লিখেছেন: কল্লোল মোস্তফা

.

Shaheed_Minarভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের শ্রেণী অবস্থান, রাজনৈতিক দর্শন, অংশগ্রহণের অনুপ্রেরণা ইত্যাদি সম্পর্কে ১৯৮৫৮৬ সালে ১২৩ জন ভাষা সংগ্রামীর মধ্যে একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। উর্দু একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হলে বাঙালির আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধার সম্মুখীন হবে বলে ভাষা আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটা আশংকা ছিল। উর্দু একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হলে তাদের ব্যাক্তিগত ক্ষতি কি ধরণের হবে বলে তারা ভেবেছিলেনএ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তাদের অনেকেই (১২৩ জনের মধ্যে ৪৪ জন) বলেছিলেন যে, ব্যাক্তিগত ক্ষতির কথা তখন তাদের ভাবনায় ছিল না। জাতীয়ভাবে তাদের কি ক্ষতি হবে সেভাবনাই ছিল প্রবল। উত্তরদাতাদের মধ্যে ১৯জন (১৫.৪৫%) বলেছেন উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে তারা সাহিত্যসংস্কৃতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তেন বলে ভয় ছিল তাদের মনে। উর্দু চালু হলে ১৩ জন বলেছেন চাকুরি ও ব্যাবসায় পিছিয়ে পড়তেন, ব্যাক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়তেন (বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে) বলে মত প্রকাশ করেছেন ২৬ জন। ১০ জন বলেছেন প্রতিযোগীতায় তারা টিকে থাকতে পারতেন না।

এই জরিপের কয়েকটি সিদ্ধান্ত ছিল এরকম:

# জরিপের আওতাভুক্ত বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারীই শ্রেণীঅবস্থানের দিক থেকে মধ্যপর্যায়ের। এদের একটি বড় অংশের পিতার পেশা কৃষি হলেও, সংখ্যা গরিষ্ঠের পিতারা ছিলেন পেশায় চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, উকিল, ডাক্তার ও অন্যান্য পেশাজীবি।

# উত্তর দাতাদের প্রধান অংশ কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের্ ছাত্র ছিলেন। মাত্র ১৪% উত্তরদাতা আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রজীবন শেষ করেছিলেন সে সময়। তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

# উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে ব্যক্তিগত ক্ষতির চেয়ে বাঙালির জাতীয় বিকাশে বাধা পড়তসে আশংকাই উত্তরদাতাদের চিন্তিত করে তুলেছিল।

# সেই সময়ের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা নানা সংকটের মধ্যে ছিল। তাই ধীরে ধীরে শ্রমিককৃষক সহ সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের নিপীড়ন মূলক রাষ্ট্রের আসল চেহারার সাথে পরিচিত হতে থাকে। প্রথম দিকে দ্বিধা থাকলেও পরবর্তী পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল স্বত:স্ফুর্ত।

[সূত্র: ভাষাআন্দোলন: অংশগ্রহণকারীদের শ্রেণী অবস্থান, আতিউর রহমান ও সৈয়দ হাশেমী, পৃষ্ঠা ২৯, ৩৯,৪০। ভাষাআন্দোলনের আর্থসামাজিক পটভূমি, ইউপিএল,২০০০ গ্রন্থভুক্ত]

এই জরিপ ও সিদ্ধান্তগুলোর কথা উল্ল্যেখ করা হলো এই কারণে যে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে আজকে যখন উদযাপন করা হয়, ফ্যাশনেকর্পোরেট বিজ্ঞাপনেরাষ্ট্রীয় প্রচারণায় অনেক সময় এমন ভাবে হাজির করা হয়, যেন ভাষা আন্দোলন স্রেফ মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার দাবী কারী একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলনযেন এর কোন সামাজিকঅর্থনৈতিকরাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ছিলনা; যেন ভাষা আন্দোলন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের আমতলায় হুট করে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনাস্রেফ ‘৩০ মিনিটের ভাষা আন্দোলন’; যেন এর সাথে রাজনীতির কোন সম্পর্ক নাই, অর্থনীতির কোন সম্পর্ক নাই, জাতীয় মুক্তি ও জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের আকাঙ্খার কোন সম্পর্ক নাই!

.

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন মূলত একটি সাংস্কৃতি আন্দোলন হলেও শুধুমাত্র তার মধ্যেই এর পরিচয় সীমাবদ্ধ নয়, রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত চিন্তার একটা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেহারা সবসময়ই ছিল। সাংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি জাতীয় অথনৈতিক বিকাশের প্রশ্নটিও এর সাথে যুক্ত ছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রধানতম গবেষক বদরুদ্দীন উমর এ বিষয়ে লিখেছেন:

পাকিস্তান আন্দোলনকালে সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের ধুলো উড়িয়ে সাধারণ লোকের দৃষ্টিকে অনেকখানি আচ্ছন্ন করলেও স্বাধীনতা উত্তরকালে এই ধুলোর মহিমা সাধারণ মানুষের মন থেকে অনেকাংশে অন্তর্হিত হলো। আত্ননিয়ন্ত্রণ বলতে এক্ষেত্রে কি বোঝায়, মানুষ শুরু করল তার সম্পর্কে শৃঙ্খলাবদ্ধ চিন্তা। রাষ্ট্রভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত চিন্তা এই শৃঙ্খালাবদ্ধ চিন্তারই একটি নিশ্চিত অভিব্যাক্তি।

প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন দানা বাধে কতগুলি সরকারী প্ররোচনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে। এগুলোর মধ্যে আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবই সর্বপ্রধান। এরপর থেকে বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করা তো দূরের কথা নানা প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বাধনীতাউত্তরকালে তার স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ করার সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়। এ ব্যবস্থাগুলির দ্বারা বাংলা ভাষার উন্নতি ব্যাহত হওয়ার উপক্রম তো হলোই উপরন্তু বাঙালীর ভাত কাপড়ের প্রশ্নও তার সাথে জড়িত হয়ে পড়লো। কারণ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা যদি তার স্বীকৃতি না পায় তাহলে সমস্ত সরকারী কাজকর্ম চলবে উর্দুর মাধ্যমে। এর ফলে বাংলার মতো একটি উন্নত ভাষার পরিবর্তে অন্য একটি আধাবিদেশী ভাষা তাদেরকে বাধ্যতামূলক ভাবে শিখতে হবে শুধুমাত্র জীবিকা অর্জনের তাগিদে। এ অবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে এক অন্যায় প্রতিযোগীতায় বাঙালীদের বহুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা।”

[সূত্র: বদরুদ্দীন উমর রচনাসংগ্রহ, পৃষ্ঠা ১৩৭, শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০১২]

ভাষার অধিকারের সাথে এক দিকে সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ আরেকদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ভাতকাপড়ের অধিকারের যে প্রশ্ন তা সে সময়ে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদান কারী ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবী দাওয়ার মধ্যেও স্পষ্ট ভাবে উঠে এসেছিলো। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত গণতান্ত্রিক যুবলীগের ‘গণদাবীর সনদ’ শীর্ষক ইস্তেহারের কয়েকটি দাবী ছিল এরকম:

# অবিলম্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া পূর্ণ আজাদী ঘোষণা করিতে হইবে। আগামী অক্টোবরের ব্রিটিশ কমনওয়েলথ/উপনিবেশ সন্মেলনে যোগদান করা চলবে না।

# ভাষার ভিত্তিতে স্বয়ং শাসন অধিকার সম্পন্ন প্রদেশ গড়িবার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মানিয়া লইতে হবে।

# বড় বড় শিল্প , বড় ব্যাংক, ইনসিওরেন্স কোম্পানিগুলি জাতীয়করণ করিতে হইবে। শ্রমিকের খাটুনির সময় আট ঘন্টা বাধিয়া দিতে হইবে এবং বাচার মতো মজুরীর ব্যাবস্থা করিতে হইবে।

# ব্যাংক চা বাগান খনি ইত্যাদি বড় বড় ব্যাবসায় নিয়োজিত বিদেশী মূলধন বাজেয়াপ্ত করিতে হইবে। মার্শাল প্ল্যান অথবা অন্যকোন বিদেশী মূলধন জাতীয় স্বার্থ বিরোধী শর্তে গ্রহণ করা চলিবেনা।

[সূত্র: ভাষাআন্দোলন: শ্রেণী ভিত্তি ও রাজনৈতিক প্রবণতাসমূহএমএম আকাশ, পৃষ্ঠা ৫৫৫৬। ভাষাআন্দোলনের আর্থসামাজিক পটভূমি, ইউপিএল,২০০০ গ্রন্থভুক্ত]

.

একটি জনগোষ্ঠির মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের সাথে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্য। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বা বিদেশী পুঁজির অধীনস্থ জাতির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অসম্ভব। আবার সাংস্কৃতিক আধিপত্যের হাত ধরে অর্থনৈতিক আধিপত্য জোরদার হয়। বাঙালি জাতির বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার ভাষা আন্দোলন ছিল একই সাথে এই সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিরোধী লড়াই। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই আজকের বাংলাদেশে একুশের চেতনার তাৎপর্য বোঝা দরকার। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গাইতে গাইতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা টিশার্টে বাংলা বর্ণমালার ফ্যাশনের মধ্যেই কি একুশে ফেব্রুয়ারি ‘উদযাপন’ সীমাবদ্ধ থাকার কথা? নাকি একুশের চেতনা আমাদেরকে বিদেশী পুঁজি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার প্রেরণা যোগায়?

যে সাংস্কৃতিক ও জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের চেতনায় ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো, সেই সাংস্কৃতিক ও জাতীয় অর্থনৈতিক বিকাশ আজো অর্জিত হয় নি। বাংলাদেশের জনগণ একদিকে হলিউডিবলিউডি পণ্য সংস্কৃতির বিষে জর্জরিত, অন্যদিকে বাংলাদেশেরই শাসক গোষ্ঠি বিভিন্ন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির জীবন ও সংস্কৃতির বিকাশের অন্তরায়। বাংলাদেশের গ্যাস কিংবা কয়লার মতো জাতীয় সম্পদ, বাংলাদেশের নদী, বন, পাহাড়, প্রকৃতি সবকিছুই দেশীবিদেশী গোষ্ঠির লুন্ঠনের শিকার। দেশীবিদেশী কর্পোরেট পুঁজির দালালেরা মুখে একুশের চেতনার কথা ইত্যাদি বলে, একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেবল সাংস্কৃতিক উৎযাপন ও বিভিন্ন প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখে, ভাষা আন্দোলনের যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনা রয়েছে, সেটাকে আড়াল করে ফেলতে চায়। তারা যখন একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করে তখন সেটাকে যথেষ্ট নির্বিষ করে নিযে উদযাপন করতে চায়, যেন একুশের চেতনা তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাধা না হয়ে দাড়ায়।

একুশের চেতনাকে এই উদযাপনের আড়াল থেকে বের করে যাপনের প্রেক্ষিতে স্থাপন করা, জনগণের জীবনযাপনের সংগ্রামের সাথে যুক্ত করা আজকের দিনের জরুরী কাজ। যে ছাত্রতরুণেরা ভাষাসংস্কৃতিঅর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে একদিন ভাষা আন্দোলোনের নেতৃত্ব দিয়েছিলো, আজকের বাংলাদেশে একুশের চেতনা সেই ছাত্রতরুণদেরকে কর্পোরেট পুঁজি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর ডাক দেয়, বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদনদীবনপাহাড় দেশীবিদেশী লুটেরার হাত থেকে রক্ষার আহবান জানায়।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s