সাহিত্যে একটি মতাদর্শিক বিতর্ক

Posted: জানুয়ারি 14, 2014 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: আহমদ জসিম

communist-signআমরা কেন লেখি?যে কোন লেখকের জন্য এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন। এই প্রশ্ন প্রসঙ্গে সর্বহারা শ্রেণীর মহানায়ক কমরেড মাও সেতুঙ তাঁর সাহিত্য বিষয়ক ঐতিহাসিক ইয়ানানের ভাষণে বলেছেন, সিদ্ধান্ত নিতে যতই বিলম্ব হোক, আগে আমাদের এই প্রশ্নের সমাধানে আসা উচিৎ আমরা কেন লিখবো (পাঠের স্মৃতি থেকে)। মাকর্সবাদীরা শ্রেণীবিলোপের রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করে, তাই সাধারণভাবেই আমরা ধারণা করতে পারি, একজন মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী লেখক তার সাহিত্য কর্মের ভিতর দিয়ে শ্রেণী চেতনাবোধকেই ফুটিয়ে তুলবে। বিষয়টা অতটুকু হলে লেটা চুকে যেত। না, বিষয়টা নিয়ে আমাদের আরো ভাবনার অবকাশ তৈরি হয়, যখন তলস্তয়এর আলোচনা করতে গিয়ে লেনিন বলেন, তলস্তয় রুশ সমাজের দর্পণ। কারণ আমরা যখন তলস্তয়ের লেখা থেকে লেখককে আলাদা করে শ্রেণীচরিত্র বিশ্লেষণ করি তখন দেখি, তলস্তয় শ্রেণীগতভাবে একজন ফিউডাল ছিলেন, একই সাথে ছিলেন আধ্যাত্বিক চেতনাধারী। অথচ আমরা যখন তাঁর ‘হাউ মা ল্যান্ড ডাজ অ্যা ম্যান নিড’ অথবা আন্না কারেনিনার মতো কালজয়ী সাহিত্য কর্ম পাঠ করতে যাই, দেখি জীবনের যে প্রতিছবি তিনি ফুটিয়ে তুলেছে তা তাকে পুরো রুশ সমাজের আয়না হিসেবে দেখা যায়।

হাউ মা ল্যান্ডএর কথাই ধরা যাক না, যেখানে আমরা দেখছি ভূমিমোহমুগ্ধ এক ভূস্বামীর মৃত্যুর দুয়ারে চলে যাওয়া। মার্ক্স তাঁর ‘ডাসক্যাপিটাল’ গ্রন্থে পুঁজির আচরণ প্রসঙ্গে যেভাবে বলেন, পুঁজি তার মালিকের নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও চলে মুনাফার দিকে। আমরা তলস্তয়ের হাউ মা ল্যান্ড সাহিত্য কর্মে মার্ক্সের উপরে উল্লেখিত উক্তির শৈল্পিক প্রকাশ যেন দেখছি। কিংবা তাঁর আন্না কারেনিনাও বা নয় কেন। আন্না নামে এক পরমা সুন্দরী নারী, যে এক আর্মি অফিসারের ঘর ভেঙে আরেক তরুণ আর্মি অফিসারের কাছে চলে যায়, একগুয়েমিপূর্ণ জীবন থেকে রক্ষা পাবার আশায়। কিন্তু সেই আন্নার শেষ রক্ষা হয় না। শেষে আমরা দেখছি, আন্নাকে আত্মহত্যার পথই বেছে নিতে হচ্ছে। এখানেও আমরা দেখছি বুঁর্জোয়া অন্তঃসারশূন্য জীবনের প্রতি তীব্র ঘৃণা। সাহিত্যে মতাদর্শিক বিতর্ক করতে গিয়ে তলস্তয় প্রসঙ্গটা অবতারণা করতে হলো এই কারণেই যে, তিনি শুধুমাত্র বিশ্বসাহিত্যের অনন্য সম্পদ সমূহই সৃষ্টি করেনি, সেই সাথে প্রচার করেছেন আর্ট ফর আর্ট(শিল্পের জন্য শিল্প)। তিনি শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টির কথা বলেছেন এবং তারই সৃষ্টি আজ মানব সমাজের মহান সম্পদ হয়ে গেছে। তবে কী এটা আমাদের মতার্দশের সংকট?বিশেষ করে আমরা যারা রিয়েলেস্টিক সাহিত্য কিংবা গণমানুষের সাহিত্যের কথা বলি, সাদা চোখে দেখলে তাই মনে হতে পারে, কিন্তু সাহিত্য তো সামগ্রিকভাবে মানবসভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; লেখক তো এই বস্তুজগতের বাইরে গিয়ে কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, ভাববাদীদের পরম স্রষ্টা নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করার পরেও যেভাবে চাইলেই পারে না, তার সৃষ্টি জগৎ থেকে মানুষকে বের করে দিতে। আর এখানেই মার্কসীয় সাহিত্য দর্শনের বস্তুনিষ্ঠতা।

বালজাক নাকি তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া প্রত্যক মানুষের হাঁটাকে অনুকরণ করে দেখতো। এই দেখার মধ্যে কোন ব্যঙ্গ ছিল না, যা ছিল তা হচ্ছে অন্য একজন মানুষের বৈশিষ্ট্যকে নিজের মধ্যে ধারণ করার প্রয়াস। লালন যেভাবে বলেন ‘মানুষ ধর, মানুষ ভজ, শোন বলি রে, পাগল মন…’। মার্ক্স ঠিক সেইভাবে বলেন, গণিতের শাশ্বত নিয়মগুলো যদি মানব স্বার্থের বিরুদ্ধে যেত তাকেও খণ্ডন করা হতো। অর্থাৎ, সৃষ্টির সমস্ত কিছুই মানব স্বার্থের পক্ষে। যার কাছে এই মানব স্বার্থের পরম সত্তা ধরা দিয়েছে, তিনিই মহান স্রষ্টা। এটা যদি সাহিত্য হয় তবে স্টালিনের ভাষায় বলতে হয়, পৃথিবীর তাবৎ মহৎ সাহিত্য মানব জাতির মহান সম্পদ। যে কারণে তলস্তয় যেমন লেলিনের প্রিয় লেখক হয়ে উঠেন, একই কারণে মার্ক্সের প্রিয় লেখক হন বালজাক। আমরা যখন মানুষের কথা বলছি তখন মানুষ একজন লেখকের সাহিত্যে তার সমসাময়িক সমাজের প্রতিচ্ছবির বয়ান আশা করেন। যেটা যথাযথভাবে পেরেছেন বলেই তলস্তয় কিংবা বলজাক মহৎ শিল্পী। ঠিক এই মানুষও তার সমাজ পর্যবেক্ষণ করতে গেলে কতগুলো বিষয়ের সম্মুখীন হয়মানুষের সাথে মানুষের ভেদজ্ঞান, শ্রেণী, শ্রেণী দ্বন্দ্ব, সমাজ বিকাশের নিয়ম শৃঙ্খলাগুলো জানা বুঝার দায়। মার্ক্স যেভাবে অর্থনৈতিক কাঠামোর ভাবনার নির্ভরতার কথা বলেছেন, একই ভাবে ব্যক্তি মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতাকেও স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমাদের কথা ব্যক্তি মানুষের সৃজনশীল হয়ে ওঠা নয়, বরং সামগ্রিকভাবে মানব জাতির সৃজনশীল বিকাশ। সত্যিই বিষয়টা ভাবনারই বটে, বিপ্লবউত্তর যুগে রুশ সমাজে একজন তলস্তয়এর জন্ম হয়, জন্ম হয় দস্তয়েভস্কি, কিংবা ম্যাক্সিম গোর্কি। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমাজে কেন আমরা এমন লেখককে জন্ম হতে দেখি না। একইভাবে আমরা দেখছি ঔপনিবেশিক সমাজে একজন রবীন্দ্রনাথের জন্ম হচ্ছে অথচ স্বাধীন ভারতবর্ষে আমরা আর কোন রবীন্দ্রনাথ দেখছি না। একথা তো অকাট্য সত্য যে, যে কোন মানুষের সৃষ্টি ও সৃজনশীলতা বিচার করতে হয় সময় ও সমাজের নিরীখে। এমন কালজয়ী প্রতিভার জন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে সময়ের মুখাপেক্ষী হয়ে, কিন্তু তাদের সৃজন করা জ্ঞান যা সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য সৃষ্ট। সেই জ্ঞান এই মানবগোষ্ঠীর কতজনে গ্রহণ করতে পারে। এই মর্ত্যলোকের মানুষ যখন ভূপৃষ্ঠ ছাড়িয়ে আকাশ অভিযান চালান তখন মনে হতে পারে মানবজাতি বোধ করি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু যখন শুনি আজও সারা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় স্রেফ মশার কামড়ে। আজও পৃথিবী থেকে নিরক্ষরতা দূর করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তখন নিজের এই সভ্যতার দিকে একবার ফিরে তাকাতে ইচ্ছা করে।

ব্যাপারটা ঠিক এই রকম, সাম্রাজ্যবাদী প্রচারযন্ত্রের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বাঘটা হচ্ছে ভারত। অথচ ভিতরকার কথাটা হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষ বাস করে এই ভারতেই, যাদের সংখ্যা প্রায় ৮৫ কোটি, যাদের দৈনিক আয় এক ডলারেরও কম। ভারতে প্রতিবছর হাজারহাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। যাদের অধিকাংশ মানুষের আত্মহত্যার কারণ দারিদ্র্য। এমন অসম পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসীর কাছে কিভাবে জ্ঞানবিজ্ঞান সার্বজনীন হতে পারে। আবার যাদের আমরা শিক্ষিত বলে জানি, তাদেরই বা কত শতাংশ মানুষ জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী। মনে পড়ে মহান রুশ বিপ্লবের পরবতী রাশিয়ার কথা, স্বয়ং ইংরেজরাই যখন ভুলতে বসেছে শেক্সপিয়রকে তখন রুশ দেশে যেন জীবন্ত হয়ে উঠে শেক্সপিয়রের কবিতা আর নাটক। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, যে নটি সমাজের চরম অবহেলা আর বঞ্ছনার ভিতর দিয়ে নাট্য কলার পরম বিকাশ সাধন করেছে ইতিহাসের পাতায় সে আজও উপেক্ষিত, বরং আমরা শিল্পের সমঝদার হিসেবে চিনি সেইসব রাজাবাদশাজমিদার কিংবা সামন্ত প্রভুদের যারা শিল্পকে নিজের উপভোগের বস্তু হিসেবে করায়ত্ত্বে রেখেছিল। এখানে ইতিহাসও বন্দি। অথচ ইতিহাস সৃষ্টি করে মানুষ। যেভাবে সৃষ্টি করেছে শিল্পকলা। বোদ্ধা গবেষকরাই তো বলেন, কাব্যনৃত্যগীতএগুলো একদা একই সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল। মেহনতি মানুষের সঞ্চারিত শ্রমের ভাষা থেকে কাব্য, কাব্য থেকে গীত এবং শারীরিক ভঙ্গী থেকে নৃত্য আলাদা হয়ে আজ আমাদের সামনে তিনটা পৃথক পরিশিলীত শিল্প হিসেবে ধরা দিয়েছে। একইভাবে প্রচীন গুহাচিত্র থেকে চিত্রকলা। আমি চাই বা নাচাই সমাজ সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে মানুষের মন ও মননের বিকাশ হয়, সেই সাথে বিকশিত হয় জ্ঞানবিজ্ঞানের সমস্ত শাখা। কিন্তু এই বিকাশের ক্ষমতা যখন মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয় তখন তার স্বাভাবিক বিকাশ বাঁধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আমরা দেখি এক বিকৃত ও বিকলাঙ্গ বিকাশ। শাসকশ্রেণী বিকাশ করে তার নিজের উপযোগি করে। এখানে নৈতিককতার কোন বালাই নেই, নেই কোন মানব সভ্যতার প্রতি দায়বোধ। প্রসঙ্গক্রমে একটা স্মৃতি চারণ করছি, থাইল্যান্ডের জাতীয় আয়ের উল্লেখযোগ্য যোগানদাতা সেই দেশের যৌন ব্যবসা থেকে। সেই যৌন ব্যবসা নিয়ে লুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকা একটা ফিচার পড়েছিলাম। যেখানে দেখা যাচ্ছে এক গণিকা সম্পর্কে তার পিতা বলছে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করার জন্য বিজ্ঞানীরা যদি তাদের মেধা বিক্রি করতে পারে সেখানে আমাদের সন্তানরা শরীর বিক্রি করতে অপরাধ কোথায়। সত্যিইতো বুঁর্জোয়াদের নৈতিকতা হচ্ছে মুনাফার কাছে, আর মুনাফার প্রশ্নটা সামনে রেখে নৈতিককতার প্রশ্নটাইতো অবান্তর। সেই গণিকার পিতার প্রশ্নের সাথে সঙ্গতি রেখে আরেকটু ইতিহাস পাঠ করা যেতে পারে। ভিয়েতনাম অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন ছাত্রসমাজ যখন প্রতিরোধ যুদ্ধে নেমেছিল তখন মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য পর্নো ছবি তৈরি করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে দিয়েছিল। আজ আমরা বুর্জোয়া মিড়িয়ার মধ্যে দিয়েই জানতে পারি মার্কিন সমাজ আজ কেমন অবক্ষয়ের শিকার। প্রয়োজনে বুঁর্জোয়ারা শুধু যে যৌনতাকে ব্যবহার করে তা নয়, তারা ব্যবহার করে ধর্মকেও। এই ব্যবহারের নমুনা আমরা পাই ইরাক যুদ্ধেও। রণক্লান্ত মার্কিন সৈনিকদের উজ্জীবিত করতে একদিকে সরবরাহ করা হচ্ছে পর্নোগ্রাফি, অন্যদিকে বাইবেল। আর এই ধারার নমুনা আমরা আমাদের দেশে হরহামেশাই দেখছি।

শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের দামে যে রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি, ৪২ বছরেও এই রাষ্ট্রটি গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধারণ করেনি, যে কারণে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করাটাও রয়ে গেছে অধরা। সমাজের প্রতিটা স্তরেই রয়েছে শ্রেণীগত নিপীড়ন, কখনো তা প্রকাশিত হয় জাতিগত নিপীড়ন আকারে, কখনো বা ধর্মীয় লেবাসে, আবার কখনো বা তা পুরুষতন্ত্রের আদলে। আমরা জানি যে, জাতিগত, ভাষাগত, ধর্মগত, বর্ণগত বা লৈঙ্গিক নিপীড়নও শ্রেণী শোষনেরই অপর নাম। এটি মার্ক্সবাদের অন্যতম শিক্ষা।

রাষ্ট্রের মানুষদের আজ দেশপ্রেমের সবক নিতে হচ্ছে কর্পোরেট মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপন চিত্রের মধ্যে দিয়ে, আজও এদেশে সার্বজনীন শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত হলো না। এটা আমাদের জন্য নিশ্চিতভাবেই নির্মম পরিহাসের বিষয়, অথচ আমাদের এই পরিহাস নিয়ে তামাশা করলো কর্পোরেট এক পত্রিকাগোষ্ঠি। তাদের পোষা আশি বছরের এক বুদ্ধিজীবিকে দিয়ে শপথ করালো গৃহপরিচারিকাদের স্কুলে পাঠানোর, অথচ সেই নির্মম সত্য আড়াল হয়ে গেল যে, যে বয়সে এইসব ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাবার কথা তারা স্কুলে না গিয়ে চরম অপমানকর কর্ম অন্যের গৃহের ফরমায়েশ খাটছে। এইভাবে আমাদের মানবসত্তা বন্দি হয়ে গেছে পুঁজির স্বার্থের কাছে। যেখানে সমগ্র মানবসত্তাই বন্দি, সেখানে শিল্পসাহিত্যের মুক্তির প্রশ্নটাইতো অবান্তর। এখন কথা হচ্ছে, আমরা যারা খাঁটি শিল্পসাধনের পক্ষে তারা কী শিল্পকে মুক্ত আঙ্গিকে দেখতে চাই না?অবশ্যই চাই। যদি না চাইতাম, তবে লেখা প্রকাশের দায় নিতাম না। কিংবা মহৎ শিল্প সৃষ্টিতে উচ্ছ্বসিত হতাম না। আজকের যুগে মানব মুক্তির প্রশ্নের সাথেই জড়িত মানবিক সমস্ত জ্ঞানবিজ্ঞানের মুক্তির প্রশ্নটা। এই ক্ষেত্রে লেনিনের সেই বিখ্যাত উক্তিটা স্মরণ করা যেতে পারে, পৃথিবীতে তিন প্রকারের দাস আছে, এক প্রকারের দাস যারা দাসত্বকে নিয়তি ভাবেন, দ্বিতীয় প্রকারের দাস যারা দাসত্বকে উপভোগ করেন এবং আরেক প্রকারের দাস যারা দাসত্বের শৃঙ্খলকে ভাঙতে চান। যারা দাসত্বকে উপভোগ করেন তাদের কাছে শিল্পের দায় কিংবা গণমানুষের জন্য শিল্প দুইটাই অবান্তর। কিন্তু যে জ্ঞানসাধক দাসত্বকে ঘৃণা করেন সামগ্রিক মানবমুক্তির প্রশ্নটাতো তার সামনে আসতে বাধ্য। সেই সাথে এই কথাটাও এখানে পরিষ্কার হওয়া জরুরি, আমরা যখন গণমানুষের জন্য শিল্পের কথা বলছি তখন ব্যাপারটা নিশ্চয় এরকম নয় যে, উচ্চ মার্গের শিল্প বাদ দিয়ে সবাইকে অতিসাধারণ মানের শিল্প সৃষ্টি করতে হবে। আমরা যখন গণমানুষের জন্য শিল্পের কথা বলি তখন বুঝাতে চাই সকলের জন্য জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। জ্ঞানকে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের মধ্যে বন্দি না রেখে সমগ্র মানুষের জন্য জ্ঞানোপযোগী সমাজ তৈরি করা। আর এই সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য পুরো সমাজের উৎপাদন পদ্ধতি পাল্টানো ছাড়া তো আর কোন বিকল্প আমাদের সামনে নেই। মনে রাখতে হবে এই পাল্টানোর সংগ্রামে প্রাচীনপন্থি অথবা দাসত্ব উপোভোগকারিদের কতিপয়ের সমালোচনা হলো ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই সমাজব্যবস্থায় প্রতিমুহূর্তে ব্যক্তিমানুষ তার সামগ্রিকতার ভিতর দিয়ে অধিকার বঞ্ছিত হচ্ছেএই বিষয় নিয়ে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বলা বাহুল্য হবে না যে, মুক্তসমাজ রক্ষাই পরাজিত শ্রেণীর শিল্পসাহিত্যসহ যে কোন ধরণের অপপ্রয়াস রুখে দেওয়াটা নীতিসম্মত, যেভাবে এই দাসত্বমূলক সমাজ প্রতিমুহূর্তে মানবমুক্তির প্রশ্নটাকে দমন করছে।।

——————————————————-

আহমদ জসিম : সাহিত্য বিশ্লেষক, সাংস্কৃতিক কর্মী

(লেখাটি মঙ্গলধ্বনি‘র ৩য় প্রিন্ট সংখ্যায় [অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যা] প্রকাশিত হয়েছে।)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s