তিন দখলদারের মাতব্বরী :: ক্রিকেটে বাণিজ্যের পসরা

Posted: ফেব্রুয়ারি 9, 2014 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

icc_logoঅবশেষে আইসিসিতে উত্থাপিত বহুল আলোচিতসমালোচিতবিতর্কিত প্রস্তাবটি আংশিক সংশোধিত আকারে গৃহীত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কাঠামো, প্রশাসন এবং বিশেষতঃ অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা এই প্রস্তাব পাসের মধ্য দিয়ে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংগঠন আইসিসিতে আধিপত্য কায়েম হয় ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ডের

শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সিঙ্গাপুরেএক হোটেলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসির এক সভায় ভোটাভুটির মাধ্যমে পাস হওয়া এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় আইসিসির দশটি পূর্ণ সদস্য দেশের মধ্যে বাংলাদেশসহ আটটি পূর্ণ সদস্য দেশ। শ্রীলংকা এবং পাকিস্তান ভোটদানে বিরত থাকে।

trio_cricket-boards-logoভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ডের প্রাথমিক প্রস্তাব ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে দুবাইয়ের বৈঠকে সেই প্রস্তাবে কিছু সংশোধনী আনা হয়। যা মূলতঃ বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমর্থন লাভের জন্যই করা হয়। উল্লেখ যে, পূর্বের প্রস্তাবে “দ্বিস্তরবিশিষ্ট টেস্ট ক্রিকেট”কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আপত্তি তুলেছিল। আর দক্ষিণ আফ্রিকার আপত্তি ছিল আইসিসিতে তিন বোর্ডের অগাধ ক্ষমতা ও অর্থের বন্টনকে কেন্দ্র করে।

সংশোধিত প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, আইসিসির সহযোগী সদস্যদের মধ্যে আগামী ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের বিজয়ী দেশ র‍্যাঙ্কিংয়ের সর্বনিম্নে থাকা দেশের সাথে টেস্ট খেলার সুযোগ পাবে এবং বিজয়ী হলে টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জন করবে। তবে বর্তমান টেস্ট স্ট্যাটাসপ্রাপ্ত দেশগুলোর সেই স্ট্যাটাস হারানোর সম্ভাবনা এই প্রস্তাবে নেই।

এই প্রস্তাব পাশের ফলে আইসিসির প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, খেলার সূচি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরণের পরিবর্তন আসবে।

আইসিসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে খেলার সূচি চূড়ান্ত হবে, দুটি সদস্য দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে। নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রাম বা এফটিপি নিশ্চিত করবে তারা।

অর্থাৎ, বাণিজ্যিকভাবে লাভবান ট্যুরগুলোকেই যে মূল্যায়ন করা হবে, অপরদিকে র‍্যাঙ্কিংয়ে নিচের সারির দলগুলোকে নগণ্য পরিমাণ খেলার সুযোগ দেওয়া হবে, তা বলাই বাহুল্য। যার মানে হলো দ্বিপাক্ষিকভাবে চুক্তি করে খেলার ক্ষেত্রে র‍্যাঙ্কিংয়ের উপর দিককার দলগুলো বা তাদের বোর্ডসমূহ তলানিতে থাকারা বাংলাদেশজিম্বাবুয়ের সাথে খেলতে চাইবে না, যার মানে হলো তুলনামূলক দুর্বল দলগুলো নিজেদেরকে বিকশিত করার সমসুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যেখানে বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য পাওনা থেকে, সেখানে বিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড)-এর এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়া এবং এর পক্ষে প্রচারণা চালানোকে প্রাক্তন ক্রিকেটার ও ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকারের ভারতের প্রতি নতজানু চরিত্র বলেই উল্লেখ করেছেন। তাদের যুক্তি হলো, এই বোর্ড পরিচালিত হচ্ছে সরকারি দলের দ্বারা, আর সরকারি দল ভারতের ওপর নির্ভরশীল। তাই ক্রিকেট বোর্ডের চরিত্রেও এর প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়েছে।

এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই তিন দেশ আইসিসি রাজস্বের বেশিরভাগ অংশ পাবে। তবে অন্য টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর জন্য থাকছে টেস্ট ক্রিকেট তহবিল, যার আওতায় টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোকে ২০২৩ পর্যন্ত তাদের দেশে নির্ধারিত টেস্ট ম্যাচগুলো অনুষ্ঠান করার জন্য সহায়তা দেওয়া হবে। অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশ তাদের অবদান অনুযায়ী অর্থনৈতিক স্বীকৃতি পাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

টেস্ট ক্রিকেটকেই এই কর্পোরেট পূজারীরা বিলুপ্ত করে দিতে চাইছে। তারা এই চাঁদার লোভ দেখালেও মূল উদ্দেশ্য হলো, টেস্ট ক্রিকেটকে কেবল গুটিকয়েকের মাঝে সীমাবদ্ধ রেখে বিশ্বব্যাপী টিটুয়েন্টি নামক বাণিজ্যের মেলা সাজিয়ে বসা, আর এই বিপুল সম্পদের ভাগবাটোয়ারার প্রধানাংশ নিজেদের মধ্যেই বন্টন করা।

এদিকে, নতুন প্রস্তাবনা ছাড়াও আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শনিবারের বোর্ড মিটিংয়ে। সিদ্ধান্ত মতে,সামনের ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের বিজয়ী দল টেস্ট র‌্যাংকিংয়ের তলানির দলের বিপক্ষে প্লেঅফ খেলবে। প্লেঅফে জিততে পারলেই টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে যাবে সহযোগী দেশটি।

পক্ষান্তরে,টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বিষয়ে নেওয়া হয়েছে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৭ ও ২০২১ সালে দুটি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আসর বসবে। এই ওয়ানডে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ব্যাঙ্কিংয়ে ওপরের দিকে থাকা আট দল। অর্থাৎ, এখানেও তাদের বাণিজ্যিক চিন্তাটাই মুখ্য। টেস্ট খেলায় দর্শক কম, বাণিজ্য কম, তাই এর স্থলাভিষিক্ত হবে ওয়ানডে। আর যেহেতু র‍্যাঙ্কিংয়ে নিচের দিককার দলগুলোর খেলায় বাণিজ্যের পসরা কিছুটা ফিঁকে, তাই এদের ছেঁটে ফেলতে হবে। ক্রিকেট যাক চুলোয়, বানিজ্যটাই প্রধান।

shreeniএছাড়াও আগামী জুলাই থেকে দু’বছরের জন্য তিন আধিপত্যবাদী বোর্ডের তিনজন সদস্য আইসিসির মূল তিনটি পদে থাকবেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকবেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান এন শ্রীনিভাসন।

এক্সিকিউটিভ কমিটি (এক্সকো) নামে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে যার স্থায়ী সদস্য হবে আধিপত্যবাদী তিন বোর্ড ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড। আর বাকি সাতটি বোর্ড থেকে আসবে এর অন্য দুজন সদস্য। নতুন এই কমিটির প্রধান হবেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান ওয়ালি এডওয়ার্ডস। ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান জাইলস ক্লার্ক থাকছেন গুরুত্বপূর্ণ ফিনান্স অ্যান্ড কমার্শিয়াল অ্যাফেয়ার্স কমিটির দায়িত্বে।

ক্ষমতার এই কুক্ষিকরণ বোর্ড তথা ঐ রাষ্ট্রসমূহের দখলদারী মনোভাবেরই প্রতিফলন। যেখানে ক্রিকেটের স্বার্থ নয়, বরং কর্পোরেট স্বার্থে ক্রিকেটের বাণিজ্যিক ব্যবহারটাই এদের একমাত্র কর্ম।

এদিকে আইপিএল (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ)-এর বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় বিভিন্ন বোর্ড তাদের দেশেও টিটুয়েন্টি টুর্নামেন্টের দিকে এগিয়েছে। আর এ কারণেই ভারতীয় ক্রিকেট কর্তাদের মতামত হলো আইপিএলকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া, যেন অন্যান্য দেশে এমন টিটুয়েন্টি টুর্নামেন্টের আগমণ না ঘটে। বরং আইপিএলটাকেই সবাইকে গিলতে হবে গ্লোবাল প্রডাক্ট হিসেবে।

এই লক্ষ্যে আরব আমিরাত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার কথা আলোচনায় এসেছে বেশ জোরেসোরে। আগামী এপ্রিলমেতে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) বিকল্প ভেন্যুর সন্ধানে বাংলাদেশ সফর করেছেন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ (আইএমজি)। তারা গত শুক্রবার ঢাকার মিরপুর ভেন্যু পরিদর্শন করেছেন, আজ ফতুল্লা স্টেডিয়ামে যাবেন।

ভারতীয় বোর্ডের এই আগ্রাসী কর্পোরেট আচরণ গত কয়েক বছর ধরেই পরিলক্ষিত হয়েছে। যে বাণিজ্য তাদের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেতবে যেহেতু ঐ তিন দেশ বেশি ট্যুর করবে, বেশি কর্পোরেট ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করবে, বেশি বেশি মিডিয়ার পাবলিসিটি পাবে, তাই তাদের ক্রিকেটের বাণিজ্য থাকবে সর্বদা। এ সময়ে অন্য কারো খেলা থাকলে তো দর্শক ও কর্পোরেটের ক্ষেত্রে বিভক্তি আসতে পারে, তাই আইপিএলই ছড়িয়ে পড়বে চারিদিকে। অন্য কোনো নামে তা চলতে দেওয়া যাবে কেন!! ছলেবলেকৌশলে তাদের স্বার্থটাই মুখ্য।

সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, এবার নাকি আইপিএল ফাইনালে ছক্কা মারলেই সেই ব্যাটসম্যান হয়ে যাবেন কোটিপতি! এক কোম্পানি আইপিএল ফাইনালে ছক্কা প্রতি কোটি টাকা দেওয়ার এই অফার দেয়। এ কথাটি উল্লেখ করলাম কেবল এটি দেখাতে যে, যা কিছু আছে তাদের সামনে, তারা সবকিছুই পণ্যে পরিণত করেছে, ক্রিকেট, তার খেলোয়াড়, আম্পায়ার, মাঠ, মিডিয়া, স্ট্যাডিয়াম, থেকে দর্শক পর্যন্ত, সর্বত্রই কর্পোরেট আর বাণিজ্যের দামামা। শ্রীলংকাপাকিস্তান এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়নি, এর মানে এই নয় যে, তারা কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। বরং তারা মূলতঃ আরো কিছু সুযোগসুবিধা পেতে চেয়েছিল, যেটুকু পেলে তারা তিন দখলদারকে সমর্থনও দিত নিশ্চিতভাবেই। ক্রিকেটের এই আকালে যতোক্ষণ পর্যন্ত না প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটাররা, ক্রিকেট অনুরাগীদের সাথে নিয়ে এই কর্পোরেট আগ্রাসন থেকে মুক্তির জন্য এগিয়ে আসছেন, ততোক্ষণ এ থেকে ক্রিকেটকে মুক্তি করাও অসম্ভবের কাছাকাছি।

সমালোচকদের মতে, ক্রিকেট বর্তমানে কেবল খেলার মাঝে আঁটকে নেই, এটি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। যেখানে একজন ক্রিকেটার পণ্যের বিজ্ঞাপন করছেন, নিজেও পণ্যে পরিণত হচ্ছেন, আর ক্রিকেট তার নান্দনিকতার আকর্ষণ হারাচ্ছে জুয়ার আসরে। সাম্প্রতিক সময়ে জুয়ার প্রভাব ও ম্যাচ ফিক্সিং ক্রিকেটে মহামারির আকার ধারণ করেছে।

সাবেক কয়েকজন ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট বোদ্ধারা টেস্ট ক্রিকেট ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের কথা বলে আসছেন কয়েক বছর ধরে। আর তারা কয়েকটি ক্রিকেট বোর্ড এবং আইসিসিকেই এই ষড়যন্ত্রের হোতা বলে দূষছেন। তাদের মতে, যেহেতু টেস্ট ক্রিকেট সময় সাপেক্ষ, তাই এতে দর্শকদের উন্মাদনা তুলনামূলকভাবে কম, তাই টেস্ট ক্রিকেটে ব্যবসায়িক ফায়দা কম। অপরদিকে, ওয়ান ডে বা টিটুয়েন্টি ক্রিকেট খুবই কম সময়ে ফলাফল আসে বলে, এতে দর্শক বেশি, তার মানে বেশি কর্পোরেট বাণিজ্য, যার মানে ক্রিকেট বোর্ডের লাখো ডলারের ফায়দা। আর এরই সাথে আসে বাজিকরদের উন্মাদনা আর ম্যাচ ফিক্সিংয়ের (পাতানো খেলা) খড়গ। যা ক্রিকেটকে ক্রমাগত কলুষিত করছে।

এমন জুয়া আর ম্যাচ ফিক্সিং শুধু ক্রিকেটকেই আঘাত করছে এমনটিও নয়, তাতে জুয়ার বলি হচ্ছে মানুষের আবেগ। আর ক্রিকেটাররা ক্রমেই পরিণত হচ্ছেন টাকার পুতুলে, যাদের নিজের মত প্রকাশের উপরেও শর্ত আরোপ করে কর্পোরেট কোম্পানি আর কর্পোরেট ক্রিকেট বোর্ড। যে এলিট ক্রিকেট বোর্ডসমূহ নিজেদের এই বনেদী প্রস্তাবনায় তাদের উচ্চাভিলাষ আর বাণিজ্যের চিন্তাটাকেই তুলে ধরেছেন। আর এই বনেদী তত্ত্ব আর কর্পোরেট প্রভাবে ক্রমেই নিষ্প্রভ হচ্ছে নান্দনিক ক্রিকেটের জৌলুস। যার ভাগশেষ কর্পোরেট ক্রিকেট।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s