লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

election-2013ভারতীয় উপমহাদেশে সংসদীয় রাজনীতির সূচনা হয় ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসকদের হাত ধরে। মূলত কোম্পানি ও রাণীর শাসন মিলিয়ে পুরো সময়জুড়ে সিপাহী বিপ্লব, ফকিরসন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ প্রভৃতি থেকে শুরু করে আরো বিভিন্ন আন্দোলনসংগ্রামের প্রেক্ষিতে শাসক গোষ্ঠী বুঝতে পারে যে কেবল নিপীড়ন চালিয়ে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ভূমিস্বার্থকেন্দ্রিক একটি দালাল গোষ্ঠী তৈরি করে এই বিশাল ভূখণ্ডের সকল জনগণের ওপর দীর্ঘ শাসন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এই চিন্তা থেকেই তারা নিজেদের দেশীয় আদলে এই ভূখণ্ডেও সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয় এবং ১৮৮৫ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় একজন অগ্রণী ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বৃটিশ সরকারের আমলা অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম। তিনি কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডুফেরিনকে লেখা পত্রে উল্লেখ করেন যে দীর্ঘদিনের বৃটিশ শাসনশোষণের প্রেক্ষিতে জনসাধারণের মধ্যে যে ক্ষোভের বাষ্প পুঞ্জীভূত হয়েছে সেটিকে নির্গত হতে দেয়ার জন্য তাদের অন্তরে ক্ষমতা প্রয়োগের একটি প্রপঞ্চ তৈরি করা প্রয়োজন এবং কংগ্রেসের মতো একটি রাজনৈতিক দল গঠন ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ে তা অধিক সফলতার সাথে সুসম্পন্ন হতে পারে না। (“A safety valve for the escape of great and growing forces generated by our own action, was urgently needed and no more efficacious safety valve than our Congress movement could possibly be devised”.)

এ পন্থাতেই তাদের ভেতর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বাষ্পের আকারে নির্গমণের পথ পাবে বলে সর্বজনাব হিউম ধারণা পোষণ করেন। জনগণ যাতে মনে করেন দেশের শাসক নির্বাচনে তাদের একটা ভূমিকা রয়েছে এবং ভোট প্রদানের মাধ্যমে তারা সেই অধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষমএমন একটা আবহ তৈরি করে শাসনশোষণের পথ নিষ্কণ্টক রাখার প্রাথমিক উদ্দেশ্য থেকেই সর্বভারতীয় কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই সেখানকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানো হয়। অন্যদিকে অভিন্ন কারণে সাম্প্রদায়িক তাগিদ থেকে বিংশ শতাব্দের গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে উচ্চ বংশীয় মুসলমান সামন্ত শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। বৃটিশভারতীয় শাসক গোষ্ঠী এই দুটি রাজনৈতিক দলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেই জনগণকে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক বৃত্তে আটকে রাখার প্রয়াস লাভ করে। কিন্তু নানকার বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, টংক বিদ্রোহ সহ সন্ত্রাসবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠীর বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের ফলে এবং কংগ্রেসমুসলিম লীগ দলের আন্দোলনসংগ্রামও কিছুটা জাতীয়তাবাদী রূপ লাভ করায় বিভিন্ন জটিল ঘটনার প্রেক্ষাপটে বৃটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত ভারতকে দুইটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের হাতে তাদের ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় গ্রহণ করে। এসব ঘটনা সবারই জানা।

ওপরে অতি সংক্ষেপে এই জানা ঘটনাগুলো উল্লেখের কারণ হলো ভারতের বিশেষ পরিস্থিতিতে এখানে সংসদীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষিতটি সহজে বুঝতে পারা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন শোষণনির্যাতনমূলক ব্যবস্থার অনিবার্য ফলস্বরূপ দুর্ভিক্ষ, অনাহার, গণমৃত্যু, লুণ্ঠন প্রভৃতি জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভবিক্ষোভের সঞ্চার করে তা অচিরেই কিছুটা সংগঠিত রূপ লাভ করে তাদের শাসনের ভিত্তিমূলকে আঘাত করতে শুরু করে। কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি শাসনভার নিয়েও এই সঙ্কট সামাল দেয়া সম্পূর্ণরূপে সম্ভব হয় নি। তখন তাদের মধ্যে এই উপলব্ধি হয় যে, জনগণকে ক্ষমতা চর্চার কিছুটা স্বাদ দেয়া প্রয়োজন। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করে যদি তাদের ক্ষোভবিক্ষোভকে একটি আধারে ধারণ করা সম্ভব হয় তাহলে শাসনের কাজ সহজ ও অনেকাংশে নির্বিঘ্ন হবে। উৎপাদনসম্পর্কের মূল কাঠামোকে অক্ষত রেখে, শ্রেণী শাসনের অধীনে জনগণকে পদানত করে তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজন থেকেই কংগ্রেসমুসলিম লীগ প্রভৃতি রাজনৈতিক দল এবং সাধারণভাবে সংসদীয় রাজনীতির ভিত্তি ভারতবর্ষে স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে নানকার বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন সহ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি বিশেষ প্রবণতা অভিমুখে ঘনীভূত হওয়া এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক সঙ্কট প্রভৃতি বৃটিশ সরকারকে উপমহাদেশ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য করলেও তারা দেশ শাসনের ভার রেখে যায় নিজেদের সৃষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে। ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে যে সংসদীয় রাজনীতির দেখা আমরা পাই তা বৃটিশ শাসক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থারই উত্তরাধিকার।

ঔপনিবেশিক বৃটিশ সরকার প্রণীত এই ব্যবস্থা যে শ্রেণী শাসন বজায় রাখতে এ পর্যন্ত মোটামুটি সক্ষম হয়েছে সেটা এর ইতিহাসের দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়। এই উপমহাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলই সংসদীয় ব্যবস্থা ব্যতীত অন্য উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয় নি। একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারত নেপাল, যেখানে একীভূত নেপালী কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-এর নেতৃত্বে সে দেশে জনগণের বিপ্লবী শক্তি ২০০৬ সালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল অন্যান্য দেশের তুলনায় নেপালে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় অপেক্ষাকৃত অনেক পরে, ১৯৯০ সালে। সে দেশের জনগণের সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা ও অভ্যস্থতাও তুলনামূলক নবীন। সে কারণে নেপালী কংগ্রেস কিংবা সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টির জনভিত্তি সেখানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। জনগণ তাদেরকে সামন্তবাদের একনিষ্ঠ সেবক হিসেবেই চিহ্নিত করেছিলেন। এই সুযোগে পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচণ্ডর নেতৃত্বে ক্রমশ শক্তি অর্জনের মাধ্যমে ২০০৬ সালে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। কিন্তু ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে সে দেশের সামন্তীয় শাসক গোষ্ঠী মাওবাদীদেরকে নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে আসতে বাধ্য করে। সাম্রাজ্যবাদের অধীনে পরিচালিত নির্বাচনে জয়লাভ করলেও এর অনিবার্য ফলস্বরূপ সংগঠনটি অচিরেই অন্যান্য সংসদীয় দলের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আমলাতান্ত্রিকতানির্ভর সংগঠনে পরিণত হয়ে সে দেশের বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী জনগণের আস্থা হতে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে সহসভাপতি মোহন বৈদ্য কিরণের নেতৃত্বে ২০১২ সালে দলটির ভাঙন সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি নেপালী কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) অন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন।

কিন্তু ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ তাদের রাষ্ট্রগঠনের প্রথম থেকেই শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে সংসদীয় রাজনৈতিক কাঠামোকে। এর মধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই সেখানে সংসদীয় নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি বিঘ্নিত হয়ে এসেছে উপর্যুপরি সামরিক শাসকদের পদাঘাতে। এর কারণ মূলত বৃটিশ পাকভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের মধ্যেই সন্ধান করতে হবে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যে সামন্তীয়বুর্জোয়া শ্রেণীর বিশেষ অংশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সংগঠিত করেছিল তাদের অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল ভারতীয় বড় পুঁজির প্রতিনিধিদের অনেক পরে। তাছাড়া এই বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব সরাসরি ধর্মকে সামনে নিয়ে আসায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা এখানে পরিপক্বতা লাভ করার সুযোগ পায় নি। যার ফলে দেখা যায়, শাসক দলগুলোর দুর্নীতির সুযোগে এবং ধর্মের নাম নিয়ে সামরিক বাহিনী বারবারই সেখানে ক্ষমতা দখল করেছে তাদের শ্রেণী শাসন অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে। বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর অপরিপক্বতাজনিত সঙ্কট এর জন্য দায়ী। বর্তমানে সেখানে একটি ভঙ্গুর সংসদীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও তার খুঁটি হিসেবে কাজ করছে বহিঃস্থ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

তবে ভারতে এই সংসদীয় ব্যবস্থা বেশ পোক্তরূপেই এখন পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে কখনোই তাদের সে ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয় নি। বরং ২৮ টি অঙ্গরাজ্যে বিভক্ত এই রাষ্ট্রের লোকসভা ও রাজ্যসভা নির্বাচন নিয়ম মেনেই নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে এবং এর মাধ্যমে রাজ্যগুলোতে ও কেন্দ্রে সরকারও পরিবর্তন হচ্ছে। এর অর্থ অবশ্য এটা নয় যে সেখানে শাসক শ্রেণীর মধ্যে দুর্নীতি নেই, তাদের শ্রেণীগত কোনো সঙ্কট নেই। কিন্তু স্বীয় পরিপক্বতার বদৌলতে তারা সেই সঙ্কট এখনো পর্যন্ত পার হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে এবং সঙ্কটকে নাগালের বাইরে যেতে দ্যায় নি। সম্প্রতি ব্যাপক দুর্নীতির প্রেক্ষিতে সেখানকার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের বীতশ্রদ্ধার সুযোগে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে আম আদমি নামক এক নতুন পার্টির উত্থান ঘটেছে। মূলত আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী অনশন কর্মসূচির জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই রাজনীতির বাজারে তাদের বাণিজ্য চাঙ্গা হওয়ার পথে। কিন্তু এই দুর্নীতিবিরোধিতার প্রশ্নে তার উৎসমূলের সন্ধান কিংবা রাষ্ট্রকাঠামোকে জনগণের আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্যই অক্টোভিয়ান হিউমকথিত ‘সেফটি ভালভ’ হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনে দেশটির রাজনৈতিক মঞ্চে দলটির আবির্ভাব ঘটেছে। এভাবে ঔপনিবেশিক আমলের শাসনকাঠামো, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখেই বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে কিছু লোক দেখানো সংস্কার সাধন করে নিজেদের শ্রেণী শাসন অব্যাহত রাখার পুঁজিবাদী তাগিদেই ভারতে আম আদমির জয়জয়কার, তাদের উত্থানে উল্লসিত হওয়া বিভ্রান্ত লোকজনের অভাবও সেখানে নেই।

তবে এদিক থেকে বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর অবস্থা অনেক শোচনীয়। ১৯৭২ সালে এই নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই এখানে যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চা বলতেও কিছু থাকবে না এটা বিশেষভাবে প্রমাণিত হয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল দলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবিকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে সংবিধান প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংবিধান সভার সদস্যদের নিয়ে স্বাধীন দেশের সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরবর্তীতে এটা আরো ভালোভাবে প্রমাণিত হয় ১৯৭৩ সালে ব্যাপক কারচুপির নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের ব্যালট ছিনতাইয়ের পর গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর “দেশে কোনো বিরোধী দল নেই”এই দম্ভোক্তি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। আর ১৯৭৫ সালের প্রারম্ভেই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ঘোষণার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সম্পন্ন হয়েছিল সরকারবিরোধী সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে।

১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের সামরিক শাসনের অবসানের পর এ দেশের জনগণ আশা করেছিলেন এরপর হয়তো গণতন্ত্রের ‘সুবাতাস’ বইবে। কিন্তু যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাষ্ট্র সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই সংস্কৃতির ধারক এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের জীবন, জীবিকা, অধিকার, নিরাপত্তা, উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো সহ নির্বাচনী রাজনীতির ক্ষেত্রেও কোনো সুস্থ ব্যবস্থা দেশবাসীকে উপহার দিতে সক্ষম হয় নি। উপরন্তু নিজেদের লুটপাটদুর্নীতির অপ্রতিহত তাগিদে তারা আর সব কিছুর মতো নির্বাচনী ব্যবস্থাকেও খুব নিকৃষ্ট পন্থায় দলীয়করণ করে ফ্যালে। ১৯৯১ সালের বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর যাওয়ার পর দেখা গেল দলীয় সরকার ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তখনো দেশে সৃষ্টি হয় নি। এ জন্য প্রয়োজন হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের। সেই ব্যবস্থাও এমনি এমনি প্রবর্তিত হয় নি। বিএনপি নিজেদের অধীনেই নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন “পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়”। কিন্তু আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী সহ তৎকালীন বিরোধী দলগুলো ১৫ ফেব্রুয়ারির এক তরফা নির্বাচন বয়কট করে রাজপথে সক্রিয় হয়। তাদের আন্দোলনসংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে শেষ পর্যন্ত সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাশ করিয়ে তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজন করে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

মাঝখানে দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে বিশেষত ২০০৭ সালে বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা কম হয় নি। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণের অভিপ্রায়ে তৎকালীন বিএনপিজামায়াত জোট প্রধান বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি করেছিল। এই বিষয় নিয়ে শাসক গোষ্ঠীর দুই জোটের মধ্যে সৃষ্ট সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি দেশকে নিয়ন্ত্রণের অযোগ্য সঙ্কটে নিক্ষিপ্ত করলে এবং তৎকালীন বিএনপিপন্থী রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে ঘোষণা করে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদকে সামনে রেখে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনীযার পেছনে কলকব্জা নেড়েছিল মার্কিনবৃটিশ সহ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং মূলত সুশীল সমাজ নামে পরিচিত তাদের এ দেশীয় দালালেরা। তিন মাসের স্থলে দীর্ঘ দেড় বছর ক্ষমতায় থেকে এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে সংস্কার, ‘মাইনাস টুফর্মুলা, নিজেদের আশ্রয়ে ও তত্ত্বাবধানে নতুন দল গঠনের প্রচেষ্টা সহ রাজনীতি নিয়ে অনেক রকম পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে তারা শেষ পর্যন্ত যে নির্বাচনের আয়োজন করে তাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করে ২০০৯ সালের প্রারম্ভে সরকার গঠন করে।

ক্ষমতাসীন হয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অভূতপূর্ব ঘোষণা দিলেন। যেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার দাবিতে তার দল ১৯৯৬ সালে জামায়াতকে সাথে নিয়ে রাজনীতির মাঠময়দান গরম করেছিল, সেই ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়এমত ঘোষণা দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করিয়ে তত্ত্বাবধায়কের ব্যবস্থা সংবিধান থেকে তিনি উঠিয়ে দিলেন। এখন আবার বিএনপিজামায়াত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তারা শুরু করেছে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন। এই দাবিতে দিনের পর দিন হরতালঅবরোধ শুধু নয়, বেসামরিক নিরীহ জনগণের ওপর চড়াও হয়ে তাদের খুন করতেও পিছপা হয় নি। এদিকে বিরোধী দলের তাণ্ডব ঠেকানোর নামে সরকারি দলের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী হিসেবে মাঠে নামা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের ছোড়া গুলিতেও নিহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ।

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতাদের মধ্যে দৃশ্যমান যতোই বিরোধ থাকুক না কেন, চরিত্রের মধ্যে কোনো মৌলিক তফাত নেই। উভয়ই একইভাবে ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় দুর্নীতিলুটতরাজের ওস্তাদ, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের একনিষ্ঠ সেবক, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকারী, রাজাকারস্বৈরাচারীর সাথে সময়সুযোগ মতো জোটগঠনকারী, নিকৃষ্ট দলীয় ও পারিবারিক স্বার্থের দ্বারা তাড়িত রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে অভিন্ন সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। এছাড়া অন্যান্য মৌলিক বিষয়েও তাদের বাস্তব আচরণের মধ্যে পার্থক্যের তুলনায় সাদৃশ্যই বেশি। কিন্তু তাদের এতোসব কর্মকাণ্ড, বক্তব্য এবং কথাবার্তার মুখ্য উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতায় গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সেবাদাস হিসেবে কাজ করে কমিশনের ভাগ নেয়া এবং দুর্নীতিলুটপাটের মাধ্যমে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ লুটে নিজেদের উদরপূর্তি করা। এই চিন্তায় তারা এতোটাই আবিষ্ট যে এর দ্বারা তাদের শ্রেণী শাসন ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে শাসক শ্রেণী হিসেবে তাদেরকে সঙ্কটাপন্ন ও ভঙ্গুরপ্রায় করে তুলছে সে বিষয়ে তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র সচেতনতা নেই। শ্রেণী হিসেবে তাদের সঙ্কটগ্রস্থতারই উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এবং এই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে দলীয়করণের জন্য তাদের যাবতীয় অপকর্ম।

এ কথা নিবন্ধের শুরুতেই বলা হয়েছে যে, সংসদীয় নির্বাচন ব্যবস্থা প্রণীত হয়েছে এর শ্রেণী শাসন টিকিয়ে রাখা এবং জনগণকে শোষণের পথকে নিষ্কণ্টক রাখার বাসনায়। এই উদ্দেশ্যেই পাঁচ বছর পরপর শাসক দলের শোষণনিপীড়নে অতিষ্ঠ জনগণের ক্ষোভের বাষ্প নিষ্ক্রমণের জন্য ভোট প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর দ্বারা জনগণের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি করা হয় যে, তারা নিজেদের জন্য শাসক নির্বাচন করতে সক্ষম। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক দল পরিবর্তন হলেও শাসনকাঠামোয় কোনো পরিবর্তন সংঘটিত হয় না। বিদ্যমান উৎপাদনসম্পর্কও থাকে অটুট। কেননা সংসদীয় ব্যবস্থার অধীন সরকার ও বুর্জোয়া বিরোধী দলগুলো একটি শ্রেণী হিসেবেই জনগণকে শোষণশাসনের মাধ্যমে তাদের আধিপত্য বজায় রাখে এবং নিজেদের বিকাশ ঘটায়। এর প্রয়োজন থেকেই তারা প্রণয়ন করে তাদের স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সংবিধান, সংসদ, সামরিকবেসামরিক আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, তথাকথিত গণমাধ্যম এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহ।

এই ব্যবস্থার অধীনে যেই ব্যক্তি কিংবা দলই নির্বাচিত হয়ে আসুক না কেন তাদেরকে বিদ্যমান কাঠামো অক্ষত রাখা এবং সংবিধানের ‘পবিত্রতা’ রক্ষার শপথ নিয়েই ক্ষমতায় আসীন হতে হয়। ফলে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণকে শোষণনিপীড়নের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখছে তার শরীর আঘাতপ্রাপ্ত হয় না। কিন্তু এই শোষণনিপীড়ন অব্যাহত থাকলেও জনগণ যেন সামগ্রিক ব্যবস্থাটির প্রতিই বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাকে আঘাত করতে উদ্যত না হন সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রচারমাধ্যমে অবিরত সংসদীয় ব্যবস্থার গুণকীর্তন করা হতে থাকেএর মাধ্যমে জনগণের মানসপটে সংসদীয় গণতন্ত্রের ‘মাহাত্ম্য’ চিরস্থায়ীভাবে অঙ্কিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। জনগণ যেন বিকল্প চিন্তা না করতে পারেন, সক্রিয়ভাবে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগের দ্বারা রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তন করতে এগিয়ে না আসেন সে জন্য বিপ্লবী যেকোনো রাজনৈতিক শক্তিকে আখ্যায়িত করা হয় ‘সন্ত্রাসবাদী’, ‘উগ্রপন্থী’ প্রভৃতি বিশেষণে, তাদের জন্য নিয়োজিত হয় রাষ্ট্রীয় বিশেষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমন ও ঘেরাও অভিযান, বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য বরাদ্দ থাকে ‘এনকাউন্টার’, ‘ক্রয়ফায়ার’ প্রভৃতির বাতাবরণে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

লক্ষণীয় বিষয় যে, বাংলাদেশের সাম্রাজ্যবাদী ‘মিত্র’রাও এ দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত সক্রিয়। এ কারণেই তাদের দূতাবাসগুলো প্রায়শই বিবৃতি দিয়ে থাকে যে, নির্বাচিত সরকার ছাড়া সংবিধানবহির্ভূত কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে তারা মেনে নেবে না। মূলত এই সংসদীয় ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্যই ২০০৭ সালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে অনুষ্ঠিত উপর্যুপরি বৈঠকগুলো ব্যর্থ হওয়ায় এই ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করে তাকে কিছুটা চলনসই করার তাগিদে তাদেরকে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতায় আনার পথ প্রশস্ত করতে হয়েছিল।

বৃটিশ আমলে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করে তার মাধ্যমে জনগণের ক্ষোভবিক্ষোভকে নির্গমণের ব্যবস্থা করে নিজেদের শোষণের পথ উন্মুক্ত রাখার স্বার্থেই তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী এই নির্বাচনী কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৪৭ সালে ‘স্বাধীন’ হওয়ার পরেও এই দেশগুলো নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অধীনে সেই কাঠামোকে সংরক্ষণ ও বহন করে চলেছে। এই ব্যবস্থায় সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রাথমিক শর্তই হলো বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অটুট রাখার প্রতিশ্রুতি প্রদান। এই কাঠামোর অধীনে সামান্য কিছু সংস্কার ছাড়া কোনো বৈপ্লবিক অথবা জনগণের ভাগ্যের মৌলিক পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয়। তাছাড়া বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় অনুন্নত পশ্চাৎপদ দেশগুলোর নির্বাচনী প্রক্রিয়া সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থেরপ্রতি লক্ষ্য রেখে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়। পর্যবেক্ষক নিয়োগথেকে শুরু করে বিভিন্ন কারিগরি ও পরামর্শক সহায়তা প্রদানের নামে তারা এই নিয়ন্ত্রণকার্যকর রাখে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেএই বক্তব্য অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অধিক সত্য। এই সত্য প্রতিবার নির্বাচনের সময় ক্রমান্বয়ে অধিক মাত্রায় স্পষ্ট হচ্ছে।

তাই জনগণের পক্ষ শক্তি হিসেবে দাবিদার রাজনৈতিক কোনো দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে বলে যে এটা তাদের নীতি নয়, কৌশলতাহলে তাদের অবস্থাও হতে পারে নেপালে প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন একীভূত কমিউনিস্ট পার্টির মতো। অথবা ভারতের আম আদমি পার্টির ন্যায় সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে চালিয়াতি ভূমিকা পালনের মধ্যেই তাদের যাবতীয় কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকবে। এসবও সম্ভব হতে পারে যদি তারা নির্বাচনে অন্তত কিছু আসন লাভের মতো অবস্থায় উপনীত হয়। অন্যথায় পরিবর্তনাকাঙ্ক্ষী জনগণকে বিভ্রান্ত করা এবং সংসদীয় রাজনীতির পাকচক্রে আবদ্ধ রাখা ছাড়া তাদের অন্যবিধ ভূমিকা থাকবে না।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে শেখ হাসিনা নিজের অধীনে নির্বাচনের যে ব্যবস্থা করেছেন তার অভূতপূর্ব যাদুমন্ত্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই ১৫৪ জন আওয়ামী ও মিত্র দলের প্রার্থী সংসদ সদস্যপদ নিশ্চিত করেছেন! অর্থাৎ জনগণ ভোট প্রদানে তার বুর্জোয়াকথিত ‘অধিকার’ প্রয়োগের আগেই আগামি পাঁচ বছরের জন্য তার পরবর্তী শাসক অর্জনকরেছেন। এ হলো গণতন্ত্রের প্রধানতম কাণ্ডারি শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে দেশের গণতন্ত্রাকাঙ্ক্ষী জনগণের জন্য শতাব্দীশ্রেষ্ঠ ‘উপহার’!! বাংলাদেশ কেন, সমগ্র বিশ্বের বুর্জোয়া রাজনীতির ইতিহাস আতিপাতি করে খুঁজলেও এমন অভিনব গণতন্ত্রের দেখা কোথাও মিলবে না।

এ রকম অবস্থায় ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যে জনগণের সাথে তাদেরই উপার্জিত শত শত কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে এক তামাশার বস্তু উপহার দেয়া ছাড়া অন্য কিছু নয়, সেটা যেকোনো সচেতন ও বিবেকবান ব্যক্তিই অনুধাবন করতে পারেন। এই নির্বাচন শাসক আওয়ামী লীগ এবং তাদের একেবারে ক্রোড়াশ্রিত দলগুলো ছাড়া যাদেরই সামান্যতম স্বাতন্ত্র্যের বোধ আছে তাদের কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি তাদের সাম্রাজ্যবাদী মুরুব্বিরাও এমন কাঁঠালের আমসত্ত্বমার্কা গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অত্যন্ত নাখোশ। একমাত্র ভারত ছাড়া এই নির্বাচনে আওয়ামী লগের পাশে দাঁড়ানোর অন্য কোনো বিদেশি শক্তিও নেই। আর জনগণও ব্যাপক মাত্রায় ভোটকেন্দ্রে অনুপস্থিত থেকে শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিককর্মকাণ্ডের প্রতি নিজেদের অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসাররা মশামাছি তাড়াতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন অথবা কেন্দ্রে অনুপস্থিত থেকে ঘরগেরস্থালির কাজ করেছেন। পোলিং এজেন্টরা ইচ্ছেমতো নৌকা মার্কায় সিলছাপ্পড় মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করেছে।

এই নির্বাচন প্রমাণ করছে জনগণকে প্রতারণার মাধ্যমে শ্রেণী শাসন অব্যাহত রাখার সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থাটিও এ দেশে অকার্যকর হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু এই অকার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়াটি কোনো বিপ্লবী শক্তির আঘাতের দ্বারা হয় নি। সেটি হয়েছে স্বয়ং এই নির্বাচনী রাজনীতির ধারকবাহক এবং মাহাত্ম্যপ্রচারকদের দ্বারাই। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী যেমন শ্রেণী হিসেবে অত্যন্ত ভঙ্গুর, এ দেশের বিপ্লবী রাজনীতির অবস্থাও তেমনি খুবই সঙ্গীণ। জনগণের বলপ্রয়োগের শক্তি হিসেবে শোষকনিপীড়ক শ্রেণীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান লড়াই গড়ে তুলবার সামর্থ্য তাদের নেই। কিন্তু তাহলেও এই সঙ্কটপূর্ণ অবস্থায় তারা হাতপা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। তাদেরকেও নিজেদের বক্তব্য নিয়ে জনগণের কাছে যেতে হবে এবং সংসদীয় নির্বাচনী রাজনীতি, বিশেষত তার বাংলাদেশি সংস্করণের প্রকৃত চেহারাটা তাদের সামনে নগ্নরূপে উন্মোচন করে দিতে হবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s