বিএনপি, আওয়ামীলীগ সহ শাসকশ্রেণীর দলগুলোর গণআন্দোলনের সীমানা কতদূর?

Posted: ফেব্রুয়ারি 22, 2014 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: ফারুক আহমেদ

election-2013নবম সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের সামনে হাজির করেছিল সরাসরি অন্যায় সুবিধা প্রাপ্তরা ছাড়া দেশের ব্যাপক অধিকাংশ মানুষ পরবর্তীতে উপলব্ধি করেছেন, তা ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতারণার দলিল। সারা দেশে শহর, বন্দর, গ্রাম, গঞ্জের সর্বত্র জনগণের শ্রমার্জিত কোটি কোটি টাকায় নির্মিত বিলবোর্ডগুলো প্রতারণার সেই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। বিলবোর্ডের মিথ্যা সাজানো গল্প মানুষ বিশ্বাস করতে পারে না, কারণ মানুষ ভুক্তভোগী। দুর্নীতি, লুটপাট, রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে এবং তার সুযোগ নিয়ে শাসক দলের লোকদের সন্ত্রাস, নদীবিলবাওড়সমুদ্র দখল, টেন্ডারবাজী, শিক্ষাঙ্গন দখল, হত্যা, গুম, বিরোধী যে কোন মতকে দমন এসব কিছুর ভুক্তভোগী অসংখ্য মানুষ। কিন্তু সবাই যার দ্বারা আক্রান্ত তা হলো বাজার। আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণ। দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মহাজোট সরকারের ক্ষমতা প্রাপ্তির পর থেকেই লাগামহীনভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ব্যাপক গরীব সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সময় একটা ব্যাপার, মানুষের ব্যাক্তিগত কর্ম উদ্যোগ এবং পথঘাট চেনা জানার অভিজ্ঞতার কারণেই শুধু আর একটি ৪৩,৪৭,৭৪ মানুষের জীবনে আর নেমে আসে না সত্য।কিন্তু দব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিমাণগতভাবে মানুষের জীবনে অভাবের নির্মমতা সেসব সময়ের তুলনায় কোন অংশেই কম নয়। পূর্ববর্তী বিএনপি জোট সরকার এবং বেনামী সামরিক সরকারের সময়ও জনগণ এই দুরবস্থার মধ্যে নিমজ্জিত ছিলেন। সেখান থেকে উত্তরণের প্রতিশ্রুতিই আওয়ামীলীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে দিয়েছিল। ক্ষমতায় বসার পর দুরবস্থায় নিমজ্জিত মানুষকে আরো বেশি দুরবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। জনগণকে দুরবস্থায় নিমজ্জিত করে জনগণের দ্বারা সদ্য প্রত্যাখ্যাত বিএনপির পক্ষে সঙ্গত কারণেই জনগণের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব নয়, হয়নি।

জনগণের এই একটি ক্ষমতা। নির্বাচন হলে শাসক দলের জনবিরোধী কর্মকান্ডের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া। লুন্ঠনজীবি শাসকশ্রেণী শাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন ধরণ পার হয়ে ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী গণঅভ্যুল্থানের পর গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবেশ করলেও তার কাঠামো নির্মাণ করতে পারেনি। ঘোর লুটপাটের নেশায় বিভোর এরা নিজেদের শ্রেণীর মধ্যেই ক্ষমতা ভাগাভাগি, বন্টন বা হস্তান্তরের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবার যোগ্যতা দেখাতে পারেনি। তাদের চরিত্রগত কারণেই তা সম্ভব হয়নি। একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা তারা গড়ে তুলতে পারেনি। জোড়াতালি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামের এক নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা আইন করে তারা গ্রহন করে। কিন্তু পরবর্তীকাল থেকেই এই জোড়া এবং তালির মধ্যে প্রথমে ফাঁকফোকর খোঁজা এবং পরবর্তীতে জোড়াতালির মধ্যে নখর ঢুকিয়ে তা ছিঁড়ে ফেলার উদ্যোগ যে যখন ক্ষমতায় থেকেছে সেই তখন নিয়েছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় বসার পরই ইতিমধ্যে টানাটানিতে জীর্ণ হয়ে পড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জোড়াতালি মেরামত না করে তা ছিঁড়ে ফেলে।

সরকারের গণবিরোধী নীতি এবং দব্যমূল্য বৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ দৈনন্দিন সকল ক্ষেত্রে জনজীবনে সংকট সৃষ্টির কারণে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারের বিরূদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা নীতি এবং চরিত্রগত কারণেই বিএনপির পক্ষে সম্ভব নয়।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জোড়াতালি খুলে ফেলাতে বিএনপি একটি ইস্যু পায়। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী কাঠামোর মধ্যে নির্বাচনে জনগণের যে লাভ হয় না তা জনগণ অনেকবারই দেখেছেন। তবুও একটি নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্যে জনগণ গণবিরোধী শাসক দলকে আশু ফেলে দিতে পারার ক্ষমতা অনুভব অবশ্যই করেন। জোড়াতালি যা দিয়েই হোক যে নির্বাচনী ব্যবস্থাটি ছিল তা বাতিল করে দেওয়াতে জনগণ এই কাঠামোর মধ্যেও যে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ছিল তা হারানোর আশংকায় নিমজ্জিত হন। এ কারণে সরকারের দ্বারা সৃষ্ট নানা সংকটসমস্যায় জর্জরিত এবং দুরবস্থায় নিমজ্জিত মানুষের নিকট থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি দুরে থাকতে পারেনি। তা সত্ত্বেও আওয়ামীলীগ প্রথমে সম্পূর্ণরূপে বিনা নির্বাচনেই ক্ষমতায় বসার পথ পাকা করে ফেলে এবং পরবর্তীতে সংখ্যালঘিষ্ঠ আসনে নির্বাচনের নামে জনগণের শ্রমার্জিত শত শত কোটি টাকা্ খরচ এবং লুন্ঠনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় বসাকে বৈধতা দান করে নিজেই!

এ পরিপ্রেক্ষিতে টকশো শিল্পী, সুধিচর্চা শিল্পী সহ বিভিন্ন শিল্পীসৈনিক থেকে নানা রকমের রাজনৈতিক বিশ্লষণ পাওয়া যাচ্ছে। কেউ বলছেন বিএনপির আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে, কেউ বলছেন পশ্চাদপসারণ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিএনপির প্রসঙ্গ আসছে এই কারণে যে, জনগণের পাশে যাঁরা আছেন তা হলো জনগণ নিজে এবং একেবারেই ক্ষুদ্র আকারের প্রয়াস। এসব কথাবার্তা থেকে বুঝবার উপায় নেই যে, জনগণের কোন সংকট আছে এবং সরকারের বিরূদ্ধে জনগণের কোন ক্ষোভ আছে। জনগণ যেন চাবি মারা পুতুল! চাবি দিয়ে ছেড়ে দিলেই তা চলে এবং চাবি বন্ধ করলেই তা বন্ধ হয়ে যায়! পশ্চাদপসারণ বা ব্যর্থ এসব কথা শুনলে মনে হয় যেন আন্দোলনটা শুধুই বিএনপির। জনগণ যেন খুব দুধেভাতে আছে। এমন একটি আইনি অবৈধ সরকার নিয়ে জনগণের যেন কোনই মাথা ব্যথা নেই। এখানে বামপন্থী বলে পরিচিত যারা তাদের কথা এবং কর্মকৌশলের মধ্যেও তেমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সমস্যা যেন জনগণের নয়। ব্রিটিশের সময়ে যখন স্বাধীনতা, জাতিসত্ত্বা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সহ নানা রকমের বার্নিং ইস্যু সৃষ্টি হয়ে চলেছিল, যার কার্যকর সমাধানের জন্য একমাত্র কমিউনিষ্ট পার্টির উপর দায়ীত্ব বর্তায় তখন সেই পার্টির প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল কংগ্রেসলীগের দুই হাত জোড়া লাগানো! রাজনৈতিক ভুল একবার হলে তাকে ভুল বলা যায়।কিন্তু একই কর্মের পুনরাবৃত্তিকে বলে মতলববাজি। বামপন্থী নামধারীরা আওয়ামীলীগ বিএনপির হাত জোড়া লাগাতে গিয়ে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের নয় মতলববাজিরই পরিচয় দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তারা পরিস্থিতিকে জনগণের সংকট হিসেবে না দেখে সরকার ও বিরোধীদলের নিছক হানাহানি হিসেবে দেখলেন! ক্ষমতার জন্য তাদের হানাহানিতো আছেই। কিন্তু জনগণের সংকট কি নেই? সরকার কি জনগণকে সংকটে নিমজ্জিত করেনি? জনগণের শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়। শাসক দল কি জনগণের কোন রকমের রাজনৈতিক অধিকার রেখেছে? এই পরিস্থিতিতে আর কেউ না থাকলেও বামপন্থীদেরইতো জনগণের পাশে থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরূদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার কথা। তা হয়নি। হয়নি কথিত বামপন্থীরা মতলববাজ বলে।

এবার আসা যাক বিএনপির ব্যর্থতা বা পশ্চাদপসারণ প্রসঙ্গে। বিএনপি কিভাবে ডাকল এবং সে ডাকে জনগণ কতটুকু সাড়া দিল এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোবিএনপি কি আদৌ জনগণকে ডাক দিয়েছে? কি আহ্বান রেখেছে জনগণের সামনে? বিএনপি, আওয়ামীলগের মত দল গণআন্দোলনের সাথে কতদূর পর্যন্ত থাকতে পারে?

বিএনপি, আওয়ামীলীগের মত দল জনগণের সাথে ততদুর পর্যন্তই থাকতে পারে যতদুর পর্যন্ত জনগণকে শুধু তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা যায়।জনগণকে নিয়ে তারা সেই বিন্দুতে যেতে পারে না যেখানে জনগণ তার রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং শক্তিকে চিনে ফেলতে পারে। তাদের মোড়লরাও সেটা চায় না। ৯০ এ স্বৈরাচার বিরোধী গণঅভ্যুল্থান চূড়ান্ত পরিণতি পায়নি। তা পেলে স্বৈরাচার এরশাদের বিচার হত। জনগণকে ব্যবহার করার এক পর্যায়ে গিয়ে সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল। সম্পূর্ণরূপে জনগণের আন্দোলনের মধ্যদিয়ে সরকার পতন মানেই হলো জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা চিনে ফেলা। এই কাজ বিএনপি, আওয়ামীলীগের নের্তৃত্বে ঘটার কোন শর্ত নেই। শাসক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালি এবং অভিজ্ঞতায় পুষ্ট রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামীলীগ। আওয়ামীলীগ ভাল করেই জানে বিএনপির পক্ষে গণআন্দোলন কতদূর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ৯৬ সালে আওয়ামীলীগও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির সাহায্য সহযোগিতার আশ্বাস ইঙ্গিত ছা্ড়া এবং আওয়ামীলীগের তুলনায় বিএনপির রাজনৈতিক পরিপক্কতা কম না হলে শুধুমাত্র জনগণকে সাথে নিয়ে বিএনপি সরকারকে ফেলে দিতে যেত না। জনগণের নিছক সমর্থনই হলো এদের দেনদরবারের পুঁজি। জনগণের শক্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তাদের ভয়।এবার বিএনপি সে পথেই থেকেছিল। বিএনপি চেয়েছিল জনগণের নিছক সমর্থনকে পুঁজি করে দেশিবিদেশী মোড়লদের সাথে দেনদরবারের মধ্য দিয়ে শাসক দলকে সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য করতে। রাজনৈতিক দল হিসেবে অধিক পরিপক্ক হওয়ার কারণে এবং ভারত সরাসরি হাতটাকে শক্ত করে ধরে রাখার কারণে আওয়ামীলীগের পক্ষে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব হয়েছে। সে কারণে বিএনপির পক্ষে জনগণের সমর্থনকে ব্যবহারকরে এপর্যন্ত আওয়ামীলীগকে কোন সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য করা সম্ভব হয়নি।

জনগণের সংকট, দুরবস্থাদুর্ভোগ কমেনি বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। জনজীবনে কোন নিরাপত্তা নেই। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, বিচারবিহর্ভুত হত্যাকাণ্ড মানুষকে আতংকগ্রস্থ করছে প্রতিদিন। শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে না। কৃষক ফসল ফলিয়ে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। হাজার হাজার আলু চাষী শ্রমসম্পদ বিনিয়োগ করে সর্বশান্ত হয়েছেন। রাজধানি ঢাকায় দুই কোটি বা তারও অধিক লোকের বাস। যাতায়াত, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সর্বপরি পানি সংকট এখানে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো, তুরাগ,বুড়িগঙ্গা, বালু মৃতই শুধু নয় এসব নদী দিয়ে যা প্রবাহিত হয় তা স্পর্শ করতে মানুষ ভয় পায়। সবকিছু মিলে জনজীবন গভীর সংকটে নিমজ্জিত। বিএনপির মত রাজনৈতিক দল উপজেলা নির্বাচনের পর আবার হয়তো দেনদরবার করার দিকে যাবে। জনগণকে খুঁজতে হবে তাঁর নিজস্ব শক্তির জায়গা।।

২১/০২/১৪

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s