‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ :: বিস্মৃতির গহ্বরে যে সংগ্রামী চেতনা

Posted: ফেব্রুয়ারি 13, 2014 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , ,

লিখেছেন: নূরুর রহমান

14 february-2সময়টা ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্র ক্ষমতায় স্বৈরশাসক এরশাদ। সামরিক অভ্যূত্থানে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর নিজের অবৈধ শাসনশোষণকে পাকাপোক্ত করার জন্য দেশে জরুরী আইন জারি করে। গণতান্ত্রিক সকল অধিকার স্থগিত। ততোদিনে এরশাদ আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা দেশটাকে মগের মুল্লুকে পরিণত করেছে, যা ইচ্ছা তাই করছে। মিছিলমিটিং, সভাসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। হরণ করা হয় মত প্রকাশের সব ধরনের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। জনগণের মধ্যে চাপা অসন্তোষ, কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কথা বলতে পারছে না। কোথাও কোন প্রতিরোধ নেই। চারিদিকে একটা থমথমে অবস্থা। এই রকম এক গুমোট অবস্থায় প্রতিবাদে গর্জে ওঠে ছাত্র সমাজ। সেটা ছিল এরশাদের সামরিক শাসন আর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ।

স্বৈরশাসক বুঝতে পারলো যে, তার অবৈধ শাসন নিষ্কন্টক আর নির্বিঘ্ন হবে না। সেদিন মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি বাতিল, বন্দী মুক্তি ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ সমাবেশ ডাকে। বিনা উস্কানিতে সেই সমাবেশে পুলিশ গুলি চালায়। জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালীসহ সারাদেশে প্রাণ দেয় ১০ জন। গ্রেপ্তার হয় ১ হাজার ৩৩১ জন। হয়ত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষেরাই সেদিন বুঝতে পেরেছিল অদূর ভবির্ষতে ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে গণঅভ্যূন্থানের যে মহাকাব্য রচিত হতে যাচ্ছে, এটা ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের বীজ বপন। সেই থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি পালিত হয় ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে!

সেই সময় রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের অবৈধ্য ক্ষমতা দখলকে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়। এমন কি সামরিক শাসন আর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর কোন প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারেনি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মাথা নত করেনি। যেহেতু সামরিক আইনের কারণে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো সম্ভব ছিল না, তাই তারা গোপনে সংগঠন সংগ্রাম গড়ে তোলার নীতি গ্রহন করে। এই সব তৎপরতার অগ্রভাগে ছিল বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো। তাই বলা যায় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের শুরু করেছিল এদেশের অকুতোভয় ছাত্র সমাজ। ছাত্র সংগঠনগুলো সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রদান করা হয়। সেটাই ছিল সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম লিখিত প্রতিবাদ।

এরশাদের সামরিক শাসন জারির প্রথম দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করে। সরকারি আইন জারির কারনে সে সময় সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকান্ড প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দেয়াল লিখন চালিয়ে যেতে থাকে। সামরিক সরকারের নির্দেশে ছাত্রদের সেই দেয়াল লিখন বারবার মুছে দেয় পুলিশ বাহিনী। পুলিশ যত বারই দেয়াল সাদা চুন দিয়ে লেখা মুছে দিতে থাকে, ততবারই ছাত্ররা দেয়াল লিখন চালিয়ে যেতে থাকে। এভাবেই সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছিল। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের প্রাথমিক প্রস্তুতি। ২৪ মার্চ কলাভবনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয় ছাত্রনেতা শিবলী কাইয়ুম, হাবিব ও আ. আলী। পরে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালতে তাঁদের সাত বছরের কারাদন্ড হয়। সেই থেকে শুরু হয় সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আপসহীন লড়াই।

পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ব বাংলার ছাত্রদের প্রধান দাবি ছিল একটি সুলভ, সার্বজনীন, বৈষম্যহীন, বৈজ্ঞানিক ও গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতি। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবি প্রণয়ন করেছিল। এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরপরই তাঁর শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়। সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আর শিক্ষা সংকোচন তার প্রণীত শিক্ষানীতির ভিত্তি। এ নীতিতে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বাংলার সঙ্গে আরবি ও ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। এ নীতি ছিল শিক্ষা অর্জনের জন্য মাতৃভাষার গুরুত্ব উপেক্ষা এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের দৃষ্টান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও শিক্ষার ব্যয়ভার যারা ৫০% বহন করতে পারবে তাদের রেজাল্ট খারাপ হলেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয় এই শিক্ষানীতিতে। ফলে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো দরিদ্র মানুষ। ছাত্ররা এ নীতির ব্যাপক বিরোধিতা করেন। ১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের শিক্ষা দিবসে এ শিক্ষানীতি বাতিল করার পক্ষে ছাত্র সংগঠনগুলো একমত হয়।

১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গণসাক্ষরতা অভিযান চলে। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মজিদ খান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়। এ সংগ্রামকে প্রতিরোধ করতে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুককে গ্রেপ্তার করলে ছাত্ররা আরো ফুঁসে ওঠেন। তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। এবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি হাতে নেয়। দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩। ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে যোগ দেন। এটা ছিল অনেকটা উৎসবের মতো। হাইকোর্টের গেট ও কার্জন হলসংলগ্ন এলাকায় মিছিলে ব্যারিকেড দেয়া হয়। ছাত্ররা ব্যারিকেড ভাঙার কোন চেষ্টা করেনি। নেতারা তারকাঁটার ওপর উঠে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন।

কিন্তু কোনো উসকানি ছাড়াই পুলিশ তারকাঁটার সরিয়ে রায়ট কার ঢুকিয়ে দেয়, রঙিন গরম পানি ছিটাতে শুরু করে। এরপর বেধড়ক লাঠিচার্জ শুরু করে। সাধারণ ছাত্ররা তখন এদিকসেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। শুরু হয় পুলিশের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া পাল্টাধাওয়া। এক পর্যায়ে পুলিশ ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল। পুলিশ সেদিন জয়নালকে গুলিবিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার শরীর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। বেয়নেটের ফলায় জয়নালের শরীর থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত বাংলার পথপ্রান্তর ভাসিয়ে দেয়। শুধু জয়নাল নয়, ছাত্রদের ওপর পুলিশী তান্ডবের সময় শিশু একাডেমীতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা দিপালী নামের এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। তবে দিপালীর লাশ পুলিশ গুম করে ফেলে। জয়নাল পড়েছিলেন কার্জন হলের সামনে। তাঁকে ধরে ঢাকা মেডিক্যালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। আরো অনেকে নিখোঁজ হয়। তাদের জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থায়ই পাওয়া যায়নি। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে যেসব ছাত্র সকালে মিছিলে আসেননি, তারাও বিকেলে জয়নালের জানাজায় বটতলায় উপস্থিত হন। হাজার হাজার সাধারণ মানুষও উপস্থিত হয়।

পুলিশ সেদিন শুধু হত্যা করেই স্থির থাকেনি, বিকেলে ক্যাম্পাসে একটি যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি করে সেনাবাহিনী। তার সঙ্গে যোগ দেয় বিডিআরপুলিশ। শাহবাগ, টিএসসি চত্বর, কলাভবনের সামনে, নীলক্ষেত, কাঁটাবনের রাস্তা ধরে পুরো অঞ্চল তারা ঘেরাও করে ফেলে। অপরাজেয় বাংলার সমাবেশে পুলিশ অতর্কিত লাঠিচার্জ শুরু করে। এ সময় বহু ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। উপাচার্যের কার্যালয়ে ঢুকে পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের মেরে হাতপা ভেঙে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনার প্রতিবাদে তৎকালীন উপাচার্য পদত্যাগ করেন। কলাভবনের ভেতরে ঢুকে পুলিশ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক যাঁকে পেয়েছে তাঁকেই নির্যাতন করেছে।

14 february-4ছাত্ররা জয়নালের লাশ লুকিয়ে ফেলে। লাশের খোঁজে পুলিশ চারুকলায় ঢুকে ছাত্রদের নির্যাতন ও গ্রেপ্তার করে। পুলিশ খুঁজে খুঁজে পোশাকে রঙিন গরম পানির চিহ্ন দেখে দেখে গ্রেপ্তার করে। অবশেষে মুহসীন হলের ডাইনিংয়ে লাশ পাওয়া গেলে অন্যান্য হলে লাশের তল্লাশি বন্ধ করা হয়। কিন্তু গ্রেপ্তার করে দুই সহগ্রাধিক ছাত্রজনতাকে। সরকারি হিসাবেই এ সংখ্যা এক হাজার ৩৩১ জন। গ্রেপ্তারকৃতদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় শাহবাগের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। এরপর তাঁদের তুলে দেওয়া হয় সেনাবাহিনীর হাতে। বন্দি ছাত্রজনতার ওপর প্রথমে পুলিশ ও পরে সেনাবাহিনী নির্যাতন চালায়। মেয়েদেরও গ্রেপ্তার করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রবল চাপের কারণে তাঁদের ১৫১৬ তারিখের মধ্যে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

স্বৈরাচারি এরশাদের বিরুদ্ধে এটাই ছিল প্রথম ব্যাপকতর বিদ্রোহ। এর আগে এত বড় বিদ্রোহ আর হয়নি। এর বাঁধভাঙা ঢেউ লাগে চট্টগ্রামেও। এই ঘটনার প্রতিবাদে মেডিক্যাল ও অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল শুরু করে। সেই মিছিলেও পুলিশ গুলিবর্ষণ ও লাঠিচার্জ করে। এতে শহীদ হয় কাঞ্চন। অসংখ্য মানুষ প্রাণ দেয় এ আন্দোলনে। তবে আন্দোলনটি সফল হয়। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের তিনটি মৌলিক দাবিতে শিক্ষানীতি স্থগিত হয়ে যায়। ছাত্রবন্দিদের মুক্তি দাবীতে তিনজন বন্দিদের মুক্তি দেয়া হয়। সামরিকতন্ত্রের অবসান না হলেও ঘরোয়া রাজনীতির অধিকার দিতে বাধ্য হয় সামরিক জান্তা। আন্দোলনের সামনে সামরিক স্বৈরাচার মাথানত করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ছেড়ে দেয় এক হাজার ২১ জনকে এবং আটক রাখে ৩১০ জনকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন স্থগিত করে সরকার। তারপর থেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু এই দিবসের সংগ্রামী চেতনাকে ধ্বংস করতে আজও চেষ্টা করে চলেছে শাসকশ্রেণী।

সামরিক স্বৈরাচারের কয়েক বছর না যেতেই ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসাবে পালনের জন্য শাসকশ্রেণীর অন্যতম মুখপত্র যায়যায়দিন প্রচারপ্রচারণা শুরু করে। এর উদ্দেশ্য হলো তরুণ সমাজের স্বৈরাচার বিরোধী চেতনাকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র। ভালবাসা দিবসের নামে তারা ‘আমি আর তুমি’র মত চরম স্বার্থপর, সমাজবিচ্ছিন্ন চেতনা যুব সমাজের মধ্যে বেশ সফলভাবেই চাপিয়ে দিতে পেরেছে। প্রেমভালোবাসার মত স্বাভাবিক সম্পর্ককে অতিপ্রাকৃত বিষয়ে পরিণত করে তরুণদের আফিম নেশার মত বুঁদ করে ফেলেছে। এ ব্যক্তিগত ভালোবাসার একপিঠে কাম, আরেক পিঠে কর্পোরেট কালচারের উস্কানি। আর ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ উদযাপনের সংস্কৃতি ঠিক এ জোয়ারকেই জোরদার করছে। শাসকশ্রেণী এ থেকে লাভ তুলে নিচ্ছে দু’ভাবে; সমাজের সবচেয়ে প্রাণবন্ত লড়াকু অংশ যুব সমাজকে মুক্তির লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন ও উদাসীন করে ফেলে এবং দিনটিকে বাণিজ্যের উৎসবে পরিণত করা। একটি মহল অনেক কায়দাকৌশল করে ছাত্র আন্দোলনের গৌরবময় এ ইতিহাসকে ঢেকে দেওয়ার জন্য পশ্চিমা সংস্কৃতির ভ্যালেন্টাইনস ডে’ কে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিক চেতনাহীন করাই এর উদ্দেশ্য। আন্দোলনের তিন দশক পার হতে নাহতেই হারিয়ে গেছে জয়নালদিপালীদের নাম। আমি তুমি টাইপের ব্যক্তি কেন্দ্রিক ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে স্বৈরাচারপ্রতিরোধ দিবস। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দিনটিতে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ স্বৈরাচারপ্রতিরোধ দিবস হিসেবেই পালন করে আসছিল।

যে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালীসহ লাখো শহীদ প্রাণ বিসর্জন দিয়ে গেছে তারা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। রক্তের অক্ষরে যাঁরা আমাদের গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন, তাঁদের জন্য অবহেলা ছাড়া আমরা কিছুই দিতে পারিনি। এমন কি সেই গণতন্ত্রকেও রক্তা করতে পারিনি। সেই পতিত স্বৈরাচার এরশাদ আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে বিশ্বাঘাতকতা করে কখনো আ’লীগ কখনো বিএনপি এই স্বৈরাচারকে ব্যবহার করেছে। ক্ষমতায় আহরণের সিড়ি হিসেবে তাকে ব্যবহার করেছে। আজ দেশে নতুন করে স্বৈরশাষণ আর ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ আর সম্প্রসারণবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃতূমি। একটি স্বাধীনভূখণ্ড পেলেও এদেশের জাতি জনগণ আজও মুক্তি পায়নি। কিন্তু তাদের মুক্তির আকাঙ্খা কখনো দমেনি তার লড়ায় কখনো থামেনি। শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে এ লড়াইকে সংগঠিত করার দায়িত্ব নিতে হবে আজকের তরুণ প্রজন্মকেই।

আমরা যখন কোন বিশেষ দিন বা কারো জন্মমৃত্যুর দিবস পালন করি তার মানে এটা নয় যে সেই দিন বা ব্যাক্তির অর্থহীন স্মৃতিচারণ করা। তার অর্থ এটাই যে সেই বিশেষ দিন বা ব্যক্তির সংগ্রামী চেতনা বা আদর্শকে ধারণ করা। সেই চেতনায় নিজের চেতনাকে আরো শাণিত করা। যদি আামরা এটা না করতে পারি তাহলে সেই স্মৃতিচারণের মর্মার্থ নিরূপণে ব্যর্থ। ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’র এটাই তাৎপর্য। এরশাদের পতন হয়েছে কিন্তু স্বৈরশাসনের অবসান হয়নি। দেশে এখনো স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী কায়দায় শাসনশোষণ চলছে। ক্রসফায়ারের নামে চলছে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড। জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামকে দমন করা হচ্ছে। এই রকম এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে স্বৈারাচার বিরোধী দিবসের প্রাসঙ্গিকতা আজ অনেক বেশি। তাই বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে তুলে আনতে হবে স্বৈরাচার আর ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের চেতনা। তাকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। দেশের সকল ছাত্রযুব, শ্রমিককৃষকসহ সংগ্রামীমেহনতি ব্যাপক নিপীড়িত জনগণকে শাসকশ্রেণীর স্বৈরশাসন আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে আসতে হবে।।

(কৃতজ্ঞতা: সকল তথ্য উপাত্তের জন্য প্রগতির পরিব্রাজ দল (প্রপদ)’র একটি পুস্তিকার সাহায্য নেয়া হয়েছে। লেখক)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s