বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে বাণিজ্য শিক্ষার প্রাধান্য বিস্তার

Posted: জানুয়ারি 22, 2014 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

education-business-1বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিকেই বড় বড় কথা বলতে দেখা যায়। একমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক, ধর্মনিরপেক্ষ, সৃজনশীল পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে কথা বলে সেমিনারে, টকশোতে, গোল টেবিলে তারা মুখে ফেনা তুলে ফ্যালেন, দিস্তার পর দিস্তা কাগজ খরচ করে ইস্তেহার, পত্রিকায় কলাম, আর্টিকেল এসব লিখে থাকেন। সিজিপিএ সিস্টেম চালু হওয়ার পর প্রতিবছর এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিশেষ করে যেকোনো সরকারের শেষ বছর এই বৃদ্ধির উচ্চহার দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। অনেকে এগুলোকেই শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেন। অথচ প্রতিবছর এসএসসিতে এ প্লাস পাওয়া ছাত্রছাত্রীর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে একজনও পাশ নাকরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোর সংখ্যা, যেগুলোতে শিক্ষক, শ্রেণীকক্ষ, বইপত্র সহ পাঠদানের উপকরণের ন্যূনতম লভ্যতা নেই। এসব বিষয়ে মাননীয় শিক্ষাবিদদের টনক কখনো নড়ে না। পত্রিকাওয়ালারা ঐ খারাপস্কুলগুলোকে গালি দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন।

তবে আমার বর্তমান আলোচনার জায়গা অন্যত্র; এবং সঙ্কটের বিশেষ এই দিকটি অভ্যন্তরীণ নয়, মূলত বহিঃস্থ কারণ হতে সৃষ্ট। সাধারণত ছোটকাল থেকে আমরা শুনে আসছি অপেক্ষাকৃত ভালো ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞানবিষয়ে পড়াশোনা করে থাকে। ভালো ছাত্রছাত্রী বলতে পরীক্ষায় যাদের বেশি নম্বর তোলার সক্ষমতা আছে তারাই নয়, যারা পাঠ্যসূচির বিষয়বস্তু যথার্থভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে তাদের কথাও বলছি। রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, জীববিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়গুলোকে বইয়ের পাতা হতে আত্মস্থ করা থেকে শুরু করে গবেষণাগারে ব্যবহারিক পরীক্ষার কঠিন স্তর পার হওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে প্রতিবছর বিজ্ঞানবিষয়ে স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রিসমূহ অর্জন করে এতো এতো ছেলেমেয়ে যাচ্ছে কোথায়? তাদের জন্য চাকরির বাজারে কী সুযোগ অপেক্ষা করে আছে? একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে, বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা বেশির ভাগ সময়েই যে চাকরিগুলো পাচ্ছে তার সাথে ছাত্রজীবনে অর্জিত বিদ্যার বিশেষ সম্পর্ক নেই। পদার্থবিদ্যায় সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে কেউ হচ্ছে ব্যাংকার, রসায়নে পাশ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে হচ্ছে প্রশাসন ক্যাডারের চাকুরে, জীববিজ্ঞানের খুব ভালো ছাত্রটি পরিণত হচ্ছে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আশাবাদী পণ্ডিত মহল এই অবস্থাকে সঙ্কটজনক হিসেবে গণ্য করেন না।

মানবিক বিদ্যা অবশ্য এই দেশে অনেক আগে থেকেই অবহেলিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেখা যায়, বাংলা, ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে যারা পড়ালেখা করেন চাকরির বাজারে তাদের অবস্থা বেশ করুণ। ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্র/ছাত্রীটি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত হয়ে অচিরেই প্রচারমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে আবির্ভূত হন। কোনো বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) মোটা বেতনে পরামর্শকের চাকরিও জুটিয়ে ফ্যালেন অনেকে। কিন্তু ৯৫ শতাংশকে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কেরাণীগিরি করেই জীবন অতিবাহিত করতে হয়। চাকরির বাজারে বিজ্ঞানের ডিগ্রিধারীদের চেয়ে তাদের অবস্থা অধিক শোচনীয়।

মানবিক বিদ্যার চর্চা কোনো হেলাফেলার বিষয় নয়। যেকোনো সভ্য দেশে এর বিশেষ কদর রয়েছে। সেটা দর্শন, শিল্পকলা, ভাষাতত্ত্ব, ফোকলোরযেকোনো ময়দানের ক্ষেত্রেই কথাটা সত্য। মানবিক বিদ্যায় শিক্ষিতরা স্বস্ব সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে খুব ভালো চাকরি পেয়ে থাকেন। ভালো চাকরির অর্থ ভালো বেতন কেবল তাই নয়, অধিত বিদ্যার সাথে বাস্তব কাজের সম্পর্ক রয়েছে এমন জীবিকা অর্জনের উপায়ের কথা বলছি। এর সাথে আরো রয়েছে মানবিক বিদ্যার বিভিন্ন শাখায় জ্ঞানচর্চার অধিকতর বিকাশের সম্পর্ক। অন্যদিকে বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্বও কেবল সঙ্গতিপূর্ণ চাকরিবাকরি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানেও চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্যকলা থেকে শুরু করে অণুজীববিজ্ঞান, জৈব রসায়ন, মনস্তত্ত্ব সহ সব শাখাতেই নতুন দিগন্তের সম্প্রসারণ, গবেষণার মাধ্যমে নিত্যনতুন দিকের উন্মোচনের প্রভূত সুযোগ রয়েছে।

এদেশে মানবিক বিদ্যার চর্চা যেমন ব্রাত্য, এখন বিজ্ঞান শিক্ষাও সেই পথেই অগ্রসর হয়েছে। কেননা এই শিক্ষাকে সৃষ্টিশীল কোনো কাজে ব্যবহারের সুযোগ এখানে নেই। বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যার এই বেহাল দশার ভেতর ‘সগৌরবে’ রাজত্ব করছে বাণিজ্যবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন বেশ লোভনীয় একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই ডিগ্রিধারীদের জন্য বিভিন্ন বেসরকারি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে রয়েছে উচ্চ বেতনে চাকরি লাভের সুবর্ণ সুযোগ। এ কারণে ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশ এখন নিয়মিত পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরও বেসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের দিকে ঝুঁকছে।

বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে সৃজনশীলতার অভিপ্রকাশ, উৎপাদনী শক্তির বিকাশ সাধন এবং সুকুমার বৃত্তি চর্চা ও সেই সাথে জ্ঞানসাধনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নবদিগন্ত উন্মোচনের; সর্বোপরি মানবসভ্যতার অগ্রগতির। অন্যদিকে বাণিজ্য শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কোনো ধরনের বস্তুগত উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়েও প্রভূত মুনাফা অর্জনের। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থার যে প্রবণতার কথা উল্লেখ করলাম সেটা খেয়াল করলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য নজরে না এসে পারে না। এ দেশে অর্থনীতিতে উৎপাদনশীল খাত প্রায় বিপর্যস্ত, বিজ্ঞান গবেষণার সুযোগ বিস্তৃত নয়সেই সাথে বিভিন্ন বিষয়ে রয়েছে সূক্ষ্মবোধের পরিবর্তে স্থূলতার প্রকট প্রাধান্য। অন্যদিকে আবাসন খাত, বড় বড় শপিং মল, বায়িং হাউস, বিজ্ঞাপনী সংস্থাএসবের অর্থনৈতিক সাফল্যের জয়জয়কার চারিদিকে। চিকিৎসাবিদ্যা, স্থাপত্য, প্রকৌশল, আইনসহ বাণিজ্য শিক্ষার বাইরে যে বিষয়গুলোর চাহিদা রয়েছে সেটাও স্বমহিমায় নয়, তার বাণিজ্য মূল্যের কথা বিবেচনা রেখেই। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে ডাক্তারি পেশায় আসার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা যায় সেটা ‘মানবতার সেবা’ কিংবা চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে নতুন কোনো আবিষ্কারের লক্ষ্য নিয়ে নয়, সম্ভাব্য দ্রুততর সময়ে প্রভূত বিত্তসম্পদ আহরণের চিন্তা থেকে উদ্ভূত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে শিক্ষা ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে বাণিজ্য, কোনো উৎপাদনশীল কিংবা সৃজনশীল ক্ষেত্র নয়। এবং অর্থনীতি ও শিক্ষার এই বর্তমান অবস্থাও দেশের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। যেকোনো পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যারা নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্যপদ লাভ করে, তারা ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের স্বার্থ রক্ষা করে। কিন্তু বাংলাদেশে সরাসরি ব্যবসায়ীরাই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ দেশের সংসদ সদস্যদের শতকরা নব্বই ভাগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অতীত নয়, ব্যবসায়ের সাথে সম্পর্কিত বর্তমানটাই মুখ্য বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়। এদের অধিকাংশই অতীতে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত না থেকেও নির্বাচনের আগেভাগে কোটি কোটি টাকা দিয়ে মনোনয়ন পত্র ক্রয় করে তারপর আরো শত কোটি টাকা খরচের পরই নির্বাচিত হতে পারেন। ব্যবসা, বিশেষত অবৈধ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত না থাকলে এতো অর্থসম্পদ ব্যয় করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং জয়ী হওয়া কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এ দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা সেই পথ বন্ধ করে রেখেছে।

এই ব্যবসায়ী ‘রাজনীতিক’রা নিজেদের শ্রেণীগত স্বার্থ দেখভাল করতে গিয়ে যেসব নীতি নির্ধারণ করেন এবং তাদের পৌরোহিত্যে দেশ যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে তাতে ব্যবসায়ী পুঁজির আধিপত্যই বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্পকলা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেইদিক থেকে বাংলাদেশে সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যদের প্রাধান্য বিস্তারের সাথে অর্থনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাণিজ্যের বর্তমান রমরমা অবস্থা ওতপ্রোত সম্পর্কসূত্রে জড়িত।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s