লিখেছেন: বখতিয়ার আহমেদ

ru-movement-21ক্যাম্পাস পরিস্থিতি গত দুইদিন স্নায়ুতন্ত্রে এমন চাপ সৃষ্টি করে রেখেছিল যে কাজকর্ম লাটে উঠেছিল। নিজের অফিসে ঢুকতে পারছিলাম না বিকেলের আগে, ধর্মঘটের জন্য ছাত্ররা ভবন তালা মেরে রাখছে সকালবেলা। কাজ সামলাতে পরশু রাত জেগেছি, সকালে উঠেছি দেরিতে।

সাড়ে এগারোটার দিকে ফোকলোর বিভাগের সুস্মিতা চক্রবর্তীর ফোনে জানলাম আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলা হয়েছে। আশংকা আগেই ছিল, তারপরেও সাথে কোথাও বোধহয় আশাও ছিল, হাজার হাজার ছাত্র তো গত কয়দিনের আন্দোলনে ক্যাম্পাসের একটা পাতাও ছেড়েনি। মারবে কোন অজুহাতে?

তারপর ফোন আসতেই থাকল। নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফোন, অন্য বিভাগের পরিচিতদের ফোন, আমার চেনা অভিভাবকদের ফোন। হাজারখানেক শিক্ষার্থী নাকি আটকা পড়েছে লাইব্রেরীতে। অনেকে আহত, অনেকে অসূস্থ হয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন গলা, ভাই আমার মেয়েটা আটকা পড়েছে, কিছু একটা করেন। শিক্ষার্থীদের আকুতি, স্যার, একটা কিছু করেন।

ছুটলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না আমি কী করতে পারি? সিরাজী ভবনের সামনেই পেয়ে গেলাম গণযোগাযোগের মামুন হায়দারকে, ক’জন ছাত্রের সাথে। তাঁর বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, ফোনে ফোনে তাদের খোঁজ নিচ্ছেন। অচেনা এক ছাত্রী আমাকে দেখে কাঁদতে কাঁদতেই রোষ ঝাড়লেন, ‘মেরে কিছু রাখেন নাই স্যার, করেন এবার আপনারা নাইট কোর্স, টাকা কামান। অন্যরা তাকে নিবৃত্ত করেন।

লাইব্রেরীর দিক থেকে একটা মিছিল আসছে। সামনে বেশ ক’টা হোন্ডা। নাট্যকলা বিভাগের কিছু চেনা মুখের শিক্ষার্থী ছুটে এসে বলল, স্যার আপনারা সরে যান, ছাত্রলীগের মিছিল। বিপদ হতে পারে। ভয় লেগে গেল। আমরা হেঁটে গেলাম মন্নুজান হলের সামনে। হলের সামনে একের পর এক আহত মেয়েদের নিয়ে আসছে সহপাঠিরা। মতিহার হলের প্রভোস্টকে দেখলাম কয়েকটি মেয়েকে হলে পৌছে দিতে। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম লাইব্রেরী পরিস্থিতি, বললেন অনেক ছাত্র এখনো লাইব্রেরীর ভেতরে। অনেকে বেরুতেও চায়না।

ছাত্রলীগের মিছিল প্যারিস রোডে চলে যাওয়ার পর আমি আর মামুন অসহায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। নার্সারি স্কুলের কোনায়। মনে পড়ল দু’দিন আগে ছাত্রদের আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন দিয়ে ফেসবুকে আমি যে লেখাটি লিখেছি, পরিসংখ্যান বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসের সেটি সমর্থন করেছেন, শেয়ার করেছেন, ফেসবুকে আমার ফ্রেন্ড হয়েছেন। মামুনের কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে ফোন করলাম। স্যারকে পরিস্থিতি জানিয়ে বললাম স্যার আপনি কী আসবেন? স্যার এক বাক্যে বললেন ‘কোথায় আসতে হবে বলেন’। বললাম এবং মনে একটু সাহস ফেরা শুরু করল।

আবার অচেনা নাম্বারের ফোন। “বখতিয়ার সাহেব, আমি বাংলা বিভাগের সৌভিক রেজা। ক্যাম্পাসে তো ছাত্রদের মেরে আর কিছু রাখে নাই। আমি বাসায় চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারছি না। আমরা কিছু করতে পারিনা?”। জিজ্ঞেস করতে বললেন, তিনি কাজলায়। উনাকে নিজেদের অবস্থান জানালাম। বললেন আসছি।

ছুটতে ছুটতে সুস্মিতা পৌছালেন। একটু পর সৌভিকও। আমরা চারজন শিক্ষক একত্রিত হতে পারলাম। নাসের স্যারকে আবার ফোন দিলাম, বললেন বেরিয়েছেন। স্যারকে লাইব্রেরীর সামনে আসতে বলে আমরা রওনা দিলাম। মামুন বললেন ‘টুকিটাকিতে ছাত্রলীগ অবস্থান নিয়েছে। আমরা বেটার প্যারিস রোড দিয়েই যাই’।

লাইব্রেরী কর্ডন করে রেখেছে পুলিশ আর র‌্যাব। গেটের সামনে সাংবাদিক আর ক’জন প্রশাসনিক শিক্ষকেরা আছেন। টুকিটাকিতে অবস্থান নিয়ে আছে ছাত্রলীগ। লাইব্রেরীর ভেতরটায় গিজ গিজ করছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। বাইরে রক্তের দাগ। প্রশাসনের শিক্ষকরা বলছেন বেরিয়ে যেতে কিন্তু তাঁদের দাবি উপাচার্যকে আসতে হবে। কেন তাঁদের অহিংস আন্দোলনে হামলা হল তার জবাব দিতে হবে। এর মধ্যে কয়েকজন আহত শিক্ষার্থীকে সরানো হল। প্রশাসনের শিক্ষকেরা বাকবিতন্ডার মুখে হতাশ হয়ে ফিরে গেলেন। আমরা গেটের শিক্ষার্থীদের বললাম আমরা প্রশাসনের কেউ না, কোন দলের না। বিবেকের তাড়নায় এখানে এসেছি। আমরা লজ্জিত যে আমরা শুধু পাঁচজনই আসতে পেরেছি। আমরা সামনে দাঁড়ালে যদি আপনাদের কম মার খেতে হয় আমরা দাঁড়াচ্ছি। কিন্তু এই লাইব্রেরী আপনাদের। এটার কোন ক্ষতি করা যাবে না। আপনারা বেরিয়ে আসেন। আমরা শহীদ মিনারে চলে যাই।

ছাত্ররা মানল না। বলে, স্যার আমাদের যারা হলে চলে গেছে তাদের ছাত্রলীগ হলে হলে মারতেছে। এখান থেকে বের হলে আবার মারবে। আমরা বের হব না। নাসের স্যারের স্নেহাতুর গলা শুনে ঢুকরে কেঁদে উঠে কয়েকজন। ‘স্যার, যদি দেখতেন কীভাবে আমাদের গুলি করছেত রক্ত যদি দেখতেন

অগত্যা আমরা গেটেই দাঁড়িয়ে রইলাম। ভেতরে খাওয়ার পানির সংকট চলছে। গুলিতে আহতদের বাইরেও টিয়ার শেলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে অনেক শিক্ষার্থী। জীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এসে ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন অনেক ধৈর্য্য নিয়ে, কিন্তু প্রশাসনের কোন যুক্তিই এখন ছাত্ররা মানতে রাজী নয়। তাঁদের দাবি আগে হামলার বিচার চাই। উপাচার্যকে আসতে হবে। তাঁদের কথা শুনতে হবে। এত রক্ত যখন তারা দিয়েছে আন্দোলনের দাবি তারা আদায় করেই ছাড়বে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেন নজরুল স্যার‌ও।

এরপর প্রশাসনের কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে আসলেন লাইব্রেরীর প্রশাসক বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী। আমাদের বললেন ‘এত জায়গা থাকতে ছাত্ররা লাইব্রেরীতে ঢুকল কেন’? বললাম ‘স্যার গুলির মুখে কোথায় ঢুকছে সেই হুশ তো থাকার কথা না’। বললেন, ‘তাদের বলেন বের হতে’। আমরা বললাম চেষ্টা করেছি, ছাত্ররা বেরুবে না, ভয়‌ও পাচ্ছে আবার মার খাওয়ার। হলে যারা ফিরে গেছে তাদের উপর এখনো হামলা চলছে। তিনি বললেন আপনাদের কথা শুনবে না মানে, আপনারাই তো উসকানি দিয়ে এসব করাচ্ছেন। ক’দিন ধরে এই অভিযোগ শুনতে শুনতে এমনিতেই মনে চাপ পড়ে গিয়েছিল। বললাম, ‘স্যার, উসকানি দিয়ে এত ছাত্র নামানোর সামর্থ্য আমাদের নাই। থাকলে আমরা অনেক আগেই অনেক কিছু করতে পারতাম’। সত্যি আমাদের সেই সামর্থ্য নাই। এই পুরা আন্দোলনে আমার অংশগ্রহণ হচ্ছে ফেসবুকে শিক্ষার পণ্যায়নের বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে লেখা একটি নোট। মতামত তৈরীতে সেটার সাফল্য হচ্ছে শ’দুয়েক লাইক আর আশিটা শেয়ার যার মধ্যে বেশিরভাগই আবার রাবি সংশ্লিষ্ট কেউ নন। এর বাইরে আমি কোন মিছিলমিটিংয়েও যাই নাই। নিজের মধ্যবিত্ত পেট আর পিঠ বাঁচানোর তাগিদ আমাকে সময়সুযোগ দেয়নি। ভর্তি পরীক্ষার প্রথম ইনভিজিলেশনের টাকা পেয়ে আন্দোলনে পাঁচশ টাকা চাঁদা দিয়েছিলাম আমি। আন্দোলনে আমার অবদান এটুকুই।

চলে যাওয়ার আগে সামাদী স্যার ক্ষিপ্ত স্বরে বললেন, “সামলান তাইলে আপনারা। উসকানি যখন দিচ্ছেন তখন এরপর কিছু হলে দায়দায়িত্ব আপনাদের”। হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সামনে মারমুখী পুলিশ আর ছাত্রলীগ, পেছনে মার খাওয়া হাজারখানেক বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী পেটে নিয়ে দাঁড়ানো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। মাঝখানে আমরা পাঁচজন শিক্ষক। এখন কিছু ঘটলেই নাকি দায়দায়িত্ব আমাদের। অভিজ্ঞতা থেকে জানি ক্ষমতাবান কেউ যখন বলেন ‘কিছু ঘটলে দায়দায়িত্ব আপনাদের’ তখন কিছু ঘটার আশংকা বাড়ে।

আমার ভীতি আরো বেড়ে গেল যখন লাইব্রেরীর উলটা পাশ থেকে পুলিশ শহিদুল্লাহ ভবনের পূর্বে সরে গেল। ছাত্রজীবন থেকেই দেখেছি সরকারী ছাত্র সংগঠনের হামলার আগে কোন এক জাদু বলে পুলিশ সেখান থেকে সরে যায়। মামুনকে বললাম আমাদের বোধহয় আরো মিডিয়া দরকার, পারলে টিভি ক্যামেরাসহ। তাতে যদি কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়। সাংবাদিকতার শিক্ষক মামুন অনেক সাংবাদিক চেনেন। সাংবাদিকরা আগে থেকেই ছিলেন। মামুন আরো কয়জন জোটালেন। আমরা সাংবাদিকদের সাথে কথা বললাম। হামলার নিন্দা জানালাম, ছাত্রদের নিরাপত্তা দাবি করলাম। যতক্ষণ সম্ভব সাংবাদিকদের ধরে রাখা যায় এখানে সেই চেষ্টা করলাম। কারণ হলে হলে হামলা চলছে, ক্যাম্পাসে ভাংচুর হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। উনাদের ছুটাছুটিও কম নয়।

এর মধ্যে ছাত্র হলের দিক থেকে শ’দেড়েক ছাত্রের একটা মিছিল আসছিল। অনেকের হাতে লাঠিচ্যালাকাঠগাছের গুড়ি। বুঝতে পারছিলাম না কোথায় কী হচ্ছে। এধরণের পরিস্থিতিতে এমন সব স্থানিক জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে যেটা এই ক্যাম্পাসের ছাত্র না হলে অর্জন করা যায় না। আমি এই ক্যাম্পাসের ছাত্র ছিলাম না। উপরুন্তু পাঁচ বছর বিদেশে থেকে ফিরেছি বেশিদিন হয়নি। ভাগ্যিস মামুন ছিলেন। একজন পাশ থেকে বললেন ‘স্যার এই মিছিলটাতে ঝামেলা আছে। কেমন যেন লাগছে। এরা সবাই সাধারণ ছাত্র নয়’। আমারও মনে হল এত মার খেয়েও লাইব্রেরির ছাত্ররা তো সহিংস হয়নি। লাইব্রেরীর একটা বইয়ের পাতাও তো ছেড়েনি।

বুঝে উঠার আগে মিছিল গায়ে এসে পড়ল। আমরা প্রাণান্ত চেষ্টা করলাম তাঁদের নিরস্ত করতে। নাসের স্যারকে দেখলাম ‘বাবা শোন বাবা শোন’ বলে এক ছেলের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিতে। এর মধ্যে পুলিশ শহীদুল্লাহ ভবনের পাশ থেকে গুলি চালানো শুরু করল । মিছিলটা ছত্রভঙ্গ হয় গেল। আমরা আশ্রয় নিলাম লাইব্রেরির ভেতরে। আমাদের লাইব্রেরীর চ‌‌ওড়া সিঁড়িটা যেন মূহ‌ূর্তেই ব্যাটেলশিপ পটেমকিন ছবির ‘ওডিসি স্টেয়ারকেস’ হয়ে গেল। টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজ থেকে বাঁচার জন্য কয়েকজন ছাত্র কাগজে আগুন ধরাল, কয়েকজন এসে দেখি সেই আগুন নিভিয়ে তাদের বলল যে বাইরে থেকে পুলিশ মনে করবে আমরা লাইব্রেরিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছি। দেখলাম তিন শিক্ষার্থী রাবার বুলেটে আহত, তার মধ্যে একজন ছাত্রী। ছাত্ররা বলছে অ্যাম্বুলেন্স দরকার।

আমার বিভাগের সহকর্মী, সহকারী প্রক্টর ফারুক সরকার টুকুর ফোন নাম্বার ছিল আমার কাছে। উনাকেই ফোন করে অনুরোধ করলাম অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে। অ্যাম্বুলেন্স এল। আহতদের পাঠানো হল চিকিৎসার জন্য। নানা দিক থেকে শোনা যাচ্ছে শিবিরের ছেলেরাও নাকি ঢুকেছে। জুবেরীতে ভাঙচুর হচ্ছে। ক্যাম্পাসে ভাংচুর হচ্ছে। আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কিছু শিক্ষার্থী জানাল লাইব্রেরীতে আবার হামলার খবর পেয়ে নাকি হলের মেয়েরা জড়ো হয়ে আবার মিছিল নিয়ে আসছে লাইব্রেরির দিকে সহপাঠিদের বাঁচাতে। উনাদের বল‌লাম ‘দোহাই লাগে উনাদের আসতে মানা করেন’। এখানে পরিস্থিতি যথেষ্ট খারাপ। উনারা এলে আরো খারাপের দিকে যাবে।

চতুর্থ সাইন্স আর রবীন্দ্রভবনের মাঝের রাস্তা দিয়ে একটা বড় মিছিল আসতে দেখা গেল। ছাত্রী হলের মিছিল না। এই মিছিলের‌ও একটা জঙ্গীভাব আছে। দূর থেকে বোঝা মুশকিল হলে ছাত্রলীগের মার খেয়ে ফেরা সাধারণ ছাত্র নাকি অন্যকিছু। মিছিল কাছে আসতেই পাশ থেকে একজন বলল, স্যার অনেক সাধারণ ছাত্র কিন্তু সাথে শিবিরের কিছু ছেলে আছে। মনের যুক্তি বলল হতেই পারে, পরিস্থিতির সুযোগ তো তারা নিতেই পারেন।

মিছিল লাইব্রেরীর গেটে আসার আগেই ছাত্রদের একাংশ গেট বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিল। বাইরে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের জমায়েত। তারা হয় ভেতরে আসতে চায়, না হয় ভেতরের শিক্ষার্থীদের বাইরে এসে তাদের সাথে যোগ দিতে বলে। ভেতরের শিক্ষার্থীরাও তাদের ক্ষোভের সাথে একাত্ম। সংগঠক স্থানীয় একজনকে সামনে পেয়ে বললাম আপনারা দ্রুত একটা পরবর্তী কর্মসূচী দিয়ে আজকের মত বিক্ষোভ এখানেই শেষ করেন। টুকুকে ফোনে পরিস্থিতি জানালাম। নিরাপদে ছাত্রদের বের করে নেয়ার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানালাম। তিনি বললেন উনারা চেষ্টা করছেন। আমরা যেন যতক্ষণ পারি গেটটা আগলে রাখি।

সংগঠকরা জানালেন কর্মসূচীর জন্য উনারা বৈঠকে বসেছেন উপরে। আমরা শিক্ষকরা তাগাদা দিলাম খুব দ্রুত করবার জন্য। উনাদের দুইজন গেটের বাইরে গিয়ে একটা খিলানের উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন। মনে হল বাইরের জমায়েতটা খানিক থিতু হল। এর মধ্যেও কয়েকজন এসে গেট ঝাঁকাচ্ছেন। কিন্তু ভেতরের জমায়েত বেশ স্থির হয়ে আছে। ক্ষোভ আছে চোখেমুখে, কিন্তু সবাই খুব দৃঢ়তা নিয়ে স্থির হয়ে বসে আছেন। সামনের সারির এক ছাত্রী কেউ বাইরের উত্তেজনায় সংক্রমিত হলেই ধমক দিয়ে থামাচ্ছেন। উনাদের এই অবস্থান অনেক সাহস ফিরিয়ে দিল। কি বলা হচ্ছিল আমি শুনতে পাই নাই, কিন্তু বাইরের বক্তৃতা মিনিট বিশেক চলার পরে, যখন জমায়েতের একটা অংশ বক্তাদের সাথে একাত্ম, এবং শান্ত হয়ে এসেছেন, আরেকটা অংশকে দেখা গেল আলগোছে চলে যেতে। শুনলাম বাইরে লাগাতার ধর্মঘটের কর্মসূচী ঘোষণা করেছে ছাত্ররা।

লাইব্রেরীর শিক্ষার্থীরা খুব শান্তভাবেই নেমে এল। বাইরে তখন পুলিশ বা ছাত্রলীগ কেউ নাই। আমরা সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে পরামর্শ দিলাম হলে ফিরে যেতে। প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে। সম্ভবত আমরা বারোটার দিকে লাইব্রেরির সামনে পৌছেছিলাম। তখন বাজে প্রায় চারটা। শিক্ষার্থীরা সবাই চলে যাওয়ার পরে নাসের স্যার বিদায় চাইলেন। কৃতজ্ঞচিত্তে এ্ই কোমল হৃদয় অধ্যাপককে বিদায় জানিয়ে আমরা চারজন এসে বসলাম টুকিটাকির খাবারের দোকানে। মনে হল একটা টাইম বোমা থেকে নেমে এলাম যেটা শেষমেষ ফাটেনি।

খাবার আমাদের আর গলা দিয়ে নামছিল না। প্রচুর পানি খেলাম আমরা। দোকানে চা না পেয়ে আমরা গেলাম সিরাজী ভবনে আমার অফিসে। বিল্ডিংয়ের নীচতলার অনেক কাঁচ ভাঙা। আমার অফিসের জানলার কাঁচ‌ও বাদ পড়েনি। কফি খেয়ে জানলা একটা বোর্ড দিয়ে আগলে আমরা বেরিয়ে এলাম। বাইরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। শুনলাম মমতাজউদ্দীন ভবনে এক শিক্ষকের অফিসে আগুন জ্বলছে। নিজের বইপত্র, গবেষণা নথির জন্য দুশ্চিন্তা নিয়েই আমরা চলে আসলাম পশ্চিম পাড়ার আবাসিক এলাকায়।।

(গত ৪৮ ঘন্টার স্নায়বিক চাপ এই মূহূর্তে আমাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। রাবিতে আমি কাল যা দেখেছি, শিখেছি তা নিয়ে আমি আরো অনেক কথা বলতে চাই। বাকি অংশ লিখব, কালকের মধ্যেই। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের টেস্টিমনি খুব জরুরী বলেই পোস্ট করা। কেন জরুরী সেটা‌ও পরেরর অংশে থাকছে। ঘটনা থেকে আমি কি শিখলাম সেটাও আসছে পরের খন্ডে লেখক)

লেখক: শিক্ষক; নৃতত্ত্ব বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s