লিখেছেন: আরিফ রেজা মাহমুদ, উদিসা ইসলাম, ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল, জাহিদ জন, বাধন অধিকারী, মনিরা শরমিন প্রীতু, মামুনুর রশীদ মামুন, সালাহউদ্দীন সুমন, সারোয়ার সুমন

ru-movement-13আন্দোলনে নেমেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডের সমাজে গণতান্ত্রিক পরিসর ক্রমাগত সঙ্কুচিত হবার এই দুর্দিনে তারা নেমেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অগণতান্ত্রিক বেতন বৃদ্ধি এবং সান্ধ্যকালিন কোর্স চালুর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। বলা বাহুল্য নিজেদের প্রয়োজনেই নেমেছেন তারা। তবে সেটাও আশাবাদী হবার মতো ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তরফে শিক্ষার্থীদের প্রেস রিলিজে জানানো হয়েছে; বর্ধিত বেতন এবং সান্ধ্যকালিন কোর্স চালুর সিদ্ধান্তটা সিন্ডিকেটের। তবে এই সিদ্ধান্ত মানতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এটাকে তারা অগণতান্ত্রিক বলছেন। কেননা এই সিদ্ধান্তে তাদের কোনো অংশগ্রহণ নাই। সিন্ডিকেটে তাদের প্রতিনিধিত্ব পর্যন্ত নাই। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত নামের কথিত গণতন্ত্র প্রত্যাখান করেছে শিক্ষার্থীরা; বিগত একযুগে চোখে পড়ার মত বড় মিছিল হেঁটেছে মতিহারের প্রতিবাদী চত্বরে। এই মিছিল একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণতান্ত্রিক কাঠামোকে প্রশ্ন করে অন্যদিকে তেমনই প্রতিরোধী হয় বিশ্ববিদ্যলয়ের ধারণাকে সংরক্ষণের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃজনচর্চার প্রতিষ্ঠান। সার্টিফিকেটের নীল চাষ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নয়। তাই এই আন্দোলন আমাদের আশাবাদী করে। এটাই আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সমাজের শুভ আর মঙ্গলের স্বার্থে।

আমাদের সোজা চোখে আমরা দেখতে পাই; ক্রমাগত বিশ্ববিদ্যালয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয়ের মানুষের সন্তানদের প্রতিনিধিত্ব কমছে। অন্যদিক থেকে বললে, ক্রমাগত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড়লোকীকরণ ঘটছে। আজকাল কৃষকশ্রমিকের ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এমনটা খুব কমই চোখে পড়ে। মোটেও এমনটা বলছি না যে; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমাগত শিক্ষাব্যয় বাড়িয়ে এমন হাল করেছে। মোটেও তা করেনি কিংবা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সেটা করতে সমর্থ হয়নি। বরং উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক আয়োজনের বড়লোকীকরণ, ভর্তিপরীক্ষাজনিত অর্থনৈতিক সমীকরণ এবং সামগ্রিক সমাজের বড়লোকীকরণের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্নবিত্তের জায়গা কমেছে। এরপরও যে একজন শিক্ষার্থী গরীব হয়েও উচ্চ শিক্ষার কথা ভাবতে পারে; সেটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে বলেই পারে। এই পারাটা যতো নাপারায় পর্যবসিত হবে, ততো বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার অবমূল্যায়ন হবে। কেননা বিশ্বজনীন জ্ঞান চর্চার সঙ্গে বাণিজ্য সাংঘর্ষিক। মানবমুখী জ্ঞান স্বাধীন পরিসরে বিকশিত হয়; বাণিজ্যসহ যাবতীয় অগণতান্ত্রিকতা স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে। সঙ্গত কারণেই মানবমুখী জ্ঞানচর্চাও ক্ষুণ্ন করে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে গরীবদের প্রবেশাধিকার যতো সঙ্কুচিত হবে; ততোই রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কাধে সামাজিক চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ গাঢ় হবে; হবে কেননা শিক্ষা সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক মানবাধিকার।

ru-movement-12রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন যা করেছে, যা করছে তা শুধু বাণিজ্যিকতা নয়। আরও কিছু। সোজাসাপ্টা বললে শিক্ষকদের হরিলুট। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বিভাগভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা প্রচলিত ছিল তখন থেকেই চলছে এই হরিলুট। বিভাগভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা মানেই সব বিষয়ে আলাদা আলাদা ফর্ম কেনাআলাদা আলাদা পরীক্ষা। বিভাগভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার সময় ফর্মের দাম ছিল ১০০ টাকা। এরমধ্য থেকে প্রশাসন নিরাপত্তা, প্রশ্নপত্র ছাপানো এবং সমন্বয় বাবদ ২৫ শতাংশ অর্থ রেখে দিত। বাকী ৭৫ শতাংশের মধ্যে ১০ শতাংশ যেত বিভাগ উন্নয়ন তহবিলে। আর ৬৫ শতাংশ অর্থ বিভাগ করায়ত্ব করত যা থেকে পরীক্ষা হলে প্রহরা, খাতা দেখা ও ফল প্রকাশের ব্যয় বহন করা হত। আর এত করে খুব বেশি হলে খরচ হত ২০ শতাংশ অর্থ। বাকী ৪৫ শতাংশ অর্থ বিভাগ কী করবে? বিভাগের শিক্ষকরা তা নিজেজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবেন। এটাই ছিল রেওয়াজ। কোন আইন, কোন বিধির বালাই নাই। আর সবচেয়ে বড় বিপত্তি হল কত টাকা বিভাগের শিক্ষকরা ভাগ করে নিয়েছেন তা কখনই অডিট হয় নি, এখনও হয় না। প্রশাসন শুধু তাদের নেয়া ২৫ শতাংশ টাকার হিসেব দেখাতে পারে। বিভাগের টাকার কোন হিসেব তাদের কাছে নেই। কোন কোন বিভাগ এই হিসেবের খাতা পুড়িয়েও ফেলেছে। সরকারিবেসরকারিআধাসরকারিস্বায়ত্তশাসিত কোন প্রতিষ্ঠানেরই কোন ফান্ড ননঅডিটেবল হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯ শতাংশ শিক্ষক এই ‘নন অডিটেলবল ফান্ডের সুবিধাভোগী। আর তাই প্রশাসনিক আমলা শিক্ষক নেতারা ‘বিভাগে নিজস্ব বিষয়’ অজুহাতে পাইকারি দুর্ণীতিকে প্রশ্রয় দেন। তারা নিজেরাও এর সুবিধাভোগী বলে। পরস্থিতি এখনও একই আছে। গুচ্ছপ্রকৃতির পরীক্ষায় গ্রেফ টাকার অঙক আর ভাগ বাঠটায়ারায় সীমানা বেড়েছে। এই দুর্নীতির তদন্ত হওয়া জরুরি। আমরা দুদককে আহ্বান জানাচ্ছি এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে।

রাবির যে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সত্যিকারের সংহতি জানিয়েছেন; তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। একেবারে কৃষকশ্রমিকের শ্রমঘামের টাকায় রাষ্ট্র তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছে। সেখানেই আবার তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছে। এটা তারা মনে রেখেছেন কিংবা রাখতে পেরেছেন; এজন্য তারা আমাদের কাছে নমস্য। তবে অধিকাংশ শিক্ষকেরাই যে টাকার লোভে লোলুপ, সেটাকেও আমরা অস্বাভাবিক মনে করিনা। মুক্তবাজারের দুনিয়ায় বিরাজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টাররা আলাদা কিছু হবেন আশা করব কী করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে নিয়োগ পর্যন্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বতন্ত্র আর অর্থনীতিতে মুক্তবাজারতন্ত্রের দর্শন প্রবহমান। তবে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলতে পারি; তারা চাইলে শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর দাবিও তুলতে পারে, বর্ধিত বেতন আর বাণিজ্যিক সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিলের দাবির পাশাপাশি। শিক্ষকরাও চাইলে লাভের ধান্দাতেই এসে শিক্ষার্থীদের কাতারে সামিল হয়ে নিজেদের ধান্দা অর্জন করতে পারেন। শিক্ষার্থীদের বর্ধিত বেতন প্রত্যাহার আর নিজেদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে (যদিও সেটা তারা করবেন, এমন বিশ্বাস হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সান্ধ্যকালিন দোকান খুলে ব্যবসা করতে তাদের লজ্জা নেই, কিন্তু বেতন বৃদ্ধির ন্যায্য দাবি নিয়ে রাস্তায় নামতে আপত্তি আছে। তাতে লোকজন লোভী বলবে কিনা!)। তবে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাজার বানানো যাবে না। তাতে জ্ঞানজগতের বড়লোকীকরণ আরও নিরঙ্কুশ হবে। তাতে সমাজে বড়লোকের দৃশ্যমানতার দাপটে আড়াল হতে থাকবে অধিকাংশের সমাজ।।

লেখকবৃন্দ: বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s