রাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুলি :: স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাশক্তির সম্প্রসারিত লক্ষ্যবস্তু মতিহার

Posted: ফেব্রুয়ারি 3, 2014 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: বাধন অধিকারী

ru-movement-17রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালিন বাণিজ্যিক মাস্টার্স কোর্স এবং বর্ধিত বেতনভাতা প্রত্যাহারের দাবিতে চলা আন্দোলনকে বরাবরের মতোই দমননীতির মধ্য দিয়ে মীমাংসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মিনি রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শনিবার রাতের আঁধারে অপারেশন সার্চ লাইটের কায়দার হানাদার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী পুলিশ আর আজকের রাজাকার বাহিনী (শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বেঈমানীর কারণে বলছি) ছাত্রলীগের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের হলে রেইড, আন্দোলনকারীদের মানসিক নির্যাতন, হুমকি, সবই সম্পন্ন হয়েছে রাতের আঁধারে। রোববার ঘুম থেকে জাগি, আমার প্রিয়তম ক্যাম্পাসে গুলির কথা শুনে। আমার চেনাজানা যারা এই আন্দোলনটাকে সংগঠিত করছেন, সেই শশীসোহানঅয়নঅনীকমুয়ীজরকিসহ অন্যদের মুখগুলো ভেসে উঠল চোখের সামনে। আমার নিরাপত্তার সাপেক্ষে ছোট্ট ছোট্ট এই ছেলেমেয়েগুলোকে বিবেচনা করে কষ্ট লাগছে। আমার চলে যেতে ইচ্ছে করছে মতিহারের সবুজ চত্বরে।

ru-movement-16রাজশাহীতে কি ঘটেছে? কী ঘটেছে ক্যাম্পাসে? সোজা কথা, মুক্তবাজারের প্রসাদ এসেছে সান্ধ্য কোর্সের নামে। স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের টাকা হরিলুটের সুযোগ এসেছে বেতনভাতা বাড়ানোর নামে। শিক্ষার্থীরা সেটায় বাধ সেধেছেন। ক্ষমতাশক্তি খেপে গেছে। এইযুগে যদি ১০০ টাকার জন্য্ মানুষ খুন করা যায়; এই যুগে শত শত শিক্ষকের টাকা কামানোর অবৈধ রাস্তা বন্ধ করে দিতে চাইবে যে শিক্ষার্থীরা তাদের গুলি করা যাবে না কেন? যাবে। যাবে বলেই গুলি হয়েছে। হামলায় ছাত্রলীগপুলিশশিক্ষকপ্রক্টর এক হয়ে লড়েছেন শিক্ষার্থীদের বিপরীতে। দেখিয়ে দিয়েছেন, গুলির সীমানা কতো বিস্তৃত হতে পারে।

সান্ধ্যকালিন মাস্টার্স কোর্স” কথাটা যতোটা নিষ্পাপ শোনায় বিষয়টি আদতেও তা নয়। আসলে এটি সান্ধ্যকালিন বাণিজ্যিক কোর্স। সার্টিফিকেট বিক্রির দোকানদারি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে অপেক্ষাকৃত কম খরচে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রাইভেট শিক্ষার দোকানদারি। খেয়াল করাটা জরুরি, শিক্ষার্থীদের বিরোধ সান্ধ্যকালিন কোর্সের সঙ্গে নয়; সান্ধ্যকালিন বাণিজ্যের সঙ্গে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করে বলেছেন; যদি এমন হয় যে শিক্ষকরা চান আরও আরও বেশি মানুষকে উচ্চ শিক্ষা দিতে; তাহলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নয়, মূল কোর্সের আওতায় সান্ধ্যকালিন শিফট তথা সেকেন্ড শিফট খুলে ফেলুক। তাহলেই আরও আরও শিক্ষার্থী নিয়মিত ব্যয়ে পড়ালেখার সুযোগ পাবে। তবে বিদ্যা দান শিক্ষকদের আগ্রহ নয়; আগ্রহ টাকা। মুক্তবাজারের প্রসাদ। রাষ্ট্রইউজিসিবিশ্বব্যাংকের নিও লিবারাল শিক্ষাপ্রপঞ্চ। যার দর্শন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব অর্থায়নে চলবে। রাষ্ট্র টাকা খরচ করবে না।

খুবই মজার ব্যাপার হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেখছি, কলামেটক শোতে এই নিজস্ব অর্থায়নের ব্যাপক গুণগান করছেন। নিজস্ব অর্থায়ন মানে যে শিক্ষার্থীর অভিভাবকের অর্থায়ন সেটা আমরা বুঝি। এটা যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইভেটাইজেশন সেটাও আমরা বুঝি। এটা যে শিক্ষাকে সবার অধিকারের জায়গা থেকে টাকাওয়ালাদের অধিকারে পর্যবসিত করবার নীল নকশা; সেটাও আমরা সবাই বুঝি। এই ষড়যন্ত্র দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর সমাজের কর্তৃত্ব কমে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। সেটা হলে যে সমাজের মঙ্গল হবে না; শিক্ষার্থীরা সেটা বুঝলেও শিক্ষকরা বোঝেন না। বুঝলে মুক্তবাজারের প্রসাদ খাওয়ার সুযোগ থাকবে কোথায়?

ru-movement-37রাবি ক্যাস্পাসে রোববার পুলিশছাত্রলীগের যৌথ গুলিকে আমাদের বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্প্রসারণ হিসেবে পাঠ করতে চাই। সেটা না করতে পারলে আমাদের বিপদ আছে। কাল পরিক্রমায় আমাদের রাজনৈতিক শক্তি নির্বিচারী হচ্ছে। নির্বিচারী স্বৈরতন্ত্রের এই আওয়ামীনেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় সরকারযুগে আমরা নির্বিচার গুলির সংস্কৃতিকে ক্রমাগত বৈধ হতে দেখেছি। রাজপথে বিরোধীদলীয় আন্দোলন দমনে নির্বিচার গুলি করেছে এই সরকারের হাতে থাকা রাষ্ট্র্র্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী। “শিবির” মিছিল করলেই গুলি করা যায়; মোটামোটিভাবে এই ভাবধারা প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে সরকার। আজ ক্যাম্পাসেও তারা সফল হতে চাইছে। সেখানেও শিবিরের ভূত খুঁজে পেয়েছেন তারা। গুলির লক্ষ্যবস্তু এবার প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা

এই শিবিরের ভূত দেখে গতকাল যাদের গুলিতে ঝাঝরা করেছে পুলিশ আর ছাত্রলীগ; তাদের একজনও কি শিবির? রাবি প্রশাসন কি জবাব দেবে? হল রেইড করে যাদের উপর নিপীড়ন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কে শিবির? রাবি প্রশাসন বলেনি। কেবল শিবিরশিবির করে ভূতের নাম নিয়েছে। ছাত্র আন্দোলনে জড়িত থাকার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি; সাড়ে চার হাজার স্টুডেন্ট রাস্তায় নামলে সেখানে শিবিরের কিছু লোকজন ঢুকবে না এটা অবিশ্বাস্য। রাজনৈতিক দলগুলো এবং এর লেজুড় ছাত্র সংগঠনগুলো বরাবরই জনআন্দোলন/ছাত্র আন্দোলনকে নিজেদের ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করতে চাইবে সেটাও স্বাভাবিক এক চলমান প্রক্রিয়া। তো এমন যদি হয়ে থাকে, বর্ধিত বেতন ভাতা প্রত্যাহার এবং বাণিজ্যিক স্বান্ধ্য কোর্স বাতিলের আন্দোলনে শিবির ঢুকে গেছে, তাহলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলেই হয়। এর জন্য গোটা আন্দোলনের শিবিরী রং দেয়াটা যে ধান্দাবাজীপ্রসূত সেটা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না।

আমরা বহু আগে জেনে গিয়েছিলাম; যেই মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধী সেই সন্ত্র্রাসবাদী, আবার যেই আল্লাহর দোহাই দিয়ে সন্ত্রাসের বিশ্বভূবন তৈরীকারীদের বিরোধী সেই ইহুদিবাদী! আমরা বহু আগেই জেনে গেছি; যেই বিএনপিজামায়াতকালে শিবিরের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বতন্ত্রের বিরুদ্ধে বলতো, সেই নাস্তিক (যেমন, হাসান আজিজুল হক) আবার আজকে এসে যেই আওয়ামী স্বৈরতন্ত্রের বিরোধী সেই যুদ্ধাপরাধীর দোসর! আমরা সবাই এখন জেনে গেছি; যেই রাবি ক্যাম্পাসে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করবে, সেই লড়াইয়ে শিবির খুঁজে পাওয়া যাবে। “শিবির” বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবতায় সরকারসমর্থক প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের সবথেকে বড় অস্ত্র। বাস্তব শিবিরের ভয়াবহতার মতোই এই ভূত “শিবির” সমান ভয়াবহ!

ru-movement-52পাঠক রাষ্ট্র আর মুক্তবাজারকে চিনে নিয়েছেন তো ভালো করে? মানুষের সম্পদ তেলগ্যাসবিদ্যুৎবন্দরপরিবেশকে মুক্তবাজারের বেনিয়াদের হাতে তুলে দেয়ার সরকারী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গেলে আমরা রাজাকার হয়ে যাই, আমরা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী এবং ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর রোষের শিকার হোই, হয়ে যাই শিবির। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে, মানে ওই মিনি রাষ্ট্রে শিক্ষাকে মুক্তবাজারের বেনিয়াদের হাতে তুলে দিয়ে তার উচ্ছিষ্টভোগের প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলে শিক্ষার্থীরা রোষের শিকার। গুলিবিদ্ধ। কিন্তু, আমি খুব জোরালোভাবে বলছি, এই গুলির সীমানা আরও বহুদূর। শিক্ষকরা টের পেয়েছিলেন ২০০৭ সালে। তবু শিক্ষা হয়নি তাদের। ২/১ জন বাদ দিলে আগস্ট আন্দোলনে নিপীড়িত সব শিক্ষক এই সরকারের উচ্ছিষ্ট ভোগ করেছে। সেকারণে শিক্ষকবুদ্ধিজীবী যারা আছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলি: স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিরোধের মুখে না পড়তে হলে তা আরও নিরঙ্কুশ হয়। সরকারের রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলির আজকের লক্ষ্যবস্তু ছাত্ররা হলে কাল আপনারাও বাদ যাবেন না। সাধবান শিক্ষক, সাবধান বুদ্ধিজীবী

মিনি রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ে অলিখিত কারফিউ, অলিখিত জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি নামানো হয়েছে বিজিবির‌্যাব। সোমবার সকাল আটটায় খালি করে দেয়া হয়েছে হল। বরাবর ছাত্র আন্দোলন দমনে একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। বিপুল নিপীড়ন অত:পর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা, মামলামোকদ্দমা

এবারও তাই হয়েছে। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ভরসা রাখছি। যেদিনই বিশ্ববিদ্যালয় খুলুক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা বিক্রির দোকানে পর্যবসিত করবার নীল নকশার বিরুদ্ধে তারা প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবেন।।

লেখক: সংবাদকর্মী; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s