অনুবাদ: জোবাইদা ও আহসান

বল প্রয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয়

ডেভিড গ্রেবার

ডেভিড গ্রেবার

কাউকে লাঠি পেটার হুমকি চরম বুদ্ধিবৃত্তিবিরোধী আচরণ। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিধা রাখবেন না। আর গত কয়েক মাসে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, যখনই বর্তমান সরকারের উচ্চশিক্ষা বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে তখন তাদের প্রথম ও একমাত্র ঝোঁক হলো বলপ্রয়োগ। পুলিশি অনুপ্রবেশ, নজরদারি, নির্বাচিত ছাত্রনেতৃত্বের ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর উপর নিষেধাজ্ঞা, ফুটপাতে শ্লোগান লিখে মতপ্রকাশের মতো সাধারণ কাজের দায়ে ছাত্র গ্রেফতারের মতো ঘটনা একটি স্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা দেয়। এসব ব্যাপারে কোনো যুক্তিসঙ্গত আলোচনা হতে পারবে না। কথা বলার মতো কিছুই আর নাই। নিশ্চয়ই এসব ব্যাপারের সাথে গণতন্ত্রের কোনো যোগ নাই। জ্ঞান ও বোধের অন্বেষণ তো একটি ভোক্তাপন্য কিংবা কারিগরি প্রশিক্ষণের এক ধরণ (যা সার্বিক অর্থনৈতিক উৎপাদনক্ষমতা বাড়ায়) বলে ঘোষিত হয়েছে আগেই। তাই এসবই হলো যে কোনো প্রশ্ন বিবেচনার একমাত্র পন্থা। কেউ যদি তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে আপত্তি জানাতে জড়ো হতে চায়, জড়ো হতে চায় শিক্ষাকেন্দ্রে, জড়ো হয়ে বলতে চায় জ্ঞান ও বোধ নিছক কোনো অর্থনৈতিক পণ্যদ্রব্য নয়, বরং আদতে বহুমূল্য, তাহলে এ কাজটি তারা তখনই করতে পারবে যখন অনুমতি পাওয়া যাবে। আর এই অনুমতি পেতে হবে তাদের কাছ থেকে যারা বলছে ঠিক উল্টা কথা। আর তা না হলে শারীরিক হামলার কথা মাথায় রেখেই তাদের এগিয়ে যেতে হবে।

এই তো কিছু দিন আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে পুলিশ মোতায়েনকে (দাঙ্গা পুলিশ তো দূরের কথা) একটি জঘন্য ন্যাক্কারজনক কাজ বলে গন্য করা হতো। সাধারণ প্রতিবাদের সময়কার কথা না হয় বাদই দিলাম, অধিকার কায়েম [অকুপেশন] এবং অন্যান্য আইন অমান্যের ঘটনার সময়ও এই অবস্থা বজায় ছিল। এমনকি আমেরিকাতেও ১৯৬৮ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশ লেলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সেদেশের জনগণ মর্মাহত হয়েছিল। নিকট অতীতেও কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ প্রবেশে কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল। এক্ষেত্রে এথেন্স পলিটেকনিক বিশেষ খ্যাতিমান।

এক সময় মনে করা হতো, জ্ঞান নিজেই যেহেতু বহুমূল্য, তাই যারা এর অন্বেষণে যুক্ত কেবল তারাই তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। আবার একই কারণে এ কাজটি করার সব অধিকারও তাদের রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে ছাত্ররূপী শ্রমজীবী শ্রেণী বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি বৈপ্লবিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। এথেন্সে ছাত্ররা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করায় ক্যাম্পাসে নেমে আসে সেনাবাহিনী। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। ফলশ্রুতিতে, সামরিক জান্তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল পুলিশ ও সেনাবাহিনী নিষিদ্ধ হয়। এই নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে শিথিল করা হয়, বিশেষত ২০০৮ সালের পর থেকে, যখন এথেন্স পলিটেকনিকের মতো জায়গা থেকে পুঁজিবাদ ও অস্টারিটির বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ আবার গড়ে উঠতে শুরু করে।

এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি চালান অতিরিক্তবেতনভোগীনির্বাহীশ্রেণী, যাদের সময় কাটে কি করে ছলেকৌশলে কর্পোরেশনগুলির কাছ থেকে আরো অর্থ বাগানো যায়, সেই চেষ্টায়। এই আয়োজনের প্রতিবাদ মানে লাঠি, গুলি, পুলিশি কুকুরের মোকাবেলা। শিক্ষার বাজারি ধর্ম গ্রহণের সাথে হাতে হাত ধরে এসেছে যে নতুন চেতনা তাতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সাক্ষাৎ অস্ত্র হলো বলপ্রয়োগ। এই দুইয়ের যোগসূত্র কাকতালীয় নয়। আমাদের শাসকেরা বুঝতে পারেন, বাজার কোনো স্বাভাবিক সামাজিক বন্দোবস্ত নয়। বন্দুকের নলের সামনেই সবসময় এটাকে চাপিয়ে দিতে হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মরে গেছে।

আমরা একে কিভাবে ফিরিয়ে আনব, আজ সেই প্রশ্নের সময় নয়। ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। আমাদের চাওয়াও তা নয়। আজকের দিনের প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাইভস্ম থেকে কেমন নতুন ধরণের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নিজস্বসংগঠন গড়ে উঠতে পারে।

এই প্রশ্ন তোলারও আগে চাই পুলিশের নিরঙ্কুশ বিদায়।

.

পুলিশমুক্ত অঞ্চল

এ জায়গাটাতে প্রচণ্ড সম্ভাবনা আছে। এক দিক থেকে, আমরা যা চাচ্ছি তা মোটেও র‌্যাডিকেল নয়। পুলিশমুক্ত ক্যাম্পাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য আমাদের আছে। সেদিকে ফেরা যায়। তবে, এই যাত্রার অভিমুখ স্বাভাবিকভাবেই যারপরনাই র‌্যাডিকেল না হয়ে পারে না। কেননা এতে আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে নিজস্বসংগঠনের নীতি পুরো সমাজটাতে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সশস্ত্র গুণ্ডাদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন হোক না কেন আমাদের সাধারণ মুক্তির পথে প্রধান ধাপ? এই মুক্তি সবখানে ধীরে ধীরে গড়ে তুলবে এমন সামাজিক বন্দোবস্ত, যা লাঠি, বন্দুক আর জেলের ভয় দেখিয়ে জারি রাখতে হবে না।

বেশিরভাগ মানুষের সাধারণ মত হলো, পুলিশ না থাকলে বিশৃঙ্খলা আসবে। সবাই একে অন্যকে হত্যায় মেতে উঠবে। এই বিশ্বাস এতোই দৃঢ় যে অনেকে বলবেন এটাই স্বতসিদ্ধ: ইতিহাসে যেন তার নজির ভুরি ভুরি। আসলে এর থেকে বড় অসত্য আর কিছু হতে পারে না। গবেষণার মাধ্যমে যতটুকু যাচাই করা সম্ভব তাতে দেখা যায়, এই অনুমান সম্পূর্ণ ভুল। আজকের দুনিয়ায় বহু জায়গা, বিশেষত গ্লোবাল সাউথ থেকে পুলিশ কার্যত উধাও হয়ে গেছে। সেখানে মানুষ একে অন্যকে খুন করতে নেমে পড়েনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগে যেমন চলছিল, তেমনি জীবন চলছে। প্রায় সবক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনা বাস্তবে কমেছে। এক্ষেত্রে সোমালিয়ার মতো কিছু ঘটনা ব্যতিক্রমী। রাষ্ট্র যখন ভেঙে পরে তার আগে থেকেই সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছিল। আর রাষ্ট্র ভেঙে পরার সাথে সাথে গৃহযুদ্ধ থামেনি। (এধরণের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ আসলে উধাও হয়ে যায় না, বরং যুদ্ধরত কোনো এক পক্ষে যোগ দিয়ে অনেকটা আগের মতোই চালিয়ে যায়।)

সারা দুনিয়ায় বহু জায়গায় ভয়ংকর দৈনন্দিন সহিংসতা ঘটে। একথা অস্বীকার করা যাবে না। তবে, এদের প্রায় সবগুলি জায়গাতেই পুলিশের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। আর সাধারণত পুলিশ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার মূল হোতাদের অন্যতম। সন্ত্রাসী দল যাতে সম্পূর্ণ লাগামহীন না হয়ে যায়, সেজন্যই পুলিশ—এমন দাবি করা হলেও এসব সন্ত্রাসী দলের থেকে পুলিশকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব, আর অনেকক্ষেত্রে তারা ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করে। সারা দুনিয়ায় দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, যেখানে পুলিশ কম, সেখানে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতাও সাধারণত কম।

ধনী দেশগুলিতে পুলিশের উশৃঙ্খলা ও সহিংসতা সাধারণত ততোটা প্রত্যক্ষ রূপ নেয় না। বরং পুলিশি সহিংসতার প্রকাশ ঘটে শ্রমজীবি শ্রেণীর জীবন এলোমেলো করে দেওয়ার মাধ্যমে, ঘরকাজশিক্ষায় অনিশ্চিত অধিকারহীনতায়, পুলিশের নৈমিত্তিক আতঙ্ক নিয়ে দিনযাপনে, তাদের জীবনকে সংগঠিত করার সব পথ বন্ধ করে দিয়ে। শ্রমজীবী শ্রেণী ও অভিবাসী বসতিগুলিতে পুলিশ এমন শাসন জারি রাখে, যা কার্যত সেখানকার ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে শিক্ষায়াতনে কেউ যাতে এই ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাজনৈতিক পথে চ্যালেঞ্জ না করে সেজন্য শারীরিক আক্রমনের ভীতি জারি রাখে। ভীতি ও উশৃঙ্খলার এই ব্যবস্থা ধ্বংস করতে হলে অবধারিতভাবে যা করতে হবে তা হলো পুলিশের লাইন ঠেলে দূরে সরানো, নিজস্বসংগঠনের নীতি পুনর্প্রতিষ্ঠা, মুক্তাঞ্চল গঠন এবং যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজ বলপ্রয়োগের ভীতি পেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে বাঁচতে শিখেছে তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার মুক্ত সমাজের স্বপ্ন লালন।

আমাদের বারংবার শেখানো হয়েছে, একলা স্বাধীন ছেড়ে দিলে আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা দানব জেগে ওঠবে আর আমরা একে অন্যকে হত্যায় মেতে উঠব। শাসকেরা চান আমরা ভাবতে শিখি, মুক্ত সমাজ অসম্ভব। ইদুঁর দৌড়ই আমাদের সহজাত ধর্ম। উচ্চশিক্ষার টুটি চেপে ধরার একটা কারণ, উচ্চশিক্ষা মিথ্যাকে স্পষ্ট করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। দুনিয়া আসলে কিভাবে চলে তা শেখার পথ করে দেওয়ার জন্যই কেবল টুটি চেপে ধরা নয়, বরং এটা করা হয় স্বশাসনের ক্ষেত্র হিসেবে উচ্চশিক্ষার পরিসরের ঐতিহ্যের জন্যই, যেখানে গভীর দার্শনিক বিরোধের সমাধানও পরষ্পরকে লাঠির ভয় না দেখিয়ে করার অনুশীলন আছে।

২০০৮ সাল ঘটে যাওয়ার পর, আমাদের শাসকেরা কোনো বিষয়ে তাদের উচ্চতর উপলব্ধি থাকার বিশ্বাসযোগ্য কোনো দাবি করতে পারবে না। এতোদিন তারা উচ্চতর প্রাজ্ঞতার অধিকারি বলে অর্থনীতিবিদদের সামনে ঠেলে দিত। আর অর্থনীতিবিদরাই আমাদের জীবনের সকল দিক পুনর্গঠনের দায়িত্ব পেত। কিন্তু ২০০৮ সাল দেখিয়ে দিল দিবালোকেরমতোস্পষ্টপ্রতারণা, কেলেঙ্কারিগুলিও ধরতে পারার সামর্থ্য তাদের নাই। আর তাদের চরম দস্যুপনা ও অদক্ষতার মাধ্যমে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ঘটালো। এখন তো তারা ‘পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ভাল; অন্তত এজন্য যে পুঁজিবাদ সমাজকে অধিকতর মুক্ত, সুষ্ঠু ও সমৃদ্ধশালী করে’ এমন দাবিও তেমন করে না। শাসকদের হাতে এখন তাদের শেষ অস্ত্র: বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়া, বিকল্প হয়ে উঠার যে কোনো সম্ভাবনা দেখা মাত্র উপরে ফেলার চেষ্টা করা এবং ‘অন্য কিছুই সম্ভব নয়’ বলে গোঁ ধরে থাকা। কিন্তু এর ফলে, আমরা যেটুকু জায়গা থেকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভয় ক্ষনিকের জন্য হলেও দূর করতে সক্ষম হই, তাতেই সুযোগ তৈরি হয় আমাদের সহযাত্রীদের সাথে সম্পর্কের নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা চালানোর। সেই নতুন সম্পর্ক বজায় রাখতে দরকার হবে না কোনো সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনীর সার্বক্ষণিক ভীতি জারি রাখা। আর সেটাই হবে তাদের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী যুক্তি। একটি মুক্ত স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় আগেকার বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে হবে না, হতে পারবে না। বরং যে নিজস্বসংগঠনের নীতির উপর দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি তারই পুনর্জন্ম ঘটবে। তাদের আছে একটাই যুক্তি: এমনটা অসম্ভব। যে মুহূর্তে আমরা করে দেখাব বাস্তবরূপে, পরিষ্কারভাবে, অন্তত একটি জায়গায় যে এটা সম্ভব, তখন সন্ত্রাসের পুরো মুখোশটাই খসে পড়তে থাকবে।।

[৪ ডিসেম্বর ২০১৩]

মূল রচনা

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s