লিখেছেন: স্বপন মাঝি

shok21আমরা খুব অভিভূত প্রবণ। আমরা আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়ি। আমরা শোকেও আভিভূত হয়ে পড়ি। এই যে অভিভূতি, তার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে বাঙালির জীবনে ২১ শে ফেব্রুয়ারি। এদিন আমরা এতটাই শোকাভিভূত হয়ে পড়ি যে কালো কাপড়ে নিজেদের ঢেকে ফেলি। রাষ্ট্রীয় সঙ্গীতালয়গুলো থেকে ভেসে আসতে থাকে, বেহালার করুণ সুর। মধ্যবিত্ত বাতাসে তখন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ হয়ে উঠে, খালি পায়ে হেঁটে চলা শোক মিছিল।

এক একটি অর্জন কত ভাবেই না শাসকগোষ্ঠি অপহরণ করে। এও তো অপহরণ। আমাদেরকে শোকসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে, শাসককূলও ভাসতে থাকে সুখসাগরে। এই দুই সাগরের পার্থক্য আকাশ পাতাল।

একটু পেছনের দিকে তাকালে দেখতে পাই, শাসকসম্প্রদায়ের এই খেলা নতুন কিছু নয়। বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করার খুব খায়েস ছিল, এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে, ১৬ অক্টোবর। কী বলেছিল সেদিনের সেই শাসকগোষ্ঠির প্রতিনিধি লর্ড কার্জন? ১৯০৪ ঢাকা সফরের সময় এই মহামান্য শাসকশিরোমণি বলেছিলেন,

বাঙালিরা যারা নিজেদেরকে একটি জাতি হিসাবে চিন্তা করতে ভালবাসে এবং যারা এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে যেখানে ইংরেজদেরকে বিতাড়িত করে একজন বাঙালি বাবু কলকাতার গর্নমেন্ট হাউসে অধিষ্ঠিত হবে, তারা অবশ্যই সেই ধরণের যে কোন ভাঙনের বিরুদ্ধে তিক্ত মনোভাব পোষণ করে যা তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাধাস্বরূপ। এখন তাদের চিৎকারের কাছে নতি স্বীকার করার মতো দুর্বল হয়ে পড়লে আমরা আর কখনো বাঙলাকে বিভক্ত অথবা ছোট করতে সক্ষম হবো না এবং তার দ্বারা আপনারা ভারতের পূর্বদিকে এমন একটা শক্তিকে জমাটবদ্ধ ও কঠিন করবেন যে শক্তি ইতিমধ্যেই অপ্রতিরোধ্য হয়েছে এবং যা ভবিষ্যতে ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলার নিশ্চিত উৎস হিসাবে কাজ করবে।” (পৃঃ ১২, বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি/ বদরুদ্দীন উমর)

এত নগ্নভাবে বলার পরও, শাসকশ্রেণীর প্রতি ভক্তিরসে আপ্লুতরা বিভাজনকে দেখেন ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসাবে। ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ এই সময় পর্যন্ত চলা তাদের বিভাজন তত্ত্বের প্রয়োগ, যা আমাদের কাছে অধরা বা চোখের আড়ালে থেকে যায়। যাদের আগ্রহ আছে, তারা শুধু কংগ্রেস আর মুসলিম লিগের অভিন্ন পিতৃপরিচয় (বলার দরকার নেই, ব্রিটিশ) জেনে নিয়ে, উভয় সন্তানদ্বয় কীভাবে পিতৃআজ্ঞা পালন করে; বর লাভ করেছিল, সে ইতিহাস জেনে নিতে পারেন। অনেক কিছু নাজানা বা জানতে নাচাওয়ার কল্যাণে, তাই গান্ধীরসে আপ্লুতদের চোখে পড়ে না, নেতাজীকে। আর নেতাজীর নাম জানলেও, জানা হয় না, গান্ধী কতটা অসহিষ্ণু আর ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন তার (নেতাজী) ব্যাপারে। শাসকগোষ্ঠির বর লাভ করে গান্ধী হয়ে গেলেন, নায়ক। তাই ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে, ব্যঙ্গ করে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গেয়েছিলেন, তার বিখ্যাত ‘লর্ড মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য’। সেই কাব্যকথা ক’জনে বা আমরা জানি?

যে রাষ্ট্র জন্ম নিতে চায়নি, তার জন্মের আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছিল অনেক আগে। মানুষের ক্ষোভ, দ্রোহ, দাহ সবকিছুকে, অন্যকিছু (যা শাসকশোষককূলের স্বার্থ রক্ষাকারী ব্যবস্থা হিসাবে সক্রিয়) দিয়ে আড়াল করার আয়োজন, মঞ্চে চলে এল নতুন নাটক

ফলে ১৯৪০ সনের পূর্ব অবধি এতদঞ্চলের বুর্জোয়া সামন্তরা পাকিস্তান আন্দোলনে শরীক হয়নি। এই পরিস্থিতি সমাধানকল্পে ১৯৪০ সনে লাহোরে অনুষ্ঠিত ভারতীয় মুসলিম লীগের অধিবেশনে পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন দানের প্রস্তবটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারপর থেকে এতদঞ্চলের মুসলিম সামন্ত বুর্জোয়ারা পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।” (অধ্যাপক ননী গোপাল দত্তের সমাজ ভাবনা, ১ম খন্ড, পৃঃ ৯)

জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে, সেই ক্ষোভকে শোষকগোষ্ঠির স্বার্থে, প্রয়োগ করার আয়োজনে শাসকগোষ্ঠি যতটা পারদর্শী, জনগণের পক্ষে সক্রিয় শক্তি তখন ততটাই ব্যর্থ ছিল, সেই আয়োজনের মুখোশ উম্মোচনে।

পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রের জন্মের পর অনেকে ঐতিহাসিক স্বস্তি খোঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু এটা যে স্বস্তিদায়ক কোন প্রজনন ছিল না, বেরিয়ে এল জন্মের পর পর। এতটা দ্রুত, কেউ ভাবেনি। যে পাকিস্তানের জন্য পূর্বপাড়ের বাঙালরা মুসলমান হয়ে উঠেছিল, এমন কি কোন কোন কমিউনিস্টরা পর্যন্ত এই নব্য মুসলমানিকরণের পক্ষে মত দিয়েছিল, সেই ‘মত’ ঘুরে যেতে সময় লাগল না। অমতকে মত হিসাবে চালান করে দিলে যা হয় অর্থাৎ ধরা পড়ে যাওয়া, তাই হল।

পূর্ববাংলায় এত দ্রুত স্বপ্ন ভঙ্গ হবে, কেউ ভাবেনি। এই স্বপ্ন ভঙ্গ শুধু পূর্ব বাংলায় হয়েছিল, এমন নয়। বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও ঘটেছিল। শাসকশ্রেণীর নিষ্ঠুরতা এতটাই নগ্ন ছিল যে, তারা বোমা মেরে সেই আন্দোলন দমন করেছিল।

শোষণ শাসনের সুবিধার্থে ধর্মীয় মোড়ক যেমন দরকার ছিল, দরকার ছিল ভিন্ন ভাষাভাষীদের, একটি ভাষা। অধিক ভাষা তো দূরের কথা, পণ্যবাহী সমাজ একটি শব্দের অনেকগুলো মানে পর্যন্ত সহ্য করতে নারাজ। তার প্রমাণ পাবেন হাল আমলের অভিধান আর পুরণো দিনের অভিধানগুলোর উপর চোখে বুলালে। (এ নিয়ে বিস্তারিত পাবেন কলিম খান ও রবি চক্রবরতীর লেখায়)

তাই ভারত থেকে আমদানি করা উর্দু ভাষার ছায়াতলে সবাইকে নিয়ে আসার আয়োজন চলে। নতুন রাষ্ট্রে, নাপাওয়ার বেদনায় কাতর শুধু কৃষকশ্রমিক নন, এই নাপাওয়ার দলে ছিল মধ্যবিত্ত, বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বুর্জোয়ারাও।

তাই ভাষার প্রশ্নে, স্বাধীনতা লাভের পরপরই বিস্ফোরণ ঘটে পাকিস্তানে। সেই মহা বিস্ফোরণের নাম ’৫২র ভাষা আন্দোলন। আমাদের মনে রাখা দরকার

১৯৫২ সনের রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি ছিল উপলক্ষ্য মাত্র, কারণ নয়। যদি তাই হত তাহলে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর অনেক আগেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হয়ে যেত। ইংলিশ স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমাগত বৃদ্ধি না পেয়ে বন্ধ হয়ে যেত।” (ননী দত্ত, ঐ পৃঃ ২০)

(এ বিষয়ে বিস্তারিত পাবেন, অধ্যাপক ননী গোপাল দত্তের সমাজ ভাবনা, ১ম খন্ড)

তাই এ আন্দোলন শুধু কথা বলার অধিকারের আন্দোলনে আটকে না থেকে বেরিয়ে এল আরও অনেক দাবী নিয়ে।

১৯৫২ সনের পর থেকে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের জন্য এবং সাম্রাজ্যবাদের সাথে বিভিন্ন গোলামী চুক্তি বাতিলের দাবীতে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে।” (অধ্যাপক ননী গোপাল দত্তের সমাজ ভাবনা, পৃঃ ১০)

কিন্তু এই বিস্ফোরণকে অপহরণ করার জন্য তৎপর হয়ে উঠে শাসকগোষ্ঠি। সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে, দলের প্রধান হন, এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা থেকে সরে আসেন। ফলে পুরস্কার হিসাবে পেয়ে গেলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদ। আর এই পদ অলংকৃত করে তিনি সদম্ভে ঘোষণা করেন, পূর্ব বাংলাকে ৯৮% ভাগ স্বায়ত্বশাসন দেয়া হয়েছে। (সংক্ষিপ্ত, পৃঃ ১০, )

ব্রিটিশ বা পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের ফসল যাদের ঘরে ওঠবার কথা ছিল, ওঠেনি। বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পরপর যেখানে শান্তির বাতাস বয়ে যাবার কথা ছিল, যায়নি। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শিক্ষানীতি নিয়ে দাবীটুকু কোন সরকার বাস্তবায়িত করেনি, করবে না; এটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা অস্বাভাবিক আনন্দ প্রকাশ করেছি সামরিক শাসন অবসানের পর পর। আমরা উল্লাস করেছি, পাকিস্তানের জন্য, বাংলা দ্বিখন্ডিতকরণের শাসকগোষ্ঠির উৎসবে। আমরা আপ্লুত হয়েছি বাংলাদেশ পেয়ে। কিন্তু আমাদের কান্না থামছে না। এত প্রাপ্তি, এত ব্যর্থতা, অপহরণ, বিস্ফোরণের ঘটনার পরিণতি জানার পর, কান্না থামানোর উপায় জেনে যাবার কথা। আমরা কি তা জানার চেষ্টা করছি?

যদিও মতলববাজরা (বদরুদ্দীন উমর এ শব্দটা খুব সার্থকভাবে ব্যবহার করেন, স্মৃতি থেকে) প্রতিটি আন্দোলনকে, ভাসা ভাসা শব্দের মোড়কে সাজিয়ে রাখার কর্মযজ্ঞে এখনও, সমান তালে সক্রিয়, আর সক্রিয় বলে মধ্যবিত্ত এখন মেনে নিয়েছে ‘একুশ’ মানে Boimela’ বাshokdibos’

৫২র চেতনাধারী, অন্য অনেকের মতো আমিও তাই ভাবগম্ভীর পরিবেশে শোকাভিভূত! কৃষক শ্রমিক তারা এখনও তাদের দাবি নিয়ে কাতরে, অকাতরে মরছে, মরুক।

আজ ২১ শে ফেব্রুয়ারি, আসুন আমরা আরও একবার শোকে কাতর হয়ে উঠি।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s