোন বীজটি বেশি বেচতে চাইছে তার উপর! ফলে অপচয় বাড়বে! ফসলের দরপতন ঘটবে বেশি! এবং কৃষকের ক্ষতি বাড়বে। তথা কৃষক পর্যায়ে সরকারবিরোধী মনোভাব ও আন্দোলন তরান্বিত হবে।

. কৃষি উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ, যেমনপ্রযুক্তি, জৈব বৈচিত্র্য, ইত্যাদির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা কায়েমের আকাঙ্ক্ষা সাধারণ কৃষকের নেই, কারণ এর জন্য বিরাট আকারের পুঁজি প্রয়োজন, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এসবের উপর সামাজিক মালিকানার দাবি করতে পারে কৃষকরা। এ পথে কৃষকদের পাতি বুর্জোয়াসূলভ মনোভাব কমবে।

. বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে বীজ, সার, কৃষি যন্ত্রপাতি, ও কীটনাশক ব্যবসায়ীরা শক্তিশালী শ্রেণীরুপে আবির্ভূত হচ্ছে। গণবিরোধী কৃষি প্রযুক্তি ও তার ধারক বহুজাতিকদের এরা স্থানীয় মিত্র শক্তি।

. ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিকর রাসায়ানিক ব্যবহারের ফল হিসেবে স্বাস্থহানী ও মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হওয়ায়, সমাজে কৃষি ব্যবস্থায় আশু পরিবর্তনের দাবী শক্তিশালী হবে। এবং ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগীরা উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের আন্দোলনে যোগ দিতে বাধ্য হতে পারে।

. আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কুফল সবচেয়ে আগে ভোগ করেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা। এ চাষীরা আগে বীজ নিজেরাই তৈরি করতেন এবং বিক্রি করতেন! বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজার সম্প্রসারণের জন্য সর্বাগ্রে এই শ্রেণীর হাত থেকে বীজ তৈরির অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। তাই এ শ্রেণীই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সবছেয়ে বড় শিকার। এ কারণে কৃষিপ্রধান দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এরাই হয়ে উঠতে পারে সবছেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশ।

. রামপাল, রূপপুর, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন, তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি, বিটি বেগুন চাষাবাদের অনুমোদনসহ ইত্যাদি কৃষক ও কৃষিবিরোধী চুক্তিকর্মকান্ডকর্মসূচি ও ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ বাস্তবায়নের ফলে দেশীয় লুটেরা শাসকগোষ্ঠির চরিত্র উন্মোচন সহজতর হবে। এবং কৃষকদের পক্ষ থেকে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

উপসংহার

জিন সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিরোধ করা এই মুহূর্তের আশু বিপ্লবী কর্মসূচি হওয়া উচিত। জিন সম্পদ লুণ্ঠনের চরিত্র অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের চাইতে আলাদা। সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের কারণে দেশের জীব বৈচিত্র্য ধংস হলে তা পনরুদ্ধার করা অসম্ভব। দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদের পূর্ণ কতৃত্ব কায়েম হলে এ কতৃত্বের অপসারণ কঠিন হবে। জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মসূচিকে বিপ্লব পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে ফেলে রাখা যায় না। বরং জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মসূচি প্রয়োগের মাধ্যমে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশ ঘটাতে হবে। কৃষক আন্দোলনের কর্মসূচিতে তাই নিন্মলিখিত এজেন্ডাগুলির অন্তর্ভূক্তি প্রয়োজন!

. জীববৈচিত্রের মুল্য এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এর গুরত্ব সম্পর্কে কৃষক সম্প্রদায়কে সচেতন করা।

. সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানির দেওয়া কৃষি প্রযুক্তি ও কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে বয়কট আন্দোলন পরিচালনা করা। (অবশ্যই এই বয়কট বাছবিচারহীন হবেনা, সবছেয়ে বেশি ক্ষতি হতে পারে যেগুলোতে সেগুলো আগে বয়কট করতে হবে)

. সাম্রাজ্যবাদের বীজের বাজার সম্প্রসারণ ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারের কৌশল মূলত প্রযুক্তি নির্ভর। তাই এ প্রযুক্তির বিরোধীতা করে বিকল্প প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে লড়াই চালাতে হবে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হবে দেশি শষ্যের চাষকে আরো লাভজনক করা, সুসংহত উপায়ে রাসায়নিকের সাহায্য ছাড়া (বা যথাসম্ভব কম সাহায্য নিয়ে) ক্ষতিকর পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করা, সহজে জৈব সার বা জীবানু সার প্রস্তুত ও ব্যবহার সম্পর্কে চাষীকে সচেতন করা, জৈব বৈচিত্রের সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা করামোটের উপর এমন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রয়োগ ও প্রচার করা যার উপর বহুজাতিক কোম্পানি বা রাষ্ট্রশক্তি সহজে আধিপত্য করতে পারবেনা।

. যেখানে যেখানে সম্ভব, যেমন যেখানে গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করা যাবে, সেখানে কিছু পরিমান খাস জমিতে জীব বৈচিত্র্যের বাগান তৈরি করা। সম্ভব হলে গোপনে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি স্থাপন করা।

. গবেষক মহলে সংগঠন গড়ে তোলা। গবেষকদের জনবিরোধী প্রযুক্তির গবেষণা থেকে বিরত থাকতে ও গণমুখী গবেষণায় নিয়োজিত থাকতে আহবান জানানো।

. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে যে সমস্ত সংগঠন জিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধীতা করছে তাদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলা। যৌথ আন্দোলন করা, পাশাপাশি তাদের শ্রেণী নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করা।

. সাম্রাজ্যবাদী বীজ কোম্পানিগুলোর গোয়েন্দা ও স্থানীয় এজেন্টদের প্রতিহত করা। এই কোম্পানিগুলো দেশের কোনো কৃষিক্ষেত্রে জনবিরোধী এক্সপেরিমেন্ট করলে তা প্রতিহত করা।

এছাড়া, কোম্পানির দালালদের মনগড়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অবৈজ্ঞানিক, বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন প্রতিরোধ করা, এ সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করা, এবং জাতিয় মুক্তির আন্দোলন জোরালো করা।।

তথ্য সুত্র: জিন সাম্রাজ্যবাদ, শুভ্রকেতন বসু (ভারত)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s