লিখেছেন: স্বপন মাঝি

14 february-5প্রতিটি বিস্ফোরণের, অবিস্ফোরিত অতীত থাকে। ১৪ই ফেব্রুয়ারির অতীত ছিল। সেই অতীত, আমরা জানতে চাইনি বা আমাদেরকে জানানো হয়নি। অতীত নিয়ে কথা বলতে গেলে, দায় অনেক বেড়ে যায়। চাওয়াপাওয়ার তালিকা আড়ালে আবডালে রাখাটা নিরাপদ, শাসকগোষ্ঠির জন্য যেমন, ব্যর্থ দল, যারা জনগণের মুক্তির কথা বলে, তাদের জন্যও।

বাংলাদেরশের অভ্যুদয় হল। জনগণ দেখল, দেখতে তাদের মতই নতুন শাসকগোষ্ঠি, যারা কথা বলে ব্রিটিশদের মত, পাকিস্তানের মত, তাদের আচরণে খুব দ্রুত মোহভঙ্গ হতে শুরু হল, এই মোহ ধরে রাখার জন্য শাসকগোষ্ঠি প্রাণান্ত চেষ্টা করেছে সবকিছুকে আড়াল করে রাখার জন্য। তাজউদ্দীন আহমদ পর্যন্ত আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একবারও জানতে চাইলেন না, যুদ্ধের নয়টা মাস কেমন করে কাটিয়েছি’। জানার প্রয়োজন ছিল না। প্রয়োজন ছিল ক্ষমতার। সেই ক্ষমতার দাপটে শেখ মুজিব নিজেও অসহায়ের মত বলেছিলেন, ‘৭ কোটি বাঙালির জন্য ৮ কোটি কম্বল এনেছি, কিন্তু আমার কম্বল গেল কই? সবাই পায় সোনার খানি, আর আমি পাইছি চোরের খানি’।

দেশের পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর হলে, আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে জাসদ হল। সেই জাসদে যোগ এমন অনেক দেশপ্রেমিক, যারা স্বপ্ন দেখেছিল; দেশ স্বাধীন হলে, তাদের মুক্তি মিলবে। আমার বাবা ছিলেন তাদেরই একজন। আওয়ামী লীগ করতেন, যোগ দিলেন জাসদে, এবং জাসদ খুব দ্রুত দেশে ছড়িয়ে পড়ল।

পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিসহ আরও কয়েকটি সাম্যবাদী দল, উপদলের সশস্ত্র তৎপরতা দেশময় ছড়িয়ে পড়িয়েছিল। রক্ষীবাহিনী নামিয়ে নৃশংস নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সেই আন্দোলন দমন করতে করতে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছিল। ভুলে গেলে চলবে না, যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ যুদ্ধে গিয়েছিল, অচিরে তা চোরের খনিতে পরিণত হল। আর সেই খনির মালিকরা, শেখ মুজিবের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবার পর, তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দ্বিধা করল না। লুটপাট অব্যাহত থাকল জিয়ার আমলে। যুক্ত হল রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার। যদিও এ ব্যবহার শেখ মুজিবের আমলে শুরু হয়ে গিয়েছিল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ওইসিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে। জিয়াউর রহমান সেই ধারাকে আরও শক্তিশালী করে তুললেন , ’৭১ এর ঘাতকদের নিরাপদ আশ্রয় ও ক্ষমতায় আসীন করে। ঠান্ডা মাথায় খুন করার জন্য জিয়ার খ্যাতি ছিল। ক্ষমতার লোভে, তিনি খুন করেছিলেন, তার জীবনরক্ষাকারী ও বন্ধু কর্নেল তাহেরকে। এসব কিছুই জমা হচ্ছিল ভবিষ্যৎ বিস্ফোরণের জন্য।

লুন্ঠন ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার আরও নগ্ন হল, এরশাদের সামরিক শাসনামালে। ‘মজিদ খানের শিক্ষানীতি’ নামে পরিচিত সেই কুখ্যাত শিক্ষানীতি ছিল ধনিক শ্রেণীর জন্য। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, তো এই মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার জন্য, শিশুদের উপর আরবি ও ইংরেজি চাপিয়ে দেয়া হল। মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যম বিনাশের আয়োজন। ধর্মের নামে বেড়ে গেল লুণ্ঠন। এরশাদ ধর্ম নিয়ে এত সব নোংরামি করেছে, সব আজ মনে নেই, আগ্রহীরা একটু পরিশ্রম করলেই তার নোংরামির নমুনাগুলো পেয়ে যাবেন। মনে আছে আমরা তার ধর্মবোধ আর কবিতা নিয়ে হাসাহাসি করতাম। যদিও বিষয়গুলো হাসাহাসির ছিল না। নগ্ন হতে গিয়ে এতটাই নগ্ন হয়ে যেতেন, না হেসে উপায় থাকত না। মনে পড়ে, সেই সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশে, একজন ছাত্রনেতা (তার নাম মনে নেই) এরশাদকে উদ্দেশ্য করে কপাল থেকে এক বিঘৎ করে হাত নিচের দিকে নামাতে নামাতে বলতেন, মহা……কবি………ইক…………তুই আর নিচে নামিস না এরশাদ।

চারদিকে মুহুর্মুহু তালি।

৭১ এর স্বপ্ন ভঙ্গ, নতুন দেশের নতুন নতুন শাসকগোষ্ঠি, যারা মূলতঃ জনগণের কথা না ভেবে, নতুন ধনিকবনিকগোষ্ঠি উৎপাদনেই ব্যস্ত ছিলেন এসব কিছু জমা হচ্ছিল বিস্ফোরণের জন্য। ’৭১ এর পর ঘটল বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ, ১৪ই ফেব্রুয়ারি ’৮৩ তে।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র মৈত্রীর তিনজন কর্মী (পরে জেনেছি তারা আসলে ছিলেন, পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির সাথে যুক্ত) পোস্টারিং করতে গিয়ে গ্রেফতার হলেন। শিবলী কাইয়ুম, হাবিব ও আলী গ্রেফতার হলে ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।

১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এই সংগ্রাম পরিষদ গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা নেয় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো। ঠিক এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুককে গ্রেপ্তার করলে ছাত্ররা আরও ফুঁসে উঠেন। ১১ই জানুয়ারি সচিবালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচী থাকলেও তা বাতিল করা হয়। তাতে সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। সেদিন অনেকে গাছের ডাল ভেঙ্গে, ছাত্র নেতাদের দিকে ছুটে গিয়েছিল। অনেকে আবার তাদের থামিয়েছে। ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়।

মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুক ও ছাত্র মৈত্রীর তিনজন কর্মীর মুক্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে ছাত্র সমাজ।

১৪ই ফেব্রুয়ারি

নতুন দিনের ডাক। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে তিল ধারণের জায়গা নেই। মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে সচিবালয়ের দিকে। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, তার কোন শেষ নেই। সচিবালয়ের সামনে কাঁটাতারের বেড়া। আমরা অনেকে অতি উৎসাহে সেই বেড়া সরিয়ে দিতে উদ্যোগ নিতেই, আমাদের থামিয়ে দিতে,ছুটে আসে রঙিন পানির জলকামান, ছুটে আসে বুলেট। সংগঠিত মিছিলের শরীর ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শুরু হয় ইট পাটকেল বর্ষণ। গুলিতে মারা যায় জাফর, জয়নাল, শিশু দিপালী সাহা।

ছিন্নভিন্ন মিছিলের শরীর আবার জড়ো হয় কলা ভবনের সামনে। চারদিকে আওয়াজঃ আমরা সামরিক আইন ভেঙ্গেছি, এবার তোমরা আস। জাতীয় নেতাদের প্রতি তীর্থের কাকের মত তাকিয়ে থাকতে থাকতে, শেষ পর্যন্ত জাতীয় নেতারা এলেন আর গেলেন।

জাতীয় নেতানেত্রীদের চলে যাবার পরই শুরু হল, দ্বিতীয় দফায় হামলা। অবর্ণনীয় ছিল সেই হামলা। আমরা জেনে গিয়েছিলাম, আমরা আবার নতুন করে জানলাম; দেশ স্বাধীন হয়নি। সেনাবাহিনী যেভাবে ও ভঙ্গিতে সেদিন হামলা চালিয়ে ছাত্রদের পিটাতে পিটাতে ট্রাকে তুলছিল, সে দৃশ্য দেখে; মিছিলে আসা কটন মিলের শ্রমিক বারেক ভাই সশস্ত্র লড়াইয়ের পক্ষে জোর মত দিয়েছিলেন, যদিও আমরা তার কথায় কর্ণপাত করিনি।

সেনবাহিনী শত শত ছাত্রকে পিটাতে পিটাতে ট্রাকে করে নিয়ে চলে যাবার পর, মনে পড়ে; মোহন রায়হান রোকেয়া হলের সামনে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিচ্ছিলেন। আমরা সংখ্যায় অল্প, যারা সেখানে উপস্থিত ছিলাম, ১৫ ফেব্রুয়ারিতে হরতাল বা ধর্মঘট কথা ছড়িয়ে দিয়েছিলাম জগন্নাথ কলেজে।

১৫ই ফেব্রুয়ারি

আমি (মুদির দোকানদার), রহিম (এখন চালের আড়তদার), নুরুজ্জামান (এখন বিচারপতি), সেলিম (এখন আর বেঁচে নেই) ছাত্রলীগের তিন চার জন কর্মী (নাম মনে নেই, আমার বন্ধু) জগন্নাথ কলেজের ক্যান্টিনে, দাঁড়িয়ে ১৪ই ফেব্রুয়ারির ঘটনা বর্ণনা করে, বেরিয়ে চলে যাই কোর্টের দিকে। সেখানে কোর্টের ভেতরে প্রবেশ করে ছাত্র হত্যার ঘটনা চিৎকার করে বলতে বলতে আমরা ছুটাছুটি করতে থাকি, নেমে আসি পথে।

সেই শুরু। দেখতে দেখতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্র। মনে আছে সেখানেও জলকামান এসেছিল। সেনাবাহিনী এসেছিল। গুলি হয়েছিল। সেই সময় তিব্বতের খুব নাম ডাক, মাস্তানির জন্য। তার ছোট দুই ভাই লোটন জোটনও যোগ দিয়েছিল আমাদের সাথে।

আন্দোলনের তীব্রতায় ধার্মিকসামরিক শাসক খুনি এরশাদ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের তিনটি মৌলিক দাবি শিক্ষানীতি স্থগিত, ছাত্রবন্দিদের মুক্তি ও সীমিত রাজনৈতিক অধিকার মেনে নেয়, অর্থাৎ সামরিক শাসনের অবসান না হলেও ঘরোয়া রাজনীতির অধিকার দিতে বাধ্য হয় সামরিক সরকার।

গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের সাথে যুক্ত থাকলে ’৯০ এ এরশাদের পতনের পর আনন্দ মিছিলে যোগ দিতে পারিনি। সেদিন গবিজোটও আনন্দ মিছিল করেছিল। হয়ত সেটা মন্দ ছিল না। অনেক কষ্টের পর একটু আনন্দ দুষণীয় কিছু নয়।

আমি জানি না, ছাত্র মৈত্রির সভাপতি ফজলে হোসেন বাদশা ভাই তার সংগঠনের একজন কর্মীর কথা মনে রেখেছেন কিনা; বলেছিলাম, বাদশা ভাই বিকল্প দরকার। বাদশা ভাই বলেছিলেন, ‘আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সেই বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে’। মৌখিকভাবে এ কথাটা না বলে সেদিন যদি চলমান আন্দোলনের মধ্যে থেকেও, বিকল্প শক্তি হিসাবে বামদের নিয়ে একটা ঐক্যের ধারা গড়ে তোলা যেত, ইতিহাস অন্যরকম হত। সেই ‘’৮৩ তে কে যে কতটা কী, তাই বা কতটুকু বুঝতাম।।

ছবি:ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s